কবিতা
-
জুলেখার প্রলাপ
অন্ধকার, চারিদিকে এত অন্ধকার আমি খুব ভয় পাচ্ছি, ইউসুফ; শুনছো একে একে সব আলো নিভে গেল, আর তুমি পাষণ্ড কোথায় একা সুখ গুনছো? শুনতে পাচ্ছো, হে পাষণ্ড ইউসুফ, জানি সবাই তোর কাছের, বড্ড আদরের; আমিই কেন ঝরাবো দু-চোখের পানি তোর মন, হৃদয় কি শিলা পাথরের? ইউসুফ, ইউসুফ প্রাণাধিক প্রিয় অভাগীর কথা ভুলে থাকো ক্ষতি নেই…
-
চাঁদের টিপ
(বর্ণমালা আ থেকে র) সারা রাত চৌবাচ্চার জলে চাঁদ ধরি। ধরি ধরি আর ধরতে পারি না, ভোর হওয়ার সাথে সাথে কপালের টিপ হয়ে পথে নামে সে নানান রঙে বেগুনি আকাশি হলুদ সবুজ কমলা লাল ও নীল আমি তারে এইভাবে পথে পাই; পথে পথে চাঁদের মতোই আলো করে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে আর নারীর হৃদয়ের মতো ভেঙে…
-
বেজে উঠছে সায়াহ্ন-সংগীত
কালো কফি, তুমি কী মরণ? ধোঁয়াশায় নিভৃতির সংবেদ ক্ষরণ আধো নোনতা হালকা তেতো চিনি ও দুধের বিস্মরণ হালভাঙা নৌকো তুমি পড়ে আছো তটে অবেলায় সখ্য তুমি দিতে পারবে কতটুকু আর? সংশয়ের মেঘ দেখছি ডানা ঝাপটায় ঝড় জল বিদ্যুতের ঝলসানি আহত আক্রোশ হয়ে উঠছে প্রবল, প্রবলতর আমরা ছিন্ন অসহায় দম হয়তো অচিরে ফুরাবে তখন উপায় –…
-
কবিতার জন্য শোকগাথা
আত্মহননের জন্য একটি কবিতা হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে আরণ্যক অগ্নিকুণ্ডলীতে সাক্ষী এই বনভূমি আর তার শোকার্ত প্রকৃতি। হায়! হায়! করে উঠলো সারি সারি বৃক্ষ আর লতাগুল্ম-দোলানো বাতাস। বাঁচানো গেল না সেই অভিমানী কিশোরী কবিতা! কেঁদে উঠলো পশুপাখি বনের বাসিন্দা যত প্রাণী। সীমাহীন সবুজের মর্মমূলে কে জ্বেলেছে ভয়াল আগুন – এই প্রশ্নে নিরুত্তর যখন সভ্যতা তখন কী…
-
যখন শৈশব ডাকে
শৈশবের ডাক আসে আজো লালমোরগের ঝুঁটি ছুঁয়ে আসে ডাক সেই ফেলে আসা ভোর ঘোরের ভিতরে নিয়ে যায় আজো এই পড়ন্ত বেলায়। শীতের শিশির ছুঁয়ে কলাপাতা দোলে মগ্নতার গভীর ভিতরে? কে আমাকে ডেকে নেয় তা হলে শীতের আমন্ত্রণে এমন খরায় পোড়া দুপুরে স্নায়ুতে কেন প্রবল বর্ষণ? ঘুম ভাঙে মধ্যরাতে ডাহুকের করুণ কান্নায়! প্রবল বৃষ্টিতে ভেসে যায়…
-
নারী ও সংগীত
বেহাগে প্রিয়তমা শুদ্ধউত্তম, দিয়েছে শ্রবণে সফল বিস্তৃতি। ভাবছি নিষ্কৃতি, কিছুতে দোষ নেই। নারী ও সংগীত যমজ সহোদরা, হঠাৎ দ্বিধারী, এবং দূরতিথি। গ্রীবায় বিব্রত হেলানো তানপুরা। কাহারবা হতে পারে মুহূর্তেই, অথবা গায়নে স্পর্শী ভৈরবী। মৌনরাত্রির ক্লান্ত দুঃখ বাজলো কেদারায়। পলাশ হাতে নিয়ে মেজাজে দাদরা, পাথর পথে কবি সমুখে দেখছে পৃথিবী কাঁদছে, ভিতরে আমরা। যখন ডাক দিই…
-
মহাকাল দেয় যারে ডাক
সব পাতা ঝরে গিয়ে পাখি হয়, একদিন পাখি হয়ে যায় বৈরাগ্য ছড়িয়ে এরা মাটিতেই সারাক্ষণ করে আর্তনাদ তোমার বক্ষেই যদি দিলে ঠাঁই – জীবনের দুরন্ত আস্বাদ নিজেকে হারায়ে তবে খুঁজে ফিরি নিশিদিন তোমার ছায়ায়। দু-চারটে পাতা থাকে রাজহংসের মতো বড় অহংকারী কৈলাস ছাড়িয়ে এরা উড়ে যায় উত্তরে কেবলই সুদূরে ঝরে যায় রৌদ্ররং এইসব পাখির পালকে…
-
স্বপ্নভুক পাখিরা
উঠোনে ছড়িয়ে রেখেছি স্বপ্নের বীজধান, পাখি-মা কুড়িয়ে নিল অভুক্ত ছানার ক্ষুণ্নিবৃত্তির জন্য দূর থেকে দেখি স্বপ্ন খেয়ে বেঁচে আছে পাখিশিশু আমার স্বপ্নরা এখন পাখির পেটে একদিন বৃষ্টি কুড়োতে গিয়ে তুলে এনেছিলাম কিছু শিশিরবিন্দু জমিয়ে রেখেছি চোখের পাত্রে … সেদিন আমাকে বলেনি কেউ আকাশের কান্নার নাম শিশির হেমন্ত-বিরহে অবিরাম ঝরছে ঘুমহীন রাতে পাখির পেট থেকে…
-
দিবালোকে মাথা মুড়ে
দিবালোকে মাথা মুড়ে ঘোল ঢালাতেও যাদের হয় না তিক্ততার হাতেখড়ি তাদেরকে লাখো বোলতা-দৃষ্টির সম্মুখে পথে ফেলে দু-চার ঘা উপদেশ দিলে তারা কি ফিরে তাকায়, তোলে তা সযতনে কানে? গায়েই মাখে না; হয় না কিঞ্চিৎ রক্তক্ষরণও! চুনেই যেখানে মুখ পুড়তে মাটি খায়, লোটা নিতে পিছন দরজা খোঁজে সেখানে দইয়ের প্রসঙ্গ টানাটা একেবারে পানসে, পড়ে না যুক্তির…
-
ফেরা
আমি যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা হাতির ঝিল নিঃসঙ্গতায় ডুবেছিল ঝাউগাছের হৃদয় বিদীর্ণ করে। আমার পায়ের ওপর খলনায়কের উড়ন্ত ঘর্মাক্ত মুখের ছায়া বিবর্ণ উল্লাসে আগুনের হল্কার মতো ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে অগ্রহায়ণের আকাশে সাদা মেঘের ঢেউ রহস্যময় বিস্তীর্ণ নক্ষত্র হয়ে গাড়ির জানালায় হরিণীর মতো সুগন্ধি বিহ্বল ছড়িয়ে দিচ্ছিল। যাকে ভালোবেসে গভীর সমুদ্র হরণ দূরত্ব তাকে…
-
শিকড়ের ডানা
মেধাবী অক্ষরগুলো পায়ে পায়ে হাঁটে বহুদূর – পাকদণ্ডী বেয়ে ওঠে পাহাড়চূড়ায়। ওখানে কি হ্রদ আছে? সুবাতাস? জল? শ্মশানের কাছাকাছি ফিরে আসি। সকাল ফুরায়। দুপুরে ঘুঘুর ডাকে বেহাগী বসন্ত সুর তোলে, কাঁপে শিমলতা হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, সব ভুলে যাবো তবু থাকে কিছু চিহ্ন, কিছু ব্যাকুলতা। বসন্ত-পেরোনো মাঠে বটগাছ বিহ্বল বিনিদ্র জেগে থাকে – টবের শহরে থমকে…
-
জেগে উঠি পূর্ণপ্রাণে
তোমার স্মৃতির ঘাটে বসে আছে আজ কোন মাঝি? তাকে চেনো? পালতোলা নৌকোর গলুই যদি খুঁজে পায় মায়াবী সবুজ গ্রাম, তবে মুহূর্তেই উবে যায় ভুলবার্তা, ছলছুতো! ঘন অন্ধকারে রুপালি নদীর ঢেউ কারা খোঁজে? জ্যোৎস্নার রোদ্দুরে ভেসে যাক ধোঁয়াওঠা প্রত্নগ্রাম, পাহাড়-প্রকৃতি আর আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ! আমি তো পেয়েছি খুঁজে সুন্দরের গ্রীবা আর প্রীতিগন্ধা কূটজ কুহক! এসেছে হেমন্তকাল,…
