শিল্পাঙ্গনে শিল্পীদের মাঝে একধরনের দ্বন্দ্বপ্রবাহ বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই এই দ্বন্দ্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব অন্তর্দাহে রূপ নেয়। এই অন্তর্দাহ থেকে উৎসারিত নিসার হোসেন (জন্ম ১৯৬১, ঢাকা) কিংবা তাঁর শিল্পকর্ম নির্মাণের প্রয়াস। শিল্পের নান্দনিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও উত্তরবিদ্ধ করেছে প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া প্রায় ৮০টির মতো কাজ, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। শিল্পের সঙ্গে বাস্তবতার যে অন্যায় সাংঘর্ষিক সম্পর্ক, যা মূলত পুঁজিবাদের চূড়ান্ত স্তরের এক নৈরাজ্যবাদী মিথস্ক্রিয়া, তাকে সূত্র ধরে ধারালো সময়ের দৃশ্যশিল্পকলার স্বদেশীয় অভিব্যক্তিবাদের চরমপন্থায় নির্মাণ এই প্রদর্শনী, যার মধ্য দিয়ে নিজস্ব শিল্পশৈলী অনুসন্ধানে নিরীক্ষামূলক প্রয়াস ঘটেছে এবং একই সঙ্গে তিনি আমলে এনেছেন আন্তর্জাতিক শিল্পচর্চার জ্ঞান। মাত্র ১৪ বছর বয়সে সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন, তবে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চারুকলা অনুষদ ও পরবর্তীকালে ১৯৮৫ সালে মাস্টার্স করেন বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতন থেকে। সেখানে ভারতের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, শিল্পী, গবেষক কে.জি. সুব্রহ্মণ্যনকে শিক্ষক হিসেবে পেলেন। কে.জি. সুব্রহ্মণ্যন নিসার হোসেনের জীবনপর্বের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর দিকনির্দেশনায় নিসার হোসেন খুঁজে পেলেন ক্যানভাসকে শিল্পে রূপান্তরের মন্ত্র! এছাড়া এদেশের বিখ্যাত ট্যাপেস্ট্রিশিল্পী রশিদ চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগে তিনি শিখেছেন রং ও আঙ্গিক ব্যবহারের নিয়ম ও নিরীক্ষা। উপরন্তু পারিবারিকভাবে ভাষাসৈনিক শিল্পী ইমদাদ হোসেনের (১৯২৬-২০১১) পুত্র তিনি। ইমদাদ হোসেনের বামপন্থী রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা নিসার হোসেনকে করেছে সমাজ-সচেতন; সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ এক দ্রোহী।

এই দ্রোহ থেকে উৎসারিত নিসারের প্রতিটি ড্রইং, ক্যানভাস, ইনস্টলেশন, ছাপচিত্র এবং পারফরম্যান্স। ঘনঘন প্রদর্শনী করা তাঁর ধাত নয়, আর দর্শককে প্রশান্তিময় এক অধিবাস্তব জগতে নিয়ে যাওয়াও তাঁর প্রচেষ্টা হিসেবে ধরা পড়ে না।

এ-কারণে তিনি ছবির বিষয় নির্বাচন করেন বাস্তবে ঘটা কোনো ঘটনা থেকে, যে-ঘটনাগুলো গভীর ক্ষত তৈরি করেছে চেতনায়। ফলে সৃষ্টি হয় ‘বিকারগ্রস্ত সময়’, ‘গুপ্তহত্যা’, ‘সত্য ও মিথ্যার লীলাখেলা’, ‘বাগানে ঘাতক’, ‘মাংশাসীদের নৃত্য’, ‘কিয়ামতের পূর্বাভাস’, ‘আঁধারভীতি’ ‘ঘাতকের প্রতিকৃতি’ প্রভৃতি সিরিজ। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া শিল্পকর্মগুলো আশির দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় চুয়াল্লিশ বছরের গভীর খনন! এই খননের গভীরতা এতটাই সুপরিকল্পিত ও বিস্তৃত যে দর্শক মুখোমুখি হন দুঃসহ অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার। অপরপক্ষে নিসার হোসেন নিজের ওপর চেপে থাকা যন্ত্রণা থেকে খালাস/ অব্যাহতির আবেদন করেন।

কৃতকৌশলে চিত্রপটগুলো অস্থির কিন্তু ছন্দময়তার সহাবস্থানে প্রচুর রেখাসমৃদ্ধ। বিভিন্ন তলের দেখা মেলে অস্বচ্ছ ও অনড় পটভূমিতে এক বদ্ধভূমির আবহে। উজ্জ্বল রং লাল, হলুদ, নীল, সবুজ ঘুরেফিরে এসেছে প্রায় প্রতিটি চিত্রপটে। তদুপরি কালো ও সাদার বৈপরীত্য লক্ষণীয়। যে-দর্শন এদেশের লোকশিল্প নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি পান তা জীবনের তাগিদকে প্রতিফলিত করেছে ক্ষিপ্র কৌশলে।  ড্রইংগুলোতে কালো কালির কলমের আঁচড় এত গভীর ও শক্তি দিয়ে প্রোথিত, তা এককভাবে নিসার হোসেনের সামগ্রিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। মানুষ হিসেবে নিসার হোসেন অপ্রিয় কথা বলতে পারেন অকপটে, কিন্তু যা বলতে পারেন না, তার বয়ান হয় দৃশ্যশিল্পের আঙ্গিকে।

বলা যায়, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে যেভাবে সমাজ-সভ্যতা এগিয়ে যায় নির্দিষ্ট কোনো গতিপ্রবাহে – প্রগতির পথে যাওয়ার এই সংগ্রামে অগণিত লক্ষ্যকোটি জনতার প্রতি শিল্পের যে-বিশেষ ভূমিকা রয়েছে তারই খতিয়ান।

শিল্পী আদতে একজন শ্রমজীবী মানুষ, যার রক্তঘাম ঝরা ফসল তাঁর সৃষ্টিকর্ম। ফলে সমাজে শিল্প ও সংস্কৃতির সম্পর্ক এতটাই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে যুগে যুগে।

তেলরং, অ্যাক্রিলিক, ট্রান্সপারেন্ট পলিথিন, মিশ্রমাধ্যম, তালপাতা, জলরং, রিলিফ প্রসেস, এনগ্রেভিং – এ-সবকিছু শুধু মাধ্যম হিসেবে থেকেছে। বিষয়বস্তুকে ছাপিয়ে মাধ্যমের চতুরতা এখানে দৃশ্যমান নয়। কিছু লেখা আছে, নরকের ভয়াবহতা নিয়ে। সেখানে নিসার দেখিয়েছেন, যে-নরকের ভয়ে ভীত সকল ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষের পরলোক, আদতে সেই নরক এখন ইহলোকে অবস্থান করছে। নরক-যন্ত্রণার প্রায় একই বর্ণনা সকল ধর্মগ্রন্থে রয়েছে। আগুন যেখানে সভ্যতার অন্যতম আবিষ্কার, একই সঙ্গে নরকের আগুনের ভয়ে ভীত হওয়ার আহ্বান রয়েছে আমাদের প্রতি। ফলে এক দিগি¦দিকশূন্য অসহায়ত্বের সূত্র নির্মিত হয়। পশু রূপান্তরিত হয় আরো হিংস্র অবয়বে, কিংবা মানুষ রূপান্তরির পশুতে বা তারচেয়েও ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হয়। ‘নরকের ডায়েরি’তে আমরা দেখি ভয়াবহতার চূড়ান্ত উদ্বেগ থেকে সৃষ্ট বমনেচ্ছু প্রাণিকুল।

সুন্দরবন ঘুরতে গিয়ে নিসার হোসেন অভিভূত হন এর সৌন্দর্যে; কিন্তু পীড়িত হন, শংকিত হন সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে মানুষের উন্নয়নমুখী বাণিজ্য-পরিকল্পনায়। যদি সুন্দরবনের এই সবুজ না থাকে তাহলে কি কয়লার কালো রঙে ছেয়ে যাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন অবলুপ্তির পথে! নিসার হোসেনের প্রদর্শনী ‘ষাট বছরের খতিয়ান’ যেন শাসন-শোষণের ঘনীভূত অন্তর্দহনের চিত্র, যা সমাজের উলঙ্গ প্রতিচ্ছবি। প্রদর্শনীতে স্বনামধন্য শিল্পসমালোচক, শিল্পবোদ্ধাদের লেখাগুলো সহায়তা করে দর্শককে সংবেদনশীল নিসারের সুদীর্ঘ যাত্রাপথ বুঝতে।

প্রদর্শনীতে নিসার হোসেন নিজের পিতার প্রতিকৃতির পাশে সযত্নে রেখেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি। এই দুই ছবির পাশে স্থান পেয়েছে একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে আঁকা ওপন্যাসিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি প্রতিকৃতি।

বিশ্লেষণার্থে বলা যায়, ছবি শুধু ঝুলিয়ে দিলেই হয় না, নির্দিষ্ট আঙ্গিকে চিত্রকর্ম উপস্থাপন ও গুরুত্বপূর্ণভাবে মতাদর্শকে উপস্থাপিত করে। যার ধারাবাহিকতায় দৃশ্যশিল্পে ওই প্রদর্শনীর ঘাত-প্রতিঘাত আলোচ্য হয়ে ওঠে। একইসাথে শিল্পীর জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত চলমান নানা অনুষঙ্গ উপস্থাপিত হয়। ‘ষাট বছরের খতিয়ানে’র (১৯ ফেব্রুয়ারি-৩১ মার্চ ২০২১) মধ্য দিয়ে নতুন আঙ্গিকে এদেশের অন্যতম শিল্প-প্রদর্শনী স্থান ‘গ্যালারী চিত্রক’ নব আঙ্গিকে যাত্রা শুরু করেছে। ফলে প্রদর্শনী আয়োজনে ও শিল্পীকে উপস্থাপনে নিবিড় পরিচর্যার দেখা মেলে। যদিওবা চূড়ান্ত কোনো অভিমত শিল্প-বিশ্লেষণের জন্য সবসময়ই আপেক্ষিক। বরং ইতিহাসের বিশ্লেষণে অনুষঙ্গ হিসেবে শিল্পী ও শিল্পকর্ম আলোচিত হওয়াই যুক্তিযুক্ত। শিল্প-আন্দোলনগুলো সামাজিক ও ঐতিহাসিক আন্দোলনে এভাবেই পাঠ হয়। এই প্রদর্শনী স্পষ্টতই বয়ান করে – শিল্প শুধু শিল্পের জন্য নয়, শিল্প মানুষের জন্যও। মানুষের জ্ঞান ও জীবনযাপনের বিকাশপর্বেই শিল্পের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। বরং সেই দ্বার উন্মুক্ত হোক যেখানে মানুষ একজন শিল্পীকে প্রশ্ন করতে পারে – এ-জীবন নিয়ে তুমি কী করেছ এতদিন?

Leave a Reply