উত্তর-আধুনিকতা – একটি অন্তঃসারশূন্য আলোচিত বিষয়
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে ধন্যবাদ কালি ও কলমের আগস্ট ২০০৪ সংখ্যায় একটি বিশাল প্রবন্ধে ‘উত্তর-আধুনিকতা’ সম্বন্ধে যথাসাধ্য আলোকপাত করার জন্য। একটি গুরুত্বহীন বিষয় যখন গুরুত্ব পায় এবং সেটি সম্পর্কে যখন নানারকম আলোচনা-সমালোচনা হতে থাকে, তখন সেটি স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কিত হয়ে থাকে। উত্তর আধুনিকতা-বিষয়টি ঠিক সে-রকম একটি বিতর্কিত বিষয়। শুধু বিতর্কিতই নয়, বাস্তবিক বা প্রায়োগিক অর্থে যার কোনো মূল্যই নেই, তবু এটি কিছু ব্যক্তির বদৌলতে আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে অনেকটা পুষ্টিগুণহীন মুখরোচক খাদ্যের মতো, যা খেতে মজা অর্থাৎ আলোচনা //করতে মজা, কিন্তু কোনো পুষ্টি নেই অর্থাৎ কোনো সারবস্তু নেই।
আধুনিকতার মাঝে থেকে আমরা কখনো উত্তর-আধুনিকতা আনতে পারি না। আমরা পারি নতুনত্ব আনতে, ব্যতিক্রম আনতে, বৈচিত্র্য আনতে, বিদ্রোহী বা আপোসহীন চিন্তাভাবনা আনতে – সেগুলো সবই আধুনিকতার অনুষঙ্গ। কিন্তু এগুলোর মাঝ থেকে কিছু কিছু অনুষঙ্গ বাছাই করে বা আবিষ্কার করে কেউ কেউ তাদেরকে উত্তর-আধুনিকতায় ফেলতে চাচ্ছে বা ফেলছে।
উত্তর-আধুনিকতা বলে যদি আদৌ কিছু থাকে, তাহলে বলতে হয়, ‘উত্তর-আধুনিকতা’ তা-ই যা ‘আধুনিকতা’র মাঝে ‘সুপ্ত’ অবস্থায় থাকে, একসময়ে তা জেগে উঠলে উত্তর-আধুনিকতার ধারণা হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারে, মূলত যা আধুনিকতার আধুনিক ধারণা।
আব্বাস তুলন
উত্তর শ্যামলী, ঢাকা
মানুষ, মানুষ!
কালি ও কলমের প্রথম বর্ষ পঞ্চম সংখ্যায় (জুন ২০০৪) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘মানুষ, মানুষ!’ ধারাবাহিক উপন্যাসে সৈয়দ মুজতবা আলীর যে-রচনার উল্লেখ করেছেন, তাতে একটু ভুল রয়ে গেছে। মূল লেখাটি নিম্নরূপ:
শের্শে লা ফাম্
(Cherchey la femme)
খুন, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি যাই হোক না কেন, এক ফরাসী হাকিম বিচারের সময় অসহিষ্ণু হয়ে বার বার শুধোতেন, ‘মেয়েটা কোথায়। শের্শে লা ফাম্ – মেয়েটাকে খোঁজো!’ তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, দুনিয়ার কুল্লে খুন-খারাবীর পিছনে কোনো না কোনো রমণী ঘাপটি মেরে বসে আছে। আসামী, ফরিয়াদী, সাক্ষী, কোনো না কোনো রূপে তাকে আদালতে সশরীরে উপস্থিত (হাবেয়াস কর্পুস) না করা পর্যন্ত মোকদ্দমার কোনো সুরাহা হবে না। অতএব শের্শে লা ফাম্ – মেয়েটাকে খোঁজো। একবার ইনশিওরেন্স মোকদ্দমা ছিল কোনো চিমনি-পরিদর্শককে নিয়ে। একশ ফুট উঁচু থেকে সে পড়ে যায়। তার খেসারতি মঞ্জুর হয়ে গেলে উকিল শুধোলেন, ‘কই হুজুর, এ মোকদ্দমায় আপনার শের্শে লা ফাম্ তো খাটলো না?’ হুজুর দমবার পাত্র নয়। সোল্লাসে বললেন, ‘খোঁজো, খোঁজো, পাবে।’ হবি তো হ – তাই! তালাশীতে বেরল, সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময় সে হঠাৎ নিচের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়েছিল এক সুন্দরী রমণীর দিকে – পড়ে মরল পা হড়কে।
শামীমা আক্তার
মীরপুর, ঢাকা
অপ্রত্যাশিত কালি ও কলম
আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সাময়িকপত্রের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। সাময়িকপত্রের মাধ্যমে বাংলাভাষায় সাহিত্যচিন্তা, বিজ্ঞানচিন্তা, ধর্মচিন্তা, ইতিহাস চিন্তা প্রভৃতি বিষয়ের প্রতিফলন উদ্ভাসিত। বাংলা সাময়িকপত্রের এই ঐতিহ্য লালিত্য চিরভাস্বর।
সম্প্রতি নবজাগরণ-সৃষ্টিকারী মাসিক সাহিত্যপত্রিকা কালি ও কলমের সপ্তম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকাটি পড়ে যা অনুভব করলাম, তা অপ্রতাশিত। কেননা, নব্বই দশকের পর এমন মুক্তচিন্তার সাহিত্যপত্রিকা দেখিনি। আমি নির্বিঘ্নে বলতে পারি যে, সম্পাদক সাহেব বলিষ্ট কণ্ঠ ও সুদৃঢ় মনোবল নিয়ে যেভাবে অগ্রসর হচ্ছেন, তা পণ্ডশ্রম নয়। বরং বাংলাভাষার অনাবাদি সাহিত্যজমিকে উর্বর করে বিস্তার করবে সাহিত্যরসপূর্ণ ফসলের দুর্বার সম্ভার। কালি ও কলম পত্রিকার দুঃসাহসিক অভিযাত্রা আরো অগ্রসর ও সফল হোক, এই কামনা।
শিউলী কাজী
আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
কালি ও কলমের সুদীর্ঘ জীবনকামনায়
সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা কালি ও কলম প্রথম বর্ষ সপ্তম সংখ্যাটি পড়লাম। ভালো লাগল প্রতিটি বিভাগ। মুনতাসীর মামুন, সুধীর চক্রবর্তী, হায়াৎ সাইফ, ইজাজ হোসেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রবন্ধগুলো আমাদের সম্পদ, কালি ও কলমের দেখা না পেলে বঞ্চিত হতে হতো আমাদের নিজস্ব সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির অমূল্য রত্ন-আস্বাদন থেকে। বিজ্ঞান, ভ্রমণ, কাব্যনাট্য বিভাগগুলো ছিল হৃদয়গ্রাহী, মঞ্চনাটক-বিভাগে মফিদুল হকের আলোচনা ভালো লেগেছে, আমাদের জন্য সাদাত হাসান মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ পুনর্মুদ্রণ করা যায় না বুঝি?
দেশ ২ আগস্ট ২০০৪ সংখ্যায় দেখলাম, কলকাতায় কালি ও কলমের পঞ্চম সংখ্যা পাওয়া যায়। অথচ শ্রীমঙ্গলে পাওয়া যায় না। আশা রাখি, আমরাও নিয়মিত পাবো। কালি ও কলমের সাফল্য ও সুদীর্ঘ জীবনকামনায়।
প্রান্ত প্রাণ
স্টেশন রোড, শ্রীমঙ্গল
অতৃপ্তি রয়েই গেল
আমাদের ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক জীবনে কিছুই যখন অনায়াসলব্ধ নয়, তখন ন্যূনতম বিনিময়-মূল্যে কালি ও কলম-প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে প্রণিধানযোগ্য। পড়ছি প্রতিটি সংখ্যাই। আলোচনা করতে তো ইচ্ছে করে অনেক কিছুই (সমালোচনাও বটে), কিন্তু সাহস হয়ে ওঠে না। শুধু ধারই নয়, এর লেখাগুলোর ভারও যথেষ্ট। তবু মাঝে মাঝে মন আলোড়িত হয়। পঞ্চম সংখ্যায় (জুন) আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন ‘উচ্চস্তরে বাংলাভাষা প্রচলনের চালচিত্র’। বাংলা-প্রচলনের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব সমস্যা-অসুবিধার পাশাপাশি এক ধরনের বৈরী মানসিকতার বিষয়ে তিনি বলেছেন, সেই সঙ্গে উল্লেখ করেছেন বাংলা-প্রচলনের ব্যাপারে বাংলা একাডেমীর সহায়ক ভূমিকার কথাও। কিন্তু এ-ও তো ঠিক যে, বাংলা একাডেমী-গ্রন্থিত অভিধানগুলো স্বয়ং তাদের দ্বারাই অনুসৃত হচ্ছে না। সাধারণের কাছেই বরং সেগুলো বেশি আদরণীয়। আজ একই শব্দ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় (অথবা একই পত্রিকার বিভিন্ন লেখায়) দেখা যাচ্ছে ভিন্ন বানানে। কেউ কি তা লক্ষ করছেন? কীভাবে হবে বাংলার প্রচলন? রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম র্যাডিচে ভারতবর্ষে প্লেন থেকে অবতরণ করে অভ্যর্থনাকারীদের ইংরেজি সম্ভাষণের উত্তরে বলেছিলেন, ‘বাংলায় বলো, আমি তোমাদের চেয়েও ভালো বাংলা জানি।’
আমরা কি এভাবে বলতে পারব যে, আমরাও বাংলা জানি? সপ্তম সংখ্যায় (আগস্ট) পড়লাম সুধীর চক্রবর্তী-লিখিত ‘মেলার অন্তর্লোক’ (বলা ভালো, পৌষমেলার অন্তর্লোক) তথ্যমূলক লেখা, কিন্তু শুধু পৌষমেলাকে কেন্দ্র করে এবং পশ্চিমবঙ্গ-প্রসঙ্গে। কেন বৈশাখিমেলা নয়? বৈশাখ নিয়ে লেখা উচিত ছিল তো আগেই, তা-ও হলো না। অতৃপ্তি রয়েই গেল। আমাদের দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যই বেশি প্রকাশ করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ের সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি-বিষয়ক এই প্রাগ্রসর মাসিক পত্রিকাটিতে আমরা আমাদের কথা পড়তে চাই। আগস্ট সংখ্যায় পড়লাম সরদার ফজলুল করিমের জীবন জয়ী হবে গ্রন্থ-সমালোচনা, সেই সঙ্গে ওই গ্রন্থটিও। এখন আরো বেশি করে ইচ্ছে করছে কালি ও কলমে তাঁর সাক্ষাৎকার পড়তে। আশা করি কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করবেন।
জ্যোতির্ময় শাণ্ডিল্য
মিরপুর, ঢাকা
প্রকাশনা অব্যাহত রাখুন
আমরা বারবার মৃত্যু দেখেছি। মৃত্যু দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত। আমরা অকাল মৃত্যুতেও অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু সমাজে এমন কিছু বিষয় আছে, ঘটনা আছে, যাদের অস্বাভাবিক মৃত্যু আমাদের বড় কষ্ট দেয়। বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো কিছুর অকালমৃত্যু মানে তো আচমকা থেমে যাওয়া। এ-বড়ই সাংঘাতিক।
কালি ও কলম পাঠ করে একে আমার উঁচুমানের একটি কাজ বলে মনে হয়েছে, যে-জন্যে আমার এরকম আশঙ্কা।
ঢাকা থেকে দূরে থাকি বলে অজান্তে কালি ও কলমের পর পর পাঁচটি সংখ্যা গড়িয়ে গেলেও ষষ্ঠ সংখ্যাটি মাত্র আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। সংখ্যাটি পড়ে এর মান ও বৈভব আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই কালি ও কলমের দীর্ঘজীবন কামনা করছি। প্রকাশক আবুল খায়ের সাহেবকে শুভেচ্ছাসহ অনুরোধ করব তিনি যেন এর প্রবহমানতা অটুট রাখতে সক্রিয় থাকেন।
আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলে পত্রিকাটি সম্পর্কে আমার অভিব্যক্তি অপূর্ণাঙ্গ থাকে। জনাব শহিদুল ইসলামের ‘কে বুদ্ধিজীবী?’ লেখার ওপর জনাব ফয়েজ আলমের প্রতিক্রিয়া। ফয়েজ আলমের লেখাটি পড়ে শহীদুল ইসলামের মূল লেখাটিও সংগ্রহ করি। আমি এখানে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করব না। শুধু বলব, শহিদুল ইসলামের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে লেখাটির সময়-উপযোগিতা রয়েছে যথেষ্ট। আমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হলো।
ফয়েজ আলমের প্রতিক্রিয়াও অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রতিক্রিয়া-প্রকাশে তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে গিয়ে তিনি বেশ পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন। আসলে আধুনিক বা উত্তর-আধুনিক বুদ্ধিজীবী চেতনার পৃথিবীব্যাপী একটি বিপ্লব ঘটে গেলেও আমরা অনেকে তার খবরই রাখি না। আর এই বৈপ্লবিক ভূমিকায় যে-কজন বিশ্বব্যাপী আলোচিত হন এডওয়ার্ড সাঈদ এবং মিশেল ফুকো তাঁদের মধ্যে পড়েন। একজন প্রাচ্যতাত্ত্বিক এবং অন্যজন উত্তর-আধুনিকতাবাদী। শহিদুল ইসলাম এবং ফয়েজ আলমের লেখায় এই দুজনেরই কথা আছে। আমার মনে হয় এঁদের সম্পর্কে আরো বেশি লেখালেখি হওয়া উচিত। কারণ সভ্যতা প্রকৃত অর্থে তো বুদ্ধিবৃত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। লুইস হেনরি মর্গানের ভাষায়, ‘সভ্যতায় এসে প্রতিভাধররাই সমাজের মূল কেন্দ্রে গিয়ে দাঁড়ায়। বাকি সব পাদ-প্রদীপের আড়ালে চলে যেতে থাকে’ (আদিম সমাজ, অনুবাদ বুলবন ওসমান, পৃ ২৫)। অথচ যথার্থ বুদ্ধির চর্চা আমাদের সমাজে ভয়ংকরভাবে কম।
আনোয়ার হাসান
ধর্মপাশা, সুনামগঞ্জ
কালি ও কলম
ভালো লাগল
কালি ও কলমের প্রথম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা পড়ে বেশ ভালো লাগল। বাংলা সাহিত্যের মনন ও চিন্তার ভুবনে এ-পত্রিকা বিশেষ রেখাপাত করবে বলেই মনে হলো।
মনজুরে মওলার ‘এলিয়ট ও এমিলি’, সুব্রত কুমার দাসের ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র উপন্যাস : বয়ন ও ইঙ্গিত সূত্রের অনুসন্ধান’, কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীরের ‘কাইয়ুম চৌধুরীর নিসর্গ’, আবদুশ শাকুরের ‘সেতারের খেয়ালিয়া উস্তাদ বিলায়েত খাঁ’ বিশেষভাবে ভালো লাগল।
বিপ্লব মাজীডাকবাংলো রোড, মেদিনীপুর

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.