অনুবাদ সাহিত্যে গুরুত্ব দিন

আমার আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করুন। কালি ও কলম প্রথম সংখ্যা-প্রকাশে আপনাদের আন্তরিক সদিচ্ছা এর প্রতিটি পাতায়ই পরিদৃষ্ট। প্রতিটি যুগেই যখন মহান সাহিত্যিক ও দার্শনিকরা আপন মেধাকে বিকশিত করেছেন তখনই কোনো-না-কোনো তৎকালীন সাহিত্যপত্রিকাকে তাঁরা অবলম্বন করেছেন তাঁদের সাধনার মাধ্যম হিসেবে। তৎকালীন পত্রিকাগুলোর কর্তাব্যক্তিরাও নিজের নাম উজ্জ্বল করার চেয়ে প্রতিভা-বিকাশে ও কালজয়ী সাহিত্য ও দর্শন-সৃষ্টিতে অধিকতর মনোযোগী ছিলেন। অপরকে বড় করতে গিয়ে তাঁরা নিজেরাও মহীয়ান হয়েছেন। কিন্তু আজকের এ-সময়ে সাহিত্য-পত্রিকাগুলো কোনোটিতেই এ-ধরনের প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় না। সাহিত্যপত্রিকাগুলোর কর্তাব্যক্তিরা একধরনের আত্মশ্লাঘায় ভোগেন। তাঁদের ভাবটি এমন যে, আমি এক বিশাল বৃক্ষ তো রয়েছিই, তো আমার আশেপাশে ছোটখাটো দু-একটি চারাগাছ বাড়তে সাহায্য করতে কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু কোনো গাছই আমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। আমাদের বর্তমান সাহিত্যজগতের রথী-মহারথীরা এ-ধরনের সংকীর্ণ মানসিকতার কারণেই – আজ তাঁরা যতই সম্মানিত হোন, সমাজের যতই মর্যাদাবান ব্যক্তিতে পরিণত হোন না কেন – একসময় ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন। এ-প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও মানসিকতার বিরুদ্ধে কি কালি ও কলম দাঁড়াতে পারবে? হতে পারবে কি কোনো নতুন যুগের সাক্ষী? এ তো বড় কঠিন পথ, তিক্ত পথ, কিন্তু বড় মধুর এর গন্তব্য।

আমাদের বর্তমান তরুণ শিল্পস্রষ্টাদের ভেতরে সাধনার আকুতি তত তীব্র নয় যতটা তাড়াতাড়ি সেলিব্রেটি হওয়ার আকুতি। তাদের সৃষ্টি তাদের সাধনার ফসল নয়, অহমের ফসল। বর্তমান সাহিত্যপত্রিকাগুলো এদের উৎসাহিত করার নামে ছাইপাশ সব লেখা ছাপিয়ে এদের মেধার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। মনে রাখতে হবে, এরা রবীন্দ্রনাথের মতো সাধক নয়, যিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরও তাঁর সাধনা বন্ধ করেননি। কোনোরূপ আত্মশ্লাঘা তাঁকে স্পর্শ করেনি। বরং তাঁর অধিকতর মহৎ সাহিত্যগুলো সৃষ্টি হয়েছে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর। তাই কালি ও কলমের প্রতি অনুরোধ কেবল লেখা ছাপানো বা শিল্প-উপস্থাপনই নয় যুগসৃষ্টির প্রয়োজনে যুগোপযোগী, গভীর চিন্তাযুক্ত ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন দিকনির্দেশনা। আমাদের দেশে এখনো অহংকারী, কূপমণ্ডুক সাহিত্যিক, দার্শনিকদের পাশে রয়েছেন হাতে গোনা কিছু নিভৃতচারী প্রজ্ঞাসম্পন্ন যুগনির্দেশক। তাঁদের খুঁজে বের করা, আলোয় নিয়ে আসা এবং নব রেনেসাঁস সৃষ্টিতে কালি ও কলম একটি ভূমিকা পালন করবে, আশা করি।

আমাদের দেশের বর্তমান সাহিত্যচর্চায় অনুবাদ সাহিত্য সম্ভবত সবচাইতে অবহেলিত। আজকাল প্রায় অধিকাংশ মহৎ সাহিত্যই বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে। কিন্তু এর পুরোটিই ব্যাবসাবুদ্ধি থেকে আহুত। অদক্ষ, অর্ধশিক্ষিত অনুবাদক কর্তৃক অনূদিত। সাহিত্যের মূলরস এতে একেবারেই অনুপস্থিত। তাছাড়া এসবের পাঠকরাও মূলত মহৎ সাহিত্যরস আস্বাদনের চেয়ে এগুলো পাঠে একধরনের আত্মতৃপ্তির প্রয়াসী হয়। কালি ও কলমের প্রতি বিশেষ অনুরোধ, আমাদের দেশে এখনো যে অল্পসংখ্যক, হাতে গোনা, মহান অনুবাদক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, তাঁদের মাধ্যমে অনুবাদ সাহিত্যকে বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়াসী হবেন। কালি ও কলম-এর প্রথম সংখ্যাতেই বিজ্ঞান-সম্পর্কিত লেখা প্রকাশ হওয়া অত্যন্ত আশা-জাগানিয়া। আজকাল বিজ্ঞানের প্রতিটি নতুন তত্ত্ব বা আবিষ্কারেই চযরষড়ংড়ঢ়যরপধষ ধংঢ়বপঃ বিবেচনা করা হয়। বিজ্ঞানের এ-দার্শনিক দিকটি নিঃসন্দেহে নতুন প্রজন্মের ভাবনার খোরাক যোগাবে। কালি ও কলম এর গভীরে প্রবেশ করুক, এ-আশাই করি।

পরিশেষে এ-কথাই শুধু বলবার যে, আমরা এ-জাতি এক মহান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। একটি বিশেষ গোষ্ঠী আমাদের এ-পরিচয়টাই ভুলিয়ে দিতে চায়, কারণ পরিচয়হীন মানুষ কখনো দৃঢ় পায়ে আপন মেরুদণ্ডের উপর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, ধ্বংস¯তূপ থেকে আমাদের পুনরুত্থান ঘটবেই। কল্যাণের ছায়া শান্ত করুক সমস্ত উত্তাপকে।

বাণীদূত

বুয়েট, ঢাকা।