মেধাবৈকল্যের মহাষণ্ড যখন এই বাংলার সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তখন জ্ঞান, রুচি, শুভবোধ ও পরিশীলনের লুপ্তপ্রায় ক্ষেত্রটিও নিশ্চিহ্ন হবার নিশ্চিত পরিণতির দিকে ধাবমান – এমত আশঙ্কায় যে-কেউ শঙ্কিত হয়ে উঠতেই পারেন। ভাবতে পারেন, ‘পাথরের মতো একা বসে আছি, চোখে আমার ক্রোধমিশ্রিত বিস্ময়, মুখে গ্লানিবোধের মালিন্য, ঠোঁটে ঘৃণার কুঞ্চন এবং ললাটে শঙ্কার ভাঁজ! কী করবো এখন আমি!’
কল্যাণকামী, শুভবাদী, শুদ্ধ, সুন্দর সৈনিকের দল সর্বদাই নির্ভয় – তথাপি রণাঙ্গনে সহযোদ্ধাদের আশ্বস্ত করে মিত্রকে গলা চড়িয়ে উচ্চারণ করতেই হয়, মা ভৈঃ! সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির টালমাটাল ‘অ্যারিনা’য় যে ‘মাতাদর’কুল কালি ও কলম প্রকাশনায় ব্রতী হয়েছেন তাঁরা জয়ী হবেনই, এঁদের সকলকেই আমার অভিনন্দন।
কালি ও কলমের প্রথম সংখ্যার উজ্জ্বলতম অংশ হচ্ছে ‘পাবলো নেরুদার শতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি’ পর্বটি, যা ৩৫ পৃষ্ঠায় শুরু হয়ে ৪৯ পৃষ্ঠায় গিয়ে শেষ হয়েছে।
এই পর্বে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত এবং খোন্দকার আশরাফ হোসেন। শ্রদ্ধাঞ্জলির তিনটি নিবেদনই নেরুদা-প্রেমিকদের কাছে যথাযথ অঞ্জলি হিসেবে বিবেচিত হবে। এই অধমের বিবেচনাও তা-ই।
তবে, অল্প-সল্প হলেও আলোচনার বিষয় তো থেকেই যায়! ‘সে যে বেঁচে ছিলো, সেটা কবুল করেছে’ শিরোনামে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির ‘র্পারাল’ নামের বৈরী আবহাওয়ায় (প্রচণ্ড শীত ও ঝড়-বৃষ্টি লাঞ্ছিত) এক ছোট্ট শহরে জন্ম নেওয়া নেফতালি রেইয়েস ওরফে পাবলো নেরুদাকে নিয়ে এক অনবদ্য লেখা পাঠকদের উপহার দিয়েছেন।
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে আমরা প্রায়-অসম্ভব এক মেধা ও কবির অনায়াস যুগল অস্তিত্ব লক্ষ করে যুগপৎ বিসি¥ত এবং আনন্দিত হই। তাঁর লেখায় তিনি পাঠকের সঙ্গে দূরত্ব ঘুচিয়ে যেন সুন্দর করে কথা বলে যান। বিস¥য় ও আনন্দ আরো তীব্র হয় যখন তাঁর নিবেদনের শেষ পর্বে নেরুদার লিব্রো দে প্রেগুনতাস থেকে অবলীলায় বাংলায় অক্ষরবৃত্তে অনুগত থেকে আবৃত অথবা অনাবৃত ভাব, রস, বিষণ্নতা, প্রশ্নের পর প্রশ্নের ঝলকানি, অন্তর্লীন শ্লেষ, অস্তিত্ববাদিতার মধ্যে নির্বস্তুভাববাদিতার দ্বন্দহীন সহাবস্থান ইত্যাদি মিলিয়ে নিটোল কবিতার সৌন্দর্যের একটি ক্লাসিক নির্মাণ তিনি পাঠকদেরকে উপহার দেন। মানবেন্দ্র, আপনি আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন।
একবার লন্ডনের সাউথব্যাংকে রয়্যাল ফেসটিভ্যাল হল-এ আমার পরিচিত এক বিশ্বনন্দিত নৃত্যশিল্পীর ক্ল্যাসিক্যাল নাচ দেখতে গিয়েছিলাম। নৃত্যের মহাসমারোহের রূপ রস-বর্ণ-গন্ধ এমনকি স্পর্শও যেন দর্শকরা নিশ্বাসের সাথে শরীরে-আত্মায় তা ছড়িয়ে দিতে পারছিলেন। সে-সময়ে নৃত্যশিল্পীর নূপুরের থোকা থেকে অনেক কটা নূপুর খসে ছিটকে ছিটকে পড়ে গিয়েছিলো মঞ্চের বাইরে এদিকে সেদিকে। তাতে নৃত্যের ধ্রুপদী মহিমা ক্ষুন্ন হয়নি।
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্লাসিক নির্মাণের ব্যস্ততায় তেমনি দু-একটি নূপুর হয়তো খসে গেছে। ছিটকে পড়ে যাওয়া নূপুরের দু-একটা তাঁর হাতে তুলে দিলে এমন কী ক্ষতি!
প্রথমটি হচ্ছে : পাবলো নেরুদার প্রথম কবিতার বইটি ছাপা হয়েছিল ১৯২১ সালে, বইটির নাম La Cancion de la fiesta; বাংলায় উৎসবের সংগীত বলা যেতে পারে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ষোলো। মানবেন্দ্র যাকে তাঁর প্রথম কবিতার বই বলেছেন, সেই Crepusculario আসলে নেরুদার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, ছাপা হয়েছিল ১৯২৩ সালে।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে : পাবলো নেরুদা নোবেল পুরস্কার পান ১৯৭১ সালে, ১৯৭২ সালে নয়। (সূত্র: Nathaniel Tarn iwPZ Pablo Neruda, Penguin Books)।
এছাড়া সে-সময়কার মার্কিন আধিপত্যবাদী সরকারের (যা আজো সত্য) মদদে ১৯৭১ সালের ১১ সেপ্টে¤¦র চিলির নৌবাহিনী এবং সামরিক বাহিনী রুশ-কম্যুনিস্ট মতাবলম্বী (ততোদিনে সমাজতন্ত্রী বলা যায়) প্রেসিডেন্ট সালভাদর আইয়েন্দের সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘটায়। নেতৃত্বে ছিল মার্কিন মদদপুষ্ট নিষ্ঠুর সামরিক-স্বৈরাচারী পিনোচেৎ। প্রেসিডেন্ট আইয়েন্দের বাসভবন ‘লা মনেদা’য় বৃষ্টির মতো বোমা ফেলে পিনোচেৎ আইয়েন্দেকে হত্যা করে। এরপরের বাকিটা পাবলো নেরুদার রোগ, শোক, মর্মপীড়া ইত্যাদির এক ট্র্যাজিক অধ্যায়। নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকের কালোহাত নেরুদার বাড়িকে করে রাখে অবরুদ্ধ। প্রায় বিনা চিকিৎসায়, ১৯৭৩-এর ২৩ সেপ্টেম্বর পাবলো নেরুদা মৃত্যুবরণ করেন।
শ্রদ্ধাঞ্জলির দ্বিতীয়টি হচ্ছে সমরেন্দ্র সেনগুপ্তের ‘পাবলো নেরুদার কবিতা’। তিনি যেসব কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছেন তার সবগুলোই পাবলো নেরুদার ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত Memorial de Isla Negra থেকে নেয়া। লেখক প্রথমেই কবুল করে নিয়েছেন নেরুদার এইসব কবিতা হিসপানিক ভাষা থেকে ইংরেজিতে এবং ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাব, অর্থ অক্ষুণ্ন রেখে ‘অনুবাদে আনা’র ব্যাপারটা। তিনি তাঁর ভাষায় ‘যৌগিক বাক্য সহজবোধ্য করার জন্য, কমবেশি আপন মনের মাধুরী মেশাতেই হয়েছে। তবে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি প্রাণপ্রিয় নেরুদার মূল বক্তব্যের যেন ব্যত্যয় না ঘটে….।’
সমরেন্দ্র সেনগুপ্তের কবিতা বাছাই এবং অনুবাদ দুটোই সুন্দর হয়েছে। লক্ষণীয় যে তিনি শুধু সেইসব কবিতা অনুবাদ করেছেন যা এর আগে আর বাংলায় অনূদিত হয়নি। যেহেতু এই পর্বের বেশির ভাগ কবিতা রাজনৈতিক চেতনা থেকে উৎসারিত তাই কবিতায় স্বদেশ, স্বদেশের মানুষ, ক্ষুধা, শান্তি, শত্রু ইত্যাদি এই খণ্ডবৃত্তের মধ্যেও তাৎক্ষণিক কবি, নিজের অগোচরেই প্রায় সর্বকালীন হয়ে ওঠেন। সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত অত্যন্ত সচেতন থেকে ‘আপন মনের মাধুরী’ মিশিয়েও পাবলো নেরুদাকে অবিকৃতই কেবল রাখেননি ভাষিক ব্যঞ্জনাতেও নির্ভার হয়ে উঠে পাঠককে আনন্দ দিতে পেরেছেন।
তবে তাঁর লেখার শেষ চৌত্রিশ লাইন কি নেরুদার খধ ঢ়ড়বংরধ কবিতার অনুবাদ নয়? তাহলে শিরোনাম কোথায়? তাঁর অনুবাদের অন্যান্য ক্ষেত্রেও কি এমন ঘটেছে?
সর্বশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলিটি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের।
একজন বোদ্ধা-কবি আরেকজন কবির, সে মহাকবি হলেও, ভাষা ও ভাবের মধ্য দিয়ে তাঁর মনকে বুঝতে পারবেন সেটাই তো প্রত্যাশিত। খোন্দকার আশরাফ হোসেনের লেখা কবিতা আমাদের দেশের কয়েকটি দৈনিকের সাহিত্যবাসরে প্রায়শ দেখতে পাই এবং তার শুদ্ধ কবিতার অনুরাগী-পাঠকের সংখ্যা কম নয়। আমিও তাঁর কবিতা-অনুরাগীদের একজন। ১৯৩৩ সালে নেরুদার জবংরফবহপরধ বহ ষধ ঃরবৎৎধ (ধরিত্রীর আবাস নামে খোন্দকার আশরাফ যার অনূদিত নাম দিয়েছেন) সেখান থেকে ডধষশরহম অৎড়ঁহফ কবিতাটি ‘পদচারণা’ (সার্থক নামকরণ) নামে অনুবাদ করেছেন। মূল ভাবের অনুগত থেকে ‘এক্সপ্রেশনিস্ট চিৎকার’টি এই অনূদিত কবিতায় শোনা যাবে যেন কানের কাছেই। তবে দু-একটি মূলশব্দের ব্যঞ্জনা বোধহয় চোট খেয়েছে। যেমন Establishments -কে ‘দোকানপাট’, glasses-কে ‘ঘড়ি, cellar -কে ‘ওয়্যারহাউজ’ এবং Orthopaedics appliances -কে ‘অর্থোপিডিক শপ’ বলে বর্ণনা করা।
তবে, আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করি গুণী তিন অনুবাদকই নেরুদার কবিতার অন্যতম ‘হলমার্ক’ ও ‘এবং’ শব্দগুলো তাঁরা তাঁদের অনুবাদে তুলে ধরেননি। অথচ বারবার নেরুদার কবিতায় সচেতনভাবেই ‘এবং’ শব্দটি এসেছে। নাটকীয়তা, অনুপ্রাসযুক্ত কিংবা অনুপ্রাসহীন বাঙময়তায় নেরুদার ‘এবং’ শব্দটি হিসপানিক ভাষার অনায়াস অনুষঙ্গ। নেরুদার ক্ষেত্রে ‘এবং’-এর ভূমিকা তাঁর পৌরুষ, তাঁর জোর এবং নিরঙ্কুশ ঘোষণার কণ্ঠস্বরের মতো। তাঁর অনেক কবিতা তিনি শুরুই করেছেন ‘ণ’ অর্থাৎ ‘এবং’ দিয়ে।
কালি ও কলম-কে ধন্যবাদ যে পাবলো নেরুদার মতো একজন বিশ্বকবির কবিতাসমুদ্রের রং, রস, বর্ণ, গন্ধের কিছুটা হলেও সার্থক তিনজন জ্ঞানী, সচেতন, স্পর্শকাতর অথচ গুণী কবির অনুবাদের মাধ্যমে নেরুদা-প্রেমিকগণ ছোঁয়াটা পেলাম।
নয়ীম গহর
ঢাকা

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.