শেক্সপিয়র-সমালোচনা সাম্প্রতিকধারাএবংআমাদেরপরিপ্রেক্ষিত

কাজী মোস্তাইন বিল্লাহ

শেক্সপিয়র-বিষয়ে এই প্রবন্ধটির লক্ষ্য দুটি : এক. শেক্সপিয়রের সাম্প্রতিক সমালোচনার প্রতি আলোকপাত করা; দুই. তারই আলোকে আমাদের শেক্সপিয়র-চর্চার সম্ভাবনা সম্পর্কে মন্তব্য করা। সাহিত্য-রুচিতে ডানপন্থি আমেরিকান সাহিত্য-সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম (Harold Bloom) সম্প্রতি শেক্সপিয়র-বিষয়ে Shakespeare : The Invention of the Human নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। ব্লুম-প্রভাবের আশংকা (anxiety of influence) শীর্ষক সাহিত্যতত্ত্বের প্রবর্তক। মাত্র কয়েক বছর আগে পশ্চিমা-সাহিত্যের সূচক (western literary canon) নির্মাণে তিনি যে-বিচারবোধ প্রয়োগ করেন তাতে রক্ষণশীলতার ছাপ স্পষ্ট। শেক্সপিয়র গ্রন্থেও তিনি সাহিত্যতত্ত্বের ‘চলতি হাওয়ার  বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সাহিত্যতত্ত্বের জন্য তাঁর তেমন কোনো সহানুভূতি নেই। শেক্সপিয়রকে তিনি মূল্যায়ন করতে চান ভিন্ন নিরিখে।

সাহিত্যের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, ইত্যাদি প্রশ্ন সাহিত্য-সমালোচনার মূল লক্ষ্য হলেও ‘সাহিত্যতত্ত্ব’ শীর্ষক একটি স্বতন্ত্র শাখা সৃজনশীল রচনার পাশাপাশি বিকাশলাভ করেছে। সাধারণ দোষ-গুণের হিসাবের পর ক্রমান্বয়ে সাহিত্য-আলোচনা স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি তত্ত্বের (লিটারেরি থিয়োরি) রূপ নিয়েছে। সাহিত্য-বিচারে এর গুরুত্ব এখন এত বেশি যে বর্তমান সময়কে তত্ত্বের কাল বললে অত্যুক্তি করা হবে না। সাহিত্যতত্ত্ব বেশ জটিল, অনেক সময়ে দুরূহ জগৎ-সভ্যতা-মনন ইত্যাদি যেভাবে বিবর্তিত হচ্ছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সাহিত্য-বিচারের লেন্স পালটাতে হচ্ছে; নতুন করে দেখতে, শিখতে হচ্ছে। নতুন নতুন টার্মস, বৈপ্লবিক সব ধারণা দ্রুত এবং এত ব্যাপকভাবে চলে এসেছে যে, অনেক সময় এর সঙ্গে তাল মেলানো যায় না। তত্ত্বের এই অগ্রগতিকে সবাই যে স্বাগত জানিয়েছেন, তেমনও নয়। সাহিত্যতত্ত্ব-বিষয়ে ডান ও বামপন্থিদের স্বাভাবিক মতপার্থক্যের কথা বাদ দিলেও তাত্ত্বিকদের অনেকেই স্বতন্ত্রভাবে অপছন্দের লক্ষ্য বাছাই করে সেটিকে আক্রমণ করেছেন। যেমন, টেরি ইগলটন (ঞবৎৎু ঊধমষবঃড়হ) নিজে একজন মার্কসীয় সাহিত্যতাত্ত্বিক, কিন্তু মানব-চিন্তার বিবর্তনের ধারাক্রমে বিকশিত উত্তর-আধুনিকতার (ঢ়ড়ংঃ-সড়ফবৎহরংস) প্রতি তিনি অপ্রসন্ন। তত্ত্বের জগতে উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে যে-চাঞ্চল্য চলছে তার সঙ্গে দ্রুত পা না চালিয়ে চেতনায় বিকশিত গতিতে হ্রাস টেনে উত্তর-আধুনিকতার আঁধারকেই আলোকিত করতে চেয়েছেন বেশি করে এবং এজন্যই বোধহয় উত্তর-আধুনিকতা-বিষয়ে তাঁর গ্রন্থের নাম রেখেছেন The Illusion of Post Modernism। উত্তর-আধুনিকতা-বিষয়ে ইগলটনের বড় আপত্তি হলো এটি রাজনীতিতে বিপ্লবী, কিন্তু আর্থিক-বিষয়ে শোষণের সহযোগী (radical in politics, but complicit in economics)। অর্থাৎ কাগজে বিপ্লবী, কাজে নেই; বাজার-অর্থনীতির স্বার্থকেই রক্ষা করছে। কয়েক বছর আগে টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট (Times Literary Supplement) প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে সাম্প্রতিক সাহিত্যতত্ত্বকে আরো জোরালো ভাষায় আক্রমণ করে তিনি লিখেছেন যে, এখানে কিছু বিগ্রহ (fetish) তৈরি করে তার বন্দনা করা হচ্ছে।

ইগলটনের সঙ্গে চিন্তা ও রুচিতে বিস্তর পার্থক্য সত্ত্বেও ডানঘেঁষা ব্লুমের কলমেও কোনো শ্লাঘা নেই সাহিত্যতত্ত্ব সম্পর্কে; তাঁর আপত্তি আরো চড়া। দেখে মনে হয়, ডান-বাম উভয় ধারার চিন্তাবিদরা একত্র হয়েছেন সাহিত্যতত্ত্ব-বিস্তারকে প্রতিহত করতে। লিঙ্গ-বৈষম্য ও ক্ষমতা বৈধকরণের বিষয়দুটি সাহিত্যতত্ত্বে বেশ প্রাধান্য লাভ করেছে; কিন্তু দুটির কোনোটিই ব্লুমকে অনুপ্রাণিত করেনি। বরং এ-জাতীয় বিষয়ের চিন্তকদের তিনি লিঙ্গ ও ক্ষমতা-অধিগ্রস্ত (gender and power freaks) বলে বিদ্রƒপ করতে দ্বিধা করেননি। সাহিত্যতত্ত্ব-বিষয়ে ব্লুমের আপত্তির অন্যতম কারণ হলো, লিঙ্গ ও ক্ষমতা-অধিগ্রস্ত তাত্ত্বিকরা শেক্সপিয়রের পঠনকে বিঘ্নিত করেছেন। সাহিত্যতত্ত্বের একটি বড় লক্ষ্য হলো সাহিত্যে স্পষ্টভাবে প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে পুনর্পরীক্ষা করা। তত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো যে, এটি অন্তর্ঘাতী বা subversive; সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত দিকপালদের প্রশংসার খোলা ছাড়পত্র দিতে তাত্ত্বিকরা নারাজ। এমনকি Western Literary Canon -এর প্রাণপুরুষ শেক্সপিয়রের প্রতিপত্তিও এদের কাছে তর্কাতীত নয়। ব্লুম শেক্সপিয়রকে নিয়ে কোনো তর্কে নামতে নারাজ, কারণ, তাঁর অবস্থান তো সেই Ivory tower বা গজদন্ত মিনারে; কালের পরীক্ষা পার হয়ে তিনি তো একজাতীয় অমরত্ব লাভ করেছেন। শেক্সপিয়রকে আক্রমণ করার অর্থ হলো পশ্চিমা-সাহিত্যের ক্যানন ধরে টান দেওয়া। সেই উদ্যোগকে প্রশ্রয় দিলে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যরুচির কী হবে? ব্লুমের গ্রন্থটি সম্পর্কে ও’ব্রায়েন (Geoffrey O’Brien) ১৯৯৯ সালের The Nwe York Reviwe of Books -এর একটি সংখ্যায় চমৎকার একটি আলোচনা প্রকাশ করেছেন (বর্তমান প্রবন্ধকার তথ্য, আলোচনার উপকরণের জন্য ওই প্রবন্ধের কাছে ঋণী)। ব্লুমের মতে, শেক্সপিয়র-চর্চার জন্য দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে; এক, শেক্সপিয়র পঠন এবং দুই, শেক্সপিয়রের চরিত্র-বিশ্লেষণ। ও’ব্রায়েন তাঁর বিস্তারিত আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, দুটি বিষয়ের কোনোটিই তেমন হঠাৎ কোনো আবিষ্কার নয়; শেক্সপিয়র-পণ্ডিতেরা অতীতে বিষয়-দুটির প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেবার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। যথার্থ শেক্সপিয়র-সমালোচনার জন্য বিষয়-দুটির প্রতি ব্লুম কেন পুনরায় জোর দিয়েছেন, ও’ব্রায়েন তার প্রেক্ষাপট   বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।

প্রথমেই শেক্সপিয়র-পঠনের বিষয়টির কথা বিচার করা যাক। সাহিত্য-সমালোচনা কি নির্মল সাহিত্য পাঠের কোনো বিকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে? সে-প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে প্রথমেই মনে রাখা দরকার যে, সহজ বই পড়াটা এখন অতীতের মতো আর অত সহজ নেই, বিশেষ করে মিডিয়ার কারণে। সিনেমা, টেলিভিশন, ইত্যাদি তার আপন ভাষায় টেক্সটকে পরিবেশন করে যে-নতুন রূপের জন্ম দিচ্ছে, তা অধিকাংশ সময়ে পাঠক ও টেক্সটের সহজ সম্পর্ক-তৈরিতে হস্তক্ষেপ করে। ফলে, পাঠক ও পঠিতব্য গ্রন্থের মাঝে একটি দূরত্ব গড়ে উঠছে। তবে শুধু মিডিয়া নয়, সাহিত্যতত্ত্ব পাঠক ও লেখকের মাঝে এই দূরত্বকে আরো বাড়িয়ে শেক্সপিয়র-সমালোচনাকে যে-পথে হাঁটাচ্ছে সে-পথে পাঠকের পথচলা অনেক সময়েই ক্লান্তিকর। যেসব জ্ঞান বা তথ্যের ভিড় ঠেলে পাঠককে এগোতে হয়, তা সহজ পঠন এবং পঠনজনিত আনন্দলাভ Ñ উভয় প্রক্রিয়াকেই বাধা দেয়। ব্লুম এ-পথ ছেড়ে শেক্সপিয়রকে তাঁর অতীত মহিমায় নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। এই লক্ষ্যে তাঁর প্রথম শর্ত, শেক্সপিয়রকে পড়তে হবে। সাহিত্যতত্ত্ব এই পঠন-প্রক্রিয়াকে যেভাবে চালিত করতে চায় তার প্রথম আপত্তি সেই পঠন-প্রক্রিয়া নিয়ে।

পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত শেক্সপিয়র-সমালোচনা কবির মাহাত্ম্যকে বিনাবাক্যে মেনে নিয়ে তাঁর সৃষ্টিকর্মকে বোঝার চেষ্টা করেছে। তাঁর শিল্প ত্রুটিহীন Ñ এমন দাবি কেউ করেনি, তবে তাঁর প্রতিভার অসাধারণত্বের বিষয়ে জোরালো কোনো সন্দেহ প্রকাশিত হয়নি। ষাটের দশকে ঔধহ কড়ঃঃ শেক্সপিয়রকে ‘মীথ’ না বানিয়ে সমসাময়িককালের চিন্তা-চেতনার প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে তার যুগোপযোগিতার বিষয় বিচার করার উদ্যোগ নেন। কটের অবস্থান ও বক্তব্য পরিষ্কার। ষাটের দশকের পশ্চিমা রাজনীতি অনেকাংশে বিপ্লবী এবং বামপন্থি; মানুষের অধিকার-বিষয়ে যেমন অনেকেই সোচ্চার, তেমনি মানব-যৌনতা-বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ওঠে খোলামেলা। সর্বোপরি অস্তিত্ববাদ ও অ্যাবসার্ডের আবেদন তখনো চিন্তকদের মাঝে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। সমসাময়িক হতে হলে যুগের মেজাজের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে। প্রায় চারশ বছর পূর্বে রচিত হলেও শেক্সপিয়র ষাটের দশকের যৌনতা বা রাজনীতির বাম-ঘেঁষা চিন্তার আদান-প্রদানে অচল মুদ্রা হয়ে ওঠেনি। মানব-যৌনতার বিষয়ে অহেতুক গোঁড়ামি-বর্জন বা কায়েমি রাজনীতি নিয়ে সংশয়ের জন্য তাকে কটের মতে আধুনিকদের গুরু বা Prophet of the modern বলা যায়। রাজনীতির বাঁধা পথ বা নৈতিকতার স্বীকৃত বুলিকে প্রতিষ্ঠিত করলেও শেক্সপিয়র প্রয়োজনীয় সংশয়কে মঞ্চের বাইরে ঠেলে দেননি। তাইতো তাঁর হাতে বিশুদ্ধ কমেডি যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি হয়েছে ডার্ক কমেডি। রাজনীতিতে বা নৈতিকতার নামে অনেক সময় যে-গোঁজামিল চলে, শেক্সপিয়র তাকে অকপটে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তাঁর নাটকে।

কিন্তু কটের শেক্সপিয়র-মূল্যায়ন নব্বইয়ের দশকে এসে নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে। কট গ্রন্থের নাম দিয়েছিলেন Shakespeare Our Contemporary (১৯৬৪); ১৯৯০-তে John Elson শেক্সপিয়রের মূল্যায়ন-বিষয়ক তাঁর গ্রন্থের নামকরণ করলেন Is Shakespeare Still Our Contemporary (১৯৯০)। নামকরণের ধরন থেকে দেখা যায়, শেক্সপিয়র-যুগোপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শেক্সপিয়রের মাহাত্ম্য হয়ে উঠছে প্রশ্নসাপেক্ষ; কেউ কেউ দাবি করছেন ওইসব মাহাত্ম্যপ্রচারের পেছনের চালিকাশক্তি হলো একজাতীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্র।

দেখাই যাচ্ছে যে, শেক্সপিয়র নিয়ে নতুন চিন্তা তাঁর খ্যাতি ও অবস্থানের শেকড় ধরেই টান দিতে প্রয়াস পাচ্ছে। শেক্সপিয়রের মাহাত্ম্যটা বিশেষ স্বার্থান্বেষীদের একটি সামাজিক নির্মাণ। (…socially constructed character of the Shakespeare phenomenon and canon)। পশ্চিমা সাহিত্য-ক্যানন এখন বিতর্কিত। সাহিত্য-তাত্ত্বিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন যে, সাহিত্য সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণির ক্ষমতা-বৈধকরণের জন্য ব্যবহার করা হয় এবং সৎসমালোচককে এই সুবিধাবাদীদের প্রকৃত চেহারা মেলে ধরতে হবে। জীবনের সঠিক চিত্র বুঝতে হলে ক্যাননের প্রাচীর ছেড়ে প্রান্তিক জীবন (marginali“ed life) এবং দমিতকণ্ঠ (silenced voice) তাকে খুঁজতে হবে। সামাজিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত বিশেষ শ্রেণির পথ নিশ্চিতকরণের জন্য শেক্সপিয়রের যে-বন্দনা চলে, সাম্প্রতিক সমালোচকরা তার প্রতি জোর অনাস্থা প্রকাশ করছেন। কবিকে গুরু বানিয়ে এরা তার বেদিতে ভক্তিরস নিঙড়াতে চান না। তাদের আচরণ একদম অযৌক্তিক নয়, তবে অবস্থানের পরিবর্তনের নিজস্ব সমস্যাও আছে। ভক্তিরস যেমন বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি বাড়াবাড়ি রকমের নিরাসক্তি নৈর্ব্যক্তিকতার সংস্কার সৃষ্টি করে সুষ্ঠু বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় সহানুভূতির আর্দ্রতাকে শুকিয়ে ফেলে। ব্লুম নিজে ক্যাননের গোঁড়া-সমর্থক এবং এক্ষেত্রে নিরাসক্তির চর্চা করতে চান না। তিনি শেক্সপিয়র-উপাসক এবং ভক্তিভরে তাঁর রচনা পাঠ করতে চান। তাঁর ভক্তি ও আসক্তির পথে সাহিত্যতত্ত্ব যে-পর্দা ঝুলিয়ে দিতে চাচ্ছে তিনি তাকে পাশে ঠেলে কীভাবে শেক্সপিয়র বুঝতে হবে তার প্রকল্প তৈরি করেছেন তাঁর শেক্সপিয়র গ্রন্থে। তার লক্ষ্য তাত্ত্বিকদের কুশলী পথ এড়িয়ে শেক্সপিয়রকে আবিষ্কার করা এবং করার সুযোগের দরজা খোলা রাখা।

তত্ত্বীয় বাধার প্রসঙ্গ তুললে যেসব সাহিত্য-চিন্তকদের নাম আসবে তাঁদের ভেতরে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন গ্রিনব্ল্যাট, ফুঁকো, গিয়ার্টজ। গ্রিনব্ল্যাট প্রচলিত শেক্সপিয়র-বন্দনা সুনজরে দেখেননি। প্রতিভার তাপ ও ধারা সাহিত্যের কারণরূপে তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, কোনো বিশেষ প্রতিভা নয়, শিল্প-সাহিত্য উৎসের শক্তি অন্যত্র বিরাজ করে। গ্রিনব্ল্যাটের এই তত্ত্ব অন্যান্য সাহিত্য-তাত্ত্বিকের সমর্থন পেলেও ব্লুমের সহানুভূতি আদায় করতে পারেনি। গ্রিনব্ল্যাট বা তাঁর অনুরাগীদের তাত্ত্বিক অবস্থানকে ব্লুম জোরালোভাবেই আক্রমণ করেছেন। নতুন তাত্ত্বিকরা শেক্সপিয়রকে যেভাবে পড়ার পদ্ধতির কথা বলেছেন ব্লুমের বিবেচনায় তা অপ্রয়োজনীয়। তাঁর বিবেচনায় গ্রিনব্ল্যাট-প্রস্তাবিত পদ্ধতির প্রধান দুর্বলতা হলো যে, এটি পাঠককে শেক্সপিয়রের মুখোমুখি হতে দেয় না। গ্রিনব্ল্যাটের তত্ত্বটি একটু ব্যাখ্যা করলে ব্লুমের আপত্তির কারণ ও প্রকৃতি আরো স্পষ্ট হবে।

গ্রিনব্ল্যাট বা অন্যরা, যেমন ফুঁকো বা গিয়ার্টজ, সাহিত্যকর্মের স্বয়ংসম্পূর্ণতায় বিশ্বাস করেন না। কারণ যে-কোনো পুঁজিবাদী সমাজে যে-ক্ষমতার খেলা (ঢ়ড়বিৎ ঢ়ষধু) চলে সেখানে লেখকের সত্যিকার কোনো স্বাধীনতা বা স্বয়ংসম্পূর্ণতা থাকা অসম্ভব। অর্থাৎ প্রতিভা বলতে যে-স্বাধীনতা বা স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তার ধারণা পোষণ করা হয়, পুঁজিবাদে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। কোনো সাহিত্য বা শিল্পসৃষ্টি সম্পর্কে যে-তত্ত্ব প্রচলিত আছে তার নিরিখে গ্রিনব্ল্যাটের বক্তব্য বেশ বৈপ্লবিক। যদি রচয়িতার স্বাধীনতা না থাকে তাহলে সেটি এলো কোথা থেকে এবং আমরা এটি বুঝবই বা কীভাবে?

এ-বিষয়ে অ্যাব্রমসের (গ. ঐ. অনৎধসং) সংক্ষিপ্ত আলোচনা আমাদের একটি সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করতে সাহায্য করবে। প্রচলিত অর্থে আমরা যাকে সাহিত্যকর্ম বলি তাকে অনন্য কিছু বলে বিবেচনা করাটা ঠিক নয়। সমাজের আর দশটি কাজের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্যের সম্পর্ক রয়েছে এবং ওইসব কাজকর্ম থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে ফেললে আমরা সুবিচার-করতে পারব না। যাকে সামাজিক কর্ম বলছি তার প্রত্যেকটির একটি নিজস্ব ও নির্দিষ্ট সীমা (নড়ঁহফধৎু) আছে এবং শিল্প-সাহিত্য-বিচারের জন্য বিভিন্ন সামাজিক কর্মের মাঝে লেনদেন, বোঝাপড়া, প্রচার (‘Negotiation… exchange, transaction, circulation’) ইত্যাদির প্রয়োজন। সাহিত্য, শিল্প ও অন্যান্য সামাজিক কাজ-কর্ম আধুনিক ভোগসর্বস্ব পুঁজিবাদের করতলগত যে-আন্ত্রিক সম্পর্কে বাঁধা পড়েছে সেটি উদ্ধার করতে না পারলে সাহিত্য বোঝা যাবে না। সাহিত্যেও অন্যান্য ডিসকোর্সের মতো, জীবনের পূর্ণ রূপ বুঝতে হলে সমাজের অন্যান্য ডিসকোর্সের মাঝে সাহিত্যকর্মকে প্রতিস্থাপন (embedded) করে লেনদেন, বোঝাপড়া ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে এবং তখন আপাতভাবে তুচ্ছ বা অপ্রাসঙ্গিক অনেক কিছুকে গুরুত্ব দিতে হবে বা বিচেনার আওতায় আনতে হবে। যেমন, সাহিত্য-মূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে কোর্ট-কাছারির দলিল, বাজার-খরচের হিসাব বা ধোপার রশিদও বিবেচনা করতে হতে পারে। প্রস্তাবটি অভিনব, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

সাহিত্যকর্মকে প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপটে স্থাপন করতে গেলে কী বিশেষ সমস্যার উদ্ভব হতে পারে? এখানে এ-কথা মনে রাখতে হবে যে, সাহিত্যকর্মকে তার প্রেক্ষাপটে প্রতিস্থাপন আর প্রেক্ষাপট-বিচার এককথা নয়। প্রচলিত প্রেক্ষাপট-বিচারে আমরা অতীত সম্পর্কে প্রাথমিক ধ্যানধারণা সংগ্রহ করি। যেমন, শেক্সপিয়র পড়তে গেলে টিলিইয়ার্ড বা উইলি বা ফোর্ডের থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রেক্ষাপটে প্রতিস্থাপন আর প্রেক্ষাপট-বিষয়ে জ্ঞান এককথা নয়। কারণ প্রেক্ষাপটের জ্ঞান মোটামুটি মূলত তথ্যভাণ্ডাররূপে কাজ করে; কিন্তু গ্রিনব্ল্যাট বিচার্য কর্মকে প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে এর সাথে ডিসকোর্সের সঙ্গে বোঝাপড়া দেওয়া-নেওয়ার ব্যবস্থা করতে চান। গ্রিনব্ল্যাটের একটি প্রিয় শব্দ হলো ‘নিগোসিয়েশন’ অর্থাৎ বোঝাপড়া বা দেন-দরবার। কোনো বিশেষ সাহিত্যকর্মকে যথাযথ বিচার করতে হলে অন্যান্য টেক্সটের সঙ্গে বোঝাপড়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেটি না করলে বিচারের কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। 

ব্লুমের অসন্তোষ এবং অবস্থানের নতুনত্ব এখানে। সমাজের প্রচলিত অন্যান্য ডিসকোর্সের সঙ্গে মিলিয়ে ‘নিউ হিস্টরিসিস্টরা’ যেভাবে শেক্সপিয়র পড়তে চান সেভাবে পড়তে গেলে শেক্সপিয়রের যুগে বিভিন্ন ঘটনা বা ধারণা যেমন, জ্যেষ্ঠপুত্রের উত্তরাধিকার, এথেক্স বিদ্রোহ ইত্যাদি বিষয় শেক্সপিয়রের নাট্যকর্মের মতো সমান গুরুত্ব পায়। ও’ব্রায়েনের ভাষায়, দলিল দস্তাবেজ, তথ্য উপাত্তের ভিড়ে মূল শেক্সপিয়র হারিয়ে যায়। ‘নিউ হিস্টরিসিস্ট’দের বক্তব্য হলো, যেহেতু সাহিত্য একটি সামাজিক কর্ম, অতএব সামাজিক কাঠামোর পুরো চিত্রটি না নিলে সাহিত্য বোঝা যাবে না। কিন্তু ব্লুম এই কথা মানেন না এবং তাঁর অবস্থান প্রচলিত নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে তুলনীয়। ব্লুম শেক্সপিয়র পড়তে চান শেক্সপিয়রের সাহিত্যকর্ম সামনে রেখে, কোনো দলিল- দস্তাবেজের সঙ্গে আদান-প্রদান ব্যতিরেকে। গ্রিনব্ল্যাট একক প্রতিভার ক্ষমতার কথা মানেন না, কিন্তু ব্লুমের কাছে শেক্সপিয়র মহান প্রতিভাধর স্রষ্টা এবং তাঁর চোখে চোখ রেখেই অর্থাৎ সরাসরি তাঁর কাজের সঙ্গে পরিচিতি ঘটিয়ে তাঁর পঠন চালিয়ে যেতে চান। ‘নিউ হিস্টরিসিস্ট’ কোনো টেক্সটকে বোঝার জন্য যে প্রতিস্থাপনের কথা বলেছেন ব্লুম সেটিকে মানতে চাইছেন না কেন? ব্লুমের জোরালো দাবি হলো, শেক্সপিয়রের শিল্পের প্রকর্ষ চরিত্র-সৃষ্টিতে এবং শেক্সপিয়র জানতে বা বুঝতে হলে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের মাঝে ডুব দিতে হবে এবং এ-জন্য প্রয়োজন তাঁর কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়। শেক্সপিয়রের প্রতিভা নিয়ে অকারণ বিতর্কে সময় না-কাটিয়ে অবাক বিস্ময়ে ভক্তের মুগ্ধ চোখ দিয়ে তিনি তাঁর রচনা পড়তে চান। এখন প্রশ্ন হলো, চরিত্রকে তিনি কেন এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন?

এ-প্রশ্নের উত্তরের জন্য চরিত্র-বিষয়ে আমাদের ধারণা স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার। চরিত্র বলতে এখানে পোর্ট্রেট বা অবিকল কোনো প্রতিকৃতি বোঝানো হচ্ছে না, যেমন আমরা কোনো প্রতিকৃতি (portrait) বা স্থির চিত্রে (still life) দেখতে পাই। শেক্সপিয়র ঠিক শান্ত স্থির কোনো কিছু অনুকরণ করেননি, চরিত্র তাঁর জন্য একটি সচল বিবর্তনমুখী সত্তা। ও’ব্রায়েন বিবর্তনমুখীনতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, চরিত্ররা ভূমিকা নয়, সত্তা; অনুকরণ নয়, জীবনের রূপ। হেগেল থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে চরিত্রের বিবর্তন-প্রক্রিয়া-ধারণা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। চরিত্ররা নিজেই নিজের শিল্পী এবং পরিবর্তনের ইচ্ছা থেকে স্বেচ্ছায় মনের খবর যোগাড় করে আত্মবিস্তারের চেষ্টা করে। চরিত্রের এ-বিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে চরিত্রকে খুব কাছ থেকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখতে হবে এবং তার জন্য প্রয়োজন সরাসরি টেক্সটের সঙ্গে পরিচিতি। ব্লুমের ভাষায়, আমরা শেক্সপিয়রকে পড়তে শিখি এবং এ-শেখার কোনো শেষ নেই।

এ-পদ্ধতির চরিত্র-পঠনে প্রয়োজন চরিত্রের যে-জগৎ নাট্যকার তার লেখনীতে সৃষ্টি করেছেন তার সীমায় বিচরণ করা। চরিত্রকে চেনা-জানার জন্য অন্য কোনো সূত্রের ওপর নির্ভর করা বা তার আপন ভুবনের ক্রিয়া-বিক্রিয়া প্রত্যক্ষ করার জন্য দলিল-দস্তাবেজ বা সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক খোঁজ-খবর করা ব্লুমের জন্য অপ্রয়োজনীয়, কারণ সত্যিকার পঠন আমাদের চেতনার সব দরজা মেলে ধরে ভালো-মন্দ, অম্ল-মধুর ইত্যাদি বিভিন্ন উপাদানই আমাদের জন্য বয়ে আনে। যে-কাজটির দরকার সেটি হলো এইসব উপাদানের বৈশিষ্ট্য ভালোভাবে বোঝা এবং বোঝার উদ্দেশ্যে মনকে মুক্ত করে দেওয়া। শেক্সপিয়র পড়তে গিয়ে দলিল-দস্তাবেজ তত্ত্ব-তালাশ করাটা অনাবশ্যক। তাঁর প্রতিভা মহান এবং অবাক বিস্ময়ে তাঁর প্রতিভার কাছে পাঠককে অবনত হতে হয় এবং শেক্সপিয়র যত পড়া যায় এই শ্রদ্ধাবোধ ততই বাড়ে।

এ-পঠনকে ব্লুমও তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে চরিত্রের অজ্ঞাত জগতে অনুপ্রবেশের জন্য ব্যবহার করেছেন। নাটকে যা ঘটে আমরা তার যেমন একটি চিত্র পাই, তেমনি যা ঘটেনি বা ঘটতে পারত তারও একটি ইঙ্গিত থাকে। কোনো কিছু কেন ঘটল না, বা ঘটলে কী হতে পারত – ব্লুম তা পরিমাপ করার চেষ্টা করেছেন। পঠনের হ্যামলেট শেষ হচ্ছে সাইলেন্সের (ঝরষবহপব) কথা বলে; ব্লুম তাঁর পঠন-প্রক্রিয়ার সাহায্যে সেই খামবন্দি নীরবতা খুলে চরিত্রের সব খবর উদ্ধার করতে চান।

শেক্সপিয়রে নাটকের মূল যে-চরিত্র, এটি নতুন উপলব্ধি নয়, শেক্সপিয়র-সমালোচনায় এটি বহুল আলোচিত বিষয়। কিন্তু ‘নিউ হিস্টরিসিস্ট’রা এ-অবস্থান থেকে সরে আসার চেষ্টা করেছেন; ব্লুমের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্যের এটিও একটি বড় কারণ। ব্লুমের বিবেচনায় চরিত্রই শেক্সপিয়রের নাটকের প্রধান শক্তি। অতএব, শেক্সপিয়রকে বুঝতে হলে কোনো প্যাঁচ-গোছ বা ঘোরাপথ নয়, সরাসরি শেক্সপিয়রকে পড়তে হবে।

চরিত্র যে শেক্সপিয়রের নাটকের উপজীব্য, সে-কথা সপ্তদশ শতক থেকেই আলোচিত হয়ে আসছে। শেক্সপিয়র-সৃষ্ট চরিত্রে সমালোচকদের আগ্রহের ইতিহাসের ক্রমধারা ও’ব্রায়েন তাঁর আলোচনায় তুলে ধরেছেন। প্রথমে সপ্তদশ শতকের Lady Marchioness of Nwe Castle-Gi Sociable Letters (১৬৬৪) এর নাম করতে হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে কবি পোপ তাঁর Characters (১৭২৫) এবং ড. জনসন তাঁর Shakespeare Illustrated (১৭৫৩) গ্রন্থে শেক্সপিয়রের চরিত্রসৃষ্টির অমর ক্ষমতার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ড. জনসন মনে করেন, শেক্সপিয়রের নাটক জীবনের মানচিত্রের মতো। মানববক্ষের পরিসর ক্ষুদ্র হলেও সেটি যেমন শরীরের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ধারণ করে, তেমনি শেক্সপিয়রের নাটকও তাঁর ক্ষুদ্র-পরিসরে জীবনের অশেষ বৈচিত্র্যকে ধারণ করেছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে শেক্সপিয়র-সমালোচনার চরিত্রে আগ্রহ কোনোভাবে হ্রাস পায়নি। আমরা হ্যাজলিট, কোলরিজ, যার কথাই তুলি না কেন, এঁদের কেউই চরিত্রের প্রসঙ্গটি খাটো করে দেখেননি এবং ভিক্টোরীয় যুগে এর তেমন কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ও’ব্রায়েন তাঁর ইতিহাস-পরিক্রমায় ভিক্টোরীয় যুগের পর মধ্যবর্তী সময়টিকে দ্রুত পাশ কাটিয়ে Jan Kott -এ চলে এসেছেন। বিংশ শতাব্দীর যেসব শেক্সপিয়র-সমালোচকদের সঙ্গে আমরা বিশেষ পরিচিত যেমন ব্রাডলি, উইলসন নাইট, ট্রাভেরসি বা কারমোড প্রমুখদের উল্লেখ তাঁর আলোচনায় নেই। তার একটি কারণ বোধহয় এই যে, শেক্সপিয়র-সমালোচনার মূল ধারা অর্থাৎ চরিত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে এরা কেউই দ্বিমত পোষণ করেননি বা শেক্সপিয়রের এভারেস্টতুল্য মাহাত্ম্য নিয়ে এদের কোনো সংশয় নেই; অন্তত যুগে যুগে চলে আসা তাঁর সুখ্যাতিকে কেউ ক্ষমতা বা প্রভাব কুক্ষিগত করার ষড়যন্ত্রের অপকৌশল মনে করেননি। ‘নিউ হিস্টরিসিস্ট’রা লেখকের সার্বভৌম বা স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে অস্বীকার করেন, কিন্তু ব্লুমের কাছে লেখক হিসেবে অন্তত শেক্সপিয়রই সর্বেসর্বা এবং অসাধারণ প্রতিভার জোরে অমর সব চরিত্রসৃষ্টি রেখে গেছেন এবং তিনি বিস্ময়-বিমুগ্ধ চিত্তে একাগ্রভাবে তাঁকে পড়তে চান। ব্লুম নির্দ্বিধায় নিজেকে ইধৎফড়ষধঃৎু বা শেক্সপিয়রের উপাসক ঘোষণা করেছেন। ও’ব্রায়েন ভক্তাবনত এই উপাসককে তাঁর ভক্তির জন্য শেষ বিশুদ্ধ শেক্সপিয়রপ্রেমী (last Shakespeare) নামে অভিহিত করেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, ব্লুমের শেক্সপিয়র-ভক্তি এবং চরিত্রানুরাগ আমাদের শেক্সপিয়র-চর্চাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারে? প্রথম দর্শনে ‘নিউ হিস্টরিসিস্ট’দের বক্তব্যই আমাদের জন্য সবচাইতে উপযোগী মনে হয়। আমরা দীর্ঘদিন উপনিবেশ ছিলাম এবং আমাদের শেক্সপিয়র-পরিচিতিও সেই ঔপনিবেশিক শক্তির দান। নিজেরা যেচে কখন বা কীভাবে শেক্সপিয়র আবিষ্কার করতাম তার ইতিহাস ভিন্ন হবে; বর্তমান আলোচনায় বিবেচ্য নয়। কিন্তু ‘নিউ হিস্টরিসিস্ট’দের প্রবক্তারা যে-প্রজেক্টের কথা বলেন শেক্সপিয়র পড়তে সে-পথে কি আমরা খুব সহজে এগুতে পারব?

নিউ হিস্টরিসিস্টদের দুজন, যেমন গ্রিনব্ল্যাট এবং গিয়ার্টজ-প্রদর্শিত পদ্ধতির কথা ভাবা যেতে পারে। কোনো লিটারারি টেক্সট বা সাহিত্যকর্মকে বিচার করার জন্য গ্রিনব্ল্যাট বিশেষ টেক্সটকে আলোচ্য সময়ে প্রতিস্থাপন করে অন্যান্য লেখালেখির সঙ্গে একটি বোঝাপড়া বা হবমড়ঃরধঃব করার পরামর্শ দিয়েছেন। সে-বিষয় পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সাহিত্য-বিচারের জন্য তিনি বোঝাপড়ার কথা বলেছেন এবং তার দৃষ্টান্ত ও’ব্রায়েন উল্লেখ করেছেন। যেমন, ১৫৫৮ সালে লিখিত Thomas Hariot -এর A Brief and True Report of the Nwe Found Land of Virginia গ্রন্থে উপনিবেশ-বিষয়ে যে ‘Machiavellian hypothesis’ দেওয়া হয়েছে তার আলোকে তিনি শেক্সপিয়রের The Tempest, Henry IV Part I & II ev Henry  শীর্ষক নাটকের পাঠ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ক্ষমতা, বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিবাদী কণ্ঠকে সর্বদাই দমন করার চেষ্টা করে। গ্রিনব্ল্যাটের মতে, শেক্সপিয়র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এবং ক্ষমতার প্রতিবাদীদের সহাবস্থান ঘটিয়ে বস্তুতপক্ষে কায়েমি ক্ষমতার স্বার্থরক্ষা করার চেষ্টা করেছেন; ক্ষমতা ধরে রাখার উপায়রূপে ব্যবহার করেছেন। নাটকের দ্বন্দ্বে একদিকে রয়েছে ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রের নানা কৌশল, ষড়যন্ত্র, হিসাব-কিতাব ও আদর্শবাদ এবং অন্যদিকে রয়েছে বিপ্লব, বিদ্রোহ বা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ বা কাজের আশংকা। রাজনৈতিক নিপীড়ক এবং নিপীড়িতদের এক ঠাঁয়ে তুলে কী লাভ হয়েছে? গ্রিনব্লাটের ভাষায়, উপকার হয়েছে ক্ষমতাধরের; কারণ এভাবে প্রতিবাদ বা বিদ্রোহকে উসকে দিয়ে আখেরে তাঁকে যথাযথভাবে দমন করা গেছে। গ্রিনব্ল্যাট যেমন Harriot -কে ব্যবহার করেছেন শেক্সপিয়রের পাঠোদ্ধার করতে, তেমনি শেক্সপিয়র-বিচারে গিয়ার্টজ ‘thick description’ নামক অন্য একটি পথের কথা বলেছেন। এই ‘ঘন বর্ণনা’পদ্ধতি-অনুযায়ী যে-কোনো সাহিত্য-টেক্সট-বিচারে বিরাজমান আচার, সংস্কার, অনুশাসন ইত্যাদি সবই বিবেচনা করার প্রস্তাব করেছেন। অর্থাৎ সাহিত্যিক text পবিত্র বা অলঙ্ঘনীয় কোনো বিষয় নয়। সকল সংস্কার ইত্যাদির ঘন বুননে যে-সমাজচিত্র তৈরি হয় তার প্রেক্ষাপটে যথাযথভাবে টেক্সটকে প্রতিস্থাপন করতে হবে প্রকৃত বিচারের জন্য। এখন প্রশ্ন হলো এর কতটুকু আমাদের আয়ত্তে বা আমাদের পক্ষে সম্ভব? গ্রিনব্ল্যাট যেভাবে Harriot -কে ব্যবহার করেছেন তেমন কোনো মৌলিক আবিষ্কার কি আমাদের নাগালে আসবে কখনো?

শেক্সপিয়রের সময়টি ভারতবর্ষে মোগল বাদশা জাহাঙ্গীরের শাসনকাল। তার দরবারে বিদেশী অতিথি এসেছে, ধর্মীয় আচার-আচরণ নিয়ে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। ঘটনাগুলো ভিন্ন দেশে ঘটে থাকলেও কালের বিচারে এরা সমকালীন। অতএব, আমরা কি শেক্সপিয়রকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করব? উদ্যোগ থাকলে অসম্ভব এমন দাবি সংগত হবে না, তবে যতটা শ্রম বা সুযোগের দরকার তা-ও খুব সহজলভ্য নয়। এছাড়াও নিউ হিস্টরিসিস্টরা রাজনীতিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে সাহিত্যকে কি কোণঠাসা করে ফেলেনি? রাজনীতির গুরুত্বকে অস্বীকার না করেও কি সাহিত্যে পাঠ নেওয়া যায় না? শেক্সপিয়রের সাম্প্রতিক সমালোচনা নিয়ে ব্লুমের অসন্তোষের মূল কারণ এখানেই নিহিত। ক্ষমতা, সমাজ,     রাজনীতি ইত্যাদি দিকে সাহিত্য-তত্ত্ব এত ঝুঁকে পড়েছে যে, ব্লুম শেক্সপিয়রের শুধু চরিত্রপাঠকে পুনর্জীবিত করে ভারসাম্য সৃষ্টি করতে চাইছেন।

তাত্ত্বিক আপত্তির কথা না তুললেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে গিয়ার্টজের ‘thick description’ বা গ্রিনব্ল্যাটের ‘negotiation’ আমাদের জন্য খুব কার্যকরী প্রকল্প বলে মনে হয় না। সোজা ভাষায় কোনো টেক্সটকে প্রতিস্থাপন করার সুযোগ কোথায় আমাদের? আর আমরা উইল বা ফোর্ড-অঙ্কিত প্রেক্ষাপটের বাইরে কি যেতে পারি? এর খুব বেশি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পেরেছি কি? আর এক্ষেত্রে ব্লুম-প্রস্তাবিত চরিত্র-বিচারই আমাদের শেক্সপিয়র-চর্চার প্রধান উপায় হতে বাধ্য। ক্ষমতার খেলা ছাড়া আমরা অন্য রাজনীতির হাতে বন্দি। আমরা সম্পূর্ণভাবে তৈরি ঃবীঃ-এর উপর নির্ভরশীল, এবং টেক্সট প্রস্তুতিতে রাজনীতি থাকে। যেমন হ্যামলেট নাটকের করোটি। টেক্সটের প্রচ্ছদে করোটি ব্যবহার করা হয়। অথচ নাটকটি যখন রচিত হয় তখন    করোটি পাওয়াটাই ছিল অসম্ভব। কিন্তু হ্যামলেট-মানসের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য করোটি প্রতীক হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এভাবে টেক্সট প্রস্তুতিতে বিশেষ চিন্তা চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা      থাকতে পারে এবং সেই রাজনীতি আমাদের মেনে নিয়েই কাজ করতে হয়, তার প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া যা তাকে অবমুক্ত করা বেশ কঠিন কাজ। সে-অবস্থায় চরিত্রপাঠই শেক্সপিয়র-চর্চার প্রধান বলেই    মনে হয়।

তবে শেক্সপিয়র-চর্চায় ব্লুমের চাইতেও মূল্যবান ধারণা এসেছে ও’ব্রায়েনের কাছ থেকে। ব্লুম শেক্সপিয়র-উপাসক এবং তাঁর নাটকে সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে তাঁর প্রতিভার অনন্য ফসল হিসেবে দেখেছেন। ও’ব্রায়েন চরিত্রের অস্বীকার করেন না, তবে চরিত্রই সব এমনও মনে করেন না। তাঁর মতে, শেক্সপিয়রের চরিত্র হয়তো বড়, তবে তারও চাইতে বড় হলো তার নাটকে দৃশ্য (scene)। ও’ ব্রায়েনের বক্তব্যে কি আমাদের জন্য নতুন কিছু আছে? আমাদের শেক্সপিয়র-চর্চা মূলত পুস্তকবন্দি। পড়া বা পরীক্ষা পাশ বা মাঝে মধ্যে অ্যাকাডেমিক প্রবন্ধ-রচনায় সীমিত। আমাদের এই অ্যাপ্রোচের জন্য শেক্সপিয়রের মাহাত্ম্য তাঁর চরিত্রের ধারণাটি খুবই কার্যকরী, কারণ তখন একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বিচরণ করলেই চলে। ‘নিউ হিস্টরিসিস্ট’রা চেয়েছেন শেক্সপিয়র-মূল্যায়ন সম্প্রসারিত করতে, ও’ব্রায়েন সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে ভিন্নভাবে সৃষ্টি করতে চেয়েছেন।সিন বা দৃশ্য বলতে আমি বুঝি ঘটনা, যেখানে চরিত্রদের    আন্তঃসম্পর্কের প্রকাশ ঘটে। আচার-আচরণ, সংলাপ ইত্যাদির মাধ্যমে নিয়োজিত থাকে চরিত্ররা এবং প্রথমত আমাদের সামনে ফুটে ওঠে জীবনের মাঠ। শেক্সপিয়র ঠিক পড়ার জন্য নাটক লেখেননি; মঞ্চে অভিনয়ের জন্য জীবনের চিত্র নাটকের রূপে তুলে ধরেছেন। এই নাটকের প্রাণ হলো সিন বা দৃশ্য যেখানে চরিত্রদের দেন-দরবার, বোঝাপড়া চলে। গ্রিনব্ল্যাট বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদানের মাঝে যে-বোঝাপড়া বা আদান-প্রদানের কথা বলেছেন তার অভাবে নাটকের চরিত্ররা দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যে আদান-প্রদান চালিয়ে যায় বা বোঝাপড়া করে, আপাতত শেক্সপিয়র বুঝতে সেটি ছাড়া আর তেমন কোনো জোরালো বিকল্প আমাদের হাতে নেই। শেক্সপিয়র-অভিনয়ের আরো নিরীক্ষাধর্মী সুযোগ সৃষ্টি হলে হয়তো নতুন করে শেক্সপিয়র বোঝার বা মূল্যায়ন করার সুযোগ হবে; না হলে চলবে শেক্সপিয়রের অকুণ্ঠচিত্ত বন্দনা। ভক্তির রসই নিংড়ানো হবে, সত্যিকার সমালোচনার ধারা গড়ে উঠবে না।