শিল্পী নাসরীন বেগম আপন পথের পথিক

সৃজনশিল্পীর জন্য সর্বদা আরাধ্য তাঁর স্বকীয় পথ। নিজের নির্মিত পথে স্বচ্ছন্দে চলাচল যেন শিল্পীর আঁকা-আঁকিকে ছন্দময় করে তোলে। শিল্পী নাসরীন বেগমের চিত্রকলায় এমন ছন্দ বিদ্যমান, যা তাঁর নিজস্ব অর্জনকেই তুলে ধরে। আর এজন্যই শিল্পীর প্রদর্শনীর শিরোনামে তাঁর নিঃশঙ্ক ও আত্মোপলব্ধিজাত বিশ্বাসী উচ্চারণ, ‘আমার আপন পথ’।

এই শিরোনামেই শিল্পী নাসরীন বেগমের ষষ্ঠ একক চিত্রপ্রদর্শনী সম্প্রতি হয়ে গেল ঢাকার বনেদি গ্যালারি বেঙ্গল শিল্পালয়ে। সুখের বিষয়, বেঙ্গল ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে তার পঞ্চম বর্ষ এবং এই পাঁচ বছরেই শিল্পী, দর্শক ও শিল্পসমঝদারদের আত্মীয় হয়ে উঠেছে। এই পাঁচ বছরে কিবরিয়া থেকে নাসরীন, মাঝখানে বাংলাদেশের অনেক গুণী গুরুশিল্পী, তরুণ শিল্পীদের প্রদর্শনী আয়োজনে, কর্মশালা-আয়োজনে বেঙ্গল সর্বদা সক্রিয় থেকেছে।

নাসরীন বেগমের শিল্পীজীবনের সূত্রপাত প্রাচ্যরীতির জলরং-চিত্রকলায়। পরিমিত বর্ণপ্রয়োগে, সাবলীল অঙ্কনে তাঁর ফিগারেটিভ কাজগুলো গীতময় পেলব-সৌন্দর্যে ভাস্বর হয়ে ওঠে। এমন কাজের স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন সত্তর দশকের শেষার্ধেই। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন ঢাকা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের বার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠরত অবস্থায় ‘শাপলা হাতে তরুণী’ শীর্ষক প্রাচ্যরীতির জলরং-ছবির জন্য তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। এর আগেও ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালে তাঁর কাজ প্রাচ্যকলায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। ১৯৮০ সালে নিরীক্ষাধর্মী প্রাচ্যকলায় তিনি শ্রেষ্ঠ পুরস্কারএবং ১৯৮৩ সালে গ্যালারি টোন-আয়োজিত জাতীয় অনুচিত্র-প্রদর্শনীতে সম্মানসূচক পুরস্কার অর্জন করেন।

একজন চারুশিল্পীর বেড়ে ওঠার পেছনে তাঁর স্বদেশ, মানুষ ও প্রকৃতির অবদান অপরিসীম। শিল্পী নাসরীন বেগমের মানসগঠনের পেছনে প্রকৃতি সবচেয়ে সক্রিয় – এ-অনুভব আমরা তাঁর চিত্রকলা-বিশ্লেষণ করেই পেয়ে যাই।   এ-প্রসঙ্গে তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘এ-পৃথিবীর যাবতীয় দৃশ্যমান বস্তু – এ-প্রকৃতি সুন্দর-সহজ-সরল মনে হলেও এর বহমান-প্রক্রিয়া সূক্ষ্ম, সংবেদনশীল, জটিল ও রহস্যময়। এখানেই মনে হয় বিশ্ব-প্রকৃতি-মানুষ একসূত্রে গাঁথা। এ-চেতনার উন্মেষের জন্যই মনে হয় আজও ছবি এঁকে চলেছি। ছবি আঁকার মধ্য দিয়েই নিজেকে চেনা-জানার প্রক্রিয়া চলে।’

বস্তুত নিজেকেই খুঁজে ফেরেন তিনি প্রকৃতির মধ্যে। প্রকৃতির আলো-আঁধারি, আলোর ক্রমান্বয় পরিবর্তনশীলতাকে তিনি তুলে আনেন তাঁর চিত্রপটে। তিনি আঁকেন সিংহদরজা, জানালা, কৃষ্ণচূড়া, জবাফুল, পাতার ঝরে পড়া, ক্যাকটাস, পথপ্রান্তর, এলায়িত ভঙ্গির সলাজ কিশোরী। বর্ণ ও আলোর প্রয়োগ তাঁর ছবির অন্যতম সম্পদ। পাতা বা ফুলের পাপড়ির ঝরে পড়ার চকিত মুহূর্তকে তিনি তুলে ধরে সময়ের প্রবহমানতাকে ধারণ করে প্রকৃতির প্রতিনিয়ত পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেছেন। এখানে আমরা চৈতি হাওয়ার দাপট দেখি, দেখি বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাস। আবার চিত্রপটের ঊর্ধ্বপাশ ও দুপাশে দরজাসদৃশ্য কল্পনাপ্রবণ স্তম্ভের ফাঁকে দেখি বাস্তব গ্রামীণ জনপদ     বা মানববসতি কিংবা নদীর প্রবহমানতা। এসব ছবিতে আছে অসংখ্য ভার্টিক্যাল ও হরাইজন্টাল লাইন, বৃত্তাকার বা অর্ধবৃত্তাকার রেখা। এর অনেকগুলোই বর্ণিল আস্তরণের ভেতর থেকে চকিতে বেরিয়ে আসায় দৃষ্টিসুখকর লাগে।

ক্যাকটাসের সঙ্গে নারীর অন্তর্দহনকে কুশলতার সঙ্গে সমন্বিত করে প্রকাশ করে   শিল্পী নাসরীন বেগম তাঁর সৃজনশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। নারীর নিঃসঙ্গতা, বিষাদময়তার এমন প্রতীকী উপস্থাপনার এমন সরল সার্থক প্রয়োগ সহসা চোখে পড়ে না।

মাহমুদ আল জামানের ভাষায়, ‘নাসরীন প্রকৃতির ভেতরমুখী সৌন্দর্য ও নারীর বেদনা-অঙ্কনে সৃজনকুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর ছবির বিষয় ও চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য আমাদের নিয়ে যায় বহুচেনা কিন্তু অল্প উপলব্ধ-ভুবনে এবং চিনিয়ে দেয় এক সংবেদনশীল অনুভূতিপ্রবণ শিল্পীমানুষকে। প্রকৃতির কাছে তিনি ফিরে গেছেন কৈশোরকালীন অনুভাবনা থেকে; স্মৃতির নানা অনুষঙ্গ আছে এই প্রকৃতিপাঠে। অধরা মাধুরী আর সৌন্দর্যের ধ্যানকল্পনা এখানে মিলেমিশে এক হয়েছে – অন্য রঙে, অন্য অনুভবে। প্রকৃতি, ফুল, লতাপাতা – যেন এক ভালোবাসারও আবেশ সৃষ্টি করেছে তাঁর চিত্রগুচ্ছে।’

চলমান প্রদর্শনীতে শিল্পী নতুন ধারার কিছু কাজ দিয়েছেন। শিরোনাম – সৃষ্টি-১ ও ২। স্ফুটনোন্মুখ ফুল ও ফুলের রূপকে তিনি প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করেছেন। সূর্য ও সূর্যমুখী ফুলকে সমন্বিত করে এঁকে শিল্পী আরো সহজ-সরল নির্মিতিতে মেতে উঠেছেন। মনে হয় অনেকদিন ধরে যে-বিষয়গুলো নিয়ে আঁকছিলেন, তাকে অতিক্রম করে অন্যভাবে আঁকার পথ খুঁজছেন শিল্পী। কয়েকটি মাত্র বিষয়ের মধ্যে ঘুরপাক না খেয়ে নিজের পথকে বিস্তৃত করার এই প্রয়াস সাধুবাদযোগ্য।

সমকালীন জনজীবনের সংকট শিল্পী নাসরীন বেগমকে যে আলোড়িত করে – তার আরো অকাট্য প্রমাণ হয়ে উঠেছে তাঁর কয়েকটি সাম্প্রতিক চিত্রকর্ম, ‘নগরে বন্যা’ শীর্ষক চিত্রকর্মগুলো। দালানকাঠামোর নিচে ঘোলাজল, একেবারে নিম্নভাগে যান্ত্রিক জলযান। তবে এসব ছাপিয়ে ‘নগর বন্যা’ কেমন যেন সুদৃশ্যময় হয়ে উঠেছে। এখানে নাগরিক কষ্টকে উপলব্ধি করা যায় না। পাহাড়ি নিসর্গের আবহে বাস্তবধর্মী দু-তিনটি জলরং-কাজ প্রদর্শনীতে বৈচিত্র্য এনেছে।     জলরঙের সঙ্গে চাইনিজ কালি মেশানোয় তাঁর চিত্রপটে কিছু গুঁড়ি গুঁড়ি টেক্সচার এসেছে, যা ছবিকে আরো আকর্ষণীয় করে। তেলরং ও অ্যাক্রিলিকেও শিল্পী কিছু কাজ করেছেন। বেঙ্গল শিল্পালয়ের বড়ো জায়গায় এ-প্রদর্শনীতে ছবির সাজানো যথাযথ মনে হয়নি। এ-ব্যাপারে শিল্পীর ও সংশ্লিষ্টদের সুপরিকল্পনার অভাব বোধ হয়েছে। এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও এ-প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে আমরা শিল্পী নাসরীন বেগমের শিল্পীজীবনের সমগ্র পথকে একত্রে অবলোকন করতে সক্ষম হলাম।