বাংলাদেশের সমকালীন চারুশিল্পে সৃজনশীলতা-বিকাশের পাশাপাশি একটি জনপ্রিয়তার ধারাও বিদ্যমান। সৃজনশিল্পীরা স্বভাবতই জনরুচির চেয়ে অগ্রসর। তা সত্ত্বেও জনপ্রিয়তাকে ধারণ করতে জনরুচির সঙ্গে কেউ কেউ নিজের সৃজনপ্রতিভাকে সমন্বিত করার প্রয়াস পান। শিল্পী জামাল আহমেদ দীর্ঘদিন এমন প্রয়াসের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন।
তাঁর নামে সম্প্রতি ঢাকায় একটি গ্যালারি, যাকে আর্ট শপ বলাই শ্রেয় – প্রতিষ্ঠা হয়েছে। জামালস গ্যালারি নামে এই চিত্রালয়টি সোবাহানবাগের প্রিন্সপ্লাজার বিপরীতে হুসাইন প্লাজার দোতলায় অবস্থিত। এটির সূচনা হয়েছে শিল্পী জামাল আহমেদের ছেচল্লিশতম একক চিত্র-প্রদর্শনীর মাধ্যমে। উল্লেখ্য, জীবিত কোনো শিল্পীর নামানুসারে একটি গ্যালারি-প্রতিষ্ঠার ঘটনা এই প্রথম এদেশে। এটি তাঁর জনপ্রিয়তার একটি প্রামাণ্যও বটে।
শিল্পী জামাল আহমেদের বয়স আটচল্লিশ আর তাঁর একক প্রদর্শনীর সংখ্যা ছেচল্লিশ। এই পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে তাঁর নিরলস শিল্পচর্চা ও জনগ্রাহ্যতার পরিচয় পাওয়া যায়।
একজন চারুশিল্পীর জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে কিছু কার্যকারণ আছে। যেমন – তাঁর শিল্পকর্মের চাহিদা বা বিক্রি কেমন, দেশ-বিদেশে তাঁর কাজের কীরূপ কদর, তাঁর স্বীকৃতি ও পুরস্কারের পাল্লা কতোটা ওজনদার, তাঁর শিল্পকর্ম-সংগ্রাহকের তালিকায় কারা আছেন, তাঁর শিল্পকর্মের অর্থমূল্য বর্ধিষ্ণু কিনা ইত্যাদি। এসব পূর্বশর্ত-পূরণে জামাল আহমেদ সৌভাগ্যবান।
জামাল আহমেদ ছবি আঁকেন বাংলাদেশের মানুষ ও তার নিসর্গ-সৌন্দর্য নিয়ে। একজন আলোকচিত্রী যেমন তাঁর ক্যামেরার চোখ দিয়ে ধারণ করেন নিসর্গরূপ ও জনমানুষকে, তেমনই প্রাঞ্জল ও বাস্তব তাঁর চিত্রকলা। বলা যায়, আমাদের প্রকৃতির এক সফল অনুবাদক তিনি।তাঁর কাজে নিসর্গের দেখা পাই কয়েকটি বিশেষ ব্যঞ্জনায়। যেমন – নদী-চরাঞ্চলের ধু-ধু বালুকা বেলা, দূরে নদীর রুপালি আভাস ও দিগন্তের অস্ফুট রেখার সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়া আকাশ – এই পটভূমে মানুষ কিংবা গো-চলাচল। এই রূপটির বৈকালিক কিংবা সকাল-দুপুরের অবয়ব – সবই তিনি আঁকেন – কখনো নীলচে কখনো ধূসর কখনো বা লালচে বর্ণের প্রাধান্যে। এতেই ঘটে সময়ের হেরফের। কখনো তাঁর ছবিতে আমরা দেখতে পাই দিগন্তবিস্তারি শর্ষেক্ষেত ধরে জনচলাচল, কখনো ধানিজমির আলবেয়ে চলাচলরত জনমনিষ্যি, দিগন্তে আম কাঁঠাল জাম জামরুল খেজুর ও তালগাছের সারি। বুড়িগঙ্গার স্ফীত বুকে নৌযান, ডিঙি নৌকোয় লোক-পারাপার, নদীপারের জনবসতি, দালানকোঠা, গাছাপালা প্রভৃতির সমন্বয়ে আঁকা তাঁর বুড়িগঙ্গা-চিত্রে নদীপারের ব্যস্ততা, হাঁকডাক অনুভব করা যায়।
এসব ছাড়াও জামাল আহমেদ আঁকেন নারী ও পুরুষ মডেলের ছবি, বাউলের ছবি। বিশাল মাপের ক্যানভাসে তিনি সাধারণ নরনারীর অবয়বও আঁকেন। তাঁর বিশ্বস্ত হাতের সঙ্গী অ্যাক্রিলিক রং। রংটি এমন – এটি দিয়ে যেমন জলরঙের ধাঁচে কাজ করা যায়, তেমনি এটি তেলরঙেরও বিকল্প। এই সুবিধাটি ভালোভাবেই ব্যবহার করেন তিনি।
আমাদের শৈশব-কৈশোরে অজানা কোনো কোনো শিল্পীর আঁকা কিংবা মুদ্রিত কিছু ভিউকার্ডে দেখেছি আকাশ-মাটি-জল-স্থলের স্বচ্ছন্দ জমিনের উপর তুলির আঁচড়ে ফোটানো নৌকো, গুনটানারত কিছু অবয়ব অথবা রমণীর জলকে চলার ছবি। দ্রুতলয়ে আঁকা এসব কাজে শিল্পীসুলভ দক্ষতার হয়তো অভাব ছিল, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অঙ্কনেও ছিল ভুলভ্রান্তি। এসব দুর্বলতা সত্ত্বেও ওইসব কার্ডের স্পেস-ব্যবহার ও কম্পোজিশনে আমরা চমকিত হতাম। প্রথম তারুণ্যে আমরা নিজেরাও নববর্ষ কিংবা ঈদ ও অন্যান্য উৎসব-উপলক্ষে এ-ধরনের প্রচুর কার্ড এঁকেছি, বন্ধু ও শুভার্থীদের দিয়েছি, স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে নিজের হাতখরচও চালিয়েছি। তখন মুদ্রণপ্রযুক্তি অতো সুলভ হয়ে ওঠেনি। বাজারে আজকালের মতো এত কার্ডের ছড়াছড়িও ছিল না।
সেই প্রায় বিরল শিল্পশৈলী দেয়ালে তুলে এনেছেন শিল্পী জামাল আহমেদ। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এমন শিল্পরূপ আমাদের মানসপটে আছে দীর্ঘকাল। সেই রূপটিকেই আরো পরিশীলিত, মার্জিত ও আধুনিক টেকনিকে উপস্থাপন করেছেন শিল্পী। ফলে জনমানসে শৌখিন চারু-প্রকাশের যে-রীতি বিদ্যমান অনেককাল আগে থেকে, তাকে আরো নিবিড় কুশলতায়, শিল্পীর অঙ্কন-দক্ষতায়, বর্ণের মধুরিমায় ঋদ্ধ করে শিল্পী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। এখনো পুরনোদিনের খ্যাতিমান গানের রিমিক্সের মতো। শিল্পী জামাল ক্র্যাফটস-ম্যানশিপে দারুণ দক্ষ। শিল্পের নতুন পথে হাঁটার ক্ষমতাও হয়তো তাঁর আছে। কিন্তু অনিশ্চিতের পথে পা বাড়ানো তাঁর স্বভাব নয়। তিনি নিশ্চিন্ত নির্ভরতায় অবগাহন করেন চারুশিল্পের জনপ্রিয় জলাধারে। আধুনিক নন্দনতত্ত্বের স্বরূপ-অন্বেষায়, নিত্যনতুন চিত্রধারা-সৃজনের তুমুল দ্বিধাদ্বন্দ্বে তিনি নিজেকে আলোড়িত করতে অভিপ্রায়ীও নন। তাঁর চিত্রকর্ম চেতনার স্তরে কোনো অভিঘাতও ফেলে না। দৃষ্টিসুখকর মিষ্টিমুখর, সহজবোধ্য ছবি আঁকাতেই তাঁর আনন্দ। সেই আনন্দে সাধারণ দর্শক ও সমঝদাররাও তাঁর সঙ্গে মেতে ওঠেন। শিল্পী জামাল আহমেদের এখানেই সাফল্য। বাংলাদেশের সমকালীন চারুশিল্পে তিনি অন্যতম সর্বাধিক বিক্রিলব্ধ চিত্রকর্মের শিল্পী।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.