জলার্দ্র হাত দুইখানার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে বুলবুলি। হাতের দিকে তাকিয়ে আছে নাকি অন্যকিছুর দিকে? না, বুলবুলি ওর দাদুবুজি আলতাবানুর হাতের দিকেই তাকিয়ে আছে। দুপুরের তুখারোদ এক্ষণে উদ্যত-ফণা নামিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। খানিক বাদেই এই রোদ পশ্চিমের দিকে ঢলে পড়বে। আর টেনে আনবে ঘোরঘুট্টি অন্ধকার! আলতাবানু সদ্য আসরের নামাজ অন্তে ভাতের লোকমা মুখে তুলল। বুলবুলির পেট এতক্ষণ না খেয়ে থাকলে মোচড় দিয়ে বমি করিয়ে ছাড়তো। আলতাবানুর হাতের ওপর বিনবিনে জলের মনিমুক্তা জমে আছে। ওই মনিমুক্তাসহ সে ভাত মাখায়, বড়সড় লোকমা মুখে পুরে। আলতাবানু যখন খায়, কব্জির নিচ থেকে বিঘতখানি জায়গা জুড়ে হাতের নকশায় বুলবুলি বিভ্রান্ত হয়। এইটা কি আলতাবানুর হাত, নাকি অন্যকিছু? যেখানে সোনার গোলাপবালা দুইটা নির্দিষ্ট ছন্দে ওঠানামা করে। প্রায়ান্ধকার ঘরের ভিতর হাতের বদলে অন্যকিছু হলে বুলবুলির বিকার থাকার কথা ছিল না। কিন্তু এটা আলতাবানুর হাত, এবং এটাই সত্য। আলতাবানু নিজের হাতে ভাত মেখে খাচ্ছে – এটাও যেমন সত্য। এবং হাতের কব্জির নিচে ভারিসারি দুইটা গোলাপবালা! বুলবুলির মনে অন্য চিন্তা – কোনো আজদাহা যেন নিজের মাথার মণিটাকে হাতে নিয়ে খেলে চলেছে। ওই মণির বিচ্ছুরণে চারপাশ কীরকম আলোকিত হয়ে উঠেছে। আজদাহার বয়সী ত্বকের কারণে কি না কে জানে, জলার্দ্র হাত দুইটা কেমন দড়ি দড়ি দেখায়। যেন-বা শুকনা পাট দিয়ে বেশ করে কষে এই দড়ি বানানো হয়েছে। বুলবুলি অবাক হয়ে আজদাহার হাত দ্যাখে। দেখে দেখে ওর দুই চক্ষে বিলম্বিত ভাতঘুমের আমেজ ভর করলে মাথা ঝাঁকিয়ে ঘুম তাড়ায়। জোর করে চোখ দুটা খুলে ফটফট করে তাকায়। আলতাবানুর রসিয়ে রসিয়ে ভাত খাওয়া দেখতে ওর ভালো লাগে না। আইচ্ছা, একজন বুড়ি মাইনষের খাওন এমুন হইতে পারে কেমতে? আলতাবানুর পরিতৃপ্তির খাওয়া দেখে নাকি অজানা কোনো মনোবেদনায় বুলবুলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে –
‘আইচ্ছা দাদুবুজি, তুমার খিদা নাগে না?’
আলতাবানুর মুখ ভরতি ভাত, ভাতের ভিতরে ইলিশমাছের ল্যাঞ্জার নরম অংশ, এই সোয়াদ না গিলে ফেললে সে জবাব দেবে কীভাবে?
ইলিশমাছ তো বচ্ছরকার পরবের মতো দুই-একবার এই বাড়িতে আসে।
আলতাবানুর ছাওয়াল আলম ব্যাপারীর এসব ব্যাপারে একেবারে গড়িমসি নাই। ভাদ্রমাসে থাকতে থাকতে দুই-একটা বড়সড় ইলিশ সে কিনবেই কিনবে। মাছের দাম তখন স্বর্ণের দামের কাছাকাছি হলেও। আলতাবানুর হাতে তুলে দিয়ে হাসিমুখ করে বলবে –
– আম্মা, মাছডায় তেলতুল হইবনি?
আলতাবানু মাছটা হাতে নিয়ে ভালো করে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখবে। জলে ভেসে থাকার কায়দায় মাছটাকে উল্টিয়ে রেখে পিঠের রেখা বরাবর পরখ করবে। তারপর উদাসীন গলায় বলবে – ‘পিডডা তো চওড়াই নাগতেছে। কাটনের পর বুঝা যাইব তেল আছে কি নাই।’
মায়ের এইরকম ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা কথা শুনে আলম ব্যাপারী মনক্ষুণ্ন হলেও মুখে তা প্রকাশ করবে না। মায়ের কথার পিঠে পাল্টা কথা বলা ওর তমিজে নাই। যদিও ভিতরে ভিতরে ক্রোধের একটা তীক্ষè সুই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ওকে রক্তাক্ত করে তুলবে।
রক্তপাত বেশি হলে মাঝেমধ্যেই রাগে ফেটে পড়ার তীব্র বাসনায় আলম ব্যাপারী চোখমুখ লাল করে ফ্যালে। তা হলেই বা কী? মায়ের কাঁচা শোকের শরীরে আঘাত করার মতো সিমার সে নয়। মাসচারেক আগে বাপ উসমান ব্যাপারী যখন তিনদিনের জ্বরে আত্কা মারা গেল, তখন থেকেই আলম ব্যাপারী নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করে। আলতাবানু যে সোয়ামি হারানোর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারে নাই, পেটের সন্তান হিসেবে এইটুকু না বোঝার মতো বোকা তো সে নয়। আর আলতাবানুকে খুশি রাখা বিরাট কসরতের কোনো ব্যাপারও না। বড় কোনো মাছ এনে মায়ের হাতে তুলে দেওয়া, পান-সুপারির সঙ্গে জর্দার বড়সড় একটা কৌটা কিনে আনা, মাসকাবারে বা দেড় মাসের মাথায় ফণীন্দ্রর দোকান থেকে মালাইদইয়ের একটা হাঁড়ি নিয়ে এলেই মা বেজায় খুশি। মায়ের জন্য এইটুকু করাই যায় বা করা উচিত বলেই মনে করে আলম ব্যাপারী। উসমান ব্যাপারী তো ছেলেকে ভুরার ওপর ভাসিয়ে দিয়ে পরপারে চলে যায় নাই। হালচাষের বেশ কিছু জমিজমা সে রেখে গ্যাছে। শালিকচূড়ার বাজারের বড় মুদিদোকানটা উসমান ব্যাপারীর বুদ্ধিতেই এতকাল বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। উসমান ব্যাপারীর মৃত্যুর পরও আলম ব্যাপারী এখন পর্যন্ত সেরকম কোনো লসের মুখ দেখে নাই। এখনো দেখে নাই বলে আগামীর দিনগুলাতেও দেখবে না, এইরকম আজাইর্যা চিন্তা আলম ব্যাপারী মাথাতেই আনে না। বেহুদা আগুরিচিন্তা কইরা লাভালাভ কী?
আলম ব্যাপারী জানে, মায়ের বুকের ভিতর কাঁচা-শোক পাথরের মতো ভারী হয়ে চেপে আছে। যদিও আলতাবানুকে বাইরে থেকে দেখে তা অনুমান করাও অসাধ্য। তার চলনবলন এখনো সধবাদের মতোই। উসমানের দাফনকাফন সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর আলতাবানু মুর্দা বিদায়ের গোসলআছল করেছিল ঠিকই। কিন্তু সাদা শাড়ি পরতে সে রাজি হয় নাই। এমনকি সধবাদের চিন হয়ে থাকা নাকের চুঙ্গিটাও সে খুলে ফ্যালে নাই। আলম ব্যাপারীর বড় চাচি লিলিবিবি বলেছিল – ‘আ গো বউ, উয়া কী? নাকের চুংগিডা তো খুইল্যা থুইতে কয় মুরুব্বিরা। তুমি দেহি পইরাই রইছ?’
আলতাবানু জবাব না দিয়ে পরনের রঙিন শাড়ির আঁচলটা তুলে পিঠ ঢেকে দিয়েছিল। কেউ যেন তাকে কোনো কথাই বলে নাই, এইরকম ভাব ধরে পানের বোঁটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খিলি বানাতে শুরু করেছিল।
আলতাবানুর হাত দুটা চলছিল যন্ত্রের গতিতে। ওভাবে না চলেই বা উপায় কী?
মরাবাড়িতে যারা ভাত খাইছে তাগো আর কিছু না দিলেও এক খিলি পান তো দেওন নাগে? নাকি নাগে না?
ছোট জায়ের একরকম আচরণে তব্দা খেলেও লিলিবিবি আর কথা বাড়ায় নাই। কিন্তু আলতাবানুর খিলি বানানো হাতে গোলাপবালা জোড়া দেখে তার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
রেগেমেগে লিলিবিবি কড়া গলায় বলেছিল – ‘আ গো বউ, আতের বালা জোড়াও পিন্দা রইছ? উসমান ব্যাপারী কি খালি মন্দই কইরা গ্যাছে তুমারে? ভালা বুঝি কিচ্ছু করে নাই? হেই মন্দের ঝাল বুঝি ঝাড়বার নাগছ হেয় মরতে না মরতেই?’
আলতাবানু একথার জবাবেও চুপ করেই ছিল। শুধু খিলি বানিয়ে রাখা পানের স্তূপ থেকে একটার বদলে দুই খিলি পান নিজের মুখে ঠুসে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। লিলিবিবি ওই দৃষ্টির সামনে আর কিছু বলার সাহস করে নাই। তখনকার মতো লিলিবিবি চুপ হয়ে গেলেও ঘটনা ওইখানেই চাপা পড়ে যায় নাই।
বিধবা হয়েও সধবা সেজে থাকার রহস্য ভেদ করতে শালিকচূড়া গ্রামের লোকজন কানাঘুষা কিছু কম করে নাই। কিন্তু আলতাবানু ছিল নির্বিকার। যেন সে চিরকালের জন্য কানে তুলার ঢিপি গুঁজে দিয়েছে। আলম ব্যাপারীর বউ ময়না শাশুড়ির পক্ষ নিয়ে প্রচুর কাইজ্যাফ্যাসাদ করলেও কাজের কাজ কিচ্ছু হয় নাই। লোকজনের আকথাকুকথা বলা সে বন্ধ করতে পারে নাই।
দাদার মৃত্যুর খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বুলবুলি এসেছিল। বুলবুলির গতর থেকে তখনো হলদিমেন্দির গন্ধ সরে নাই। ওর বিয়ের একমাস গত হয়েছে মাত্র। বুলবুলির নজরেও পড়েছিল দাদুবুজি আলতাবানুর একরোখামি। সাদা শাড়ি তো সে পরেই নাই, এমনকি নিজের শরীর থেকে একরতি অলংকারও খুলে রাখে নাই।
নদীর নতুন ঢেউ যেমন পুরাতন ঢেউয়ের চিনপরিচয় নিশ্চিহ্ন করে দেয়, সময়ের স্রোতে তেমনি করে কানাঘুষাও কিছুটা থিতিয়ে এসেছিল। আদতে মানুষের দেখার চোখ কোনোকিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গ্যালে তা নিয়ে আর বুদবুদও ওঠে না। আলতাবানু পাটভাঙা রঙিন শাড়ি পরে, জর্দা দিয়ে খাওয়া পানের রসে ঠোঁট লাল করে উসমান ব্যাপারীর পিতৃভিটায় দিব্যি বসবাস করছিল। আলতাবানু চলাফেরার সময় গায়ের গয়নাগাটি ঝুমুতঝুমুত করে রোজই বেজে উঠতো। কিন্তু ওই ঝুমুতঝুমুত আর কেউ গ্রাহ্য করতো না।
আলতাবানুর সঙ্গে আরেকজনও দিব্যি বসবাস করছিল – সে হলো বুলবুলি। উসমানের মৃত্যুর পর বুলবুলি আর ওর স্বামী হুরমুজ মিয়াও ফিরে যায় নাই। যদিও ময়না এ নিয়ে মেয়েকে দুই-একবার বলেছিল। সদ্য বিয়ে হওয়া মেয়েটা নিজের সংসার কি গোছাবে না? কিন্তু বুলবুলি মায়ের তাগাদায় গা করে নাই। শালিকচূড়ার লোকজনের এই নিয়ে আহাজারির অন্ত ছিল না।
‘আহারে! এরম নাতিন কয়জনের ভাগ্যে মেলে? দাদা মরণের শোকে যে কব্বরের কাছেই রইয়া গেল! দাদিরেও সে কতই না ভালোবাসে!’ আদতে উসমান ব্যাপারীর কবরের কাছেপিঠে দূরে থাকুক, কবরস্থানেও বুলবুলি কোনোদিন যায় নাই। না গেলেও কী? বাইরের লোকজন এরকম ভাবতে ভালোবাসে।
এ-জগতের কেইবা কবে অন্যদের ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে?
দুই
আলম ব্যাপারীর হাত থেকে ইলিশমাছটা নিয়ে উঠানের এককোণে ঝটাঝট বঁটি পেতে বসে পড়ে আলতাবানু।
‘পোলায় যহন কইছে, মাছ কুইট্টা দেহন লাগে তেলতুল কিরম আছে? কষ্ট কইরা নিজে গিয়া কিন্যা আনছে পোলাডা।’
আলম ব্যাপারী এই সময়টা মায়ের কাছ টুল পেতে বসে থাকে। নিপুণ হাতে মাছ কুটে আলতাবানু। একটা টুকরাও বেঁকাত্যাড়া হওয়ার জো নাই। বঁটিতে নয়, আলতাবানু যেন মেশিনের তলায় ফেলে মাছে একই রকম নিখুঁত কাট দিয়ে চলে। কত যুগ ধরে এই কাজে মাকে এমন পারদর্শী দেখছে ছেলে? উসমান ব্যাপারীও বড়সড় মাছ কিনে এনে ফেলে দিত বউয়ের সামনে। আলতাবানু তখনো উঠানের কোনায় বঁটি পেতে বসে পড়তো। আর মাছ কুটা দেখতে উসমানও টুল পেতে বসতো বউয়ের পাশে। উসমানের পাশে ওর ছেলেমেয়েরা। আলতাবানুর হাতের সোনার ভারিসারি গোলাপবালা দুইটার ওপর মাছের রুপালি আঁশের আলো পিছলে যেত। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি নিয়ে উসমান ব্যাপারী কোমল চোখে তাকিয়ে থাকতো বউয়ের মসৃণ ও নির্মেদ হাতের দিকে। ধানি জমিনগুলায় যেইবার বাম্পার ফলন দিলো, উসমান সেইবার বউকে চার ভরির এই বালা দুইটা গড়িয়ে দিয়েছিল। স্যাকড়ার দোকান থেকে বেগুনিরঙা পাতলা কাগজে মুড়িয়ে গোপনে আনা গয়নার ভাঁজ খুলেছিল নিশুতি রাতে। পোলাপাইনেরা যখন গভীর ঘুমে কাদা হয়ে আছে। অনতিদূরের জলাজংলার ঝোপ থেকে দুই-একটা ক্ষুধার্ত শেয়াল হাই তুলে তুলে হুক্কাহুয়া হুক্কাহুয়া রব তুলছে। আর বয়সী গাবগাছের ঝাঁকড়া মাথা থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা কোরাস ঢুকে পড়ছে ঘুমলাগা কানের পর্দায়। উসমান ব্যাপারী বউকে তখন আদুরে গলায় ডেকেছিল – ‘বউ, ও বউ, ঘুমায়া গেছ নাহি?’
আলতাবানু সারাদিনের ক্লান্তিতে আধো ঘুম নাকি তন্দ্রায় বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে ছিল।
জবাব না পেয়ে উসমান ব্যাপারী অন্ধকারেই তালাশ করেছিল বউকে। নাকি সে তালাশ করে চলেছিল বউয়ের পেট, নাভি, জংঘা কিংবা ভরাট দুই স্তনের খাঁজ। উসমানের হাত চালাচলিতে মেজাজ খারাপ হলেও আলতাবানুর তামাশা দেখার লোভও কম ছিল না। কিন্তু ওইদিন উসমানের মন ছিল উদাস। দেহের উন্মাদনার দিকে না হেঁটে উলটা কোনো পথের সন্ধান করেছিল সে। একেবারে অচেনা মানুষের গলায় কথা বলে উঠেছিল, ‘আলতা, একডা কতা কই আইজ।’
এরকম কণ্ঠের পর আধো-ঘুম নাকি তন্দ্রা কোনোকিছুই অবশিষ্ট থাকে নাকি কারোর! আলতাবানু উঠে হারিকেনের কমিয়ে রাখা সলতে উস্কে দিয়ে আলো বাড়িয়ে অপেক্ষা করেছিল। কী বলতে চায় আজ উসমান? সংসারের ঘানির নিচে চাপা পড়া দুইজন কবে একান্তে কথা বলেছে, সেদিন ইয়াদ করতে পারবে না আজ কেউ-ই।
এখন এই নিশুতি রাত, কর্মক্লান্ত আলতাবানুর তন্দ্রাচ্ছন্নতা, ক্ষুধার্ত শেয়ালদের উচ্চ কোলাহলের মাঝে কী কথা বলতে চাইছে উসমান ব্যাপারী? হারিকেনের মøান আলোয় যেন আরো অচেনা দেখায় উসমানকে। আলতাবানু পরনের আলুথালু শাড়ি গোছাতে গোছাতে অপেক্ষা করে না-বলা কথা শোনার জন্য। উসমান বালিশের তলায় হাত ঢুকিয়ে আলগোছে বেগুনিরঙা পাতলা কাগজের মোড়কটা বের করে আনে। এই কাগজ আলতাবানুর অচেনা নয়। এর আগে আলতাবানুকে যত সোনার-জেউর গড়িয়ে দিয়েছে উসমান, এরকম কাগজে মুড়িয়ে যত্ন করেই এনেছে।
দুমড়েমুচড়ে থাকা কাগজ খোলার শব্দের সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকাদের কোরাস মিলেমিশে নিশুতি রাতে কেমন নতুন শব্দের জন্ম হয়।
উসমান ব্যাপারীর কণ্ঠ থেকে আশ্বিনের ঝিরঝিরানো শিশিরের মতো করে মৃদু শব্দাবলি ঝরে পড়ে।
‘আমি জানি না তুমারে তেমন কিছু দিতে পারছি নাহি? আইজ এই বালাজোড়া দিলাম দেনমোহরের ঋণ যাতে মাফ কইরা দেও তুমি, বউ।’
উসমানের কণ্ঠ আরো ধীর হয়। আরো মোলায়েম। আলতাবানুর মনে হয়, সে যেন এই উসমানকে চেনে না। কোনোদিন এই পুরুষের সঙ্গে তার চিনপরিচয়ও হয় নাই! বউয়ের দুই হাতে যত্ন করে বালাজোড়া পরিয়ে দিয়ে বলে – ‘তুমারে কিরম মানাইছে দেহ।’
রাত যত গাঢ় হয়, ঘরের ভিতরের জ্বালিয়ে রাখা আলো বুঝিবা ততই মলিন হয়। নাকি সলতের তেল ফুরিয়ে গ্যাছে বলে ওরকম দেখায়।
আলতাবানু দ্যাখে, উসমানের চোখের কোণে দুই ফোঁটা অশ্রু জমে আছে। হারিকেনের হলুদাভ আলোতে সে-অশ্রু পোখরাজ পাথরের মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলে।
উসমান ব্যাপারীর আত্কা মৃত্যুর পরও আলতাবানু তাই বিধবার বেশ ধরতে পারে নাই। সালঙ্কারা আলতাবানুকে নিয়ে যতই কানাঘুষা হোক না কেন, সে ওসব না-শোনার ভানই করে গ্যাছে।
তবে সোয়ামির মৃত্যুর পর আলতাবানু আর আগের মতন নাই। কেমন উদাস হয়ে গ্যাছে। চারপাশে যত যা-ই কিছু ঘটুক না কেন, যত যা কিছুই হোক না কেন, স্রোতের টানে শ্যাওলার মতো ভেসে যায় সে। যেন কোনোকিছুতেই আর আলতাবানুর শেকড় গেঁথে নাই।
আলম ব্যাপারী মায়ের মাছ কুটা আগের মতোই আনন্দ নিয়ে দ্যাখে। দেখতে দেখতে ইলিশমাছ কীভাবে কাটতে হয় তারও যেন একেবারে মুখস্থঠোঁটস্থ হয়ে আছে। তবে মায়ের মুখে শোনা সেই কিস্সা এখন আর কেউ শুনতে পায় না। যুবতী মায়ের নিটোল হাতে পড়ে মরা মাছেরা যেন ফের জ্যান্ত হয়ে উঠতে চাইতো। আলতাবানু এক ফ্যাসে মাছের ধড় থেকে মাথা আলাদা করে ফেলতো। পাশে রাখা জলভরতি মালশায় ডুবিয়েভাসিয়ে রক্ত ধুয়ে নিত। পিঠ, পেট আলাদা করে তীক্ষè চোখে পরখ করতো কোথাও আঁশ লেগে আছে কি না? পিঠের দুইপাশ থেকে সরু সুতার মতো রগ বের করে বলতো – ‘এই রগ দুইডা খাইতে অয় না, খাইলে ব্যারাম অয়।’
লম্বালম্বিভাবে মাথাটা ফালি করে ফুলকা আলাদা করে ফেলতো। ফুলকা খুঁজে পেতে নাতিদীর্ঘ কী একটা বের করে আলম ব্যাপারীর সামনে রেখে বলতো – ‘এইডারে কয় বাছুরের ল্যাজ। ইলিশ মাছ ডিম পাড়নের সমুয় গাঙ্গে চইল্যা আসে। ওইরম একডা সমুয়ে ওরা খাইয়া ফেলাইছিল গরুর মরা বাছুরের ল্যাজ। খাইছিল, কিন্তুক হজম করতে পারে নাই। ওই হজম না হওয়া ল্যাজডা ফুলকার লগে আটকাইয়া গেল চিরতরে।’
আলম ব্যাপারীর অন্য ভাইবোনেরাও তখন বিস্মিত হয়ে ইলিশমাছেদের বাছুরের লেজ ভক্ষণের দৃশ্য দেখে চলেছে। ইয়াল্লা! মাছে কেমতে বাছুরের ল্যাজ খাইতে পারে? মাছ কি রাক্ষস নাহি?
আলতাবানুর মুখে মাছেদের কিস্সাকাহিনি তো ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। সে তখন ইলিশের দুই কানের পাশ থেকে বুড়া আঙুলের নখের মতো কিছু একটা বের করে মাটিতে ফেলেছে।
‘এই দুইডা অইলো ধোপার পায়ের নখ। কাপড় ধুইতে আছিল এক ধোপা, ইলিশমাছ খাওন না পাইয়া ওই ধোপার পায়ের নখ খাইয়া ফেলাইছিল। কিন্তুক নখ কি কেউ হজম করতে পারে? তাই সেই নখ দুইটাও দেহ কিমুন আটকাইয়া আছে মাছের মাথার মইদ্যে।’
আলতাবানু মাছের লেজ কাটতো সব্বার শেষে। মাছের লেজের পাখনাগুলা তেরছা করে কাটতে কাটতে ইলিশের শেষ কিস্সাটা বলতো সে – ‘শুদু ইলিশের প্যাড আর পিঠ না, মাছের আসল সোয়াদ অইলো ল্যাঞ্জার ভিত্রে। আর ইলিশ মাছের ল্যাঞ্জা কেন এত সোয়াদের অয় জানো?’
বাচ্চারা ভ্যাবলাকান্ত হয়ে মায়ের কিস্সার দিকে তাকিয়ে থাকতো।
আলতাবানু রহস্যের হাসি হেসে বলতো – ‘গরুর মরা বাছুরের ল্যাজ যেমন এরা খাইছিল তেমনি খাইছিল হরিণের মাংসও। পানি খাইতে আইস্যা নদীতে পইরা গ্যাছিল এক হরিণ। আর উঠতে পারে নাই টানে। সুতে ভাইস্যা গেছিল হেয়। তখন অই হরিণের মাংসও খাইছিল এই ইলিশের জাত। দেহো না, ল্যাঞ্জার মাছের রং কিমুন খয়েরি? আর কিমুন সোয়াদ?’
বাচ্চারা কী করে জানবে ইলিশের ল্যাঞ্জার সোয়াদ কিমুন? ওই ল্যাঞ্জা আলতাবানুর জন্যই বরাদ্দ করা।
আলম ব্যাপারীর বউ ময়নাও জানে – ‘মরশুমের ইলিশমাছডা আনলে ল্যাঞ্জাডা আম্মারে দেওনই নাগে। না দিলেও কিছুই কইব না, কিন্তুক অইদিন হেয় ভাতও খাইব না আর।’
তিন
দাদাজানের মরণের খবর পেয়ে বুলবুলি সেই যে এসেছিল
শালিকচূড়ায়, আর সে ফিরে যায় নাই। অন্য আত্মীয়স্বজন সকলে ফিরে গেলেও বুলবুলি ফিরে যাওয়ার নাম করে নাই। উসমান ব্যাপারীর শোক পালনের চাইতে আরেকটা বিষয় বুলবুলির মনে চোরকাঁটার মতো চুপিসারে লেগে ছিল। যে চোরকাঁটার খবর ওর স্বামী হুরমুজ মিয়া ছাড়া আর অন্য কেউই জানতো না। সাবানফেনার মতো লোভের অজস্র বেলুন ফুলেফেঁপে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল বুলবুলির মনের ভিতর।
‘দাদিবুজির জেওর! স্বর্ণের দাম তো অহন অক্করে আসমানে চড়া! জেওরগুলার উপায় কী করব হেয়?’
অন্য আত্মীয়কুটুমের মতোই বুলবুলিও প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট ছিল আলতাবানুর ওপর। বিধবা হওয়ার পরেও নাকের চুঙ্গিডা সে খুইল্যা থোয় নাই! কিন্তু মনের অসন্তোষ অন্য কারো সামনে প্রকাশও করে নাই বুলবুলি।
হলদিমেন্দির বাস্না বুলবুলির গতরে এখনো লেগে আছে। নতুন বউয়ের কী শখ-আহ্লাদ থাকতে নাই। আছে, আছে, বুলবুলির অনেকের চাইতে এই শখ-আহ্লাদ খানিকটা বেশিই আছে। স্বর্ণের বাজারদর যখন ভরিতে লাখ দুইয়ে ঠেকেছিল তখনই বুলবুলির বিবাহ হয়। কিন্তু আলম ব্যাপারী বা হুরমুজ মিয়া কেউই এক রতির গয়নাও ওকে দিতে পারে নাই। কাবিনের সময় সাত পাথর বসানো নাকের একটা ফুলচুঙ্গি ছাড়া শ্বশুরবাড়ি থেকে আর কিছুই আসে নাই। বুলবুলি ক্রোধে ভিতরে ভিতরে পুড়ে ছাই হলেও কাউকে বুঝতে দেয় নাই। ওর মনে তখনো সুপ্ত আশা, ‘দাদুবুজির একটা জেওর তো আমারে দিবই দিব। নাতনিরে কেউ খালি হাতে বিদায় করে নাহি?’
কিন্তু বুলবুলির মনের আশা পূর্ণ হয় নাই। আলতাবানু নাতনির হাতে হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বরবধূর বিদায়ী সালাম নিয়েছিল। উসমান ব্যাপারীর ব্যবসার দায়দায়িত্ব তখন ছেলের হাতে। নাতনির বিয়েতে তাই তারও খুব বেশি নড়চড়া করার উপায় ছিল না। ফলে যা হওয়ার, তাই হয়েছিল। বিনা-জেওরে শ্বশুরবাড়ি যেতে হয়েছিল বুলবুলিকে। উসমানের মৃত্যুর খবর পেয়ে পড়িমরি করে সে ছুটে এসেছিল ঠিকই। এইখানে একটা গোমর অবশ্য ছিল – দাদাজানের জন্য যত না শোক, তার চাইতেও অধিক ছিল মনের ভিতরে এক অধরা-স্বপ্ন। যা সাপের মতো বিড়া পাকিয়ে শান্তসুবোধ হয়ে থাকার কসরত করছিল।
কিন্তু মাস চারেক পার হয়ে যাওয়ার পরও দাদুবুজির কোনো হেলদোল নাই দেখে বুলবুলিও ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। জেওর গায়ে দিয়ে ঝুমুতঝুমুত করে আলতাবানুর চলাফেরায় বিড়াপাকানো সাপটা ফণা তুলে ফোঁসফোঁস করছিল। এই ফোঁসফোঁসানি টের পেত শুধু হুরমুজ মিয়া। আর কেউই নয়।
প্রতিরাতে ঘুমানোর সময় সোয়ামির বুকে মাথা রেখে সারাদিনের জমানো বিষ উগরে দেয় বুলবুলি।
‘আইচ্ছা কও তো দেহি, এই বুড়িবেডির জেওর পিন্ধনের কাম কী?’
হুরমুজ মিয়ার মাথাটাথা এখনো অতটা খারাপ হয়ে যায় নাই, যাতে করে সে বুলবুলির বিপক্ষে কথা বলবে? সে-ও তাল দিয়েই বলে – ‘কতা তো মিছা কিছু কও নাই। জেওর পিন্ধনের শখ হের মিডে না কিয়েরে? অহন তো সোয়ামিও মইরা গ্যাছে।’
বুলবুলির রাগের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে নির্বিকার হুরমুজ মিয়া। বুলবুলি, তুমি অহনে রাতভর জ্বালাপোড়া নিয়া অঘুমা থাকো, তাতে আমার কী?
বুলবুলি রাগে গজগজ করতে করতে বলে –
‘দেহো আমার বিয়ার সমুয় বুড়ি কিছুই দিলো না। কানপাশাডা তো দিতে পারতো। নাতিন যে ল্যাংটা অইয়া শ্বশুরবাড়ি গেল সেইটা তার লিগ্যা শরমের কিছু মনে অয় নাই।’
‘হ। আমিও তো তুমারে সুনাদানা কিছুই দিতে পারি নাই। ক্যাম্নে দিমু কও? এমুন দাম অহন। জেওর গড়ানোর কতা অহন ভাবনও যায় না।’
‘আমি তো তুমারে কিছু কই নাই।’
‘হেইডা তুমি কইবা ক্যান? আমারই তো শরম নাগে। তাই কই।’
‘তুমার কিয়ের শরম? আইচ্ছা তুমিই কও, দাদুবুজিরে অহন কি মানায় জেওরে? আমার তো খালি মনে অয়, একডা আজদাহা হাতে বালা পিন্দা থুইছে। কিমুন দড়িদড়ি খসখইস্যা দেহায় হের হাত দুইডা।’
বুলবুলির কথা শুনে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে হুরমুজ মিয়া। এরকম রাতনিশুতিতে আজদাহার কথা পাড়লে কার না ডর করে? হুরমুজ মিয়ার লাফ দেখে অবাক হয় বুলবুলি।
‘কী অইলো? ফাল দিয়া উঠলা কেন? আমি কি মন্দ কিছু কইছি? হের হাত দুইটা দেখছ, তুমি? চামড়াচুমড়া ঢিলা হইয়া কুঁচকাইয়া গ্যাছেগা। আজদাহার খসখসা চামড়ার লাহান দেহায়। হেই হাতে ক্যামনে ওই মুটাসুটা বালা পিন্দা হেয় ঘুইরা বেড়ায় সারামুলুক, তুমিই কও?’
হুরমুজ মিয়া জানে, বুলবুলির এখন কিছু সান্ত্বনা-বাক্য বলা দরকার। নইলে আগুনে ঢেলে দেওয়া ঘি আজ রাতে প্রকাণ্ড অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলতে পারে। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সেই চেষ্টাই চালায় হুরমুজ মিয়া। গলায় আহ্লাদ মিশিয়ে বলে –
‘অহনই মাতা অত গরম কইরো না। তবে যা কইছ তা এক্করে মিছাও না।’
বলেই ঠা-ঠা করে হাসে হুরমুজ মিয়া। হাসতে হাসতে বলে – ‘ওহহো আজদাহা! আজদাহা!’
হরমুজ মিয়ার হাসির তোড়ে আগুন নেভে না, বরং আরো দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে ওঠে। বুলবুলি রাগ দমিয়ে চাপাস্বরে বলে –
‘হাসো ক্যান? এত হাসির কী আছে এইহানে? তুমার হাসি দেখলে আমার গা জ্বইল্যা যায়।’
হিতে বিপরীত অবস্থা দেখে হুরমুজ মিয়া মনে মনে ঘাবড়ে যায়। গলায় আরো খানিকটা আহ্লাদ ঢেলে বলে –
‘আইচ্ছা আমার দুষ অইছে, আর হাসুম না। আল্লার কিরা।’
সোয়ামিকে কিরা কাটতে দেখে ভিতরে ভিতরে নরম হয়ে পড়ে বুলবুলি।
হরমুজ মিয়ার বুকের ভিতর আরো খানিকটা ঢুকে পড়তে পড়তে বলে – ‘এহন কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি তো করণ নাগে। এবারো জেওর ছাড়া শ্বশুরবাড়ি যাই কেমতে? তুমার মায়ে কিন্তুক খোঁটা দিয়াই থুইছে। কয়, এত বড়নুক, তাও কি না মাইয়ার গতর খালি রাইখ্যাই বিদায় করছে।’
‘হ, আম্মায় এমন কয় জানি। আমারেও তো কয় কত কী? কয়, একডা মোটরসাইকেল দেওনের কতা আছিল, হেইডাও তুমরা দেও নাই।’
হুরমুজ মিয়ার পেতে রাখা ফাঁদে কেমন অজান্তে পা দিয়ে ফেলল বুলবুলি! কিন্তু এখন রেগে উঠলে বহু কথাই বলে ফেলতে পারে হুরমুজ মিয়া। বুলবুলি তাই পাশ কাটাতে বলে – ‘আরেহ মোটরসাইকেল নিয়া ভাইবো না। আব্বায় তো দিয়াই দিত এতদিনে। দাদাজান হটাশ কইরা মইরা গেল। কইছে যহন, তহন তো দিবই। এইডা নিয়া ভাইবো না।’
হুরমুজ মিয়াও বউকে নতুন করে এখন আর ঘাঁটাতে চায় না।
ঝুমুতঝুমুত শব্দ করে বেজে ওঠা আলতাবানুর জেওরগুলি কী করলে বা কীভাবে হাতিয়ে নেওয়া যায় – সেসবের শলাপরামর্শে দুইজন উত্তেজিত বোধ করে। এভাবেই ওরা সেদিনের রাত কাবার করে ফ্যালে।
চার
উসমান ব্যাপারীর মৃত্যুর পর ফজরের নামাজ একদিনও
কাজা পড়ে নাই আলতাবানু। আজান ধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে
সঙ্গে উঠে গিয়ে কলপাড়ে অজু করে নেয়। নাকের ফুটায়
পানি দিতে দিতে আকাশের দিকে তাকায়। ইতিউতি দ্যাখে, ভালো করে ফজর হলো কি না? আলো কতটা ফর্সা হলো কি হলো না?
‘আইজ কিমুন আন্ধারডা একডু বেশিই নাগতেছে। আসমান ফর্সা অইতে দেরি অইব মনে অয়।’
ফর্সা-আলোর তালাশ আলতাবানু প্রতি ভোরেই করে। ভালো করে আলো ফুটে না উঠলে উসমান ব্যাপারীর কাছে যেতে কেমন ভয় লাগে তার। সারি সারি মুর্দার সঙ্গে উসমানও নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে আছে। তবুও আলতাবানুর অহেতুক ভয় লাগে। এই এক আজব কারবার! এত বছর সংসার যাপনের সঙ্গীটি মাটির তলায় হান্দাইল কি, এক্করে জন্মের মতো পর হইয়া গেল! তখন তার কবরের কাছে যেতেও ভয়ে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে! কিমুন তাজ্জব ব্যাপারস্যাপার!
এদিকে ফজরের ওয়াক্ত ছাড়া উসমানের কাছে
যাওয়ার সময় হয় না আলতাবানুর। সারাদিন ময়নার
সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে সাংসারিক কাজকর্মেই তার দিন ফুরিয়ে যায়।
মাঘ মাস শুরু হয়েছে বলে লেপের তলা থেকে উঠলেই হাত-পা কেমন অসাড় বোধ হয়। আলতাবানু তবু একবিন্দুও আলসেমি করে না। ঝটাঝট উঠে পড়ে। তারপর আজান শোনার সঙ্গে সঙ্গে নামাজ আদায় করে নেয়। আর গায়ে একটা উলের চাদর জড়িয়ে অপেক্ষা করে ভোরের আলো ফর্সা হওয়ার জন্য। কিন্তু আজ এত ঘন হয়ে কুয়াশা ঝরছে কেন? যেন অঝোরবৃষ্টি নামিয়ে ফেলবে। জমাট-বাঁধা-অন্ধকার কাটবে কখন? আলোর আশায় বসে থেকে থেকে আলতাবানুর কেমন ঝিমুনি লেগে যায়। তবুও সে ফের ঘুমিয়ে পড়ে না। বিগত চার মাসের অভ্যাসবশে এলোমেলো পায়ে পৌঁছে যায় কবরস্থানে। উসমানের কবরে আজ এত কুয়াশা ঝরে পড়েছে যে, বিভ্রম তৈরি হয় – গোরখোদকেরা সদ্যই বুঝি মাটিচাপা দিয়ে চলে গ্যাছে?
আচানক আলতাবানুর চোখের সামনে ভারী কাপড়ের একটা পর্দা নেমে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই পর্দা গলায় ফাঁস হয়ে এঁটে যায়। কাপড়ে ঢাকা পড়ার আগে আলতাবানুর বিস্মিত চক্ষু দুইটা হয়তো দেখে থাকবে – এইটা না বুলবুলির গায়ের ওড়না?
গলায় এঁটে বসা ফাঁস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় আলতাবানু। কিন্তু গায়ের জোরে পেরে না উঠে একসময় শান্ত হয়ে যায়।
হুরমুজ মিয়া ফিসফিস করে বলে – ‘হাত চালাইয়া কাম সারো বুলবুলি।’
কানপাশা, গলার লম্বা চেইন, হাঁসুলি সহজে খুলে ফেললেও ঝামেলা বাধিয়ে দেয় হাতের গোলাপবালা। বাঁ হাতেরটা খুলে নিতে পারলেও ডানহাতের বালাটা আঁট হয়ে বসে যায়। বুলবুলি কয়েকবার টানাটানি করে হাল ছেড়ে দেয়। আর বেশি সময় নিলে ধরা পড়ে যেতে হবে।
আলতাবানুর গলা থেকে ওড়নাটা খুলে নিজের গায়ে জড়িয়ে নেয় বুলবুলি। ফুলতোলা ওড়নায় ভালো করে নিজের মুখ-মাথা ঢেকে ফেলে সে।
ঘণ্টা তিনেক বাদে ময়নার ভয়ার্ত চিৎকারে সকলের ঘুম ভেঙে যায়। হুরমুজ মিয়া আর বুলবুলিও জেগে ওঠে তখন। ময়নার চিৎকার অনুসরণ করে দুইজনেই একযোগে দ্রুত পা চালায়।
শীতের সকালের গাঢ়-কুয়াশা ভেদ করে নারীকণ্ঠের আর্তনাদ খুব বেশি দূর পৌঁছাতে পারে না। বুলবুলির কান্নার শব্দে কবরস্থানের ভেজামাটির নীরবতায় ফাটল ধরে …
– আল্লাগো, আমাগোর এমুন সব্বোনাশ কিডায় করল? কিডায় করলো? দাদুবুজিরে কিডায় মারল, কিডায়? ও আল্লাহ…
হুরমুজ মিয়া অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে স্ত্রীর দিকে। এই বুলবুলিকে সে যেন একদম চিনতে পারে না!
স্ত্রীর এমন বুকফাটা আকুলকান্না দাদুবুজির জন্য নাকি খুলে নিতে না পারা ডানহাতের গোলাপবালার জন্য – হুরমুজ মিয়া ঠিক বুঝে উঠতে পারে না …।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.