খুব সাধারণভাবেও যদি দেখি, তাহলেও এটি বুঝতে খুব বেশি অসুবিধা হয় না যে, সবসময়ের জন্যে না-হলেও, কখনো-কখনো কবি ও কবিতা নিয়ে কবিরাই সাধারণত সবচেয়ে ভালো আলোচনা ও প্রাঞ্জল বিশ্লেষণ করে থাকেন। মার্কিন অধ্যাপক-কবি-প্রাবন্ধিক মার্ক ভ্যান ডোরেন (Mark Van Doren : 1894-1972)-এর মতে, ‘A good critic, like a good poet, is made as well as bornÕ (Doren, 1962 : 1)। একইসঙ্গে তিনি সমালোচক সম্পর্কে এটিও বলেছিলেন যে, ‘He also is an artist.’ আর এখানেই থামেননি ডোরেন, বেশ জোরের সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন ‘A good critic must be a good writer.Õ (Doren, 1962 : 3)। বুদ্ধদেব বসু তো আরো খানিকটা অগ্রসর হয়ে বলেই দিয়েছিলেন, ‘একজন কবির বিষয়ে অন্য এক কবির মন্তব্য, অত্যুক্তি হলেও, ভ্রান্ত হলেও, মূল্যবান।’ কেন মূল্যবান? বুদ্ধদেবের মতে, ‘কেননা কেবল কবিরাই পারেন সংক্রামকভাবে সাড়া দিতে।’ (বুদ্ধদেব, ১৯৯১ : ১৭৯)
১.২
সাহিত্যের সমালোচনা মূলত সাহিত্যের বিচার। সমালোচকের সূক্ষ্ম দৃষ্টিটা এখানে বলা যায় একটি অপরিহার্য বিষয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘সাহিত্যবিচার’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘সূক্ষ্ম দৃষ্টি জিনিসটা যে রস আহরণ করে সেটা সকল সময় সার্বজনিক হয় না। সাহিত্যের এটাই হল অপরিহার্য দৈন্য। তাকে পুরস্কারের জন্য নির্ভর করতে হয় ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধির উপরে। তার নিম্ন-আদালতে বিচার সেও যেমন বৈজ্ঞানিক বিধি-নির্দিষ্ট নয়, তার আপিল-আদালতে রায়ও তথৈবচ।’ (রবীন্দ্রনাথ : চতুর্দশ খণ্ড; ১৪২১ : ১৯২)।
২
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন ঠিক সেই জাতের কবি, যাঁর সম্পর্কে বঙ্গদর্শন (ভাদ্র ১২৮০) পত্রিকায় বঙ্কিম লিখেছিলেন : ‘যে দেশে একজন সুকবি জন্মে, সে দেশের সৌভাগ্য। যে দেশে সুকবি যশঃপ্রাপ্ত হয়, সে দেশের আরও সৌভাগ্য। … এই প্রাচীন দেশে, দুই সহস্র বৎসরের মধ্যে কবি একা জয়দেব গোস্বামী। … জয়দেব গোস্বামীর পর শ্রীমধুসূধন।’ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গর্বের সঙ্গে আরো জানিয়েছিলেন, ‘যদি কোন আধুনিক ঐশ্বর্য্য-গর্ব্বিত ইউরোপীয় আমাদিগের জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের আবার ভরসা কি? – বাঙ্গালীর মধ্যে মনুষ্য জন্মিয়াছে কে? আমরা বলিব, ধর্ম্মোপদেশকের মধ্যে শ্রীচৈতন্যদেব, দার্শনিকের মধ্যে রঘুনাথ, কবির মধ্যে শ্রীজয়দেব ও শ্রীমধুসূদন।’ (বঙ্কিম, ১৪১৭ : ৮০৮-৮০৯)। অন্যদিকে, আবার রবীন্দ্রনাথের কাছে গোটা মেঘনাদবধ কাব্যটি একটি ‘কৃত্রিম মহাকাব্য’ হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। তাঁর মতে, ‘কাব্যে কৃত্রিমতা অসহ্য এবং সে কৃত্রিমতা কখনো হৃদয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করিতে পারে না।’ আর সেই কারণে তিনি ছয় কিস্তির বেশি আর আলোচনা করতে সম্ভবত সম্মত হননি। তিনি বলছেন, ‘আমি মেঘনাদবধের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ লইয়া সমালোচনা করিলাম না – আমি তাহার মূল লইয়া তাহার প্রাণের আধার লইয়া সমালোচনা করিলাম, দেখিলাম তাহার প্রাণ নাই। দেখিলাম তাহা মহাকাব্যই নয়।’ (রবীন্দ্রনাথ : পঞ্চদশ খণ্ড। ১৪১৭ : ৭০)।
৩
তার মানে অন্য আরো সব কবির মতোই মধুসূদনের পক্ষে-বিপক্ষে দুটো দলই বিদ্যমান। তাঁর দ্বিশতজন্মবর্ষে আমরা আপাতত মধুসূদনের কৃতিত্বটুকু নিয়েই আলোচনা করি। মধুসূদনের এই কৃতিত্বের নেপথ্যের কারণ হিসেবে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত উল্লেখ করতে ভোলেননি যে, ‘মাইকেল শুধু ম্রিয়মাণ বাংলা কাব্যকে জাগিয়ে তুলে, ঝিমিয়ে পড়েননি’; সেইসঙ্গে তিনি ‘বাঙালী কবিকে তরজাওয়ালার দল থেকে বাঁচিয়েছিলেন।’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২৪৪)। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের দৃষ্টিতে এইটি এড়ায়নি যে, যতই রামায়ণ-মহাভারতের পুরাণের চরিত্রগুলোকে তিনি কাব্যিক রূপ দিন-না কেন মধুসূদনের কাব্যের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাঁর সমকালের রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ।
৪
আমাদের আধুনিক বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যে বুদ্ধদেব বসু একজন প্রধান ব্যক্তিত্ব – তাঁর অনেক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবহিত হয়েও, আমরা এই সত্যটি মেনে নিয়ে থাকি। বুদ্ধদেব বসু, তাঁর সমালোচক-ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই, মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘যাকে আমরা সমালোচনা বলি সে-জিনিশটা অত্যন্ত অস্থির। তার উপর নির্ভর করতে ভয় হয়।’ (বুদ্ধদেব, ১৯৮৪ : ১৩৪)। সেই বুদ্ধদেব বসুর কাছে মনে হয়েছে, ‘মাইকেলের মহিমা বাংলা সাহিত্যের প্রসিদ্ধতম কিংবদন্তী, দুর্মরতম কুসংস্কার। কর্মফল তাঁকে পৌঁছিয়ে দিয়েছে সেই ভুল স্বর্গে, যেখানে মহত্ত্ব নিতান্তই ধরে নেয়া হয়, পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। এ-অবস্থা কবির পক্ষে সুখের নয়, পাঠকের পক্ষে মারাত্মক।’ কেন মারাত্মক? তার প্রমাণ দিতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু এমন সব উদাহরণ দিতে থাকেন, যা কি না তাঁর নিজেরই সাহিত্যের আদর্শের প্রায়-বিপরীত বললেও খুব-একটা অনুচিত কথা বলা হয় না। তাঁর মনে হয়েছে, ‘আধুনিক বাঙালি পাঠক মাইকেলের রচনাবলী পড়ে এ-মীমাংসায় আসতে বাধ্য যে তাঁর নাটকাবলী অপাঠ্য এবং যে-কোনো শ্রেণীর রঙ্গালয়ে অভিনয়ের অযোগ্য, মেঘনাদবধ কাব্য নিষ্প্রাণ, তিনটি কি চারটি বাদ দিয়ে চতুর্দশ-পদাবলী বাগাড়ম্বর মাত্র, এমনকি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা বীরাঙ্গনাকাব্যেও জীবনের কিঞ্চিৎ লক্ষণ দেখা যায় একমাত্র তারার উক্তিতে।’ আমরা বেদনার সঙ্গে খেয়াল করি যে বুদ্ধদেবের মতে – মাইকেলের খ্যাতির সঙ্গে মাইকেলের কীর্তির সুমাত্রা-সূত্রের সম্বন্ধ নয়। … সমসাময়িক পাঠকসমাজে মাইকেলের আধিপত্য সূচিত হয়েছিলো মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশিত হবার আগেই। আর তার পর থেকে আজ প্রায় একশ বছর ধরে আমরা অবিশ্রান্ত শুনে আসছি যে মাইকেল মহাকবি, বাংলা সাহিত্যের ত্রাতা এবং বাংলা কাব্যের মুক্তিদাতা। তাঁর ঘটনাবহুল জীবন, জীবনের শোকাবহ সমাপ্তি তাঁর প্রতিষ্ঠার সহায়তা করেছে। (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ২৮)
আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে এও দেখতে পাই, মধুসূদনের গোটা সাহিত্যকর্মকেই বুদ্ধদেব বসু সাহিত্যের প্রাঙ্গণ থেকে একেবারে যেন হটিয়ে দিতে চেয়েছেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছে – ‘ভাবতেই অবাক লাগে যে মাইকেলের ইংরেজি পত্রাবলীতে প্রাণশক্তির যে-প্রাচুর্য দেখি, যে তার সংক্রমণ প্রহসন দুটিতে ছাড়া আর-কোনো রচনাতেই নেই – এবং প্রহসন দুটিও সর্বাঙ্গসুন্দর নাটক নয়, নবিশের কাঁচা হাতের কৃশাঙ্গ নকশা মাত্র, অনেকটাই তার ছেলেমানুষি।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ২৮)
মাইকেলের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু বারবারই রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনেন, যেটি তাঁর পক্ষে নতুন কিছু নয়। এটি যে একেবারে অসংগত তা-ও আমরা বলছি না। কিন্তু তিনি যখন মেঘনাদবধ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ষোলো বছরের কিশোর রবীন্দ্রনাথের মতামতকে ‘একুশ বছর বয়সে লেখা মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনা’ বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছেন, তখন তাঁর প্রবন্ধের অনুরাগী পাঠক হিসেবে সত্যিকার অর্থেই হতাশ হয়েছি। রবীন্দ্রনাথের সেই প্রবন্ধের ‘চিন্তাবিন্যাসে অপরিণত মনের পরিচয়ে’র কথা বুদ্ধদেব বসু স্বীকার করে নিয়েও, গ্রাম্যজন সমালোচকের মতো, একরোখা জেদ নিয়ে বলেই গিয়েছেন সেখানে নাকি ‘তৎসত্ত্বেও সত্য কথাই যে বলা হয়েছিলো তাতেও সন্দেহ নেই।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ২৮-২৯)। অথচ যাঁকে তিনি সাক্ষী মানছেন, সেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর অল্প বয়সের কৃতকর্ম নিয়ে অপ্রস্তুতই শুধু নন, তিনি অনুতপ্তও বটে। সে-কারণেই তিনি এইভাবে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন – কাঁচা আমের রসটা অমøরস, কাঁচা সমালোচনাও গালিগালাজ। অন্য ক্ষমতা যখন কম থাকে তখন খোঁচা দিবার ক্ষমতাটা খুব তীক্ষ্ণ হইয়া উঠে। আমিও এই অমর কাব্যের উপর নখরাঘাত করিয়া নিজেকে অমর করিয়া তুলিবার সর্বাপেক্ষা সুলভ উপায় অবলম্বন করিতেছিলাম। এই দাম্ভিক সমালোচনাটা দিয়া আমি ভারতীতে প্রথম লেখা আরম্ভ করিলাম। (রবীন্দ্রনাথ, ১৪২৪ : ৯২)এটিই অত্যন্ত পরিহাসের বিষয় যে, বুদ্ধদেব যাঁর সমালোচনার মধ্যে সত্যের নির্যাস খুঁজে পেয়েছিলেন, নিজের সেই সমালোচনাকে রবীন্দ্রনাথ নিজেই পরবর্তী সময়ে বলেছেন ‘দাম্ভিক সমালোচনা’, স্বীকার করেছিলেন যে, ওটা সমালোচনা ছিল না, বলেছিলেন ওটা ছিল ‘গালিগালাজ’। অথচ রবীন্দ্রনাথের এই আত্মসমালোচনাকে বুদ্ধদেব বসুর কাছে মনে হয়েছে নিছক ‘পূর্বসূরীর প্রতি সৌজন্য প্রকাশের প্রথা।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ২৯)
৪.১
বুদ্ধদেব এটিও খেয়াল করতে ভোলেননি যে, ‘তারুণ্যের সত্যভাষণ ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হবার পঁচিশ বছর পরে রবীন্দ্রনাথ অগ্রজ-নিন্দার প্রায়শ্চিত্ত করলেন ‘সাহিত্যসৃষ্টি’ প্রবন্ধে।’ কিন্তু সেই প্রবন্ধের মূল বক্তব্যকেও বুদ্ধদেব বসু একধরনের অন্ধ-জেদের বশেই যেন মেনে নিতে চাননি। এ-বিষয়ে তাঁর অনুতাপহীন বক্তব্য ছিল এমন অসহিষ্ণু রকমের : ‘রবীন্দ্রনাথ কি জানতেন না যে তাঁর এই মন্তব্যে যাথার্থ নেই, আছে শুধু চলতি মতের পুনরুক্তি? … আধুনিক সাহিত্যে মাইকেলের প্রভাব যে বলতে গেলে শূন্য, এমনকি মোহিতলালের প্রশংসনীয় উদ্যম সত্ত্বেও তাঁর প্রবর্তিত অমিত্রাক্ষর পর্যন্ত জাদুঘরের মূল্যবান নমুনা হয়েই রইলো, পূর্ব-পশ্চিমের মিলনসাধনায় তাঁর ব্যর্থতার এটাই প্রমাণ।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৩০-৩১)
এখানেই থেমে যাননি বুদ্ধদেব বসু, তিনি যেন মাইকেলের বিরুদ্ধে এক অলিখিত যুদ্ধ ঘোষণা করে জানালেন, ‘বললে হয়তো কালাপাহাড়ি শোনায়, কিন্তু কথাটা একান্তই সত্য যে বাংলা সাহিত্যে পাশ্চাত্ত্য ভাব মাইকেল আনতে পারেননি, এনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ; মাইকেলে আমরা শুধু পাই আঁকাড়া অনুকরণ (যার সবচেয়ে লোহমর্ষক দৃষ্টান্ত অষ্টম সর্গের নরকবর্ণনা), রবীন্দ্রনাথে পাই সসত্ত্ব অনুপ্রাণনা।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৩১)
৪.২
আমরা দেখেছি যে, মেঘনাদবধ কাব্যের অষ্টম সর্গের বিবরণটাকে রবীন্দ্রনাথও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু তাই বলে বুদ্ধদেব বসু নিজেও? যে-বুদ্ধদেব বসু কি না শার্ল বোদলেয়ারের কবিতাকর্মের অনুবাদের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘বোদলেয়ারে এমন কেউ নেই – খুনে, মাতাল, লম্পট কিংবা অভাজন, কেউ নেই যে চৈতন্যের দ্বারা আক্রান্ত ও পীড়িত নয়, ভাবনা যার অন্ত্রে-তন্ত্রে দংশন করেনি কিংবা যার বিবেকের ভার প্রতিভূ-কবি বহন করেননি।’ (বুদ্ধদেব, ১৯৯১ : ২০৪)। অষ্টম সর্গে নরকের বিবরণের মধ্যে দিয়ে তো মাইকেল মধুসূদন সেইসব নরকবাসীর বিবেক ও যন্ত্রণার ভারটাকেই নিজের মধ্যে বহন করেছেন একা। বুদ্ধদেব বসু তাঁর সেই প্রবন্ধে আরো বলেছিলেন, ‘মানুষ দুঃখী, কিন্তু সে জানুক মানুষ দুঃখী; মানুষ পাপী, কিন্তু সে জানুক সে পাপী; মানুষ রুগ্ন, কিন্তু সে জানুক সে রুগ্ন; মানুষ মুমূর্ষু, এবং সে জানুক সে মুমূর্ষু; মানুষ অমৃতাকাক্সক্ষী, এবং সে জানুক সে অমৃতাকাঙ্ক্ষী : বোদলেয়ারের সমগ্র কাব্যে … এই বাণী নিরন্তর ধ্বনিত হচ্ছে।’ আর সবশেষে বুদ্ধদেব বলতে ভোলেননি যে, এসব ‘সকলে জানবে না, জানতে পারবে না বা চাইবে না; কিন্তু কবিরা জানুন। এই জ্ঞানেই আধুনিক সাহিত্যের অভিজ্ঞান।’ (বুদ্ধদেব, ১৯৯১ : ২০৪)
সেই বুদ্ধদেব বসুর মতে কি না মেঘনাদবধ কাব্য থেকে শুরু করে বীরাঙ্গনা কাব্য, সেইসঙ্গে ‘ব্রজাঙ্গনার প্রেমলীলা এবং চতুর্দশপদীর দেশপ্রেম আর প্রকৃতিবর্ণনাও – সেই একই কথাই বলতে হয় – গতানুগতিকতারই পরাকাষ্ঠা, নাটক ক-খানাও তা-ই, উজ্জ্বল প্রহসন দুটির পরিসমাপ্তিও এর ব্যতিক্রম নয়।’
৪.৩
এরপর থেকেই আমাদের বিস্ময়ের শুরু আর তা যেন শেষ হতে চায় না। এতসব নেতিবাচক বিশ্লেষণের পরেও বুদ্ধদেব বসু কি না বলছেন – ‘তবু এ-কথা মানতেই হয় যে মাইকেল শক্তিধর পুরুষ, বঙ্গসাহিত্যের অন্যতম প্রধান। কিন্তু তাঁর প্রাধান্যের স্বরূপ বুঝতে হবে, তবে তো তাঁকে আমরা নিজেদের কাজে লাগাতে পারবো।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৩৯)
মধুসূদনের কৃতিত্বের বিবরণ দিতে গিয়ে এবার যেন অনেকটা উল্টোমুখো হয়ে বুদ্ধদেব বসু আমাদের জানাচ্ছেন, ‘এমন একটি কাণ্ড মাইকেল করেছিলেন যার সামনে কোনো সন্দেহ টিকলো না, কোনো আপত্তি দাঁড়াতে পারলো না। সকলেই জানেন যে সেটি তাঁর অমিত্রাক্ষর ছন্দের উদ্ভাবনা। এ-উদ্ভাবনা যে ঠিক কী-কারণে মাইকেলকে অক্ষয় যশের অধিকারী করলো তা অবশ্য তাঁর সমসাময়িকেরা স্পষ্ট বোঝেননি, তাঁরা ভেবেছিলেন যে মিল-বর্জনটাই খুব বড়ো কথা।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৪০)
ইতিহাসের পরম্পরা ও সত্যের খাতিরে এখানে আমাদের বলতেই হচ্ছে যে, মাইকেলের সমসাময়িকরা তাঁর অক্ষয় যশের অন্তর্নিহিত কারণের কথা জানতেন না বা বুঝতেন না – বুদ্ধদেব বসুর এই দাবির সঙ্গে আমরা একমত নই। মাইকেলের সমকালে, সেই ১৮৫৯ সালে, রাজেন্দ্রলাল মিত্র অত্যন্ত সারগর্ভভাবে মধুসূদনের কৃতিত্বকে বিশ্লেষণ করেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র বলেছিলেন – [তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য] ‘ইহার রচনাপ্রণালী অপর সকল বাঙ্গালী কাব্য হইতে স্বতন্ত্র। ইহাতে ছন্দ ও ভাবের অনুশীলন ও অন্ত্য যমকের পরিত্যাগ করা হইয়াছে। ঐ উপায়ে কি পর্য্যন্ত কাব্যের ওজোগুণের বর্দ্ধিত হয়, তাহা সংস্কৃত ও ইংরাজী কাব্য-পাঠকেরা জ্ঞাত আছেন; বাঙ্গালীতে সেই ওজোগুণের উপলব্ধি করা অতীব বাঞ্ছনীয়; বর্ত্তমান প্রয়াসে সে অভিপ্রায় কি পর্য্যন্ত সিদ্ধ হইয়াছে, তাহা সহৃদয় পাঠকবৃন্দ নিরূপিত করিবেন।’ (রাজেন্দ্রলাল, ২০২৩ : ৪৭)।
বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, ‘যাকে আমরা মিল বলি আসলে তা অনুপ্রাসেরই রকমফের, এবং কোনো-কোনো শ্রেণির অনুপ্রাস পদ্য-গদ্য লিখিত-কথিত সর্বপ্রকার ভাষার মর্মমূলে প্রোথিত। … মিলের কথাটা তাই বড়ো কথা নয়; মাইকেলের যতিস্থাপনের বৈচিত্র্যই বাংলা ছন্দের ভূত-ঝাড়ানো জাদুমন্ত্র। কী অসহ্য ছিলো ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল’-র একঘেয়েমি, আর তার পাশে কী আশ্চর্য মাইকেলের যথেচ্ছ-যতির ঊর্মিলতা।’
(বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৪১)। অন্যদিকে, বুদ্ধদেবেরও অনেক আগে, রাজেন্দ্রলাল মিত্র কাকে ছন্দ বলে, সে-সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, ‘ছন্দের লক্ষণ এই যে, রচনাকে নির্দ্দিষ্ট সঙ্খ্যক পদ বা চরণে বিভক্ত করিয়া ঐ চরণে নির্দ্দিষ্ট সঙ্খ্যক মাত্রা বা বর্ণ ও যতি বা বিরাম রাখিতে হয়।’ এ-প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, ‘দেশ, ভাষা ও পাঠকদের রুচিভেদে ঐ ছন্দের বিবিধ রূপান্তর হইয়া থাকে। সংস্কৃতে ঐ রূপান্তর করণার্থে ছন্দের বর্ণ, মাত্রা ও যতির পরিবর্ত্তন করা হয়; সুতরাং বর্ণ, যতি ও মাত্রাই ছন্দের আত্মা, তদ্ভাবে ছন্দ হয় না।’ (রাজেন্দ্রলাল, ২০২৩ : ৪৭)। অনুপ্রাস ও অন্ত্যমিল বিষয়েও রাজেন্দ্রলালের স্পষ্ট ধারণা ছিল। তার প্রমাণ আমরা পাই তাঁরই এই বক্তব্য থেকে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘ছন্দের অলঙ্কার-স্বরূপে কোন কোন ছন্দের এক চরণের শেষ অক্ষরের সহিত অপর চরণের শেষ অক্ষরের অনুপ্রাস করা হয়; কিন্তু তাহা ছন্দের অঙ্গ নহে।’ (রাজেন্দ্রলাল, ২০২৩ : ৪৭-৪৮)। রাজেন্দ্রলাল তাঁর প্রবন্ধে মধুসূদনের কাব্য ভাষা ও ছন্দের কাঠামোকে সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতেই যেভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর ও প্রশংসার যোগ্য। তাঁর মতে – ‘অনুপ্রাসের প্রতিবন্ধক না থাকিলে কবিরা এক বাক্যকে যতদূর ইচ্ছা ততদূর দীর্ঘ করিতে পারেন; যে স্থানে ইচ্ছা সেই স্থানেই বাক্য শেষ করিতে পারেন, ও যে পরিমিত ছন্দে আপনার ভাব সুপরিব্যক্ত হয় তাহাই গ্রহণ করিতে পারেন, কদাপি পাদ-পূরণের নিমিত্ত বৃথা শব্দের প্রয়োগ বা প্রয়োজনীয় শব্দের পরিত্যাগ করিতে প্রণোদিত হয়েন না। ফলতঃ দত্তজ যথার্থ লিখিয়াছেন যে, মিত্রাক্ষর কবিতার নিগড়। তাহার পরিত্যাগে কবিতা কামাবচর হইতে পারেন।’ (রাজেন্দ্রলাল, ২০২৩ : ৪৮)। এরপরেও রাজেন্দ্রলাল আরো অনেকখানি অগ্রসর হয়ে এটিও বলেছিলেন যে, ‘কথিত হইয়াছে যে, অন্ত্যানুপ্রাস ত্যাগ করিলে কবি যেস্থানে ইচ্ছা সেই স্থানে বাক্যের সমাপ্তি করিতে পারেন, ইহাতে আশু বোধ হইতে পারে, এবং কোন কোন সম্পাদকের বোধ হইয়াছে যে, অমিত্রাক্ষর কবিতার যতির ভেদ নাই; কিন্তু তাহা আমাদিগের উদ্দেশ্য নহে।’ (রাজেন্দ্রলাল, ২০২৩ : ৫০)। বলা যায়, অনেকটা রাজেন্দ্রলালের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন – ‘প্রকৃতপক্ষে, অন্য কোনো কারণে যদি না-ও হয়, শুধু বাংলা ছন্দে প্রবহমানতার জনক বলেই মাইকেল উত্তরপুরুষের কাছে প্রাতঃস্মরণীয়, এবং যদি মিলহীনতার দিকে অত্যন্ত বেশি জোর না-দিয়ে তাঁর সহজীবীরা প্রবহমানতার তত্ত্বটা আবিষ্কার করতেন, তাহলে শ্রীযুক্ত অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শ বহুপূর্বেই স্বতঃসিদ্ধ হতো যে এ-ছন্দের যথার্থ নামকরণ অমিত্রাক্ষর নয়, অমিতাক্ষর।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৪১)
কিন্তু রাজেন্দ্রলাল যে-ভুল করেননি, বুদ্ধদেব বসু সেটিই করে বসলেন। তাঁর মনে হয়েছে যে, ‘আসল কথা, বাংলা ভাষার প্রাণের ছন্দের সঙ্গে মাইকেল তাঁর অমিত্রছন্দকে মেলাতে পারেননি, তাই তাতে শুধু আন্দোলন আছে স্বাচ্ছন্দ্য নেই; বেগ আছে প্রবল, কিন্তু গতির অনিবার্যতা নেই; এ যেন নদী নয়, আবর্ত।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৪১)। মাইকেলের কৃতিত্বকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেও বুদ্ধদেব বসু যথার্থই বলতে পেরেছিলেন – ‘আমি ভুলিনি যে মাইকেল পুরোমাত্রায় সচেতন শিল্পী। শুধু যে বাংলা ছন্দে যুক্তবর্ণের পরম রহস্যের তিনি আবিষ্কর্তা তা নয়; বাংলা স্বর-ব্যঞ্জনের ফলদ প্রয়োগ সম্বন্ধেও অবহিত ছিলেন বলেই : ‘আইলা তারাকুন্তলা শশী সহ হাসি/ শর্বরী; বহিল চারি দিকে গন্ধবহ’ তাঁকে তৃপ্ত করতে পারেনি, : ‘আইলা সুচারু তারা, শশী সহ হাসি/ শর্বরী, সুগন্ধবহ বহিলা চৌদিকে’ লিখে তিনি সূক্ষ্মতর ধ্বনিসন্ধানের পরিচয় দিয়েছিলেন। … আর সেইসঙ্গে এ-কথাও আমরা বুঝলাম যে যতিপাতের স্বৈরিতা শ্বাসনালির চমকপ্রদ ব্যায়াম নয়, তার [ছন্দের] আসল কাজ কাব্য-ভাষার সঙ্গে কথ্য-ভাষার ঘটকালি।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৪২-৪৩)
৫
এতো সবাকিছুর পরেও মাইকেলের কৃতিত্বকে স্বীকার করে নিতে রবীন্দ্রনাথের মতো বুদ্ধদেব বসুও ইতস্তত করেছেন। সে-কারণেই হয়তো বলেছিলেন, মাইকেল বিষয়ে ‘সবচেয়ে বড়ো কথা, কাব্যে যে-গুণ তাঁর কখনো বর্তায়নি, সেই স্বাচ্ছন্দ্যকে অর্জন করেছিলেন গদ্য-মহাদেশের দুই বিপরীত সীমান্তপ্রদেশে। প্রহসন দুটির প্রাণপূর্ণ সংলাপ পড়ে যেমন মনে হয় যে পদ্মাবতীর কৃষ্ণকুমারীকে নিয়ে পণ্ডশ্রম না-করে ব্যঙ্গবিদ্রূপের লীলা-খেলায় নামলেই তাঁর প্রতিভার ধর্মরক্ষা হতো।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৪৪)। সেইসঙ্গে তিনি আরো জানিয়েছিলেন, ‘আবার হেক্টর-বধের উদার, গম্ভীর গদ্য পড়ে বলতে লোভ হয় যে দৈবাৎ গদ্যকাহিনীতে হাত দিলে ইনিই হতেন বাংলা উপন্যাসের স্রষ্টা – অন্তত, আদ্যন্ত হোমর অনুবাদ করে উঠতে পারলেও সে-গ্রন্থ যে কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতের মতোই বাঙালির একটি রত্নখনি হতো তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে মাইকেল আমাদের হতভাগ্যতম কবি; ব্যস্ত, উদ্ধত, অব্যবস্থিত উৎসাহে এই প্রায়-প্রৌঢ় যুবক তাঁর সাহিত্যিক তড়িৎ-যুদ্ধ চালিয়েছেন, এক-এক মাসে এক-একটা নতুন দেশ জয় করে চমক লাগিয়েছেন।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ৪৪-৪৫)
৫.২
বুদ্ধদেব বসু খুবই ভুলভাবে মন্তব্য করেছিলেন যে, মধুসূদনের সাহিত্যশক্তির প্রধান অন্তরায় ছিল ‘ভাষাকে আত্মীকরণের অক্ষমতা’। তাঁর ‘মাইকেল’ শীর্ষক প্রবন্ধে আমরা দু-রকম সমালোচক বুদ্ধদেব বসুকে যেন পাচ্ছি। লেখার প্রথম দিকে যিনি মাইকেলের সব কৃতিত্বকে একেবারে খারিজ করে দিয়েছেন, শেষের দিকে এসে একে-একে মাইকেলের কৃতিত্বগুলো চমৎকারভাবে পাঠকের সামনে সাধ্যমতো হাজির করেছিলেন। একজন সহানুভূতিশীল এবং হৃদয়বান সমালোচককেই আমরা বুদ্ধদেব বসুর মধ্যে দেখতে পাই। মাইকেল মধুসূদন সম্পর্কে তিনি যখন এই বলে উপসংহার টানেন যে, ‘তাঁর সাহিত্যিক জীবন বলতে গেলে মাত্রই তো পাঁচ-সাত বছরের। তাই সুধীন্দ্রনাথের সিদ্ধান্ত যদিও স্বীকার্য যে ‘বাঙালি কবিকে তরজাওয়ালার দল থেকে প্রথম অব্যাহতি দিয়েছিলেন তিনিই’ এবং এইখানেই তাঁর ঐতিহাসিক প্রাধান্য।’ তখন মনে বেশ কিছু দ্বিধা থাকা সত্ত্বেও, সেটিকে আমরা খানিকটা অকুণ্ঠভাবে মেনে নিতে পারি।
এখানে বলা রাখা ভালো যে, রবীন্দ্রনাথের মতো বুদ্ধদেব বসুও সমালোচনাকে একটা ‘সাহিত্যকর্ম’ হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর মতে, ‘সমালোচনাকেই সাহিত্য করে তুলতে পারলে মস্ত একটা সুবিধা এই যে পরবর্তী যুগে মতামতগুলি সর্বাংশে গ্রাহ্য যদি না-ও হয়, সাহিত্যরসের প্রলোভনেই পাঠক সেখানে আকর্ষিত হবে, তার মধ্যে সত্য প্রচ্ছন্ন থেকে মনকে নাড়া দেবে সুন্দর, তাই কোনোকালেই তা ব্যর্থ হবে না।’ (বুদ্ধদেব, ১৯৮৪ : ১৩৬)। বুদ্ধদেবের সমালোচনা সেই অর্থে একটি সাহিত্যকর্মের শিল্পময়তারই বিকীর্ণ চেহারা। সে-কারণেই তাঁর মতামতগুলো গ্রাহ্য না-হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো পাঠ করে আমরা সাহিত্যেরই নিবিড় আনন্দ উপভোগ করতে পারি।
৬.
বুদ্ধদেবের সমসাময়িক কবি-প্রাবন্ধিক বিষ্ণু দে’র মনে হয়েছে, মাইকেল যখন বাংলা কবিতায় আলো জ্বালানোর সামর্থ্য অর্জন করেছিলেন, ‘তখন দেখা গেল অন্তরঙ্গ সেই আজন্ম সাযুজ্য, যে উৎসের অমোঘ শক্তি গোটা হিন্দু কলেজ ও তাঁর ফিরিঙ্গি কৈশোর যৌবনকে ভাসিয়ে দিলে, জীবনের বৈপরীত্য সত্ত্বেও কাব্যের মুক্তিতে।’ মাইকেলের সেই অমোঘ শক্তির উৎসটা কোথায়? সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বিষ্ণু দে আমাদের জানিয়েছেন যে, ‘এ শক্তি নিহিত ছিল তাঁর মানসের গভীরতম স্তরে যে স্তরে কবিতার মূল, যার কল্পনাবিহারকে আমরা ভাষান্তরে বলি স্বপ্নজগৎ। আর মাইকেল তা জানতেন, তিনি তাই বন্ধুকে লেখেন যে, তিনি মনে প্রাণে একজন গর্বিত, মিতবাক্, নিঃসঙ্গ, গানে-পাওয়া মানুষ।’ (বিষ্ণু দে, ১৯৬৭ : ৫)
৭.
আমরা স্বীকার করতে বাধ্য যে, কবিতার অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে সত্যের অভিমুখে ক্রমাগত যাওয়া, এই যাওয়াটা তার একটা পরিভ্রমণও বটে। আর সে-কারণেই সম্ভবত কবি শঙ্খ ঘোষ জানিয়েছিলেন যে, ‘সত্যি বলা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই কবিতায়’। (শঙ্খ, ১৯৮৬ : ভূমিকা)। শঙ্খ ঘোষেরও বহু বছর আগে কবি-সমালোচক C. Day-Lewis (১৯০৪-১৯৭২) বলে গিয়েছেন যে, Truth is poetry’s only defence, and true poetry can defend itself.’ আর কবিতার সমালোচনা তো সেই সত্যিটাকেই নানাভাবে উদ্ঘাটন করে। আর সে-কারণেই বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘সমালোচনা বলতে আমি বুঝি উন্মীলন।’
কেমন সেই উন্মীলন? এর উত্তরে বুদ্ধদেব বসু জানিয়েছিলেন, ‘সাহিত্যের বড়ো একটা পটভূমিকায় আলোচ্যকে আলোকিত করে, এবং নিজের উৎসুক চিত্তকে প্রকাশ করে, পাঠকের উদাসীন মনকে জাগ্রত করেন সমালোচক।’ (বুদ্ধদেব, ১৯৮৪ : ১৩৮-১৩৯)। আর সেইসঙ্গে যে-জরুরি কথাটা বলতে বুদ্ধদেব বসু একেবারেই ভোলেননি, সেটি হচ্ছে – ‘এ কাজে উত্তাপ চাই, উৎসাহ চাই, নিন্দার ঠাণ্ডা সংকীর্ণতা দিয়ে তা সাধিত হতে পারে না।’ (বুদ্ধদেব, ১৯৮৪ : ১৩৯)।
৮.
বুদ্ধদেবের সেই শীতল সংকীর্ণতার বাইরে ছিলেন বলেই মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বঙ্কিম তাঁর ‘Bengali LiteratureÕ (The Calcutta Review : 1871) প্রবন্ধে ‘a most prolific writer of poems and plays’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তকে যদিও কালিদাস প্রভৃতি মহান কবিদের সঙ্গে একাসনে বসাতে বঙ্কিম সম্মত হননি, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটিও বলতে দ্বিধা করেননি যে, ‘… his rightful place in Bengali literature is perhaps the highest.’ (বঙ্কিম, ২০১৭ : ১৬৬-১৬৭)। বঙ্কিমের সেদিনের কথা আজো প্রবলভাবেই সত্যি; আর এখানেই মাইকেলের কাব্যসামর্থ্য ও স্বাতন্ত্র্য। তাঁর সমালোচনাকে খানিকটা ভুল পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত বুদ্ধদেব বসুও মাইকেলের সেই স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। আর এভাবেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে তাঁর পর্যালোচনার দুই প্রান্তকে, বুদ্ধদেব বসু, আমাদের সাহিত্য-সমালোচনার একটি বৃহত্তর পরিসরে এনে মিলিয়েছিলেন।
সহায়ক গ্রন্থ ও পত্রিকাপঞ্জি
১. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১৪১৭। বঙ্কিম রচনাবলী : দ্বিতীয় খণ্ড (যোগেশচন্দ্র বাগল-সম্পাদিত), সাহিত্য সংসদ, কলিকাতা।
২. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ২০১৭। বঙ্কিমচন্দ্র রচনাবলী : ষষ্ঠ খণ্ড (সম্পাদকমণ্ডলী : শ্রীমতী শাঁওলী মিত্র গয়রহ), পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা।
৩. বিষ্ণু দে, ১৯৬৭। মাইকেল রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জিজ্ঞাসা, মনীষা গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
৪. বুদ্ধদেব বসু, ১৩৬১। সাহিত্যচর্চা, সিগনেট প্রেস, কলকাতা।
৫. বুদ্ধদেব বসু, ১৯৮৪ (প্রথম প্রকাশ : ১৯৪৬)। কালের পুতুল, নিউএজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা।
৬. বুদ্ধদেব বসু, ১৯৯১ (প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৬)। প্রবন্ধ-সংকলন, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
৭. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৪১৭। রবীন্দ্র রচনাবলী : পঞ্চদশ খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলকাতা।
৮. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৪২১। রবীন্দ্র রচনাবলী : চতুর্দশ খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলকাতা।
৯. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৪২৪ (প্রথম প্রকাশ : ১৩১৯)। জীবনস্মৃতি, বিশ্বভারতী, কলকাতা।
১০. রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ২০২৩। সাহিত্য সমালোচনা সমগ্র (সংকলন ও সম্পাদনা : অরুণকুমার সাঁফুই), পত্রলেখা, কলকাতা।
১১. শঙ্খ ঘোষ, ১৯৮৬ (প্রথম প্রকাশ : ১৯৭০)। শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
১২. সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ১৯৯৫। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধসংগ্রহ (সম্পাদক : অমিয় দেব), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
১৩. C. Day-Lewis, 1947. A Hope for Poetry, Basil Blackwell, Oxford.
১৪. Mark Van Doren, 1962. The Happy Critic and Other Essays, Oliver & Boyd LTD, Edinburgh and London.


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.