মেয়েটি সুন্দরী?
অবশ্যই সুন্দরী, অন্তত আমার চোখে। সৌন্দর্য তো একজন মানুষের কাছে একেক রকম। আমি যেটুকু সৌন্দর্য বুঝি, তাতে আমি মেয়েটিকে সুন্দরই মনে করি।
নাম কী?
তারানা।
শুধুই তারানা?
আমি তারানাই জানি। ওর বাবা-মা, ভাই-বোন এ নামেই ডাকে। আমিও ডাকি।
আপনি চেনেন কীভাবে?
তারানার বড় ভাই জাহিদ আমার ক্লাসফ্রেন্ড। আমরা একসঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। জাহিদের বাবা ওয়াসার অনেক বড় কর্মকর্তা ছিলেন। মগবাজারে ওদের বিরাট সরকারি বাসা ছিল। তোমাকে বলছি আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। সেই বাসায় আমি অনেক গিয়েছি, থেকেছি, খেয়েছি। ওর মা, মানে খালাম্মা আমাকে ছেলের মতো আদর করতেন। গ্রামের ছেলে, মায়ের কাছ থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকি, কী খাই না খাই, তিনি চিন্তা করতেন। সে-সময়ে তারানা বোধহয় থ্রি-ফোরে পড়ত। দেখো সময় কীভাবে চলে যায়, সেই ছোট্ট তারানা এখন বিয়ের পাত্রী।
একসঙ্গে গোটা ইতিহাস বলে থামে সুমন।
খুঁতখুঁতে টাইপের ছেলে সোহাগ মাথা নাড়ে, আপনার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক?
হ্যাঁ। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কেবল একটা ফার্মে ঢুকেছি তখনই তো তিথিকে, মানে তোমার ভাবিকে বিয়ে করলাম কোর্টে গিয়ে। থাকি মেসে, নতুন বউ নিয়ে কোথায় যাব? গেলাম খালাম্মার কাছে। তিনি সাদরে গ্রহণ করলেন আমাদের। অবশ্য আদুরে বকাও দিয়েছেন। আমাদের বাসরও হয়েছিল সেই বাসায়। এখন তারা সরকারি কলোনি ছেড়ে থাকে নিজেদের বাসায় মগবাজারেই। খালু মারা গেছেন। আমি থাকি টিকাটুলী। ফোনে প্রায়ই কথা হয় খালাম্মার সঙ্গে। তোমার ভাবি ও মেয়েদের নিয়ে যাইও মাঝেমধ্যে। তারানার সঙ্গে তিথির খুব চমৎকার সম্পর্ক। আমি যেটুকু জানি এবং চিনি, তারানা খুব ভালো মেয়ে। তুমি ওকে বিয়ে করলে আর কী পাবে জানি না, নিশ্চিত বলতে পারি তুমি ভালো একটা বউ পাবে।
মেয়েটি লম্বা?
হ্যাঁ, লম্বা। বাঙালির গড় মেয়েদের চেয়ে একটু লম্বাই। মাথায় অনেক চুল। মুখটা একটু লম্বাটে – যাবে দেখতে?
আজ একটু ভাবি, কাল আপনাকে জানাব – সোহাগ চেয়ার ছেড়ে চলে যায়।
ঠিক আছে, মনে মনে বিরক্ত সুমন। একই অফিসে জুনিয়র কলিগ সোহাগ আহমেদ। বছরখানেক হলো জয়েন করেছে। ছেলেটা চৌকস। মাত্র তো শুরু চাকরির, অনেকদূর যাবে ও। বিয়ে করতে চায়। অন্তত ডজনতিনেক মেয়েও দেখা হয়েছে, দেখার পর দু-তিনদিন মেয়েটি বা তার পরিবার সম্পর্কে ভালোই বলে সোহাগ। কিন্তু বেশ কয়েকদিন যাওয়ার পর মেয়েটি এবং তার পরিবারের নানা রকম খুঁত বের করে সমালোচনা শুরু করে – বুঝলেন সুমনভাই, ভেবেছিলাম এই মেয়েটিকে বিয়ে করব কিন্তু –
আবার কিন্তু কেন? বিয়ে করলে করো। সময় তো স্থির নয়, সময় চলমান, গতিশীল। দিনে দিনে তোমার বয়স কত হলো?
এই আসছে এপ্রিলে একত্রিশ বছর পূর্ণ হবে।
একত্রিশ বছর বয়সে এখনো বিয়ে করছ না কেন?
করতে তো চাই কিন্তু মনের মতো মেয়ে পাই না।
এই মেয়েটি, যাকে কদিন আগে দেখে এলে, কী যেন নাম? নাদিয়া – ওকে বিয়ে করো। তোমার কাছেই তো শুনলাম নাদিয়া চাকরিও করে, দুজনে মিলে সংসারটা ভালো চলবে।
বিয়ে করতে তো চেয়েছিলাম কিন্তু এখন ভেবে দেখলাম নাদিয়াকে বিয়ে করা ঠিক হবে না।
নাদিয়া আবার কী দোষ করল?
না, নাদিয়া কোনো দোষ করেনি।
তা হলে?
নাদিয়ার পরপর তিনটি ছোট বোন আছে –
পরপর তিনটি বোন আছে নাদিয়ার, তোমার সমস্যা কী?
একটা থাকলে ভালো হতো, পরপর তিনটে বোন – নাদিয়াকে বিয়ে করলে আমি হবো বড় জামাই। ওদের বিয়ে দেওয়ার দায় পড়বে আমার ওপর।
গাছে না চড়তেই এক কাঁদি! আশ্চর্য ছেলে তো বাবা। ভেতরে ভেতরে তেতে ওঠে সুমন – নাদিয়ার বাবা-মা আছে না?
আছে।
তাদের মেয়ে তারা বিয়ে দেবে। তুমি বড় মেয়ে নাদিয়াকে বিয়ে করে আলাদা সংসার করবে আলাদা জায়গায়। শালিদের বিয়ে দিতে হবে – এমন কোনো শর্ত ওরা তোমাকে দিয়েছে?
না, তা দেয়নি। কিন্তু বড় দুলাভাই হিসেবে একটা দায় তো থাকবে আমার।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সুমন, তুমি যদি এভাবেই চিন্তা করো তাহলে আর কি! অন্য মেয়ে দেখো।
একটা মেয়ের খোঁজ পেয়েছি –
কোথায়?
মালিটোলা বাসা। কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে।
চোখ বড় বড় করে তাকায় সোহাগের দিকে, এই ছেলেটা আসলে কী চায়? এতগুলো মেয়ে দেখেছে একটি মেয়েও পছন্দ করছে না। নাকি মেয়ে দেখা ওর রোগ? মনে আছে, গ্রামে দূর-সম্পর্কের এক চাচা হামিদুল ইসলাম মাস্টার্স করার পর এলাকার বিয়ের বাজারে তার বিপুল চাহিদা বেড়ে যায়। বাবা নিম্নবিত্ত পরিবারের খেটে খাওয়া মানুষ। অনেক কষ্ট করে ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। সেই ছেলের বিয়ের বাজার বাড়লে বাবা-মা খুশি। ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও মেয়ে বিয়ে দিতে চায় হামিদুল চাচার সঙ্গে। এলাকার নতুন পয়সাঅলা ফয়েজ আলীও মেয়ে দিতে চায় হামিদুলের কাছে। হামিদুল বাজারের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয় আর গালগল্প মারে। ফয়েজ আলীর মেয়েটা ম্যাট্রিক পাস, একটু কালো কিসিমের, দেখতে মন্দ নয়। কিন্তু বিয়ে হচ্ছে না। ফয়েজ ঘটকের কাছে প্রস্তাব পাঠায়, মেয়ের বিয়েতে পালংখাট, বিছানা, বালিশসহ এক লাখ টাকা নগদ ক্যাশ দেবে –
নড়েচড়ে বসে হামিদুল আর ওর পরিবার। ফয়েজের প্রস্তাবে প্রায় রাজি, এই সময়ে পাশের ইউনিয়ন থেকে আরেকটি প্রস্তাব আসে, মেয়ের বাবা টাকাঅলা। মেয়েও দেখতে খুব সুন্দরী। হাতের কাজ জানে। একটু শিক্ষা কম, প্রাইমারি পাস। তবে শিক্ষাটাকে পুষিয়ে দেবে শাল কাঠের পালংখাট, বিছানা-বালিশ, নগদ তিন লাখ টাকা, সঙ্গে একটা মোটরসাইকেল দিয়ে। হামিদুল চাচার বাবা এক কথায় রাজি। মেয়েও দেখে এসেছে সবাই; কিন্তু হামিদুল চাচা একটু নীরব। একজন এমএ পাস শিক্ষিত মানুষ কীভাবে প্রাইমারি পাস মেয়ে বিয়ে করে? লোকে কী বলবে? বন্ধু-বান্ধবদের কাছেই কী করে মুখ দেখাবে? দু’পক্ষের মধ্যে যখন দড়ি টানাটানি চলে, সে-সময়ে কচা নদীর ওপার থেকে আরো ভালো একটি বিয়ের প্রস্তাব আসে। এসব প্রস্তাবের আগে ছোট-বড় অনেক প্রস্তাব এসেছে চাচার জন্য। চাচা পাইক-পেয়াদা নিয়ে গেছে মেয়ে দেখতে, এসে দু-একদিন পর অন্য মেয়ে দেখতে গেছে। হিসাব করে জানা গেছে, হামিদুল চাচা একান্নটি মেয়ে দেখার পর নদীর ওপারে বিয়ে করেছে। কারণ মেয়ের বড় মামা ফরেস্টের রেঞ্জার। নগদ টাকার সঙ্গে ফরেস্টে একটা সরকারি চাকরিও পাওয়া যাবে। চাকরির কাছে জিম্মি হয়ে চাচা বিয়ে করে বউ বাড়ি আনলেন; কিন্তু সেই বউয়ের মুখ দেখে কেউ খুশি হয়নি। মুখটা একেবারে কালো… কালো মানে কালো। অন্ধকারের মতো কালো।
হামিদুল চাচার ফরেস্টে চাকরিও হয়েছে। অনেক টাকা-পয়সার মালিকও হয়েছেন; কিন্তু মাঝবয়সে বাগেরহাটে একটি বিয়ে করেছেন। সেখানেই ছোট বউ থাকে। নতুন ছোট বউকে নিয়ে নতুন বাড়ি করেছেন। বড় বউ থাকে গ্রামে। গ্রামে খুব একটা আসেন না। কখনো এলে বড়রা দ্বিতীয় বিয়ের কারণ জিজ্ঞেস করলে হামিদুল চাচা বলতেন, পাতিলের কালির সঙ্গে আর কত থাকা যায়? অনেক তো থাকলাম।
আমাদের সোহাগের জীবনে এমন ঘটনা ঘটবে না তো, ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করে সুমন, মালিটোলার মেয়ের কী সমস্যা?
মেয়েটার বাবা নেই।
থাকে কার সঙ্গে?
বড় ভাইয়ের সঙ্গে।
তা তুমি তো মেয়েটার বাবা-মাকে বিয়ে করছ না। বিয়ে করছ মেয়েটাকে। তুমি সংসার করবে মেয়েটার সঙ্গে –
কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ি না থাকলে জামাই হিসেবে কি মর্যাদা পাব?
সুমন উত্তর দিতে পারে না। সোহাগ এ-কথাটা ঠিক বলেছে। সব জামাই শ্বশুরবাড়ি থেকে আদর-আপ্যায়ন চায়। মেয়ের জামাইয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি না থাকলে কিছুই পাওয়ার সুযোগ থাকে না। ফিরে তাকায় নিজের দিকে সুমন। তিথিকে বিয়ের দিনসাতেক পর জাহিদদের বাসা থেকে একটা একরুমের বাসায় নিয়ে উঠেছে মালিবাগের ভেতরে চারতলা বাড়ির দোতলায়। ছোট্ট ঘর, রান্নার চুলাটা পাশের ভাড়াটিয়ার সঙ্গে এজমালি। বাথরুমটা খুব ছোট্ট, যদিও রুমের সঙ্গে অ্যাটাচড। একটা মাত্র জানালা, দক্ষিণের। ভেতরে ভেতরে খুব টেনশনে ছিল সুমন, বাসা দেখে তিথি কী বলে! মিরপুরে ওদের নিজেদের বিরাট বাড়ি। বাড়ির ভেতরে আম, কাঁঠাল, নারিকেল গাছে ভরা। তিথির বাবা ব্যবসায়ী। ঢাকায় আরো বাড়ি আছে। নিজেদের গাড়ি আছে। কেবল ভালোবাসার নৌকায় চড়ে সব ছেড়ে চলে এসেছে সুমনের হাত ধরে।
না ধরে উপায় কী? ক্যাম্পাসে চার বছরের প্রেম সুমন আর তিথির। পাস করে মাত্র একটা চাকরিতে ঢুকেছে সুমন। আরো একটু সময় দরকার ওর। কিন্তু তিথিকে বিয়ে করার জন্য প্রবাসের এক যুবক এক পায়ে খাড়া। তিথিকে একবার দেখলে যে-কোনো তরুণের আরেকবার দেখতে ইচ্ছে করবে। ছুটির দিন সকালে তিথি মেসে হাজির। হাতে একটা ব্যাগ। হাতে ব্যাগ দেখেই সুমন বুঝে গেছে, তিথি চলে এসেছে। বিয়ের আনাগোনা চলছে – জানে সুমন। কিন্তু এমন ভর সকালে? ছুটির কারণে মেসে লোক কম ছিল, রুমের মধ্যে নিয়ে বসায়। রুমের মধ্যে তিনটে খাট পাতা। বিছানা, বালিশ, মশারি এলোমেলো। কী করবে ভেবে পায় না সুমন। রুমের একজন দৌড়ে হোটেল থেকে ডিম-পরাটা আর কোক নিয়ে আসে।
তিথি দিব্যি নাশতা খায়। খেতে খেতে বলে, এখানে তো আমি থাকতে পারব না। একটা রুম দেখো। ছোট হোক – আমার অসুবিধা নেই। আমি থাকতে পারব।
ঠিক আছে। তুমি একটু বসো।
তুমি কী করবে?
জাহিদকে একটা ফোন করব।
কোত্থেকে করবে?
এই তো মোড়ে টেলিফোন করার একটা দোকান আছে।
কতক্ষণ লাগবে?
পাঁচ মিনিট।
ওকে।
ফোনে জাহিদকে সব জানিয়ে রুমে এসে দেখে তিথি ওর বিছানায় শুয়ে রয়েছে। আর কেউ নেই। ধীরে ধীরে তিথির পিঠে হাত রাখে। ফিরে তাকায় তিথি।
জাহিদকে পেলে?
হ্যাঁ। ও আসছে গাড়ি নিয়ে। আধা ঘণ্টার মধ্যে জাহিদ এসে তিথি আর সুমনকে নিয়ে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে। বিয়ের পর সোজা বাসায় নিয়ে যায়। নিজের রুমটা ছেড়ে দিয়ে বেচারা ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ডাবলিং করে কয়েক দিন। যদিও বন্ধুর বাসা কিন্তু সময় কেটে যাচ্ছিল সুখের বহুমাত্রিক কম্পনে।
তাকায় তিথির মুখের দিকে ভয়ে ভয়ে, বাসা তোমার পছন্দ হয়নি না?
কে বলল পছন্দ হয়নি?
তোমার মুখ গম্ভীর কেন?
হাসে তিথি, কই আমার মুখ গম্ভীর। হোক ছোট বাসা – সঙ্গে তুমি আছো। আমার আর কী চাই?
তিথিকে আবেগে জড়িয়ে ধরেছিল সুমন, তুমি সত্যিই সুন্দর।
সেই ছোট্ট বাসা থেকে এখন অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। দুটি মেয়ে নিয়ে দারুণ সুখের সংসার। তিথির বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রায় বছরদুয়েক পর দেখা তিথির। অনেক খুঁজে মেয়েজামাইকে বাসায় নিয়ে যায় তারা। খুব আদর-যত্ন করে। সুমনকে কমপ্লিট স্যুট, ঘড়ি, জুতো দিয়েছে। শাশুড়ি প্রস্তাব দিয়েছে মালিবাগের ওই ছোট বাসা ছেড়ে তাদের বিরাট বাড়িতে উঠতে। কিন্তু তিথি কোনোভাবেই রাজি হয়নি।
আমার স্বামী কেন তোমার বাড়িতে থাকবে?
থাকলে তোর সমস্যা কী? হাসেন শাশুড়ি, আমার দুই ছেলের সঙ্গে সুমনও থাকবে আমার আর একটা ছেলের মতো।
কিন্তু সুমন তোমার ছেলে না। তোমার মেয়ের জামাই। ওর মর্যাদা আছে না? আর আমিইবা কেন থাকব? ও থাকলে থাকতে পারে, আমি থাকব না।
তিথির আত্মসম্মানবোধ সুমনকে প্রবল নাড়া দিয়েছিল। আজকে জীবনে যতটুকু উন্নতি, অর্জন পেছনে তিথির প্রবল জেদ আর সামনের চিন্তার ফল। প্রেম, বিয়ে, সংসার, সন্তান মানুষের জীবনটাকে পূর্ণতা দেয়। কখন, কোথায়, কোন মেয়ের কিংবা কোন ছেলের সঙ্গে একবার দেখা হয়, চোখের ওপর চোখ পড়লে গোটা জীবনের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে, বলা খুব মুশকিল। জীবন ঘটনাচক্রে খুব সহজ আবার কখনো খুব কঠিন। এসব ভাবতে ভাবতে সুমন ভাবে, সোহাগ বোধহয় বিয়েই করতে পারবে না। নিজের সম্পর্কে কোনো স্থির ধারণা নেই। কী যে হবে ওর? অবশ্য এত ভালো একটা ছেলে এভাবেই নিজের সর্বনাশ করবে? অফিসের কাজ খুব যত্নের সঙ্গে করে। অনেক মানুষ সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই পিছিয়ে পড়েছে – চোখের সামনে কত উদাহরণ আছে।
দিনকয়েক পর সোহাগ জানায়, সুমনভাই চলেন।
কোথায়?
তারানাকে দেখতে।
সোহাগের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবে, এরকম সিদ্ধান্তহীন একটা ছেলেকে জাহিদের বোন তারানাকে দেখাতে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আগের অনেক মেয়ের মতো প্রথমে পছন্দ করে যদি পরে খুঁত বের করে? বিয়ে করতে অস্বীকার করে তারানাকে? খালাম্মা কষ্ট পাবেন। তারানার কাছে চিরকালের জন্য ছোট হয়ে যাবে। জাহিদকেই বা কী বলবে? সোহাগকে নিয়ে না যাওয়াই ভালো।
কী ভাবছেন?
তুমি সত্যি বিয়ে করবে সোহাগ?
সুমনভাই, আমি বুঝতে পারি – আপনি আমাকে নিয়ে কী ভাবছেন। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি যদি তারানাকে আমার পছন্দ হয় আর দ্বিতীয় কোনো চিন্তা করব না। বিয়ে করব। আমিও তো একজন মানুষ, পুরুষ মানুষ। আর পারছি না নিজেকে সামলাতে।
সুমনের ভালো লাগে, না সোহাগের ভেতরের অস্থিরতা শেষ হয়েছে। মানুষ এমনই, যতই স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে রাখুক, এক সময় তাকে তীরে ভিড়তে হয়। সুমন খুব পজিটিভ মানুষ, অন্যকেও পজিটিভ দেখতে চায়। সোহাগের এই পজিটিভ অ্যাপ্রোচ ভালো লাগে – ঠিক আছে, আমি জাহিদের সঙ্গে কথা বলে তোমাকে কাল জানাব।
ওকে।
পরদিন বিকেলে অফিস থেকেই জাহিদদের বাসায় চলে যায় সুমন। সঙ্গে সোহাগ, সোহাগের এক ফুফাত বড় ভাই, সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ডেস্ক অফিসার, হুমায়ূন রশীদ। ভদ্রলোককে শুরুতে রাশভারী মনে হলেও কিছুক্ষণ পর সুমন বুঝতে পারে হুমায়ূন রশীদ মিশুক মানুষ। যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তারানাকে দেখে, কথা বলে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা। সোহাগ তারানাকে খুবই পছন্দ করেছে। ওর চোখ-মুখে কামনার কমলা রং দেখতে পায় সুমন। খাওয়া-দাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছে, এ-ফাঁকে সুমন ছাদে নিয়ে যায় সোহাগ আর তারানাকে। একটু নিভৃতে দুজন দুজনকে একটু পরখ করে দেখুক, জানুক। সব জানার মধ্যে এই সময়টুকু ওদের জীবনে দক্ষিণ জানালার দারুণ স্মৃতি হয়ে থাকবে। দশ মিনিট সময় দিয়ে নিচে নেমে আসে সুমন। হুমায়ূন রশীদ ডেকে নিয়ে যায় বারান্দায়, ভাই – মেয়ে তো আমার পছন্দ হয়েছে।
সোহাগ? সোহাগ কী বলছে?
হাসেন রশীদ, ও তো চায় এখনই বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে।
কীভাবে কী করবেন, কিছু ভেবেছেন?
ভেবেছি। সোহাগের বাবাকে আজ রাতেই আমি মোবাইলে সব জানাব। যত শিগগির সম্ভব তাকে ঢাকায় আসতে বলব – সম্ভব হলে ফুফুকে নিয়ে এলে ভালো হবে।
হ্যাঁ, ছেলে বিয়ে করালে গার্ডিয়ানদের দেখেশুনে করানোই ভালো।
কিন্তু আমাদের ছেলেকে কি পছন্দ হয়েছে আপনার কন্যার পক্ষের?
কেন আমাদের ছেলে ফেলনা নাকি? সরকারের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। দেখতেও চমৎকার। আমি খালাম্মা, জাহিদ – এমনকি তারানার সঙ্গেও কথা বলেছি।
কী বলল ওরা?
ওরা পজিটিভ না থাকলে আমি কখন আপনাদের নিয়ে চলে যেতাম?
রাইট। কিন্তু একটা কথা – হুমায়ূনের কণ্ঠে দ্বিধা।
বলুন।
ওনাদের তো ঢাকায় বাড়ি আছে। আমাদের তো কিছুই নেই। আমি থাকি সরকারি কলোনিতে। সোহাগ থাকে মেসে –
হাসে সুমন, রশীদভাই এই ঢাকা শহরে আমিও মাসের পর মাস মেসে থেকেছি। তারানার বাবাও তার জীবনের শুরুতে মেসে থেকেছেন। ঢাকার বাইরে থেকে যারা আসি সেই আমরা তো উদ্বাস্ত্ত। প্রথমে উদ্বাস্ত্ত থাকলেও পরে কিন্তু সবার ঠাঁই হয় – এই জনাকীর্ণ ঢাকা শহরের বুকে।
ঠিক বলেছেন। চলুন, অনেক রাত হয়েছে।
আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।
সুমন ছাদে গিয়ে দেখে দুজনে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে আসতে দেখে হাত ছেড়ে দূরত্বে দাঁড়ায় দুজনে। সোহাগের দিকে তাকায় সুমন। সোহাগ অন্যদিকে তাকিয়ে হাসছে। তারানাও অন্যদিকে তাকিয়ে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করছে। হাত ধরে সোহাগের – ভায়া, দশ মিনিটে অনেক এগিয়েছ। এত সাহস আমাদের ছিল না। এখন চলো।
তিনজনে নেমে আসে নিচে।
সোহাগের বাবা এবং এক চাচা এসে তারানাকে দেখে গেছেন। ছেলের বউ হিসেবে তারানাকে দারুণ পছন্দ করেছেন তারা। বিয়ের আনুষ্ঠানিক কথা শুরু হয়েছে। সোহাগ বড় বাসা ভাড়া নিয়েছে ঝিকাতলায়। সুমনের খুব ভালো লাগছে, এই বাসার মানুষদের কাছে কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। অন্তত একটা কাজ তো করে দিতে পারল। তিথি মেয়েদের নিয়ে বিয়ের বাজারে যাচ্ছে। তারানাকে বাসায় নিয়ে সংসারের টিপস দিচ্ছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় সোহাগ আর তিথি সেলে কথা বলছে, এত কথা বলছে, তবু কথা ফুরোয় না। মগবাজার, টিকাটুলী আর ঝিকাতলার তিন বাসা ঘিরে বিয়ের উৎসব চলছে। আর মাত্র আট দিন পর বিয়ে তারানার সঙ্গে সোহাগের।
সোহাগের গ্রামের বাড়ি থেকে বড় দুলাভাই, ভাগ্নি আর ছোট বোন রেহানা আসে ঢাকায়। বিয়ের চারদিন আগে বিকেলের দিকে যায় তারানাদের বাসায়।
রাতেই ফোন করে সোহাগ – সুমনভাই, আপনি কি মানুষ? কঠিন, ভয়ংকর গলা সোহাগের।
চমকে ওঠে সুমন – কী হয়েছে সোহাগ? তুমি এমন করে কথা বলছ কেন?
তারানাদের একটা প্রতিবন্ধী ভাই আছে, আপনি জানাননি কেন?
সোহাগের প্রশ্নে কয়েক মুহূর্ত থমকে যায় সুমন, কী উত্তর দেবে খুঁজে পাচ্ছে না। একটু সময় নিয়ে জবাব দেয়, তুমি বিয়ে করবে তারানাকে – ওর প্রতিবন্ধী ভাই দিয়ে তোমার কী দরকার?
এইটা কোনো কথা বললেন আপনি? আমার ছোট বোন রেহানা গিয়েছিল আজ ওদের বাসায়। বাসার দোতলায় পেছনের একটা রুমের ভেতর থেকে আহত পশুর মতো শব্দ এলে রেহানা ওদিকে যেতে চাইলে তারানা ওকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। রেহানা ঘটনাটা জানায় ভাগ্নি রুহিকে। রুহি গোপনে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে, রুমের মধ্যে একটা মানুষ – চার হাত-পায়ে হাঁটছে আর গো গো করছে। মুখ থেকে লালা পড়ছে – ছি সুমনভাই, আপনি আমার এতবড় ক্ষতিটা কেন করতে চাইলেন? আমি আপনার কী ক্ষতি করেছি?
সোহাগ, আমার কথা শোন। আমি সেই আঠারো-উনিশ বছর ধরে তারানাদের চিনি। ওই প্রতিবন্ধী ছেলেটির নামও সোহাগ। খুব ভালো ছেলে। আমি ওকে অনেক আদর করি। আর প্রতিবন্ধী সন্তান তো কেউ ইচ্ছে করে জন্ম দেয় না। যদি প্রতিবন্ধী সন্তান হয়, মা-বাবা কি তাকে ফেলে দিতে পারে? প্রতিবন্ধী ভাই সোহাগের জন্য বোন তারানার কী অপরাধ?
সুমন ভাই আমি সরি!
সোহাগ প্লিজ – আমার কথা শোনো।
আমি তারানাকে বিয়ে করতে পারব না সুমনভাই। আমার বাবা-মা, দুলাভাই-বোন কেউ রাজি না। আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন। রাখি। সোহাগ সেল কেটে দেয়।
সুমন কথা বলছিল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। আকাশে চাঁদ ভাসছে। সোহাগ ফোনটা কেটে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাদা চাঁদটা একখন্ড কালো মেঘে ঢেকে যায়। সুমন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। দুচোখে জল, জল আর জল…। তারানার জন্য বুকটা হাহাকারে খন্ড খন্ড হয়ে ফেটে যাচ্ছে। চিৎকার করে দুনিয়াকে অভিশাপ দিতে চাইছে। কিন্তু কাকে দেবে অভিশাপ? মানুষ পৃথিবীর কাছে, প্রকৃতির কাছে কত অসহায়, কত ক্ষুদ্র, কত সামান্য? সুমন দেখতে পায়, খালাম্মার কমনীয় মুখের ওপর অভিশাপের সাপ ফণা তুলে নাচছে। জাহিদ বিষণ্ণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তারানা তা থা থইথই বিষাক্ত আগুন মঞ্চে কত্থক নৃত্য করছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা একটা অন্ধকার টানেলের ভেতর ঢুকছে শোঁ-শোঁ শব্দের মাতম তুলে। চারদিকে আর্তি আর আর্তনাদের সঙ্গে করুণ বিউগল বাজছে। সুমন প্রাণপণে দুহাতে কান চেপে ধরে…

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.