বারো ঘর এক উঠানের গল্প জানা আছে। উঠানের চারপাশে বারোটি ঘর, সেখানে বারোরকমের জীবন। কাঠ-পাতা কী কয়লার ধোঁয়ায় উঠান ঢাকা পড়ে, শলার ঝাড়ু হাতে যে যে যার যার অংশের পাতাকুটো পরিষ্কার করে যখন, তখনো ধূলিরাশিতে ঢাকা পড়ে। কিন্তু যা জানা নেই তা হচ্ছে, কখনো এই বারো ঘর থাকে না, এক উঠানও নয়। থাকে না ধোঁয়ার, কী ধূলিকণার রাশি। কালকাসুন্দির ঝোপ কী দণ্ডকলমের ঝাড়, থাকে না বেরাটির বেড়া কী তাতে ঝুলে থাকা তেলাকুচার লতা। সব, এইসব মোহনীয় চাঁদোয়ায় ঢাকা পড়ে, ছলকাতে থাকে হালকা ঢেউয়ের ডগায় রুপালি আলোয়, কোনো এক দিন।
উঠানের একপাশে স্নানাগারটি, শৌচাগারও। বারোয়ারি। দেয়াল দিয়ে ঘেরা। তরল বর্জ্য দেয়ালের নিচের সরু পথে বেরিয়ে আসে, নালা দিয়ে বয়ে যায়, ক্রমে সেটি প্রসারিত হয়ে নরম মাটির উঠানের শেষ প্রান্তে এসে একটি ছোট জলাধারই হয় যেন। গাঢ় ছাইয়ের রং ও শ্যাওলার সবুজ জলাধারের মধ্যে মেশে এবং সেখানে বাড়িওলার আফ্রিকী মাগুর মাছটি ক্রমে হাঙরের চেহারা পায়। তবে ওই মাগুরটিও সেদিন থাকে না। চন্দ্রালোকে সে-ও হয় ছায়াহীন এবং ছায়াহীন হয় ঘর এবং উঠানও, কেবল গৃহশীর্ষ ছাড়া।
দুই
বড় রাস্তার দুপাশে শহরের চেহারা। শহরতলিই প্রায়। তবুও মূল শহরতলি ছাড়িয়ে, বিস্তীর্ণ মাঠ কী ইটভাটার সহস্র চিমনি পেরুলেই জনপদটি পড়ে। সবরকমের দোকানপাট, শহুরে জীবনের চেহারা দেখা যায়। জাতীয় সড়কের পাশেই নানা ব্যবসায়। সোয়েটার কী পোশাক তৈরির কারখানাও বেশ কটি। স্থানীয় কাঠের আসবাবপত্রের দোকানও আছে, ঢালাই লোহার আলমারি কী তারে ছাওয়া তৈজসপত্র রাখবার দেয়ালদানিসহ।
অজস্র যানবাহন – দূরপাল্লার বাস, ছোট দৌড়ের মিনিবাস। শিল্পোপকরণ টানবার ট্রাক কী স্বল্পবিত্তের মাল টানাটানির ভ্যানগাড়িতে বাজারে ঢোকার মুখ সর্বদা বন্ধ যেন। সেটি পেরুলে, বাজারের মধ্য দিয়ে যাওয়া রাস্তার দুপাশে দাঁড়ানো থাকে রিকশার দল, এবং তারপর গ্রাম্য-পসারির অস্থায়ী দোকানপাট। কিছু এলোমেলো, অগোছালো স্থাপনার শেষে বাঁয়ে মোড় নিলে মনে হয় যেন জনপদের শেষ Ñ ফলা না-ফলা আম, জাম, কী পীতরাজের বাগান পার হয়ে। আছে বুঝি কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া কী দু-একটি শিমুলও; অসমান ভূমি, কিছু লালমাটির ঢিপি এবং শেষে পরিত্যক্ত ইটখোলার চৌবাচ্চা কী পরিখা। বারো উঠানের কেউ কেউ সেটিকে পুষ্করিণীও ঠাউরে নেয় কখনো।
উঠানে যাওয়ার পথ আমবাগানের মধ্য দিয়ে। সরকারি পথ নয়, বেসরকারিও নয়। পায়ে চলার দাগই বলে সেটি পথ। পথের শেষে ইটের দেয়াল টিনের চালের বসতি। সেখানে ডাইনে মোড় নিলে পড়বে ঐ মৎস্যাধার। উলটোদিক থেকে আরেকটি নালা এসে ওই আধারে পড়ে বলে পারাপারের জন্যে ছোট একটি বাঁশের মাচা। সেটি পার হয়ে বাঁয়ে গেলে আবার কিছু ইট-টিনের ছাউনি এবং ঠিক সামনেই সেই চারপাশে বারোঘরের উঠান।
উঠানের বাঁয়ে ইট-টিনের নতুন ছাউনি। ইটের দেয়াল দিয়ে ভাগ করা পাঁচটি খোপ, এক একটি ঘর। ঘরের ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় দোচালার টিন। সিলিং নেই Ñ বাঁশের মাচারও। ঘরকটির বাইরে টানা বারান্দা এখনো মাটির। ঘরের মেঝে মাজা সিমেন্টের হলেও, বারান্দা মাটিরই। টিনের চালা দিয়ে ঢেকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও আছে। বারান্দার দূর-মাথায় এক-দুধাপ নামলেই উঠানের শেষ Ñ সেখানে সাজানো পাঁচটি উনুন, মাটিতে গর্ত করে কাদা লেপে বানানো। কাঠকুটো, পাতা কী শুকনো ঘাস জ্বলে সেখানে, যখন যে জ্বালায়।
উঠানের শেষ সীমানা বরাবর বাঁশ-কাঠের দোচালা Ñ বাড়িওলার রান্নাঘর। বাঁয়ে সামান্য তফাৎ করে আরো তিনটি বাঁশের বেড়া Ñ টিনের চালের ঘর। কাঠের জানালা বসানো। দিনমজুরের ঘর নয়, বোঝা যায়। বাড়িওলা ও তার দুই ভাই, প্রত্যেকেরই দুটি করে ঘর বলে শৌচাগারের পেছন দিকে ঘুরে এসেছে স্থাপনা।
উঠানের বাঁপাশে একটি বেলগাছ, তার নিচে বাঁশের মাচা। রন্ধনক্লান্ত গৃহিণী শরীরের তাপ-নিবারণ কী সতীর্থদের সঙ্গে দিনের সংবাদ-বিনিময়কালে সেখানে বিশ্রাম করেন। কখনো কখনো চাঁদ-তারার রাত্রিতে দীর্ঘকাল ভিড় জমে যেন মাচার ওপরে এবং চারপাশে।
উঠানের প্রায় মাঝখানে আছে একটি বাতাবিলেবুর গাছ। আকারে খুবই ছোট তার ফল, তবুও যখন ফলে তেল-মরিচের বাটি নিয়ে অনেকেই যায় তার নিচে। ঘরকটির পেছনে কিছু গাছ আছে। আম-কাঁঠাল হতে পারে। হতে পারে নিষ্ফল পীতরাজ এবং এই গাছের শ্রেণি পেরুলে শুধুই উঁচু-নিচু জমি। পতিত। ফসলের ক্ষেত নয়। ইটখোলার মাটিকাটা খানাখন্দে ভরা। দূরে একটি বাঁশবন। তারপরে ইতস্তত ছড়ানো ইটভাটার চিমনি কখনো আকাশে চোখ তুলতে দেয় না। নীলকালো ধোঁয়ার জন্যে।
এই। এই হচ্ছে বারোঘরের উঠান।
তিন
নতুন ছাউনির প্রথম ঘরটিই তার। শহরে যে-গৃহস্বামীর পরিচর্যাকারী ছিল সে, তিনি দেশত্যাগকালে কেবল তার নতুন ঘরের জন্যে তৈজসপত্রই কিনে দিয়ে যাননি, এই নতুন ঘরটিরও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। নিজে এসে দেখে বাড়িওলাকে বলেছিলেন ভাড়ার জন্যে যেন চিন্তিত না হয়।
প্রথম ঘরে ঢোকার বিস্ময়কর দিনটি তার স্বপ্নেও আসে বারবার। পাঁচ ইঞ্চি ইটের দেয়ালে পলস্তারা, আছে নীলরঙের কাঠের দরজা। উত্তর-দক্ষিণে দুটি জানালা। বারবার দরজা বন্ধ করে, খুলে দেখে সে, জানালার পাট খুঁটিয়ে দেখে, হাত বোলায় জানালার গরাদে। সিমেন্টে পালিশ করা মেঝে। খালি পায়ে মসৃণতা পরখ করে। মাথার ওপরে খালি। দুদিক থেকে টিনের চালা এসে মিলেছে যেন খিলানের মতো। বাড়িওলা আশ্বাস দিয়েছিল, এইরকম থাকবে না। ঢেকে দেবে সে। বাঁশে বোনানো হলেও সিলিং-ই তো।
সে কিছু ভাবেনি এ-নিয়ে। টিনের চালা, ইটের দেয়াল। নিজের ঘর তার। হোক ভাড়ায়। নতুন চৌকিটিকে জানালার পাশঘেঁষে বসায়, আলনাটিকে বসায় জানালাহীন দেয়াল বরাবর, তার গর্বের ঢালাই লোহার মোটা তার দিয়ে বানানো আলমারিসদৃশ শেল্ফটিকে বসায় উলটো দেয়ালে। শেল্ফের নিচের অংশটুকুতে পাল্লা দেওয়া। তালাবন্ধ করা যায়। কিছু শূন্য, কিছু পূর্ণ বিদেশী প্রসাধনীর মোড়ক দিয়ে সাজায় তাক দুটি। পরিচর্যার বিনিময়ে পাওয়া সেসব। বারবার বাইরেগিয়ে দেখে Ñ ঘরের মাঝখানের একমাত্র আলোটি জ্বালালে চোখ ঝলসে যায় তার যেন।
এটি তার নতুন ঘর। আসলে প্রথম ঘরই। যদিও আরো কয়েকটি গৃহে প্রবেশের চেষ্টা ছিল তার। ঢুকেও ছিল কিন্তু সে-ক্ষণিকের জন্যেই। এবং বারবার এই ঘর ওই ঘর করায় একসময়ে ভেবেছিল কোনো দরজাই খুলবে না আর। পঁচিশ বছরেই শুরু বুঝি তার বন্ধ্যা জীবন।
একমাত্র কন্যাটি তার প্রথম গৃহপ্রবেশের ফসল। এই ঘরে যে-পুরুষের সঙ্গে বাস তার, কন্যাটিকে সেই পুরুষ ভালো চোখে দেখে না। তবুও কী কারণে কন্যাসহ তাকে নিয়ে গৃহপ্রবেশ ওই পুরুষের, বোঝা যায় না। সম্ভবত হবু স্ত্রীর পেছনে দাঁড়ানো উপচিকীর্ষু গৃহস্থের চেহারা সে দেখেছিল। আর বিনা খরচে নতুন ঘরে ঢোকার লোভটিও হয়তো তাকে টেনেছিল।
এই শহরপারের আমবাগান ইটভাটার বসতিতে আসার তীব্র বাসনা ছিল না নব্য ঘরনির। ঢিল ছুড়লে একটু দূরে যে-ঘরের দেয়ালে লাগে সেটি তার দুই ননদের, কিন্তু স্বামী তার ঘরবাঁধার জন্যে এখানেই আসতে চাইলে সে না-করতে পারেনি। হোক তো ঘর! প্রথম না-হলেও নতুন ঘরই তো।
গৃহপ্রবেশের পরে ঘরের মধ্যে ভিড় করে দাঁড়ানো আত্মীয়-প্রতিবেশী অভ্যাগতদের হাতে বড় রাস্তার বাজার থেকে কেনা জিলিপি তুলে দিয়েছিল। তারপরে সকলে বেরিয়ে গেলে, স্বামীও তার ফিরি-ব্যবসায় মন দেওয়ার জন্যে চলে গেল, মেয়ের ঘর গুছিয়ে দিতে আসা মা ও কন্যাটিকে ননদের ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে, নতুন বিছানায় শুয়েছিল সে। শুয়ে কেঁদেছিল।
চার
কখনো কখনো দুঘর পরের প্রতিবেশিনীর কাছে যায় সে। সন্তানহীনা মহিলা স্বাবলম্বী। বাড়িওলার বোন। ভাইয়ের সাহায্যে দেওয়া ছোট একটি ফোন-ফ্যাক্সের দোকান তার। এ-কারণে অন্যের দৃষ্টি বেশি এ-ঘরের দিকেই। পাশের ঘরটি প্রায়ই খালি থাকে। তিন নম্বর ঘরের স্বামী-স্ত্রী বড় কলহপরায়ণ। কখনো তেল-কাঁচামরিচ চাইতে তারা যদি বা আসে, সে কখনো যায় না। কোনো ঘরেই কিছু চাইতে যায় না সে। যদি কিছু না-থাকে তার ভাঁড়ারে বরং উপোসী থাকে সে, কিন্তু হাত পাতে না। অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্বামী তার এই কথা বোঝে না। সকলের মতোই কেন সে নয়, এই তর্জনে ঘরের মেঝেতে বসিয়ে কাঁদায় লোকটি তাকে। কেউ তার কথা বোঝে না।
ছাউনির শেষ ঘরটিতে বাস বাড়িওলার বড় মেয়ের। মাধ্যমিক পাশ না-করা এই যুবতীও দুই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। এখন এই বারোঘর এবং তার চারপাশে আরো যেসব ঘর আছে সেইসব ঘরের শিশুকুলের আপা সে। বাল্যশিক্ষা থেকে পাঁচ-ছ ক্লাস অবধি পড়াতে পারে অক্লেশে।
এই শেষ ঘরের যুবতীটির সঙ্গে তার ভাব বেশি। নিজ স্বপ্ন, বারবার সেই স্বপ্নভাঙার, আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার গল্প করে সে বাড়িওলার মেয়েটির সঙ্গে। ‘আমিও ঢুকছিলাম দুই ঘরে বইন’, শেষ ঘরের স্বপ্নহীনা বলে, ‘কিন্তু আর না। চোখে কিছু নাই আর।’ অপলক তাকিয়ে দেখে সে বাড়িওলার মেয়েকে। এখনো তো স্বপ্ন দেখার দিন শেষ নয় তার। তাহলে, সে নিজে তো চেষ্টা থামায়নি। তবে এটিই শেষ, বিশ্বাস তার। এজন্যেই এমন আঁকড়ে ধরা। এজন্যেই ঘরের প্রতি ধূলিকণার জন্যে এমন ভালোবাসা।
তার নিজের যেমন একটি কন্যা প্রথম ঘরের, তার মায়েরও সে তেমনি Ñ প্রথম ঘরেরই। তার মা-ও কয়েকঘরে ওঠাউঠির পর শহরে বড় মহাজনের পরিচর্যা করে, এবং এখন দূর-গ্রামে ভাইয়ের মাটিকোঠার পাশে টিনের একটি ঘর তুলে বাস করে। ওই মহাজনের বদান্যতাতেই। কখনো কন্যাসহ সে আসে মায়ের কাছে, নিজ-ঘর থাকে না যখন। মা-ও যায় তার কাছে যখন ঘর থাকে। মা কী মেয়ে, কেউই চায় না শিশুটিও অমন হোক। তাই এই শহরতলির শেষ ঘরে ওঠা, তাই মেয়েটিকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া। শেষ ঘরের আপা তার মেয়েটিকেও পড়ায়।
একটি খাটে শোয়ারও বড় শখ ছিল তার। নিজ-ঘরে ওঠার মতোই। খাটের বাজুতে মাথা রেখে কাঁদবার জন্যে নয় নিশ্চয়ই, তবুও শখ ছিল। আপার ঘরে ঢুকেই সেদিন বুকের রক্ত ছলকে উঠেছিল তার। সেই খাট। অবিকল। স্বপ্নে দেখা যেন। অনেকক্ষণ ধরে খাটটিকে দেখে সে পরে দাম জিজ্ঞাসা করে।
রাত্রিতে এমন হয়। মেয়েটিকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে শুয়ে থাকে সে। চৌকির ওপরে অন্য যে-মানুষ থাকে সে-ফেরে অনেক রাত্রিতে Ñ তখন সে ঘুমে। আবার লোকটি যদি কখনো সন্ধ্যায় কী সন্ধ্যার পরে ঘরেও থাকে, মধ্যরাত্রিতে তার চিহ্ন পাওয়া যায় না। গভীর নিশীথে ঘুম ভেঙে সে অনেকবার নিজেকে একলা দেখেছে।
সেদিনও তেমনি। কিন্তু সে আর ঘুমে ফেরে না। অপেক্ষা করে। কোনো একসময়ে লোকটি ঘরে ঢুকে শব্দহীন বিছানায় এলে সে কিছু জিজ্ঞাসা করে না। জানে, ননদের ঘরে সময় কাটানোর কথা কখনো বলবে না লোকটি। বুকে চাপ-ধরা কষ্ট আছে তার। দিনরাত্রি সেটি বাড়ে। সব মুছে নিয়ে বলে, ‘আমারে খালু যা দিছিলো সবই দিছি তোমারে, তার বদলে খালি একখান জিনিস দিবা। আপার লাহান একটা খাট কিন্যা দিবা?’
বিস্ময় বোঝা যায় না, উপেক্ষা বোঝা যায়, ‘পাগল নাহি। চুপ থাহো। ঘুম যাও।’ আর কোনো কথা শোনা যায় না। কিন্তু ঘুম আসে না আর। ঘুমন্ত লোকটি ও শিশুটির পাশ থেকে উঠে আসে সে। নিঃশব্দে দরজা খুললে বাইরে দেখে শেষ রাত্রির জ্যোৎস্নায় সব ধুয়ে যাচ্ছে। পায়ে পায়ে হেঁটে বাইরে আসে। আমবাগিচার ছায়া দেখে দূরে। তারপর হাঁটতে থাকে। হঠাৎ খেয়াল হলে বোঝে,এ-ই হচ্ছে নিশিতে পাওয়া। তবুও সামনে যায়। বাগানের শেষে অসমান-জমির ছায়ায়, উঁচু ঢিবির কৃষ্ণ অবয়বে গা মিশিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
পরদিনও ঠিক অমন ঘটে।
একটি আলমারির বড় শখ ছিল তার। কাপড় ঝুলিয়ে রাখার খোপ থাকে যে-আলমারিতে। ঢালাই লোহার মোটা তারে তৈরি নয়। ইস্পাতের তৈরি। আয়না বসানো। শাড়ি ঝোলানো থাকবে। বিভিন্ন খোপে থাকবে নানা মনোহারী জিনিস। একবার বলেওছিল সঙ্গীকে তার ইচ্ছার কথা। লোকটি কানেও তোলেনি।
আলমারিটি প্রথম দেখেছিল সে ফ্যাক্স-ফোনওয়ালীর ঘরে। চাবি দিয়ে দরজা খুললে সাজানো শাড়ি আর তেল-সাবান দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। তারপর ঘরে ফিরে যখন ভাবছে কী করা, তখনই দেখে পাশের ঘরের ভাড়াটে ঠিক অমনি একটি আলমারি কিনে ঘরে তুলে নিচ্ছে। তার দুঘণ্টা পরে দেখে তিন নম্বর ঘরেও ধরাধরি করে তুলছে অমনি একটি। তার দুঘণ্টা পরে দেখে শেষ ঘরের আপাও একটি কিনে নিয়ে এসেছে। বিস্ময়ে হতবুদ্ধি সে। ভাবে, নিশ্চয়ই খুব সস্তায় দিয়ে দিচ্ছে দোকানি।
আমবাগানের ছায়া মাড়িয়ে বাজার পার হয়ে বড় রাস্তায় ফ্যাক্স-ফোনওয়ালীর দোকানে যায়। ‘আপা, আমার খালুরে একটু ধইরা দিবেন।’ আশা, দূরবাসী সহৃদয় প্রতিপালক যদি মেটান তার শখ। কিন্তু তিনবারের চেষ্টা বৃথা হয়। ওপার থেকে কোনো সাড়া মেলে না।
ঘরে ফিরে এসে খোলা বারান্দায় বসে থাকে সে। আর এই বসে থাকার কালেই অসময়ে সন্ধ্যা হয় এবং চাঁদ ওঠে না, কিন্তু তার তরল জ্যোৎস্নার স্রোত প্রবাহিত হতে থাকে।
ওইরকম বসে ভিজতে দেখে কয়েকদিন আগেই তাকে দেখতে আসা মা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে। অনবরত নানা কথা বলতে থাকে। ‘রাইতে বাইর হইয়া যায়, কই যায় জিগাইবার পারস না’, ‘শাহেনশার বেডি, খাডে শুইতে হইব’, ‘একখান সুতাও দিছে না বিয়া হইছে তক’, ‘যে বেডারে নিজের কামাই খাওয়ান লাগে, হ্যারে রাইখ্যা লাভ কী?’ ইত্যাকার নানা প্রলাপ। সে কিছুই কানে নেয় না। সবই জানে। এ-ও জানে এইসব চিন্তার সমাধান কোথায়। সে পথে যাবে না আর। অন্য এক নতুন ঘরে ওঠা আর নয়। তাই খোলা বারান্দায় বৃষ্টিতে বরং ভিজুক সে।
অবশেষে মা তাকে ধরে ঘরে নিয়ে যায়।
যে-তরল স্রোতের প্রবাহ সন্ধ্যায় শুরু হয়েছিল গাছের এক পাতা থেকে অন্য পাতায় পড়ে পড়ে, ঘাসের ডগা ডুবিয়ে, আফ্রিকী মাগুরের ঘরদোরের সীমানা বাড়িয়ে, সেটি পরদিন বিকালের আগেই বারোঘরের উঠানে জলযান চলাচলের পথ করে দেয়। পাঁচঘরের উঠানে কাটা উনুনের চিহ্নও দেখা যায় না। ঘরে তুলে রাখা আগের দিনের হাঁড়ি শূন্য হলে ঘরের মেঝেয় বসে কেবল অপেক্ষা বারোঘরের উঠান ঠিক কখন ঘরের দরজার সঙ্গে সমান হয়ে যাবে। চাই কী ঘরের মধ্যে, চৌকির নিচেও উঠে আসতে পারে। ঘরের চাল বরাবরও উঠতে পারে। চাইলে গাছের কাণ্ড জড়িয়ে ধরে মগডালেও উঠে যেতে পারে।
চৌকাঠ-সমান উঠান থেকে লুঙ্গি কোমরে গুঁজে শূন্য হাতে লোকটি ঘরে ঢোকে প্রায় দুদিন পরে। কোথায় ছিল সে, শূন্য হাঁড়ির কথা কি সে জানে না? পারত না কি বড় রাস্তা থেকে কিছু নিয়ে আসতে? যা ছিল তার, যা পেয়েছিল সে, সব গেছে ওই অকর্মার, বোন-ভাতারীর নিষ্ফল ব্যবসায়। কী কাজে লাগে সে? কোথায় তার খাট, কোথায় তার স্টিলের আলমারি! সবই সে করতে পারত যদি এই লোকের পায়েধরা কান্নায় সেদিন কান না দিত। মা-মেয়ের কোনো কথার জবাব দিতে পারে না লোকটি, লুঙ্গি বদলে, জামা খুলে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। আর তখুনি স্রোত আরো প্রবল হয়। উঠানরা ঘরে উঠে আসতে চায়। উচ্চস্বরের স্রোতও ক্রমে প্রবল হয়।
প্রায় মধ্যরাত্রিতে প্রবাহ বন্ধ হয়। লোকটি তখনো শোয়া। মা-মেয়ে বলে যেখান থেকে পারে কিছু নিয়ে আসুক। নম্রস্বরে অবশ্যই নয়। লোকটি আর পারে না যেন, বিদ্যুদ্বেগে কাঁথা ফেলে উঠে দাঁড়ায়, লাফ দিয়ে চৌকি থেকে নামে যেন। কন্যার চুলের মুঠি চেপে ধরে। আর দরজা টান দিয়ে খুলে উঠানে ছুড়ে ফেলে যেন।
আর তখন ঠিক তখুনি, আকাশ পরিষ্কার হয়, চাঁদ উঠে আসে।
সে উঠে দাঁড়ায়। সাঁতারও দেয় বলা যায়। বাড়ির বাইরের দিকে যেতে থাকে। চারপাশে মেলে দেওয়া ছলছলে রুপোলি চাঁদের বুকে একটি শীর্ণ ছায়া আমবাগানের মুছে যাওয়া পথে অদৃশ্য হয়ে যায়।
অনেক অনেক পরে আকণ্ঠ উদ্বেগ-দুশ্চিন্তায় অস্থির মা তার ঘর থেকে নামে। অমনি সাঁতরে সেও বাড়ির বাইরে যায়। ননদের ঘরে খোঁজে, চৌকির ওপরে উঠবে কিনা ভেবে জেগে বসে থাকা জাগ্রত সব প্রতিবেশীর ঘর খোঁজে। না কোথাও নেই।
মা তখন, আশংকায়, ভয়ে, দুঃখে কাঁদতে থাকে। এই রাত্রিতে কোথায় গেল সে? তখন কী করবে না বুঝতে পেরে, মুখে অব্যক্ত শব্দ তুলে সেও আমবাগান পার হয়ে ইটখোলার দিকে যায় এবং দূরে একটি ছায়া দেখে কালো টিবির মাথায়। কোনোমতে কাছে গেলে দেখে ভেসে থাকা টিবির মাথায় বসে আছে বুকছেঁড়া ধন তার। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। ‘কী করতাছস?’ মেয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। আকাশের চাঁদ তখন নির্মল। তরল তার ঔদার্যে শুভ্রজলের বিস্তার। মৃদু ঢেউয়ের মাথা কাচের দ্যুতির মতো ছলকে ওঠে কখনো। সে বলে, ‘তুই ঘরে যা মা, আমি কিছু করতাম না, এট্টু বইয়া থাহি।’ ভেজা কাপড়ে ভেজা গায়ে যদি অসুখ হয় শুনে সে বলে, ‘কিছু হইতো না। চান্দ দেখস না। চান্দের আলোয় গা শুকাইব, কাপড়ও শুকাইব।’ কিন্তু সে জানে না, চাঁদ কখনো সূর্য নয়।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.