১৯৪৬ সাল। অকুস্থল কলকাতা। হিন্দু-মুসলিম ‘মহাদাঙ্গা’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। এটা ভাবচক্ষে দেখছি –
হিন্দু-মুসলিম ভদ্রলোক বা গুন্ডা ছুরি হাতে ঘুরছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে এবং এই রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ইরানি চেহারা। দীর্ঘাঙ্গ, লম্বা-চওড়া মানুষ। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চেহারায় বেমানান।
অবশ্য তাঁর আগে ছিলেন এ. কে. ফজলুল হক। তিনিও ছিলেন বিরাট বপুর মানুষ, শুধু রংটি বাঙালির – শ্যামলা – তা-ও কালো-ঘেঁষা। তারও আগে ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দীন – এবারো অবাঙালি … ব্যবসাসূত্রে ঢাকায় এবং পয়সাসূত্রে নবাব। ব্রিটিশের অনুগত।
১৯৩৮ থেকে ১৯৪৭-এর ১৪-১৫ই আগস্ট পর্যন্ত ছিল বাংলার মুসলিম প্রধানমন্ত্রীর শাসন। তারপর দেশভাগ – পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ ঠিকই ছিল। পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় কংগ্রেস।
এইভাবে বাংলা রাজ্য দুই সাম্প্রদায়িক বিভাজনে বিভক্ত হলো। শুভবোধের বাঙালি এই বিভাগ চাননি। এর মধ্যে নেতাজি সুভাষের মেজদা শরৎচন্দ্র বসু। বদরুদ্দীন উমরের পিতা আবুল হাশিম ও আরো কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি দেশবিভাগ চাননি। তার মধ্যে আমার বাবা শওকত ওসমানও ছিলেন ঘোর বঙ্গ-বিভাগ বিরোধী। অবশ্য তিনি তখন মাত্র ৩০ বছরের মানুষ – আর কোনো রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন। ১৯৪৪ সালে তাঁর প্রথম কিশোর উপযোগী ছোটগল্পের বই ওটেন সাহেবের বাংলো প্রকাশিত। আর প্রথম পুস্তকেই সবার নজর কাড়েন।
কলকাতায় দাঙ্গা, কিন্তু উদ্বেগ পুরো ঝামটিয়াজুড়ে। শিক্ষিত মানুষ এবং কারিগর সবাই কলকাতাবাসী। সপ্তাহের ছুটিতে আসে বাড়ি। আবার সোমবার কাজে যোগ দেয়।
আমার মামাবাড়ি ও দক্ষিণপাড়া পুরুষশূন্য থাকে এই সময়। এমনকি ক্লাস সেভেনে যারা পড়ে, তারাও কলকাতার উপকূলে। বাড়িতে শুধু মহিলা আর বাচ্চাকাচ্চারা উপস্থিত। যেমন আমরা তিন ভাই। আমি ছয়-সাত, মেজো চার আর তখন ছোট – পরে সেজো মাত্র দু’বছরের। গুটলি গুটলি। পুঁটলি পুঁটলি। দৌড়ে পালানোর যোগ্য একমাত্র আমি। ভাগ্য ভালো যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ছিল অটুট। তাই আমরা একঘর মুসলিমপাড়া নিশ্চিন্ত ছিলাম। কারো মধ্যে রাজনৈতিক শয়তানি বোধ ছিল না। ছিল না শ্রেণি-সংগ্রামের বিদ্বেষ।
কলকাতা-দাঙ্গা ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি কলঙ্ক। এর ফল হলো ভারত বিভাগ। দেশটা তার বিশালতা হারাল। ফেডারেল চরিত্র হলো নষ্ট। দেশটা হয়ে গেল হিন্দু আর মুসলমানের আবাসভূমি।
বাঙালি-বিহারি ভাই ভাই থাকল না। হয়ে গেল হিন্দু আর মুসলমান। কৌশলে ধনী-গরিব দ্বন্দ্বটিকে বাঁক ফিরিয়ে দেওয়া হলো। সারাবিশ্বে তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ঝাণ্ডা উড়ছে। মেহনতি মানুষের দেশ। ভারতেও তার ঢেউ লেগেছে। কৌশলে ব্রিটিশের সঙ্গে মিলে ভারতীয় বুর্জোয়া নেতৃত্ব এটিকে স্থাপন করল। ব্রিটিশ করল ভারত বিভাগ, যাতে ভবিষ্যতে এই রাজ্য মহাশক্তিধর দেশ হয়ে দাঁড়াতে না পারে। এই দাঙ্গার ফল হলো সরাসরি পাকিস্তান সৃষ্টি এবং বাংলা বিভাগ। ভারতবর্ষকে দু’দিক দিয়ে চেপে ধরা। যদিও আকারে ছোট – উন্নত অস্ত্র পেলে ছোটও বড় হয়ে যায়। উদাহরণ আজকের ইসরায়েল। একটা লড়াই চালাচ্ছে সমস্ত আরব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে বর্তমানে ইরান সমস্ত আরব দেশের বিরুদ্ধে লড়ছে। ইসরায়েল তো আছেই। বাকি সবই চলছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সাহায্যে। ইরান পেছন থেকে সাহায্য পাচ্ছে রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে। আসলে যুদ্ধটা চলছে পরাশক্তির মধ্যে। মাঝখানে শিখণ্ডি ইরান ও ইসরায়েল।
তো ঝামটিয়ার কথা। তিনতলা বাড়িতে সবার মুখ কালো। শুধু আমরা বাইরে গিয়ে ছোট বাগানে বা বড় বাগানে ফড়িং ধরার চেষ্টা চালিয়ে হল্লাক হয়ে যেতাম।
বড় বাগানের পাশে ছিল, এখনো আছে, বড় একটা ঝিলের মতো। তারপরই বড়খাল চলে গেছে পুবদিকে খালনার দিকে। আর পশ্চিমে গিয়ে পড়েছে রূপনারায়ণে, বাকশির কাছে।
এই বাকশি একটা ছোটখাটো নৌ-বন্দর। এখানে তখন একটি টকিজঘর বসানো হয়। ওখান থেকে জোরে দখিনা হাওয়ায় সিনেমার গান ভেসে আসত। আমরা বলাবলি করতাম, বাকশির টকিজ চলছে। খুব ইচ্ছা হতো একবার বাকশি যাই। টকিজ দেখে আসি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ পর্যন্ত আমার জীবনে বাকশি-দর্শন ঘটেনি। অথচ বাবা, আমি আর রেজাউল দাদা বাগনানে না নেমে কোলাঘাট পর্যন্ত রেলগাড়ি করে পৌঁছাই। কোলাঘাট থেকে নৌকো করে পৌঁছাই বড়খাল। এখান থেকে ঘর মাত্র পাঁচশো গজ। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার, রেজাউল দাদা আর বাবার আলোচনা শুনতে শুনতে কখন যে বাকশি পার হয়ে এসেছি খেয়াল করিনি। আজো সেই দুঃখের কথা ভুলিনি। বাকশি আমার কাছে যেন এক রূপকথার জগৎ হয়ে রইল। আর কি কোনোদিন দেখার সুযোগ হবে? কে জানে?
এমনি দূরের এক হাতছানি দিয়ে ডাকত খড়িগেড়ের বন্যানিরোধক বাঁধ। তিনতলার ছাদ থেকে সেই বাঁধ অর্ধচন্দ্রাকারে ধরমপুতা ও ঝামটিয়াকে বেড় দিয়ে অবস্থান করছিল। ওই বাঁধে গিয়ে দিগন্তরেখা ছুঁয়ে সূর্য অস্ত যেত। নিচের ঘরবাড়ি আর নজরে আসত না।
খড়িগেড়ের মধ্যে ছিল বড়খালের একটা শাখা। এটা ঝামটিয়া আর ধরমপুতা গ্রামের সীমারেখা। নদীর দু’পাশে বাবলার সার একটা সবুজ রেখা টানা অর্ধাবৃত্তাকার। খুব সুন্দর একটি ল্যান্ডস্কেপ। শিল্পীর হাতে খুব চমৎকার দৃশ্যের বিষয় হয়ে ফুটে উঠতে পারে। আমি শেষ জীবনে ছবি আঁকা ধরলে কী হবে আমার বাল্যের লীলাভূমি তিনতলা পাকাবাড়িটি আজ আর নেই। মামাতো ভাই কবীর বাগনানে স্থানান্তরিত হওয়ায় এই ভবনটি আজ অদৃশ্য। আমার স্বর্গের ছবি আজ-কালের অতল গর্ভে হারিয়ে গেছে। শুধু স্মৃতির মধ্যে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। ওখান থেকে মোছা যাবে না, মরণ ডাক না দেওয়া পর্যন্ত।
এদিকে কলকাতায় ১৯৪৬-এর দাঙ্গা চলছে – তার মধ্যে দেখা দিলো এক বড় ধরনের বিপত্তি। মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। জ্বর ওঁর কমে না। জ্বর একটানা দুই-তিন ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে – কমলে একশ এক। শেষে ডাক্তার ডাকা হলো। একমাত্র এলএমএফ ডাক্তার ছিলেন অমলেন্দুবাবু – চেম্বার খালনায়। তাঁকে তলব করা হলো।
মানিকমামা মনে হয় সঙ্গে করে এনেছিলেন। হাতে ডাক্তারি ব্যাগ। ডা. অমলেন্দু ছোটখাটো মানুষ। চওড়ায় কিছুটা বেশি। গায়ে একটা হালকা নীলরঙের কোট। যদিও গ্রীষ্মকাল। তবু গায়ে কোট – অবশ্য সুতির – আমার মনে হলো ডাক্তারদের মনে হয় গায়ে কোট দেওয়া রেওয়াজ – যেমন উকিলরা পরেন কালো কোট।
ডাক্তারবাবু নাড়ি দেখলেন। জিভের নিচে থার্মোমিটার লাগিয়ে তাপ মাপলেন। তারপর গলায় ঝোলানো স্টেথোস্কোপ দিয়ে শ্বাস ওঠানামা দেখলেন। বুকে, কোমরের পাশে সবদিক দেখলেন। তখন কিছু জানালেন না।
বের হওয়ার সময় নানি বললেন, ডাক্তারবাবু কেমন দেখলেন?
– টাইফয়েড হয়েছে। আমি ওষুধ দিচ্ছি, তবে টাইফয়েডের এখনো কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। আপনারা খুব সাবধানে রাখবেন। জ্বর বাড়লে মাথায় জল ঢালবেন, যতক্ষণ না জ্বর কমে। আর প্রতিদিন কুসুম কুসুম গরম জলে গা মুছিয়ে দেবেন। বার্লি খাওয়াবেন যতটা খেতে পারেন। ফলের রস দিতে পারেন।
ডাক্তারবাবুকে নানি কত ফি দিয়েছিলেন মনে নেই। সম্ভবত এক বা দু’টাকা।
মানিকমামা সঙ্গে করে ডাক্তারবাবুকে আবার দিয়ে আসেন।
ডাক্তারবাবু যাওয়ার মুখে বললেন, কেমন থাকেন আমাকে জানাবেন। আর ওষুধ আমি পাঠিয়ে দেব।
তখনকার দিনে ওষুধের একটা ধরন ছিল। যে রোগই ধরুক অ্যালকলি মিক্সচার খাওয়াতে হবে। চ্যাপ্টা একটা শিশি যাতে একশর কিছু বেশি এমএল ওষুধ ধরত। তিন দিনের মাপ। গায়ে হাতে-কাটা ওষুধের দাগ লেই দিয়ে সাঁটা। এটা আমি খুব পারতাম। কারণ নানা ম্যালেরিয়ার ওষুধ বিক্রি করতেন। এক শিশি পাঁচ সিকে, মানে এক টাকা চার আনা। কলকাতা থেকে ছাপানো বিবৃতি থাকত শিশির গায়ে। শেষে লেখা থাকত ডা. শেখ কওসর আলী। নানার এই ওষুধের খুব সুনাম ছিল। এক শিশি খেয়েই মানুষ ম্যালেরিয়ামুক্ত হয়ে যেত। ওষুধটা আর কিছু নয় – কুইনাইন। মিশ্রিত ছিল জল। রস নেওয়া হতো যে গাছ থেকে তার বৈজ্ঞানিক নাম : সিঙ্কোনা। আমি নানার বদৌলতে তখন ছ-সাত বছরেই ডাক্তার। অনেকটা শেয়াল পণ্ডিতের মতো। প্রকৃতি বা পরিবেশ থেকে জানা। এটাই জীবনের ধর্ম।
নানার একটা তিন তাকওয়ালা আলমারি ছিল তিনতলায়। নানারকম ওষুধ সাজানো থাকত।
একবার আমরা তিন ভাই বেশ কিছু বড়ি খেয়ে ফেলি। অনেকটা সবুজ রঙের লজেন্স গন্ডাসের মতো। গন্ডাস হলো চিনির প্রলেপ দেওয়া মৌরি বা অন্য কোনো সুগন্ধি মসলার গায়ে চিনির প্রলেপ দেওয়া বীজাকৃতির লজেন্স। খুব ছোটগুলো প্যাকেটে পাওয়া যেত। ছিল নানা রঙের : লাল-নীল-হলুদ-সবুজ-সাদা-বেগুনি কত রং। তো আমরা যে বড়িগুলো খেয়েছিলাম সেগুলো ছিল সবুজ এক ধরনের ভিটামিন। তাই ভয়ের কিছু হয়নি। কিন্তু বেশি খাওয়ায় মাথা ঘুরতে থাকায় নানিকে বলে ফেলি। বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া দরকার। নানি ভয় পাননি। মা কিছুটা ভয় পেয়েছিলেন। তখন তো আর ফোন ছিল না যে কলকাতায় ফোন করে জানা যাবে। নানির ভরসায় আমাদের বিপদ কাটে। খানিক পর বিপদ কেটে যায়। পরের সপ্তাহে নানা কলকাতা থেকে ফিরলে নানি বিশদে সব বলেন। নানা বললেন যে, ওগুলো ভিটামিন ট্যাবলেট, গন্ডাস নয়। যে-কোনো ওষুধ ডোজ বেশি হলে হিতে বিপরীত হয়। তাই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে ওষুধ খেতে হয়। নিজে নিজে ডাক্তারি করলে বিপদ হতে পারে।
তো মায়ের টাইফয়েড। দিন দিন মায়ের শরীর খারাপ হচ্ছে। জ্বর বেশি হলে মাঝে মাঝে ভুল বকছেন।
একদিন সন্ধ্যায় আমাকে বললেন, তোর আব্বাকে ডেকে আন।
আমি অবাক। আব্বাকে কোথায় পাব। তিনি তো কলকাতায়।
আমার পাশে ছিলেন মামি হালিমা খাতুন। তিনি বললেন, শোনো – বলবে ডাকতে যাচ্ছি।
কিন্তু মামির কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে, আব্বা তো আসেনি। মা ক্ষেপে উঠলেন।
– যা ডেকে আন। আমি জানি তোর আব্বা এসেছে।
ততক্ষণে মামির ইশারা বুঝে গেছি। মা যে বিকারগ্রস্ত তা-ও বুঝতে পারি। জ্বর মাপা হলো : ১০৩ ডিগ্রি। নানি, মামি ও মেজোখালা সাহিদা খাতুন তিনজন মিলে মার মাথায় জল ঢালার ব্যবস্থা করতে লাগলেন। অয়েলক্লথ বালিশের নিচে দিয়ে বদনা করে জল ঢালা হতে লাগল। জল জমা হচ্ছে বালতিতে। দু-বালতি জল ঢালা হলো। জ্বর এক ডিগ্রি কমেছে। মাকে নিস্তেজ মনে হচ্ছিল। হঠাৎ আমার দিকে চেয়ে বললেন, বললাম না তোর আব্বাকে ডাক।
আমি বলি, বাবা তো আসেনি।
মামি আমাকে চিপ দিয়ে বললেন : যাও, তোমার আব্বাকে ডেকে আনো।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।
এই কামরাটা দোতলার পশ্চিম দিকে। বেশ বড় লম্বাটে কামরা। এদিকে অন্য আর কোনো কামরা নেই। অনেকগুলো জানালা। দক্ষিণে একটা, পশ্চিমে দুটো আর উত্তরে একটা। ঘরে রাত্রিকালীন প্রস্রাব করার জন্য বাঁধানো জায়গাও ছিল। একটা লোহার পাইপ দিয়ে জল নিচে নেমে যেত। খুব কম ব্যবহার হতো বলে নিচে আর কোনো নালা তৈরি করা হয়নি। ভিটে ছাড়িয়ে সবার চলাচলের রাস্তা পর্যন্ত কখনো জল যেত না।
উত্তরে ছিল প্রায় দু-আড়াই ফুট চওড়া বারান্দা। এই বারান্দা বেশি ব্যবহার না হওয়ার ফলে বুনো পায়রার পায়খানায় ভরে যেত। মাঝে মাঝে কোদাল দিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করে ধোয়া হতো। কিন্তু ধোয়া সার। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই আবার যে কে সেই।
খানিক পর মার খবর নিতে ঘরে ঢুকতেই মা রাগত গলায় বললেন, তোর আব্বাকে বলেছিস!
বলি, বলেছি, এখনি আসবেন … কথাটা বলি বুদ্ধি খাটিয়ে। মামির মুখে তৃপ্তির হাসি।
আমি আর অপেক্ষা করলাম না। বেরিয়ে গেলাম।
রাত প্রায় এগারোটার দিকে জ্বর অনেকটা কমল। আর মা ঘুমোতে লাগলেন। রাতে কিছু খাওয়ানো গেল না।
অমলেন্দু ডাক্তারবাবুকে আরো দু’তিনবার তলব করা হয়েছিল। যখন একটু একটু করে জ্বর কমছে, দুধের বদলে মাকে দই-ভাত খাওয়ানো হতো। পরে মা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন; কিন্তু দাঁড়াতে পারেন না।
একমাস হয়ে গেছে। মামি-মেজোখালা আর নানি মায়ের সেবা করতে করতে ক্লান্ত। আমাদের দিকে নজর দেওয়ার জন্য মা নানিকে তাড়া দিতেন।
এই সময় রঞ্জবাড় মানে নানির বাবাবাড়ি থেকে আসেন লুৎফরমামা। তাঁকে বাড়ির সবাই লুথু বলে ডাকত। লুৎফরমামা ছিলেন ছোট নানির ছেলে। আমার নানি গোলাপজানরা ছিলেন তিন বোন। ভাই বড় এবং একা। মেজোনানি খুব সুন্দরী ছিলেন। লম্বা-চওড়া ফর্সা। গলাটাও সুরেলা। তবে ছোট নানির চেহারা ছোট আর রংও চাপা। কিন্তু নানির মা, যাকে আমরা ঝি-মা বলতাম, ছিলেন লম্বা একহারা চেহারা আর দারুণ ফর্সা। যদ্দূর শুনেছি, এদের পূর্বপুরুষরা ইসলাম প্রসারে এদেশে এসেছিলেন। সম্ভবত ইরান বা আফগানিস্তান থেকে এসেছিলেন। বাঙালি জাতির মধ্যে দ্বাদশ শতক থেকে নানা মুসলিম দেশ থেকে সাধকগণ আসতে থাকেন ইসলাম প্রচারে।
বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ-বিজয় থেকে শুরু করে বাংলায় একটা সাংস্কৃতিক মিশ্রণ ঘটতে থাকে। পূর্বের বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের সঙ্গে ইসলাম ও সুফিবাদের অভিঘাতে বাংলার কৃষ্টি নতুন করে সাজতে থাকে। নানারকম মাজার ও আখড়া তৈরি হতে থাকে। আসে তান্ত্রিকবাদ, নাথবাদ, বাউল ও সহজিয়াপন্থা। বড় ধর্মের অনেক শাখা-প্রশাখা গজাতে থাকে। জৈনধর্মও প্রচুর প্রভাব ফেলে। যেমন ফেলেছে সুফিবাদ।
বাংলায় সুলতানি আমল একটা চমৎকার সমন্বয়ধর্মী
সংস্কৃতি গড়ে তোলে। বাংলায় রামায়ণ-মহাভারত অনূদিত হতে থাকে। অনেক পুঁথি তৈরি হয়। মঙ্গলকাব্য অঞ্চলভিত্তিক সংস্কৃতির ঐতিহ্য তুলে ধরে। আসে কারবালার কাহিনি। শাহনামার মতো মহাকাব্যের সঙ্গে পরিচিতি। মঙ্গলকাব্যের উদ্ভব।
তো লুথুমামার পদায়ন। এখন বাসায় তিনি একচ্ছত্র নায়ক। তিনি আমাদের তিন ভাইয়ের জিম্মিদার হয়ে গেলেন। মামাকে পেয়ে আমরাও তার গায়ে-মাথায় চেপে অনেকদিন পর আবার স্নেহের আশ্রয় পেলাম। তিনি নিজ হাতে আমাদের খাইয়ে দিতেন। আমি বাদে বাকি দুজন রাতে বিশেষ করে কলা মাখিয়ে দুধভাত খাওয়ানোর চেষ্টাটা ছিল সহজ। ছোট দু’ভাই হাঁ করলে তিনি গালে লোকমা ভরে দিতেন। লোকমা, মাপনে দলাপাকানো অন্ন – সম্ভবত এটি ফার্সি শব্দ হবে। বাংলা ভাষায় আরবি-ফার্সি ভাষার একটা বড় অবস্থান। বিশেষ করে জমি-জায়গা সংক্রান্ত সব শব্দ ফার্সি। জমিন, পর্চা, খতিয়ান, দলিল – মৌজাটা অবশ্য আরবি – গ্রামের চেয়ে কিছু বড়।
ক্রমশ মা সেরে উঠলেন। অসংখ্য ধন্যবাদ ডাক্তার অমলেন্দুবাবুকে। তিনি আমাদের ধন্বন্তরি বা বিধান রায়। যে-যুগে টাইফয়েডের ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি, সেই রোগীকে বিনা হাসপাতালে সারিয়ে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। মার ভালো হতে প্রায় একমাস লেগেছিল। আমরা ছিলাম অনাথের মতো। লুথুমামাকে পেয়ে আমাদের সব কষ্ট দূর হয়ে গেল। তাঁর স্নেহের প্রকাশ আজো আমাকে মনে করিয়ে দেয় সেসব দিনের কথা। তিনি যেন ছিলেন ঈশ্বরপ্রেরিত কোনো দেবদূত।
সেই নানি আর মামারা আজ আর কেউ ধরাধামে নেই। তাঁদের জন্য শুধু মনের মধ্যে গুমরে ওঠা কান্না ছাড়া আর কিছু দেওয়ার নেই। একটি জীবন গড়ে উঠতে কতজনের যে সেবা-ভালোবাসা-স্নেহ-আশীর্বাদ জড়িয়ে থাকে, তা স্বীকার করে কখনো ঋণ শোধ করা যায় না।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.