লন্ডন থেকে – স্যারাহ্ ড্যুনান্টের উপন্যাস; লন্ডনে বৈশাখি মেলা

‘কালি, কলম, মন, লেখে তিনজন’ – এই আপ্তবাক্যটি মনে পড়ে লিখতে বসলেই, কিছু লেখার কথা চিন্তা করলেই। তবে ওই মনে পড়া পর্যন্তই, লেখার কাজে কালি আর কলমের পাট তো প্রায় উঠেই গেছে আজকের এই কম্পিউটার-প্রযুক্তির যুগে। একমাত্র ব্যাংকের চেক কিংবা অন্য কোনো দলিলপত্র সই করার সময় ছাড়া কলম ধরি আমাদের মধ্যে কজন? অবশ্য আমার মা বেঁচে থাকতে মাঝেসাঝে তাঁর কাছে চিঠি লেখার সময় কলম হাতে নিতে হতো, কিন্তু সেও তো বেশ কয়েক বছর আগের কথা। এখন আমার লেখার টেবিলের কলমদানিতে রাখা গোটা তিনেক কলম চোখে পড়ে রোজই, কিন্তু হাত দিয়ে তাদের ছুঁয়ে দেখিনি সম্প্রতি। কদিন আগে একটি সাময়িক-পত্রিকায় একটি চমৎকার বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। সুন্দর একটা কলমের ছবি, পার্কার কিংবা শেফার্স হবে, তার নিচে ক্যাপশন: ‘দ্য আলটিমেইট ওয়ার্ড প্রসেসর-ইয়োরস ফর লেস দ্যান দ্য প্রাইস অব এ মাউস!’ কথাটি সত্যিই, কলমের কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু বেশির ভাগ লোকের কাছে কলম, বিশেষ করে একটু দামি কলম, এখন যেন অনেকটা কোটের বাটনহোলে গোলাপ ফুল গুঁজে রাখার মতোই, আনুষঙ্গিক সাজগোজের বেশি কিছু নয়।

কালি-কলমের এই বিদায়পর্ব শুরু হয়েছে অনেকদিন আগেই। বেশ কবছর আগে, আমাদের ছেলে রূপক যখন জুনিয়র স্কুল থেকে প্রাইমারি স্কুলে গেছে, তখন ওদের স্কুলে এক প্যারেন্টস ইভনিংয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে ওদের শ্রেণিশিক্ষকের সঙ্গে আলোচনাপ্রসঙ্গে বললাম, ‘পড়াশোনা তো রূপক ভালোই করছে মনে হয়, তবে ওর হাতের লেখা খুবই খারাপ, স্কুলের কি এ-ব্যাপারে কিছু করার নেই?’ মহিলা মৃদু হেসে বললেন, ‘শোনো, তোমাদের ছেলে কলম-পেনসিল দিয়ে আর কতটুকু লিখবে? লেখার জন্য ও তো কম্পিউটারই ব্যবহার করবে, তাই না? কাজেই হাতের লেখা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই, কী-বোর্ড ব্যবহার করতে পারলেই চলবে।’ বাস্তবেও ঠিক তা-ই ঘটছে আজকের যুগে, আমাদের মতো পঞ্চাশোত্তর বয়সের কিছু লোকজনের কথা না ধরলে, আজকালকার কিশোর-যুবক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কালি-কলমের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই বললেই চলে এবং কালি-কলমকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। সম্প্রতি ব্রিটেনের শিক্ষা-কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রক ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কাগজ-কলম-পেনসিল ব্যবহার করে স্কুলস্তরের পরীক্ষার উত্তরপত্র সম্পন্ন করার প্রথার বদলে জাতীয় পর্যায়ে জিসিএসই এবং এ-লেভেল পরীক্ষাগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার স্ক্রিনে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হচ্ছে, হয়ত আর বছর পাঁচেকের মধ্যেই। সুতরাং অদূরভবিষ্যতে পরীক্ষাগ্রহণ-কক্ষের চিরাচরিত ছবিটাই পালটে যাবে, সারি সারি ডেস্কের সামনে মাথা গুঁজে বসে খাতার উপরে কলম চালানোর বদলে পরীক্ষার্থীরা তখন কম্পিউটারের মাউস নাড়িয়ে স্ক্রিনে ভেসে-ওঠা প্রশ্নের পাশের বক্সে কেবল টিক দেবে। শোনা যাচ্ছে, এমনকি বাড়িতে বসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পাঠক্রম অনুসরণ করা যায় কি-না তা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কালক্রমে ব্যাংকের চেক বা অন্যান্য দলিলে সই করতেও আর কলমের দরকার হবে না, ইলেকট্রনিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট কাজ করবে সইয়ের বদলি হিসেবে। সই করার বদলে বোতাম টিপে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করার পদ্ধতি ইতোমধ্যেই নানা জায়গায় চালু হয়ে গেছে।

হলিউডের চলচ্চিত্রশিল্পে ব্রিটিশ লেখকদের কাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সাম্প্রতিককালের ব্যবসায়িক দিক থেকে অত্যন্ত সফল বেশ       কয়েকটি হলিউড-চলচ্চিত্রের কাহিনীকার হলেন ব্রিটিশ, যেমন-ইয়ান ফ্লেমিং (জেমস বন্ড), জে. কে. রাউলিং (হ্যারি পটার), জে. আর. আর. টলকিয়েন (দ্য লর্ড অব দ্য রিংস)। এঁদের সঙ্গে নতুন যে আরেকজনের নাম যুক্ত হতে চলেছে তিনি হলেন স্যারাহ্ ড্যুনান্ট, যাঁর লেখা ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস দ্য বার্থ অব ভিনাস্ আমেরিকার পাঠকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং উপন্যাসটিকে এক বর্ণাঢ্য চলচ্চিত্রে রূপদানের তোড়জোড় চলছে। স্যারাহ্ ড্যুনান্ট কিন্তু লেখক হিসেবে এ-পর্যন্ত খোদ ব্রিটেনেই তেমন পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, এ-দেশের বেস্টসেলার তালিকায় তাঁর নাম আগে কোনোদিনই ওঠেনি। ব্রিটেনে তিনি অধিকতর পরিচিত বিবিসি ২-এর দ্য লেইট শো নামের টেলিভিশন-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত একজন উপস্থাপক ও ভাষ্যকার হিসেবে। নব্বই দশকের গোড়ার দিক থেকে টিভির পর্দায় তাঁকে দেখা গেছে। এতদিন পর্যন্ত আমি নিজেও তাঁকে সেভাবেই চিনতাম, তাঁর কোনো বই-ই আমি আগে পড়িনি, যদিও তিনি কয়েকটা ছোট অপরাধ-কাহিনী লিখেছেন এবং সেগুলো মোটামুটি প্রশংসাও পেয়েছে শুনেছি। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু লন্ডনের একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকায় গ্রন্থ-সমালোচনা লেখে। তার কাছে যেসব বই আসে তাদের একটি-দুটি মাঝে মধ্যে আমাকে পড়তে দেয়। কয়েক সপ্তাহ আগে সে-ই আমাকে এক কপি দ্য বার্থ অব ভিনাস্ দিয়ে বলল, ‘পড়ে দেখো, ভালোই লাগবে। হাইলি ইমপ্রেসিভ।’ পড়ে দেখলাম ঠিকই বলেছে, ঐতিহাসিক পটভূমিতে রোমান্টিক কাহিনী, যদিও বিয়োগান্তক, তার সঙ্গে সে-যুগের রাজনীতি আর ধর্মবিশ্বাসের মিশেল – সব মিলিয়ে ক্ল্যাসিক সাহিত্যের পর্যায়ে হয়ত পড়ে না, তবে অবশ্যই সুখপাঠ্য উপন্যাস এবং তার চেয়েও বড় কথা, কিছুদিন বাদ দিয়ে দ্বিতীয়বারও পড়া যায়। দ্য বার্থ অব ভিনাস্-এর কাহিনীর উপজীব্য হলো পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ অর্ধে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে এক শিল্পীর সঙ্গে একটি পনেরো বছর বয়সী তরুণীর ব্যর্থ প্রেম এবং তাদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের পটভূমিতে প্রতিফলিত সেই সময়ের বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আবহাওয়া।

তাঁর নতুন বইয়ের অপ্রত্যাশিত সাফল্য স্যারাহ্ ড্যুনান্টকে অচিরেই একজন মাল্টি-মিলিওনিয়ার করে তুলবে এটি অবধারিত। বইটি নিউইয়র্ক টাইমস্ পত্রিকার বেস্টসেলার তালিকায় রয়েছে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের নামী পুস্তক-প্রকাশক র‌্যান্ডম হাউজ তাঁকে আরো দুটি বই লেখার বরাত দিয়েছে বিরাট অঙ্কের দক্ষিণার চুক্তিতে এবং হলিউডের দুটি চলচ্চিত্র-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাঁর বইয়ের চলচ্চিত্রায়নের উদ্দেশ্যে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। স্যারাহ্ ড্যুনান্ট নিজেও দ্য বার্থ অব ভিনাস্রে এই অভাবনীয় সাফল্যে চমৎকৃত। তাঁর মতে এর কারণ হলো যে, যুক্তরাষ্ট্রের পাঠকরা আগে তাঁকে চিনতই না আর সেজন্য তাঁর সম্পর্কে তাদের কোনোরকম পূর্বকল্পিত ধারণা ছিল না। অন্যদিকে, ব্রিটিশরা তাঁকে চেনে প্রধানত একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সিরিয়াস উপস্থাপক হিসেবে। আর তাই উপন্যাস-রচয়িতা হিসেবে তাঁকে মেনে নিতে তাদের সময় লাগছে। তবে ব্রিটেনেও এখন দ্য বার্থ অব ভিনাসের বিক্রি ক্রমেই বাড়ছে – গত দুমাসে বইটির পঁচাত্তর হাজার কপি বিক্রি হয়েছে এবং সতেরোটি ভাষায় এর অনুবাদের কাজ চলছে। এখন স্যারাহ্ ড্যুনান্টের প্রধান চিন্তা হলো, তাঁর পরের বইগুলোও দ্য বার্থ অব ভিনাসের সাফল্যের যথার্থ উত্তরসূরি হতে পারবে কি-না।

গত ২৫শে এপ্রিল বাংলাদেশের ওপরে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র দেখতে গিয়েছিলাম পূর্ব লন্ডনের জেনেসিস্ সিনেমায়। ছবিটির পরিচালক হলেন গত বারো বছর যাবৎ জার্মানি-প্রবাসী যুবক শাহীন দিল-রিয়ায, ছবির নাম জীবন জলে-বেলে, ইংরেজিতে স্যান্ড অ্যান্ড ওয়াটার। ধারাভাষ্য ইংরেজি ভাষাতে, সেই সাথে সমস্ত বাংলা কথাবার্তার ইংরেজি সাব-টাইটল্ দেওয়া আছে। ছবিটি ঢাকায় একবার দেখানো হয়েছে শুনলাম, যদিও সেখানকার দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল জানতেপারিনি। তবে সদ্য নিউইয়র্ক-প্রত্যাগত একজনের কাছে শুনলাম, সেখানে ছবিটি দর্শকদের প্রশংসা পেয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ/যমুনা নদীর অববাহিকার নানা জায়গায় যেসব চর জেগে ওঠে, যেগুলো প্রতিবর্ষায় কয়েক মাসের জন্য তলিয়ে যায়, শীতকালে জল সরে গেলে আবার মাথা তোলে, সেইসব চরে ঘর বেঁধে চাষাবাদ করে যেসব লোকজন, সেই চরুয়াদের দৈনন্দিন জীবন, সুখদুঃখ, প্রকৃতির সঙ্গে অন্তরঙ্গ সহবাস এই তথ্যচিত্রের বিষয়বস্তু। চুরাশি মিনিটের এ-ছবি তৈরি করতে শাহীনের সময় লেগেছে এক একবারে দুই-তিন সপ্তাহ করে কয়েক ধাপে বছর দুয়েক এবং ছবিটি ২০০২ ও ২০০৩ সালে কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে।

তথ্যচিত্রটি আমার নিজের খারাপ লাগেনি, তবে খুবই যে ভালো লেগেছে তা-ও নয়। কোনোরকম স্ক্রিপ্ট বা চিত্রনাট্য ছাড়াই ছবিটি তোলায়, বিশেষ করে চরুয়াদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের খণ্ড খণ্ড দৃশ্য বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলায়, পরিচালক অবশ্যই মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন এবং তাঁর আন্তরিকতাও সন্দেহাতীত। কিন্তু কেমন যেন এলোমেলো, অগোছালো। শেষ পর্যন্ত যেন দানা বাঁধেনি, ফলে চরুয়াদের জীবনযাত্রা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি বলে আমার মনে হয়েছে। সম্পাদনার ত্রুটিই কি তার জন্য দায়ী? তাছাড়া শাহীন ঠিক এ-বিষয়টি নিয়েই তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে উদ্যোগী কেন হলেন সেটিও আমার কাছে পরিষ্কার নয়। ওঁর ইনস্পিরেশন কী ছিল? তবে এটি সম্পূর্ণভাবেই আমার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার, ছবিটির বা তার পরিচালকের যোগ্যতার কোনোরকম বিরূপ সমালোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয় একেবারেই। ওই সন্ধ্যায় অন্যান্য যাঁরা জেনেসিস্ সিনেমার প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন তাঁদের অনেকেরই ছবিটি ভালো লেগেছে এবং তাঁদের মধ্যে অন্তত কয়েকজনের মতামতের প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে। হয়ত ত্রুটি আমার নিজেরই, আমিই হয়ত ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গে একাত্মবোধ করতে – রিলেইট করতে – পারিনি।

গত ৯ মে, এটাও একটা রোববার, চলতি বছরের, অর্থাৎ ১৪১১ সালের বৈশাখি মেলা হয়ে গেল লন্ডনে স্থানীয়, প্রধানত পূর্ব লন্ডনের বাঙালিদের উদ্যোগে। প্রতি বছরই মে মাসের এই সময়ে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে বৈশাখি মেলার আয়োজন করা হয়ে আসছে ১৯৯৮ সাল থেকে, অতএব এবার মেলা সপ্তম বছরে পড়ল। প্রথম বছর থেকেই এই মেলা বিলেতের বাঙালিদের মধ্যে তো বটেই, ইংরেজ ও অ-ইংরেজ সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রভূত আগ্রহের সঞ্চার করেছে, প্রত্যেক বছর এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে আর সরকারি কর্তৃপক্ষের অকৃপণ সাহায্য ও সহযোগিতাও রয়েছে এর পেছনে। কেবল লন্ডন নয়, ইংল্যান্ডের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও প্রচুর লোক আসেন মেলা দেখতে, এই দিনটিতে আয়োজিত নানান ধরনের অনুষ্ঠানের শরিক হতে। ল্যুটন, বার্মিংহ্যাম, ম্যানচেস্টার, শেফিল্ড, কার্ডিফের মতো শহর থেকে বাস ভাড়া করে দলে দলে বাঙালিরা যেমন আসেন, তেমনি আরেকটু দূরের ওয়েলস্, স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকা থেকেও আসেন তাঁরা, অনেকেই সপরিবারে। ঢাকা এবং বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেরও যাঁরা গত চার-পাঁচ বছরের মধ্যে বছরের এই সময়টাতে বিলেতে এসে থাকবেন তাঁদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই লন্ডনের বৈশাখি মেলা দেখতে এসেছেন আর বিদেশের মাটিতে স্বদেশের উৎসবে শামিল হয়ে ফিরে গেছেন।

এবারকার মেলা-সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছে সদ্যগঠিত বৈশাখি মেলা ট্রাস্ট, যার মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় শিল্পীদের, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং বাসিন্দাদের প্রতিনিধি। টাওয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিল, করপোরেশন অব লন্ডন, সিটিসাইড রিজেনারেশন, লন্ডন ডেভলপমেন্ট এজেন্সি ও লন্ডন ফায়ার ব্রিগেডের মতো সংস্থাগুলো। সেই সঙ্গে লন্ডন-মেয়রের দপ্তর এবং মেট্রোপলিটান পুলিশ মেলাকে সফল করে তোলার জন্য সক্রিয় সাহায্য করেছে। আগের বছরগুলোতে যাঁরা মেলায় যোগ দিয়েছেন তাঁরা জানেন, মেলার দিন সকালবেলা পূর্ব লন্ডনের অধুনা ‘বাংলাটাউন’ নামে পরিচিত অঞ্চলের অ্যালেন গার্ডেনস্ থেকে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে ব্রিক লেইন ধরে এলাকার চারপাশ পরিক্রমা করে। এই সেই বিখ্যাত ব্রিক্ লেইন, যাকে আজকাল বলা হয় ‘ইউরোপ’স কারি ক্যাপিটাল’, কারণ এখানেই রয়েছে লন্ডন শহরের সবচেয়ে নামকরা বাংলাদেশী রেস্তোরাঁগুলো। মেলা বসে ব্রিক্ লেইন-এর দুধার বরাবর, মেলা চলাকালীন এই রাস্তায় এবং আশেপাশের আরো কয়েকটি রাস্তায়, কোনোরকম যানবাহন-চলাচল নিষিদ্ধ। বেলা বাড়তে বাড়তে       রাস্তায় নামে হাজার হাজার মানুষের ঢল – মেলার উদ্যোক্তাদের হিসেবমতো ৫০ হাজার – রাস্তার দুই ধারে নানা ধরনের পশরায় সাজানো বিপণিগুলোর সামনে জমতে থাকে উৎসুক ক্রেতাদের ভিড়, সাহেব-মেমদের সংখ্যাও তাদের মধ্যে কম নয়। তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় বোধহয় জমেছিল রকমারি মুখরোচক, জিভে-জল-আনা খাবারের দোকানগুলোর সামনে। সবই প্রায় দেশী খাবার, যেমন চট্পটি, পাকোড়া, সিঙাড়া, মশলা মুড়ি, খই, আচার, নানারকমের মিষ্টি, এমনকি বিরিয়ানি, হালিম আর পান-জর্দাও। নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে, ছোট্ট কোলের বাচ্চা থেকে শুরু করে বয়স্করা পর্যন্ত সবাই সন্ধ্যা পর্যন্ত মেলা উপভোগ করেছে প্রাণভরে।

অ্যালেন গার্ডেনসের মূল মঞ্চে পরিবেশিত হয় নাচ-গান-আবৃত্তির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাতে অংশ নেন স্থানীয় জনপ্রিয় শিল্পীরা ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে আগত কুমার বিশ্বজিৎ এবং নিউইয়র্ক-প্রবাসী তাজুল ইসলাম। শেষোক্ত শিল্পীর পরিবেশিত বাউল গান ও বাংলার লোকগীতি সমবেত শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। তাজুল লন্ডনে এসেছিলেন মেলা উপলক্ষে লন্ডন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মূল আসর বসেছিল ব্রিক লেইনের অনতিদূরে অবস্থিত ব্র্যাডি সেন্টারে, যেখানে সারাদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ওই অনুষ্ঠানমঞ্চেও দুপুরে ও সন্ধ্যায় তাজুলের দরাজ গলায় গাওয়া বাউল গান ও লোকগীতি উপস্থিত সকলকে আপ্লুত করে। কয়েক দিন আগে তাজুলের গাওয়া প্রাচীন বাংলা গানের একটা সিডি প্রকাশিত হয়েছে, ব্র্যাডি সেন্টারে সেটাও রাখা ছিল আর সান্ধ্য অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই তার সবগুলো কপি বিক্রি হয়ে যায়। সব মিলিয়ে, অন্যান্য বছরের মতো এ-বছরও লন্ডনের বৈশাখি মেলা প্রবাসী বাঙালির এক সার্থক মিলনোৎসব হিসেবে সকলের মনে ছাপ রেখে যেতে পেরেছে নিঃসন্দেহে।