গবেষক গোলাম মুরশিদের মনীষাদীপ্ত সুকীর্তি

একজন বাঙালি হিসেবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে নিজের অনুরাগের কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী সেই কবে মাঘ ১৩২৫ বঙ্গাব্দে জানিয়েছিলেন, ‘গম্ভীর উদাত্ত সুর বাঙালীর কণ্ঠে, বাঙালীর সুরে গীত না হইলে তাহা কানের ভিতর দিয়া আমাদের মরমে পশিবে না, আমাদের অন্তরের সুপ্ত তন্ত্রীগুলি সেই সুরের তালে তালে বাজিয়া উঠিবে না।’ আর সেই একই প্রসঙ্গের বিস্তার টেনে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বাঙলা আমাদের মাতৃভাষা; অতএব বাঙলা সাহিত্য আমাদের মাতৃসাহিত্য।’ (ওয়াজেদ, ১৯৯০ : ২৮৫)। গবেষক ও প্রাবন্ধিক গোলাম মুরশিদ ছিলেন ওয়াজেদ আলী-কথিত সেই মাতৃসাহিত্যের একজন কীর্তিমান সন্তান, যিনি নিজের সম্পর্কে বলতেন, ‘প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেকে আমি একজন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। দেখিও।’ সবার ক্ষেত্রে না-হলেও গোলাম মুরশিদের বেলায় এটিই ছিলো স্বাভাবিক, কেননা তিনি সেরকমই-একজন হতে চেয়েছেন। গোলাম মুরশিদ এসবের সঙ্গে আরও খানিকটা যোগ করে নিজের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘আমার আরও-একটা পরিচয় আছে – বাংলা আমার মাতৃভাষা এবং সেই সুবাদে আমি ‘বাঙালি’। (মুরশিদ, ২০১৭ : ১১৪)। এইটে নিছক কথার কথা ছিলো না তাঁর কাছে। আমরা দেখবো যে আমৃত্যু তিনি যেসব সাহিত্যকর্ম বা গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তার সবকিছুরই কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে – বাংলা, বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য।

দুই

গোলাম মুরশিদের গবেষণার একটি বড়ো জায়গা জুড়ে আছে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ। এর একটা প্রধান কারণ এই যে, তিনি মনে করতেন, অখণ্ড বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে হলেও ‘ভাষা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের ক্ষেত্রে রেনেসন্স’ ঘটেছিল। আর এর ফলে ‘বঙ্গদেশের সমাজের একাংশে সীমিত অর্থে এবং সীমিত মাত্রায় ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে জাগরণ এসেছিল – সেই জাগরণকে যে-নামেই চিহ্নিত করা হোক না কেন।’ (মুরশিদ, ২০১৭ : ১১৪)। জাগরণের সেই প্রেক্ষাপটে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ‘একইসঙ্গে বাংলার রেনেসন্সের একজন প্রধান কর্মী এবং সেই রেনেসন্সেরই ফসল’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন গোলাম মুরশিদ। তাতে করে অবশ্য অধ্যাপক অমিয় সেনের মূল্যায়নটা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যেখানে তিনি বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘The man himself : a man defined by an undying zeal, a resolute will, and boundless energy, who allowed no degree of adversity or opposition to deter him social goals he had set for himself.’ (Sen, 2021: 6)। এসবের পাশাপাশি বিদ্যাসাগরের দুর্বলতাটুকুও আমাদের দেখিয়ে দিতে পিছপা হননি তিনি। তাঁর মতে, ‘বিদ্যাসাগর এত আধুনিক হওয়া সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে ভারতবর্ষ ও সমকালীন রাজনীতি সম্বন্ধে আশ্চর্য রকমের অসচেতন ছিলেন। এ তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো অসঙ্গতি।’ তিনি আরও মনে করতেন, ‘বিদ্যাসাগরের দৃষ্টি সমাজকে ছাড়িয়ে আর একটু প্রসারিত হয়ে দেশ এবং শাসন ও শোষণের দিকে অগ্রসর হলে তাঁকে অতুলনীয় প্রগতিবাদী বলে আখ্যায়িত করা যেত। দৃষ্টির সেই প্রশস্ততার অভাবে, তিনি শুধু মানবপ্রেমিক ও মানবতাবাদী হয়েই রইলেন। মানুষের মুক্তির সন্ধান দিতে পারলেন না।’ (মুরশিদ, ২০১৬ : ১৬৮-১৬৯)।

আমরা দেখি, শুধু যে বিদ্যাসাগর একা এই সংকটে ভুগেছেন তা নয়, বাংলার বুদ্ধিজীবীদের একটা বড়ো অংশ তাঁদের চারপাশের সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে হয় অজ্ঞ অথবা উদাসীন। এমনকি গোলাম মুরশিদ নিজেও সেই উদাসীনতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারেননি।

তিন

জীবনী রচনার ক্ষেত্রে গোলাম মুরশিদ, বলা যায়, একটা নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন। সেই ধারার সফল উদাহরণ ঊনবিংশ শতাব্দীর উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব কবি মাইকেল মধুসূদনের জীবনী – ‘আশার ছলনে ভুলি’। মাইকেল সম্পর্কে তিনি মনে করতেন, ‘গত দেড়শো বছরে বাংলা সাহিত্যের আকাশে ছোটো-বড়ো অনেক তারকা দেখা দিয়েছেন। নিজের নিজের বৈশিষ্ট্যে তাঁরা সমুজ্জ্বল। কিন্তু ধূমকেতু  দেখা দিয়েছেন একটি মাত্র – মাইকেল মধুসূদন দত্ত।’ তাঁর বক্তব্যকে খানিকটা বিস্তারে নিয়ে গিয়ে মুরশিদ এ-ও বলেছিলেন, ‘তিনি [মাইকেল মধুসূদন দত্ত] যে কেবল ধূমকেতুর মতো অল্প সময়ের জন্যে দেখা দিয়েছিলেন, তাই নয়; তাঁর গতি-প্রকৃতি অন্যদের থেকে আলাদা, কক্ষপথও আলাদা। … তিনি অসাধারণ দীপ্তিতে ভাস্বর ছিলেন।’ আর সে-কারণেই ‘নিজের সেই চোখ-ধাঁধানো জ্যোতি দিয়ে সবাইকে চমক লাগিয়ে অচিরে তিনি হারিয়ে গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব অথবা তাঁর বিস্ময়কর আবির্ভাবের কথা এতো কাল পরেও বাংলা সাহিত্যের পাঠকরা ভুলতে পারেননি।’ (মুরশিদ, ১৯৯৫ : ১৩)। মাইকেলের আচার-আচরণের মধ্যে ‘তীব্র ঔদ্ধত্য, সনাতন মূল্যবোধের প্রতি অবজ্ঞা’ গোলাম মুরশিদ দেখতে পেলেও বিপরীত দিক থেকে প্রাজ্ঞ-প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত [যিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে লেখা মাইকেল মধুসূদন দত্তের ৩৫ খানা মূল চিঠি গোলাম মুরশিদকে ‘ব্যবহার’ করতে দিয়েছিলেন] মাইকেলের ‘অন্তর্জীবনে এক অপ্রমত্ত শান্ত আত্মস্থতার সন্ধান’ পেয়েছিলেন। তাঁর মতে, মধুসূদনের ‘এই অন্তর্মুখিতার প্রকাশ তাঁহার শেষ জীবনের রচনায় চতুর্দশপদী কবিতায়। এ-কাব্যে স্থিরচিত্ত হইয়া তিনি নিজেকে অবলোকন করিতেছেন – জগৎ-ব্যাপারের মর্ম উপলব্ধি করিতেছেন। এ-কাব্যের ভাষার মিতব্যয়িতায় এক সংযত আত্মদর্শী পুরুষের পরিচয়।’ (দাশগুপ্ত, ২০০৭ : ২৬২)। মাইকেলের যাবতীয় রচনাসহ এই চতুর্দশপদী কবিতা ‘modernts first certain, self-aware writer’ হিসেবে মধুসূদনের কৃতিত্বকে ছড়িয়ে দিয়েছে, যা সমালোচকের ভাষায়, Nation building, or a preoccupation with the enhancement of national feeling, was not just incipiently present in the stated intentions of Madhusudan, but was a declared objective. (Chaudhuri, 2014 : 124)। পরিচয়ের সেই সূত্র আমরা ‘আশার ছলনে ভুলি’ গ্রন্থটিতেও নানাভাবে পেয়েছি। তাঁর নিজের এ-গ্রন্থ বিষয়ে গোলাম মুরশিদ বলেছিলেন, ‘আমার মতে তথ্যের থেকেও মূল্যবান যা পেয়েছিলাম, তা হল জীবনী লেখার কৌশল।’ কী সেই কৌশল, বাংলা সাহিত্যে ইতোপূর্বে যার ব্যবহার দেখা যায়নি?
সে-সম্পর্কে বলতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে মুরশিদ আমাদের জানিয়েছেন, ‘জীবনীর প্রধান উপজীব্য হওয়া উচিত, যাঁর জীবনী তাঁকে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসহ জীবন্ত তুলে ধরা। … জীবনীতে কেবল জীবনের ঘটনাবলি থাকলে তাকে সার্থক জীবনী বলা যায় না, স্বভাব এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও ফুটে ওঠা দরকার।’ আরেকটি কথা এখানে বলা দরকার যে, এই জীবনীগ্রন্থ রচনার মাধ্যমে গোলাম মুরশিদ দেখাতে পেরেছেন যে, মাইকেলের ‘প্রায় সমস্ত রচনাই আত্মজৈবনিক। নিজের কথাই পুরাণের আড়ালে পরিবেশন করেছিলেন।’ (মুরশিদ, ২০১৭ : ১২১)। কথাটি যে খুব নতুন তা নয়। কেননা, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত এর বহু আগেই আরও স্পষ্টভাবে বলে গিয়েছিলেন যে ‘ব্যবহারিক ও আত্মিক জীবনের দ্বন্দ্বই’ মাইকেলের কাব্যের উৎস। (দাশগুপ্ত, ২০০৭ : ২৬২)। আর কবি ইয়েটস-এর সৌজন্যে আমাদের কারো কারো জানা আছে যে, ‘A poet writes always of his personal life, in his finest work out of its tragedy, whatever it be, remorse, lost love, or mere loneliness.’  (Yeats, 1961 : 509)। একটা গোটা  জীবনী-গ্রন্থের মাধ্যমে এমন একটি বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করা যে-কারো পক্ষেই পরিশ্রমের কাজ। সেই কাজটি সার্থকভাবে সম্পন্ন করেছিলেন গোলাম মুরশিদ।

চার

মাইকেল নিয়ে ‘আশার ছলনে ভুলি’ গ্রন্থের পাশাপাশি গোলাম মুরশিদের আরেকটি জীবনীগ্রন্থ ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত’-র কথাও কিছুটা বলতে হয়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন নিয়ে একটি বড়ো মাপের কাজ। যে-নজরুল কিনা, বুদ্ধদেব বসুর মতো সমালোচকের ভাষায়, ‘রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা ভাষায় … প্রথম মৌলিক কবি।’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ১৪৫)। যাঁকে নিয়ে বাঙালির আবেগ-উচ্ছ্বাসের কোনো কমতি নেই কিন্তু তাঁর জীবনী-গ্রন্থ রচনার এই কাজটি মাইকেলের জীবনী রচনার চেয়েও কোনো-কোনো ক্ষেত্রে অনেক কঠিন। এর মূল কারণ সম্পর্ক গোলাম মুরশিদ বলেছিলেন, ‘নজরুল ইসলাম সম্পর্কে অপ্রকাশিত দলির-পত্রাদি, বলতে গেলে পাওয়াই যায় না। আর প্রকাশিত বইপত্র থেকে তাঁর জীবনের ঘটনা যতোটা জানা যায়, রটনা জানা যায় তার থেকে ঢের বেশি।’ সেইসঙ্গে তিনি আরও বলেছিলেন যে, এমনতর বানানো কথা এবং শোনা কথা-নির্ভর রচনা কবির মিথ্যে ও বিকৃত ভাবমূর্তি অঙ্কন করে।’ (মুরশিদ, ২০১৮ : ৯)।

তাঁর এই নজরুল-জীবনীর বিশিষ্টতা সম্পর্কে গোলাম মুরশিদ জানিয়েছিলেন, ‘কবি [কাজী নজরুল ইসলাম] ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান ও প্রাণোচ্ছল চরিত্রের মানুষ। তাঁর যেসব “জীবনী” লেখা হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই বীরপূজামূলক এবং অতিরঞ্জিত। এসব বইপত্র তাঁকে স্পষ্ট করে অথবা সঠিকভাবে দেখতে সাহায্য করে না।’ আর সে-কারণেই তিনি ‘এইসব বইপত্রের তথ্যাদি যাচাই-বাছাই করে ব্যবহার’ করেছেন। গোলাম মুরশিদের হাতে নজরুলের যে-জীবনী নির্মিত হয়েছে, সেখানে নজরুলকে দেখানো হয়েছে ‘সদা-পরিবর্তনশীল এক প্রতিভা হিসেবে’, যিনি ‘সীমাবদ্ধতাপূর্ণ একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন।’ (মুরশিদ, ২০১৮ : ৯)

কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে অধ্যাপক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত বলেছিলেন, ‘আমি নজরুলকে এক নিঃস্বার্থী ত্যাগী পুরুষ বলিয়াই জানিয়াছি। নজরুল নিজেকে জানিতেন, নিজেকে চিনিতেন।’ (দাশগুপ্ত, ২০০৭ : ৩১৯)। অন্যদিকে তাঁর জীবনীগ্রন্থে গোলাম মুরশিদ নজরুলের চরিত্রের যে-প্রধান বৈশিষ্ট্যটি উন্মোচন করেছিলেন, সেটি হচ্ছে : কবি ছিলেন ‘ভক্তিবাদী’।
এ-প্রসঙ্গে মুরশিদ বলেছেন, ‘এর সূচনা তাঁর বাল্যকালে। এই ভক্তিবাদের প্রবল বন্যায় কখনো তিনি খড়কুটোর মতো ভেসে গেছেন, কখনো ভক্তিবাদকে অস্বীকার করে বুক ফুলিয়ে বলতে চেয়েছেন, তিনি কোনো অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস করেন না। … তারপর আবার সংকটের নীরন্ধ্র অন্ধকারে তাঁরই শরণ ভিক্ষা করেছেন – কখনো নাত-হামদের সুরে, কখনো কীর্তনের ক্রন্দসী তানে, কখনো শ্যামা-মায়ের চরণে নিজেকে সমর্পণ করে। কিন্তু পূজ্য যিনিই হন, তাঁর ভক্তির ভাষা অভিন্ন।’  সেইসঙ্গে গোলাম মুরশিদ এইটি বলতে ভোলেননি যে, ‘কবি হিসেবে তিনি যেমন অন্য কারও সঙ্গে তুলনীয় নন, ব্যক্তি হিসেবেও তেমনি। তিনি অনন্য।’ (মুরশিদ, ২০১৮ : ৫১৫)।

পাঁচ

নিজেকে অরাজনৈতিক হিসেবে প্রতিপন্ন করবার একটা প্রবল ব্যাপার গোলাম মুরশিদের মধ্যে আমরা নানাভাবে দেখতে পাই। এ-বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘কোনও রাষ্ট্রীয় অথবা রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে আমি চিহ্নিত হতে চাই না।’ এর কারণ সম্পর্কে তাঁর মনোভাব ছিলো এই যে, ‘রাষ্ট্রীয় সীমানা, রাজনৈতিক আদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস-সহ বিভিন্ন মতবাদ মানুষের সঙ্গে মানুষের ভেদের দেওয়াল তুলে দেয়। আমি এসব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে নিজেকে একজন নির্ভেজাল আন্তর্জাতিক মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। দেখতে ভালোবাসি।’ (মুরশিদ, ২০১৭ : ১১৪)। যিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যথেষ্ট পরিমাণে প্রগতিবাদী নন বলে আফসোস করেন; নারীর সচেতন ক্ষমতায়নের কথা বলেন; যিনি বিশ্বাস করেন যে ‘ক্ষমতা কেউ কাউকে দিতে পারে না, ক্ষমতা অর্জন করে নিতে হয়’ সেই তিনিই আবার নিজেকে নিরপেক্ষ, অরাজনৈতিক মানুষ হিসেবে দেখতে পছন্দ করতেন। এখন অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন যে তাতে সমস্যা কোথায়? আমাদের সমাজে এই বি-রাজনীতিকরণের যে সংস্কৃতি রয়েছে, তার কথা যদি বাদও দিই, তবুও বলতে হয় যে গোলাম মুরশিদের এই আচ্ছন্ন চিন্তার প্রভাব পড়েছে তাঁর গবেষণায়। গোলাম মুরশিদ তাঁর ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ গ্রন্থটি বিষয়ে বলেছেন যে, ‘আমার বিশ্বাস, আমি মোটামুটি নিরপেক্ষ বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস লিখেছি এবং এই সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছি।’ (মুরশিদ, ২০১৭ : ১২৬)। শুধু সাক্ষাৎকারেই নয়, এই গ্রন্থের ‘কৈফিয়ৎ’ অংশেও তিনি জানিয়েছিলেন, ‘ঐতিহাসিকেরা হয় হিন্দু বাঙালিদের ইতিহাস লিখেছেন, নয়তো লিখেছেন মুসলমান বাঙালির ইতিহাস-সমগ্র বাঙালির নয়।’ (মুরশিদ, ২০২৩ : ৭)। কিন্তু তাঁর এই পাঠকনন্দিত গবেষণাগ্রন্থটি বাস্তবে এসবের বিপরীত চিত্রেরই সাক্ষ্য দেয়। বাঙালির নিরপেক্ষ ইতিহাস বলি কিংবা এই জাতির নিরপেক্ষ সংস্কৃতিই বলি – সেটি একটি অসম্ভব বিষয়।

ছয়

আজকের এই শ্রেণি-বিভক্ত দুনিয়ায় ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটিই বরং বিভ্রান্তি তৈরি করে, যার শিকার গোলাম মুরশিদ নিজেও। তাঁর গ্রন্থেও এর বহু নজির রয়েছে। একটা উদাহরণ দিই। বাংলার সাম্যবাদী আন্দোলনের নেপথ্যে মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা-সক্রিয়তা-আত্মবিসর্জনের যে-ইতিহাস, তার সবকিছুকেই অস্বীকার করে মুরশিদ লিখেছেন, ‘বস্তুত তিরিশ এবং চল্লিশ দশক থেকে বামপন্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়া একটা প্রশংসনীয় ফ্যাশনে পরিণত হয়। শিক্ষিত সমাজে প্রগতিশীল বলে পরিচিত হতে হলে এখন বিশ্বাস করতে হয় কমবেশি বামপন্থায়। মার্কসের রচনা না-পড়লেও … বিশেষ করে যাঁরা সাহিত্যিক, অধ্যাপক, সাংবাদিক … তাঁদের মধ্যে এই অবস্থান নেওয়ার মনোভাব ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। এঁরা অনেকটা শখের বামপন্থী।’ (মুরশিদ, ২০২৩ : ৫১৪)। এই বক্তব্যের পুরোটাই একপেশে এবং নিরপেক্ষতার নামে গোলাম মুরশিদ মূলত বাংলার বামপন্থীদের মহান ঐতিহ্যকেই অস্বীকার ও অপমান করেছেন। শুধু এই গ্রন্থেই নয়, গোলাম মুরশিদের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর : একটি নির্দলীয় ইতিহাস’ বইটিতেও তাঁর একমুখী চিন্তার প্রভাব মারাত্মকভাবে পড়তে দেখা যায়।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, ‘১৯৭১ হঠাৎ করে আমাদের জীবনে আবির্ভূত হয়নি। সেদিনকার ঘটনাধারার পেছনে ছিল ২৪ বছরের সংগ্রামের ইতিহাস। … আমাদের বস্তুগত অভিজ্ঞতা এই চেতনাকে জাগ্রত ও লালিত করেছিল। এই চেতনার আলোকে বস্তুজগৎকে রূপান্তরিত করার অভিলাষ ব্যক্ত হয়েছিল ছয় দফা ও এগারো দফা কর্মসূচিতে।’ আর সেই সূত্র ধরেই আনিসুজ্জামানের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ‘পূর্ববর্তী চব্বিশ বছরের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রবণতার সঙ্গে সেদিনকার স্বাধীনতার স্পৃহা মিলে বিকাশলাভ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।’ (আনিসুজ্জামান, ২০১৩ : ১১)। আর সেই বিশাল চেতনাকেই কিনা গোলাম মুরশিদ দেখতে চেয়েছেন একটা ক্ষুদ্র নির্দলীয় চেতনায়! এই গবেষণার কাজে তিনি অনেকটাই নির্ভর করেছেন তিনজন ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের উপর – এঁরা হলেন ড. কামাল হোসেন, বীরউত্তম রফিকুল ইসলাম এবং মুজাহিদুল ইসলাম। বাংলাদেশের রাজনীতি-সচেতন যে-কেউ বুঝবেন যে, এই তিনজনই আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে জড়িত। এঁদের কেউই নিরপেক্ষ নন, নির্দলীয় ব্যক্তিত্ব তো ননই। এমনকি একাত্তরের যাঁরা সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরাও সেই অর্থে নিরপেক্ষ ছিলেন না। কেননা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধটাই ছিলো একটি রাজনৈতিক চিন্তার ফসল আর সেই চিন্তাটা ভীষণভাবেই দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিপরীত দিকে তাঁর এই গ্রন্থের ‘ভূমিকা’য় গোলাম মুরশিদ নিজের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘আমি জীবনে কোনো দলীয় রাজনীতিতে অংশ নিইনি। ছাত্রজীবনেও না। আমি কারো তল্পিবাহক নই।’ (মুরশিদ, ২০১৯ : ৮)। গোলাম মুরশিদ একা নন, আমাদের শিক্ষিত শ্রেণির একটা বড়ো অংশ ভুলে যান যে, রাজনীতি বিশাল জগৎটাই বরং আমাদের প্রতি পদে-পদে ‘তল্পিবাহকে’র কাজগুলো করতে বাধা দেয়।

সাত

এসবই একটি মুদ্রার খানিকটা অপর পিঠ। তাতে করে বাংলা সাহিত্যে গোলাম মুরশিদের যে-অবদান, সেসব, কোনোভাবেই মুছে যায় না। বলা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী গ্রন্থদুটি গোলাম মুরশিদকে এমন-এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে, যেখানে অন্য কারো সঙ্গেই তিনি তুলনীয় নন। পাশাপাশি ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালির নবজাগরণ বিষয়ে মুরশিদের তন্নিষ্ঠ গবেষণার কথাও আমাদের বারেবারেই স্মরণ করতে হবে, যে-গবেষণার মূল্যায়ন করতে গিয়ে অধ্যাপক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত বলেছিলেন, ‘গোলাম মুরশিদের আলোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত আমাদের চমৎকৃত করিয়াছে।’ এ-ছাড়াও গোলাম মুরশিদের গভীর জ্ঞান ও উপলব্ধির কথা স্বীকার করেছিলেন অধ্যাপক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত (দাশগুপ্ত, ২০০৭ : ৩৬২)। একজন পরিশ্রমী গবেষক হিসেবে এখানেই তাঁর সামর্থ্য, স্বকীয়তা এবং স্বীকৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর বৈচিত্র্যময় গবেষণার মধ্যে দিয়ে, আমাদের সাংস্কৃতিক জগতে, গোলাম মুরশিদ একজন মনীষাদীপ্ত ব্যক্তিত্ব হিসেবে মর্যাদা পাবেন।

সহায়কপঞ্জি

১.         আনিসুজ্জামান, ২০১৩। মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর (প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৯), আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

২.         গোলাম মুরশিদ, ১৯৯৫। আশার ছলনে ভুলি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

৩.         গোলাম মুরশিদ (সম্পাদনা), ২০১৬। বিদ্যসাগর (প্রথম প্রকাশ : ১৯৭০। প্রথম শোভা প্রকাশ সংস্করণ : ২০১১), শোভা প্রকাশ, ঢাকা।

৪.         গোলাম মুরশিদ, ২০১৭। বইয়ের দেশ (জানুয়ারি-মার্চ ২০১৭), (সম্পাদক : হর্ষ দত্ত), কলকাতা।

৫.         গোলাম মুরশিদ, ২০১৮। বিদ্রোহী রণক্লান্ত : নজরুল জীবনী, প্রথমা, ঢাকা।

৬.         গোলাম মুরশিদ, ২০১৯। মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর : একটি নির্দলীয় ইতিহাস (প্রথম প্রকাশ : ২০১০), প্রথমা, ঢাকা।

৭.         গোলাম মুরশিদ, ২০২৩। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি (প্রথম প্রকাশ : ২০০৬), অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা।

৮.         বুদ্ধদেব বসু, ১৩৬১। সাহিত্যচর্চা, সিগনেট প্রেস, কলকাতা।

৯.         মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ১৯৯০। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী রচনাবলী : প্রথম খণ্ড (সম্পাদনা : আবদুল মান্নান সৈয়দ), বাংলা একাডেমি। ঢাকা।

১০.       রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত, ২০০৭। প্রবন্ধসংগ্রহ, এবং মুশায়েরা, কলকাতা।

১১.       Amiya P. Sen, 2021. Vidyasagar : Reflections on   a Notable Life, Hyderabad, Telengana.

১২.       Rosinka Chaudhury, 2014. The Literay Thing, Oxford University Press, New Delhi.

১৩.       W. B. Yeats, 1961. Essays and Introductions, Macmillan & Company Limited, London.