সঙ্গীতের বিষয়ে আমার প্রায় কারো সঙ্গেই মেলে না। আমি গীত-রচক নই, মেলে না ওদের সঙ্গে। নই সুরকার, তাদের মতো হতে পারি না, যতই না চাই তাদের কীর্তির পেছনের মানুষটিকে ধরতে। এবং নই রবীন্দ্রনাথ-আদি পঞ্চকবি, যাঁরা বাংলা গানের একটি ধ্রুপদী যুগ, ধ্রুপদী একটি শৈলীই নির্মাণ করেছেন নিজেদের লেখা গানে নিজেরা সুর করে, তাঁদেরও কোনো অক্ষম পদাঙ্ক-অনুসারী। তাদের আলোকসামান্য কীর্তি যুগল-সৃষ্টির কারণে নয়। গেয় কবিতা ও তার সুরছন্দের বাহন ময়ূরপঙ্খিটির পৃথক্ করে করে সৌন্দর্য-শিল্পোত্তীর্ণতার ঘটনা তো আছেই। মূল যে-জ্যোতি বিকীর্ণ হয় তাঁদের রচনা থেকে, তার অপূর্ব চিন্ময়তা প্রসন্নতা এসে কথা সুরছন্দের সঙ্গে মিলে যে-তৃতীয় মাত্রার যৌগ গড়ে, তার থেকে। আমি অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি।
শুনি ভারতবর্ষীয় সঙ্গীতধারার পরিশীলন পরাকাষ্ঠা খেয়াল-ধ্রুপদকে। গাওয়ার চেষ্টা করি না, শেখারই চেষ্টা করিনি কোনোকালে। আমি ছা-পোষা ভদ্র বঙ্গসন্তান, আমার পক্ষে সম্ভব নয় আমার সমাজ-ভাবনা, সংস্কৃতি-ভাবনা, পড়াশোনা, কথঞ্চিৎ অ্যাকটিভিজম, এ-সব ছেড়ে পরিণত বয়সে অনিশ্চিত ফলের সাধনার জীবনে প্রবেশ করা। ভালোবাসি বাংলার গ্রামের গান। লালন-রাধারমণ কি কেবলি গ্রামের গান? তারাও ধ্রুপদী সঙ্গীত। প্রাণ এমন করে কাড়ে, মনে হয় একতারা সম্বল করে পথে বেরিয়ে পড়ি। মধ্যবিত্ত বুদ্ধি বলে, সব্বোনাশ, ও তোমার পথ নয়, বেঘোরে প্রাণটাই যাবে, গানকে পাবে না।
তাহলে পারতামই তো সঙ্গীত-অচেতন সবার মতো ইহজাগতিক প্রতিষ্ঠার কাঙাল হতে, শিল্প সঙ্গীত সংস্কৃতির মতো আকার-অবয়বহীন অকাজকে মনপ্রাণ সঁপে না দিয়ে। অবশ্য সঙ্গীতে চিত্রে চলচ্চিত্রে নাটকে এখন প্রচুর পয়সা, সর্বত্র সোনা। এবং এসবেও ক্যারিয়র গড়া যাচ্ছে। এইমতো ক্যারিয়র গড়বার আশা নিয়ে এদেশের কত ছেলেমেয়ে ভারতের শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রভারতী, দিল্লির শ্রীরাম কলাকেন্দ্র, বরোদার সয়াজীরাও সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমাচ্ছে। মন ঘাবড়ায় যখন কুমারপ্রসাদকে বলতে শুনি, এই যে ভারতবর্ষ জুড়ে সঙ্গীতের অ্যাকাডেমিকীকরণ হচ্ছে, তাতে কি এত বছরে পাঁচটিও গুণী ছেলেমেয়ে বেরিয়েছে? এই জায়গাগুলো থেকে পি এইচ ডি বেরিয়েছে শত শত। কিন্তু শিল্পী? নৈব নৈব চ।
সঙ্গীত সবার জন্যে অকাজ নয়, আজকাল। কিন্তু আমি যে লোভের লাভের সঙ্গীতকে সঙ্গীত বলে জানি না। রাসেল ইউসলেস নোলেজের জয় গেয়েছেন, আমি জয় গাই ইউসলেস সঙ্গীতের। কিন্তু পারলাম না সঙ্গীত-নিরপেক্ষ সফলতা-সচেতন মানুষও হতে। সেই স্কুলে পড়তে কানে বিঁধেছিল, প্রাণে বেজেছিল আবদুল করিম খাঁ সাহেবের সর্পর্দা খেয়াল ‘গোপাল মোরি’, ঝিঁঝিট ঠুমরি ‘পিয়া বিন’, ভৈরবীর ‘যমুনাকা তীর’ – তা ছয় দশক ধরে আমাকে নিশি-ডাকা করে তাড়িয়ে ফিরতে লাগল। হলো না আমার পাশ দেবার বিদ্যা। পিতৃহীন
ছয়-মানুষ সংসারকে জ্যেষ্ঠপুত্র, নিতান্তই সাধারণ ছিলাম বাউন্ডুলে প্রকৃতির আমি, ভবসমুদ্র পার করাবার চেষ্টায় সম্ভব হয়নি কারো পায়ের কাছে বসে সা-তে সুর লাগানো। এই ভেবে মানাতে চেষ্টা করি মনকে যে, সে-রকম বসতে পারলেই কি হতো? কী হতো? এবং আমি বেশ বুঝি যে, সদ্গুরু পেলেও আমার সৎশিষ্য হওয়া হতো না। তেমন গুণী পাইনি, তা তো নয়। আসলেই সুরের ব্যাপারটি আমার মধ্যে নেই। বালককালের কথা মনে পড়ে, কোনোদিন ভুলেও গুনগুন পর্যন্ত করিনি।
মোহাম্মদ হোসেন খসরু বাঙালি মুসলমানের মধ্যে সবচেয়ে বড় সঙ্গীতগুণী ছিলেন। আমি যখন আটচল্লিশে তাঁকে পাই, কণ্ঠ তাঁর সুরমাধুর্য হারিয়েছে। তিনি সঙ্গীত-পণ্ডিতও ছিলেন। বড় কথা, কুমিল্লা-দারোগাবাড়ির এই গৌরব-পুরুষ সঙ্গীত-ভাবুক ছিলেন। কণ্ঠের অসহযোগে আমাদের প্রজন্ম তাঁর গান পায়নি – ওই বয়সে আমার বরং নবযুবক (তখন) মোহাম্মদ হোসেন খাঁর ‘রাগপ্রধান’ গান ভালো লাগত। সেই সূত্রে মোহাম্মদ হোসেন, যিনি পেশাদার তবলিয়া ছিলেন, তাঁকে ভ্রাতুষ্পুত্রী মিতা হকের সঙ্গীত-শিক্ষক নিয়োগ করি। এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আলী হোসেনকে আমার সহোদরা নার্গিসের গুরু করে ঘরে তুলে আনি। আলী হোসেনও রেডিয়োতে তবলা বাজাতেন। আমার সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণিত হয়। আলী হোসেনের মতো ভালো শিক্ষক আমি আর দেখিনি। তবে তাঁর গানগুলোও আমি আর শুনিনি কোথাও। ইমনের ‘দিন দিন মোরা ভাগ যাওয়ে’, জৌনপুরীর ‘এরি ফিরত সজনকো কুঞ্জন’ যেমন।
পিতৃবন্ধু খসরু সাহেবের পিতৃদত্ত ডাকনাম ছিল অবশ্য খোরশেদ। তাঁর কলকাতা-প্রবাসের জীবনে (যেখানে তিনি মেহেদী হুসেন ও ফিদা হুসেনের কাছে তালিম নেন) সঙ্গীততাত্ত্বিক আমীরুল ইসলামের সংস্পর্শে আসেন। ইসলাম সাহেব পণ্ডিত লোক ছিলেন, কিছুটা পাগল-প্রেমীও ছিলেন সঙ্গীতের। তা না হলে কেউ নামশেষে শর্কী উপাধি জোড়ে (জৌনপুরের সুলতান হুসেন শর্কীর ইয়াদগারিতে!) তাঁর আরেক কীর্তি, মোহাম্মদ হোসেন খোরশেদকে খসরু বানানো। তিনি তো আমীর আছেনই। দুইয়ে মিলে বেশ নাম হলো আমীর খসরু (কে না জানে হযরত আমীর খসরু ছিলেন ত্রয়োদশ শতকে আলাউদ্দিন খিলজির সভাসদ। পরবর্তী আরো পাঁচ রাজসভায়ও ছিলেন এই তুর্কি প্রতিভাধর, ফারসি কবি এবং ঠেট হিন্দিতে গীতরচয়িতা, সেতার যন্ত্রের উদ্ভাবক বলেও যিনি অনুমিত কিংবা তবলারও। অনেক রাগ বেঁধেছেন তিনি, যা এখনো পর্যন্ত আদৃত। যুগান্তকারী পুরুষ।) ওই জোড়নামে তাঁরা নানা গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করেন, কিছু তার বেরোয় উত্তুঙ্গ সম্মানের গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়-সম্পাদিত সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রকাশিকায়।
খসরু সাহেব ওই আটচল্লিশ সাল নাগাদ পিতৃদেব-সন্নিধানে প্রেমসে আসতেন, ফারসি গজল নিয়ে আলাপ করতে। উভয়ে কিছু অতিমাত্রার সুরারসিক ছিলেন বলেও হতে পারে তাঁদের বন্ধুতা। বাবাকে না পেলে আমাকে নিয়ে পড়তেন খসরু সাহেব। আমি স্কুল না-পেরোনো এক মস্ত শ্রোতা তো – আমাকে শোনাতেন তিনি ধ্রুপদের তোম নোম আলাপ। ওই বয়সে তাঁর কাছে পাই মেঘ রাগের স্বাদ। বললেন তিনি, খেয়াল-রীতিতে এ-রাগ তেমন ফোটে না। ধ্রুপদী গমক চাই এর রূপায়ণে। শেখালেন তিনি আমাকে তবলার অ্যালফাবেট, হাতে পাড় দেখিয়ে দেখিয়ে।
বললাম তাঁকে, আমার কণ্ঠে সুর নেই। বোধেই নেই। আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। তিনি ভাবলেন। তাঁর ওপর-পাটির সামনের জোড়া দাঁত একটু প্রকট ছিল, সে-কারণে তাঁর হাসিটি বিশিষ্ট, বিশেষ রকম ডিজার্মিং ছিল। কিন্তু তিনি হাসলেন না, দন্তপ্রকাশ এক নিঃশব্দ ভঙ্গি করলেন, ইংরেজিতে বোধহয় একে গ্রিমেস বলে। তারপরে স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, যারা মিউজিক্যাল অর্থাৎ ন্যাচারাল তাদের সঙ্গে যারা তা নয়, পার্থক্য শুধুই দুই বছরের আন্তরিক এবং অনেস্ট মেহনতের।
আমি সেই কথাকে ধ্রুব জেনে সেই যে ঝুলে পড়লাম, এখন তারপরের ছাপান্ন বছরের লাগাতার মেহনতেও যে ওই দুবছর আমার পার হলো না। হয়তো মেহনত আমার যথোচিত আন্তরিক এবং অনেস্ট ছিল না। গায়ক তো হতে চাইনি, গানের ক্ষমতাটায়, গানের বুঝটাতে আমার লোভ ছিল। সেই লোভ আমাকে ছাড়ল না। নেক্সট বেস্ট বলে সাধনা শুরু করলাম ভালো শ্রোতা হবার। কিন্তু কী করে? তখনকার দিনে গান শুনবার একমাত্র নির্ভর রেডিয়ো। তাতে কান পেতে থাকতাম দিনরাত। জোরে তো ছাড়া যাবে না, তাই আড়ি-পাতা মতো কান লাগিয়ে শুনতাম, মন লাগিয়ে শুনতাম। করিম খাঁ সাহেব যার মন হরেছেন, তার পক্ষে ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের গানেরও রসাস্বাদন কঠিন শ্রবণ-সাধনায়ই সম্ভব হতে পারে। আমার পিতৃদেব ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের গানের ভক্ত ছিলেন। তাঁর গান হলে রেডিয়ো জোরে ছাড়তাম। এবং দুজনে একসঙ্গে শুনতাম, থেকে থেকেই একে অপরের মুখে চাওয়া-চাওয়ি করতাম। আমি জানি না আমাদের কালের চাষি-পশ্চাৎপটের আর কোনো পিতাপুত্রের এমন সঙ্গীত-ইয়ারি সম্পর্ক ছিল কিনা।
সেই বাবা অকালে মারা গেলেন বিয়াল্লিশ বছর বয়সে, আমাকে ষোলো, মাকে তিরিশ বছরেরটি রেখে। তাঁর প্রিয় ফৈয়াজের সঙ্গে গেলেন তিনি, সেই একই বছরে, উনিশ পঞ্চাশে। বাবা গুনগুন করতেন সারাক্ষণ, ‘তাজা বতাজা নৌ বনৌ’ – কিন্তু তাতে বোঝা যায় না তাঁর সঙ্গীত-রসিকতার পরিমাপ। ঢাকা কেরানীগঞ্জের কৃষক-পরিবার থেকে আসা (দাদা আমার অবশ্য ‘হিন্দুস্থান’ পাশ মস্ত আলীম ছিলেন) এই মানুষটির জন্মগত একটি ভাষা-প্রতিভা ছিল। বাংলা অনার্সে স্বর্ণপদক, ইংরেজিতে মাস্টার্স, তিনি হিন্দি, উর্দু, ফারসি, আরবিতে অনর্গল বক্তৃতা করতেন। সহোদর রেজাউল হক (মিতার বাবা) সেদিন জানালেন, রাজনীতির কারণে দূরে সরে যাওয়া খাজা নাজিমউদ্দিন (পূর্ববঙ্গের প্রাইম মিনিস্টার তখন) আফগান এক আমন্ত্রণ পেয়ে তা বাবাকে পাঠিয়ে দেন, এই বলে যে, ‘মাজহার তো ভালো পশতু জানে, ওকে পাঠাও কাবুল’। আঁচ পেয়েছিলাম তিনি সংস্কৃতেরও স্বাদ জানতেন। তাঁর খেয়াল-ঠুমরির প্রতি পক্ষপাতের কারণ, পরে বুঝতে পারি, তাঁর হিন্দি-উর্দু-ফারসির সঙ্গে অন্তরঙ্গতা। খেয়াল-ঠুমরি যে ভাষা-আধার, তা তাঁর কাছে মাতৃভাষার মতো ছিল। তাই বাড়ির পাশের প্রতিবেশী (চুরিহাট্টা, ’৩৭-’৪০) আলাউদ্দিন হালওয়াই ভোজপুরীর সঙ্গে তাঁর সখ্য হতে অসুবিধা হয় না। সর্ববিষয়ে আমরা পাঁচ সন্তান তাঁর নিরতিশয় কুসন্তান। দুজন ম্যাট্রিক ডিঙিয়েছি বটে, তার বেশি নয়। বাকি তিন তাও ডিঙায়নি। তবু রেজাউল (বাচ্চু ভাই) দুহাতে লেখে দুই ভাষায় – ইংরেজি, বাংলা। আমিও তার পিছে। বোন নার্গিস ইরাদাতুল হক সম্ভবত ইংরেজিতে আমাদের দুজনের চাইতে অগ্রসর। ইংরেজি সাহিত্যের সুরসিক নিষ্ঠাবান পাঠিকা তিনি। কিছু ফরাসি, কিছু রুশ তাঁর আয়ত্তে আছে। আর বেলগ্রেডে প্রবাসকালে লাজুক স্বামীর যত দাপ্তরিক মেলামেশা লেখাপড়ার কাজ তিনিই সারতেন সার্বো-ক্রোয়াশিয়ানে। পঞ্চরত্নের শেষটি জ্যানেট। মধ্য-আমেরিকা তাঁর প্রিয় দেশ। নিকারাগুয়া, গুয়াতেমালা। ছেলেরা আমেরিকায়। দেশে ফিরবে না হয়তো, জ্যানেটই যায় খবরদারি করতে, নাতনি সামলাতে। হোক ইংরেজি, হোক স্প্যানিশ – ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যারিয়ার সে সহজেই যায় ডিঙিয়ে। গুষ্টির কেচ্ছায় যখন ধরেছে, বলে নিই, ছোট কাকা মাহফুজুল হক গান গাইতেন সুরেলা। কোরান পাঠ তাঁর মধুর ছিল।
বাবা মারা যাবার আগে বিলক্ষণ জানতেন আমার সঙ্গীত-প্রীতির কথা। ও যে প্রীতিতে শেষ হবে না, যাবে আরো দূর, সে-সন্দেহ হতেই তিনি মাকে সাবধান করেছিলেন, তোমার ছেলের রোখশোখ ভালো না। সময়মতো না শোধরালে সারা জীবন আঙুল নাচিয়ে তানা নানা করবে, আর কিসসু হবে না ওর। ফলেছে সে-কথা, তানা নানা করেছি ত্রিশ বছর, লাজুক বলে আঙুল তত নাচাইনি। কিন্তু গান আমার হলো না। এরিক নিউটন বলেছেন, সমালোচক হতে হলে অন্তত ফেইল্ড্ পেইন্টার হতে হয়। আমি ফেইল্ড্ মিউজিশ্যন, সমালোচক পর্যন্ত হতে পারলাম না। খসরু সাহেব মেহনত আর অনেস্টির কথা বলেছিলেন। ওই শেষের ব্যাপারটিতে আমি আমার নিজের কাছে পাশ। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সেই উত্তর-কৈশোরে – আর যা-ই করি সঙ্গীতের বিষয়ে মিথ্যাভাবনা করব না, মিথ্যা উচ্চারণ করব না। সম্ভবত রাখতে পেরেছি সে-প্রতিজ্ঞা।
বাবা নেই, মার শাসনে চলি। কিংবা, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, শাসনের পাথর ডিঙিয়ে চলি। তিনি বাধা দেন না মাসিক সঙ্গীতাসর বসাতে। ঘরে খাবার নেই, তবু মেহমানদারি মাসান্তে। আগ্রহ করেই তিনি খুরশীদ খানের কাছে সেতার নিয়ে বসতে শুরু করেন। আমি নিজে প্রাণের বন্ধু ঝিলুকে (নূরুল কাদির) নিয়ে ধীরালি মিয়ার কাছে বাঁশি ধরি, পরে আলাউদ্দীন খাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মীরকাশেম খাঁর কাছে তালিম নিই সেতারে। কিন্তু বেকার যুবকের জীবনের অনিশ্চয়তায় সে বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি।
তবে এই সুবাদে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে অনেকের সঙ্গে। রামপুরের দুই ভাই সলামৎ হুসেন, সখাওয়াৎ হুসেন বাসায় আসতেন, আসরে গাইতেন-বাজাতেন। আসতেন মুহম্মদ হুসেন হেকিম-পুত্র মুনীর হুসেন। ক্রমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিবপুরের পুরো আলাউদ্দিন গুষ্টির সঙ্গে বন্ধুতা হয়। খাদেম থেকে নিয়ে খুরশীদ পর্যন্ত। ওদিকে গুলমুহম্মদ-পুত্র ইউসুফ কোরেশীও আসতেন এবং পরিচয় হয় ক্রমে নূর মুহম্মদ ও ইয়াসিনের সঙ্গেও। উস্তাদ গুলমুহম্মদ খাঁ সাহেবেরও সন্নিধানে যাই কিছুদিন। দেশভাগের পরে এদেশ থেকে যত হিন্দু গুণী ওদিকে চলে যান। যেতে দেরি করেন গিরিন চক্রবর্তী, প্রিয়লাল চৌধুরী, রবীন্দ্রসঙ্গীতগায়ক বিমলচন্দ্র রায়। গিয়ে ফিরে আসেন অঞ্জলি মুখোপাধ্যায় (পরে রায়)। তার বদলে যেন পেয়ে যাই আব্বাসউদ্দীন, আবদুল হালিম চৌধুরীসহ জিন্দাবাহার লেইনের এক বাড়িভর্তি গায়ক। সোহরাব হোসেন, আবদুল আলীম, আবদুল লতিফ, শমশের আলী, বেদারউদ্দিন আহমদকে। বংশীবাদক ধীরালি সহজেই গুরুগিরি ছেড়ে বন্ধু হয়ে যান, তাঁর দুই কাকা যাদবালি সাদেকালি আমাদের (নূরুল কাদির ও আমার) কাকু হয়ে যান। ধীরালি-সহোদর মনসুর আলী, যাদবালি-তনয়া যমুনা হয় আমাদের ভাইবোন (পরে এদের
বিয়ে হয়)। ধীরালি ভাবি আমাদের বড় আপন জানতেন, সেই মর্যাদা রাখতে পারিনি।
এই তো আমার আর ঝিলুর জগৎ। বেজায় চেহারা ছিল ঝিলুর, গুণও ছিল তাঁর। হয়তো চেহারার চাইতে বেশি। কিন্তু চেহারা-সম্পদটি তাঁর কাজে দিয়েছে বরাবর। এবং সে তাঁর দর্শনকে গুরুত্ব না দিলেও অবহেলা করেনি। ওই সাক্ষাৎ ইংরেজ (ইউরোপীয় বললে সঠিক হয়, কিন্তু তখনো গৌরবর্ণ বলতে ইংরেজই বুঝি) চেহারা নিয়ে সে যখন পায়ে বহুমূল্য শাল ঢাকা দিয়ে সেতার নিয়ে মঞ্চে বসত – এবং যন্ত্র থেকে ঝমঝম মধুর ধ্বনি নির্গত হতো, তখন অনুষ্ঠানের সব শ্রোতাদর্শক মোহিত হয়ে পড়ত। এক শুধু আমিই মনে মনে ফিরে ফিরে প্রতিজ্ঞা করতাম – এইটি আমি কক্খনো করব না। ওর মতো কন্দর্পকান্তি নই বলে নয়। ওর সেতার থেকে যা উত্থিত হতো, তাকে সঙ্গীত বলা যায় না। মধুর ধ্বনির জঙ্গল বিশেষ ছিল তা। মঞ্চে ওঠার আগে ওর সম্বল ছিল ইমনের একটি গৎ, হাত সাধার কিছু পালটা। খাম্বাজ তখনো ধরেনি। অকুতোভয় ছিল সে, মুক্তিযুদ্ধে রেখে গেছে তার পরিচয়। কিন্তু সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তার এই ভয়হীনতা আমার কাছে অনুসরণীয় আদর্শ মনে হতো না। এখন বুঝি আমার সঙ্গীতে পৌঁছাবার সাধনায় একটু শাসন একটু অসঙ্কোচ ভয়হীনতা বুঝি প্রয়োজনই ছিল।
আমাদের গ্রাম অর্থাৎ যেখানে আমার বাবা-মা আমার এবং দুই সহোদরের জন্ম, তার নাম ভাওয়াল মনোহরিয়া। নামটি অবশ্যই বিশিষ্ট। এমন গ্রাম-নাম তো আমি আর পেলাম না জীবনে এবং একষট্টির আদমশুমারি ঘেঁটে। সত্যেন সেন বাংলার (পূর্ব পাকিস্তানের) প্লেস-নেইমের ওপর কী কাজ করবেন বলে সেই ঢাউস জিনিস বাসায় এনেছিলেন। আমাদের সেই গ্রামের মাইলতিনেক পুবের গ্রাম ব্রাহ্মণশূর। সেখানে এলাকার কিংবদন্তিতুল্য গায়ক ভ্রাতৃদ্বয় বাস করেন। মালেক দেওয়ান, খালেক দেওয়ান। সাধক আলফু দেওয়ানের পুত্র। খালেকের সঙ্গে আমার পরিচয় হতেই তাঁকে গ্রামের বাড়িতে আহ্বান করি। আমার ঠাকুর্দা একবার গ্রামে মহামারি ঠেকাবার ব্যবস্থা করেছিলেন, দোয়াদরূদ দিয়ে গ্রামকে ব্যাধি-বালাইয়ের অতীত-সীমানা করে বাঁধিয়ে গিয়েছিলেন। সেই থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আমাদের গ্রামে মহামারি হয়নি। আমি হলপ করে বলব না, সে আমার দাদা মাওলানা মোহাম্মদ আলীর সূত্রেই ঘটেছিল। তিনি এক শর্ত দিয়েছিলেন গ্রামবাসীকে, যতদিন এ-গ্রামে গাওনা-বাজনা না প্রবেশ করবে, ততদিনই তাঁর রোগমুক্তি-ব্যবস্থা কাজ করবে। আমি পাষণ্ড পৌত্র, তাঁর সেই নিষেধ লঙ্ঘন করি খালেককে দিয়ে গান করিয়ে। আমাদের গ্রাম-উপান্তে বাস করতেন দূর-আত্মীয় মফিজদ্দিন। গান করতেন সুদর্শন সেই ছিপছিপে মানুষটি। কোনো গায়কের ব্যাটা নয়, গানে পেয়েছিল তাঁকে। সংসারে থেকেও বিরাগী ছিলেন ওই সদাহাস্যময় সদাশিব মানুষটি। আমাকেও গানে পেয়েছিল, কিন্তু আমি আর গানকে পেলাম না। আমার ভেতরে পর্যাপ্ত বৈরাগ্য ছিল না বলে হয়তো। মফিজদ্দির বাড়ি যাই, তাঁকে বাড়িতে ডাকি। আগেই বলেছি, আমার ছোট কাকা বেশ গাইতেন, কিন্তু দোতারার সঙ্গতে নয়। তাহলে জাত যেত। ডাক ছেড়ে গেয়ে উঠতেন, ‘ওরুমচাঁদ কয় লালচান্দেরে দেশ বৈদেশে ঘুরিস নারে, সাড়ে তিন হাত জমিদারির জমাখরচ কর, যাবি যদি মন গুরুর কাছে, উড়ু জাহাজ চড় ্।’ কেমন যেন হয়ে যেতাম। ওইটি আমার মধ্যে ছিল, ওই কেমন যেন হয়ে যাওয়া। খালেক-মফিজদ্দিদের সূত্রে গ্রামের ওই সাধন-ভজনের গানের সঙ্গে আমার নিবিড় পরিচয়।
শীতে খালেকদের বাড়িতে গানের মোচ্ছব হতো। যেতাম ঢাকা থেকে পায়ে হেঁটে। একবার শামীম, অর্থাৎ সুফিয়া কামালের বড় ছেলে শাহেদ কামাল, আমার সঙ্গে ছিল। পৌঁছোলাম গভীর রাতে। একটি অন্ধ মেয়ে হাতে একটি চিমটা নিয়ে গান করছিল। বলছিল সে, ‘আমি অনাথ জন্মান্ধ, ও গুরু, আমার বাপ তুমি, মা তুমি, তুমিই আমার চোখ হে গুরু, আমাকে ত্যাগ করো না।’ কী ছিল তার গানে, আমি আকুল হয়ে কাঁদলাম অসঙ্কোচে। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, তার সেই গুরু আমাদের মালেক দেওয়ান। মালেক, মানে জ্যেষ্ঠটিও গাইলেন শেষরাতে, বেহালা বাজিয়ে (খালেক বাজায় দোতারা)। গুরু হতে পারার কিছু উপাদান ছিল তাঁর সেই গানে, কিন্তু শুনতে পারলাম তা খটখটে চোখ নিয়েই। বহুদিন মনে রেখেছিলাম সেই মেয়েটির নাম, এখন ভুলেছি। কিন্তু তার গান এখনো আমার বুকে বাজে।
এখনকার মমতাজ, গিনেস বুকে যার নাম উঠেছে, সেই একই ধারার গায়িকা, অতি কাছের সিঙ্গাইরে। কিন্তু বাজাইরা গান, বাজাইরা গানই, কাঁদায় না। শুধু বাজার মাত করে। আরেক মোমতাজ ছিলেন ওই সিঙ্গাইরেই। মোমতাজ আলী খাঁ। কৈশোরেই শুনেছিলাম তাঁর গান, গ্রামোফোন ডিস্কে – আমার দয়ালচান্দের বাজারে, এক-মন যে যাইতে সে পারে। আরো কিছু গান। কেমন যে প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর দেশভাগের আগের কলকাতাতেই। জিন্দাবাহার লেইনে তিনিও উঠেছিলেন। পরিচয়ের বিংশ বৎসরে আমি ধন্য হয়েছিলাম তাঁকে ছায়ানটে লোকসঙ্গীতের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিতে পেরে। কিন্নরকণ্ঠ ছিল তাঁর। কিন্তু আগাগোড়া ট্রেমেলোতে ভর্তি। পরিপূর্ণ সুর এবং উপচে পড়া মাধুর্য দিয়ে সে-ঘাটতি তিনি পূরণ করতেন। খালেক দেওয়ানকে যেদিন আমাদের উর্দুরোডের বাড়িতে ডাকি, গান নয় বন্ধুতার জন্যে, সেদিন মোমতাজ ভাইকেও ডেকেছিলাম গান করতে। গান শুনে খালেকরা খুবই নিরাশ হলো। হবারই কথা। র’ এলিমেন্টালিটি আমাদের গ্রামের গানের প্রাণস্বরূপা। তাছাড়া, খেয়ালে কীর্তনে যেমন – গানটা গায়কেরই, মাত্র দুচার ছত্র তার কোনো গুণীর থেকে আসা। শুনি যে-গান সেটা গায়ক-গায়িকা আমাদের উপস্থিতিতে নির্মাণ করতে থাকেন – এবং একটি পারফরম্যান্স তার আরেকটির সঙ্গে মিলবার নয়। মোমতাজ ভাই করেন প্যাকেজ্ড্ গান, খালেকের যেন পুরো এক অক্টেভ নিচে। মোমতাজ ভাই তাঁর গানের ধরন তো গ্রাম থেকে পাননি স্পষ্টতই। আমার কেবলি মনে হয় আমাদের মুক্তবিহঙ্গের গানকে খাঁচায় পুরে ভদ্রলোকের মনোরঞ্জনার্থে বাজারজাত করেছিল গ্রামোফোন কোম্পানি। সেখানে কাজ করতেন ফটিকচন্দ্র শীল। সকলে আব্বাসউদ্দীন জসীমউদ্দীনের কথা বলে। যাঁকে ছাড়া তাঁদের চলত না, সেই ফটিক শীলের কথা কেউ বলে না। তিনি কি কেবলই দোতারা বাদক ছিলেন? ধলেশ্বরী পার-সিঙ্গাইর থেকে পদ্মাপারের ফরিদপুর – একই সঙ্গীত এলাকা। এবং এই এলাকা পূর্ববঙ্গীয় গানের রাজধানী। সম্রাট এ-রাজ্যের ফটিকচন্দ্র। তাঁকে জানবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। নাতি দুলালকে ভালোবাসতাম তার গুণে। অকালে সে চলে গেল। থাকল আশুতোষ। তাদের অনেকের যত্নে, সহযোগিতায় গান গেয়ে চলেছে তুলনাহীনা কাননবালা সরকার। বড় ভালোবাসি তাকে। আমাদের কালের এই কমলা ঝরিয়াকে।কিন্তু আমি খালেক-মোমতাজ আলী থেকে একলাফে কেন কাননবালাতে চলে এলাম! মাঝে থাকল যে কত কিছুই। থাকল নাগরিক বাংলা গানের সঙ্গে আমার পরিচয়ের কথা। গ্রাম ও শহরকে মেলালেন গানে যিনি, সেই শচীন কত্তার কথা। হিমাংশু দত্তের কথা জানি, কিন্তু গান জানি তাঁর মানসকন্যা শৈলর। রেণুকা দাশগুপ্তা, এই শৈল আর কানন দেবীর মতো গান আর কেউ গাইবে না।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.