সনাতন বিশ্বাসের জন্য দুফোঁটা অশ্রু

মানুষ তো পাখি নয় – তবু সনাতন চলে গেলেন পাখির স্বভাবে। দূরে, অচিনপুরে। তরুণ শিল্পী সনাতনের এই অসময়ে চলে যাওয়া এক ধরনের দাহ তৈরি করে। বুকের ভেতর এক চাপা যন্ত্রণা তৈরি হয়। আত্মসমাহিত এক আধ্যাত্মিক জগৎ বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকত সনাতনকে। উদ্বুদ্ধ করত ভাবনায়, লোকজ দর্শনে, ছবি আঁকায়, গানে… মানুষ-ভজনায়।

খুব বেশি দ্রুত অন্য-এক আশ্চর্য জাদুর জগতের দিকে চলে গেলেন সনাতন, যেখান থেকে আর ফেরার উপায় নেই। ২৫ আগস্ট ১৯৬৬ সালে বাগেরহাটের মংলা নদীর পাড়ে সনাতনের জন্ম। মৃত্যু ২৪ ডিসে¤¦র ২০০৩। ৩৭ বছরের এই ক্ষুদ্র শিল্পীজীবনে সনাতন অনেক দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণার অগ্নিদাহ সয়েছেন নীরবে-নিভৃতে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে হয়েছেন ক্ষত-বিক্ষত। মংলা নদীর পাড়ের এই অভিমানী শিল্পী কী এক গাঢ়তর অভিমান বুকে নিয়ে চলে গেলেন স্পর্শের বাইরে! তবে কি এই ঢাকা শহর সনাতনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল? এই শহরের দমবন্ধ    করা রুদ্ধশ্বাস বিষবাষ্পে সনাতনের অভিমানী শিল্পীসত্তা    কি জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হয়ে গিয়েছিল? এই যান্ত্রিক শহরে, পুঁজিনির্ভর এই প্রেমহীন নগরে একজন স্পর্শকাতর,বাউলমনস্ক শিল্পী কি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যায়? হারিয়ে যায় অন্ধকারের কালো গুহায়? পাঠক, চলুন সনাতনের জন্যে আমরা দুফোটা অশ্রু ঝরাই।

নিুআয়ের এক কৃষক-পরিবারের সন্তান সনাতন বিশ্বাস, যাঁর মধ্যে মেধা ও শিল্প-সম্ভাবনার কোনো অভাব ছিল না, কিন্তু অভাব ছিল অর্থের। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্য চারুকলার ছাত্র হয়েও প্রয়োজনীয় রং এবং ক্যানভাস কিনতে পারেননি সনাতন। ছবি এঁকেছেন সস্তা কাগজে, সিগারেটের প্যাকেটে, ঝরাপাতার গানে…। প্রকৃতির নিবিড় পাঠ নিয়েছিলেন তিনি। তাই তো রূপের জগতে আত্মনিমগ্ন এক মরমী জীবনদর্শন বুকের গভীরে লালন করতেন। তান্ত্রিকতার প্রতি সহজাত ভালোবাসা, মরমী-সাধনা তাঁর ছবিতে এক অপার্থিব ইন্দ্রজালের মতো বারবার উঠে এসেছে।

সনাতন কি মনেপ্রাণে বাউল ছিলেন? সনাতনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু টোকন ঠাকুর জানান, ‘ভেতরে ভেতরে সনাতন বাউল ছিলেন। বাউল-মতবাদের সূক্ষ¥জ্ঞানে বিশ্বাসী ছিলেন। লালন ছিলেন সনাতনের আদর্শ। লালনের গান এবং দেহতত্ত্ব নিয়ে আমি, সনাতন, দীপঙ্কর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম।’ ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রাচ্যকলার মেধাবী ছাত্র সনাতন প্রখ্যাত শিল্পী এস. এম সুলতানকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। খুলনায় থাকাকালে শিল্পী সুলতান-পরিচালিত ‘জলরং’-ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেন, যার ফলে সুলতানের প্রত্যক্ষ প্রভাবে গড়ে উঠেছিল ওঁর শিল্পমানস। নিভৃত-শিল্পসাধনায় আকণ্ঠ ডুবে থাকতে পেরেছেন তিনি সাধকের মতো। মরমী-সাধক হয়ে উঠেছিলেন সনাতন অন্তরে, বাহিরে। সনাতনের অকালপ্রয়াণের পর পাঁচশর বেশি আঁকা ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। এম এফ এ পরীক্ষার ফলাফল পর্যন্ত এতো ছবি কখন এঁকেছিলেন তিনি? প্রাচ্যকলার এই প্রতিভাবান উদাসীন অভিমানী শিল্পীর শিল্পকর্ম সম্পর্কে সহপাঠী নাসিমুল    খবির বলেন, ‘সনাতনের ছবিতে মরমী কবি লালন ফকিরের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল। সনাতনের শেষের দিকের ছবিতে কৈলাশের গল্প,    আরশিনগর, বারামখানা, ধ্যানস্থ তান্ত্রিক-দর্শন-রসে সিক্ত ছিল।’ তবে কি সনাতন নির্মোহ এক সন্ন্যাসী ছিলেন? প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র মানুষের জন্যে তাঁর মনে ছিল অফুরন্ত ভালোবাসা। তাই তো তিনি নির্দ্বিধায় তাড়িখোরদের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঝরাপাতাদের মতো খয়েরি-হলুদ মেয়েদের সঙ্গে নিবিড় সখ্য গড়ে তুলতে পেরেছেন। পার্কের মেয়েদের নিয়ে অনেক ছবি এঁকেছেন সনাতন। চারুকলার সামনে বসা পথের শিশু, দোকানি – সবার কথা মন দিয়ে শুনতেন তিনি। অনেক দূর থেকে নানা পেশার লোকজন আসত তাঁর কাছে। মানুষকে ভালোবেসেই সনাতন পৌঁছাতে চেয়েছিলেন মহাপ্রকৃতির অসীম ভালোবাসার জগতে। রং ও জীবনের অন্তহীন নিবেদন ছিল তাঁর শিল্পকর্র্মে। আত্ম-অনুভব ও কল্পনার এক শক্তিশালী ভুবনের সঙ্গী ছিলেন সনাতন।

কালো রং ছিল তাঁর খুব পছন্দ। কালো রঙের গহীন অন্ধকার, আর লাল রঙের রক্তিম আবেগ হৃদয়ে ধারণ করে ছবি এঁকেছেন সনাতন। অন্ধকারকে ভালোবেসে অন্ধকারকে ক্রমাগত ভেঙে ফেলতে চেয়েছিলেন। রক্তরঙের বর্ণচ্ছটায়, আর কালো অন্ধকারের কুহকে এক অন্যজগতের মায়াবী অনুভবকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন ক্যানভাসে। জলরং এবং অ্যাক্রিলিক ছিল তাঁর প্রিয় মাধ্যম। এ-দুটি মাধ্যমে প্রচুর ছবি এঁকেছিলেন। পরাবাস্তব, রিয়ালিস্টিক, ফিগারেটিভ-নন ফিগারেটিভ, মূর্ত-বিমূর্ত সবধরনের কাজই করেছেন সনাতন। তবে তাঁর ফিগারেটিভ কাজেও এক পরাবাস্তব ফ্যান্টাসি উঠে আসে। নারীর প্রতিকৃতি, আত্ম-প্রতিকৃতি, অনুভূতি ও সম্পর্ক উঠে এসেছে তাঁর শিল্পকর্মে। ২৫ জুলাই থেকে ৩০ জুলাই ২০০৪ চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে সনাতনের শিল্পীসত্তার প্রতি সম্মান জানিয়ে হয়ে গেল একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রদর্শনী। ‘একবার পায় তারে’ শিরোনামের এই প্রদর্শনীটিতে সনাতন-স¥ারকগ্রন্থ একই নামে প্রকাশিত হয়। সনাতনের বন্ধুদের পক্ষে কবি টোকন ঠাকুর ও নাসিমুল খবির এর সম্পাদন করেন। কবি টোকান ঠাকুর বলেন, ‘সনাতনের সঙ্গে আমার দীর্ঘ তেরো বছরের অসংখ্য স¥ৃতি রয়েছে। সনাতন তাঁর কাজের স্বীকৃতি জীবিতকালে পাননি, কেননা এই ব্যবস্থায় তারুণ্যের প্রথাবিরোধী শিল্পসম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। জীবিতকালে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অর্থ ও নানান প্রতিকূলতায় সনাতনের কোনো একক প্রদর্শনী আমরা করতে পারিনি। মৃত্যুর পর সনাতনকে স¥রণ করে আমরা একটু কাঁদতে চাই। এই প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো সনাতনের শিল্পসত্তাকে, সাধনাকে, বাউল-ভাবনাকে দর্শকদের আত্মসমীক্ষার মুখোমুখি এনে দাঁড় করালেই আমরা শান্তি পাবো।’