(জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ শিশুচরিত্র সম্পর্কে লিখেছিলেন : শারদ্বত ও শার্ঙ্গরবের বয়স যখন দশ-বারো ছিল তখন তাঁহারা কেবলই বেদমন্ত্র উচ্চারণ করিয়া অগ্নিতে আহূতিদান করিয়াই দিন কাটাইয়াছেন, এ-কথা যদি কোনো পুরাণ লেখে তবে তাহা আগাগোড়াই আমরা বিশ^াস করিতে বাধ্য নই – কারণ, শিশুচরিত্র নামক পুরাণটি সকল পুরাণের অপেক্ষা পুরাতন।)

সিনথির দ্বিতীয় জন্মদিনের আগের দিন সকালে তার মা রাবেয়া দেশের একটা প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘কীভাবে সন্তানকে পালন করবেন’ প্রতিবেদনটি পড়ে এবং কেটে রাখে।

যখনই সিনথি তার নিজের ইচ্ছে বা পছন্দমাফিক, তার পছন্দের রূপ, গ্রাহ্যতা, অবহেলা দ্রুত বদলায়, আচরণ করতে থাকে তখন মা-বাবা, নানা-নানি, মামা-খালা কারো কথা, অনুরোধ শোনে না, যেন সে একজন বধির, চোখের দৃষ্টি তার প্রিয় কোনো পুতুলের দিকে, টিভিতে, বা হাতের স্মার্টফোনে। তখন রাবেয়া তার ব্যক্তিগত ড্রয়ার থেকে প্রতিবেদনটা নিয়ে সিনথির আড়ালে বারবার পড়ে। পঠিত বিষয়কে বিচার-বিশ্লেষণ করেও সুখী হওয়ার মতো সমাধান না পেয়ে, সমাধান প্রায়সময়ই এক প্রশ্নবিদ্ধ তর্ক, নিজের ওপর রেগে যায়। ‘সিনথির কাছে আমি কি হেরে যাচ্ছি?’ নিজের প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে হাতের কাছে যা পায় আছড়ে ভাঙে। রাবেয়া যখন কাচের গ্লাস বা কমলা বা চায়ের কাপ আছাড় মারার জন্যে হাতে নেয় এবং তাকায় সিনথির দিকে, চোখে রাগ, সিনথি নির্বিকার চোখে একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে অন্য ঘরে চলে যায়। যার প্রতি রাগ দেখানো হচ্ছে সে যদি না দেখে, যে রাগ দেখায় তার রাগ আরো বেড়ে যায়। চব্বিশ বছর বয়সী রাবেয়া ব্যর্থ হয়ে কাঁদেও। ফর্সা মুখে রক্ত জমে। মনোবিদের পরামর্শ মনে পড়ে, ‘শিশুকে মারবেন না।’

সিনথিকে ঠিকভাবে মানুষ করার জন্যে, আদর্শ মা-বাবার আচরণ কেমন হওয়া উচিত, শিশুমনোবিদরা সবসময় যেসব নির্দেশনা দিয়ে থাকেন, যেমন : শিশুকে প্রশ্ন করতে দেওয়া, প্রশ্নের উত্তর বুঝিয়ে বলা, তার ওপর কর্তৃত্ব না করা, কীভাবে বিনয়ী হতে হবে, হতে হবে আত্মবিশ^াসী ও পরিশ্রমী, নেগেটিভ নয় পজিটিভ মনোভাব যেন শিশুর মনে গড়ে ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখা, অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়া এবং ছোট-বড় সবার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ কীভাবে তৈরি হয় ইত্যাদি কাজ নতুন ফ্যাশনের সালোয়ার-কামিজ প্রয়োজন না থাকলেও কিনে ক্যাবিনেট ভরে রাখতে পছন্দ করা রাবেয়া সচেতনভাবে করার পরও সিনথি নিজের খেয়াল বা বুদ্ধি বা চালাকি যথাসময়ে কাজে লাগিয়ে তার লক্ষ্য হাসিল করার জন্যে আচরণ করতেই থাকে। আচরণে চরণ নিজের পথে হাঁটতেই পারে।

শিশুমনোবিদ বলেছিলেন, যে-শিশুরা বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে তারা খুব মেধাবী হয়। সিনথি কোন সূত্র থেকে উদ্ভট কথা বানায় বা কাজ করে তার হিসাব-শেকড় রাবেয়া ও কাদির খুঁজে পায় না।

দৈনিকে পড়া সন্তান পালন করার নীতিকৌশল বারবার প্রয়োগ করেও ফ্যাশন ডিজাইনে লেখাপড়া করা রাবেয়া ব্যর্থ হচ্ছে। স্বামী কাদিরকে নিয়ে শিশুমনোবিদের সঙ্গে সিনথির আচার-আচরণ নিয়ে তিনবার, যাকে বলে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও করেছে রাবেয়া। আলোচনার মধ্যে একটা জরুরি বিষয় ছিল, সিনথি খেতে চায় না। মনোবিদ সিনথির সঙ্গে অনেক কথা বলার পর তার মা-বাপকে বলেছে : ওর মেধা ভালো, কোনো সমস্যা নেই। আপনারা যে বলছেন সিনথি কখনো কখনো মিথ্যে বলে, সব শিশু নয়, কোনো কোনো শিশু মিথ্যে বলে বড়দের বুদ্ধিকে পরীক্ষা করে, বুদ্ধির খেলায় হারিয়ে দিতে চায়, এরকম শিশুরা খুব মেধাবী হয়। মনে রাখবেন, শিশুরা প্রায় সবসময় রূপকথার জগতে থাকলেও বাস্তবতা ও রূপকথার জয়-পরাজয় ভালো বোঝে। ওর খিদে লাগলে ও খাবার চেয়ে খাবে। খিদে লাগতে দেবেন।

দুই

‘হাঁ করো, করো, হাঁ করো।’

‘মা মনি খাও।’

‘প্লিজ সিনথি।’

‘ভাইয়া, ভাইয়া খাও, হাঁ করো।’

‘মম কিন্তু রেগে যাচ্ছে। এই ককরোচ আন।’

রাবেয়া ‘ককরোচ আন’ বলতেই সিনথি ভয়ে ‘না, না’ বলে কেঁদে দেয়।  গোলাকার, উজ্জ্বল শ্যামলা রঙের মুখের মধ্যে ছোট দুটি চোখ ঘরের চারদিকে ঘুরতে থাকে। ককরোচ কোনদিক থেকে আসছে?  

কেঁদে ওঠার সময় অনেকের মুখ, অনেকের মধ্যে সিনথিও আছে, হাঁ হয়ে যায়। আর হাঁ হতেই সিনথির মুখের মধ্যে রাবেয়া দ্রুত ঢুকিয়ে দেয় ফ্রাইড রাইস। সাফল্যে হাসে। সিনথির চোখের পানি ঠোঁট পর্যন্ত আসার আগেই রাবেয়া মেয়ের চোয়াল মেরুন রঙের নেইল পালিশ লাগানো বড় নখের তর্জনী দিয়ে মুছে দিতে দিতে বলে, ‘মাই গুড গার্ল।’ অশ্রু মুছে দেওয়ার সময় খেয়াল রাখে, ধারালো নখ যেন মেয়ের চোয়ালে না লাগে।

সিনথি খাবার চিবায় না। দুই মাঢ়িতে খিল দেয়। ওপরের নরম ঠোঁটে নিচের ঠোঁট আটকানো। পাশ থেকে পুতুল নিয়ে জড়িয়ে ধরে। পুতুলের বুকে আশ্রয় খোঁজে। ভেজা চোখ টিভিতে। চলছে কার্টুন। জেরির পেছনে টম দৌড়াচ্ছে।

‘বিসমিল্লাহ কও, গিইলা ফ্যালো, নানু গিইলা ফ্যালো।’

‘খাইয়া ফ্যালো, টেস্ট হইছে তো, খাইয়া ফ্যালো।’

‘মা দেখছো, চিবায় না, একটা নটি, টিভি অফ করে দাও, ফোনটা কিন্তু নিয়ে নেব’, বলে রাবেয়া মিথ্যে হাত বাড়ায়। সিনথি ফোনটা পিঠের দিকে নেয়। মুঠি শক্ত।

‘চিবাও, তুমি কত ভালো গার্ল, চিবাও।’

‘কোক খাবা?’

‘গিইলা ফ্যাল, চকবার দেব, গিইলা ফ্যাল।’

চকবারের কথা শুনে সিনথি মুখের খাবার একবার চিবায়।

রাবেয়া বলে, ‘গুড গার্ল।’

‘শোন তোর মিয়ে কিন্তু খুব পাকা, খুব চালাক।’ সিনথির খালা নাফিজা বললো।

রাবেয়া ফ্রাইড রাইস চামচে তুললো, কমালো, আবার একটু নিয়ে বললো, ‘তুই ঠিক বলছিস।’

যে-মামা বলেছিল ‘চকবার দেব’ তার দিকে সিনথি তাকায়। চোখে সন্দেহ। আগেও খাওয়ানোর সময় মা, খালা, মামা, নানা তাকে বলেছে, চকবার, ক্যান্ডি, চিপস, কোক, চকলেট এনে দেবে। দিয়েছে কিন্তু অনেকবার চাওয়ার পর, কান্নাকাটির পর। কাঁদতে কাঁদতে প্লে-গ্রুপের খেলতে খেলতে পড়া শেখা সিনথি মামা, খালা, নানা ও মাকে বলেছে, ‘লায়ার, লায়ার।’

সিনথি খাবার টেবিলের চেয়ারে বসে খায় না। বসে কার্পেটের ওপর। তার খাবার সময় কয়েকটি জরুরি আয়োজন সাজাতে হয়। টিভিতে চলতে হবে কার্টুন। তিন পাশে থাকবে তার প্রিয় তিন-চারটে পুতুল এবং কখনো কখনো বাজাতে হবে ইংরেজি রাইম। মুখের মধ্যে, যখন সে খায়, খাবার না চিবিয়ে টিভি দেখতে থাকে। অথবা হাতের স্মার্টফোনে চলা শিশুদের কোনো খেলা। ডান বা বাম হাতে সে মোচড় দিতে থাকে কুকুর পুতুলের লেজ বা কোনো রাজকন্যা পুতুলের মাথা, পা বা পেটে হাত বোলায় এবং কখনো কখনো সে কুকুর বা রাজকন্যা পুতুলের বগলে কাতুকুতু দেয়, কেন কুকুর ডাকে না বা রাজকন্যা  হাসে না, মাকে প্রশ্ন করে।

সিনথির বয়স এখন সাড়ে তিন। এই বয়সে যতটা উচ্চতা, স্বাস্থ্য এবং ওজন হওয়ার কথা, হয়নি। রাবেয়া চিন্তিত। শিশুদের পুষ্টি-বিশেষজ্ঞ ও ডাক্তারের সঙ্গে তিন-চারবার সিটিং দিয়েছে। তাদের পরামর্শমতো যা যা করার, করছে। বদলাচ্ছে রেসিপি। ‘মেয়ে কি বামুন হয়ে যাবে?’ কাদির ও রাবেয়া নিজেদের মধ্যে অনেক কথা বলেছে। হয়েছে হতাশ।  

সবসময় নয়, সিনথিকে খাওয়ানোর সময়, কখনো কখনো তার মাকে রূপকথা, ভূতের গল্প অথবা বনের রাজা সিংহ যখন একদিন সকালে ঘুমাচ্ছিল তার সঙ্গে একটা বানর কীভাবে সিংহের নাকের মধ্যে লেজ ঢুকিয়ে সুড়সুড়ি দিয়েছিল এবং সিংহ জেগে উঠতেই বানর লাফ দিয়ে উঠে পড়েছিল গাছের ওপর – সে-গল্প শোনাতে হয়। 

একদিন সিনথি কিছুতেই খাচ্ছিল না, তখন তার বয়স আড়াই বছর, রাবেয়া রূপকথার শুরুতে বলে : এক দেশে ছিল এক রাজকন্যা। তার নাম সিনথি। বনের ভেতর থেকে রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে …’ পরের কথা শেষ না হতেই, মাকে থামিয়ে মেয়ে বলে, আমার নাম এখন থেকে সিনথি। সিনথির আগের নাম ছিল পিংকি।

রাবেয়া হেসে হেসে, মেয়ের বুদ্ধির প্রশংসা করতে করতে আত্মীয় ও বন্ধুদের জানায়, তার মেয়ে রূপকথা শোনার সময় রাজকন্যার নাম বলতেই নিজের ডাকনাম বদলে দিয়েছে। ও এখন সিনথি। পিংকি বলে ডাকলে উত্তর দেয় না।

সিনথিকে খাওয়ানোর সময়, যদি সে একটু খায়, তখন তার আর একটি প্রিয় খেলা রাবেয়াকে মেয়ের সঙ্গে খেলতে হয়। খাবার মুখে নেওয়া, চিবানো ইত্যাদির প্রদর্শন সেলফিতে ধারণ করতে হবে। মুখের মধ্যে খাবার। ছোট মুখের দুই চোয়াল ফোলা। সিনথি সেলফিটা দ্যাখে। পছন্দ হলে হাসবে। 

তিন

রাবেয়া ও কাদিরের সঙ্গে উত্তরা থেকে নানাবাড়ি বনশ্রীতে ঈদ করতে এসেছে সিনথি। থাকবে এক সপ্তাহ। নানার বাড়িতে যখনই আসে, রাবেয়া লক্ষ্য করেছে, সিনথির জিদ ও বায়না বেড়ে যায়।

নানা, মামা ও খালার সঙ্গে সে বাইরে যায় এবং যখনই ফেরে, তার হাতে থাকে হয় আইসক্রিম বা ক্যান্ডি বা ব্যাটারিচালিত চার চাকার খেলনা গাড়ি। রাবেয়া ওদের ওপর রাগও করেছে। শপিংমলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় যদি একটা শিশু চিৎকার করে বলে, আমাকে গাড়ি দাও, আমাকে কোক দাও তখন তার সঙ্গী কী করবে? সিনথির চালাকি প্রায় সবসময় জিতে যায়।  

সিনথির বাবা কাদির আহমেদ ব্যবসায়ী। বয়স একত্রিশ। শ্যামলা রঙের পুরুষ। মাথায় চুল কম।  প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে না। শুক্রবারে দামি সিল্কের পাঞ্জাবি পরে, বগলে ও বুকে আতর মেখে, জায়নামাজ ডান হাতের ওপর ভাঁজ করে মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ পড়ে। রাবেয়া অন্তঃসত্ত্বা হলে বড় বড় আঙুলের দুই হাত তুলে মোনাজাতের সময় কাদির আল্লাহকে বলেছিল, ‘হে আল্লাহ আমার প্রথম বাচ্চা যেন মেয়ে হয়।’ আল্লাহ তার কথা শুনেছেন।

উত্তরা থেকে বনশ্রীতে আসার সময় সিনথির স্যুটকেসের ওজন ছিল দশ কেজির কাছাকাছি। স্যুটকেসে ছিল পাঁচ-ছয়টা পুতুল, পরার কাপড় এবং কিন্ডারগার্টেনের প্লে-গ্রুপের স্টুডেন্টের ইংলিশ মিডিয়ামের অনেকরকম ছবিওয়ালা বই এবং ছবি আঁকার রং, তুলি ও কাগজ। পুতুলগুলির মধ্যে একটা সাদা ও ধূসর রঙের কুকুর এবং গোলাপি রঙের একটি রাজকন্যাও ছিল। পুতুলগুলি বিশেষ ধরনের। চাবি দিলে কুকুরটা ডাকে। ঘেউ ঘেউ শুনে সিনথি কপট ঢংয়ে ভয় পায়। রাজকন্যার বগলে কাতুকুতু দিলে রাজকন্যা হাসে, সিনথিও। ঠোঁটে আঙুল লাগলে রাজকন্যা বলে : ‘ডিয়ার, হাউ আর ইউ।’ সিনথি রাজকন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। দৃশ্য দেখে তার আশপাশে যারা থাকে তারাও হাসে। রাবেয়া সেলফি তোলে। দেশ-বিদেশে থাকা আত্মীয় ও বন্ধুদের কাছে ছবি পাঠায় এবং কত কমেন্ট আর লাভ-সাইন এলো তা দেখে ও দেখায় মেয়েকে।

কাদির দুবাই থেকে ওইসব পুতুল কিনেছিল। 

একদিন সিনথির মুড খুব খারাপ ছিল, ওরা বেড়াতে এসেছিল বনশ্রীতে। তার মুড কখন কী কারণে খারাপ হয় তার কারণ মা-বাবা বুঝতেই পারে না। সিনথিকে কখনো ধমক দেওয়া যাবে না, গায়ে হাত তোলা যাবে না, শাসন করার আগে তাকে কী করা ভালো এবং কী করা ভালো নয় তা বারবার বোঝাতে হবে – তার বাপের বলা ওইসব নির্দেশনামা সিনথির মা, নানি, মামা, নানা ও খালা নাফিজা জানে। শিশুমনোবিদ সিনথির মা-বাপকে বলেছেন, শিশুদের লজিক্যাল সেন্স খুব প্রখর। কোনো বিষয়কে যতক্ষণ লজিক্যালি সলভ করতে না পারছে ততক্ষণ সে প্রশ্ন করবে এবং বড়রা যখন বলে, তুমি বুঝবে না, এখন থামো, শিশু তখন হিসাব করে, এই বড় মানুষটা আসলে জানে না, বোকা।

মেয়ের সব চাহিদা পূরণ করে কাদির। রাবেয়া একদিন কাদিরকে বলেছিল, তুমি ভুল করছো, ‘মেয়েকে এভাবে বড় করলে মেয়ে কখনো বুঝবে না অভাব কাকে বলে।’ কাদির হেসেছিল। ‘আমার মেয়েকে আমি রাজকন্যা করবো। আমার এত টাকা খাবে কে? সামনে যদি সবকিছু বেশি বেশি থাকে তাহলে কোথাও কোনোকিছু দেখে ওর লোভ হবে না।’ ‘অপব্যয় হচ্ছে’ – রাবেয়া বলেনি। সে জানে, কাদিরের কথাটি সিদ্ধান্ত। 

এক রাতে, তখন বারোটা বেজে গেছে, সিনথি ঘুমায়নি, সে জিদ ধরলো, আইসক্রিম খাবে। কাদির গাড়িতে মেয়েকে নিয়ে এক পাঁচতারা হোটেলে এসে আইসক্রিম খাওয়ায়। রাবেয়া সঙ্গে আসেনি। কাদিরকে বলেছিল কাজটি না করতে।  

সিনথি আলাদা ঘরে শোবার আগে মা-বাবার সঙ্গেই ঘুমাতো। তখন তার বয়স আড়াই বছর। অনেক কথা বলে। প্রশ্ন করে।

একরাতে সিনথির ঘুম ভেঙে গেলে দেখে পাশে মা-বাবা নেই। ভয়ে ভয়ে খাটের পাশে গিয়ে মশারি তুলে তাকায়। বাথরুম থেকে আসছে পানি পড়ার শব্দ। কথার শব্দ। দরজা লাগানো নয়। পাল্লার ফাঁক দিয়ে আলো এসে ঘরে পড়েছে। সিনথি খাট থেকে নামে। বাথরুমের দরজা ধাক্কা দেয়। মা-বাবা নগ্ন। হাসছে। ক্যান্ডেল লাইট সাওয়ারে দুজন ব্যস্ত। সিনথি প্রশ্ন করে, ‘কী করছো?’ দৈনিক কাগজের বিশ্লেষণে পড়া শিশুর প্রশ্নের উত্তর ওই রাতে রাবেয়া দিতে পারেনি। 

রাবেয়া ও কাদির সকালে সিদ্ধান্ত নেয়, সিনথিকে আলাদা ঘরে রাখতে হবে। ফরিদপুর থেকে বারো-তেরো বছর বয়সের ডালিয়াকে আনা হলো। সে সিনথিকে শুধু দেখাশোনা করবে, সঙ্গে খেলবে এবং একই ঘরে দুজন দুটি খাটে থাকবে।

সিনথির ঘরের তিন দেয়ালেই তিনরকম ও বহু রঙের, শিশুর মনকে উৎফুল্ল রাখে, আনন্দ দেয় এমন অনেক ছবির ওয়ালপেপার লাগানো হলো। সিনথি পশ্চিমের দেয়ালে লাগানো উইজার্ড অব ওজের ডরোথির সামনে গিয়ে বলেছিল, ওর নাম সিনথি। ডরোথি রাস্তায় দৌড়াচ্ছে। দুই পাশে বিভিন্ন জাতের ফুল দুলছে বাতাসে। ডরোথির সঙ্গে ভালুক, হরিণ, প্রজাপতি। মাথার ওপর নীল আকাশ।

উত্তরের দেয়ালে রাত্রির আকাশে চাঁদের পাশে একদল উড়ন্ত পরী। দক্ষিণের দেয়ালে সিনথির তিনটি বিভিন্ন মাপের ছবি। একটা মা-বাবার সঙ্গে সেন্ট মার্টিনে সমুদ্রের তীরে। ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে সিনথির পায়ের ওপর। অন্য দুটোর একটা ব্যাংককে জ্যান্ত বাঘের বাচ্চার সঙ্গে। সিনথি বাঘকে ফিডার খাওয়াচ্ছে এবং অন্যটা রাঙামাটিতে, নৌকায়।

বিছানাটা মাঝারি আকারের। দেয়াল ঘেঁষে শুয়ে আছে, বসে আছে এবং দাঁড়িয়ে ও ঝুঁকে আছে অনেকরকম পুতুল। ঘর সাজানোর তিনদিন পর সিনথি তার ঘরে ডালিয়ার সঙ্গে থাকতে রাজি হয়। শর্ত দেয় : প্রতিরাতে মা তাকে ঘুম পাড়িয়ে যাবে।

ডালিয়াকে বলা হয়েছে, সিনথির মন খারাপ হলেই যেন রাবেয়াকে সে জানায়। ‘সিনথির মন খারাপ।’ ডালিয়া বললো, সিনথি রাজকন্যা পুতুলকে থাপ্পড় মারার পরও কেন রাজকন্যা কাঁদলো না, সিনথি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল। তারপর থেকেই সিনথি চুপ করে আছে।

কাদির দুবাইয়ের বড় মার্কেট থেকে রাজকন্যা পুতুল কিনে আনে, মুখে থাপ্পড় মারলে যেন শব্দ করে কাঁদে। সিনথির রাজকন্যা পুতুল দুটো। একটা হাসে, একটা কাঁদে।

চার

সন্ধ্যা। সিনথির চোখ টিভিতে। চলছে কার্টুন মটুপাতলু। মটু পাতলুর পেছনে দৌড়াচ্ছে। তার মোটা শরীর ক্লান্ত। চোখে রাগ। পাতলু পেছনে তাকায়। শরীরের বিচিত্র ভঙ্গি দেখায়। মটু হাঁপাচ্ছে। সিনথি হাসে।

সিনথির হাসি দেখে খালা নাফিজা বললো, ‘আপা তোর মেয়ে এখন খাবে। মুড ভালো মনে হচ্ছে।’ 

রাবেয়া জানে, খাবার সামনে আনলেই মেয়ের মুড বদলে যেতে পারে। দাঁতে দাঁত কামড়ে বসে থাকবে। কারো কোনো কথা, অনুরোধ শুনবে না। ববছাঁট চুলে ঢাকা মাথা এবং ডান ও বাম হাত বারবার নেড়ে নেড়ে প্রতিবাদ করতে করতে দৌড় দিয়ে অন্য ঘরে চলে যাবে। রাবেয়া হেসে তার বোন নাফিজাকে বলে, ‘তুই ওকে চিনিস না। সিনথিকে নিয়ে আমার সঙ্গে কাদিরের ঝগড়াও হয়েছে।’

পাঁচ

কয়েকবার বিদেশে ও দেশে বড় বড় ডাক্তার ও শিশুদের পুষ্টিবিদ সিনথিকে দেখেছেন। ডাক্তারদের পরামর্শমতো রাবেয়া যা যা করার সবই করে কিন্তু সিনথি, মা যতটুকু খাওয়াতে চায়, খায় না। কখনো কখনো মুখে খাবার নিয়ে উগড়ে দেয়। ‘লবণ।’ রাবেয়া খাবারটা মুখে দিয়ে বোঝে সিনথির না খাবার অজুহাত।

‘না, খাবো না।’

‘কী খাবে?’

সিনথি অপশন বোঝে। তার প্রিয় খাবারের নাম বলে, ‘আইসক্রিম।’

রাবেয়া মেয়ের জন্যে চকবার আনে। আইসক্রিম খাওয়া শেষ হলে রাবেয়া বলে, ‘এখন খাও।’ মেয়ে খায় না। থাপ্পড় মারতে হাত তোলে। মারলে সিনথি বাবাকে বলে দেবে। কাদির রাগ করবে।

ছয়

সিনথির কোনো অবসর নেই। স্কুল থেকে আসার পর দুপুরে কোনোদিন সামান্য খায়, কোনোদিন খায় না। কারণ : স্কুলে যাওয়ার সময় তার ব্যাগে প্রতিদিন হয় কিটক্যাট অথবা ওয়েফার না দিলে সে স্কুলে যেতেই চায় না।

তো, দুপুরের পর তাকে যেতে হয় আর্টের ক্লাসে। সেখান থেকে ডান্সের। শেখানো হচ্ছে ভরতনাট্যম। চলে সপ্তাহের দুদিন। অন্য দিনগুলির মধ্যে আছে সুইমিং এবং মিউজিক ক্লাস।

দুলাভাইকে নাফিজা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘সিনথিকে কী বানাতে চান?’

‘কোন প্রতিভা – নাচ, গান নাকি ছবি আঁকা – তার মধ্যে আছে সেটা বুঝতেই দেখা হচ্ছে’, কাদির বলেছিল।

সপ্তাহে পাঁচদিন সন্ধ্যায় তাকে পড়াতে আসেন একজন ম্যাম। ম্যামকে একদিন বলেছিল, ‘তুমি আর এসো না।’ কারণ জানতে চাইলে সিনথি বলে, পড়তে, নাচতে, গান শিখতে ভালো লাগে না। ছবি আঁকতে ভালো লাগে। ম্যাম দেখেছে, সিনথির আঁকার কাগজে শুধু বিভিন্ন রং, কোনো ছবি নেই। তাকে ম্যাম একদিন জিজ্ঞেস করে, ‘কী এঁকেছ?’ ‘পাখি উড়ছে।’ ‘পাখি কোথায়?’ ম্যামের প্রশ্নে সিনথি বলেছিল, ‘তোমার চোখ খারাপ। তুমি দেখতে পাও না।’

সাত

বড় ড্রয়িংরুমের মাঝখানে নরম কার্পেটের ওপর বসে রাবেয়া মেয়েকে মধু মেশানো দুধ, সন্দেশ ও সাগরকলার সঙ্গে লাল চালের চিড়া মাখিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। পাশে বসে আছে খালা নাফিজা। দরজায় বেল বাজলো। নাফিজার অংকের টিচার এসেছে। ‘আপা তুই ওকে খাওয়া।’ বলে নাফিজা পড়তে যায়।

অংক শুরু করার আগে তরুণ টিচার নাফিজাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাচ্চাটা কাঁদছে কেন?’ নাফিজা জানায় কাঁদার কারণ। টিচারের হাসি পায়। কিছু বলে না। জ্যামিতির সরলরেখা কতরকম বক্ররেখা হতে পারে তার ব্যাখ্যা করতে করতে বলে, ‘বাচ্চাটাকে খাওয়াতে যাওয়ার আগে মনে হয় জিজ্ঞেস করা হয়, কী খাবে। অপশন আছে বুঝে তার মতো জিদ করে। খাবার নষ্টও করে নিশ্চয়ই।’ নাফিজার চোখ বক্ররেখায়। উত্তর দেয় না।  

টিচার চলে যাওয়ার আগে তার জন্যে চায়ের সঙ্গে কখনো পরোটা, মাংস এবং কখনো পাস্তা বা নুডলস দেওয়া হয়। সবটুকু খাবার যত্নে খায়। একদিন নাফিসাকে আপেল খেতে খেতে বলেছিল :  ‘মানুষের প্রথমবার খাবার খাওয়ার গল্পে একটা ফল আছে। তুমি গল্পটি জানো। ফলটি না খাবার জন্যে মানুষ আকারের দুজনের প্রতি তাদের সৃষ্টিকর্তার নিষেধও ছিল। দুজনের মধ্যে একজন ছিলেন নারী, অপরজন পুরুষ। নারী তার সঙ্গীকে অনুরোধ করে ফলটা খেতে। ফলের ওপরে, গাছের ডালে সুন্দর একটা সাপও ছিল। সাপেরও প্ররোচনা ছিল, যেন দুজন ফলটা খায়। ফল খাওয়ার আগে নারী ও পুরুষ জানতো না, খাদ্য শরীরকে কী দেয়, কী শেখায়। চোখ নতুন কী কী দ্যাখে। নারীর নাম হাওয়া। পুরুষের নাম আদম। গড তাদের একসঙ্গে পৃথিবীতে ফেলে দেন। দুজন বাঁচার জন্যে একসঙ্গে যুদ্ধ করে। পরিশ্রম করে। খাদ্য ও খিদে এমন এক বিষয় যার বাস্তবতা মানুষকে মানুষ যতদিন বাঁচবে, বলে যেতে হবে।’

সেদিন নাফিজা টিচারের বলা গল্পটার মধ্যে অন্য কোনো কথা আছে কি না, বিছানায় শুয়ে অনেক রাত পর্যন্ত ভেবেছিল। গল্পের আসল উদ্দেশ্য কী? 

সিনথি যখন খায় না, রাগ করে খাবার কখনো কখনো ফেলেও দেয়। রাবেয়ার ইচ্ছে করে মেঝের থেকে খাবার তুলে নিয়ে মেয়ের মুখের মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে দিতে। টিচারের যত্ন করে খাওয়ার দৃশ্যটা নাফিজার মনে পড়ে। খাবারের একটা দানাও নষ্ট করে না। খিদেকে শান্ত করতে কী যত্ন!

আট

ঈদের পর উত্তরায় যাওয়ার আগে ধানমন্ডির বড় ডাক্তারের কাছে সিনথিকে নিয়ে রাবেয়া ও কাদির গেল। এই ডাক্তার আগেও কয়েকবার সিনথিকে দেখেছে। সিনথির একটাই অসুখ : খায় না।

ডাক্তার জানেন সিনথি যখন যা যা খেতে চায়, যেমন চকবার, ক্যান্ডি, বিদেশি চকলেট, চিপস তখনই তার জিদ বা আবদার মেনে নেয় বাপ-মা।

কদিন আগে, বনশ্রীতে আসার আগে, সিনথিকে খাওয়ানোর জন্যে রাবেয়াকে মুখোশ পরতে হয়। পরতে হতো না, টিভিতে সিনথি দেখেছিল একজন মা বাঘের মুখোশ পরে তার ছেলের পেছনে খাবার নিয়ে দৌড়াচ্ছে। ছেলেটি পর্দার আড়ালে লুকায়।

বাসায় বাঘের মুখোশ ছিল না। ছিল হরিণের। মুখোশ পরা রাবেয়া হাতে খাবার নিয়ে, টিভির বিজ্ঞাপনের মতোই, সিনথির আবদার অনুযায়ী, দৌড়ে যাওয়ার সময় চেয়ারে ধাক্কা খায়। পড়ে গিয়ে হাতের কুনইয়ে জোরে ব্যথা লাগে। হাড়ে অল্প চিড় ধরে। মা যন্ত্রণায় কাতর। সিনথি পর্দার আড়াল থেকে বের হয়ে হাসে।

ডাক্তার রাবেয়া ও কাদিরকে দেখে বিরক্ত হলো। কী কী করলে সিনথি খায় এবং খায় না, কতটুকু খায় – এসব অনেকবার শুনেছেন ডাক্তার।

‘এই মেয়েকে নিয়ে কী করবো ডাক্তার সাহেব? কিছুতেই খেতে চায় না। গ্রোথ হচ্ছে না। শুকিয়ে যাচ্ছে। মিল্কও খায় না। স্যুপও না। বুকের হাড় দেখা যায়। কিন্তু মাথাটা বড় হচ্ছে। ক্যান্ডি আর আইসক্রিম খেয়ে কেউ বাঁচে? অবশ্য কখনো কখনো মর্জিমতো দু-তিনটি ফ্রাইড উইংস খায়।’

‘সিনথি এখন কি নীল নাকি হলুদ ঘরে বসে খায়?’

‘না না। ওই জিদ এখন নেই।’

‘মনে হয় ভুলে গেছেন, বলেছিলাম, মানুষ খাবারের পেছনে রাতদিন দৌড়ায় আর আপনারা খাবার নিয়ে বাচ্চার পেছনে টিভির বিজ্ঞাপনের মতো সারাদিন দৌড়াচ্ছেন।’

‘কী করবো ? বেবি তো খেতে চায় না।’

‘আমার কাছে আর কোনো ওষুধ নেই। একটাই আছে। লিখে দিচ্ছি। নাম : খেতে দেবেন না।’

‘কী বলছেন?’

‘খিদে কাকে বলে বোঝেন?’

Leave a Reply