February
-

ঠাকুরবাড়ির মহাতীর্থে কবি জসীম উদ্দীন
কবির আহবান : শিল্পীর আতিথ্য – তুমি শান্তিনিকেতনে এসে থাকো। – আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ. পড়ছি। – শান্তিনিকেতন থেকে প্রাইভেটে এম. এ. পরীক্ষা দিতে পারবে। – ভালো করে ভেবে আপনাকে জানাবো। এই কথোপকথনের সময় ছিল সম্ভবত ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ। তখন কবির বয়স প্রায় ৭০ বছর। বৃদ্ধ কবির আন্তরিক আহবান এলেও ভরসা করতে পারেননি নবীন…
-

কলকাতার বাঙাল বৃন্দাবন মল্লিক লেন
কলকাতা শহরে এমন মানুষ আছে, যারা একসময়ে পূর্ববঙ্গবাসী বা কোনো পূর্ববঙ্গবাসীর উত্তরপুরুষ হলেও কলকাতায় এসেছে, এবং থেকেছে নানা কারণে – অনেক আগে থেকে আজ পর্যন্ত – কখনো পড়াশোনার জন্য, কখনো চাকরিবাকরির সন্ধানে, কিংবা পরবর্তীকালে দেশভাগে বিপর্যস্ত হয়ে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তো দেশত্যাগের আরেক পালা। এরাই বস্ত্তত কলকাতার বাঙাল। কলকাতায় থাকলেও পূর্ববঙ্গের অনেক অভ্যাস ও স্বভাব…
-

দৃশ্যাবলি : অন্নদাশঙ্কর
জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ১৯৪৮ সালে পড়ার সময় ক্লাসে একটি ছেলে আসে, আমার সহপাঠী হয়, সেন্ট্রাল ব্যাংকের ম্যানেজারের ছেলে। তার জন্মদিনে আমাকে নেমন্তন্ন করে। সেদিন তার বোনের সঙ্গেও আলাপ হয়। ভাইবোনে মিলে আমার মাথা খারাপ করে দেয় ছেলেমেয়ের শরীর নিয়ে নানা কথা বলে। তারা আমার বয়ঃসন্ধির অভিশাপ। কোনোমতে নবম শ্রেণিতে উঠি। নবম শ্রেণিতে সহপাঠী…
-

ডানা
ঝাঁট দিতে দিতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসতে থাকে রোশনারা। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপের কোনায় জমে থাকা ধুলোবালি, ছেঁড়া কাগজের টুকরো, চকলেটের দোমড়ানো মোড়ক, পাউরুটির পোড়া চামড়া, ফুরিয়ে যাওয়া পেনসিলের গোড়া এমন করে জড়ো করতে থাকে দেখলে মনে হয় কাজটার মধ্যে কিছু একটা খুঁজে বেড়ায় মেয়েটা। কোথায় যেন বাড়তি একটা উৎসাহ ওকে এই কাজে নিবিড় করে,…
-

দাগ
এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল তাদের। পাঁচতারা হোটেলের দীর্ঘ ও প্রশস্ত করিডোর, একপাশে সারিবাঁধা রুম, অন্যপাশটা খোলা। করিডোর না বলে ব্যালকনি বলাই ভালো। সেখানে রেলিংয়ে দুই হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল সে। দূরে তাকিয়ে ছিল, অনেক দূরে, কী ভাবছিল জানে না কেউই। এই করিডোর ধরেই সিঁড়িতে যেতে হয়, কিংবা লিফটে। শায়লাও যাচ্ছিল। ডিনারের সময় হয়ে…
-

চিল
শিউলি গাছের পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখদুটো হঠাৎই বড়োসড়ো এক লাফ মারলো আকাশে। বহুকাল বাদে আজ ঘটনাটা পুনরায় ঘটলো। তুলো-পেঁজা সাদা সাদা মেঘের বুটি দেওয়া ঝকঝকে নীল আকাশ। তিনটে চিল ডানা কাত করে ঘুরছিল। যেন চাঁদোয়ার তলায় বড় পোকারা ওড়ে। মাঝে মাঝেই নীল রঙের মধ্যে চোখ ধাঁধিয়ে হারিয়ে ফেলছিলাম ওদের দু-একটাকে। আবার খুঁজে পাচ্ছিলাম খানিকবাদে।…
-

এই গৃহ এই সন্ন্যাস
রাত গভীর। নিজ্ঝুম। চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন তিনি। তিমিরানন্দ। মহারাজ তিনি। অলকানন্দা মঠের। ভক্তদের কাছে তিনি তিমিরানন্দ পুরী। পূজনীয়। তাঁর সংসারী নাম দেবদুলাল রায়। ভেক নেওয়ার পর তাঁর নাম পালটে যায়। রাত্রির দ্বিতীয় থাম শেষ হতে চলল। তিমিরানন্দ এখনো নিদ্রাবিযুক্ত। এপাশ-ওপাশ করছেন। মনটা কি আজ বিচলিত তাঁর? গুরুদেব বলেছিলেন – মনের চঞ্চলতা দূর করতে চাইলে…
-

এই পথে আলো জ্বেলে
শেখ মুজিব আবদুল মোমিনকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন! আহা, কতদিন পর, ১৭ মাস পর, তাঁর নিঃসঙ্গতা ঘুচল! কারাগারে তিনি এখন একজন সঙ্গী পাবেন, যার সঙ্গে তিনি সুখ-দুঃখের কথা বলতে পারবেন। তার কক্ষে আরেকজনকে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমিন। রাতের বেলা যখন বাইরে থেকে দরজায় তালা পড়ে, একা থাকলে তখন পৃথিবীর সমস্ত নির্জনতা এসে…
-

একটি নক্ষত্র আসে
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে আমাদের নোনাজলহাওয়াময় ছোট, তুচ্ছ, মলিন শহরে স্মরণযোগ্য এমন এক আলোড়ন এসেছিল আজো যার গায়ে ধুলো-ময়লা জমেনি। এই ঘটনা নিশ্চিত কালের প্রহার সহে বহু বহু বছর বেঁচে থাকবে। আমরা তখন যারা কিশোর ছিলাম, এখন বয়সী, তাঁদের স্মৃতির প্রতি আঁশে আঁশে ওই অতীত বৃত্তান্তকাল পাড়ি দিয়েও সজীব। আমি বারবার চেষ্টা করেও তেজোপূর্ণ জাগরণের…
-

মেহেরজান
চোখের আড়াল হতে না হতে পদ্ম এমন বদলে যাবে, পদ্ম ওরফে পার্লির মা মেহেরজান যদি আগে আন্দাজ করতে পারত! পরের ঘটনা আগে জানার উপায় নেই; তবু ভাবে যদি জানত, অন্তত একটা ইশারাও মিলত, তাহলে কি দিনের পর দিন চুলমুঠি টেনে মাটিতে আছড়ে মুগুরছেঁচা দিত! কিল, লাথি-উষ্টা, ডালঘুটনির বাড়ি। লম্বা, ঘন কোঁকড়া চুল – ধরার সুবিধা…
-

বাবার কিছু ঋণ ছিল
৫ অক্টোবর ২০১৭ সকালবেলা স্যার, একজন লোক আসছে। কোত্থেকে? বাইন্নানগর। ইয়ে মানে বানিয়ানগর। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকা। চোখ তুলে জিন্নাহর দিকে তাকালাম। কী নাম? রশিদুল। বানিয়ানগর থেকে এসেছে শুনেই বুঝেছিলাম, রশিদুলই হবে। আমার কিশোরবেলার বন্ধু। বহু বছর তার সঙ্গে দেখা নেই, যোগাযোগ নেই। অথচ একটা সময়ে আমরা দুজন দুজনার জন্য পাগল ছিলাম। দিনের বেশিরভাগ সময়…
-

ভোররাতে শুরু হয় অপারেশন
ভোররাতে শুরু হয় অপারেশন। দুটো বন্দুক আর একটা মাত্র এলএমজি সম্বল করে এতবড় অপারেশন কল্পনাও করা যায় না। অবশ্য তাদের অন্যদের হাতে ছিল গ্রেনেড। এই গ্রেনেডও ঠিকমতো ছুড়তে পারলে খুব শক্তিশালী। সীমান্ত থেকেই তাদের ক্যাপ্টেন বলে দিয়েছিলেন, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। কাঁকড়ভরা চালের ভাত খেয়ে এতদিন বেঁচে আছো না? এই খানা খেয়েই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছো না?…
