কোয়াং ইল রিউ-র চিত্রকর্ম : তাঁর জীবন-জিজ্ঞাসা

‘কোথায় চলেছ তুমি?’- একপাশে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে রিকশা এগিয়ে চলেছে, অন্যপাশে নক্ষত্ররাশি আর ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় আছে ঘাসে আবৃত পাথরের টেবিলের ওপর গোলাপি জবার টব, ঘড়ি ও জুতো। কোয়াং ইল রিউ-র প্রদর্শনীতে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়বে এ ছবিটি। এমনি ধারার নিত্যদিনকার নানান বস্তু-সামগ্রীকে বারবার তাঁর শিল্পকর্মে উপস্থাপিত করেন তিনি। খানিকটা স্টিল লাইফ খানিকটা স্যুরিয়ালিস্টিক ঢঙে।

দক্ষিণ কোরীয় শিল্পী কোয়াং ইল রিউ। বছর চারেক ধরে বাংলাদেশে আছেন। গত ১৮ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হলো শিল্পকলা একাডেমীর গ্যালারিতে। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সত্তরটির মতো চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।

 কোরীয় ঐতিহ্যিক মাধ্যমে কাজ করেন শিল্পী রিউ। বিভিন্ন রঙের পাথরের গুঁড়ো আঠার সঙ্গে মিশিয়ে রং তৈরি হয় (ইদানীং অবশ্য কৃত্রিম গুঁড়োও ব্যবহৃত হচ্ছে)। এরপর পানি ব্যবহার করে রঙকে ইচ্ছেমতো গাঢ়-পাতলা বা স্বচ্ছ-অস্বচ্ছ সবরকমভাবেই ব্যবহার করা হয়। তেল রং বা অ্যাক্রিলিকের তুলনায় এর ব্যবহার-পদ্ধতি অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ। মূলত এ মাধ্যমটির উৎপত্তি ও

ব্যবহার শুরু হয় চীন দেশে।

বাংলাদেশে এটি শিল্পী রিউ-র দ্বিতীয় প্রদর্শনী। গত প্রদর্শনীর তুলনায় এ প্রদর্শনীতে মাধ্যমগত বা বিষয়বস্তুগত তেমন বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ না করা গেলেও শিল্পী তাঁর বিষয়ভাবনায় স্থির থেকেও আনুষঙ্গিক সংযোজন-বিয়োজন ঘটাতে সচেষ্ট হয়েছেন, তা স্পষ্ট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালে খ্রিষ্টধর্মের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। ক্রমান্বয়ে তার চিত্রকর্মে এর প্রভাব স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকে। শিল্পীর চিত্রকর্মে তাই ঘুরে-ফিরে উপস্থাপিত হতে থাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এই নশ^র জীবন এবং একই সাথে সিউল-এর মতো ব্যস্ত নগরীতে বাস করা নাগরিক জীবনের প্রতিচ্ছবি। জন্ম-জীবন-মৃত্যুর ভাবনার প্রতিফলনই তাঁর চিত্রকর্ম। তাঁর শিল্পকর্মের সিংহভাগ জুড়েই তাঁর জীবন-জিজ্ঞাসা নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। জন্ম-মৃত্যুর ভাবনাকে অসংখ্য প্রতীকের সাহায্যে তুলে ধরেছেন তিনি। শুরুর দিকে জীবন-বৃক্ষ, পরবর্তীতে ক্ষণস্থায়ী ভ্যানডিলাইঅ্যান ফুল, জবাফুল, প্রজাপতি ইত্যাদি। জীবন ও কর্মের প্রতীক হিসেবে পাথরের টেবিল ও ঘড়িকে ব্যবহার করেছেন।

তাঁর চিত্রকর্মে স্থান পেয়েছে প্রতিদিনকার পরিচিত পরিবেশ। তবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শিল্পী এ পরিবেশকে অবলীলায় যুক্ত করেন অসীম আকাশের সাথে। শুরুর দিকে এ আকাশকে এঁকেছেন তারকাখচিত গভীর নীল আর ইদানীংকার আকাশ হয়ে উঠেছে মেঘের হালকা চাদর পরা সুন্দরবন অথবা ঢাকার আকাশ। পরিচিত জগতকে সুদূর আকাশের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত করে তিনি আশার বাণী শোনাতে চান। সে-কারণেই হয়তো মসলা- পেষা বাঙালি রমণীর বেদনাকে ঘিরে থাকে নেমে আসা নক্ষত্ররাশি আর প্রজাপতি ও  ফুলেরা।

অত্যন্ত নিখুঁত তুলি চালনায় পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেলে কাজ করেন রিউ। সমান যতেœ ক্যানভাসের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত প্রলেপের পর প্রলেপ রং সংযোজন করেন তিনি। ঐতিহ্যিক মাধ্যমের ব্যবহার করলেও বিষয়ের প্রয়োজনে কাগজের বদলে অন্য কোনো জমিন যেমন, কর্ক ইত্যাদি অথবা কোলাজের ব্যবহার তিনি করে থাকেন। তাঁর এবারকার প্রদর্শনীতে কাগজের হাতপাখার সংযোজন চোখে পড়ে। ‘সুন্দরবন’ ও ‘পরিমিত সময়’ সিরিজে হাতপাখার আকৃতিকে পৃথিবীর দ্বার হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। আবার ‘ধ্যান’ ও ‘বাসা’ সিরিজে একই সাথে দুটো পাখার কোলাজও পৃথিবীর গোলাকার আদলকেই তুলে ধরেছেন।

শিল্পী কোয়াং ইল রিউ তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনাকে অত্যন্ত আন্তরিকতায় তাঁর দেশীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পমাধ্যমে আধুনিকতার     সংমিশ্রণে সাবলীলভাবে উপস্থাপিত করেন তাঁর চিত্রকর্মে। শিল্পীর নিজের ভাষায় তাঁর প্রতিটি চিত্রকর্ম তাঁর প্রতিদিনকার ধ্যানেরই অংশবিশেষ।