ঢালী আল মামুনের সাম্প্রতিক উপস্থাপন : প্রাচীন মনোবেদনার নবীন ভাষ্য

স্বতন্ত্র নৃ-জাতীয়তা ও সংস্কৃতির একটি জনগোষ্ঠীর নিজের ভেতরে সঙ্গোপনে প্রবহমান একটি প্রাচীন মনোবেদনার স্বরূপকে কি ভিন্ন সংস্কৃতির কারো পক্ষে সম্পূর্ণভাবে হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব? এটি কি সংখ্যাগুরু ও উচ্চতর সংস্কৃতি এবং সামাজিক অবস্থানের সুবিধা থেকে সংখ্যালঘু ও নিুতর অবস্থানের জনগোষ্ঠীর মর্মপীড়ার প্রতি এক ধরনের নিছক রোম্যান্টিক সহমর্মিতা? পীড়িতের অন্তর্দাহ কি অসম অবস্থানের কারও মধ্যে সত্যিই প্রতিস্থাপিত হওয়া সম্ভব এবং তা থেকে জাত-প্রতিক্রিয়া কি পীড়িতের মানসলোকের গহনে লুক্কায়িত বেদনাকে স্পর্শ করতে পারে? চট্টগ্রামের ‘আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ’-এ ঢালী আল মামুনের সাম্প্রতিক উপস্থাপন ‘অপাপবিদ্ধ জল!’ দেখে এ-সকল প্রশ্ন কিংবা সংশয় জাগতে পারে। এর চেয়েও গুরুতর বিতর্ক হতে পারে, আজকের আরো বীভৎস উৎপীড়নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চল্লিশ বছরের ধুলোময়লায় অপ্রাসঙ্গিক (?) হয়ে পড়া একটি বিষয় এতখানি মনোযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে কি-না? বস্তুতপক্ষে প্রদর্শনীর শেষদিন নির্ধারিত মতবিনিময়ে এসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে এবং শিল্পী তাঁর বক্তব্যে নিজ-অবস্থান ব্যাখ্যাও করেছেন।

বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের মূলস্রোত এখনো গতানুগতিক ধারণাপ্রসূত আকর্ষক চিত্রতল-নির্মাণের গণ্ডির মধ্যেই প্রধানত বিচরণশীল। অল্প কিছুসংখ্যক অনতিপ্রবীণ ও নবীন শিল্পপ্রয়াসী সমসাময়িক শিল্পের গতিপ্রবাহকে অনুধাবন ও চিন্তনধর্মী উপস্থাপনের নিরীক্ষা করছেন, তবে প্রায়শই এগুলো প্রসঙ্গের গূঢ় তাৎপর্যকে তার প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ধারণ করতে সমর্থ হচ্ছে না মূলত ভাবনার দীনতা ও রূপকল্পের উদ্ভাবনের স্থূলতায়। এদের মধ্যে যাদের কাজ কিছুকাল ধরে আগ্রহী দর্শকের অভিনিবেশ দাবি করে আসছে তাদের অন্যতম শিল্পী নিশ্চয়ই ঢালী আল মামুন। এমনও হয়ত বলা চলে যে, বাংলাদেশে বুদ্ধিনির্ভর       চিন্তাপ্রসূত শিল্পের যে ক্ষীণ চর্চাটি চলছে তার প্রধানতম নিদর্শন মামুনের কাজেই দেখতে পাওয়া যাবে। অতএব, দীর্ঘ শ্রম ও সময় ব্যয় করে যখন এই শিল্পী একটি বৃহৎ শিল্পপ্রকল্প প্রণয়ন,      বাস্তবায়ন ও উপস্থাপন করেন, তখন তা শিল্পরসজ্ঞমহলে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচিত হয়। দর্শক নিশ্চয়ই একটি অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ সৃজনকর্মের প্রত্যাশা করতে প্রস্তুত থাকেন যা শুধু উপভোগের বস্তু নয়, উপলব্ধিরও বটে। মামুন সে-রকম একটি পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন তাঁর দর্শককুলকে।

‘আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ’, চট্টগ্রাম-এর অনতিপরিসর কক্ষে মামুনের সুবৃহৎ কর্মযজ্ঞ প্রথমে আমাদের খানিকটা হকচকিয়ে দেয়। আমরা বুঝতে পারি না এটি কী প্রকারের শিল্পকর্ম এবং কোথা থেকে একে অনুধাবনের প্রয়াস শুরু করা যেতে পারে। চিত্র, ভাস্কর্যসদৃশ নির্মিত-সামগ্রী, তাদের আন্দোলিত রূপবৈচিত্র্য, জলের প্রবাহ ও নিঃসরণ, আলোকচিত্র, মুদ্রিত ভাষ্য, চলচ্ছবি, শব্দ ও প্রক্ষেপিত আলো আমাদের এমন একটি অভিজ্ঞতায় নিয়ে যায়, যার মোকাবিলার কৌশল আমাদের রপ্ত নেই। চট্টগ্রামের বিবেচনায় উপকরণের ব্যবহারে এ-প্রদর্শনী এমনিতেই একটি ভিন্নতর অভিজ্ঞতা, তদুপরি এর বিষয় নবীন প্রজন্মের জানাশোনার একেবারেই বাইরের বস্তু, যার সঙ্গে বোঝাপড়া হয়ে পড়ে দুরূহতর। তবে দর্শকের জন্য সূত্রধর হিসেবে প্রথমত রয়েছে মুদ্রিত ভাষ্য ও আলোকচিত্র, যার সহায়তা নিয়ে নিতান্ত অগোচর দর্শকও অনুধাবনের সূচনা করতে পারেন। মামুন এ-বিষয়ে সচেতন যে, তাঁর উপস্থাপিত বিষয়বস্তু একটি দূরবর্তী ঘটনা, কালিক এবং স্থানিক বিচারেও বটে, এবং এর সঙ্গে অধিকাংশ দর্শকের প্রত্যক্ষ পরিচয় নেই বললেই চলে। এ-ঘাটতি পূরণের জন্য তিনি একজন গবেষকের নিষ্ঠা ও শ্রম নিয়োজিত করে সংগ্রহ করেছেন পার্বত্য জনগোষ্ঠীর উপর ঔপনিবেশিক জবরদস্তির প্রাচীন আলোকচিত্র এবং কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বাঁধ নির্মিত হওয়া এবং বিস্তীর্ণ বসতভূমি প্লাবিত হওয়ার অনতি-পরবর্তী ভাষ্য। এ-ছাড়াও সংযুক্ত করেছেন প্রকল্পটি- সম্পর্কে শিল্পীর নিজের বক্তব্য। এসব প্রামাণিক দলিল দর্শককে সংযুক্ত করে শিল্প-উপস্থাপনটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে। এভাবে ত্রিমাত্রিক আকৃতিসমূহ ও এদের দোলাচল, রক্তবর্ণ পানির প্রবাহ ও চক্ষুসদৃশ উৎস থেকে নিঃসরণ, চলচ্ছবি ও সংযুক্ত শব্দের সম্পর্ক, দেয়াললগ্ন চিত্রসমূহের বিষয় ক্রমশ দর্শকের দৃষ্টিতে অর্থময়তা পেতে শুরু করে। ঢালী আল মামুন এভাবে একটি বিস¥ৃত বিষয় ও তার জটিল প্রতীকী উপস্থাপনাকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে আত্মস্থ করবার ধাপগুলো নির্মাণ করেন।

তবু এমনটি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে, একটি স্বল্পজ্ঞাত অঞ্চলের ভূগোল ও ইতিহাস-সংলগ্ন অতি সূক্ষ¥ ইঙ্গিতময় রূপকল্পসমূহের ব্যবহার সকলের কাছে অর্থপূর্ণভাবে প্রতিভাত হবে। একটি বিশেষ সংস্কৃতির অবকাঠামো ও তার একান্ত মনস্তত্ত্ব-ভুবনের অনুধাবন ছাড়া এটি হয়ত সম্ভবপরও নয়। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অন্য সংস্কৃতিটির স্বাতন্ত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও তার     অস্তিত্বের প্রতি মমত্ববোধ, যা আমাদের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের চৈতন্যের মধ্যে নেই বললেই চলে। একটি জনগোষ্ঠীর প্রতি দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও নিপীড়ন, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তুচ্যুতি তথা নিশ্চিহ্নকরণের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছায়, যে গভীর ক্ষত নির্মাণ করেছে, তা সমাজের সংখ্যাগুরু অংশের কাছে নির্মম উদাসীনতা বা তাচ্ছিল্য ছাড়া প্রায় কিছুই পায়নি, আশ্চর্যজনক হলেও এটি সত্যি। এ-রকম একটি সামাজিক পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে একজন শিল্পী যখন এ-ধরনের একটি বিষয়ে আলোকপাতের সিদ্ধান্ত নেন তখন একদিকে যেমন তা তাঁর স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করে তেমনই আমাদের পাপমোচনের দায়ভার গ্রহণ করে শিল্পী তাঁর সচেতনতা ও অঙ্গীকারবোধেরও পরিচয় দেন। যে- বিপুল শ্রম ও নিষ্ঠায় মামুন এ-দায়িত্ব পালনের প্রয়াস নিয়েছেন তা অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য।

উপস্থাপনটির মূল উপাদান হিসেবে শিল্পী নির্বাচন করেছেন জলকে, যে-জল স্বভাবত ‘অপাপবিদ্ধ’। মানুষের মতলবি ব্যবহারে প্রাণদায়ী জল হয়ে উঠতে পারে সংহারী, একটি জনগোষ্ঠীর স্থানচ্যুতির ও ভাগ্যবিপর্যয়ের অপদেবতা। মামুন লক্ষ করেন, পার্বত্য জীবনে জলের       এ-অবশ্যম্ভাবিতা, একই সঙ্গে তার এ-দ্বিচারিতা, জীবন ও মৃত্যু উভয় বোধের সঙ্গে তার অনিবার্য সম্পৃক্ততা। স্বচ্ছ নির্মল জল তাই তাঁর উপস্থাপনে হয়ে ওঠে রক্তবর্ণ, নিঃসরিত হয় অবিরল অশ্রুরূপে, নিমজ্জিত রাজবাড়ির প্রতীকী নির্মাণের সর্বাঙ্গ বেয়ে ঝরতে থাকে। পার্বত্য মানুষের জল রাখবার পাত্র লাউয়ের খোলকে শিল্পী ব্যবহার করেন আরো বিশদ রূপকে, তাদের আন্দোলিত জৈবিক অস্তিত্ব ক্রমাগত বমন করে যায় জল, যে-জল রূপান্তরিত হয়েছে রক্তে। এর সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন তাঁর ভিডিওচিত্র। বস্তুরূপের পাশাপাশি চলচ্ছবিতে উপস্থাপিত সর্বগ্রাসী দিগন্তবিস্তারী জলরাশির প্রবল আলোড়ন গম্ভীর নাদের মন্ত্রধ্বনির সঙ্গে মিলিত হয়ে আমাদের উত্তীর্ণ করে সেই বোধের জগতে, যেখানে অর্থের চেয়ে অনুভবের ব্যঞ্জনা এক ভিন্নতর সংবেদ ও মাত্রা অর্জন করে। এখানেই মামুনের সার্থকতা, তাঁর উপস্থাপন ইতিহাসের নিছক বয়ান হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে সৃষ্টিকর্ম, যা স্পর্শ করতে পারে সংবেদনশীল দর্শকের চিত্ত।

শুরুর প্রসঙ্গটি এখানে পুনরায় বিবেচনার প্রয়োজন পড়ে। বহিঃস্থ অবস্থান থেকে এই চ্যুতির স্বরূপকে সর্বাংশে অনুভব করা কি সম্ভব? কাপ্তাই হ্রদে বহুকাল আগে নিমজ্জিত চাকমা রাজবাড়ি, যা মামুনের উপস্থাপনের কেন্দ্রীয় ইমেজ, পার্বত্যবাসীর চেতনায় কী ধরনের অভিঘাত রচনা করে? এ কি হারিয়ে যাওয়া এক স্বপ্নলোকের স¥ৃতিরূপকল্প, না-কি বর্তমানের অস্তিত্বের প্রেরণা? এসব প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, হয়ত এগুলোর একটিমাত্র উত্তরও নেই। এসব সংশয় ও দ্বিধা মামুন নিজেও বিবেচনা করেছেন, বিবিধ সংযোগ ও প্রত্যক্ষকরণের মাধ্যমে প্রায় গবেষকের অনুপুঙ্খতায় বিষয়ের নির্যাসকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন, তাঁর ভাষ্যকে মৌলিকতম প্রতীকে ও শিল্পভাষায় উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছেন। এই শিল্পভাষাতেই তাঁর জোর। মামুন প্রধানত চিত্রশিল্পী। এবারে আমরা তাঁকে পাই চিত্রীরূপের পাশাপাশি একাধারে স্থাপতিক ও      ভাস্কর্য-সদৃশ নির্মাণশিল্পীরূপে, চলচ্চিত্রের সৃষ্টিশীল চিত্রগ্রাহক ও শব্দ-সংযোজক হিসেবে, প্রযুক্তি-প্রয়োগের দক্ষ কারিগররূপে, সর্বোপরি শিল্পের বহুমাত্রিক উপস্থাপনের শক্তিমান এক প্রতিনিধি হিসেবে। ধাতুনির্মিত বিসর্পিল নদীপথ, এর ভাররক্ষার ছিদ্রযুক্ত বেদিমূল, আন্দোলিত লাউয়ের খোলসদৃশ জৈবিক আকৃতি শিল্পীর ত্রিমাত্রিক ডৌল গঠনে পারঙ্গমতার পরিচায়ক। তবে মামুনের উদ্ভাবনী সবচেয়ে সার্থকরূপে প্রতিভাত হয়েছে চলচ্ছবি-নির্মাণে ও শব্দ-সংযোজনে। তাঁর ক্যামেরা জলের আক্রমণাত্মক ও বিভীষিকাময় রূপের আদলকে যথার্থভাবে তুলে এনেছে, নিমজ্জিত বৃক্ষের দুটি নিষ্পত্র কাণ্ড বিপর্যস্ত মানব-মানবীর প্রতিরূপ স¥রণে আনে। শব্দ-অনুষঙ্গে তিব্বতী জপমন্ত্রের ব্যবহার অনবদ্য, বলা যেতে পারে এ-উপস্থাপনের প্রাণশক্তি। এভাবে শিল্পের সংবেদী ক্ষমতার সুচিন্তিত প্রয়োগের দ্বারা মামুন অতিক্রম করেন বিষয়ের দূরত্বকে এবং প্রদর্শনীর দর্শকপ্রিয়তা এর যাথার্থ্যরে একটি প্রণিধানযোগ্য প্রমাণ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধ-নির্মাণ ও পরবর্তীতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাঙালি-বসতি-স্থাপনের মাধ্যমে পার্বত্য নৃ-জনগোষ্ঠীসমূহের যে-উচ্ছেদপ্রক্রিয়া তাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করেছে সে-সম্পর্কে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠশ্রেণি দীর্ঘকাল মোটামুটি নীরবতা পালন করে এসেছি। নীরবতা মৌন সম্মতিরই সূচক। মামুনের প্রতিবাদের এই ভাষ্য কি আমাদের পাপবোধকে স্পর্শ করতে পারবে? অনেকেই জানতে চেয়েছেন পার্বত্যজনেরা কি এ-প্রদর্শনী দেখেছেন, দেখে থাকলে তাদের প্রতিক্রিয়া কী? এটি একটি কৌতূহলের বিষয় বটে, যাঁদের নিয়ে এ-রচনা সেটি তাঁদের আবেগকে কতখানি স্পর্শ করতে সক্ষম হলো। তবে, মনে হয়, তাঁদের চেয়েও এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য আমাদের নিজেদের, সংখ্যাগুরু বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য, এ-প্রদর্শনী যাদেরকে প্ররোচিত করতে পারে আত্মসমীক্ষণে, গ্লানিমোচনের উদ্যোগে।