আমাদের চিত্রকলা জগতে বেশ কিছুদিন ধরেই মনসুর উল করিমের সৃষ্টিকর্ম একটি বিশেষ ঘরানা ও রুচির মানসম্পন্ন উদাহরণ হিসেবে একটি পাকাপোক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। তাঁর একক প্রদর্শনী আগ্রহী দর্শক ও রসজ্ঞমহলে বিশেষ ঔৎসুক্য ও কৌতূহল জাগিয়ে থাকে, নবীন শিল্পপ্রয়াসীদের অনেকের কাজেই তাঁর শিল্পধারার নানান টুকরো-টাকরা প্রভাব সহজেই দেখা যেতে পারে। তবে রাজধানীর বাইরে অবস্থান এবং স্বভাবে নির্জনতাপিয়াসী হওয়ায় সাধারণভাবে আমাদের শিল্পবাজারে তিনি তেমন বিজ্ঞাপিত নন। তবু রাজধানীতে তাঁর একক প্রদর্শনী চিত্রকলার ঐকান্তিক অনুরাগীদের জন্যে বিশেষ আকর্ষণের বিষয় বটে।
প্রায় পাঁচ বছরের বিরতিতে অনুষ্ঠিত তাঁর সাম্প্রতিকতম একক প্রদর্শনীটি সংখ্যার গণনায় দ্বাদশতম, শিল্পীর তিরিশাধিক বছরের অভিজ্ঞতা ও সাধনার পরিপক্বতা দ্বারাজারিত বলে মানতে হবে। এবারের প্রদর্শনীর বিশেষ লক্ষণ মনসুর উল করিমের সচেতন পরিবর্তন-প্রয়াস, সংবেদনশীল ও বিবর্তনকামী সৃজনশিল্পী মাত্রেই নিজেকে চলিষ্ণু রাখতে প্রয়াসী হবেন, বিবর্তিত হতে চাইবেন-এটিই প্রত্যাশিত। মনসুর উল করিম বিবিধ শিল্পধারায় বিচরণশেষে নিজের একান্ত একটি ভাষা নির্মাণ করে নিতে পেরেছিলেন, যেটি বিগত বছর দশেক ধরে তাঁর চিহ্নমতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে জায়গা থেকে, পুরোপুরি না হলেও, সরে আসার বা খানিকটা ভিন্ন চিত্রভাষায় কথা বলার পরিকল্পিত একটি প্রয়াস এ প্রদর্শনীতে চিত্রকলা-জগতের অনুরাগী দর্শকের নজরে আসবে। মনসুর উল করিম চিত্রকলার ছাত্র এবং চর্চাকারী হিসেবে গত শতাব্দীর যাবতীয় প্রধান শিল্পধারার প্রায় সবগুলোকেই কোনো না কোনো সময় তাঁর অনুসন্ধান বা নিরীক্ষায় ব্যবহার করে দেখেছেন, ধীরে-সুস্থে প্রভাবকে আত্মস্থ করে পছন্দমতো রাস্তায় এগিয়েছেন। এই অন্বেষণে অবশ্য তাঁর শিক্ষক রশিদ চৌধুরীর একটি প্রলম্বিত ছায়া নেপথ্যে ক্রিয়াশীল থেকেছে।
সার্বক্ষণিক শিল্পী বলতে যা বোঝায়, আমাদের দেশে তেমন উদাহরণ কমই দেখা যাবে। অধিকাংশ শিল্পী সাধারণত কোনো একটি উপলক্ষ, শিল্পযজ্ঞ বা ব্যক্তিগত প্রদর্শনীর
কাছাকাছি সময়েই শিল্পসৃষ্টিতে উঠেপড়ে লেগে যান। সার্বক্ষণিক বলতে সারাক্ষণই কর্মতৎপর থাকতে হবে এমন নয়, তবে অনুশীলন ও ভাবনের একটি আবহের মধ্যে বিরাজমান থাকাকে বোঝায়, যা শিল্পীকে যোগায় সৃজনের পরিপুষ্টি। মনসুর উল করিম এরকম সার্বক্ষণিক শিল্পীর একজন উপযুক্ত উদাহরণ। ক্রিয়াশীলতার এই ধারাবাহিকতা শিল্পীকে যেমন দিতে পারে কারুকৃতির পারঙ্গমতা তেমনই আঙ্গিকের নৈপুণ্য ও উপস্থাপনের কুশলতা। মনসুর উল করিম এ কৃতি ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছেন বলা চলে। চিত্রের দ্বিমাত্রিক দৃষ্টগুণ মাত্রা পায় যে বিশেষ তলনির্মাণকৌশলে তা তিনি রেখা-বর্ণ-বুনট-তক্ষণের জমাটি প্রয়োগে, পরিসরের পূর্ণতা ও শূন্যতার পরিপূরক ব্যবহারে সার্থকভাবেই নির্মাণ করতে জানেন।
যেমনটি আগে বলা হয়েছে, তাঁর শিল্পপ্রয়াস একটি পূর্ণতার অবয়ব অর্জন করে বছর দশেক আগে এবং এর স্বীকৃতি আসে ’৯৩-৯৪ সালে পরপর এশীয় দ্বিবার্ষিকে সেরা পুরস্কার, দিল্লিতে ত্রিবার্ষিক আন্তর্জাতিকে অন্যতম শ্রেষ্ঠের সম্মান এবং জাতীয় পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে। এ সময়ে তাঁর কাজে ন্যূনতম উপাদানের মাধ্যমে পরিসরের পরিমিত ব্যবহার এক উচ্চমাত্রায় সংস্থিত হয় যা চিত্র-দর্শনের এক সংবেদী আস্বাদন নিয়ে আসে। তবু, বলা চলে, তাঁর শিল্পসৃষ্টি এক ধরনের সংকট থেকে কখনোই পুরোপুরি উত্তরণ লাভ করেনি। সে-সংকটটিকে হয়তো চিহ্নিত করা যেতে পারে বক্তব্য বা বিষয় নির্ধারণের সমস্যা হিসেবে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে মনসুর উল করিম ও তাঁর সমসাময়িকরা বিমূর্ততার একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে বেরিয়ে এসে মানুষী অবয়বকে অবলম্বন করে স্থান ও কালসচেতন এক ভিন্নস্বাদের চিত্ররচনা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তবে তাঁদের সে সচেতনতাও অনেকটাই আচ্ছন্ন ছিল সদ্য-স্বাধীন দেশের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক ঐতিহ্যিক আবেগ ও রোমান্টিক উচ্ছ্বাসে। মনসুর উল করিম ক্ষান্তিহীন ক্রিয়াশীলতা ও উদ্যমের সমন্বয় ঘটিয়ে বহুবিধ নিরীক্ষার মাধ্যমে একটি নিজস্ব চিত্রভাষা রচনা করতে সক্ষম হলেও অন্যরা তেমন বিবর্তিত হতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। বস্তুত তাঁর সমসাময়িকদের প্রায় কেউই আজ আর সমকালের প্রেক্ষাপটে তেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করেন না, মনসুর উল করিম করেন তাঁর দৃষ্টিগ্রাহ্যতার শক্তিতে। তবে তাঁর সে রোমান্টিক মননের বাইরে চেষ্টা করেও তিনি বেরুতে পারেন না। সংক্ষুব্ধ কালের আর্তি ও ক্ষরণ, বিশ্লিষ্ট ও বিপন্ন মানুষের ক্লিষ্টতাকে দর্শকের চৈতন্যে বিদ্ধ করার সমকালীন চিত্রভাষা তাঁর অধিগত নয়, হয়তো মনমতোও নয়। ফলে, সচেতনপ্রয়াস সত্ত্বেও তাঁর সৃষ্টিতে দৃষ্টিসুখের এক ধরনের ঘোর লেগে থাকে, যা মনকে মজিয়ে ফেলে, তাকে বিদ্ধ করে না বা অস্বস্তিতে ফেলে না। মানুষী কায়া তাঁর প্রধান প্রণোদনা হওয়া সত্ত্বেও এবং তাদের অবয়বের নানান বাস্তব-অতিক্রমী বিন্যাস, ভাঙচুর, ছায়াছায়া প্রহেলিকাময় উপস্থাপনও স্পষ্ট কোনো ভিন্নতর মাত্রা আনে না, প্রকৃতি ও মানব-সম্পর্কের এক রহস্যঘেরা, কিছুটা বা টানাপোড়েনময়, নান্দনিক জগতে বিচরণ করায় কেবল।
তাঁর শিল্পের এ ঊণতা বিষয়ে মনে হয় মনসুর উল করিম পুরোপুরি সচেতন, তাঁর মতো সৃষ্টিশীলতায় নিমগ্ন শিল্পীর পক্ষে যা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং একটি প্রতিষ্ঠিত শৈলীর মধ্যে বিচরণের স্বস্তি ছেড়ে অনিশ্চিত নিরীক্ষার ঝুঁকি নেওয়ার মধ্যেই তাঁর অতৃপ্তি ও এগোবার প্রবল আকাক্সক্ষাকে অনুভব করা যায়, যেটি অবশ্যই একটি ব্যতিক্রমি ও অভিনন্দনযোগ্য উদাহরণ। বেঙ্গল গ্যালারিতে আয়োজিত তাঁর চলমান প্রদর্শনী যেন একটি প্রশ্নবোধকচিহ্ন রূপেই ঘোষণা করে আপন উপস্থিতি – কোন দিকে এগোবেন শিল্পী এবার? এ প্রদর্শনীকে একজন নিবেদিত শিল্পীর নিজেকে পুনরাবিষ্কারের রক্তক্ষরিত ও দ্বিধান্বিত অনুসন্ধান হিসেবে হয়তো দেখা যেতে পারে। দ্বিধান্বিত কেন? কারণ, প্রদর্শনীর পঞ্চাশটির মতো চিত্রকর্মে তাঁর মানসিক অনিশ্চিতি ঘুরে-ফিরে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। মাঠ-ফসল-কিষান-কিষানীর মায়াবী আলো-আঁধারির গল্প ছেড়ে তিনি এসব কাজে আধুনিক ও নাগরিক মানুষের বিখ-িত সত্তা, তার বিচ্ছিন্নতার গুরুভার, বিশেষ করে নারীর বিশ্লিষ্ট দ্বৈততার পীড়িত-অস্তিত্বকে চিত্রভাষা দেওয়ার কথা ভেবেছেন। তাঁর স্বভাবসুলভ উপস্থাপনের অনেক উপাদানই এসব ছবিতে প্রবলভাবেই বিরাজমান, তবে মানুষী অবয়ব, বিশেষ করে নারীর শরীরকে রূপদানের জন্য তিনি ফিরে গেছেন অধিকতর বাস্তবধর্মীতায়, যে বাস্তবমুখীনতা কেড়ে নিয়েছে এদের রূপকাশ্রিত রহস্যময়তা, মানসের দুর্জ্ঞেয়তা। এরা কান্তিময়, তবে নব্যবঙ্গীয় ঘরানার লীলায়িত রেখার ঢঙে বড়ই স্পষ্ট-চিহ্নিত, এলায়িত, ব্যক্তিত্বের দীপ্তিহীন। তাঁর ভাঙাভাঙা-খোদিত রেখার শক্তিমান প্রকাশক্ষমতার বিপরীতে এই প্রবহমান ছন্দিত রেখা, যা কোথাও কোথাও আশ্চর্যজনকভাবে দুর্বলও, যেমন – ‘ভার্জিন ইন ব্ল্যাক লাইনস’ চিত্রে – কেন তিনি নির্বাচন করলেন সেখানেই হয়তো তাঁর চিন্তার অনিশ্চিতির সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
আসলে মনসুর উল করিমের মানসজগত প্রকৃতি ও মানবের মায়াবী সম্পর্কের এক আবহমান রোমান্টিক বিভঙ্গরূপের মায়াডোরে বাঁধা। যতই তিনি সমকালের অবক্ষয় ও ভাঙনের কথা বলতে চান না কেন, শেষ পর্যন্ত তা সবই রোমান্টিক ব্যঞ্জনায় নিষিক্ত হয়ে আর্দ্র ও কমনীয় হয়ে ওঠে। তাই শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরে যান স্বস্থানে, সাম্প্রতিকতম প্রদর্শনীতেও ‘ষড়ঋতু’র মতো বহু ব্যবহারে জীর্ণ ও গতানুগতিক বিষয় নিয়ে ‘সিরিজ’ আঁকেন। সম্ভবত তরুণ শিল্পীগোষ্ঠীর হাতে বর্তমানে ভিন্নতর শিল্পভাবনা ও চিত্রভাষা তাঁকে ভাবিত করে থাকবে, অনুপ্রাণিতও করে থাকতে পারে। ফলত, আপন মর্মস্থল ও সমকালের দাবির এই দ্বান্দ্বিক সংঘাত মনসুর উল করিমকে টেনে নিয়ে যায় এক অনিশ্চিত যাত্রায়, এমনকি তাঁর চিত্রের সংহতিগুণকেও কি খানিকটা নষ্ট করে দিয়ে যায়? ক্যাটালগে মুদ্রিত ‘এইম্লেস’ চিত্রটির মতোই তাঁর কিছু কিছু কাজকে লক্ষ্যহীন ও অবিন্যস্ত মনে হয়। এর মানে এ নয় যে, এ প্রদর্শনী থেকে পাওয়ার কিছুই নেই। মনসুর উল করিমের চিত্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শক্তি এর দর্শনযোগ্যতা। চিত্রতলকে সম্পন্ন-সমৃদ্ধ করে উপস্থাপনে তাঁর জুড়ি মেলা ভার, পরিসরের বুদ্ধিদীপ্ত বিন্যাস তাঁর ছবিকে দেয় স্বল্পতার মধ্যে পূর্ণতার নিটোলতা, বর্ণ-ছায়-বুনটের নান্দনিক কারিকুরি আনে অভিব্যক্তির হার্দিক দ্যোতনা। উপকরণ ব্যবহারে তাঁর পারঙ্গমতা তরুণতর শিল্পীদের জন্যে শিক্ষণীয় হতে পারে। সর্বোপরি সমস্ত আয়োজনকে একটি সূত্রে গ্রথিত করে সার্থক শিল্পের রূপ নির্মাণের দুর্লভ ক্ষমতা রয়েছে তাঁর, যেটি আমাদের খুব বেশি শিল্পীর আয়ত্তে রয়েছে বলে মনে হয় না। এ প্রদর্শনী হয়তো মনসুর উল করিমের ক্রান্তিলগ্নের অনিশ্চিত স্বাক্ষর, তবু এ যে একজন বড়মাপের শিল্পীর ভাবনার ফসল তা অনুধাবন করতে ভুল হয় না। দর্শকের জন্য এ-ও কম প্রাপ্তি নয়।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.