এখন ওরা থাকে চামেলীবাগের ভেতরে এঁদো ডোবার পাশের ছোট্ট টিনের ঘরটায়। আগে কিন্তু এখানে থাকতো না। এ-পরিবেশেও না। সবাই বলাবলি করে, সময় নাকি ওদেরকে এ-পরিবেশে টেনে এনেছে।
গলির মুখে যে একটা জামগাছ তারই তলায় দাঁড়িয়ে থাকে রোজ রোজ হাতের মুঠোয় একটুকরো ভাঙা ইট কিংবা পাথর নিয়ে। ছেঁড়া প্যান্ট। ময়লা গেঞ্জি। মাথার চুলগুলো ঘাড় পর্যন্ত নেমে গেছে। চোখের দৃষ্টি ওর সব সময় উদ্্ভ্রান্ত। অস্থির। মনে হয় কাউকে বুঝি খুঁজছে ও। আবার কখনো বা মনে হয় কিছু একটা করবে। মুহূর্তের মধ্যে একটা অঘটন ঘটাবে। পাগল অবশ্য কেউ ওকে বলে না। কেউ কেউ বলে, বড়লোকের ডি-রেইল্ড সন্তান।
– কিরে তমাল, এখনো তুই গাছতলাতেই দাঁড়িয়ে আছিস। যা, বাড়ি যা।
স্থানীয় গার্লস স্কুলের সরলা দিদিমণির চোখের দিকে না তাকিয়েই ও উত্তর দেয় : বাড়ি গিয়ে কী করবো দিদিমণি? আমার কি কিছু করার আছে?
দিদিমণি স্কুলের দিকে দ্রুতপায়ে হাঁটতে হাঁটতে বলেন : না থাক। তবু তুই বাড়ি যা।
দিদিমণির কথাগুলো কোনোদিন তমালের কান পর্যন্ত পৌঁছায়, কোনোদিন পৌঁছায় না।
বড় বড় গাছের নিচে ও সব সময় দাঁড়িয়ে থাকে। আম, জাম আর বটের ছায়ায় দাঁড়ালে তমালের মনে হয় ভালোবাসার কাছাকাছি এসে গেছে। জীবনের সঙ্গে বৃক্ষের একটি মিল খুঁজে পায় ওর এই কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সটা। তাই সারাদিন ও বড় বড় গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে বিল্টু, খোকন আর তানভীররা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ব্লু প্যান্ট আর সাদা শার্ট পরে কোথায় যেন যায়। কোথায় যায়? তমাল ভাবতে চেষ্টা করে। এভাবে ভাবতে ভাবতে যেই দেখে কোনো গাড়ির পেছনের কাচের ওপর লাল রঙের যোগ চিহ্ন আঁকা অমনি হাতের মুঠিতে ধরে রাখা ইটের টুকরোটি ছুড়ে মারে গাড়ির পেছনে। মেরেই আবার গাছের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে। কখনো আবার লুকোতে পারে না। ধরা পড়ে যায়। রাস্তায় ভিড় জমে।
কে মারল? কে মারল? শোরগোল ওঠে। স্থানীয় লোকেরা গাড়িচালককে বুজিয়ে-সুঝিয়ে বিদেয় করে। ভাই কিছু মনে করবেন না, ছেলেটি একটু …। না, না সায়েব, কী যে বলেন! ভদ্দরলোকের ছেলে নাকি? নিশ্চয়ই। জানেন আপনি? বাবা সরকারি চাকরি …। হয়েছে আর সাফাই গাইতে হবে না। ফের যদি কোনোদিন …।
এভাবে পাড়ার লোক ওকে প্রায়ই আত্মরক্ষার সুযোগ করে দেয়।
একদিন মনির বলল : আচ্ছা তমাল তুই বেছে বেছে ওই ডাক্তারদের গাড়িতে শুধু ঢিল ছুড়িস কেন বল তো?
তমাল কিছু বলতে পারে না। কেন যে এমন করে তা-ও সে বুঝতে পারে না নিজেই। আসলে মানুষের মাথার ঘিলুর ভেতর একটা স্মরণশক্তির ঘর আছে। সে-ঘরের চাবি তমাল মাঝে মাঝে হারিয়ে ফেলে। যখন চাবিটা হারিয়ে যায় তখনই ও এমন করে। নয়তো সে বেশ ভালোই। হাঁটে। চলে। কথা বলে। খায়-দায়। ঘুমোয়। বাবার কথা শোনে। আবার গানও গায় গলা ছেড়ে।
তমালের বাবা রফিকউদ্দীন ভূঁঞা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবরক্ষক। মালিবাগ বাস স্টপেজের উল্টোদিকে রাজারবাগের দিকে যেতে হাতের ডানে যে পাঁচতলা ফ্ল্যাটবাড়িটা তারই তিন তলায় একসময় থাকতো ওরা। ওরা মানে বীথি, তমাল আর ওদের বাবা। তমাল বড় হয়ে মাকে দেখেনি। মায়ের একটি ছবি দেয়ালে টানানো দেখেছে শৈশব থেকে। তমালের চেয়ে প্রায় ছ’বছরের বড় বীথিই বলতে গেলে তমালকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছে। তমালের বাবার এক দূরসম্পর্কের বড় বোন ওদের সংসারে থাকেন। থাকেন মানে ঠাঁই নিয়েছেন। নিঃসন্তান বিধবা শান্তি ফুফু। যাকে তমাল শিশুকাল থেকেই শানফু বলে ডাকে। সেই শান্তি ফুফুকে তমাল মাঝে-মাঝে জিজ্ঞেস করতো : আচ্ছা শানফু, আমার মা কোথায় তুমি সত্যি জানো না?
হিন্দু বিধবাদের মতো থানপরা, ছোট্ট মাথার ওপর কদমছাঁট চুল। শক্তপোক্ত মহিলা শান্তি ফুফু পান-দোক্তা খাওয়া খয়েরি দাঁত বের করে বলেন : জানি তো, ওই আকাশে।
: আকাশে মা কী করে?
: ওমা! তারাদের জলসায় বসে আছে।
: আমিও যাবো। তমালের বিস্ময়ভরা চোখ দুটি জ্বলজ্বলে হয়।
: বালাই শাট্। তোমার যে এখনো ম্যালা কাজ খোকা। বড় হলে আপনিই যাওয়া যাবে। এখন পড়তে বসোগে। নইলে বাবা রাগ করবেন বলে দিচ্ছি।
মেঘলা আকাশের মতো থমথমে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে তমাল আর কথা বাড়ায় না। সুশীল বালকের মতো পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে। পড়া শেষ হলে বীথি আপুর হাতে মাখানো কষানো মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে বাবার বিছানায় শুয়ে পড়ে। বীথি আপু ঘুমোয় শান্তি ফুফুর সঙ্গে পাশের ঘরে। বাবা আর তমাল বসার ঘরের এক কোণে পেতে রাখা নরোম ডিভানে। কতদিন বাবার গলা জড়িয়ে তমাল মা-মা করে ডেকে উঠেছে ঘুমের ঘোরে। বাবা তখন ওকে আরো জোরে বুকের মাঝে চেপে রেখেছেন।
ঘুম থেকে জেগে তমালের মনে হতো, মানুষের মা না
থাকলে সময়গুলো কখনো সুসময় হয় না। বীথি যখন কলেজে থাকে, বাবা অফিসে আর শান্তি ফুফু রান্নাঘরে, তমাল তখন আস্তে আস্তে গিয়ে মায়ের বাঁধানো ছবিটার কাছে দাঁড়িয়ে বলতো : মা, মাগো, সুসময়ের কি একটু সময় হয় না আমাদের সঙ্গে দেখা করার? তুমি একটু বলেটলে সুসময়কে আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিও মা। বাবা যে খুবই সুসময়ের জন্য চিন্তা করে …। তেরো পেরিয়ে যাওয়া তমাল পড়ার অবসরে খালি গাছতলায় গাছতলায় ঘুরে বেড়ায়। ফুলের সঙ্গে পাতার সঙ্গে কথা বলে ফিসফিস করে।
বীথি একদিন ওর কাণ্ড দেখে বলেছিল : যা না ওই ফাঁড়ির মাঠে, বল নিয়ে ছেলেদের সঙ্গে খেলগে যা।
: যাবো না তো তোর কী? তমাল বীথিকে বুড়ো আঙুল দেখায়।
বীথি গলা ছেড়ে বলে : বাবা। ও বাবা, দেখে যাও তোমার ছেলে দিনকে দিন রবীন্দ্রনাথের বলাই হয়ে যাচ্ছে। খালি নিচে নেমে ঝোপঝাড়ে ঘুরঘুর করে।
শান্তি ফুফু বারান্দায় এসে নিচে তমালের দিকে বিচিকলার মতো দাঁতগুলো বের করে হেসে হেসে কাংসবিনন্দিত সুরে বলেন : জগদীশ চন্দ্র বসু হবি নাকি রে?
এভাবেই তমালের দিনক্ষণ-মাস-বছর কেটে যায় বহতা নদীর মতো।
কলেজ পাশ করার পর বীথির বিয়ে হয়ে গেল। সাদা পাগড়ি, সাদা শেরওয়ানি আর সাদা নাগরা পরে একটি রাজপুত্র এসে বীথি আপুকে যেন চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। তমালের একবার মনে হয়েছিল লোকটাকে বেঁধে রাখবে নিমগাছের সঙ্গে। কিন্তু বাবার মুখের ভাব দেখে মনে হলো ব্যাপারটা বুঝি মেয়েদের জন্য অপরিহার্য।
বিদায়বেলায় বাবা কাঁদলেন। শান্তি ফুফু কাঁদল। অতিথিরা কাঁদল। সবাই কাঁদল। তমালেরও খুবই কান্না পেয়েছিল। কিন্তু বাবার মতো হাউমাউ করে কাঁদতে পারল না। জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার্থী তমাল যদি ওভাবে কাঁদে তো লোকে বলবে কী! ছেলেদের শব্দ করে কাঁদতে নেই। মনে-মনে কাঁদতে হয়। বাবা যদিও ছেলে। কিন্তু বাবা তো বাবাই।
বীথির বিয়ের পর থেকে প্রায় রাতেই তমালের জ্বর আসে। বমি বমি লাগে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। এখন তো ও আর বাবার সঙ্গে এক বিছানায় শোয় না। একই ঘরে অবশ্য শোয়। পাশাপাশি দুটো খাটে। জ্বরের ব্যাপারটা, শরীর খারাপ লাগার ব্যাপারটা তমাল বাবাকে বলে না। কারণ বীথির বিয়ের পর বাবা কেমন যেন একটু বেশি বুড়োটে, নাকি রোগাটে, হয়ে গেছেন। চলায়-ফেরায়, কথাবার্তায় আগের মতো জোর নেই। কেমন যেন একটু ঝুঁকে ঝুঁকে শুকনো ডালপালার মতো দু-হাত ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে বাবা হাঁটেন। মুখটা যেন শুকনো আতাফল। তমাল ভাবে, আমিও বাবার মতো বুড়ো হয়ে যাবো একদিন …।
– যাহ্্ কী সব আজেবাজে ভাবছি! নিজেকে নিজেই শাসন করল তমাল। তারপর কোলবালিশটা দু-পায়ের মধ্যে চেপে ধরে দেয়ালের দিকে মুখ করে ঘুমোতে চেষ্টা করে।
শহরের বড় বড় ডাক্তার দেখানো হচ্ছে, তবু তমালের জ্বর কমে না। বিদেশে পাঠানো দরকার। রফিকউদ্দীন ভূঁঞা দু-চোখে অন্ধকার দেখেন। বীথি খুলনা থেকে চিঠি লিখল : বাবা, তুমি গ্রামের জমিজমা যা কিছু আছে সব বিক্রি করে দাও। তবু তমালকে সুস্থ করে তোলো …।
তাই হলো। স্থাবর-অস্থাবর যা কিছু ছিল সব বিক্রি করে তমালকে নিয়ে বাবা বিদেশে পাড়ি জমালেন চিকিৎসার জন্য।
প্রায় মাস দেড়েক পর যখন ওরা ফিরে এলো রফিকউদ্দীন ভূঁঞার হাত-পা যেন আর চলে না।
তমালের অসুখটার নাম লিউকোমিয়া। শ্বেতকণিকাগুলো প্রবল বেগে তেড়ে আসছে। লালকণিকাগুলোকে সরিয়ে দিচ্ছে অজেয় শক্তিতে।
আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব যতটা পারল সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলো। পারিবারিকভাবে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করা হলো, তমালকে কিছুতেই বুঝতে দেওয়া যাবে না দুরারোগ্য এই ব্যাধির কথা। তারচেয়ে ওর মনের মতো করে ওকে চলতে দাও। যে কদিন বাঁচে। লেখাপড়ার মতো স্নায়বিক চাপের কাজকর্ম থেকে ওকে বিরত রাখতে হবে। ভালো ভালো কাপড়-চোপড়, খাবার-দাবার দিয়ে ওকে সারাক্ষণ চাঙা রাখা দরকার। যে কদিন বাঁচবে, আনন্দের মধ্যে বাঁচুক।
সেই বলাই-বলাই, ভাবুক-ভাবুক তমাল এখন বিদেশ ঘুরে এসে সাপের মতো খোলস বদলেছে। কেউ তেমন কিছু বলে না ওকে। যা ইচ্ছে করুক ও। ড্রেন পাইপ প্যান্ট, চক্রা-বক্রা ট্রাউজার, বাঘের মুখ আঁকা গেঞ্জি। ইচ্ছেমতো শিস বাজিয়ে ঘোরাফেরা, নাটক দেখা, সিনেমা দেখা। এমনকি কক্সবাজারে বন্ধুদের নিয়ে পর্যটনের মোটেলে হইচই করা এখন তমালের জন্য নৈমিত্তিক এবং বরাদ্দ ব্যাপারে দাঁড়িয়েছে। কষ্ট করে আর স্কুলে যেতে হয় না। কী হবে লেখাপড়া করে! সে তো আর বাঁচবে না। তমাল বুঝে ফেলেছে। সারাদিন কেবল তক্কে তক্কে থাকে। বাবা যেন ওর মুখ দেখে বুঝতে না পারে যে, তমাল তার অসুখের মর্মটা জেনেছে। এদিকে বাবাও এমন ভাব দেখান যে, তমালের কিছুই হয়নি। বাপ-ছেলের রৌদ্র-মেঘের লুকোচুরি খেলা চলে নীরবে-নিভৃতে। বাবাকে খুশি করার জন্য তমাল ইচ্ছেমতো ফুর্তি করে। তমালকে আনন্দে রাখার জন্য বাবা দু-হাতে খরচ করার প্রাণান্ত চেষ্টায় থাকেন। গভীর রাতে বালিশ ভেজান। জমিজমা, ব্যাংকে গচ্ছিত সামান্য যা ছিল আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের আশি ভাগ টাকা তিনি তুলে ফেলেছেন ছেলের জন্য। জীবনের আর কীই বা আছে তার? অবেলায় স্ত্রী গেছেন। সাঁঝবেলাতে ছেলেও যাবে …। এরপর তার বেঁচে থাকার তো কোনো অর্থ থাকে না। ভাবনার মৌমাছিরা পিলপিল করে বের হয়ে আসে। হুল ফুটায়। সে-হুলের মারাত্মক বিষে রফিকউদ্দীন ভূঁঞা দিন দিন জর্জরিত হচ্ছেন। তবু একমাত্র ছেলের মুখের হাসিটি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত দেখার সাধ জাগে মনে। ও যেন বুঝতে না পারে খোদা।
প্রায় এক বছর কেটে গেল। সেই হাবাগোবা স্বভাবের তমাল দিন দিন কেমন উচ্ছৃঙ্খল হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুবান্ধব দিন দিন বাড়ছে। টাকার প্রয়োজন বাড়ছে। ধুম-ধাড়াক্কা ক্যাসেট বাজিয়ে নৃত্যগীত করছে। এ-ছেলেই একদিন সুবোধ বালকের মতো স্কুলে যেত। জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার্থী ছিল। জগতের অনন্ত রহস্য সম্পর্কে কৌতূহল ছিল গভীর। আজ আর ওকে দেখলে সেসব কিছুই মনে হয় না।
রফিকউদ্দীন ভূঁঞার মনে রাতারাতি চিন্তার পাহাড় গড়ে ওঠে। সে-পাহাড়ের শক্ত মাটি দাঁত দিয়ে কেটে কেটে বীথি বলে : আর বিদেশে নয়। দেশেই ভালো ডাক্তার আছে বাবা। আর একবার ওকে দেশেরই বিশেষজ্ঞ দেখাও।
রফিকউদ্দীন ভূঁঞা ছেলের হাত ধরে নিয়ে গেলেন সোহরাওয়ার্দীতে পুরনো ফাইলপত্রসহ। সবরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেল তমালের কিছুই হয়নি। সামান্য বাতজ্বর। রক্তকণিকার প্রবাহ স্বাভাবিক।
এমন সুখকর সঞ্জীবনী সংবাদটা শোনামাত্র তমালের বাবা পাঁজরভাঙা এক আর্তচিৎকার দিয়ে সেই যে চুপ করলেন, আজও চুপ।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.