আশ্বিনের অপেক্ষা শেষে কার্তিক পড়তেই মন চনমনিয়ে ওঠে। মনের মধ্যে দোলা লাগে। সে-দোলায় বাকবাকুম-বাকবাকুম ডাকটা বেশ টের পায় গোলামালি। কার্তিক-অঘ্রানে হালকা শীত-শীত একটা আমেজ শরীর-মনকে ঠান্ডা রাখে। পৌষ, মাঘ, ফাল্গুনে তো শীতের জেরবারে কাহিল দশা। ঋতুর এই চড়কানাচন বড় বিচিত্র। লোকমানপুরের আকাশে ভাতের মাড়ের মতো মেঘ লেপ্টে থাকে। গোলামালি হলদিগাছি-চারঘাট-আড়ানী-পিরিজপুর-নন্দনগাছির দিকের প্রায় সব খেজুরগাছের গাছি। তার সাগরেদ আছে দশ-বারোজন। দিন দিন তারাও পাকা শিউলী বা গাছি হয়ে উঠেছে। ওস্তাদকে মান্যও করে বটে তারা। কর্মঠ-ক্লান্তিহীন গোলামালির মতো তারাও পরিশ্রমী।
এবার কার্তিক পড়তেই শীত বেশ জাপটে বসেছে, শীতের কামড় বাঘের দাঁতের চেয়েও মারাত্মক মনে হয়। দুপুরের পরপর শরীরটাকে আর বিছানায় গড়ান না দিয়ে বাপেকার মাডগার্ডহীন ভাঙা সাইকেল নিয়ে বের হতে হয় গোলামালিকে।
অনেক-অনেক দূরে যেতে তার এতটুকু ক্লান্তি লাগে না। সাইকেলের দুই হ্যান্ডেলে এবং পেছনের ক্যারিয়ারে পেল্লাই সাইজের অ্যালুমিনিয়ামের কেতলি। সঙ্গে দু-চার রকমের হেঁসো, সান দেওয়ার পাতলা পাথর, কোমরে হেঁসো রাখার চোঙা। একগাছা পাকানো দড়াগাছা, লোহার সরু চোঙা, আরো নানা খুঁটিনাটি সরঞ্জাম, একজন পাকা শিউলীর যা লাগে। সাগরেদরাও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যায়, রসের যত জোগান, গুড়ের তত বাড়বাড়ন্ত। গুড়
বেশি-বেশি মানে হলো ব্যবসার উন্নতি। বাতাসে যখন গুড়ের সুঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার হয়ে মাতামাতি করতে থাকে, তখন গোলামালির মনটাও কেমন আইঢাই করে ওঠে। রসের জ্বাল যত সুনিপুণ হয়, মনটা তখন হারিয়ে যায় কোথায়। ফাল্গুন মাসের একটা হালকা ছোঁয়া এভাবে তাকে উচাটন করে কেন বোঝে না কিছুই সে।
পড়ন্ত রেশমি বিকেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোলামালি ভাবে, এবার আরেকটা বিয়ে করবে। ভাবনাটা দীর্ঘদিনের, কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। বিয়ে মানে আরেকটা বিয়ে, আরেকটা বউ। নতুন বউ ঘরে এলে তার ভাগ্যের সঙ্গে বউয়ের ভাগ্য এক হলে ব্যবসার উন্নতি হবে। নতুন-পুরনো দুজনে একসঙ্গে কাজ করলে মন্দ কি! আগেরটা পরিশ্রমী। নতুনটাও তার দেখাদেখি পরিশ্রমী হয়ে উঠতে কদিন আর লাগবে। অতএব বিয়ে তাকে করতেই হবে।
সেদিন কথাটা জরিনাকে বলতেই গোখরা সাপের মতো ফণা তোলে। চোখে বিষ থাকলে হবে কী, কাজ তো হয় না। গোলামালি আলগোছে নিজেকে সংবরণ করে।
মনে-মনে বলে, যে সাপের বিষ নেই, তার আবার কুলোপনা … অমন সাপের ছোবল কত সে খেয়েছে জন্ম থেকে। কী হয়েছে? মরেনি আজো। কেন মরবে? ইচ্ছা করলেই কি মানুষ মরতে পারে? মরা তো কারো হাতের মোয়া নয় যে, মরতে ইচ্ছা হলো আর মরে গেলাম। ওপরওয়ালার মর্জি না হলে কেউ মরতে পারে না। সবই তার কারসাজি, দাবা খেলার আসল রহস্য তো তার নিজের হাতে। সে যা করে, তাই হয়।
ফাল্গুন মাস এলেই মনটা কেমন উড়ুউড়ু করতে থাকে। কী যেন চাই, কী চাই, তা সে নিজেই জানে না। জরিনার মধ্যে আর সেরকম স্বাদ নেই, দিন দিন কেমন পানসে-পানসে একঘেয়ে লাগে সবসময়। তারপরও মুখ ফুটে তো কিছুই বলা যায় না। বিষ খেয়ে বিষ হজম আর কি! টাকা-পয়সা যতই আসুক না কেন, মনে তৃপ্তি বা শান্তি না হলে তো জীবন বিষণ্ন-বিপন্ন হবেই। জীবনে সখ-সাধ বলে তো একটি বিষয় আছে, জীবন মানে তো শুধু টাকা রোজগার করা নয়, একটু সুখ, একটু আনন্দ, বাকিটা হয়তো গল্পের। সে-সুখ তো জরিনা দিতে পারে না। আগের মতো আর নেই সেই মজা-আনন্দ।
লোকমানপুরের স্টেশনের কাছাকাছি এসে পশ্চিমের ঘন সবুজের দিকে একবার তাকিয়ে মন হারিয়ে যায়। একদিন এখানে কত ট্রেন থামতো, আজ সবই পুরনো গল্পকেচ্ছা, মানে ইতিহাস। নামমাত্র স্টেশন, কাঠামো ভেঙে-ভেঙে একশেষ অবস্থা। প্ল্যাটফর্ম-চাতাল সবই ইট বের হওয়া ঘেয়ো নেড়ি কুকুরের দশা। বাদুর-কাকের বাসা, আরো কত কী রয়েছে তার ফিরিস্তি দিতে গেলে বিশাল ফর্দ করতে হবে। রাজ্যের বেজি-শেয়াল আর সব সাপখোপের আস্তানা। কোনো ট্র্রেন আর থামে না। মানুষ যতই এগিয়ে যাচ্ছে সময়ও যেন কেমন ছোট হয়ে আসছে। এপাশে আড়ানী ওপাশে আবদুলপুর, মাঝে লোকমানপুর। কেন থামবে আর আন্তঃনগর, মেইল-কমিউটার ট্রেন। লোকাল ছোটখাটো মাঝারি ট্রেন কি থামে দু-একটা! গোলামালি অনেক চেষ্টা করে দেখার, নিশ্চয়ই কোনো সাক্ষী থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু না, অন্বেষণ করেও কোনো লাভ হয় না। বুকের মধ্যে কেমন একটা হ্যাচড়প্যাচড় শুরু হয় একসময়। বাপজানের মুখে শুনেছে এককালে দূর-দূর শহরের ক্রেতা-বিক্রেতা, ফরিয়া-পাইকাররা শুধু খেজুর গুড়ের বায়না করতে ভাদ্র-আশ্বিন থেকে কার্তিক-অঘ্রান মাস অবধি আসতেই থাকতো লোকমানপুরে। সে-সময় শত-শত গেরস্তবাড়ির গুড়ের জ¦ালে মোহিত হতো আকাশ-বাতাস। সেই সুঘ্রাণে দূর-দূর অঞ্চলের মানুষ কী এক শিহরণে-উত্তেজনায় ছুটে আসতো এই হদ্দগাঁয়ে। অথচ আজ সেই স্টেশনটাই হারিয়ে যেতে বসেছে, কোনোদিন বা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে ওর সর্বশেষ স্মৃতিচিহ্নটুকু। তখন কেউ জানবে না, একদিন এখানে একটা লোকমানপুর স্টেশন ছিল। ব্রিটিশরাজ এলাকার মানুষের কথা ভেবে স্টেশন করেছিল এখানে। একটা সময়
বেপারি-সওদাগরদের হাঁকডাকে সরগরম থাকতো। শোনা যায়, আশপাশে দু-চারটে বেপাড়াও ছিল তখন। কাস্টমার যেহেতু ভিনদেশের এবং অল্প সময়ের, তাই সেটাকে পাড়া বলা যায় না। তবে বেপাড়া মানে পাড়া নয় – এমনটাও নয়। সেটাও পাড়া, তবে ভিনদেশি নিশিলোকেরা সেখানে কদাচিৎ হাজির হতো। কত কিসিমের মানুষ এখানে আসতো। তাদের জন্য দরকার ছিল এমন বেপাড়া। তারা আসতো ক্ষণিকের সুখ-সুখ ভালোবাসা কিনতে। মানুষ সারাজীবনে কত কিছুরই না বেসাতি করে। জীবন থেকে সেগুলো কিনতে হয়, আবার জীবনেরই হাটে বিকিয়ে দিতে হয়। গোলামালিও প্রথম যৌবনে কয়েকবার গিয়েছিল, হয়তো পথ ভুলে। তবে সে-আনন্দ আজো শিরায়-শিরায় বয়ে বেড়ায়। যার কারণে এদিকে এলেই সে-অনুভূতি জেগে ওঠে, মনটাকে নাড়িয়ে দেয় কিসের এক অচেনা বাতাস। সে-বাতাস যেন বাতাস নয়, ভালোবাসার পরম মমতা। জরিনাকে পাওয়ার পর ভুলেই গিয়েছিল সেসব স্মৃতি। তারপরও মন থেকে তো সরানো যায় না সবকিছু। গোপন ভালোবাসা হয়তো একেই বলে। আজো পৌষ-মাঘের কনকনে শীতে জাকিয়া, রাবিয়া, সীমা, আনারকলির কথা মনে পড়ে। বেপাড়ার এসব মেয়ে তার মনকে একটা সময় রাঙিয়েছে ক্ষণিকের জন্য হলেও।
ফাল্গুন মাসের বৈরী বাতাসে মনকে শান্ত করেছিল বেপাড়ার তন্বীরা। আজ তারা কোথায় কে জানে। কে কার খোঁজ রাখে। সময় মানুষকে সবকিছু ভুলিয়ে দেয়।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের আগুনঝরা গরম শরীরমনে উত্তাপ তোলে।
লোকমানপুর স্টেশন থেকে মাইল তিনেক দূরে খেজুরগাছের বাগানে গোলামালি নিজেকে হারিয়ে ফেলে। গাছগুলো পোয়াতির মুখের মতো আনন্দ-আহ্লাদে ভরা যেন। বাসুদেবপুর-মালঞ্চি-মধুঘাটি-এনায়েতপুরের ওদিক থেকেও সম্বন্ধ আসছে। গোলামালির সৎমায়ের ভাই, অর্থাৎ আতাবুর মামা পেছনে লেগেছেন বেশ কয়েক মাস ধরে।
– আমার এক দূরসম্পর্কের ভাগ্নি আছে, অল্প বয়সে স্বামীছাড়া, তুমি ইচ্ছে হলে বিয়ে করে ঘরে আনতে পারো …
– কিন্তু মামা জরিনা কি মানবে, যদি কোট-কাচারি করে।
– না ভাগ্নে, তুমি তো পুরুষ নও দেখছি …
– বিয়ে করা যায়, কিন্তু …
– আবার কিন্তু কী ব্যাটা। রোজগার করছো ভালোই, তোমার মা-বাপ তো নেই, সৎমা অর্থাৎ আমার বোনটাও তো চলে গেল, এখন কি আর …
– কথা ঠিকই, জরিনার দু-দুবার বাচ্চা নষ্ট হলো, আর সম্ভাবনাও নেই। মরা শুকনো খেজুরগাছের মতো অবস্থা, রস আসবে না আর …
– তাহলে বোঝো, আমি তোমার তিন কুলের এক মামা তো বটেই, আপন মানুষ বলতে যা বোঝায়। তাই বলি, ভাগ্নিটাকে ঘরে তুলে নাও।
– জরিনাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম তো! ওকে দুঃখ দিতেও মন সায় দেয় না …
– আহা দুঃখ-কষ্ট দেবেই বা কেন! শুধু ঘরে একটা নতুন মানুষ। ধরে নাও নতুন আরেকটা কাজের লোক। আয়-উন্নতিও তো বাড়বে, ওর কপালেই ও খাবে …
হঠাৎ আতাবুর মামার কথা স্মরণ হতেই গোলামালি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বিয়ের কথা চাওর হতেই ইয়াসিনপুরের নইমুদ্দী কবিরাজের ছেলে মরিচ শেখ রাতারাতি একদিন বাড়ি এসে জানায়, ভালো-মন্দ মিলিয়েই কিন্তু মানুষের জীবন, তো কথা হলো, আমি দু-চার-দশ অঞ্চলের মানুষের বাড়ির হাঁড়ির খবর জানি, কারণ আমার পেশা কি না …
– কিন্তু আমি তো মানুষ চিনি না, অতশত বুঝিও না, সোজাসাপটা দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ …
– ওখানেই তো সব ফিনিশ, মানুষ চিনতে হবে, তুমি মিয়া আমাকে না চিনে কি না আতাবুর মাঝিকে চিনে ফেললে? জানো ও একটা আস্তো বদের ধাঁড়ি, ওর বাপ একটা পিশাচ, দয়াগঞ্জের ঘাটের পারানি ছিল …
– জানি, আমার আব্বা শেষকালে বিয়ে করে আতাবুরের বিধবা বড় বোনকে, ছাবেরালি পারানির মেয়ে …
– তো, ওই হারামজাদা সাতগাঁয়ের মেয়েদের নষ্ট করে দূরসম্পর্কের আত্মীয় বলে বিয়ে দিয়ে টাকা কামায় …
– আতাবুর মামা তো ঘটক না, নির্ভেজাল মানুষ শুনি।
– কী যে বলো, আতাবুর বাসুদেবপুর-মালঞ্চির মানুষ নয়, সে কি জিনিস জানো না, একটা বউ বাসুদেবপুরে আরেকটা মালঞ্চির দিকে আছে, আবার শুনি হিলি নাকি বালুরঘাটের দিকে আরেকটা আছে …
– তা তো জানি না, অনেকদিন পর দেখা হলো সেদিন।
– হ্যাঁ এই তো, আমি মরিচ শেখ, আমার আব্বা নইমুদ্দী শেখ কবিরেজ। আমরা সাত তল্লাটের মানুষকে
হাড়ে-গতরে চিনি। আমার হাতে হাজারখানেক মেয়ে আছে, হ্যাঁ কমবেশি তা হবে। তুমি একেবারে সধবা আনকোড়া মেয়ে বিয়ে করবে …
গোলামালি কোনো কথা বলতে পারেনি। মরিচ শেখের মুখে আতাবুর মামার ভেতরের কথা শুনে মনটা ভেঙে যায়। ওর বাপ ঘাটের পারানি করত। শোনা যায়, ভালো মানুষ ছিল। তবে এমনও শুনেছে বেশ কয়েকটা বিয়েও করেছিল, অঘাটে-বাঘাটে পড়েও থাকতো। শেষকালে নাকি কোনো এক ডোমনির ঘরে মরেছিল। ওর মেয়েটাকে বাপের ঘাড়ে চাপিয়েছিল; কিন্তু বাপ চোখ বোজার আগেই ঢেমনি হলিদাগাছির নজেল মাছুয়ার সঙ্গে ভেগে যায়। দুর্নামটা আগে থেকেই ছিল, নজেল নাকি রাত-বিরাতে ফাঁকফোকর পেলেই গেছো বেজির মতো ঘরে এসে হা-ডু-ডু-ইসকাবনের টেক্কা খেলতো। গোলামালি ওসবে তেমন পাত্তা দিত না কোনোদিন। কারণ মা মরে যাওয়ার পর বাপ হয়েছিল তালই। কোনো ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই উল্টো ঝামেলা তার ঘাড়ে ঝেড়ে দিত।
মাঝরাতে গোলামালির মাথায় তাবদ-তাবদ সুন্দরী সধবা-বিধবা মেয়েদের ঝলকানি ধাক্কা দেয়। ওপাশে জরিনা খোলসছাড়া সাপের মতো শুয়ে আছে। ওর মধ্যে না আছে বিষ, না আছে গন্ধ, শুধু একটা মরা শরীর। অথচ একদিন ভালোবেসেই ঘরে এসেছিল ইছাপুরের যাবেদালি ঘরামির মেয়ে। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে তালগাছ ঝুড়াতে গিয়েছিল ইছাপুরের চেয়ারম্যানবাড়ি। পঁচিশ-ছাব্বিশটা গাছ, ছিল সুপারিগাছও। গোফর মুন্সী মানুষ ভালো। দিন পাঁচেক ছিল গোলামালি ওই বাড়িতে। কত কাজ করেছে তারপরও। যাবেদালি ঘরামির সঙ্গে তখন পরিচয়, গোবেচারা মানুষ। খুব ভালো লেগে যায় গোলামালির। একদিন নিয়ে যায় বাড়িতে। জরিনাকে দেখে মন ভরে। মাজা সমান কালো মিশমিশে চুল দেখে মন বড় আকুল হয়। মাস ছয়েক ঘুরতে না ঘুরতেই ঘরে নিয়ে আসে যাবেদালি ঘরামির মেয়েকে। তখন সৎমা ছিল, বাপটারও শয্যাগত অবস্থা।
জরিনাকে দেখে সৎমা বলেছিল, এ আবার এমন কি … আমার ভাইকে বললে এর চেয়ে ঢের সুন্দরী মেয়ে তোমার জন্য এনে দিত, সঙ্গে নগদ মালামাল, হাভাতে নয় তো …
খুব খারাপ লেগেছিল সৎমায়ের কথা শুনে। টাকা-পয়সায় কী হবে, ভালোবাসাই তো সব একজন মানুষের। জরিনার মতো একটা পানপাতা মুখের মেয়ে তার জীবনটা কানায়-কানায় ভরিয়ে দেবে। সেখানে টাকা নস্যি বই তো কি!
তার কিছুদিন পর বাপ চোখ বুজলে, সৎমা পালিয়ে গেলে বাড়িটা হালকা হয়। ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয় বলা যায়। এর মধ্যে নাকি অজানা-অচেনা ভূতের উপদ্রব বেড়ে যায়। জরিনাকে বেশ কয়েকবার জাপটে ধরে, পেটে বাচ্চা এলে নাকি খেয়ে ফেলে। কবিরাজ বলে, তোমার বউকে সহজে ছাড়বে না, খেতে যখন শুরু করেছে, ওর পেটে যত বাচ্চা আসবে, অশরীরি ভূত-আত্মা তা খেয়ে উদরের তৃপ্তি মেটাবে। কথাটা সত্য – তা গোলামালি অনুধাবন করেছে ঘটনা পরম্পরায়। একদিন নাকি সচক্ষে দেখেছেও মস্ত হাত-পাওয়ালা ভূতটাকে। মুখটা সেভাবে দেখতে না পেলেও পিলে চমকে যায় তাতেই। সেদিন থেকে বিশ্বাস করলেও ওসব নিয়ে বেশি আর বাড়াবাড়ি করেনি। ভূত নিয়ে কে আর অত নাড়াচাড়া করতে চায়।
কাকডাকা ভোর হলেই রস সংগ্রহ করা থেকে রস জ¦াল, তারপর গুড় আর গুড় … পরিশ্রমের এতটুকু কমতি নেই। জরিনাও গতর খাটায় সমানতালে। তারও কোনো আরাম নেই। মোষের মতো খাটতে জানে জীবনভর। শুধু চোখে-মুখে ক্লান্তি। তারপরও গোলামালির কদাচিৎ মনে পড়ে, সুখ নেই মনে, শরীরে তাই চরম ক্লান্তি। শরীরে কিসের টান পড়ে। এর মধ্যে কয়েকবার বেপাড়ায় গেছে শরীরের আগুন নেভাতে। কিন্তু আগুন যেন আরো দ্বিগুণ বেড়েছে। রাতের দিকে তালের রস খেতে গিয়েছিল নগেনের ঝুপড়িতে। ও-ই বললো, চলো আজ ঘুরে আসি কোমরদুলানি সাধনার ঘর থেকে …
কোমরপুরের নগেনের সঙ্গে ভাব সেই কিশোরবেলা থেকে। সাধনার রূপ-যৌবন-শরীর যত দেখা যায় নেশা যেন ততই বাড়ে। সাধনার চোখ আর হাসি দিনরাত উন্মাদ করছে গোলামালিকে।
সপ্তাহখানেক যেতেই নগেনের কাছে আবার যায়, চলো সাধনা, না রমনা কে যেন আছে …
– আহা যাবে যখন তো যাবে, আমার সাইকেল তো আছেই …
শীতের কনকনে ভাবটা বেশ জমাট আজ। নগেনের মাডগার্ডহীন সাইকেলের পেছনে বসে আছে গোলামালি। এবড়োখেবড়ো মাটির সড়ক। পাকা সড়কও বেশ ভাঙাচোরা। সরকার গাঁও-গ্রামের সড়কগুলোকে সেভাবে লক্ষই করে না। অকস্মাৎ নগেন বলে ওঠে, এই মিয়া, ঘরে তো বউ রেখে এসেছো। রাতের ভিজিট এত বাড়ালে হবে …
নগেন বিয়েশাদি এখনো করেনি। তবে রাতের ভিজিট বেশ বাড়ে। কেউ বলার নেই। তাড়ি-ধেঁনো-পচানি যা বিক্রি করে সবই ওর পয়সা। সংসারে তেমন কেউ নেই। আছে বলতে এক বিধবা বয়স্ক পিসি। তো সেও দিনরাত বিছানাগত, একটু ভাত-শাকপাতা রেঁধে দেয়, তা-ই দুজনে খায়।
– না মানে, এই একটু নতুন কিছু আর কি?
– এই তো গুরু আমার পথে এলে …
– মানে বুঝলাম না, তোমার পথ আবার কি?
নগেন বলল, দেখো আমারও কি ইচ্ছে করে না এই শীতে বউকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকি, ইচ্ছে করলে একটা বিয়েও করতে…
– কেন করছো না তাহলে …
– ওই তো বললে। শোনো, একই জিনিস জীবনভর না খেয়ে নতুন-নতুন খাওয়া কি …
– হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো ভায়া …
– তুমি বিয়ে করেছো একটা, ঠিক আছে করেছো, বেশ করেছো; কিন্তু খবরদার আর দ্বিতীয়টা এনো না …
– না মানে, তুমি জানলে…
– আরে মিয়া গাঁয়ের খবর চাপা থাকে, মরিচ শেখ বলো আর আতাবুর বলো, সব শালাই ধান্ধাবাজ, বিয়ে দিয়ে ফাঁসাবে…
– হুম, তুমি তো আমার বাল্যবন্ধু, তুমি বলো কী করব তাহলে।
– আমি আবার কী বলবো, রসের গুড় তৈরি করে বেশ পয়সা তুমি কামিয়েছো, এখন একটার জায়গায় দশটা কচি বউ ঘরে আনতে …
– কথা বলেছো বটে, কিন্তু জরিনার বাধা …
– কী দরকার ঝামেলা বাড়ানো, বরং এই তো ভালো, যখন খায়েস জাগলো ভরা নদীতে ডুব দিয়ে এলাম …
– ভরা নদীতে ডুব, আহা কী কথা শোনালে গো!
– কেন, তুমি যা করছো, তাই তো বলে নাকি!
– আহা নগেন তুমি কবি হয়ে গেলে দেখছি …
– দেখো দেখো, ওই আকাশের তারার মতো আমরাও ছুটে যাচ্ছি দূরে-দূরে কোথায় অজানায় …গোলামালি খুব স্থির হয়ে ভাবতে লাগল। সত্যিই মানুষও আকাশের তারা, শুধু ছুটে যায়, ছুটে-ছুটে কোথায় যেন যেতে চায়। রাত অনেক এখন। শেষ প্রহর। শিশিরে ভরে আছে চারদিক। নগেনের সাইকেলের সামনে রডে বসে গুটিসুটি মেরে সব কথা শুনে যাচ্ছে সে। বাংলা মদের দারুণ গুণ, যে খায় সে বোঝে, তুমুল উত্তেজনার মতো তুমুল বুদ্ধি বের হয়। নগেনের কথা শুনে গোলামালি কাস্তেতে ধার না দিয়ে সাপ মারবে, কিন্তু লাঠি ভাঙবে না। জীবন ভোগ করে যাবে, অথচ শরীরে কোনো দাগ থাকবে না। সংসার যেভাবে চলছে প্রবহমান নদীর মতো চলতে থাকবে। খেজুরের গুড়ের সুঘ্রাণে মোহিত হবে তামাম তল্লাট।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.