ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’

প্রাকৃতিক উপাদানকে গড়ে-পিটে রূপান্তর ঘটিয়ে আমাদের অনুভূতিকে নাড়া দেয় যে ত্রি-মাত্রিক শিল্প, সেটিই ভাস্কর্য। সেই আদিকালে মানুষ তার জীবিকা নির্বাহের জন্যে পশু শিকার করতো পাথর ঘষে বানানো ধারালো অস্ত্র দিয়ে – সেগুলোই তো আদি ভাস্কর্যের অবয়ব। কিংবা তারও আগে – প্রকৃতিই এক স্বয়ম্ভু ভাস্কর! প্রাকৃতিক উলট-পালটে বনভূমি চাপা পড়েছে মাটির নিচে। শত সহস্র বছরের ক্ষয়ে মাটিবন্দি বৃক্ষের রূপ পরিবর্তিত হয়েছে, ঝড়-বৃষ্টি-বাদলে ঊষর পাথরের বুক-পিঠে তৈরি হয়েছে আশ্চর্যজনক নানা ফর্ম। এগুলোও তো প্রাকৃতিক ভাস্কর্য, যেনো পাথরের বুকে ফোটা ফুল!

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী এমনই এক প্রাকৃতিক ভাস্কর এই আধুনিককালে; যিনি প্রকৃতির অসীম সৃজনকে উপলব্ধি করেই নিজের সৃজনশীলতাকে আবিষ্কার করেছেন। নারীর মাতৃত্ববোধই তো তাঁর সৃজনশীলতার আধার। সন্তানধারণ, প্রতিপালনে যেমন স্বাভাবিক জীবনপ্রক্রিয়া আছে, তেমনি সৃষ্টিশীল মননও সেখানে কার্যকর থাকে। তবে, তাকে উপলব্ধি করতে হয়, খুঁজে পেতে নিতে হয়। ফেরদৌসী এই বিষয়টি বুঝেছেন তাঁর চারপাশের সাংস্কৃতিক পরিম-লের প্রসাদগুণে।

তিনি একজন প্রেমময়ী স্ত্রী, সন্তানবাৎসল্যে ভরা মমতাময়ী মা। মাতৃত্বের মমতা দিয়ে ভাস্করের অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে তিনি তাকান পরিত্যক্ত বৃক্ষের ডাল ও শেকড়ের দিকে। প্রকৃতিজাত শেকড়-বাকড়ের মজার মজার ফর্ম তাঁকে আলোড়িত করে। তিনি সেগুলো উলটে-পালটে দেখে নানা প্রাণী, পাখি বা মানব অবয়বের মিল খুঁজে পেয়ে, সেই গড়নকে সযতেœ কেটে-কুটে গড়ে-পিটে আরো সন্বিষ্ট রূপ দেন। আমরা বিমোহিত হই প্রাকৃতিক উপাদানের পরিচর্যিত এসব ভাস্কর্য দেখে।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ ২০০৪ পর্যন্ত ঢাকার ধানমন্ডিতে সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গনে চলেছে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ শীর্ষক একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী। গ্যালারির পাঁচটি কক্ষ জুড়ে প্রায় অর্ধশত কাজ সাজানো হয়েছিল। মেঝের উপর রাখা ভাস্কর্যের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দেয়ালে দেয়ালে ফ্রেম-আবদ্ধ রিলিফ আকারের ভাস্কর্যের কয়েকটি নতুন ধরনের কাজ দেখা গেছে। এই কাজগুলোসহ অন্যান্য ভাস্কর্যের ডিসপ্লেতে বৈচিত্র্য এসেছে।

পরিত্যক্ত ডালপালা ও কর্তিত বৃক্ষের শেকড়-বাকড়ের চরিত্র প্রায় অক্ষুণœ রেখেই কিছু ঘষে-মেজে ভাস্কর্য অবয়ব গড়েন তিনি। অপ্রচলিত উপাদান প্রয়োগ করে শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কুটুম কাটাম’ শীর্ষক ভাস্কর্যের রূপ তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে জগৎবিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসোর সাইকেলের হ্যান্ডেল দিয়ে হরিণ অবয়ব কিংবা ষাঁড় ভাস্কর্যের কথা। উপমহাদেশের বিখ্যাত ভাস্কর রামকিংকর বেইজ, সোমনাথ হোড় ও শর্বরী রায় চৌধুরীর কাজ তাঁকে মুগ্ধতায় আবিষ্ট করেছে। অনেকটা না জেনেই যেন তিনি রামকিংকর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

শিল্পী এস এম সুলতানের অনুপ্রেরণায় ১৯৯০ সালে যশোরের চারুপীঠ আয়োজন করে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনীর। এর মাধ্যমে তাঁর  শিল্পচর্চা

বেগবান হয় ও নতুন একটি পর্যায়ে উপনীত হয়। তারপর এই দেড় দশকে তিনি অনেক পরিণত, অনেক সংহত। বাংলাদেশের চারুশিল্পে অপরিহার্য ও স্বকীয় একটা অবস্থান গড়ে উঠেছে তাঁর। কৃতী ভাস্কর পিলু পোচখানওয়ালা ও দাবিয়েলওয়ালার মতো শিল্পকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি আধুনিক ভাস্কর্যের মূল সুরটি উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছেন।

চারুশিল্পের বৃহৎ পরিসরে তাঁর প্রবেশ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। প্রকৃতির কোলে মধুর পরিবেশে যেমন তিনি লালিত হয়েছেন, তেমনি বাস্তবের রূঢ় কশাঘাত তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। পিতার রূঢ় আচরণ, মায়ের অসম্মানিত জীবনের পীড়ন তাঁকে দগ্ধ করেছে। এর বিপরীতে নানাবাড়ির সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিম-ল তাঁকে প্রভাবিত করেছে। প্রিয়ভাষিণী নামটি তাঁর মাতামহের দেয়া। কঠিন কষ্ট ও দুঃখকে তিনি জয় করে আত্মসম্মানবোধে অনমনীয় হয়ে উঠেছেন। তিনি মনে করেন- মানবচর্চা ছাড়া শিল্পী হয়ে ওঠা যায় না। দুঃখ-কষ্টের কষ্টিপাথরেই প্রকৃত মানুষকে যাচাই করা যায়। আর সত্যিকার শিল্পী হতে হলে প্রথমে তাঁকে ভালো মানুষ হতে হয়।

স্বামীর চাকরির সুবাদে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন তিনি। নানা পরিবেশ, নানা রকম মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তাঁকে নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। গাছের শেকড়-বাকড় সংগ্রহ করে তা দিয়ে ঘর সাজাতে সাজাতে তাঁর সুপ্ত শিল্পচৈতন্যের বিকাশ ঘটে। তাঁর উদ্ভাবনী গৃহসজ্জার শৈল্পিক সৌকর্যে বিমোহিত হন অনেকেই। তাঁর শুভার্থী ওমর ফারুক ও ওয়ালিউল ইসলাম তাঁর এই শৈল্পিক গুণাবলিকে সাধারণ্যে প্রকাশের অনুপ্রেরণা দেন। প্রায় তিন দশক আগে থেকে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী তাঁর শিল্পের নানা উপাদান সংগ্রহ শুরু করেন। নিজের অন্তর্দৃষ্টির অবলোকনে প্রাকৃতিক ফর্মকে তিনি নানা অবয়বে উপস্থাপন করে ক্রমান্বয়ে পরিণত হয়েছেন আমাদের ভাস্কর্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে।

তাঁর গড়া ভাস্কর্য অবয়বগুলো আমাদের চারপাশের পরিবেশ ও প্রকৃতিতেই বিচরণ করে। নারী তাঁর ভাস্কর্যের একটি প্রধান বিষয়। যেমন-’মাতৃত্ব’, ‘আসন্ন প্রসবা’, ‘বিরহিণী প্রিয়া’, ‘বিনীতা’ শীর্ষক ভাস্কর্যে তিনি নারীর মাতৃত্ব, মমতা ও প্রেমাস্পদের প্রতি রমণীর প্রতীক্ষার বেদনাকে তুলে ধরেছেন। তারুণ্যের রোমান্টিকতাও তাঁর ভাস্কর্যের বিষয়। যেমন-’মধুচন্দ্রিমা’ ও ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ ভাস্কর্যে মানব-মানবীর শাশ্বত আকর্ষণ ও ভালোবাসার শক্তিতে চিহ্নিত করেছেন।

ভাস্কর প্রিয়ভাষিণী সবচেয়ে সপ্রতিভ নানা প্রাণী ও পাখির অবয়ব নির্মাণে। এরকম কয়েকটি কাজের শিরোনাম – ‘কাক ডাকে কা কা’, ‘হরিণ’, ‘অন্বেষণ’ ‘উচ্চকিত পালক’, ‘ঘরে ফেরা’, ‘প্যাঁচা’ প্রভৃতি। কাকের ভাস্কর্যে কাক ডাকা অনুভব চমৎকার ফুটে ওঠেছে। প্যাঁচানো দীর্ঘ শিং নিয়ে বসে থাকা হরিণ অবয়ব, দুটি বকের খাদ্য অন্বেষণের সুললিত লম্বা গ্রীবার ভঙ্গিমা, দুটি সারসের বৃক্ষশাখার আশ্রয় ‘ঘরে ফেরা’, গাছের কোটরের পাশে প্যাঁচার রহস্যময় অবয়ব নির্মাণে প্রিয়ভাষিণীর প্রচেষ্টা প্রশংসার্হ।

মুক্তিযুদ্ধ তাঁর আরেকটি প্রিয় প্রসঙ্গ। নিজ জীবনের শ্রেষ্ঠসম্পদ দিয়ে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে মহীয়ান করেছেন। তাঁর অনুভব আমাদের আলোড়িত করে ‘র‌্যাভেজড মাদার ’৭১’ ও ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ শীর্ষক ভাস্কর্যে। রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শহীদী আত্মদানকে তিনি তুলে ধরেছেন – ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’তে। ‘ভাঙ্গনের তীরে’ ভাস্কর্যে তিনি যেমন একদিকে নদী-ভাঙনের প্রাকৃতিক দুর্যোগকে চিহ্নিত করেছেন, তেমনি সমসাময়িক অস্থিরতা, অসহিষ্ণু রাজনীতির ফলে আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সমাজের অসহায়ত্বকেও নির্দেশ করেছেন প্রতীকী উপস্থাপনায়।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী প্রকৃতি প্রদত্ত উপাদানকে অবিকৃত রেখেই কিছু রূপান্তর করে উপস্থাপনাযোগ্য করে তোলেন। তাঁর কাজ আমরা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাই – বিশেষ একটি এঙ্গেল থেকে উপস্থাপিত অবয়বের পূর্ণতা পাওয়া যায়। অন্যান্য এঙ্গেল থেকে তাঁর কাজকে কিছুটা ‘পরিবর্তিত মনে হয়’। এভাবেই তাঁর কাজ হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক এবং প্রকারান্তরে সার্থক সৃজন।

পরিশ্রমী এই শিল্পী নানা স্থান থেকে তাঁর শিল্প উপাদান সংগ্রহ করেন এবং অসীম ধৈর্যে তাতে নানা রূপারোপ ঘটানোর কষ্টকর কাজটি করেন। বৃক্ষের বিভিন্ন অংশ তিনি বহুদিন ধরে সংরক্ষণ করেন এবং ওই কাঠকে প্রচলিত নানা টেকনিকে টেকসই করার ব্যবস্থা নেন। তারপর গভীর    অন্তর্দৃষ্টিতে তাঁর অবলোকন প্রক্রিয়া চলে এবং ক্রমান্বয়ে কাজ শুরু করেন। এক্ষেত্রে তাঁর পরিমিতি বোধ গোটা প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি সঠিক উপলব্ধি করেন – কোথায় থেকে শুরু করবেন এবং কোথায় থামবেন। আরাধ্য বিষয়কে ফুটিয়ে তোলার জন্যে যেখানে যতটুকু ঘষা-মাজা প্রয়োজন – তার বেশি একটুও করেন না। প্রকৃতি তাঁর প্রথম শিক্ষক। আর প্রকৃতির উদার ঐশ্বর্য থেকে যে শেখে, প্রকৃতিও যেন তার কাছে মেলে ধরে তার বিশাল ভা-ার। প্রিয়ভাষিণী এই বৈচিত্র্যময় ভা-ারের ভাষা সার্থকভাবেই রপ্ত করেছেন। এভাবেই তিনি অনন্য, অসাধারণ এক প্রকৃতি ভাস্কর। কবি ও শিল্প সমালোচক রবিউল হুসাইনের ভাষায় – ‘মূল্যহীনকে অমূল্যে যে-গড়ে অনায়াসে/তিনিই খাঁটি শিল্পী-মানুষ দুখের আকাশে’।