সাম্প্রতিক কালে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত চীনা লেখক গাও জিঙ্গজিয়ানের উপন্যাস আত্মা পর্বত নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমি অগতানুগতিক বৈচিত্র্যময় শক্তিশালী সাহিত্যকর্ম। আত্মা পর্বতকে কোনো সুস্পষ্ট তালিকাভুক্ত অথবা খোপবন্দি করা কঠিন। সবচাইতে কাছাকাছি যে-সংজ্ঞা দেওয়া যায় তা হলো এই যে, আত্মা পর্বত একটি পিকারেস্ক উপন্যাস। এখানে আমরা পাই এক ব্যক্তির প্রায় উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণকাহিনী। এখানে প্রচুর আত্মজৈবনিক উপাদান আছে। যিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি একজন লেখক। আসলে তিনি গাও-ই। সাহিত্য-রচনার ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা এই লেখক মেনে নিতে অপারগ। সৃষ্টিশীল লেখকের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তিনি নিরাপোস। তাই আত্মরক্ষার জন্য তাঁকে সিচুয়ান প্রদেশের গভীর অরণ্যাঞ্চলে পালিয়ে বেড়াতে হয়। উপন্যাসটির নায়কের দীর্ঘ ভ্রমণযাত্রা তাকে নিয়ে যায় কিয়াং, মিয়াও এবং ই জেলায়, হান চীনা সভ্যতার প্রান্তিক অঞ্চলে। বিচিত্র অভিজ্ঞতাসমূহের সম্মুখীন হন এই পথিক। বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন গোত্রের মানুষের বৈচিত্র্যময় আচার-ব্যবহার, জীবনধারণ-পদ্ধতি, সংস্কার-কুসংস্কার, লোকগল্প ও লোকগীতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, প্রাণীকুল – সব সম্পর্কে লেখকের অদম্য কৌতূহল। তাঁর মধ্যে আমরা লক্ষ করি একজন ঐতিহাসিককে, একজন লোকসংস্কৃতিবিদকে, একজন পুরাতাত্ত্বিককে, একজন পরিবেশবাদীকে, ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি নিয়ে একজন নিরীক্ষাপ্রবণ সাহিত্যিককে, একজন জীবনজিজ্ঞাসু দার্শনিককে এবং একজন প্রেমিককে। আক্ষরিক অর্থেই আত্মা পর্বত বহুমাত্রিক গ্রন্থ। জনৈক সমালোচকের বিবেচনায় ‘এই মনোমুগ্ধকর গ্রন্থটি একজন চিত্রকর, কবি এবং দার্শনিকের সৃষ্টি।’ উক্তিটি যথার্থ। লেখক গোটা গ্রন্থজুড়ে ছবির পর ছবি এঁকে গেছেন। পাহাড়, উপত্যকা, স্রোতস্বিনী, গাছগাছালি, ঘন অরণ্য, ছোট গ্রাম-গঞ্জ-শহর, সুদূর বিরান অঞ্চলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত রাজনৈতিক ক্যাডার দল, স্থানীয় চাষি নারী-পুরুষ, প্রাচীন যুগের আধিভৌতিক জ্ঞানসম্পন্ন চিকিৎসক, বৃদ্ধ গায়ক, ছুটিতে বেড়াতে আসা তরুণী, বিরল প্রজাতির পান্ডা – কত কিছুর ছবি যে লেখক এঁকেছেন, তা বলবার নয়। এসব ছবি গাও জিঙ্গজিয়ান এঁকেছেন এক ঢঙে নয়, নানা আঙ্গিকে, নানা ভঙ্গিতে। চিত্রশিল্পীর ভাষায় বললে, কখনো সূক্ষ্ম সরু তুলি, কখনো তিনি আঁকছেন কালি ও কলমে, কখনো ড্রইং করছেন পেন্সিলে, কখনো কাজ করছেন জলরঙে, কখনো তেলরঙে, কখনো মিশ্র মাধ্যমে, কখনো তৈরি করছেন কোলাজ, আর আঙ্গিকের ক্ষেত্রে কখনো তিনি ইম্প্রেশনিস্ট বা রূপবাদী, কখনো বাস্তববাদী, কখনো রোমান্টিক, কখনো এক্সপ্রেশনিস্ট বা অভিব্যক্তিবাদী, কখনো সুররিয়ালিস্ট বা পরাবাস্তববাদী। তবে গাও জিঙ্গজিয়ানের লেখা প্রায় সবসময় হৃদয় ছুঁয়ে যায়, কারণ, পাঠক লক্ষ করেন যে, তিনি কখনোই শুধু ভঙ্গির জন্য কোনো একটি ভঙ্গি অনুসরণ করেন না, তিনি নিছক ভঙ্গি দিয়ে ভোলাতে চান না পাঠককে, তাঁর লেখায় সততা বা ইন্টেগ্রিটির বিষয়টি কেন্দ্রীয়। কৃত্রিমতা পরিহার করেন বলেই গাওয়ের লেখা আড়ষ্টতামুক্ত, স্বচ্ছন্দ এবং সাবলীল। স্রোতস্বিনীর যে-স্নিগ্ধ কুলকুল ধ্বনি ও পাহাড়ের যে-অবারিত উদারতার দৃশ্য তাঁর রচনায় আমরা পাই তা তাঁর রচনাশৈলীতেও লক্ষণীয়।
আত্মা পর্বত দীর্ঘ উপন্যাস। ছোট-বড় একশটি অধ্যায় নিয়ে এ-উপন্যাস গড়ে উঠেছে। কাহিনী অনেক সময় এগিয়ে গেছে পুরানো দিনের, বিশেষ করে শৈশবকালের, স্মৃতিকে অবলম্বন করে। মূল ভ্রমণকাহিনীর সঙ্গে এসে মিশেছে নানা মানুষের নানা গল্প, যেমন ছোট জনপদের তেমনি বিস্তৃত সংরক্ষিত বনাঞ্চলের। একটি বিশেষ মাত্রিকতা যুক্ত হয়েছে এক রমণী ও লেখকের মধ্যে গড়ে-ওঠা আকর্ষণ-বিকর্ষণকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে যৌনতার আভাসের পাশাপাশি রয়েছে অস্তিত্ববাদী দার্শনিকতার ছোঁয়া, চটুল হাস্যকৌতুক, চাপা ব্যঙ্গ ও শ্লেষ।
ছাপ্পান্নতম অধ্যায়টি বেশ ছোট। পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, বন-জঙ্গলে অনেক দিন ভ্রমণের পর লেখক একটি শহরে এসে পৌঁছেছেন। সেখানে এক দঙ্গল তরুণীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। এ-অধ্যায়টি সমগ্র উপনাসে তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না, কিন্তু এটি বেশ আকর্ষণীয়। আমি তার বাংলা অনুবাদ এখানে পরিবেশন করলাম।
মেয়েটি তোমাকে তার হাত দেখতে বলল। ছোট, কোমল হাত, নাজুক, অত্যন্ত রমণীসুলভ। তুমি ওর হাতের পাতা খুলে তা নিজের হাতে তুলে নিলে। তুমি বললে যে, সে খুব শান্ত প্রকৃতির, স্বভাবে সে অমায়িক। ও সায় দিয়ে মাথা নাড়ে।
তুমি বললে যে ওই হাত আবেগপূর্ণ। একথা শুনে সে ভারি মিষ্টি করে হাসল।
কিন্তু ওই শান্ত প্রকৃতি বাইরের ব্যাপার, কারণ তার অন্তরে একটা প্রবল আগুন জ্বলছে, একটা লেলিহান উদ্বেগ। একথা শুনে তার ভ্রƒ কুঞ্চিত হলো।
তার লেলিহান উদ্বেগের পেছনে রয়েছে ভালোবাসার জন্য তার আকুতি এবং এমন একজন লোক যার কাছে সে তার দেহ ও আত্মা নিয়ে পরিপূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে, সে-রকম কাউকে খুঁজে পাবার দুরূহতা। এই মেয়ে বড় বেশি খুঁতখুঁতে, তাকে খুশি করা কঠিন। তার হাতে যা লেখা আছে তুমি শুধু তা-ই বলছ। সে ঠোঁট ফোলায়, মুখ বানায়।
সে একাধিকবার ভালোবেসেছে।
কবার? সে তোমাকে অনুমান করতে বলে।
তুমি বললে যে খুব ছোট থাকতেই সে শুরু করেছে।
কত বয়সে? সে জিজ্ঞাসা করে।
তুমি বললে যে সে একজন রোমান্টিক, আর খুব অল্পবয়স থেকেই সে ছিল ভালোবাসার জন্য লালায়িত। সে হেসে ওঠে।
তুমি তাকে সাবধান করে দিলে, জীবনে সাদা টগবগে ঘোড়ায় চড়ে কোনো রাজপুত্র আসে না, বারবার তার আশাভঙ্গ হবে। সে তোমার চোখে চোখ রাখে না।
তুমি বললে, সে বহুবার প্রতারিত হয়েছে এবং বহুবার সে অন্যকে প্রতারিত করবে… সে তোমাকে তার হাতের রেখা পড়ে যেতে বলে।
তুমি বললে যে তার হাতের রেখা খুব জটিল, আর সে অবধারিতভাবে একই সময়ে নিজেকে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে জড়িয়ে রাখে।
ভুল, সে বলল।
তুমি তার প্রতিবাদকে বাধা দিয়ে বললে, একজনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখার সময়েই সে অন্যের কথা ভাবে এবং আগের প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করার আগেই সে নতুন প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।
সে বলল, তুমি বাড়িয়ে বলছ।
তুমি বললে, কখনো কখনো সে তা সচেতনভাবে করে, কখনো কখনো অচেতনভাবে। তুমি বলছ না এটা ভালো নয়, তুমি শুধু বলছ যে তার হাতে এটা লেখা আছে। এমন কিছু কি আছে যে-সম্পর্কে তোমার কাছ থেকে সে কিছু শুনতে চায় না? তুমি তার চোখে চোখ রাখো।
সে ইতস্তত করে, তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বলে যে তুমি সবকিছু সম্পর্কেই বলতে পারো।
তুমি বললে যে তার ভালোবাসার ক্ষেত্রে একান্তভাবে অনুরক্ত থাকা তার নিয়তি নয়।
তুমি তার হাতের হাড়গুলো অনুভব করো, বলো যে তুমি শুধু তার হস্তরেখা দেখছ না, তার হাড়ের গঠনও পরীক্ষা করছ। তুমি বললে যে, তার এই ছোট্ট কোমল হাত ধরেই যে-কোনো লোক তাকে তার পথে নিয়ে যেতে পারে।
দেখো চেষ্টা করে! সে তার হাত টেনে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করে, কিন্তু তুমি তার হাত ছাড়ো না, শক্ত করে ধরে রাখো।
কষ্ট পাওয়া তার নিয়তি, তার হাতে যা লেখা আছে তুমি শুধু সে-কথাই বলেছ।
কেন?
তোমাকে তোমার নিজেকেই তা জিজ্ঞাসা করতে হবে।
সে বলল, সে শুধু একজন মানুষকেই মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে চায়।
তুমি জানালে যে, সে তা চায় বটে, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে সেটা অসম্ভব।
কেন?
তুমি বললে যে তাকে তার হাতকেই সে-কথা জিজ্ঞাসা করতে হবে, হাতটা তার, তার হয়ে তুমি তাকে উত্তর দিতে পারো না।
সে বলল, তুমি সত্যিই খুব ধূর্ত।
তুমি বললে, সে ধূর্ত নয়, তার এই হাতই ধূর্ত, যে-হাত বড় বেশি নাজুক, বড় বেশি কোমল, বড় বেশি দুর্বোধ্য।
সে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে তার হাত-দেখা অব্যাহত রাখতে বলল।
তুমি বললে, তুমি যদি তা অব্যাহত রাখো তাহলে সে রাগ করবে।
না, করবে না।
তুমি বললে, সে ইতোমধ্যেই রেগে গেছে।
সে জোর দিয়ে বলল যে, না, সে রেগে যায়নি।
তুমি বললে, কী ভালোবাসতে হবে সেটা সে জানে না।
সে বলল, সে বুঝতে পারছে না। তুমি কী বলতে চাও সেটা সে বুঝতে পারছে না।
তুমি তাকে ব্যাপারটা ভেবে দেখতে বললে।
সে বলল, সে ভেবে দেখেছে, কিন্তু তবুও সে বুঝতে পারছে না।
তার অর্থ, কী ভালোবাসতে হবে তা সে জানে না।
সে এমন একজনকে ভালোবাসতে চায় যে সত্যিই বিশেষ একজন!
সত্যিই বিশেষ একজন বলতে সে কী বোঝাতে চাইছে?
এমন একজন যে তাকে এমন প্রেমে পড়াবে যে সে তার হৃদয়-মন সব তাকে সমর্পণ করে সর্বত্র তাকে অনুসরণ করবে, এমনকি এই পৃথিবীর শেষপ্রান্ত অবধি।
তুমি বললে, এ-হলো মুহূর্তের রোমান্টিক উত্তেজনা।
সে উত্তেজনাই চায়! শান্ত হবার পর তা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সে বলল, না, সেটা সম্ভব।
কিন্তু শান্ত হবার পর অন্যান্য বিষয় সামনে এসে পড়ে।
সে বলল, সে যদি প্রেমে পড়ে তাহলে আর কখনো শান্ত হবে না।
তার মানে সে কখনো পড়েনি। তুমি সোজা তার চোখের দিকে তাকাও, সে চোখ সরিয়ে নেয়, তারপর বলে যে, সে সত্যি সত্যি জানে না।
সে প্রেমে পড়েছে কিনা সেটা সে সত্যি সত্যি জানে না, কারণ সে নিজেকে বড় বেশি ভালোবাসে।
তোমাকে সে সাবধান করে দেয়, এতটা পাজি হয়ো না।
তুমি বললে, সে বড় বেশি সুন্দর এবং অন্যের মনের উপর সে কীরকম দাগ কাটছে সে-সম্পর্কে সে বড় বেশি সচেতন থাকে।
বলতে থাকো!
সে বিরক্ত হয়েছে। তুমি বললে, না-জানাটা তার সহজাত।
ভ্রƒ কুঁচকে সে বলল, কী বলতে চাও তুমি?
তুমি বললে যে, তার এই সহজাত জ্ঞান তার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্পষ্ট, কারণ সে বড় বেশি সুন্দর দেখতে এবং অনেক মানুষ তাকে ভালোবাসে। এটা তার দুর্ভাগ্য।
সে মাথা নেড়ে বলে যে, তুমি সংশোধনের অতীত।
তুমি বললে, সে-ই তোমাকে তার হাত দেখতে বলেছে। অধিকন্তু সে তোমাকে সবকিছু খোলাখুলিভাবে বলতে বলেছে।
সে মৃদুকণ্ঠে আপত্তি জানায়, বলে যে তুমি একটু বাড়াবাড়ি করছ।
তুমি যেমন চাও সত্য তো ঠিক তেমন হতে পারে না, ঠিক সে-রকম চমৎকার শোনাতে পারে না, একটু মলিন ও বিবর্ণ হতে তা বাধ্য, না হলে মানুষ কীভাবে তার ভাগ্যের মুখোমুখি হবে? তুমি জানতে চাও, তার হাত দেখে তুমি আরো কিছু বলবে কিনা।
তাড়াতাড়ি করে শেষ করো।
তুমি বললে তার আঙুলগুলো ছড়িয়ে ধরতে হবে। তুমি সেগুলো ফাঁক করে দিলে, বললে, সে তার নিয়তিকে নিয়ন্ত্রণ করে নাকি নিয়তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেটা তোমাকে দেখতে হবে।
তো কে নিয়ন্ত্রকের আসনে আছে বলে তোমার মনে হয়?
তোমার নির্দেশ-অনুযায়ী সে শক্ত করে তার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে, তুমি তখন তার হাতদুটি ধরে হ্যাঁচকা টানে তার দুবাহু ঊর্ধ্বে তুলে চিৎকার করে সবার দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করলে।
তখন সবাই সশব্দে হেসে ওঠে আর সে সজোরে নিজেকে মুক্ত করে নেয়।
তুমি বলে ওঠো, কী দুর্ভাগ্য! তার কথা নয়, তুমি তোমার নিজের কথা বলছ। তোমার কথা শুনে সে-ও হেসে ফেলে।
তুমি জিজ্ঞেস করো, আর কেউ হাত দেখাতে চায় নাকি। মেয়েরা সবাই চুপ করে থাকে। তারপর একটা হাত সামনে প্রসারিত হয়, আঙুলগুলো লম্বা ও শীর্ণ, লাজুক কণ্ঠ শোনা যায়, মেয়েটি আমার দিকে তাকায়।
তুমি বললে, তুমি হাত দেখ, মুখ নয়।
সে তোমাকে শুধরে দেয়। আমি তোমাকে আমার নিয়তি কী সেটা দেখতে বলছি।
তুমি হাতটা টিপে দেখতে দেখতে বললে, এই হাত বেশ শক্তিশালী।
অন্য কিছু বলার দরকার নেই, শুধু বলো আমি সার্থক পেশাজীবী হবো কিনা।
সে একজন পেশাজীবী হবে তুমি শুধু সে-কথা বলতে পারো। কিন্তু পেশাজীবী হওয়াকে আবশ্যিকভাবে সার্থক হওয়া বলা যায় না।
সে প্রতিবাদ করে বলে ওঠে সার্থক না হলে তাকে কী করে পেশাজীবী বলা যাবে?
নিজের ভরণ-পোষণ করতে পারলেই একজনকে পেশাজীবী বলা চলে।
তুমি কী বলতে চাও?
আমি বলতে চাই যে, উচ্চাশার অভাব থাকতে পারে।
সে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, তার হাত শিথিল হয়। সে স্বীকার করে যে, হ্যাঁ, উচ্চাশার সত্যিই ঘাটতি আছে।
তুমি বলো যে, সে শক্তিশালী কিন্তু তার উচ্চাশা নেই, আর সে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না।
ঠিক তা-ই, সে তার ঠোঁট কামড়ে ধরে।
পেশা এবং উচ্চাশা প্রায়ই অবিচ্ছেদ্য হয়ে থাকে। একটি লোকের উচ্চাশা আছে একথা বলার অর্থ তার একটা পেশা আছে। উচ্চাশা হলো পেশার ভিত্তি, উচ্চাশা থাকলে একজন অনিবার্যভাবে বিশিষ্ট হয়ে উঠতে চায়।
হ্যাঁ, সে বলল, সে বিশিষ্ট হতে চায় না।
তুমি বললে, সে শুধু নিজের অবস্থানকে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করতে চায়, সে সুন্দরী নয়, কিন্তু দয়ালু। পেশায় সফলতা সর্বদাই একটা লড়াই দাবি করে, কিন্তু দয়ালু হওয়ার জন্য সে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারাতে পারে না, আর তাই স্বাভাবিকভাবেই বিশিষ্ট হওয়ার মতো সাফল্য সে কখনোই অর্জন করতে পারবে না।
সে শান্ত গলায় বলে, সে এটা জানে।
তুমি বললে, একটা পেশায় থেকেও আবশ্যিকভাবে সফল হওয়াটা কিন্তু সৌভাগ্য হতে পারে।
কিন্তু সে বলল, ওটাকে সৌভাগ্য হিসেবে গণ্য করা যায় না।
তুমি আবার বললে, একজনের পেশায় সফল না হওয়া আর দুর্ভাগ্যের শিকার হওয়া এককথা নয়।
তুমি কী ধরনের সৌভাগ্যের কথা বলছ?
আবেগগত।
সে হালকাভাবে নিশ্বাস ফেলল।
তুমি বললে, একজন তাকে গোপনে ভালোবাসে, কিন্তু সে গভীরভাবে নেয় না, তাকে সে লক্ষই করে না।
তো লোকটা কে?
তুমি তার হাত ছেড়ে দিয়ে বললে যে, তাকেই সেটা ভেবে বের করতে হবে।
তার চোখ বিস্ফারিত হয়, সবাই যারা কান-খাড়া করে শুনছিল তারা এবার হাসিতে ফেটে পড়ে, সে বিব্রত হয়ে তার মাথা হেঁট করে, তারপর সে-ও হাসতে শুরু করে।
এ-একটা সুখী রাত, মেয়েরা তোমাকে ঘিরে আছে, সবাই তাদের হাত দেখাবার জন্য চেঁচামেচি করছে। তুমি বলো যে, তুমি ভাগ্য-গণনাকারী নও, তুমি শুধু প্রাচীন আধিভৌতিক বিদ্যায় পারদর্শী একজন চিকিৎসক।
মেয়েরা একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে, কী সাংঘাতিক, খুব ভয় করছে আমাদের!
এক নারী দুবাহু দিয়ে তোমাকে জড়িয়ে তার পুরুষ্টু হাত বাড়িয়ে বলে ওঠে, আমার ভয় করছে না, আমি ওইসব চিকিৎসককে পছন্দ করি, আমি ওদের ভালোবাসি। এই, আমার হাতটা দেখে দাও। আমার টাকা হবে? অন্যদের হাত ঠেলে দিয়ে সে বলে, ভালোবাসা বা পেশা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, আমি শুধু একজন স্বামী চাই, একজন বিত্তশালী স্বামী।
অন্য একটি মেয়ে বিদ্রƒপ করে বলল, একটা বুড়ো যোগাড় করে নাও না, তাহলেই তো হয়।
পুরুষ্টু হাতের মেয়েটি বলল, কেন? বুড়ো যোগাড় করতে হবে কেন আমাকে?
বুড়ো যখন মরে, যাবে তখন তার সব টাকা-পয়সা তোমার হবে না? তখন তুমি তোমার তরুণ প্রেমিকের কাছে চলে যেতে পারবে। মেয়েটিকে বেশ কর্কশ শোনাল।
যদি না মরে তাহলে ব্যাপারটা খুব ট্র্যাজিক হবে না? অতটা ইতর হয়ো না! পুরুষ্টু হাতের মেয়েটি এবার শোধ নিল।
তুমি বললে, কামনারঞ্জিত পুরুষ্টু হাতটা খুব যৌনাবেদনময়।
সবাই হাততালি দিল, শিস বাজাল, চিৎকার করে উঠল।
মেয়েটি হুকুম করল, আমার হাতের রেখা পড়ো! এই, কেউ বাধা দেবে না।
হাতটা যে যৌনাবেদনময় সে-কথা তুমি বেশ গভীরভাবে বলেছ। তার মানে এই হাত অনেক পাণিপ্রার্থী ডেকে আনে এবং তখন কী করণীয় তা ঠিক করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মেয়েটি অস্ফুট গলায় বলল, আমাকে অনেকে ভালোবাসে সেটা উত্তম কথা, কিন্তু টাকা-পয়সার ক্ষেত্রে কী হবে?
এ-প্রশ্ন শুনে সবাই হেসে ওঠে।
যে-সব মানুষ টাকা-পয়সা খোঁজে না কিন্তু ভালোবাসা খোঁজে তারা ভালোবাসা পায় না, আর যেসব মানুষ টাকা-পয়সার পেছনে ছোটে তারা টাকা-পয়সা পায় না, কিন্তু তাদের ভালোবাসে এমন অনেককে পেয়ে যায়। তুমি গম্ভীরভাবে ঘোষণা করো, এটাই হলো নিয়তি।
একটি মেয়ে চেঁচিয়ে বলল, এই নিয়তি তো বেশ ভালো!
পুরুষ্টু হাতের মেয়েটি তাচ্ছিল্যভরে জানাল, টাকা-পয়সা না হলে আমি কেমন করে সাজগোজ করব? যতদিন সাজগোজ করে নিজেকে সুন্দরী করে রাখতে পারব ততদিন কেউ আমাকে চায় কিনা তা নিয়ে আমাকে দুর্ভাবনা করতে হবে না, তাই না?
মেয়েরা সবাই একযোগে সায় দিয়ে বলে, যথার্থ বলেছো!
আর তুমি, তুমি শুধু চাও যে, মেয়েরা জড়াজড়ি করে চারপাশ দিয়ে তোমাকে ঘিরে থাকুক! সত্যিই তুমি ভারি লোভী! তোমার পেছনে বসা একটি মেয়ে একথা বলল। তুমি কি ওদের সবাইকে ভালোবাসতে পারবে? কিন্তু এরকম একটা সুখী রাতের জন্য তুমি হাপিত্যেশ করে বসেছিলে। তুমি বললে, তুমি প্রত্যেকটি হাত ভালোবাসো! প্রত্যেকটি হাত প্রতিবাদ জানায়, চিৎকার করে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.