কাঞ্চনগ্রাম উপন্যাসে জীবন-বাস্তবতা

কাঞ্চনগ্রাম:

শামসুদ্দীন আবুল কালাম

সাহিত্য প্রকাশ

ঢাকা, ১৯৯৮,

দাম : ৩৫০ টাকা

শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-৯৭) বিভাগোত্তর বাংলাদেশের পঞ্চাশের দশকের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক। কাশবনের কন্যা (১৯৫৫) তাঁর বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয় উপন্যাস। কাঞ্চনগ্রাম (১৯৯৮) লেখকের কয়েক দশকের সাহিত্য-চর্চার নির্যাস। উপন্যাসটির পটভূমি, চরিত্র-চিত্রণ, কাহিনীবর্ণন ব্যাপক ও দীর্ঘায়ত। নবতর

প্রস্তাবনায় তাঁর এ-উপন্যাসে যে-আঙ্গিক রূপায়িত হয়েছে সেখানে মানবজীবন-বীক্ষণের পর্বে একটা সামগ্রিকতাকে ধরার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। উপন্যাসের ভূগোল কাঞ্চনগ্রামে সীমাবদ্ধ হলেও সেখানকার সমাজ-নৃতত্ত্ব-ইতিহাস -মনস্তত্ত্ব-ঐতিহ্য দীর্ঘ সময়কালকে ফ্রেমে এঁটেছে। কিন্তু কাঞ্চনগ্রাম-এর মূল কাহিনী মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিত এবং সে-সময়ের আতঙ্ক-দ্বিধা-সংকট-বিভীষিকার শহর-উপচানো প্রচণ্ডতার স্রোত। প্রবহমানতার সূত্রে যা পৌঁছে গেছে কাঞ্চনগ্রামে; গুটিকতক শেকড়-আকড়ে দিন গুজরান মানুষের চিত্তে, যা বীভৎসতার অশনিসংকেত হয়ে জেগে উঠেছে। মানুষের চলমান জীবনের স্বাভাবিকতাকে রুদ্ধ করেছে, প্রশ্নদীর্ণ ও চরম আতঙ্কমুখী করে তুলেছে মানুষকে। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি-প্রতিপার্শ্বও একই জটিলতায় আচ্ছন্ন। শিল্পীর রচনায় এগুলো কোনো নিছক ঘটনা নয়; এর কার্যকারণসূত্র, ভেতরের দর্শন আর সমাজ-নিষিক্ত পল্লী-মানুষের প্রাণনায় সময়ের রাজনীতির অনুপ্রবেশ বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনে বর্ণনা চলে। প্রসঙ্গত বলা

যায়, লেখক-উপস্থাপনার স্বরূপ উপন্যাসটির বাড়তি আকর্ষণ – কেননা অনেক রূপে, অনেক প্রসঙ্গ এলেও প্রায় একটি

গদ্যে, একই উত্থাপনে অনেক অনুষঙ্গে বয়ান করেন শিল্পী। বোধকরি কাঞ্চনগ্রামে এটি একদিকে লেখকের সচেতন নিরীক্ষাপ্রয়াস, অন্যদিকে একটি গ্রামীণ পটভূমির জীবন-বীক্ষণের স্বরূপকে দার্শনিক পরিধিতে যাচাই করবার ইঙ্গিত। শামসুদ্দীন আবুল কালামের ভাষা-বিষয়ে

এ-সচেতনতাই তাঁর উপন্যাসের ক্যানভাস তৈরি করে দিয়েছে। আর আধুনিক গণতন্ত্রের ফসল উপন্যাসকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কিংবা ব্যক্তি-অস্তিত্বের নিরিখে সমগ্রতায় বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিত রচিত হয় এমন সব প্রবণতা থেকেই। উপন্যাসটির অনেক জায়গায় ‘উৎপাদন ও ভোগ-ব্যবস্থার মধ্যে নিদারুণ বিশৃঙ্খলা’র কারণ ও পরিস্থিতির কথা বলা আছে। লেখকের সমাজসন্দিগ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিপ্রেক্ষিত অনুমান করা যাবে এ-উক্তির শর্ত থেকে। আর গোটা মানবজীবন ব্যবস্থাপনার স্বরূপও উপন্যাসে নির্ধারিত হয়েছে এমন দার্শনিক বিবেচনার ইঙ্গিতে।

দুই

আমাদের সাহিত্যের সমাজ-দর্পিত রূপের অনিবার্যতায় এমনটা সহজেই অনুমেয়, মানুষ কোনো সময়েই স্বয়ম্ভু বা নিরবলম্ব নয়; একটি ভৌগোলিক অবস্থান ও তার প্রতিপার্শ্বের আবহে মনোলোকের বিনির্মাণ চলে এবং সমাজ-নৃতত্ত্ব সেখানে মৌল অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। আর সামাজিক উৎপাদনে প্রবৃত্ত মানুষ তার অপরিহার্য অনিবার্যতায় উৎপাদন-সম্পর্কের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে। ফলে, মানুষ অর্থনেতিক ভিত্তির প্রাণকেন্দ্রে এক নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তিতে উজ্জীবিত হয়। সমাজ-অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে ঐতিহাসিক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তার যে পরিচালন-প্রাবল্য তাই তাকে জীবন-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন ও সন্দিগ্ধ করে তোলে। জন্ম

নেয় এক ধরনের সমাজ-আবিষ্ট জীবনদৃষ্টি। সুতরাং এমনটি নিশ্চিত যে, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনদৃষ্টিই তার সমাজপ্রসূত জীবনদর্শন। জীবনদ্রষ্টা শিল্পী তাঁর শিল্পগৌরবে স্বসমাজের দ্বান্দ্বিক বিবর্তন ও বিকাশকে এই প্রবণতা থেকেই চিত্রিত করেন। শামসুদ্দীন আবুল কালামের ঔপন্যাসিক-প্রতিভা এমন এক সমাজচৈতন্যের পরিপ্রেক্ষিতে নির্মিত। ব্যক্তির উদ্ভব ও বিকাশের জিজ্ঞাসা যেখানে উৎপাদন-সম্পর্কের পটভূমিতে উজ্জীবিত।

কাঞ্চনগ্রাম উপন্যাসে উৎপাদক

ও উৎপাদন-প্রসঙ্গে লেখকের

উচ্চারণ পৌনঃপুনিক। কাঞ্চনগ্রাম আবহমান গ্রামীণ সমাজ-অবকাঠামোর একটি প্রতীক মাত্র। কিন্তু এ সমাজ-ব্যবস্থাপনা, তার নিয়ন্ত্রণ, বিনির্মাণ, বিবর্তন ইত্যাদি প্রসঙ্গগুলো দীর্ঘায়িত উপন্যাসটিতে পরিশীলিত ও পরোক্ষ-ভাবনা থেকে বিধৃত। উপন্যাসে মূল চরিত্র জালাল মিঞা। তাকে ঘিরে কিছু শক্তিশালী চরিত্র তৈরি হয় লেখকের হাতে। আবদুল মাস্টার, হেদায়েতউল্লাহ, জনার্দন কর্মকার উপন্যাসের কাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। জয়নাল শেখ, মকবুল খাদেম এবং কদভানু, ইসহাক, নসু, নুরুদ্দীন, কালুর মা, চম্পা ইত্যাদি ছাড়াও আরো অনেক বিবিধ মাপের মানুষের পরিচয় মেলে উপন্যাসে। প্রত্যেক মানুষই সমাজ-অনুষঙ্গী এবং তাদের উৎপাদন-সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক সংগ্রাম ও সহনশীলতায় পরিচালিত। শামসুদ্দীন আবুল কালামের এ-উপন্যাসের বিষয় নিরঙ্কুশ সমাজ-নির্ভর এবং পরিকল্পিত বিন্যাসে সাজানো। ‘উপক্রমণিকা’ অংশে লেখক পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের ইঙ্গিতময় বিবরণ প্রদান করেন। লেখকের জীবনদর্শন, সমাজ-ইতিহাস-প্রসঙ্গের প্রবণতা এ-অংশেই বিধৃত হয়। মূলত ‘উপক্রমণিকা’ অংশটি উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি বলে অনুমান হয়; এরপর ‘অবতরণিকা’, ‘১ম অন্তরা’, ‘২য় অন্তরা’, ‘স্বতঃশীলা’, ‘অববাহিকা’, ‘ক্রমান্তরা’, ‘স্বয়ংবরা’, ‘মাধ্যমিকা’, ‘ধারা-উপধারা’, ‘উপলব্যথিতা’, ‘নিশীথ গম্ভীরা’, ‘গোপনাভিসার’, ‘পরম্পরা’, ‘দিক পরিক্রমা’, ‘অন্তঃশীলা’, ‘জীবনবন্যা’, ‘কূল-উপকূল’, ‘তরঙ্গরঙ্গ’, ‘বায়বাতাস’, ‘উদারা’, ‘বেপথু ব্যাকুলা’, ‘উপসংহার’ – অংশে বিভক্ত উপন্যাসে কাহিনীর ক্রমবিকাশ, পরিবর্তন ও প্রসার নজরে আসে। অংশ-বিভাজনে শিরোনামগুলো যেন কাহিনীর ইঙ্গিতময়তাকে প্রমূর্ত করে তোলে। আর এ-ইঙ্গিতময়তায় সময়ের আবহ নির্মিত হয়। ঘটনার আবর্তন চলে মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। যুদ্ধের উন্মাদনা, আতঙ্ক এবং উত্তেজনা কাহিনীর মূল প্রতিপাদ্য। উত্তেজনামুখর এ-সময়-প্রসঙ্গকে ঘিরে সমাজ-অন্বিষ্ট মানুষের রূপায়ণ চলতে থাকে স্মৃতি ও শ্রুতির দর্শনে, ইতিহাসে এবং রাজনীতির নিরিখে।

কাঞ্চনগ্রামের বর্ণনায় লেখকের উচ্চারণ:

যেমন বাবুই পাখির বাসা দোলে কোনও কোনও গাছের ডালে অনেকগুলি একই ধারে, যেন সেই মতই গড়িয়া উঠিয়াছিল এক পাশের কাঞ্চনগ্রাম, মূল সড়কের একধারে বিল আর অন্যদিকে নদীতে ঠেকাইয়া। গ্রাম হইতে সড়কটাকে যেমন আন্দাজ করা যায় না, আবার সড়কের দিক হইতেও তার অবস্থান আকৃতি নির্ণয়ও কঠিন। পুঞ্জ পুঞ্জ বাড়িঘর যেন মুখ থুবড়াইয়া রহিয়াছে জলাভূমির মধ্যে, এক হইতে অন্যে বিচ্ছিন্ন। নানারকম গাছগাছালির আড়ালে-আবডালে কেবল কোথাও কোনও ধোঁয়া অথবা কাকপাখির গতিবিধি দেখিয়া কী কলরব শুনিয়া আন্দাজ করা যায়, কোনখানে বসতি আছে অথবা কী ঘটিতেছে। (কাঞ্চনগ্রাম, পৃ. ৮০)

সমাজ-অন্বিষ্ট-ভাবনায় এমন বিবরণ যেমন মেলে, ঠিক একই উচ্চারণে এ-গ্রামের বাসিন্দা

ইছু-নসুর জীবন ও জীবিকার প্রসঙ্গও বিধৃত হয় – ‘ইছু-নসু দুই ভাইর ঘর-গৃহস্থালি। সামান্য জমিজমা, তবে তাহাদের প্রধান পেশা হইয়া দাঁড়াইয়াছে মাটি কাটিয়া দূর দূর এমনকি রাজধানী শহরের বিভিন্ন ঘাটেও লইয়া যাওয়া। সেইখানে সব জলাভূমি এবং খানাখন্দ ভরাইয়া নূতন নূতন ও বিরাট বিরাট দালান-কোঠা উঠিতেছিল। ইছু-নসুর নৌকা এমনই বোঝাই থাকে যে মনে হয় সামান্য একটু তুফান দেখা দিলেও হয়ত ভূশুৎ করিয়া তলাইয়া যাইবে।’ ইছু ও নসুর মতো কাঞ্চনগ্রামে আরো যারা বেঁচেবর্তে আছে তাদের জীবন-ব্যবস্থাপনাও খুব জটিল

বাস্তবতাবাহী। যুদ্ধ করেই তারা বাঁচে, প্রশ্নই বৈকি – কিসের যুদ্ধ, কেমন যুদ্ধ, কার জন্য যুদ্ধ? ক্ষুদ্র একটি গ্রাম, যে-গ্রামের মাত্র গুটিকতক ভূমিসংলগ্ন মানুষ অন্নজলে বেঁচে আছে, একমাত্র গ্রামকে ভালোবেসে এ-গ্রামে যুদ্ধ চলুক; বিপন্ন অবস্থা তৈরি হোক – কিংবা অনাহূত অপরিচিত কেউ এসে এর পরিবেশ নষ্ট করুক, তা কেউ চায় না। জালাল মিঞা এ-গ্রামের প্রচণ্ড প্রভাব-প্রতিপত্তির মানুষ নন। কিন্তু প্রবল এক ব্যক্তিত্বে উজ্জীবিত মানুষ। পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে তার আধিপত্য জোরালো হলেও খুব ধীরস্থির; সমাজ-ইতিহাস-নৃতত্ত্ব-জিজ্ঞাসু এ-ব্যক্তিটির প্রতিপার্শ্বের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ঋজু ও পরোক্ষ। নির্বিরোধী ও দ্বন্দ্বমুখর না হলেও তার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি আছে। সমাজ-জিজ্ঞাসু জ্ঞান তাকে সারাক্ষণ নিরীক্ষার মধ্যে রাখে এবং এ-চরিত্রের পটভূমিও লেখক উত্থাপন করেন এমন বিশ্লেষণে :

কিছুকে শাশ্বত মনে না করিবার চিত্ত-চারিত্র্য হয়ত জালাল মিঞাও পাইত, যদি না অকস্মাৎ নিজেকে অন্য একরূপে আবি®কৃত না দেখিত। জীবন তাহার সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করাইয়া উৎক্ষিপ্ত করিয়া দিয়াছিল তাহাকেও, আবার সেই জীবনই তাহার হতশ্রী গৃহ-সংসারকে রূপে-সৌষ্ঠবে ভরিয়া তুলিতেছিল। কোন বড় আকাক্সক্ষা সে করে নাই, প্রত্যাশাও করে নাই, নিজেকে প্রার্থী করিয়া কোন সুখসমৃদ্ধি যাচ্ঞা করে নাই কাহারও কাছে, অথচ উদাসীনও হইতে চাহিতেছিল না। (পৃ. ৪৭)

‘উপক্রমণিকা’ অংশে বোধকরি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের যে-সারসংক্ষেপ বিবৃত হয় সেখানে লেখক-কথনে কাঞ্চনগ্রামের বিবর্তিত রূপ রচিত হয়। এক্ষেত্রে জালাল মিঞা লেখকের একটি অবলম্বন মাত্র। তবে অনেক প্রসঙ্গ এ-অংশে গ্রথিত হলেও ‘গ্রাম উপেক্ষিত কেন’ তার একটা দার্শনিক বিবেচনা এখানে রূপায়িত। কাহিনীর সূচনা-অংশে (বীঢ়ড়ংরঃরড়হ) কিছু উদ্দিষ্ট চরিত্রের উপস্থাপনে উপন্যাস শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। কাঞ্চনগ্রাম-এর সমাজ-বীক্ষায় জালাল মিঞা, জনার্দন কর্মকার, আবদুল মাস্টার ক্ষয়িষ্ণু

অস্তিত্ত্বে পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল

বাস্তবতার প্রতিভূরূপে চিহ্নিত হয়। প্রাসঙ্গিক হয়ে আসে, দ্বান্দ্বিক সংগ্রামের সূত্রে বিবর্তিত মানুষের স্মৃতি-শ্রুতি ও সংস্কারের পটভূমি:

লাঠির উপর ন্যস্ত-মুষ্টি দুই হাতের উপর মস্তক নত করিয়া বেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসিয়া রহিয়াছিল জালাল মিঞা। পাশে নিত্যকার মতো বিশাল গাঙ্গ বহিয়া যাইতেছিল তাহার নিজস্ব রভস-রঙ্গে, কৌতুক-নৃত্যে, চাপল্যে-নিমেষে, কেবল তাহার উৎস এবং গন্তব্য ব্যতীত কোনও দিকেই কোনও ভ্রƒক্ষেপমাত্র ছিল না। তবুও সেই গাঙ্গের স্রোতেই মানুষ আসিয়াছে, আবার ভাসিয়াও গিয়াছে; সেই স্রোতকেও ব্যবহার করিতে শিখিয়াছে আপন প্রয়োজনে; কুমারপাড়ার কুম্ভকারেরও নিজেদের সমস্ত সৃষ্টিশক্তি ও বুদ্ধি দিয়া নিষ্ঠুর ঔদাসীন্যের কবল হইতে রক্ষা পাইতে চাহিয়াছে; বান-বন্যার কালে বাঁধ

দিয়া ক্ষেত-মাঠ-ফসল জীবন প্রাণ রক্ষার জন্যও উদ্যমের অভাব হয় নাই। …(পৃ. ৪৩)

এতদ্ব্যতীত আরো অনেক ব্যাখ্যা এলেও কোনো কিছু সুস্পষ্ট কার্যকারণ অনুমান করা যায় না। তবে প্রশ্ন ও বিতর্কের আড়ালে সমাজের বাতাবরণে উঠে আসে জালাল মিঞার অতীত-বর্তমান। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পটে পক্ষ-বিপক্ষের শক্তি চিহ্নিত হয়। পাওয়া যায় উৎপাদন ও উৎপাদকের মাঝে মধ্যস্বত্বভোগীদের। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উন্মত্ততাও কালের স্রোতে বহমান থাকে। প্রাসঙ্গিকরূপে তা-ও স্পষ্ট হয়। জালাল মিঞার কৈশোর ও যৌবনের স্বপ্নস্মৃতিতে ধরা দেয় – পেশাজীবীর পেশার পরিবর্তন, ধর্ম-বর্ণ-জাতভেদে সমাজ-মর্যাদা মূল্যায়ন এবং প্রভাবশালীদের প্রক্রিয়ার প্রকৃতিতে। সমাজে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ। যুদ্ধই যেন দৈনন্দিনতার জীবনচরিত। এককালের ‘বাদিয়ার বাজার’ পরিণত হয় বৈদ্যের বাজারে, মহামারি ও অন্যান্য বিপর্যয়ে গ্রাম বদলে যায়; কৃষক-চাষী, চণ্ডাল-নমঃশূদ্র, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জীবন-যাপন একরকম থাকে

না। ত্রিদিবের তাঁতির ব্যবসা, জাল-জেলে-নৌকার মানুষরা নীরবে আত্মসমর্পণ করে।

প্রভাব প্রতিক্রিয়া ও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দাপটের সঙ্গে ভয়ার্তরূপে আসে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নিয়তি সময়ের ভূমিপুত্রদের বিবেচনার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয় ‘যারা চিরকাল অন্যের সৎকার করে তাদের সৎকার কেউ করতে চায় না’। ঔপন্যাসিকের এসব সমাজ-ব্যাখ্যায়নের মাঝে কাহিনী তৈরি হয় জালাল মিঞার আশ্রয়ে যখন কদভানুর মা, রূপা, কানু, কদভানু এসে পড়ে। খুব নির্বিকার আবহের মধ্যেই রূপা অন্তর্মুখী মনস্তত্ত্বে মূল চরিত্রের প্রকৃতির মধ্যে অনুপ্রবেশ করে। জালাল মিঞার ভাবজগতের যাবতীয় প্রণোদনা তৈরি হয় রূপার আশ্রিত জীবনকে ঘিরে। পরিশীলিত প্রবণতায় দ্বান্দ্বিক জীবন-ব্যাখ্যায়নে প্রেমজ আবেগে তথা মানবিক অনুষঙ্গের নানা মাত্রায় জালাল মিঞা তার সংসারে রূপা-কদভানু-কানুর আবির্ভাবকে গুরুত্বের সঙ্গেই গ্রহণ করে। একই সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে কদভানুর ভবিষ্যৎ-নির্মাণে নিশ্চিন্তরূপে আবদুল মাস্টারকেই সে নির্বাচন করে। জালাল মিঞার নিরন্তর নির্বিঘ্নরূপে কাঞ্চনগ্রামে বসতির অনিবার্য সঙ্গী আবদুল মাস্টার। উপন্যাসে ‘দ্বিতীয় অন্তরা’ অংশে আবদুল আলী মাস্টারের ধর্মবিশ্বাস, প্রতিপার্শ্ব, পড়াশোনা, ‘হয়ে ওঠা’ প্রসঙ্গে বিস্তৃত বিবৃত করেন লেখক। সমাজ-রাজনীতির ছকে কাহিনীর প্রবহমানতার মাঝেই স্বতঃস্ফূর্ত উঠে আসে আবদুল আলী মাস্টারের জীবনচরিত। গৃহশিক্ষক ইন্দ্রলাল রায়ের প্রভাব ও দীক্ষাই মূলত আবদুল আলীকে ঔৎসুক্য করে তোলে যাবতীয় জ্ঞান-বিষয়ের প্রতি। জায়গির বাড়ির উকিলকন্যা মালকা বানু তার মানসপটে বৈচিত্র্যের রং ছড়ায়। উপন্যাসে আবদুল মাস্টারের ব্যক্তিত্বে মালকা বানু-প্রসঙ্গের গুরুত্ব না থাকলেও ‘নিশীথ গম্ভীরা’ অংশে তার পুনরায় উপস্থিতি একটা মাত্রিকতা আনে। তবে গোটা উপন্যাসে জালাল, হেদায়েতউল্লাহ, আবদুল মাস্টার যে-সম্পৃক্ততায় উপস্থাপিত তা বাঙালি সমাজের দীর্ঘ সমাজ-নৃতত্ত্বের পটভূমিকেই চিহ্নিত করে। হেদায়েতউল্লাহর পরিবারে স্ত্রী আয়েশা, মেয়ে কুলসুমের জীবন-ব্যবস্থাপনা সেখানে ঔপনিবেশিক শাসনসূত্রে পাওয়া বিপন্ন এক গ্রাম-সংস্কৃতিরই রূপায়ণ, সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রে খুব তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয় ‘প্রথম অন্তরা’ অংশে জালাল মিঞার নিকট কদভানু-প্রদত্ত সিন্ধুকের আড়াল থেকে পাওয়া গাঁটরি-প্রসঙ্গ। লৌকিক জীবনাচারে সিন্দুকের অবস্থান, তার অতীত, বংশপরম্পরায় তার ব্যবহার-রীতি এবং গাঁটরির ভেতরে পাওয়া বিবিধ প্রকরণের উপাদানগুলো সযত্নে আঁকড়ে রাখা – উর্বর এক সময়-সংস্কারকে যেন লেখক এক ঐতিহাসিক বন্ধনে আবদ্ধ করেন। জালাল মিঞার পরিবারের প্রকরণ এবং দীর্ঘায়িত উপন্যাসের পরিণতির দিকে ‘কূল-উপকূল’ অংশে তার শহরে গমন ও উকিলের শরণাপন্ন হওয়া, ফেরার পথে ‘উদারা’ অংশে পুটুলি হারিয়ে যাওয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গ ঔপন্যাসিকের মানবজীবনের অনিবার্য সূত্রের ইঙ্গিত। লেখক-জীবনদর্শনের মূল ভিত্তিভূমিতে বিধৃত হয় চিরায়ত সংস্কার ও নৃতত্ত্বের নিরীক্ষার স্বরূপ। এক্ষেত্রে কাঞ্চনগ্রাম-এর পটভূমি লেখকের আত্মজৈবনিক বীক্ষণ ও পরিপক্ব অভিজ্ঞতার ফলশ্রুতি। দীর্ঘ শহরবাসের সময়গুলো তাঁকে এ-পরিপ্রেক্ষিত নির্বাচন ও অন্তর্বয়নকে এত বেশি দায়িত্বশীল করে তুলেছে, অনুমান করি। তবে ‘প্রথম অন্তরা’ অংশে এসব কিংবদন্তির সন্ধান ও উচ্চারণের পর্বে কাঞ্চনগ্রাম-এর একটি শঙ্কা সময়ের ক্ষেত্র থেকে বিধৃত হয়। বস্তুত এ-শঙ্কা ‘বেপথু ব্যাকুলা’ অংশ পর্যন্ত কাটেনি। বরং তা গ্রামবাসীর নিকট সন্দেহ বা ভয়ের মধ্যে না থেকে বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করেছে। উপন্যাসের এ চূড়ান্ত অংশে মুক্তিযুদ্ধের একটি পরিণতির পর্ব চিহ্নিত হয়। উপন্যাসের মূল প্রবণতা তথা যে-সময়কে লেখক অবলোকন করেছেন – কাহিনীর মধ্যে সেটা সবকিছু ছাপিয়ে আরো স্পষ্ট হয়ে পড়ে ‘উপসংহার’ অংশে তারেক, খালেদ, মাস্টার, সেন্টুর মতো তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘবদ্ধ ও একত্রীকরণের প্রয়াস থেকে। তবে মুক্তিযুদ্ধ কাঞ্চনগ্রাম-এর পটভূমিতে যে অক্রিয়-উন্মত্ততায় উঠে এসেছে তা মূল কাহিনীস্রোতকে আরো ব্যঞ্জিত করেছে এবং পূর্ণ সমাজ-সংশ্লিষ্ট চেতনাকে বহুমাত্রিকতায় তুলে এনেছে। আসলে ঔপন্যাসিক মুক্তিযুদ্ধকে শুধু যুদ্ধ নয়, জনযুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করে শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্বকে রূপায়িত করেছেন। আর সে-কারণেই প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে জয়নাল শেখদের মতো প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিভূ চরিত্রগুলো।

‘বিস্তারণা’ অংশে যুদ্ধের দামামামুখর প্রতিবেশের কিশোর রতনের নিবিষ্ট শ্রমে সংগ্রামমুখর বাস্তবতায় জনার্দন কর্মকারকে পাওয়া যায় দীর্ণ প্রতিবেশে। উপন্যাসে জনার্দন চিহ্নিত ক্ষয়িষ্ণু সমাজের প্রতীক হিসেবে। জনার্দন কর্মকারের পাশে কর্মসহিষ্ণু কিশোর রতন, ইছু-নসু মনস্তত্ত্ব, ঘাট-নৌচালনার মধ্যে তাদের নিজস্ব জীবনদৃষ্টি সন্দেহাতীতভাবে কাঞ্চনগ্রামের অনেক মানুষেরই পরিবর্তিত জীবন-বাস্তবতা। জালাল মিঞার জীবনদর্শনের সঙ্গে কিংবা তার প্রবাহিত জীবনানুষঙ্গে জনার্দন অনিবার্য না হলেও, একটা সমগ্রতার পরিপ্রেক্ষিতে চরিত্রটি বেশ অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। নগর-জীবনের বিরূপতা, সনাতন জীবনদৃষ্টির চর্চা অথবা দেশভাগের ট্র্যাজেডি ঔপনিবেশিক-উত্তর বাংলাকে নানা টানাপোড়েনে ব্যক্তিমানুষকে ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে। পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল জীবন-ব্যবস্থাপনার তাণ্ডব বিধৃত হয় কাঞ্চনগ্রাম-এর সংগ্রামশীল চরিত্রগুলোর মধ্যে। জালাল মিঞা যে-বোধে অপরিবর্তিত বা সনাতন কাঞ্চনগ্রামকে উজ্জ্বলতর করে তোলেন, প্রায় একই মানসিকতা থেকে জনার্দন বা রাঙাদিদিরা যুদ্ধাক্রান্ত বাংলাদেশের গ্রামে বিচিত্র মানুষের আগমন-নির্গমনে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। রতন, ইছু, নসুরা এক জীবনবাদী চেতনায় স্বপ্ন-সংগ্রামে উঠে আসে উপন্যাসে। জনার্দন প্রত্নদৃষ্টিতে যুদ্ধাতঙ্ক সময়কে পরিহাসপ্রিয়তায় নবমাত্রা দেয়। উপন্যাসের শেষপর্বে যুদ্ধাতঙ্কের ক্রমপ্রসারে শ্যামলী ও জনার্দনের বাক্যালাপে তথ্য ও তত্ত্বের নিবিড়তায় একধরনের অসহিষ্ণু ঊষর জীবনের ইঙ্গিত মেলে। ‘অন্তঃসলিলা’ পর্বে কাঞ্চনগ্রামের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ ও তাদের দোসরদের হাতে জালাল-পরিবার আক্রান্ত হলে দবিরদ্দির তীব্র প্রতিরোধ ‘বেপথু ব্যাকুলা’ অংশে তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা তৈরি করে। দবিরদ্দির স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতা যেভাবে উপন্যাসে

বর্ণিত হয় সেখানে মনে পড়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৬) উপন্যাসের খিজিরের কথা। খিজির পূর্ব-বাংলার স্বৈরশাসন থেকে যেন মুক্তির প্রণোদনা নিয়ে উঠে আসে উপন্যাসে।

কাঞ্চনগ্রাম-এ মকবুল খাদেম-সম্পর্কে জালাল মিঞার ব্যাখ্যা এ-রকম : ‘সেও একই রকমের ভূমিহীন পুঁজিহীন মানুষ, জীবিকার জন্য যে কাজটারে হাতের কাছে পাইছে, তা-ই লইয়া নামিয়া পড়ছে জীবন-যুদ্ধে।’ শামসুদ্দীন আবুল কালাম উপন্যাসে জীবন-সংগ্রামের প্রবণতা সম্পর্কে বলেন: ‘সনাতন কৃষি-ব্যবস্থা, পণ্য উৎপাদন, তার ভোগ-বণ্টন-ব্যবস্থা দাস-ব্যবসায়ের আওতামুক্ত হইতে পারে নাই। এক এক দল মানুষ নিছক আত্মস্বার্থের অভিযানে টলমল হইয়া উঠত দেশ-মহাদেশ। আবিষ্কারের নামে ঔপনিবেশিকতা, অন্ত্যজ ব্যবস্থা, হইতে উদ্ধারের নামে নতুন রকমের শাসন-ব্যবস্থার কথা।’ এমন পরিকাঠামোয় কাঞ্চনগ্রামের বিধৃত সমাজে জালাল-হেদায়েত-আবদুল মাস্টার-মকবুল-জনার্দনরা প্রত্নজ্ঞানে-সংস্কারে-কুসংস্কারে বিকশিত হয়। আর ইতিহাস তাদের অবলম্বী হয়ে শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিকে যেমন প্রাণনা দেয় তেমনি বংশপরম্পরার প্রত্নদৃষ্টিকে সম্ভাবনার ইঙ্গিতে উজ্জ্বলতর করে তোলে।

তিন

কাঞ্চনগ্রাম শিল্পীর যে-ফ্রেমে আবদ্ধ, সেখানে রাজনীতি পরোক্ষ ইঙ্গিতে প্রচণ্ড তাৎপর্যমুখর। মুক্তিযুদ্ধ নিছক একটি যুদ্ধ নয়; জালাল, আবদুল মাস্টারের স্মৃতি ও শ্রুতিতে সাতচল্লিশ-পূর্ব ও পরবর্তী বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ছয়দফা, এগারো দফা, নির্বাচন ও শেখ মুজিবের গ্রেফতারের প্রসঙ্গ উজ্জ্বলতররূপে বর্ণিত হয়। চরিত্রগুলোর প্রত্যয় ও প্রত্যাশার মধ্যে চিহ্নিত থাকে স্বাধীনতা তথা মুক্তির প্রণোদনা। ঔপন্যাসিক যেমনটা বলেন : ‘কোনও আসন্ন ঝড়-তুফানের কালে গাঁ-গ্রাম যেইভাবে চঞ্চল হইয়া ওঠে, সেইরকমই একটা তৎপরতা এবং আশংকা চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িতেছিল। যে-মানুষ দুর্ধর্ষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামেও হার মানিতে চায় না, সে-ও কোনো অজ্ঞাত শত্রু কী হানাদারদের নিকট হার মানিতে প্রস্তুত ছিল না।’ শিল্পীর দায়বদ্ধতায় এমন প্রবণতা ও চালচিত্র বিশ্বস্ততায় নির্মিত হয় যখন সম্মিলিত প্রতিরোধীশক্তি ও প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিভূরা চূড়ান্ত দ্বন্দ্বে মুখোমুখি দাঁড়ায় জালাল-পরিবারকে কেন্দ্র করে। লেখকের হাতে মুক্তিযুদ্ধ সৃজনীমাত্রা অর্জন করে একদিকে জাতির প্রাণিত স্বপ্নের জয়গানের মধ্য দিয়ে, অন্যদিকে প্রখর যুক্তি-তর্ক ও দর্শনে উদ্দীপিত

ক্রান্তিকাল অতিক্রান্ত মানুষের মুক্তিসংগ্রামের অবিনাশী উন্মাদনার জয়গানের ইঙ্গিতে। এমন রূপায়ণ সর্বকালিক-সর্বদৈশিক হয়ে যেন গোটা মানবসমাজের শাসন-শোষণ ও শৃঙ্খল-মুক্তির বারতায় পর্যবসিত হয়।

জালাল মিঞা ফজলুল হকের (১৮৭৩-১৯৬২) রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী, নির্ভেজাল সমাজচিন্তায় মুক্তিযুদ্ধকে প্রাসঙ্গিক জ্ঞান করে তিনি ইতিহাস আওড়ান :

সে-ও তো যুদ্ধ, সে-ও তো সংগ্রাম। নমঃশূদ্ররা চর অঞ্চলেই থাকিয়া গেল, যাইবে কোথায়, বাবুদের বন্দোবস্তের মধ্যে প্রজা হইয়া থাকিতে হইবে তো! কৈবর্তরাও রহিল দূরে দূরে, মুসলমানরাও একান্তে রহিল, চেষ্টা করিল নিজ নিজ জীবনযাপন গুছাইয়া লইতে, যাহার যা পেশা, যাহার যা কর্ম সেইদিকে নিবিষ্ট থাকিতে, কিন্তু তাহাদের দুঃখদুর্দশা, হীন-ম্মন্যতা, মানবেতর জীবন যাপনও তো একটা মৌন প্রতিবাদ …। (পৃ. ৫৪)

সমাজের শ্রেণিবৈষম্য ও রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রকে বিবেচনায় এনে লেখক মুক্তিসংগ্রামের ভিত্তিকে বিশালতায় বিবৃত করবার প্রয়াস পান। শামসুদ্দীন আবুল কালামের শিল্পসৃষ্টিতে বিবর্তনশীল সমাজ মুখ্য বিষয় হিসেবে গুরুত্ব অর্জন করে। তাঁর আলমনগরের উপকথা-র (১৯৫৫) মধ্যেও শোষণমুক্ত সমাজ-ভাবনার চালচিত্র পরিলক্ষিত হয়।

কাঞ্চনগ্রাম-এ শুধু দেশভাগ নয়, ‘ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকারীরা মৌলিক গণতন্ত্রের নামে’ যে অবস্থা-ব্যবস্থার তৎপরতা শুরু করে তারই প্রতিরোধ-স্মৃতি

উঠে আসে আবদুল আলীর স্মৃতিচেতনায়। উপন্যাসে চেতনার প্রবাহে যে রাজনৈতিক ম্যাসেজ পাওয়া যায় সেখানে অসহযোগ, হরতাল, ছয়দফা, ইয়াহিয়া

খান, নির্বাচন, শেখ মুজিবের গ্রেফতার স্বতঃস্ফূর্ত কাহিনীর পাদপীঠ তৈরি করে। এ-কাহিনীতে পার্শ্বচরিত্রগুলোও অনেক প্রয়োজনে কৌতুকময় ও কার্যকরী হয়ে ওঠে – তাবৎ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সূত্র থেকে। ইছু-নসু, রতন-শ্যামলী, দবিরদ্দি, নুরুদ্দীন তাদের বচনে হানাদার-আক্রমণ, রাজাকারদের উল্লম্ফন, রেডিওতে গোলাগুলি, ট্যাংক-কামানের আক্রমণের খবর, কোনো বিশেষ যুদ্ধস্থানের ফলাফল ইত্যাদি ‘জীবন বন্যা’ অংশে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিসংগ্রামের বারতারই সংবাদ প্রদান করে। ঔপন্যাসিকের ভাষ্য:

সমস্ত দেশের সহিত সেই ভূখণ্ডের মানুষগুলির প্রবল প্রতিরোধ তখন মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হইতেছিল। সামরিক বাহিনী তো সড়কের মুখে থমকাইয়া দাঁড়াইয়া পড়িয়াছিল আবারও; তাহাদের পশ্চাতের দিক হইতে কোনও গ্রামের ওপর ধোঁয়ার কুণ্ডুলী আকাশে বাতাসে ছড়াইয়া পড়িতেছিল সর্বত্র; সেই দিকে দৃষ্টি রাখিয়া ক্রমাগত আরও আরও জনতার বজ্র-নির্ঘোষও পরিব্যাপ্ত হইয়া যাইতেছিল; কখনও-বা

যেন সেইদিকেই ধাইয়া আসিতেছিল। (পৃ. ৫৮২)

বিস্ফোরিত জনতার ক্রমসংগ্রামের পটভূমিকে এভাবেই শিল্পরূপ দেন শামসুদ্দীন আবুল কালাম। জীবনযুদ্ধের বাস্তবতাই যেন মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য পরিণত রূপ। কাঞ্চনগ্রাম উপন্যাসে সেজন্য রাজনীতি ওতপ্রোত জীবনের অনিবার্য অংশ হিসেবেই চিত্রিত হয়। সমাজ-অন্বিষ্ট দৃষ্টিতে লেখকও বোধ করি এর ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন না।

চার

দার্শনিক চেতনাসমৃদ্ধ এ-উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জালাল মিঞা একজন পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক; দর্শনের অভিজ্ঞান তার দৃষ্টিকে প্রলম্বিত করে। তার বিশ্বাস, সংস্কার, সমাজ, ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব প্রভৃতি ভাবনার মর্মমূলে নিহিত রয়েছে দার্শনিকবোধ। ‘সব ঠাঁই সব বস্তুই জীবন হইতে জাগিয়া আবারো কদিন জীবনেরই প্রয়োজনে অন্যরূপ অন্যবস্তুতে পরিণত হয়, কেবল নাম-ধাম, বেশ-বাস, পেশা-নেশা, গাঁ-গ্রাম, ভোল-ভাল সবকিছু বদলাইবার আগ্রহটা হয়ত প্রকৃতির মধ্য হইতে উপ্ত হওয়া কী শিক্ষা নেওয়া অতি সহজ কোনো প্রবৃত্তি, কাহারো খেয়াল থাকুক বা না থাকুক, সকলেই সবকিছুই একটা অমোঘ নিমিত্তমাত্র’- এমন সমর্পিত আধ্যাত্মিক চেতনায় জালাল মিঞা জগৎ-জীবন-ভাবনাকে ব্যাপক করে

তোলেন। জালাল মিঞা ভিন্ন অর্থে জীবনবাদী; সমস্ত জগৎ-অভিজ্ঞতায় নশ্বর পৃথিবীর মহাকালের অভিজ্ঞানকে নিজের চেতনায় আত্মস্থ করে তুচ্ছতাকে স্বীকার করে নেন। পুরনো দলিল-পর্চা বা পিতলের ঘট-প্রসঙ্গে বিবিধ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যতই উত্থাপিত হোক জালাল মিঞা নির্বিকার ও আবেগবর্জিত উচ্চারণে প্রধানত মানুষের মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্বজ্ঞানকেই বড় করে দেখেছে। কারণ, মানুষ সৃষ্টিশীল ও শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে সকলেই জগতের মহিমাকে সমান অধিকার ও সমানভাগে ভোগ করবে। সমাজ-ইতিহাস বা প্রত্নভাবনায় জালাল মিঞার দর্শনচিন্তা কাণ্ডজ্ঞান থেকেই উত্থিত। প্রয়োগিক জীবনে নির্বিকার-নির্মোহজ্ঞানে যা কিছু তিনি অর্জন করেছেন তা যৌক্তিক সত্যতায় নিজস্ববোধ ও বুদ্ধির প্রতিমূর্তি। এখানে তিনি রূপকথা বা কল্পকথার ভৌত চিন্তনের মানুষ নন। সেজন্য তার দর্শন নিছক কাণ্ডজ্ঞান থেকেই বিধৃত। কাঞ্চনগ্রাম শিল্পসাফল্যের মাত্রায় সহজেই উত্তরিত হয় জালাল বা আবদুল আলীর মতো চরিত্রের চিন্তাকে কাণ্ডজ্ঞানের দর্শনে সুচারুরূপে প্রয়োগ ঘটানোয়। কোনো লেখাপড়ার সুযোগ নয়, কর্মানুষঙ্গের অভিজ্ঞতা থেকে প্রকৃতির আবহে স্বশিক্ষিত মানুষ এমন দর্শন-চর্চার প্রয়াস পায়। উদ্ধৃতি :

আমরা গ্রাম-দেশের মানুষ, সব সময়েই দেখছি চলাচল শুরু করলেই পথ হইয়া যায়। আরও মন বলে, যদি কোনও পথই পাওন না যায় তা হইলে সেই হতাশাই পথের সৃষ্টি করবে। যে মানুষ সব চেষ্টা ছাড়িয়া হতাশই হয় কেবল, সে নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। আর কিছু না হউক, এই দেশের মানুষের মনোবলের কমতি নাই। ঝড়-তুফান-বন্যা-মহামারীর কালে তা যেন আরও স্পষ্ট হইয়া ওঠে – আমি তো সেই রকমই দেখছি। (পৃ. ৪৮২)

শামসুদ্দীন আবুল কালামের শিল্পচিন্তায় দীর্ঘ কলেবরের উপন্যাসটি নিছক দর্শনের তাৎপর্য আহরণ নয়, প্রায়োগিক জ্ঞানের স্বীকৃতি থেকেও বেশ গুরুত্ববাহী। কেননা জাতির অন্তরশক্তিকে লেখক দার্শনিক প্রজ্ঞায় প্রজ্বলিত করে তা বয়ানের চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছেন।

পাঁচ

উপন্যাস হিসেবে কাঞ্চনগ্রাম ভিন্ন এক আঙ্গিক তৈরি করেছে, যার গতি কোনো ক্ষেত্রে শ্লথ এবং মননচিন্তার আভরণে ব্যঞ্জিত। অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার মূল প্রবাহ অতীতস্মৃতিচারণার চোরাবালিতে আচ্ছন্ন হবার বাধা এসেছে। তবে চেতনার প্রবাহরীতিতে তা অনেক ক্ষেত্রে বিবিধ প্রসঙ্গ ধারণ করেই মূলস্রোতে ফিরে আসবার প্রয়াসও পেয়েছে। ভাষা-নির্মাণ ও বর্ণনে লেখকের কৃতিত্ব অনবদ্য এবং অভিনব। ভাষার গুণেই যাবতীয় সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কাঞ্চনগ্রাম উপভোগ্য হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত, এ-রকম সত্য উপন্যাসটির উপযোগিতা শুধু বিশেষ কোনো বিষয়ের পাঠে নয় – শিল্পের প্রসাদগুণেই তা পূর্ণ উপভোগের মাত্রা পায়। মহাকাব্যিক এ-উপন্যাস একটি জনপদের মানুষের সংগ্রামের দলিলও বটে। আর সে-কারণেই তা হয়ে ওঠে নির্ধারিত

জ্ঞানের প্রবর্তনা। সেদিক থেকে কাঞ্চনগ্রামের তাৎপর্য গভীর ও অতলস্পর্শী।