চলছে-চলবে

জানা-অজানা

দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্কে ‘মৌচাক’ নামে বিখ্যাত একটি মিষ্টির দোকান আছে। এই দোকানের ওপরেই সপ্তর্ষি হোটেল। ছিমছাম এবং অভিজাত।

এই হোটেলেরই দোতলায় সমকাল আর্ট গ্যালারি। সেখানে প্রায় নিয়মিত চিত্রপ্রদর্শনীর সঙ্গে কবিতাপাঠের আসর বসছে। সেই আসরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, নবনীতা দেব সেন থেকে শুরু করে আরো অনেকেই যোগদান করেন। আমিও যাই।

‘মৌচাক’ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কর্মকর্তা কলা ও কাব্যরসিক শ্রীযুক্ত চক্রবর্তী মহোদয় একদিন আসরশেষে আমাদের মিষ্টিমুখ করালেন। চা-টা প্রতিদিনই হয়, কিন্তু সেদিন তিনি আমাদের আশ্চর্য একটা জিনিস খাওয়ালেন।

খুব মিষ্টি নয়, চমচম-রসগোল্লার মতো রসের মিষ্টান্ন নয়, দুই রঙা, অতি ক্ষীণ লবণাক্ত, কিঞ্চিৎ মুচমুচে অথচ অতি সুস্বাদু এই দ্রব্য। জানতে পারলাম মিষ্টান্নটি চক্রবর্তী মহোদয়ের নবতম আবিষ্কার।

আমার পরম সৌভাগ্য যে, চক্রবর্তী আমাকেই মিষ্টিটির নামকরণ করতে বললেন। অনেক ভেবেচিন্তে আমি ঠিক করেছি মিষ্টদ্রব্যটির নাম আমি প্রস্তাব করবো ‘জানা-অজানারে’ অথবা ‘জানা-অজানা’। যেটি চক্রবর্তীবাবুর পছন্দ হয়।

মিষ্টান্নের কথা আর বেশি বলা যাবে না। এ-বয়েসে লোভে জিব জড়িয়ে আসে, তাছাড়া ডাক্তারের বারণ আছে। এবার সরাসরি জানা-অজানার মূল বিষয়ে অবতরণ করছি।

যে জানে সে জ্ঞানী। ঊনবিংশ শতকের ইংরেজ প্রবন্ধকার বলেছিলেন, ‘Knowledge is power’ (জ্ঞানই ক্ষমতা)। এই ক্ষমতা চতুর্বর্গীয় :

প্রথম বর্গ-সবচেয়ে ক্ষমতাবান, যে জানে সে জানে।      

দ্বিতীয় বর্গ-মোটামুটি ক্ষমতাবান, যে জানে সে জানে না।

তৃতীয় বর্গ-সুপ্ত ক্ষমতাবান, যে জানে না সে জানে।

চতুর্থ বর্গ-লুপ্ত ক্ষমতাবান, যে জানে না সে জানে না।

দুঃখের বিষয়, আমরা অধিকাংশই ওই চতুর্থ বর্গের অন্তর্ভুক্ত। আমরা জানি না যে আমরা জানি না। আমরা ক্লাবে, চায়ের দোকানে, বাড়িতে ড্রয়িংরুমে কতরকম বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। রাজনীতি হোক, অর্থনীতি হোক, সাহিত্য, এমনকি বিশ্বকাপ বা ইউরো- এসব বিষয়ে কত কম জেনে আমরা কত বেশি কথা বলি।

আবহাওয়া, মেঘবৃষ্টি-বিষয়ে আলোচনায় সেদিন দেখলাম এক খ্যাতনামা সাংবাদিক লিখেছেন, মেঘ দুরকম, স্ট্র্যাটাম মেঘ এবং স্ট্র্যাটা মেঘ। স্ট্র্যাটাম-স্ট্র্যাটা এগুলো একই বস্তুর একবচন ও বহুবচন, যেমন, ওভাম-ওভা। আগে স্কুলের উঁচুক্লাসে ইংরেজি ব্যাকরণে এসব শেখানো হতো, যেমন শেখানো হতো ডাটাস-ডাটা, ডাটা নিজেই বহুবচন, কাজেই যখন কেউ ডাটাস লেখে, ভুল লেখে।

আমাদের এই সাংবাদিকও ভুল করেছেন। স্ট্র্যাটাম মানে না জেনে আবোল-তাবোল লিখেছেন। ‘যে জানে না যে সে জানে না’, অজ্ঞানতার এটি নিকৃষ্টতম পর্যায়। সাংবাদিক ভদ্রলোক এইক্ষেত্রে নিজেকে সেই সবচেয়ে খারাপ বর্গে টেনে নামিয়েছেন।

দ্বিতীয় ধরনের লোক হলো, যে জানে সে জানে না। যেমন, সূর্যমুখী ফুলের চাষ-বিষয়ে আমি যে কিছু জানি না, সেটা আমি জানি। বিপরীতদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি দপ্তর সূর্যমুখী-চাষ না জেনে তবুও জানি ভেবে এ-বছর চাষীর প্রভূত ক্ষতি করেছে।

অবশেষে যে জানে না যা সে জানে। স্যার ওয়ালটার স্কট একবার লর্ড বায়রনের একটা কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। পরে তিনি জানতে পারেন কবিতাটি বায়রনের লেখা নয়, ওয়ালটার স্কটই একদালিখেছিলেন।

অনুরূপভাবে, এক পরলোকগত, প্রখ্যাত গল্পলেখককে উদ্ধৃত করে বলতে পারি, ‘অনেক লেখা পড়তে গিয়ে মনে হয়, বেশ লিখেছেন ভদ্রলোক। পরে দেখি আমিই লিখেছি।’

তবে সব জানাই শেষ জানা নয়। যখন আমরা কোনো বিষয়-সম্পর্কে ভাবি যে এ-বিষয়টা জানি, সেটা কিন্তু সর্বার্থে সঠিক নাও হতে পারে।

আমরা জানি, পাটিগণিতের সরল নিয়মে দুয়ে আর দুয়ে চার হয়। যোগ দিলেও হয় গুণ দিলেও হয়।

কিন্তু মহামতি শিবরাম চক্রবর্তী বলেছেন দুয়ে দুয়ে সবসময় যে চার হয় তা মোটেই নয়। দু’য়ে দু’য়ে (অর্থাৎ দোহন করে) দুধও হয়।

এই আপ্তবাক্যও সত্যি, সেটা মানতেই হবে।

কিন্তু জানলেই তো হয় না, জানাতেও হয়।

সবাই সবকিছু জানায় না। সব জানাবার নয়।

পুরনো দিনের কলকাতায় হেরস্ব মৈত্র নামে এক নীতিবাগীশ অধ্যাপক ছিলেন। একদিন তিনি তৎকালীন রঙ্গালয়-পল্লী হাতিবাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন সময়ে এক নবীন যুবক একটি থিয়েটার হলের নাম বলে জিজ্ঞাসা করে, ‘হলটি কোথায়?’ একটা যুবক থিয়েটার দেখে নষ্ট হয়ে যাবে ভাবতেই তাঁর মাথায় রক্ত উঠে গেল। কোনোরকমে ক্রোধ দমন করে তিনি বললেন, ‘জানি না’।

যুবকটি এগিয়ে যাচ্ছিল অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করবে বলে। ইতোমধ্যে অধ্যাপকের প্রত্যয় হয়েছে যে ‘জানি না’ বলাটা মিথ্যে কথা বলা হয়েছে। যুবকটিকে পিছন থেকে ডাকলেন, ‘এই শুনুন’, যুবকটি এগিয়ে আসতে তিনি বললেন, ‘আপনার ওই থিয়েটার হলটি কোথায় আমি জানি, কিন্তু বলবো না।’

জানা-অজানার মূল সমস্যা এইটাই।

যে জানে সে বলে না, যে বলে সে জানে না।