বাংলাদেশের বিখ্যাত এক এনজিওর মাইক্রো ফিন্যান্স সেকশনের ডেপুটি ডিরেক্টর তানজিলা খানের পছন্দ তিন ইঞ্চি উচ্চতার হাইহিল। কিন্তু যখন গ্রামে গরিবদের আগামীদিনের স্বপ্ন দেখাবার জন্যে – ওই আগামী দিন ক্রমাগত আগামী হয় – ঋণের বোঝা দিতে সমিতির মিটিংয়ে তাকে যেতে হয়, তখন পায়ে থাকে দুই ফিতার ফ্লাট স্যান্ডেল এবং পরেন সাধারণ মানের সালোয়ার-কামিজ। সাধারণ মান দিয়ে মিথ্যা বোঝাবার একটা চেষ্টা থাকে, দেখুন আমি আপনাদের কাছের মানুষ। ‘মানুষ’ কথাটার মধ্যে অনেকরকম ছবি আছে, জানেন তানজিলা। গ্রামে যাওয়ার সময় কপালে টিপ দেন না। কিছুদিন আগে ঢাকার এক শপিংমলে একজন পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিল, ‘টিপ পরা শেষ করবো।’ যদিও আগামী দিনগুলি বড় বড় নখে ঋণ নেওয়া মানুষদের রাত্রিদিন খামচায়।
বয়স তেত্রিশ হবে, শরীরের আকার ঠিক রাখার ব্যাপারে সচেতন, সপ্তাহে দুদিন, শুক্র-শনির বিকালে, মাসে আটদিন, চামড়ার বড় ব্যবসায়ী স্বামী আজাদ খানের সঙ্গে তানজিলাকে জিমে যেতে হয়। নানা কাজে পরিশ্রম করা শরীর বিশেষ ধরনের সেবা – স্পা, মাসাজ – পেয়ে সুখী হতে ভালোবাসে।
মানুষের চামড়া দেখে, নৃতত্ত্ব বিষয়ে জীবনে এক অক্ষর না পড়া, জনাব খান, যদিও কোন পশুর চামড়া কেমন, চামড়ার বয়স কত – সেসব তার নখদর্পণে – দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘ড্রাই, ওয়েলি, মিক্সড, ন্যাচারাল, সেনসেটিভ আর স্মুদ এই ছয় রকম স্কিনের মানুষ ছয় রকম চরিত্রের।’ স্বামীর কথা শুনে তানজিলার মন্তব্য ‘হতেও পারে।’ খান না হেসে, জানেন কখন হাসতে হবে, কখন নয়, বলেন, ‘আমি যা বললাম তুমি মিলিয়ে দেখো। আমার স্কিন সেনসেটিভ। তোমারটা ন্যাচারাল। মানুষের নখ দেখেও পামিস্টরা বলে দিতে পারেন, কার কেমন চরিত্র।’ তানজিলা নখ দেখিয়ে বলেন, ‘জানি তুমি পামিস্ট না, আমার নখ কি খুব খারাপ?’ ‘সুন্দর।’
কথা বলার মধ্যে পার্শিয়ান লং কোটের বেড়াল, পোষা, দৌড়ে এসে তানজিলার কোলের ওপর বসলো। তানজিলা বেড়ালের মাথায় বাম হাত রাখতেই, ইচ্ছে আদর করবে, বলল, ‘সুনু।’ ডাকের উত্তর না দিয়ে সুনু ডান পা তুলে তানজিলার হাতের ওপর পা বুলিয়ে দিলো। ‘এই দ্যাখো, সুনুর নখ বড় হয়ে গেছে, কাটা হয়নি। কাকে কখন যে খামচি মারে?’ বললেন আজাদ।
গুলশানের নামকরা – নামকরা তাদের কাছেই যারা সেখানে যায় – এক বিউটি পারলারে মাসে দুবার ফেসিয়াল, এবং পেডিকিউর ও ম্যানিকিউর করাতে যান এক নয় বছর বয়সী মেয়ে পিউলীর মা তানজিলা খান। মায়ের স্বপ্ন – নিজের স্বপ্ন বাস্তবতা পায়নি এ জন্য – মেয়ে ডান্সার হবে। ইংরেজি স্কুলের ক্লাস ফোরের ছাত্রী পিউলী শুক্র-শনির সকালে ডান্স শিখতে যায় ধানমন্ডিতে। পিউলীর, রাতে ঘুমাবার কয়েক ঘণ্টা ছাড়া, নিজের বলতে কোনো সময় নেই। শুক্র-শনির দুপুরের পরে যেতে হয় আর্ট শিখতে। সন্ধ্যায় আসেন গানের শিক্ষক। সপ্তাহের অন্য পাঁচদিন স্কুলে যাওয়া-আসা এবং তিনজন হোম টিচার তাকে পড়ায়। তাদের মধ্যে একজন আরবির টিচার। আজাদ খানের বাপ তাদের জেলার এক ইউনিয়নের ‘মডেল মসজিদ’ কমিটির সভাপতি, বলেছেন, পিউলীকে আরবি শেখাতে। পিউলীর স্কুলে ‘রিলিজিয়ন’ হিসেবে একটা সাবজেক্ট আছে। আজাদ খান আরবি জানেন না। আরবি জানলে কোরবানি ঈদের সময় আরব থেকে উট কেনায় সুবিধা হতো।
সময় সন্ধ্যা। জনাব আজাদ ও তানজিলার সামনে ছিল কফি। পিউলী বাংলা পড়ছিল টিচারের কাছে। ‘পিউলী যে অবস্থার মধ্যে বড় হচ্ছে একসময় রোবট হয়ে যাবে।’ ‘এটা কি বললে? কমপিটিশনে পিছিয়ে পড়বে নাকি?’ ‘কমপিটিশনের দৌড় কি কখনো থামে?’ জনাব খান বউকে বলেননি। বললেন, ‘কোথায় যেন পড়েছিলাম, কমপিটিশনের নেইল অনেক বড় না হলে বাজারে টেকা যায় না।’
তানজিলাকে প্রথম দেখে, সৌন্দর্য বোঝার বেসিক কিছু শিক্ষা যার আছে, বাংলায় নয়, ইংরেজিতেই বলবে, ‘সিøপিং বিউটি’। চোখে বিনয়ী মায়া বিস্তারিত। কথার স্বর মৃদু। তানজিলার ভালো লাগে ঝিরঝির বৃষ্টিতে হাঁটতে। ঋতু পরিবর্তনের সময় অনেকের সর্দি-কাশি হয়, তানজিলার এমন ঝামেলা নেই। কোনো কাজে তাড়াহুড়া করা তার অপছন্দ। সংস্থার বড় কর্তারা তার ব্যক্তিত্ব ও কাজে স্যাটিসফাইড।
দুই
বিয়ের আগে তানজিলার নামের পরের অংশ ছিল আহমেদ, এখন পদবি খান। অফিসের গাড়িতে দুজন সহকর্মী ফারিয়া ও শিফাতের সঙ্গে, অফিস থেকে ফেরার পথে, তখন সন্ধ্যা, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের এলইডির ফর্সা আলোতে সন্ধ্যার ছাইছাই রং উধাও, সবারই মুড ছিল আনন্দে, তিনজনেরই দেখা মনিকা বেলুচ্চির বিতর্কিত ছবি ইরিভারসিবল নিয়ে সতর্কভাবে, কোন দৃশ্য ভালো, কোন দৃশ্য অতিশরীরী – নিয়ে কথা বলছিলেন। নায়ক-নায়িকার বিশেষ ঘনতাপূর্ণ দৃশ্য ফারিয়া, ড্রাইভার যেন তার ব্যাক ভিউ গ্লাসে দেখতে না পান, ইঙ্গিত এঁকে বিশেষ ইশারায় পরস্পরকে দেখাচ্ছিলেন, তাদের উপভোগ সুখী হচ্ছিল, গাড়ি থেমে গেল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মোড়ে, সামনে অনেক গাড়ি, ড্রাইভার বললেন, ‘মনে হয় শাহবাগে আন্দোলন চলতেছে।’
‘যখন-তখন আন্দোলন শুরু হচ্ছে।’
‘কবে শেষ হবে কে জানে।’
‘আন্দোলন কখনো শেষ হয় না।’
‘দাবি-দাওয়ার শেষ নাই।’
‘কখনো শেষ হবে না।’
‘জ্যাম যে কতরকম?’
তিনজনের ছয়টি বাক্য এসি গাড়ির হালকা শীতলতার মধ্যে হয়তো কেবল কথার কথা নয়।
তিন
গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবারে অফিসের শেষবেলায় সব শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়ে জরুরি মিটিং করেছেন এনজিওর এমডি। এজেন্ডা ছিল দুটো। অফিসে এবং বাইরে পলিটিক্যাল কথাবার্তা কেউ যেন না বলেন। এবং ধর্মীয় বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা থেকে দূরে থাকতে হবে। ধর্মকে ব্যবসা বানানোর লোক বেড়ে যাচ্ছে। সবার জন্য পলিটিক্স নয়। যদিও কোনো কোনো দেশে পলিটিক্সও খুবই উঁচু দরের ব্যবসা। অবশ্য একসময় তা ছিল না। রাজনীতিবিদদের কাজ ছিল দেশ ও মানুষকে সেবা এবং জাতিকে ও জাতির চিন্তাকে এগিয়ে দেওয়া। নিজের আইডেন্টিটি চেনানোর দায়দায়িত্ব জাতিকেই বহন করতে হয়।
আলোচ্য বিষয় দুটি প্রসঙ্গে এমডি আরো বলেছিলেন, সহকর্মী এবং বন্ধুদের মধ্যে কে কার কথা গোপনে মোবাইলে রেকর্ড করছে এবং সময়মতো বন্ধু বা সহকর্মীকে ব্ল্যাকমেইল করবে, প্রতিহিংসার প্রতিযোগিতা চলছে তো, বোঝার উপায় নেই। ফলে হত্যাকাণ্ড হতে পারে। হচ্ছেও। সাবধানে থাকতে হবে। কাউকে বিশ^াস করার আগে দশবার চিন্তা করতে হবে : সঙ্গী বন্ধু, না শত্রু।
আর শেষ কথা হিসেবে বলেছিলেন, সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে টাকা। আপনারা কাজ করছেন টাকার সঙ্গে। কথাটা বলে নিজের তর্জনীর নখে কামড় দিলেন। এবং তার মনে হলো, নখ বড় হয়ে গেছে।
মিটিং-শেষে নিজেদের টেবিলের দিকে যেতে যেতে ফিসফিস করে ফারিয়া শিফাতকে বলেছিলেন, ‘মানি অ্যান্ড সেক্স আর প্যারালাল বার্স। স্যার বিশ^াস করেন সবকিছুকে এই দুটি ডমিনেট করে; কিন্তু কলিগদের সামনে সেক্স শব্দটি বললেন না।’ ‘তুমি কীভাবে জানো?’ শিফাতের প্রশ্নে উত্তর ছিল, ‘দীপা বলেছে। সিঙ্গাপুরে স্যার তাকে বলেছিলেন।’
তানজিলা, ফারিয়া ও শিফাত সেদিন থেকে সতর্ক। কোনো পলিটিক্যাল আলোচনা, ধর্মের অবমাননা হয়ে যেতে পারে – এমন কথাবার্তা না বলে বরং অফিসে আসা এবং ফেরার পথে কখনো ফ্যাশন, বাংলাদেশের কোন মিডিয়ার ভূমিকা কী, দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া, মেধাবী তরুণ-তরুণীরা দেশ থেকে চলে যাচ্ছে, কখনো হলিউড বা বলিউডের মুভি, কোন নায়ক-নায়িকার অভিনয় ভালো, কখনো-বা কোন বিউটি পারলার ভালো কাজ করে, টাকা কমপারেটিভলি কম নেয়, ইউএস এইড বন্ধ হয়ে গেছে, অনেকের চাকরি চলে যাবে, ট্রাম্প ঠিকই করেছেন, এইডের টাকা নিয়ে এই দেশের কিছু সুশীল আমেরিকার অন্য পারপাস সার্ভ করছে, এবং এমডির সঙ্গে কোন্ নারী কলিগ, নাম উচ্চারণ না করে, কদিন আগে সিঙ্গাপুরে গেছে – এইসব কথা বলে অফিস ও পথের ক্লান্তির ঘাম মোছে।
চার
আজাদ খানের কল। ‘রাত সাড়ে আটটা। এখনো কি অফিসে?’ ‘শাহবাগে আন্দোলন চলছে, কোনো গাড়ি মুভ করছে না। কখন পৌঁছাব ডোন্ট নো।’ তানজিলার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনলেন জনাব খান। আজ বৃহস্পতিবার রাতে তাদের ডিনার করার কথা ছিল এক পাঁচতারা হোটেলে।
দুই সহকর্মী তাদের স্বামীকে ফোন করে জ্যামে আটকে থাকার কথা জানালেন। একটা বাক্য ফারিয়ার ফোন থেকে স্পষ্ট শোনা গেল, ‘সাবধানে থেকো। মব কালচার হঠাৎ কী করে কে জানে?’ ‘কতরকম কালচার যে দেখতে হবে?’ মন্তব্য শিফাতের।
জ্যামের ভেতর বসে কথা বললে সময় কাটে। কথা মানুষকে জীবিত রাখে। তিনজন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে একসময় ফারিয়া বললেন, ‘ঢাকায় আর চট্টগ্রামে রুমডেট বেড়ে গেছে।’ তানজিলার এক আত্মীয়া, ঢাকার নামকরা বেসরকারি এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী, সুন্দরী, সপ্তাহে দুই-তিন দিন রুমডেট করে। তার মা মেয়ের ব্যাগে ‘একস্ট্রা লাভ’ নামের প্লাস্টিকের একটা জিনিস পেয়েছিলেন। মেয়েকে জিজ্ঞেস করলে মাকে শুনতে হয়েছে, ‘ইটস মাই লাইফ।’ মা শুধু মেয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলেছেন, ‘টেক কেয়ার।’ ‘আই ডু নো’, উত্তরে দৃঢ়তা ছিল। শিফাত বললেন, ‘জেন-জি হার্ড রিয়েলিটি এবং ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডের কনফ্লিক্টের মধ্যে সাঁতার কাটছে।’ ‘পোর্ট পাবে কি না সন্দেহ আছে।’ ফারিয়ার মন্তব্য।
শিফাত হেসে বলেন, ‘হোয়াটএভার জেনারেশন। রুমডেট পশ্চিমে দুধভাত, আমাদের এখানে প্রহিবিটেড স্টোরি।’
পাঁচ
রাত সাড়ে দশটার দিকে তানজিলার অফিসের গাড়ি দাঁড়াল বেইলি রোডের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। লিফট কেবল দোতলায় উঠেছে, হয়তো যাবে দশতলায়। উঠতে এবং গ্রাউন্ড ফ্লোরে আসতে কয়টা ফ্লোরে থামবে কে জানে? তানজিলা সিক্সস্থ ফ্লোরের বাসিন্দা। তাকে বিরক্ত এবং ক্লান্তি থাপড়াচ্ছে। বাম হাতের তর্জনীতে কামড় দিলেন। নখের নীল রঙের পলিশ থুতুতে ভিজে গেল।
ডান হাতের নখগুলিতে চোখ পড়লো। গত সপ্তাহে বিউটি পারলারে গিয়ে চুল ও নখ কাটিয়ে এবং সাজিয়ে আনার পর ‘নখগুলি এত শিগগির বড় হলো কীভাবে?’ নিজের প্রশ্নের উত্তর তার নিজের কাছেই নেই।
লিফট এলো। চারতলার মেয়েটির সঙ্গে বের হলো কানে দুল ও খোপাঅলা চুলের সুদর্শন এক তরুণ। তরুণের স্মার্ট ফোনে কি একটা ইংরেজি গান বাজছিল। ‘হাই আন্টি’ মেয়েটি হেসে বলতেই তানজিলার নাকে এলো ভালো মদের গন্ধ। মেয়েটির বাবা-মা বাসায় ছিলেন না। দুদিনের জন্য গেছেন রাজশাহীতে।
লিফট উঠছে। ভেতরে মদের গন্ধ। লিফটের একটা দেয়ালে আয়না। প্রতিবিম্বে তানজিলার মুখ মৃদু হাসল। হাসির উৎস হতে পারে, তরুণ-তরুণীর তারুণ্য। এবং অনেকদিন আগে দুজন ছেলেবন্ধুর সঙ্গে এক বান্ধবীসহ মদ্যপানের কোনো স্মৃতি। ভাবনা চলছিল। আয়নায় চোখ পড়তেই দেখলেন, বাম হাতের নখগুলির মধ্যে অনামিকার নখের অর্ধেক পলিশ উঠে গেছে। ফলে নখটা হয়ে গেছে দুই রঙের, নীল ও সাদাটে। আঙুলে খানের পরানো এনগেজমেন্ট রিং। সোনার। নেইল পলিশের দুই রঙের নিচে সোনালি রংকে লাগছিল ফ্যাকাসে।
‘সারাদিন চোখে পড়েনি কেন?’ পায়ের দিকে চোখ পড়ল, ডান পায়ের হাইহিলের পাশে তিনটি ফেইক নেইল। ঝুঁকে তুলে নেওয়ার সময় একটা সম্ভ্রম বোধ থেকে ওড়না বুকের ওপর টেনে দিলেন। ‘চারতলার মেয়েটির আসল নখ থেকে ফেইক নেইল পড়ে গেছে নাকি? নাকি সাততলার আপার?’ নখগুলি হাতে নিয়ে শুকলেন। মদের গন্ধ নেই। লিফট থেকে নামার সময় আবার চোখ পড়ল পলিশের রং হারানো অনামিকায়। ডান পাশে মধ্যমা ও বাম পাশে কেনি আঙুল। ‘না, দুটোর নেইল পলিশ ঠিক আছে।’
ছয়
একবার কলিংবেল বাজাতেই, তিন-চার সেকেন্ড শেষ না হতেই জনাব খান, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে খুললেন দরজা। ‘ডিজগাস্টিং’ বলে বেডরুমের দিকে দ্রুত হেঁটে গেলেন তানজিলা। জনাব খান বুঝলেন, জ্যামে আটকে থাকার রিঅ্যাকশন। বউয়ের বাঁ হাতের মুঠো বন্ধ ছিল। হাতের ওপর চোখ পড়েছিল জনাব খানের। তিনি জিজ্ঞেস করেননি, মুঠোতে কী? ‘শাওয়ার যদি নাও নিয়ে এসো। ডিনার আসছে।’
পাঁচতারা হোটেলে যাওয়া হয়নি। অর্ডারে এসেছে সেখানকার বিচিত্র নামের পাঁচ পদের বিদেশি খাবার। মেয়ে পিউলী আর কতটুকু খাবে। তিনজন খাবার পরও থাকবে লেফট ওভারস। কালকে দিয়ে দেওয়া হবে ‘হোম হেলপারকে’।
সাত
ঘরে এসেই ফেইক নেইলগুলি তানজিলা রাখলেন ড্রেসিং টেবিলে সাজানো বিশ^খ্যাত ব্র্যান্ডের কয়েকরকম পারফিউম, নেইল পলিশ এবং অন্যান্য প্রসাধনের পাশে। জিনিসগুলির সামাজিকতা প্রতিযোগিতামূলক। ভুরু নিজ থেকে কোঁচকাল। এবং নিজের দশ আঙুলের নখ দেখে তার সন্দেহ হলো, নখগুলিকে বড় লাগছে কেন? আয়নায় দুটো টিপ – লাল ও সবুজ – লাগানো ছিল। তর্জনীর নখ দিয়ে টিপ দুটি তুলে বিনে ফেলে দিলেন।
নেইল কাটার বক্সটা ড্রয়ারে আছে। শুধু নখ কাটা নয়, নখের সবদিক পরিষ্কার করার ছোট, মাঝারি ও বড় টুলস, স্টেইনলেস স্টিলের, মোট ১৬ পিসের একটা বক্স। সুন্দর চামড়ার। রং চোখকে আরাম দেয়। ‘বের করবো নাকি? না কালকে পারলারে যাবো।’
লিফটের মধ্যে পাওয়া তিনটি ফেইক নেইলের মধ্যে একটা ছিল বুড়ো আঙুলের, একটা তর্জনী এবং আর একটা কেনি আঙুলের। বুড়ো আঙুলের ফেইক নেইলে হালকা লাল রঙে আঁকা ছবিতে হার্ট, তর্জনীতে নীল রঙের চোখ এবং কেনি আঙুলে গোলাপি পালক। তিনটি বস্তুর তিনরকম মিনিং তো আছেই। ‘মিনিং ছাড়া কে সারভাইভ করে। কে হতে চায় মিনিংলেস?’ কথাটা মনে পড়ল তার।
নিজের দশ নখের জন্য তানজিলার আছে অনেকরকম ছবির, অনেক ফেইক নেইল। তিনটি ফেইক নেইল ড্রেসিং টেবিলের পাশে রাখা বিনে ফেলে দিলেন। একটা চীনা তেলাপোকা বিন থেকে বের হয়ে দৌড় দিলো। তানজিলার তেলাপোকা এলার্জি নেই। মেয়ে পিউলী তেলাপোকা দেখলেই ভয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে যায়। ‘ককরোচ ককরোচ। হাগ মি মম।’
নিজের আঙুলের নখগুলি আয়নার সামনে ধরলেন, প্রতিবিম্বের দশটি নখ এখনই চোখমুখ খামচে ধরবে নাকি? এবং আরো মনে হলো, নখের আসল খাদ্য কী? পুষ্টি কি? নখ কত প্রকার? ছোটকালে মা, চাড়া (নখ) কাটার আগে সাবান পানিতে দু-তিনবার ধুয়ে নিয়ে, বাড়িতে নেইল কাটার ছিল না, ব্লেড দিয়ে, ধীরে ধীরে কাটতো। ‘চাড়া’ শব্দটা মনে আসতেই মুখে দেখা গেল সহজ হাসি। কতদিন ‘চাড়া’ বলা হয়নি।
মোবাইল নিয়ে তানজিলা গেলেন বাথরুমে। গুগলে দেখতে হবে নখের জীবন।
নখ আসলে শরীরের এক ধরনের মৃত কোষ। কেরাটিন নামের এক প্রকার প্রোটিন দিয়ে তৈরি হয়। আরো অনেক তথ্য জানার পর তানজিলার মনে হলো, প্রোটিন মৃত কোষ তৈরি করে? কোষ তো জীবন তৈরি করে? কন্ট্রাডিকটরি। নখ কত প্রকার? নখ ব্যবহারের সামাজিক রুচি অর্জন করা খুবই কঠিন কাজ।
মনে পড়ে, কোনো একজন নারীবাদী বলেছিলেন, নখ মেয়েদের জন্য ওয়ান সর্ট অফ উইপন। নিজেকে রক্ষা করার জন্য কখন যে কাজে লাগবে। ‘খামচি’ নামের কাজটা প্রয়োজনে খুব উপকারী। শৈশবে তানজিলা কতবার খেলার সঙ্গীদের খামচি দিয়েছে এবং সঙ্গীরাও তাকে দিয়েছে এবং সব খামচি ছিল খেলার সঙ্গ, মুখ থেকে চামড়া তুলে নেওয়ার আক্রমণ নয়।
‘কত কিছুর তো মিউজিয়াম আছে, নখের আছে? যদি থাকে কোন কোন পশুপাখির নখ ধারালো হয়? নাকি মানুষের নখের ধারের কাছে পশু ও পাখির নখ কিছুই না?’ প্রশ্ন দুটি আজাদকে বললে আজাদ হয়তো হেসে বলবেন, ‘আই মে বি রং। সো ফার আই নো, অ্যানিমেলদের মধ্যে টাইগার অ্যান্ড অ্যামং বার্ডস বল্ড ঈগলের নেইল বেশি শার্প। স্টেটসের ন্যাশনাল বার্ড বল্ড ঈগল। অ্যান্ড উই নো হোয়াট ইজ আমেরিকা। বাট আই অ্যাগরি উইথ ইউ, অ্যানিমেল-ওয়ার্ল্ডে, ডোন্ট ফরগেট মানুষও টু লেগস বিশিষ্ট অ্যানিমেল, মানুষের নখ সবচেয়ে বেশি ধারালো এবং রিভেঞ্জ নিতে নাম্বার ওয়ান অ্যান্ড আনপ্যারালাল।’
আট
পাঁচতারা হোটেলে বসে সেখানকার খাবার খাওয়া, আর্টিফিসিয়াল পরিবেশের ভেতর বসে হোটেলের খারাপ মানের খাদ্যেরও, নমনীয় আলোর নিচে থাকে এবং মিউজিক বা গানবাজনা হয় বলে বিশেষ স্বাদ না থাকলেও, খাদকরা মনে করে, স্বাদ অন্যরকম। অনেক দাম, অন্যরকম স্বাদচিন্তা মেনে নিতেই হয়।
তানজিলার খিদে নষ্ট হয়ে গেছে। জনাব খান বললেন, ‘ভালো লাগছে না?’ তানজিলার ভালো লাগছিল না। ‘একটু রাইস আর মাটন নাও, ব্রাজিলিয়ান রেসিপি, খুব টেস্ট।’ বলে নিজে বউয়ের পাতে ফ্রাইড রাইস দুই চামচ (ভাত শব্দটা লিখলাম না কেন?) আর দু-টুকরো মাটন (খাসির মাংস লিখলাম না কেন?) তুলে দিলেন।
দ্বিতীয় লোকমা ভাত মুখে নিয়েই পাশে রাখা বনপ্লেটে, ‘ওয়াক’ শব্দ তুলে মুখ থেকে খাবার বের করে দিলেন তানজিলা। ‘কী হলো?’ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে, কাঁটা চামচ দিয়ে দুবার চিবানো রাইসের দলা ঘাঁটলেন। ‘লুক রাইসে একটা নেইল।’
জনাব খানের প্লেটের ডান দিকে ছিল মোবাইল। হাত বাড়ালেন ফোন নিতে। পাঁচতারা হোটেলে ফোন করতে হবে। তানজিলা বললেন, ‘কি দরকার? হয়তো একটা বা দুটো লোকের জব চলে যাবে।’
নয়
রাত সাড়ে এগোরাটা। বেডরুমে জ্বলছে হালকা নীল আলো। সঙ্গে বাজছে এস্রাজ। শব্দ মৃদু। আলো কাঁপছে না। চাদরে জনাব খান ছিটিয়ে দিলেন পারফিউম।
তানজিলা ও জনাব খানের শরীরী ঘনতা শুরু হলো। দুজনই হাসছিলেন। পলিটিক্যাল কথা চলছিল। এমডির বলা ‘ব্ল্যাকমেইল’ করার জন্য এখানে দুজনের কারো কথা মোবাইলে রেকর্ড হচ্ছে না। দেশের, ওয়ার্ল্ডের পলিটিক্স যে কোনদিকে যাচ্ছে, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি তার দেশকে চিনতে পারছেন না, কথা ও হাসির মধ্যে জনাব খানের ধারালো কয়েকটা নখ তানজিলার পিঠে বিঁধে গেল। ‘কি যে করো না। নখ ক’দিন কাটো না। রক্ত বের হচ্ছে মনে হয়।’ ‘সরি ডিয়ার।’ বলে বউয়ের পিঠে হাত দিলেন। তর্জনী ও মধ্যমা ভিজে গেল। রক্ত শুকলেন। ‘ডেটল আনছি। সরি। সরি।’
বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের আলো জ্বেলে ভেতরে গেলেন জনাব খান। স্বচ্ছ আলোর ভেতর হাসছে নখগুলি। ‘বড় লাগছে কেন? তিনদিন আগেই তো কাটলাম? নখের ভেতর এতো ময়লা এলো কীভাবে? হতে পারে ঢাকা শহর পৃথিবীর মধ্যে তিন নম্বর পলুটেড সিটি, নখে ময়লা তো হবেই।’
তার মনে পড়ল, দুদিন আগে সচিবালয়ে এক সচিবের রুমে বসে যখন দুজন – দেশ, রাজনীতি, ব্যবসা, গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, ট্রাম্পের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, মুসলিম দেশগুলির ইসলামি ব্রাদারহুড শুধু কথামাত্র – নিয়ে কথা বলছিলেন, এসেছিলেন একজন রাজনৈতিক নেতা। নখগুলি বড় এবং ছিল কালো ময়লায় ভরা। ভদ্রলোক বেশিক্ষণ বসেননি। ‘একটা ফাইল আসবে, একদিনের মধ্যে ছেড়ে দেবেন’, ভদ্র স্বরে, স্বর ছিল বরফঢাকা, বলেছিলেন। ‘চা না কফি দিতে …’ সচিবের কথা শেষ না হতেই ‘সময় নেই’ বলে দেশের জন্য অনেক কাজের চাপ নিয়ে রাজনীতিবিদ দ্রুত চলে যান।
তিনি চলে যাওয়ার পর সচিব হেসে জনাব খানকে বলেছিলেন, ‘মনে হয় নেতা নখ কাটেন না।’
‘কখন কোথায় লাগে।’ জনাব খানের কথা শুনে সচিব কোনো মন্তব্য করেননি।
দুজনই আড়চোখে নিজেদের নখ দেখেছিলেন। ‘আমার নখ বড় হয়েছে। ক’দিন আগেই তো কাটলাম। কাটতে হবে।’ বলেছিলেন সচিব।
দশ
পরদিন ছিল মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার। প্রথম ও শেষ শুক্রবারে তানজিলা যান পারলারে। পরিচিত এবং নিয়মিত যাওয়া পারলারে ফোন করে জানালেন, ‘সকাল সাড়ে দশটার দিকে আসছি।’ ‘ওকে ম্যাম’ উত্তরের সঙ্গে ছিল, ‘ইউ আর ওয়েলকাম।’
ওয়াশরুমে গিয়ে ঘুমলেপা চোখেমুখে ডান হাত দিয়ে পানি দেওয়ার সময় তানজিলা আয়নায় দেখলেন, এবং মনে হলো, এক রাতেই নেইলগুলি আরো বড় হয়ে গেছে। ‘অসুখ হলো নাকি? কী অসুখ? গড নোজ।’
আগে কোনোদিন এরকম হয়নি। সব আঙুলের নখ দেখলেন। চারপাশে নরম মাংস ফোলেনি বা দুইপাশে লাল হয়ে যাওয়া, যাকে বলে কেনি ওঠা, ওঠেনি।
এগারো
ব্রেকফাস্টের টেবিলে পিউলীর নখের দিকে তানজিলা তাকালেন। বড় হয়নি। ‘ও শিশু বলেই কি নখ ওকে ছাড় দিলো?’ তাকালেন জনাব খানের নখগুলির দিকে। বড় হয়েছে কি না বুঝতে পারলেন না। মনে হলো, জনাব খানকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘তুমি ক’দিন নখ কাটো না?’ মনে হওয়া কথাটা মনেই থাকল। নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, নখের চিন্তা মাথার ভেতর থেকে যাচ্ছে না কেন? হ্যালুসিনেশন হচ্ছে নাকি?
বারো
পারলারে গিয়ে তানজিলাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। বেশ ভিড়। নিয়মিত যাওয়ার ফলে পারলারের প্রোপাইটার এবং অন্যান্য স্টাফ তাকে বিশেষ হিসাবে রাখেন। দু-মিনিটও বসতে হয়নি। ওই সময়ের মধ্যে তানজিলা অপেক্ষমাণ অন্য মেয়ে ও মহিলাদের নখগুলি দেখেছেন স্থির চোখে। বেশ বড় বড় নখ। ‘কতরকম নখ। নখ কাটতে আগে তো এত ভিড় হয়নি। এই শহরে কি নখ বড় হওয়ার অসুখ হলো?’
পেডিকিউর ও ম্যানিকিউর করাতে তানজিলার পছন্দ পার্বত্য চট্টগ্রামের মেয়ে, হাসি সুন্দর, প্রশিক্ষণ ওইভাবেই পাওয়া, সফট ভয়েসের সুমি মুরমু।
তানজিলার নখগুলির নেইল পলিশ তুলতে সুমি লেবুর রস আর ভিনেগার মেশাতে যখন ব্যস্ত তখন তানজিলা জানতে চাইলেন, ‘খুব ভিড় দেখলাম।’ ‘জি ম্যাম, লাস্ট উইক থেকে খুব রাশ যাচ্ছে। আমাদের ওভারটাইম করতে হচ্ছে।’ ‘মেন সেকশনেও কি রাশ?’ ‘জি ম্যাম।’
তানজিলার ডান পাশে শোয়া এক তরুণীর দুই চোখের ওপর শসা। তরুণী বললেন, কণ্ঠ ছিল নিচু, ‘কেন যে নখ বড় হচ্ছে। এপিডেমিক হয়ে যাবে নাকি? গড নোজ।’ তানজিলা বললেন, ‘আই থিংক ডিপ কজ ইজ দেয়ার।’ তরুণীর মন্তব্য নেই। ঠোঁটে হাসি ছিল।
ফর্সা দুটো পা লবণ ও শ্যাম্পুু মেশানো বৌলের উষ্ণ পানির ভেতর তানজিলা পাশাপাশি রাখতেই দুই পায়ের সংযোগে সুমি একটা চন্দ্রমল্লিকা গুঁজে দিলেন। সামনের আয়নায় তানজিলা স্মিত হাসি হেসে উঠল। সুগন্ধি ওড়া পারফিউম+সহনীয় আলো+বাজছিল জোরে নয়, শ্রবণে আরামদায়ক টুংটাং টুংটাং মিউজিক।
পেডিকিউর ও ম্যানিকিউর করাতে প্রয়োজন পড়ে কতরকম মিশ্রণ : লেবুর রস+অ্যালোভেরা+শসা+বাথসল্ট+ময়েশ্চারাইজার ক্রিম+গোলাপের পাপড়ি+উষ্ণ পানি।
কিউটিকল, প্যাডি স্টোনে পায়ের তলা ঘষা, নেইল কাটিং, ফাইলিং, স্ক্র্যাবিং, মাসাজপর্ব, হাত ও পায়ে মাস্ক লাগানো এবং নেইল বাফারিং ও ময়েশ্চারাইজার ইত্যাদি কর্মপর্ব তানজিলা খুব এনজয় করেন।
তেরো
বিউটি পারলার থেকে বের হওয়ার সময় তানজিলা দেখলেন, ভিড় আরো বেড়ে গেছে। ভিড়ের মধ্যে বিভিন্ন পেশার মানুষ। ক’জন বিদেশি নারী ও পুরুষও আছে। সবাই এসেছেন নখ কাটাতে। সবার বয়স আঠারোর ওপরে। কোনো শিশু নেই। এক আতঙ্কের কালচে ছায়া সবার চোখে-মুখে। মুখ চিন্তিত। কেউ কেউ কথা বলছেন। স্বর নিচু। চোখ তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। তানজিলার মনে হয়, কথার বিষয় একটাই, নখ কেন বড় হচ্ছে।
পারলারের দরজার সামনে তানজিলার সঙ্গে দেখা হলো পরিচিত তরুণী ডাক্তার ও উকিলের সঙ্গে। ‘ম্যাম কেমন আছেন?’ প্রশ্ন উকিলের। উত্তর দেওয়ার আগে তানজিলা দুজনের হাতের নখের দিকে তাকালেন। কুড়ি আঙুলে বড় বড় নখ। ‘জি। ভালো আছি।’ দুজনই প্রায় একসঙ্গে বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’
‘আজ খুব ভিড়। নখ কাটাতে তিনটি পারলারে গেছি। বসার জায়গাও ছিল না।’ তরুণী ডাক্তারের কথার কী উত্তর দেবেন তানজিলার মাথায় এলো না।
ভদ্রতার হাসি দিয়ে, ‘দেখা হবে’ বলে দ্রুত নিজের গাড়ির সামনে পৌঁছাতেই পরিচিত দুজন বিদেশির সঙ্গে দেখা হলো। ব্রিটিশ ও আমেরিকান। একজন নারী। একজন পুরুষ। দুজনই বিশ্বব্যাংকের কর্মী। কিছু কিছু বাংলা – কে ম ন আ ছে ন, বা লো আ ছে ন, আ মি বা লো আ ছি, আ মি মা ছ খা ই বা লো বা সি – বলতে পারেন। তানজিলার চোখ গেল দুজনের হাতের দিকে। বিশ্বব্যাংকের কর্মীদের নখও বেশ বড়।
গাড়িতে উঠে, ভালো লাগাটা অভ্যাসের মতো হয়ে গেছে, তানজিলা ব্লু টুথ হেডফোনে গান শোনেন। বাজছিল, ‘বেদনায় ভরে গিয়েছে পেয়ালা, নিয়ো হে নিয়ো/ হৃদয় বিদারি হয়ে গেল ঢালা।’ ‘লা’ শেষ না হতেই ঢুকে পড়ল বিজ্ঞাপন ‘এই বিশেষ চামড়ার জুতো কেবল আমরাই দিচ্ছি। হাতে পাবার পর দেখে দাম দেবেন।’ ‘ভরা সে পাত্র’তে বিজ্ঞাপনের নখ ঢুকে গেছে।
গাড়ির ভেতর বসে ন্যাচারাল রঙে পলিশ করা আঙুলের নখ কয়েকবার দেখার পর চোখ পড়ল তরুণ ড্রাইভারের হাতের ওপর। স্টিয়ারিংয়ে দুই হাত। তার নখগুলিও অনেক বড়। ‘আসার সময় চোখে পড়ল না কেন?’
বন্ধের দিন। গাড়ির চলার গতি বেশ ভালো। রাস্তায় জ্যাম নেই। রাজধানীর নাগরিক পথে গতির সঙ্গে দৌড়াচ্ছে চাকা।
স্টিয়ারিং ধরা দশ আঙুলের বড় বড় নখ সামনের সবকিছুকে খামচাতে খামচাতে যাচ্ছে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.