হামিদুজ্জামান খানের সমকালীন সৃজন

আমাদের দেশের কৃতী ভাস্কর ও চিত্রকর হামিদুজ্জামান খান শিল্পকে জনঘনিষ্ঠ করতে সত্তর বছর ধরে সহজ ও স্বচ্ছন্দ দৃষ্টিভঙ্গিতে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। পেইন্টিং থেকে ভাস্কর্যে তাঁর যাত্রা বাস্তবের গভীরে প্রোথিত এক শিল্পপ্রয়াস। এক্ষেত্রে

শিক্ষক-শিল্পী আবদুর রাজ্জাক তাঁর অনুপ্রেরণা।

বহিরাঙ্গন ভাস্কর্যে হামিদুজ্জামান খান এদেশের অন্যতম এক পথিকৃৎ ভাস্কর। জ্যামিতিক বিমূর্ততায় আঙ্গিকের সঙ্গে স্থান বিভাজন তাঁর ভাস্কর্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আশির দশকের গোড়ার দিকে নিউইয়র্ক স্কাল্পচার সেন্টার সফরকালে তিনি বিমূর্ত আঙ্গিক এবং এর সঙ্গে বহিরাঙ্গন ভাস্কর্য ও নগরের ভূদৃশ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে সম্যক ধারণা লাভ করেন।

দেশে ফিরে তিনি উন্মুক্ত স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণে মনোনিবেশ করেন এবং দেশের অন্যতম একজন ভাস্কর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সিলেট ক্যান্টনমেন্টে ‘হামলা’(১৯৮১), বঙ্গভবনে ‘পাখি পরিবার’ (১৯৮১), সিউল অলিম্পিক উদ্যানে ‘স্টেপস’ (১৯৮৮), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংশপ্তক’ (১৯৯০), দক্ষিণ কোরিয়ার পুয়ো ভাস্কর্য পার্কে স্থাপিত শিল্পকর্ম (১৯৯৯) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে ‘শান্তির পায়রা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ‘হামিদুজ্জামান খান ১৯৬৪-২০১৭’ শিরোনামে তাঁর রেট্রোস্পেকটিভ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান ২০০৬ সালে একুশে পদক লাভ করেন। ২০২৩ সালে বাংলা একাডেমির ফেলোশিপ পেয়েছেন চারুশিল্পে তাঁর কৃতিত্বের জন্য।

১৯৮১ সালে যে-সময় হামিদুজ্জামান খান ‘হামলা’ ও ‘পাখি পরিবার’ গড়ছেন, আমি তখন চারুকলার শিক্ষার্থী। খুব কাছ থেকে দেখেছি তাঁর সেই কাজ কীভাবে গড়ে উঠছে। পরিশ্রমী এ-কাজগুলো অত্যন্ত নিষ্ঠাভরে করেছেন তিনি। তাঁর ছাত্রছাত্রীরাও বহিরাঙ্গন ভাস্কর্যের গঠন প্রক্রিয়া সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছেন। মনে পড়ে শিল্পানুরাগী বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরী তাঁর গড়া মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ‘হামলা’ দেখতে তখন ঢাকার চারুকলায় এসেছিলেন। আশির দশকের শেষার্ধে চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে মুক্তিযুদ্ধের শহিদ স্মরণে তাঁর প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করে তিনি বিশেষ সুনাম অর্জন করেন।

এদেশে ভাস্কর্য পার্কের ধারণা জনপ্রিয় করে তোলায় হামিদুজ্জামান খানের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ তাঁর ভাস্কর্য সংগ্রহ দিয়ে বড় এক ভাস্কর্য বাগান নির্মাণ করেছে গাজীপুরের কড্ডায়। এছাড়াও দেশে-বিদেশে অনুরাগী সংগ্রাহকদের কাছে তাঁর অনেক ভাস্কর্য ও চিত্রকর্ম সংগ্রহ আছে।

ঢাকার বেঙ্গল শিল্পালয়ে হামিদুজ্জামান খানের বড় পরিসরের একক শিল্পপ্রদর্শনী আয়োজনে আমরা দেখলাম নিকটকালে গড়া ও অঙ্কিত তাঁর শতাধিক শিল্পকর্ম। গত ৩১শে জানুয়ারি থেকে ১৫ই মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত আড়াই মাসের এ-প্রদর্শনীতে দর্শক ও শিল্পানুরাগীরা মাঝে মধ্যেই তাঁদের প্রিয় শিল্পীকে প্রদর্শনশালায় পেয়েছেন। তাঁর কাজ সম্পর্কে দর্শকদের কৌতূহলের নানা বিষয়কে সহজভাবে ব্যাখ্যা করে তাঁদের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন।

প্রদর্শনী হলে ঢুকতেই দর্শক-মন প্রফুল্ল হয়ে উঠেছিল সাজানো-গোছানো শিল্পকর্মের সমাহার দেখে। মূর্ত-বিমূর্ত অসংখ্য ছোট-বড় ভাস্কর্যের সঙ্গে বিশাল বিশাল ক্যানভাসে আঁকা সাযুজ্যময় চিত্রকর্মে রুচিস্নিগ্ধ পরিবেশ ভালো লাগার অন্যরকম একটা আবহ তৈরি করেছে।

বেঙ্গল শিল্পালয়ের দোতলায় শিল্পী কামরুল হাসান প্রদর্শনালয়ের দরজার বাঁদিকে প্রদর্শনীর কিউরেটর শিল্পী মোস্তফা জামানের লেখায় ভাস্কর-শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের সৃজনধ্যানের উল্লেখ এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া আছে।

মোস্তফা জামান লিখেছেন – “ভাস্কর্যে আধুনিকতার নিমিত্তে যে ‘ছন্দোবদ্ধ কাঠামো’ শিল্প হিসেবে স্বীকৃত তার পেছনের জীবন দর্শনটি যেমন আত্মাকাঙ্ক্ষার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তেমনি আধুনিক সময়ের যান্ত্রিকতাও মাঝে মাঝে ধর্মোত্তর সমাজে জীবনের ‘মর্ম’ আবিষ্কার করার চেষ্টারও প্রতিফলন। যে ভাস্করের কাজ আধুনিকতার এই সত্যকে বাস্তবতা দান করেছে তিনি কনস্তান্তিন ব্র্যাঙ্কুসি। তাঁর হ্রস্বকরণের সূত্রটি শিল্পের মৌল একটি ধারণা সামনে নিয়ে আসে : সাধারণীকরণ বা সার্বলৌকিক করে গড়ে তোলার তাগিদে গাঠনিক ছলনা ত্যাগ করে প্রকাশভঙ্গিতে শিল্পবস্তুকে হয়ে উঠতে হবে ‘সহজ’ ও ‘স্বতঃস্ফূর্ত’। হামিদুজ্জামান খানের শিল্পকর্ম আধুনিক ভাস্কর্যের এমন আপাত অনায়াসসিদ্ধ ও সুবোধ্য ভাষার সূত্রে পাঠ করা যায়। … হামিদুজ্জামান বস্তুর বিন্যাসে নতুনত্বের পাশাপাশি ফর্ম বা রূপাবয়বের সাধারণত্ব অর্জনে চেষ্টা করেন। তিনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতামূলক ভাষার মহাজন। কখনো কখনো শিল্পবস্তুর সুরাহা করেন বস্তুর আকৃতি ও প্রকৃতি উভয়কে একসূত্রে বেঁধে, কখনো বা কেবল আকৃতির বা আকারের নিঃসঙ্গ প্রকাশ ঘটিয়ে।

জগতের বাহ্যিক রূপের মাঝারে যদি স্বরূপের সূত্র থেকে থাকে, দৃশ্যমান বস্তুরাজির মাঝে যদি কোন ঐক্যের সুর চিহ্নিত করা যায়, তবে তারই প্রতিনিধিত্ব করে হামিদুজ্জামান খানের জ্যামিতি ও জৈবনির্ভর ভাস্কর্য ও ছবি। রূপ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পীর কাজ রূপ-অরূপের দ্বৈততার বদলে ঈষৎরূপের মধ্য দিয়ে আকার ধারণ করে বললে সত্যের অপলাপ হয় না। … ব্রাঙ্কুসির মহাজাগতিক ছন্দের বিপরীতে এই শিল্পী যা অর্জন করেন তা শান্তিনিকেতনের কলাভবনের উত্থানপর্বের বিশিষ্ট ভাস্কর রামকিঙ্করের ভাষায় ধরা যায়। হামিদুজ্জামানের কাজ ‘লিলায়িত প্রাণ উৎসের পাশে ছন্দোবদ্ধ কাঠামোর জন্ম-মৃত্যুর খেলা।”

আরো সহজ করে বলা যায়, এই শিল্পীর সৃজনধ্যানে আছে আমাদের চারপাশের চেনা সব ফর্মের বিচরণ। লোহার

মোটা-চিকন পাত কেটে কেটে কিংবা বাঁকিয়ে জ্যামিতিক আকার-আকৃতিতে বানিয়েছেন নানারকম পাখির রূপ – যেমন বক, পায়রা, হাঁস, কাক। গড়েছেন নারী-পুরুষের অবয়ব – কখনো যুগল রূপে, একক যোগাসনরত, চিন্তিত কিংবা হতাশামগ্ন মানুষের অবসাদখিন্নতা। সিরামিক পটারির অনুরূপ ফর্মকে বিভক্ত করে তিনি আরেকটি রূপের সন্ধান করেছেন। এছাড়াও চেনা-অচেনা বিমূর্ত কতক রূপের প্রকাশ করেছেন তিনি মেটালে।

মজাটা ব্যাপ্ত হয়েছে পাশেই দেয়ালে ঝোলানো বৃহৎ ক্যানভাসে সেই চেনা-অচেনা ফর্মের পেইন্টিংয়ের সঙ্গে মিলে অসামান্য পরিবেশের সৃজনে! দুটি মাধ্যমেই তাঁর অনায়াস বিচরণ এবং দক্ষতার ঝলকানি দেখে সমীহ জাগে, শ্রদ্ধায় নত হতে হয় সৃজনকারের সত্তর বছরের সুদীর্ঘ যাত্রা এবং বিরতিহীন অধ্যবসায়ের জন্য।

এ-প্রদর্শনীর ভাস্কর্যগুলির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই সহজ ও স্বচ্ছন্দ ফর্মের অনায়াস প্রয়োগ। রেখাচিত্রে শিল্পীরা যে অবয়ব আঁকেন, সে-রূপটাই যেন মেটালে অনূদিত হয়েছে হামিদুজ্জামানের হাতে। কী নেই সেখানে! মানব-অবয়বের বিচিত্রতা, ডানার মতো দুই হাত ছড়ানো মুক্তবিহঙ্গের রূপ, পাখির ছানার চঞ্চলতা, ডালে বসে থাকা পাখির ইতিউতি তাকানো, মাছের ঊর্ধ্বমুখী ঘাই, চলন্ত অবস্থার বাঁকানো রূপ, ময়ূরের উপবেশন এমন অনেক কিছুই। রূপ-অরূপের সহজ সাযুজ্যতে ভর করে অভিজ্ঞ ভাস্কর তাঁর সৃজনকে আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত সংগ্রাহকদের নিকটবর্তী করে তুলেছেন।

হামিদুজ্জামান খান এই বয়সেও তরুণের মতো সচল, সৃজনের আনন্দে ভাসছেন, অনবরত আঁকছেন, ভাস্কর্য গড়ছেন। যেখানেই যান সৃজন যেন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে যায়!