সুবর্ণজয়ন্তীতে অর্জন ও প্রত্যাশা

লেখক:

ইমরান ফিরদাউস

 ‘শুধু এদেশে নয়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশে চলচ্চিত্র সংসদগুলো নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে উঠেছে। নিষ্ক্রিয় উপভোগমাত্র নয়, চলচ্চিত্রে আছে দর্শকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও উৎসাহ; এ-ঘটনাShameem Akhter_photo credit - Imran FIrdaus

তে তাই প্রমাণিত। এসব সংসদ সংখ্যাল্পের আন্দোলন; তাই আন্তরিক বলে এ-আন্দোলনগুলোর মূল্য কম নয়। চোখে দেখে রসাস্বাদন করতে হয়, এমন শিল্পগুলোর ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চিত, তখন সীমিত হলেও চ

লচ্চিত্র-আন্দোলনসমূহের প্রভাব আরো বেশি প্রয়োজন।’            – এরনস্ট লিন্ডগ্রেন১

চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন। একটি শিল্প-আন্দোলনের নাম। যে শিল্প-আন্দোলন ডাক দিয়ে যায় যূথবদ্ধতার, পারস্পরিক মিথোজীবিতার। মানে এ-আন্দোলন যার যার মতো করে একা একা বা কয়েকজনের আলাদাভাবে করার বিষয় নয়। জ্ঞান-সম্বন্ধীয় এই আন্দোলনে শামিল হতে আমরা উপবিষ্ট হই চলচ্চিত্রের ছায়াবীথিতলে। বা বলা যেতে পারে – চেনা অাঁধারের মাঝে বসে অচেনা ছায়াছবির আলোয় জায়মান সময়কে পরখ করে নেওয়ার দৃশ্যরূপক রাজনীতির পাঠের শুরু হয় এ-আন্দোলন থেকেই। চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের উন্মেষ পর্ব হিসেবে চিহ্নিত করা যায় প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী কালকে। এই আন্দোলন দেশ-কাল ভেদে কোথাও পরিচিত ‘ফিল্ম ক্লাব মুভমেন্ট’ (জার্মানি), আবার কোথাও ‘সিনে ক্লাব মুভমেন্ট’ (স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ইতালি) মনিকারে।২ তবে, চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল ফ্রান্সের পারী শহর থেকে ১৯০৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো এক অবকাশে নির্মাতা-সমালোচক লুইস দেলুকের হাত ধরে বাজারে আসতে শুরু করে চলচ্চিত্রসংসদ কর্তৃক প্রকাশিত সিরিয়াস কাগজ সিনেয়া। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সিনেমা একটি নবজাতক শিল্প হিসেবে এগিয়ে চলতে শুরু করে নদীর মতো। এমন মুহূর্তেই সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের উত্থানপর্ব  লক্ষ করা যায়। সে-সময়কার অন্যতম উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র সংসদের নাম হিসেবে বলা যেতে পারে ‘অবজেক্টিফ ৪৯’।৩ ১৯৪৮ সালে যাত্রা শুরু করা ‘অবজেক্টিফ ৪৯’-এর চালকদের মাঝে ছিলেন চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক সমালোচক মহামতি আন্দ্রে বাজাঁ আর সঙ্গে ছিলেন পরিচালক-চিত্রনাট্যকার রেনে ক্লেমেন্ত, আস্ত্রুক এবং আরো অনেকে। আভাঁ-গার্দ ঘরানার এই সংসদের সভাপতি ছিলেন আরেক ফিল্ম মায়েস্ত্রো জঁ ককতো। ‘অবজেক্টিফ ৪৯’ই বলা যায় ফরাসি ‘নব তরঙ্গ’ বা ‘নুভ্যেল ভার্গ’ ফিল্ম-আন্দোলনকে বুকে নিয়ে আশ্রয় দিয়েছিল; শৈশবাবস্থায় লালন-পালন করেছিল মা যশোধরার স্নেহে।

এদিকে ঢাকার কাছে কলকাতায় ১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, বংশীচন্দ্র গুপ্ত এবং আরো কয়েকজন চলচ্চিত্রানুরাগীর কর্মোদ্যোগে শুরু হয় কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির পথচলা।৪ জানবেন, ভুবনবিখ্যাত পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের ফসল। বা আমাদের সূর্যদীঘল বাড়ি স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রথম ছবি, যা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সমাদৃত হয়েছিল, সেটিও চলচ্চিত্রসংসদকর্মীদের কীর্তি। একটু নজর আন্দাজ করলে বোঝা যায় যে, ‘উনিশশো পঞ্চাশ, ষাট আর সত্তরের দশকে ফিল্ম সোসাইটিগুলো ছিল সাংস্কৃতিক পরিসরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিনেমার বাণিজ্যিক পরিকাঠামোটি এক সংকীর্ণ পরিসরে মাধ্যমটিকে বেঁধে রাখতে চায়। ফিল্ম সোসাইটিগুলো বোঝাতে পেরেছিল শিল্প হিসেবে সিনেমার সম্ভাবনা আরও ব্যাপক। সেই সম্ভাবনার নিদর্শনগুলি তারা খুঁজে আনত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।’৫

যাহোক, এত কথা দিয়ে যা বলার চেষ্টা করা হচ্ছে… দেশে-বিদেশে কালে-কালে সৎ এবং নতুন ছবির বিকাশ হয়েছে চলচ্চিত্র সংসদ-আন্দোলনের হাতে হাত রেখে। চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন কখনোই বাধা নয় বরং সুখের সারথিই হতে চেয়েছে; যদিওবা এদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ বাণিজ্য-সংশ্লিষ্টরা এই আন্দোলনকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন, কেননা, এটি দৃশ্যকল্প নিয়ে এক্সপ্লয়টেশন-ম্যানিপুলেশনের ব্যবসাকে খোলাবাজারে নগণ করে ফেলে যখন-তখন। তার ওপর এদেশের চলচ্চিত্রসংসদগুলোর ওপর গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের কালা-কানুনের খড়গ ঝুলছেই ত্রিশ বছর ধরে। একরকম বৈরী পরিবেশেই বলা যায়, বাংলাদেশে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন তার বয়স পঞ্চাশ পার করে ফেলল। হ্যাঁ, কেউ কেউ বলতে পারেন, চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের আগের সেই যৌবন কই!? তাই বলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সামগ্রিক অগ্রগতিপর্বে এই আন্দোলন যে বনস্পতির ছায়া বিস্তার করেনি, সেটি কিন্তু অস্বীকার করবার জো নেই।

বাংলাদেশে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দলনের সূত্রপাত হয় ১৯৬৩ সালের ২৫ অক্টোবর। তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে ঢাকায় বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির হাত ধরে এই অঞ্চলে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টের অঙ্কুরোদ্গম ঘটে। সূচনা হয় নগরকেন্দ্রীক এক নব শিল্প-আন্দোলনের। সুবর্ণজয়ন্তীর ঊষালগ্নে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল এই আন্দোলনের পোড়খাওয়া, জনাকয়েক ঊর্জস্বল চলচ্চিত্র-সংসদকর্মীর সঙ্গে।

বাহাত্তর সাল থেকে চলচ্চিত্র সংসদ-আন্দোলনে জড়িত চলচ্চিত্র-সমালোচক, সংসদকর্মী মাহবুব আলম বলছিলেন ওই আমলের ঘটমান সাংস্কৃতিক প্রতিবেশের গল্প। তখন ঢাকায় একসঙ্গে দুটো শিল্প-আন্দোলন চলছিল। একটি হলো নাট্যচর্চা-আন্দোলন, অন্যটি ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট। ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টের সামনে থেকে কাজ করছিলেন বাংলাদেশের সৎ চলচ্চিত্র-আন্দোলনের পুরোধাপুরুষ মুহম্মদ খসরু। তাঁর মাধ্যমেই চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের হাতেখড়ি মাহবুব আলমের। তবে, বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে তাঁর চেনা-পরিচয় সংসদের কাগজ ধ্রুপদীর পাতা ওলটানোর মধ্যে দিয়ে। তখন পূর্বদেশে ‘আনন্দলোক’ নামে চলচ্চিত্র-পাতাটি আজমল হোসেন খাদেম সম্পাদনা করতেন। জানা গেল, মাহবুব আলম এবং আজমল হোসেন পূর্বদেশে প্রথম চালু করেছিলেন ফিল্ম সোসাইটি সংবাদ বিভাগ – এ-ধরনের বিভাগ তখন কোনো কাগজেই ছিল না এবং বর্তমানেও নেই (!)। পরে চিত্রালীও চালু করে এমন একটি বিভাগ। স্বাধীনতার পরপর চলচ্চিত্রসংসদকর্মী ও নাট্য-আন্দোলনকর্মীরা একসঙ্গে একাতম হয়ে কাজ করতেন। যেমন, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, মামুনুর রশীদ, নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু প্রমুখের যাতায়াত-যোগাযোগ ছিল ফিল্ম সোসাইটিগুলোর সঙ্গে। আর স্বাধীন দেশে ফিল্ম সোসাইটির সংখ্যাও বাড়তে থাকে দারুণভাবে। তখন উল্লেখযোগ্য ছিল সিনেপল, ঢাকা সিনে ক্লাব, সায়েন্স সিনে ক্লাব ইত্যাদি। ওই সময়ে বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি চিটাগাং ও নারায়ণগঞ্জে শাখা খোলে, এর পরপরই রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি, সিনেপল ঢাকার বাইরে শাখা চালু করে। এত কিছুর মাঝেও আন্দোলনে শরিক হওয়ার মতো আগ্রহী নাগরিক খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়েছে সংসদগুলোর। তখন মানুষজনের বোঝাপড়াটাও পোক্ত ছিল না। কারণ, সদস্য করার ক্ষেত্রে সোসাইটিগুলোর আগ্রহ সাধারণে প্রচারিত হয়েছে এভাবে যে, এখানে বোধহয় নিষিদ্ধ কিছু দেখার লোভনীয় সুযোগ আছে, যদিও প্রকৃত চিত্র এমন ছিল না, তা বলা বাহুল্য! এ-কারণেও সভ্য-কর্মী পেতে সংসদগুলোকে একটু কড়াকড়ি করতেই হতো। এ সময়টায় সংগঠনের কাজকর্মও বেড়ে যায়। তখন বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি উদ্যোগ নেয় ও চালু করে ফিল্ম স্টাডি গ্রুপ, ফিল্ম কো-অপারেটিভ, আদার্স ভিডিও কালেক্টিভ (ওভিসি)। ফিল্ম স্টাডি গ্রুপে চলতো ফিল্ম নিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ার আদান-প্রদান। ফিল্ম কো-অপারেটিভের সূচনা হয়েছিল সিনেমা দেখানো ও সচেতন দর্শক নির্মাণের পাশাপাশি চলচ্চিত্র-নির্মাণে প্রস্ত্তত আগ্রহী কর্মীদের প্রযোজনা করার উদ্দেশ্যে। সে-মতে ১৯৮৪ সালে তানভীর মোকাম্মেলের হুলিয়া ছবির কাজও শুরু হয়, যদিও শেষাবধি নানা কারণে তা ফিল্ম কো-অপারেটিভের আওতায় থাকেনি। সংসদের চলচ্চিত্র অধিবেশনে নিয়মিত কবি-সাহিত্যিক-শিক্ষানুরাগীদের আমন্ত্রণ জানানোর চল ছিল, যেন তাদের আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে সিনেমা শুধু ‘বই’ নয় বরং একটি জনগুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের অন্যতম অর্জন ছিল ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করা। এর মূল পরিকল্পনা করেন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সতীশ বাহাদুর। একই সময়ে প্রথম ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। সিনেমা নিয়ে লেখালেখির চর্চা আরো গতিশীল হয়। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়তে যান চলচ্চিত্রসংসদকর্মীরা। আবার, আদার্স ভিডিও কালেক্টিভের (ওভিসি) উদ্দেশ্য ছিল এলাকার ভিডিও ক্লাবগুলোতে ভালো ভালো সিনেমার ভিডিও ক্যাসেটে সরবরাহ এবং ক্লাবগুলোতে ফিল্ম সোসাইটি কর্নার নামে একটি জোন বরাদ্দ করা। চেষ্টাটা ছিল মানুষজনের হাতের আরো নাগালে ভালো ছবি পৌঁছে দেওয়া। আশির দশকে ‘চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর কোপানলে পড়েও স্থবির হয়ে যায়নি এই আন্দোলন। গতি স্তিমিত হয়েছে নিশ্চিত, তবে স্থবির হয়ে যায়নি কর্মীদের জেদের কারণেই। মাহবুব আলমের মতে, এটা মোটেও অত্যুক্তি নয়, আজকের বাংলাদেশে যেসব সিনেমা নিয়ে বিশ্বদরবারে গর্ব করার আছে, তার সবকটারই নির্মাতা চলচ্চিত্রসংসদকর্মীরা।

এদিকে, চলচ্চিত্রসংসদকর্মী ও  নির্মাতা শামীম আখতার যখন চলচ্চিত্র সংসদ-আন্দোলনে যোগ দেন তখন মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছেন। দেশে চলছিল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামল। সরকারের শ্যেন নজরের কারণে ছাত্র-আন্দোলন তখন ভাটার দিকে, কোনো কিছু সে-অর্থে হচ্ছিল না। ওইরকম একটা সময়ে একটা আন্দোলন চলছিল, যা তখনো নজরবন্দি হয়নি সরকারের। সেটা ছিল চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন। চলচ্চিত্র আন্দোলন তখন বা এখন শুধুই সাংস্কৃতিক অনুশীলনের জায়গা ছিল না বরং রাজনীতি-চর্চার ক্ষেত্রও ছিল। মূলত ছবি দেখার লোভেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্রসংসদে যাতায়াত শুরু হয় তাঁর। স্মৃতি রোমন্থনে বলছিলেন বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির বিশাল লাইব্রেরির কথা। সিনেমা নিয়ে এত এত ভালো, দুর্লভ বই আর ম্যাগাজিনের সংগ্রহশালা যেনবা একটা ছোটখাটো মহাফেজখানায় এসে পড়েছেন। সিনেমা দেখা, সিনেমা নিয়ে আলাপ, বই পড়ার মধ্য দিয়ে আটাত্তর সালে কর্মী হিসেবে যুক্ত হন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের সঙ্গে। একই সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন চলচ্চিত্রসংসদ- আন্দোলনের জোয়ারে। সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন মুহম্মদ খসরু, মসিহউদ্দিন শাকের, মাহবুব আলম, বাদল রহমানকে। বর্তমান কালের যাপনের ধরনের সঙ্গে সে-সময়কার যাপনের তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে শামীম আখতার দেখছেন যে, আজকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর জীবনের হিসাব-নিকাশ প্রতিদিনকার যে-সময়টুকু দখল করে নিচ্ছে তার সবটুকুই তাঁরা ব্যয় করেছেন নির্মল চলচ্চিত্রের উৎসসন্ধানে। দেশাল কারখানার চলচ্চিত্রকর্মীদের সঙ্গে চলচ্চিত্র-সংসদকর্মীদের বোঝাপড়ার সুরতহাল করতে বলা হলে শামীম আখতার জানালেন, ‘এক ধরনের বৈরিতা ছিল। মূলধারা আর প্যারালাল সিনেমার যে স্থূল বিভাজনরেখা টানা হয়, বৈরিতা ঠিক সেখানে ছিল না। আমাদের কথা হলো, এফডিসিতে যা নির্মিত হয়, সেগুলো কোনো চলচ্চিত্র নয়। আমরা যেহেতু সে-সময় চলচ্চিত্র নির্মাণ করতাম না, সেহেতু এফডিসির মূল হোতারা একরকম বৈমাত্রেয়সুলভ আচরণ করতেন। যদিও আলমগীর কবির এফডিসিতে যুক্ত ছিলেন, তারও আগে জহির রায়হান কাজ করেছেন – উনাদের কাছ থেকে আমরা ভালো ভালো ছবি পেয়েছি। যখন আমরা পুরোদস্ত্তর চলচ্চিত্রসংসদকর্মী হিসেবে কাজ করছি, তখন দুঃখজনকভাবে দেখা গেল চলচ্চিত্র ঢালে নামতে শুরু করেছে। ফর্মুলা আর গল্পহীনতার ফাঁকে পড়ে স্থানীয় চলচ্চিত্র জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে যোজন দূরে চলে গিয়েছিল।’ সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা, জঁ লুক গদারের কারুকৌশল দ্বারা নির্মাণ-ভাবনায় অনুপ্রাণিত শামীম আখতার মনে করেন, চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান প্রথাটি যদি আরেকটু পোক্ত হতো, তবে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের ধারায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারত।

বাংলাদেশে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট যখন থিতিয়ে পড়ছে, তখন রাজধানীর সাংস্কৃতিক বলয়ের বাইরে খুলনায় চলচ্চিত্র সংসদের কার্যক্রম শুরু করেন পার্থ প্রতীক রায় ও সমমনা কয়েকজন। শুরু হয় খুলনা ফিল্ম সোসাইটির যাত্রা। একজন নবীন চলচ্চিত্রসংসদকর্মী হিসেবে চলচ্চিত্রসংসদ- আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তীতে পার্থ প্রতীক রায়ের ভাবনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘ঢাকার বাইরে একটা নতুন শহরে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন চালিয়ে নিতে যে পরিমাণ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা উতরাতে হয়, তার ফর্দ মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। এই দশকেও আমাদের বিশ্ব-চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করতে গেলে স্থানীয় সিনেমাহল কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে হয় যে, এখানে তথাকথিত কোনো অশ্লীল ছবি প্রদর্শন করা হচ্ছে না বা হবে না! এর পাশাপাশি দক্ষ কর্মীর অভাব থেকেই যায়। প্রথম অবস্থায় স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ছিল মূল কর্মপ্রবাহ, যাদের কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে পরিস্থিতির চাহিদার কারণে ঢাকামুখী হতে হয়। কর্মীসংকট কাটাতে তাই আমরা নজর দিই খুলনার স্থায়ী বাসিন্দাদের প্রতি। পরবর্তীকালে সংসদ-আন্দোলন চর্চার ভেতর দিয়ে আমরা তৈরি করে নিয়েছি একঝাঁক উদ্যমী নতুন কর্মী।’ তিনি আরো বলছিলেন চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন চর্চার যথাযথ বিকাশ ঘটেনি বিধায় এ-অঞ্চলের চলচ্চিত্রের কোনো নিজস্ব ‘সিনেমাস্কেপ’ তৈরি হয়নি। ফলে একটা ফরাসি, রুশ বা এস্পানিওল ভাষার ছবির ইমেজ দেখে যেমন ঠাহর করা যায় সেটা কোন অঞ্চলের ছবি, ঠিক সেভাবে বাংলাদেশের সিনেমা যাচাই করার উপায় থাকছে না। চলচ্চিত্রসংসদগুলো যখন প্রায় নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় পর্যবসিত হচ্ছে, তখন এই হাল থেকে উত্তরণের জন্য প্রচলিত ক্রেতা থেকে বের হয়ে এসে নতুন করে সমরকৌশল নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এ-কারণে পার্থ প্রতীক রায় মনে করেন, চলচ্চিত্র সংক্রান্ত জনসচেতনতা বাড়াতে সংসদগুলো গ্রামে গ্রামে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি স্কুল-কলেজে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর কথা ভাবতে পারে। এর ফলে নতুন প্রজন্ম কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ইতিহাস নিয়ে টেক্সচুয়াল পাঠের বাইরে চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবে, যা পরবর্তীকালে দেশ-কাল নিয়ে বোঝাপড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই শহরে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের পঞ্চাশ বছরপূর্তি যখন চলছে তখন আন্দোলনে বিরাজ করছে ভাটার টান। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে পঞ্চাশ বছরপূর্তির মধ্য দিয়ে কি আমরা চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শেষ পেরেকটি ঠোকার অপেক্ষায় আছি, নাকি অস্বাভাবিক রকমের গভীর ঘুমে যাওয়ার আগেই একে চাঙ্গা করার কোনো উপায় আছে কি নেই – তা জানতে মুখোমুখি বসা গেল গুণী প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও সংসদকর্মী মানজারেহাসীন মুরাদের সঙ্গে। দীর্ঘ প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে মানজারেহাসীন মুরাদ বললেন, ‘চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন একটি শক্তিশালী আন্দোলন ছিল, যার কিছু কিছু ফলাফল আমরা পরবর্তীকালে পেয়েছি। এখন হয়তো আন্দোলনটা সেই পর্যায়ে নেই। নতুন পরিস্থিতিতে এই আন্দোলনটাকে কীভাবে আবার উজ্জীবিত করা যায়, কার্যকর করা যায়, সেটা যারা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত আছেন, তাঁরা কতটা ভাবতে পারেছেন আমি জানি না। কিন্তু আমরা স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি, চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন একটি স্থবির আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। মনে হচ্ছে যেন এই ধরনের আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা নেই। কিন্তু যদি এইটুকু ভাবা যায়, আজকের দিনে আমরা কতটা দৃশ্যস্বাক্ষর হয়ে উঠতে পেরেছি, এইটা চিন্তা করা খুব জরুরি; কারণ আমরা চবিবশ ঘণ্টা কিন্তু দৃশ্য দ্বারা বোম্বার্ডেড হচ্ছি। এই টেলিভিশনের কথা বলি, যদি আমরা বিলবোর্ডের কথা বলি, যদি আমরা প্রিন্ট মিডিয়ার কথা বলি… সর্বত্রই একই দশা। আগে একাত্তর সালে, বাহাত্তর সালে বা পঁচাত্তর সালে যে-কয়টা ছবি আমরা দেখতে পারতাম, আজকে একটি শিশুও কিন্তু তার চেয়ে একশগুণ-দুশোগুণ ছবি বাসায় বসেই দেখছে। আজকে দৈনিক কাগজগুলোতে সাত-সকালে যত ছবি দেখতে পাওয়া যায়, বা রাস্তায় বেরোলে যত কোটি বিলবোর্ডে ঢাকা পড়ে যায় মানুষের মুখ, বিশ বছর আগেও তো এই চরাচরের দৃশ্য এমন ছিল না। এবং এর মধ্যে দিয়ে আমাদের দৃশ্যজগতে যে বিকার বা অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে, সেখানে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলনে হাজির থাকাটা অনেক দরকার; দৃশ্য স্বাক্ষরতার দিকে মানুষকে সচেতন করতে এই আন্দোলন এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জনসাধারণকে দৃশ্যস্বাক্ষর করে তোলা তথা কোন দৃশ্যটা তার জন্য জরুরি, কোন দৃশ্য তার মনোজগৎকে পরিশীলিত করতে পারে – সেদিকটা নিয়ে আমার মনে হয় আজকের চলচ্চিত্রসংসদ- আন্দোলনের কর্মীরা ভাবতে পারে। আরেকটি কারণেও এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে উচ্চতর চলচ্চিত্রবিদ্যা অধ্যয়ন, এই বিষয়টাকেও যদি চর্চা করতে হয়, তবে একা একা বাড়িতে বসে তা করা সম্ভব নয়। এটা করতে হলে আবার আমাদের আগের মতো একত্র হতে হবে। ফিল্মস্টাডি সার্কেলের মাধ্যমে চিন্তার বাটোয়ারা করতে হবে। হাতের নাগালে ইন্টারনেট বা ডি.ভি.ডি. যাই থাকুক না কেন পারস্পারিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে না গেলে এই স্থান-কালের পরিপ্রেক্ষিতে ওই সিনেমার তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এখন ইন্টারনেটে অনেক কিছুই পাওয়া যায়; কিন্তু যা পাওয়া যায় তা যতটা না বেশি আমাদের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ তার চেয়েও বেশি সম্পর্কিত উন্নত দেশগুলোর জীবন-বাস্তবতার সঙ্গে। কারণ, উন্নত দেশের একজন ওই ছবিকে পাঠ করছেন তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে। আমরা এখানে বসে সেই পাঠের সঙ্গে কেন একাত্মতা ঘোষণা করব? আমাদের জন্য ওই একই ছবি ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আসবে। কারণ, আমাদের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা অন্যরকম। আমাদের দেশের সঙ্গে অন্য দেশের বৈশ্বিক সম্পর্কের মাত্রাটা ভিন্ন। সুতরাং, যারা মনে করছেন ইন্টারনেটের ব্যবহারের মাধ্যমে সব প্রশ্নের সমাধান করে ফেলবেন সেটা ভালো কথা; কিন্তু যেটা জরুরি সেটা হচ্ছে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দেশের বা ভিনদেশের কোনো ছবি বা চলচ্চিত্র-আন্দোলনকে মূল্যায়ন করতে হলে তাদের উদাহরণ অনুসরণ করলে চলবে না; আমাদেরকে আমাদের জ্ঞান-দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই তা বিচার করতে হবে। এ-কাজটা এককভাবে করা সম্ভব নয় বরং তা সমষ্টিগতভাবে করতে হবে। আর এটা চলচ্চিত্রসংসদ আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই করতে হবে। কমিউনিটি হিসেবে সিনেমাকে নিয়ে পার্টিসিপেট করার জন্য এই মুভমেন্টটাকে জিইয়ে রাখা জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যায়তনে আর্ট, গান, নাচের সাথে চলচ্চিত্রকে যুক্ত করার দাবি তোলার সময় এসেছে। সুবর্ণজয়ন্তীর এই ক্ষণে অতীত গৌরবের আবেশে ভবিষ্যত কর্মপন্থা হিসেবে আমাদের এইবিষয়গুলি নিয়ে এখনই ভাবা উচিত।’

আপাতঅর্থে ঝিমিয়ে পড়ে চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন আসছে সময়ে নতুন পরিকল্পনা, নব উদ্যমে শিল্পাঙ্গনে সিনেমা নিয়ে আলাপ-আলোচনা-আড্ডায় প্রাণের মেলবন্ধন ঘটাবে, কালাকানুন আইন বাতিলের আন্দোলন আরো সোচ্চার হবে আগামীতে  –  এর কোনটাই যে অকাশ-কুসুম কল্পনা নয়, একজন সচেতন দর্শকমাত্র তা স্বীকার করবেন। এই তো, বেশি কিছু না!

দোহাই

১. খসরু, মুহম্মদ, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রসংসদ-আন্দোলন, পৃ ৭৯, ২০০৪, পড়ুয়া, ঢাকা। ISBN :            ৯৮৪-৮১৪১-৩৮-৫

২.    Film society (http://en. wikipedia.org/wiki/Film_society)

৩.    প্রাগুক্ত

৪.    কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি (http://tinyurl.com/m3nffwm)

৫.             ভৌমিক, সোমেশ্বর,  জনতার উৎসব?,  ১৬ নভেম্বর ২০১১, আনন্দবাজার পত্রিকা (http:// www.anandabazar.com/ archive/1111116/16edit5.html)