মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ‘নর-নারী’ নারীমুক্তির সরলপাঠ

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪) আমাদের একজন প্রধান প্রবন্ধকার। প্রাক-পাকিস্তান আমল থেকে ১৯৫৪ সালের ৮ নভেম্বর তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি নানা বিষয়ে অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষাসহ খুব কম বিষয়ই আছে যা নিয়ে তিনি লেখালেখি করেননি। আর এ-সব বিষয়েই তিনি তাঁর গভীর জ্ঞান, তীব্র অনুসন্ধিৎসা, প্রখর যুক্তিবোধ ও মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এ-ব্যাপারে তাঁর সমকক্ষ লেখক তাঁর সমসময়ে বা পরবর্তীকালে আমাদের দেশে বেশি দেখা যায় না। ভাষার প্রাঞ্জলতা ও দীপ্তিতেও প্রবন্ধগুলো আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

অথচ, বিভাগপূর্বকালে প্রধানত বুলবুল পাবলিশিং হাউজের উদ্যোগে প্রকাশিত কয়েকটি জীবনী ও কিশোরপাঠ্য পুস্তকের কথা বাদ দিলে, জীবদ্দশায় তো নয়ই, এমনকি মৃত্যুর পরও তাঁর কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। যদিও বাংলা একাডেমী-প্রকাশিত মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী রচনাবলীতে (আবদুল মান্নান সৈয়দ-সম্পাদিত, প্রথম খণ্ড : ১৯৯০, দ্বিতীয় খণ্ড : ১৯৯২) সংকলিত হওয়ার সূত্রে বর্তমানে আমরা তাঁর প্রবন্ধগুলো পাঠের সুযোগ পাচ্ছি।

সে-অর্থে রক্ষণশীল বলা না গেলেও, সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতিতে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ছিলেন মোটের ওপর ধর্মীয় আদর্শের অনুসারী। পাকিস্তানকে তিনি একটি ইসলামি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন। আর সে-লক্ষ্যে নানা বিষয়ে করণীয় নির্দেশ করে তিনি কলম-চালনা করেছেন। যদিও এ-কথাও তিনি বারবার স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ইসলামি নীতিভিত্তিক রাষ্ট্র মানেই মোল্লাতন্ত্র বা ঃযবড়পৎধপু নয়। উর্দু বা আরবিকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব এবং বানান-সংস্কারের সরকারি পদক্ষেপ সমর্থন করেও তিনি বিতর্কিত হন। যদিও এরই পাশাপাশি তিনি আবার আরবি হরফে বাংলা লেখার এবং বাংলাভাষায় ব্যাপকভাবে আরবি-ফারসি শব্দ-আমদানির বিরোধিতা করেন। এমনকি পাকিস্তানোত্তর দিনগুলোতে রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নের প্রশ্নেও তিনি অত্যন্ত উদার ও যুক্তিবাদী অবস্থান গ্রহণ করেন। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কিন-বিরোধী, জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সঙ্গে মৈত্রী-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেও তিনি এ-সময়ে একাধিক প্রবন্ধ রচনা করেন।

তবে সবচেয়ে আশ্চর্য হতে হয় মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ‘নর-নারী’ নামক প্রবন্ধটি পড়ে। মাসিক দিলরুবা-র বৈশাখ ১৩৫৮ (৩য় বর্ষ ১ম) সংখ্যায় প্রকাশিত এ-প্রবন্ধে তিনি নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও নারী-স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে যেভাবে দেখেছেন ও বিচার করেছেন, এ-ব্যাপারে যে-মুক্তদৃষ্টি, সাহস ও যুক্তিবাদের পরিচয় দিয়েছেন, সে-সময়ের পটভূমিতে তো বটেই, আজকের বিচারেও তাকে এককথায় বলা যেতে পারে তুলনারহিত।

ইতিপূর্বে মাহে-নও-এর ভাদ্র ১৩৫৭ সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর ‘সাধনার পথে’ প্রবন্ধেও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী সদ্য-প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে ‘প্রকৃত গণতন্ত্রে’র স্বার্থে নারীপুরুষ-নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের সমান আত্মবিকাশের সুযোগের ওপর জোর দেন। নারী-পুরুষ অসাম্যের ব্যাপারে শাস্ত্রিক বচন ও প্রতিক্রিয়াশীলদের মতামত বর্জন করে ‘যুগোপযোগী প্রগতির পথ’ ধরার এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীকে সমানাধিকার প্রদানের কথাও বলেন তিনি ওই প্রবন্ধে [মো. ও. আ. র./২, ১৯৯২, পৃ. ৯২]। সামাজিক ও রাষ্ট্রিক স্বাধীনতার মূলভিত্তি হিসেবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার আবশ্যকতার কথা বলতে গিয়ে তিনি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ছাড়া পরিবারে ও সমাজে নারীর স্বাধীনতা যে-অর্থহীন হয়ে পড়ে, সে-কথা বলেন [ঐ, পৃ. ৯২]। তিনি লেখেন, ‘আমাদের মধ্যে যাঁরা উদারভাবে নারী-স্বাধীনতার কথা বলতে কার্পণ্য করেন না, তাঁদেরও অনেকে এটা তলিয়ে বুঝতে চান না যে, পরিবারে বা সমাজে অর্থনীতির দিক দিয়ে নারী স্বপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত তার স্বাধীনতার বিশেষ কোনো অর্থ হয় না’ [ঐ, পৃ. ৯৪]। এখানে আমাদের আলোচ্য অবশ্য তাঁর ‘নর-নারী’ প্রবন্ধটি।

সকল ধর্মেই যে নারীকে পুরুষের তুলনায় অধস্তন অবস্থানে রাখা হয়েছে – এমনকি ‘উন্নততম ধর্মীয় ব্যবস্থাতে’ও যে ‘নারীকে পুরুষের সমান ভাবা হতে দেখা যায় না’ – ‘নর-নারী’ প্রবন্ধের গোড়ায় মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় সে-কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পার্থিব পরিকল্পনার মতো স্বর্গীয় পরিকল্পনাতেও নারীই পুরুষের ভোগের সামগ্রী’ [ঐ, পৃ. ১০৫]। শাস্ত্রীয় পরিকল্পনায় স্ত্রীজাতিকে পুরুষের কৃষিক্ষেত্রস্বরূপ মনে করা, বিবাহ বা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতা বা গুরুত্ব না থাকা, রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে নারীর ভোট বা মতামত গ্রহণীয় না হওয়া ইত্যাদির উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘সংসারে নারী নরের সহধর্মিণী; নর নারীর সহধর্মী নয়।’ এবং ‘পুরুষের সঙ্গ নারীর কাম্য হতে পারে, এ-কথাটাকে বিশেষ আমল দেয়া হয়নি’ [ঐ, পৃ. ১০৬]।

এ-ব্যাপারে প্রচলিত যুক্তিবাদী মনোভঙ্গির সীমাবদ্ধতাকেও লেখক তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তিবাদী ব্যবস্থায়’ নারী-পুরুষের এ-সম্পর্ক ভিন্নরূপ ধারণ করাই যদিও সংগত ও স্বাভাবিক (লেখকের ভাষায়, ‘সম্ভব’), তবু ‘এ-কথা স্বীকার করতে হবে যে, এটা বৈজ্ঞানিক যুগ হলেও মানুষের সামাজিক মন, যে-যুক্তিবাদের ওপর বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত, তার থেকে এখনো বহু দূরে পড়ে রয়েছে। …মানুষ ভেবে-চিন্তে ও বুঝে-সুজে চলার ক্ষমতা নিয়ে পয়দা হলেও সেই ক্ষমতা কার্যত ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করার ইচ্ছা, সাহস ও অভ্যাস সে এখনো পায়নি, এবং কবে পাবে কিংবা কখনো পাবে কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এই অনতিক্রান্ত ক্ষুণ্নতার জন্য সে বিজ্ঞানকে বাইরে বাইরে স্বীকার করলেও অন্তরে বরণ করতে পারেনি, তাকে পুরাতন জীবন-মনের নব-রূপায়ণে প্রয়োগ করতে সমর্থ হয়নি’ [ঐ, পৃ. ১০৭]। ফলে, ‘বাইরেকার বিজ্ঞানের টানে কোনো সংস্কার-চেষ্টায় এগুতে চাইলেই গোঁড়া ধার্মিকতার কাছে সে জবাবদিহি করতে বাধ্য হচ্ছে’ [ঐ, পৃ. ১০৭]।

লেখকের মতে : ‘নর-নারীর যুক্তিবাদসম্মত সম্পর্ক পরিবার ও সমাজে এখনো দেখা যায়নি। মানে, তার বাস্তব রূপ জগতে কোথাও নেই।’ কেননা, ‘প্রথমত, পরিবার ও সমাজ বলতে এখন যা বোঝায়, নর [-] নারীর যুক্তিবাদসম্মত সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা হলে ঠিক তা থাকে না। দ্বিতীয়ত, যুক্তিবাদী চিন্তায় বিবাহ-সম্পর্কের ওপর কোনোরকম পবিত্রতা আরোপ করা হয় না। বস্তুত যুক্তিবাদের অভিধানে ‘পবিত্র’ শব্দের ব্যবহারই অনাবশ্যক ভাবা হতে পারে। বিবাহ-অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য দেখলে প্রধানত এ-ই বোঝা যায় যে, অন্তত পত্নীর পক্ষে বিবাহিত পতি ভিন্ন অন্য কোনো পুরুষকে যৌনসঙ্গীরূপে স্বীকার করা চলবে না। এর তাৎপর্য অস্পষ্ট নয়; এবং সেটা এই যে, একের বীজ থেকে উৎপন্ন মানুষ (নর বা নারী) অন্যের সম্পত্তি বা অর্থবিত্তের উত্তরাধিকারী হওয়া অন্যায়। এটা পুঁজিবাদের বিচার’ [ঐ. পৃ. ১০৭]। এবং ‘বিবাহ-প্রথার ফলে বৈবাহিক পরিবেষ্টনীর বাইরে যৌন-সংসর্গের লোভ, সুযোগ বা সম্ভাবনা দূর হয়েছে, ইতিহাস এরূপসাক্ষ্য দেয় না’ [ঐ, পৃ. ১০৮]। কিংবা, ‘বিবাহে এক-পতিত্ব প্রথা রতিজ রোগের পূর্ণ প্রতিষেধকরূপে যুক্তিবাদ কল্পনা করে না’ [ঐ, পৃ. ১০৮]। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী লিখেছেন, ‘যৌন ঐকিকতা বা একচেটিয়াত্ব রক্ষার জন্যে এই যে আগ্রহ-ব্যাকুল মনোভাব নর-নারী উভয়ের মধ্যে দেখা যায়, এর কতটুকু ধার্মিক সমাজবুদ্ধির পরিণাম, আর কতখানিই বা মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির দান তা যুক্তিবাদের একটা বড়ো পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের বিষয়’ [ঐ, পৃ. ১০৮]।

যুক্তিবাদী সামাজিক পরিকল্পনায় – নর-নারীর সম্পর্কের দিকে ‘নির্ভয়ে’ তাকাতে গিয়ে – লেখক সেখানে বিবাহিত জীবনের সম্ভাবনাকে একেবারে নাকচ করে না দিয়েও বলেছেন : ‘কিন্তু সে বিবাহ মাত্র নর ও নারী – উভয়পক্ষের স্বেচ্ছাদত্ত সম্মতি-কাল পর্যন্ত স্থায়ী হবে। উভয়ে উভয়ের দৈহিক, মানসিক ও যৌন-শান্তি-বিধানে অক্ষম বা অপ্রচুর অনুভূত হওয়ামাত্র তারা বা তাদের যে-কোনো এক পক্ষ বিবাহ-সম্পর্ক ছেদন করতে পারবে। নর বা নারী কেউ কারুর অধীন হবে না; (সাময়িক বা স্থায়ী) বিবাহিত জীবনে তারা পরিবার গঠন করে থাকবে বটে, কিন্তু এ-পরিবার স্বাধীন দুটি বন্ধু-বান্ধবীর মিলনমাত্র’ [ঐ, পৃ. ১০৮]। এমনকি, ল্যাবরেটরিতে সন্তানধারণের সম্ভাবনা নিয়েও লেখক আলোচনা করেছেন। লিখেছেন: ‘নারী-কুক্ষির বাইরে (যেমন সরকারি ল্যাবরেটরিতে) সন্তানধারণের ব্যবস্থা সম্ভব হলে এবং তা সত্ত্বেও নর-নারীর যৌন-ক্ষুধা পরিতৃপ্ত হতে পারলে, স্ত্রী পুরুষের বীজ গ্রহণ না করতেও পারে। …সন্তান-লালনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে সমাজ, মাতাপিতা নয়’ [ঐ, পৃ. ১০৯]। তিনি বলেছেন, অবিবাহিতা মাতার ক্ষেত্রে সন্তানের মাতৃপরিচয়ই যথেষ্ট হবে [ঐ, পৃ. ১০৯]। আর ‘যদি ল্যাবরেটরির সন্তান হয়, এইটুকু পরিচয়েরও কোনো প্রয়োজন নেই। কন্যা বা পুত্র একটা মানুষ, এই পরিচয়ের বলেই সে সমাজে সম্মানিত হবে’ [ঐ, পৃ. ১০৯]।

নারীকে ‘অবলা’ বলাটাকে লেখক মনে করেছেন, একরকম ভাবের ঘরে চুরির সামিল [ঐ, পৃ. ১০৯]। দৈহিক ও মানসিক শক্তির দিক থেকে নারী ও পুরুষের মধ্যে যে তফাত করা হয় তার উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘কিন্তু এই তথ্য যে নারীর পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনেতিক পরাধীনতার পরিণাম নয়, তা কে বলবে? বহু দৃষ্টান্তে পুরুষের তুলনায় নারীর দৈহিক, মানসিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষ দেখা গেছে। …প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা এবং আত্মোপলব্ধি ও আত্মবিকাশের সুযোগ ভোগ করতে পেলে তার পুরুষ-জাতির সমকক্ষ হয়ে দাঁড়াতে না পারার কোনো বিশ্বাসযোগ্য কারণ নেই’ [ঐ, পৃ. ১০৯]।

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর উল্লিখিত ‘যুক্তিবাদী’ পরিকল্পনায় ‘নর-নারীর সম্পর্কের ভেতর ধর্ষণ-কর্ষণের চিন্তা দাঁড়াতে পারে না, কেননা উভয়ে উভয়কে মনোনীত করার ব্যাপারটা সেখানে অবাধ’ [ঐ, পৃ. ১০৯]। আবার ‘স্ত্রী গৃহিণী – এ-কথাও যুক্তিবাদে অচল’। কারণ সেখানে ‘নারী ও পুরুষের কর্মক্ষেত্র আলাদা নয়। …গৃহস্থালির কাজকর্ম নারীও করতে পারে, নরও করতে পারে। অবসর ও অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। রান্না-বান্না, কাপড়-কাচা প্রভৃতি ব্যাপার নারীর জন্য নির্দিষ্ট নয়। পরিবার-সংগঠনের ভেতর পুরুষও এগুলো করতে পারে’ [ঐ, পৃ. ১১০]।

লেখকের মতে, ‘নারীর দেহ পুরুষের কাছে লোভনীয় সামগ্রী, একথা যতোটা সত্যি, পুরুষের অবয়ব নারীর কাছে লোভনীয় বস্তু এটাও তার চাইতে কম সত্যি নয়’ [ঐ, পৃ. ১১০]।

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী তাঁর এই ‘যুক্তিবাদী কল্পনাটি’কে তখনও পর্যন্ত একটি ‘অবাস্তব কল্পনামাত্র’ বলে উল্লেখ করে লিখেছেন : ‘এতে ত্রুটি থাকতে পারে। এই কল্পনাকে নিখুঁত রূপ দেওয়ার ভার যদি কোনো মুক্তমনা, স্বাধীনচিন্তাশীল ব্যক্তি নিতে চান, বুদ্ধি-চর্চাকারীদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য হবে’ [ঐ, পৃ. ১১১]।

প্রবন্ধে আদর্শবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে নারী-স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে বিচার করতে গিয়ে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বলেছেন, ‘গোঁড়া ধার্মিকতা ও নিছক যুক্তিবাদে মিকচার চলে না’ [ঐ, পৃ. ১১১]। মেয়েদের পুরুষের সঙ্গে থিয়েটার-সিনেমায় যাওয়া, সভা-সমিতিতে যোগ দেওয়া ও ‘পরী সেজে রাস্তায়-পার্কে হাওয়া খেয়ে বেড়ানো’কে যাঁরা নারী-স্বাধীনতা মনে করেন, এবং তা ভেবে তৃপ্তি পান; তাঁদের চিন্তার সীমাবদ্ধতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেছেন, ‘এরই নাম নারী-স্বাধীনতা নয়। অথচ এরই জন্যে ধার্মিক সমাজে অসোয়াস্তি দেখা দিয়েছে’ [ঐ, পৃ. ১১১]। তিনি লিখেছেন, ‘নারী-স্বাধীনতায় এগুলো থাকবে না, তা বলছি নে। কিন্তু তার মূল ভিত্তির প্রতিষ্ঠা ছাড়া শুধু এগুলো দিয়ে বিশেষ কোনো লাভ হবে না। সমাজে যদি মেয়েদের পুরুষের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রাণী ভাবা হয়, যদি জীবনের অর্থনৈতিক দিকে পুরুষের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা থাকে, যদি কতকগুলো মেয়ে দাসী-চাকরানিরূপে পরিবারে এসে দেখা দেয়, অবরোধের বাইরে এসেও তারা স্বাধীন হবে না। বস্তুত অবরোধ-ত্যাগকেই নারী-স্বাধীনতা বলা যায় না।বর্তমান সমাজব্যবস্থায় নরের সঙ্গে নারীর সম্পর্ক যে-চিন্তাধারায় সৃষ্টি, তাকে নতুনের পথে প্রবাহিত করতে না পারলে নারীর নারীত্ব স্বাধীনতার প্রতি পুরুষের একটা করুণার প্রকাশমাত্র হয়ে থাকবে। এই করুণায় আন্তরিকতা থাকতে পারে, কিন্তু তার থেকে নারীর প্রতি প্রকৃত সম্মানবোধ বা সাম্যবোধ জেগে ওঠে না’ [ঐ, পৃ. ১১১]।

এদেশে ইউরোপিয়ানা বা পাশ্চাত্যমুখিতাকে যাঁরা প্রগতির সমার্থক বলে মনে করেন, একরকম আদর্শবাদ হিসেবে তাকে গ্রহণ করতে চান, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি দ্বিমত প্রকাশ করে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বলেছেন যে, ‘বস্তুত তা কোনো আদর্শবাদ নয়’ [ঐ, পৃ. ১১১]। তাঁর মতে, তা ‘ধার্মিকতা ও যুক্তিবাদের একটা গোঁজামিল’ [ঐ, পৃ. ১১১]। প্রবন্ধে লেখকের মন্তব্য : ‘ইউরোপীয় জীবন এখনো বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ থেকে দূরেই রয়েছে।’ এবং ‘গোঁড়া ধার্মিকতা পুঁজিবাদ ও পুরুষকেন্দ্রিক সমাজের জন্মদাতা ও পৃষ্ঠপোষক। এ-দুটো ইউরোপ থেকে এখনো বিদায় নেয়নি’ [ঐ, পৃ. ১১১]। প্রসঙ্গত ইউরোপের তথাকথিত নারী-স্বাধীনতার স্বরূপ তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, ‘পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত স্ববিরোধের অনিবার্য পরিণাম যুদ্ধ। যুদ্ধের পর যুদ্ধ এবং অবশেষে দুদুটো মহাযুদ্ধের ফলে ইউরোপে গোঁড়া ধার্মিকতা অসহায় হয়ে পড়েছে। পুরুষকেন্দ্রিক সমাজ যুদ্ধে নামলে স্বভাবতই অগণিত পুরুষ নিহত হয় এবং নারীর বহুল সংখ্যাধিক্য ঘটে। এই পরিস্থিতিতে নর-নারীর সম্পর্ক সম্বন্ধে ধার্মিক-পরিকল্পনা আপনা থেকেই ভেঙে পড়তে চায়। গোঁড়া ধার্মিকতা এটা ঠেকাতে পারেনি এবং পারছে না বলেই এক ধরনের নারী-স্বাধীনতা ইউরোপে দেখা দিয়েছে। সেটা যেমন গোঁড়া ধার্মিকতা নয়, তেমনি বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের সৃষ্টিও নয়। সেটা আসলে একটা গোঁজামিল। এই জন্যে তাকে উচ্ছৃঙ্খলতা নামে আখ্যায়িত করার সুযোগ হচ্ছে’ [ঐ, পৃ. ১১১-২]।

‘এদেশের লোকদের অনেকে’র উল্লিখিত গোঁজামিলকেই ‘একটা আদর্শবাদ মনে করে তার অসার্থক অনুকরণে ধার্মিকতা ও যুক্তিবাদের খিচুড়ি তৈরি করা’ এবং তাকেই ‘নরের মুকাবিলায় নারীর স্বাধীনতা এসে পড়ছে’ বলে মনে করার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি লিখেছেন, ‘তাই তাঁদের গতিকে অধোগতি নাম দেওয়ার সাহস ফণা বিস্তার করছে। এ-সাহসকে দুঃসাহস প্রমাণ করা যেত, যদি শুধুমাত্র মজাদার খিচুড়ি না হয়ে আদর্শবাদের তৈরি একটা সাচ্চা জিনিস হতো’ [ঐ, পৃ. ১১২]।

সমাজ থেকে পুরুষ-প্রাধান্য হ্রাস, নারীর অর্থনৈতিক পরনির্ভরতার অবসান এবং পুঁজিবাদ ও তার ব্যবস্থিত পরিবার ও সমাজের পরিবর্তন ছাড়া যে প্রকৃত নারীমুক্তি আসতে পারে না, উপসংহারে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে সে-কথা বলেছেন [ঐ, পৃ. ১১২]। এ-ব্যাপারে ‘ইউরোপিয়ানিজম’কে তাঁর মনে হয়েছে ‘একটা ভাঙন-অবস্থামাত্র, কোনো আদর্শবাদ নয়’ [ঐ, পৃ. ১১২]।

প্রবন্ধশেষে লেখকের মন্তব্য : ‘এটা দুঃখের বিষয় যে, কী গোঁড়া ধার্মিক, কী নারী-স্বাধীনতাকামী, কেউই এভাবে ব্যাপারটার দিকে নজর দিচ্ছেন না। তাই চলছে নির্বোধের মতো কাদা-ছোড়াছুড়ি’ এবং নর-নারীর সম্পর্ক সম্বন্ধে চিন্তা এই ধরনের নিম্নস্তরের বাদ-প্রতিবাদে নিশ্চয়ই এগোয় না’ [ঐ, পৃ. ১১২]।

১৯৫১ সালে লিখিত মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর এই প্রবন্ধটির মনোযোগী পাঠ থেকে আমরা দেখতে পাব, যে-যুক্তিবাদী সমাজের কল্পনা তিনি করেছেন, যেখানে নারী প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনতা ও সমানাধিকার ভোগের অধিকারী হবে, প্রথম যুগের সমাজতন্ত্রী নীতি-দর্শনেই কেবল তার সমর্থন মেলে। আর আজকের দিনের প্রাগ্রসর নারীবাদী চিন্তার সঙ্গেই আমরা এর মিল খুঁজতে পারি।

বিভাগপূর্ব আমলে সওগাত পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৫ (১৯২৮) সংখ্যায় ‘স্ত্রীশিক্ষা’-শিরোনামে লেখা এক প্রবন্ধে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী নারী-পুরুষের জন্য একই ধরনের শিক্ষার বিরোধিতা করেন। তাতে নারী-পুরুষের মধ্যে সার্বিক সাম্যাবস্থার ধারণার বিরোধিতা করে তিনি লেখেন, ‘পুরুষ ও স্ত্রীর মধ্যে সম্পূর্ণ তুল্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া কখনও সম্ভব নহে। দার্শনিক ও রাষ্ট্রনীতিবিদগণের উর্বর মস্তিষ্ক ভিন্ন কোথাও মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণ সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, হইবেও না। সেইরূপ, স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যেও সম্পূর্ণ সমান অধিকার স্থাপিত হইতে পারে না। যদি স্থাপিত হয়, তাহা হইলে গৃহ-জীবন (ভধসরষু-ষরভব) ধ্বংস হইবে। …স্ত্রীকে স্বামীর ন্যায় সমান অধিকার দান করিলে, ‘সংসার’ একদিনও চলিতে পারে না। ইচ্ছা হইলে বর্তমান ব্যবস্থা উল্টাইয়া পুরুষকে স্ত্রীর অধীনতাপাশে আবদ্ধ করা সম্ভব, কিন্তু উভয়কে তুল্য কর্তৃত্বদান সম্পূর্ণ অসম্ভব’ [ঐ, পৃ. ৩১৮]। ইত্যাদি। তেইশ বছর পর একই লেখক তাঁর ‘নর-নারী’ প্রবন্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য নিয়ে উপস্থিত হন। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় মানচিত্রের পরিবর্তন ছাড়া, সামাজিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নারীর অবস্থান বা তার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে, তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং সদ্য-প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে তথাকথিত ইসলামি সমাজ-প্রতিষ্ঠার নামে নারীকে গণ্ডিবদ্ধ করার আয়োজনই যেন সর্বত্র দৃশ্যমান ছিল। এমনকি তুলনামূলকভাবে কম-রক্ষণশীল বলে পরিচিত যে-পত্রিকাটিতে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ‘নর-নারী’ প্রবন্ধটি ছাপা হয়, তাতেই কয়েক সংখ্যা আগে পর্যন্ত পর্দাপ্রথার সমর্থনে সেকালের একজন সুপরিচিত প্রবন্ধকারের ‘বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পর্দা’ শীর্ষক ধারাবাহিক রচনা প্রকাশিত হচ্ছিল [সূত্র : ইসরাইল খান (সম্পা.), পূর্ব বাঙলার সাময়িকপত্র, ১৯৯৯, পৃ. ৪৭৮-৮৭]। রচনাটি পরে গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়। আমাদের বাল্যবয়সে স্কুল লাইব্রেরিতেও বইটি দেখেছি বলে মনে পড়ে। পর্দার ব্যাপারে এই শেষোক্ত লেখকের বক্তব্য সেদিন কিছুটা বাদ-প্রতিবাদেরও জন্ম দেয়, যার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি একই পত্রিকার পাতায় পরবর্তীকালে কয়েকটি সমালোচনামূলক রচনার প্রকাশ থেকে [ঐ, পৃ. ৪৮৮ ও ৪৮৯]। ড. এম আবদুল কাদেরের উক্ত প্রবন্ধের যাঁরা প্রতিবাদ করেন, দৌলতন নেছা খাতুনসহ তাঁদের অন্তত দুজন ছিলেন মহিলা। বাদ-প্রতিবাদের এই ব্যাপারটি শেষ পর্যন্ত উকিল নোটিশ পর্যন্ত গড়ায় [ঐ, পৃ. ৫০২]। অথচ মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর প্রবন্ধটি সেদিন পাঠক-মহলে কোনো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পেরেছিল কিনা জানা যায় না।গঙ্গাজলে গঙ্গা পূজার মতো, এই মনীষী-লেখকের পঞ্চাশতম মৃত্যুবার্ষিকীর প্রাক্কালে, তাঁর একটি মূল্যবান অথচ এ-যাবৎ প্রায়-উপেক্ষিত রচনার উদ্ধৃতি দিয়েই আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম।