মননচিন্তার বিবর্তন-বাঙালি ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ও বাঙালি এক অর্থের – সমার্থবোধকের দ্যোতনায় তা হাজার বছর অতিক্রম করেছে। আমার দেশকে আমি চিনি হাজার বছরের ব্যবধানে; অনেক চড়াই-উৎরাই আর সংগ্রাম আছে তার ভেতরে। সংগ্রাম আর শক্তি ছাড়া সে বড় হয়নি। পাইয়ে দেওয়া বা হঠাৎ করে পাওয়া স্বাধীনতা কোনো জাতির জন্ম দিতে পারে না ব০ পারেনি কখনো। সমস্ত পৃথিবীর ইতিহাসে, বিভিন্ন বিপ্লবের ইতিহাসে সংগ্রামের বা রত্ত্কের যে-স্রোতধারা তাই সভ্য জাতি, বিবর্তনশীল জাতির বেদিমূল তৈরি করে দেয়। বাঙালির মননচর্চায় এমন সংজ্ঞায়ন এবং সংগ্রামশীলতায় প্রগতিশীল জীবনায়নের যে-বুননি পাওয়া যায় তা নিরন্তর বয়ে-চলা সভ্যতার ইতিহাসের অনুগামী। বিচ্ছিন্ন কোনো ধারায় বা হঠাৎ করে পাওয়া শিখার মতো বাঙালিত্বের মননবৈশিষ্ট্য চর্চিত হয়নি। দীর্ঘ জীবনযাত্রার তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে; পাশ্চাত্য-প্রাচ্য রেনেসাঁসের ফল্গুধারায়, মানবতার বৃহত্তর বাতাবরণে যে-সভ্যতার ক্রম-নির্মিতি চলে সেখানে ধর্মবুদ্ধি ও স্বার্থবুদ্ধির ঊধের্ব মানুষের জয়োৎসব রচনার প্রণোদনাই মূল উদ্দেশ্য। মূল কথা, সৃষ্টির বা উৎসবের প্রাণকেন্দ্রে মানবতার জন্যে দীর্ঘদিনের পৃথিবীর মানুষের যে-সভ্যতা ও প্রগতির বিনির্মাণের আকাঞ্ঝজা তা তাবৎ সংগ্রামী জাতিত্বের ইতিবাচক অর্থারোপের মর্মমূলকে স্পর্শ করেছে। বাঙালিত্বের পর্বে আমরা লক্ষ করেছি ঊনবিংশ শতাব্দীর মানবতার আন্দোলন, মুসলিম সাহিত্য-সমাজের প্রগতিশীলতার আন্দোলন, দেশভাগ-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন এবং অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছয়দফাসহ বিভিন্ন গণ-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে স্বতন্ত্র বিচারবুদ্ধির, সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ধর্মবিযুক্ত রাষ্ট্র বাংলাদেশের সৃষ্টি। সকল মানবতার সংগ্রামে; বাঙালি তার অন্তরে-বাহিরে সকল সৃষ্টিশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনকেই চিত্তে ধারণ করেছে। সমস্ত রক্ষণশীলতা, প্রতিত্র্কিয়াশীলতার নাগপাশ ছিন্ন করে সামনে চলার পথকেই বরাবর সে অবমুক্ত রেখেছে। সভ্যতানির্ভর পৃথিবীর বিবর্তনে মানুষের সকল আনন্দ-উচ্ছ্বাসে বাঙালির যে-অংশগ্রহণ তা প্রগতির অংশ এবং সহজ বিনির্মাণের পথ। এ নির্মিত পথে বা পরিপক্ব অভিজ্ঞ জাতির পূর্ণাবয়বে তার প্রাণধর্মে লুক্কায়িত আছে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাণভোমরা। এই লুক্কায়িত প্রাণভোমরাই আমাদের সংগ্রামশীলতাকে, দ্বন্দ্বমুখরতার শক্তিকে চালিত করেছে। বাংলা-সাহিত্যের চর্যাপদ থেকে মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগের প্রক্ষালনে এক দীর্ঘ ঐতিহ্যচর্চার মধ্য দিয়ে মূলত তার মননধর্মকেই সে প্রকাশ করেছে। এ মননশীলতার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে উজ্জ্বলতর কাব্যবোধ এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্কারের প্রাতিস্বিকতা। সার্বজনীন সংসার থেকে আহরিত শিল্প-সামগ্রীর এ উপাদান বিচারবুদ্ধির স্বাতন্ত্র্যে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ তেমনি এর আন্তরপ্রবাহে লুকিয়ে আছে অলৌকিক আনন্দের আভাস। বিখ্যাত ইংরেজ কবি শেলী, কীটস, বায়রন বা ওয়ার্ডসওয়ার্থের লেখায় যে অরূপ আনন্দের আভাস মেলে আমাদের বাঙালি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ কোনোভাবেই তার চেয়ে কোনো কিছুতেই কম যান না। উপর্যুক্ত এ কথাগুলো এসেছে বাঙালির মননবৈশিষ্ট্যের স্বরূপ উদ্ভাবনের জিজ্ঞাসা থেকে এবং এ জিজ্ঞাসা নিশ্চয়ই আমাদের সময়ের বিবর্তনের পর্বকে চিহ্কিত করবে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিরিখেই বোধকরি এর মূল্যায়ন জরুরি।

দুই

আমরা যখন বিবর্তনের বিশ্বাসের কথা বলি তখন নিশ্চয়ই আত্মশুদ্ধির প্রসঙ্গ চলে আসে। আমাদের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও চিন্তনের যে প্রসঙ্গ এসেছে সেখানে নিরন্তর তৈরির পথ প্রস্তুত হয়েছে এবং ব্যক্তিশুদ্ধির মধ্য দিয়ে আমরা যুগকে নির্মাণের প্রয়াস পেয়েছি। এক্ষেত্রে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যদৃষ্টির উদাহরণে আমরা বিষয়বৈশিষ্ট্যের তথা আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন পাই না। কারণ, সামন্ত শাসনযন্ত্রের শোষণের যে প্রচ্ছদপট ব০ সেখানে ব্যক্তির আবিষ্কার ও অন্বেষণ দুরূহ ছিল। ধর্মের রক্ষণশীলতার নিগড়ে কিংবা ধর্মকে স্বয়ম্ভুজ্ঞানে যে-কল্পনার চর্চা হয়েছে তা একটা দৈনন্দিনতার স্বীকৃতি এবং রূপময় আভার বৈচিত্র্যের মাত্রিকতা, সন্দেহ নেই। কিন্ত্ত প্রকৃতপক্ষে সমাজচিন্তনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ কিংবা কালসাপেক্ষের নৈর্ব্যক্তিক জ্ঞানচর্চা সফলভাবে হয়নি। তবে শিল্পের যে অহেতুকী আত্মপ্রকাশ তা ধনমান নিরপেক্ষরূপেই প্রকাশ পেয়েছিল বা তার যথোচিত অবকাশও ছিল। এভাবেই একটা দীর্ঘকালের মননচর্চা চললেও আধুনিক সময়ে পুঁজির সঞ্চালনে তা বিবিধ মাত্রা অর্জন করে। সামন্তবাদ ভাঙনের ফলে পুঁজির যে-নিরবধি বিচিত্রময় প্রকাশ, তা-ই এক আধুনিক সময়কে গড়বার প্রয়াস পায় এবং ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি চলতে থাকে নিরন্তর। মননচর্চার প্রাবল্যে আসে নতুন মাত্রা, বুদ্ধিবৃত্তি তথা সৃজনশীলতায় চলে আকর্ষণী আক্ষেপের বহিঃপ্রকাশ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তাৎপর্যপূর্ণ উল্লম্ফন আর কর্মব্যবস্থাপনার বিবিধ প্রকোপ বৈশ্বিক আবহকে দৈশিক ভিত্তিতে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এবং ব্যক্তি তার পরিমার্জন ও পরিতুষ্টিতে সময়কে বিবেচনায় আনতে প্রয়াস পায়। শিল্পসাহিত্যের আদিপ্রকরণ কবিতায় এ প্রয়াস উপলব্ধির দ্যোতনায় উদ্ভাসিত। দেশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবে সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতিতে হাজার বছরের বাঙালি-অভিক্ষেপে নতুন প্রসঙ্গ ও প্রকরণে সৃষ্টি হলো আত্মআবিষ্কারের মুখ। ওই পূর্বতনের সৃষ্টিকে বা জাতিত্বের প্রগতির নিশানাকে যেন আরো কয়েকগুণ এগিয়ে দিল। বিশ্ববাস্তবতার সূত্র যে-রোষানলেই প্রক্ষিপ্ত হোক – তা যে নতুন মননমাত্রার জন্ম দিয়েছিল সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। কবিগুরুর উক্তি: জ্ঞসম্মুখে চলিবার প্রবলতম বাধা আমাদের পশ্চাতে; আমাদের অতীত তাহার সম্মোহবান দিয়া আমাদের ভবিষ্যতকে আক্রমণ করিয়াছে; তাহার ধূলিপুঞ্জে শুষ্কপত্রে সে আজিকার নতুন যুগের প্রভাত সূর্যকে ম্লান করিল, নব নব – অধ্যবসয়শীল আমাদের যৌবনধর্মকে অভিভূত করিয়া দিল, আজ নির্মম বলে আমাদের সেই পিঠের দিকটাকে মুক্তি দিতে হইবে, তবেই নিত্যসম্মুখগামী মহৎ মনুষ্যত্বের সহিত যোগ দিয়া আমরা অসীম ব্যর্থতার লজ্জা দিয়া বাঁচিব।ঞ্চ

তিন

রবীন্দ্রনাথের উক্তি ও উপলব্ধিতে বাঙালি তার মননচিন্তাতে একটা পর্যায় অতিক্রম করেছে। রবীন্দ্রনাথের উপরের মন্তব্যটির মর্মে আছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির কালজ্ঞান। এ কালজ্ঞান-ভাবনা বাঙালিকে স্পর্শ করেছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙালির সংস্কার-প্রবণতার বৃত্তায়ন ভেঙে নতুন মনন অভীপ্সায় বিংশ শতাব্দীর মনীষী রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণ জ্ঞসম্মুখে চলিবার প্রবলতম বাধা আমাদের পশ্চাতেঞ্চ- এমন সচেতনতা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব পেরিয়ে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি করেছে বাঙালিকে। সেই সাথে তার মননের পরিকাঠামোয় উচ্চারিত হয়েছে স্বতন্ত্র-স্বভূমির জিজ্ঞাসা। দীর্ঘ সময়ে যা সুপ্ত তা এক সময়ে হয়ে ওঠে বিকশিত, ফুলে-ফলে ঐশ্বর্যমণ্ডিত। কালজয়ী পুরুষ রবীন্দ্রনাথ বাঙালিকে সচেতন করায় তার  মননধর্ম সৃজনে ও বিকশিত করায় প্রধান ভূমিকা পালন করে গেছেন, বাঙালির চৈতন্যের মাত্রাকে দৈশিক আবহ ছড়িয়ে গোটা বিশ্বে পৌঁছে দিয়েছেন। যেমনটা বলেছি, যে-কোনো দেশের, যে-কোনো অঞ্চলের সৃজনী মেধার পরিচালনায় কবির ভূমিকা বা তাঁর কাব্যবোধের জগতের অপরিসীম গুরুত্বের কথা। কারণ,  কবিরা মানুষের তথা সভ্যতার জন্যে যে অলৌকিক আনন্দের ভার কাঁধে বহন করেন কিংবা তাঁদের যে-দিব্যদৃষ্টি সেটা সাহিত্যের অন্য কোনো শাখার শিল্পীদের নিকট তেমনটা মেলে না। যা হোক, কবি রবীন্দ্রনাথ কবিচৈতন্যেরপ্রবহমানতায়, শব্দের বিবিধ মাত্রিকতায়, সংযমের শিল্পের আরাধনার মধ্যে ব০ বাঙালিকে একটা চিহ্কিত পর্বে অধিষ্ঠিত করে যান। তাঁর দৃষ্টিতে জগতের বৈজ্ঞানিক প্রবৃদ্ধি, বৈশ্বিক আবহের গরিমা, দু দুটো বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক তাণ্ডব আর আধুনিকতার প্রবহমান উল্লম্ফন – যা কবির পরিধিকে বাড়িয়ে দিয়েছে তেমনি তীব্র সচেতনতায় মানবতার স্্থেৈর্য্যর বাণীকে সভ্যতার তটিনীকূলে পৌঁছে দিয়েছে। ফলে বিবেকের উচ্ছ্বাসময়তায়, মননের আঁচড়ে একটি বৃহত্তর সময় অনিবার্যতায় পৌঁছে রবীন্দ্রনাথ শুধু নিজেকে নন গোটা বাঙালি-সংস্কৃতি এবং তার রূপ-নিশানাকে দূর-দূরান্তে, প্রত্যন্তে পৌঁছে দিতে সক্ষম হলেন। খুব ঋজু উচ্চারণে বাঙালির কলোচ্ছ্বাসে জেগে উঠল জাতীয়তাবাদ তথা রাষ্ট্রায়নের সংস্কৃতির ঝোঁক – সে নিজ জাতিত্বে, নিজ নৃতত্ত্বে, নিজস্বতায় বিজয় পতাকা ওড়াতে চাইল। এমন সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বোধকরি রবীন্দ্রনাথের সময়ের শুরুর দিকেই ভাবা যেত না – মাত্র চার-পাঁচ দশকের ব্যবধানে বরেণ্য দেশাত্ম কবি-রাজনীতিকরা বাঙালির বোধের সীমানাকে অনেক দূর পৌঁছে দিলেন।

বলেছি, বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবে ইতিবাচক জীবন-ব্যবস্থাপনার নানাদিক প্রসঙ্গে, কিন্ত্ত নেতিই কি এই ইতিবাচকতাকে খুব বড় প্রভাবনা হিসেবে কাজ করেনি! মানবতার অপমৃত্যু দেখে মানবতাবোধ জাগেনি! মহামন্দায় পুঁজির প্রভাব প্রতিত্র্কিয়াশীলতার জন্ম দেয় এবং তাই আবার শিল্প-সাহিত্যে উঠে এসে মননমাত্রায় যোগ করেছে নতুন চিন্তার। বৃহত্তর অর্থে, এসব গ্লানিকর, মরুময় জীবনাভিজ্ঞতার মাঝেই বাঙালি তার ধর্মীয় বেড়াজাল পরিহার করে তার নিজস্বতায়, নিজস্ব সংস্কৃতিকে বড় করে দেখেছে। সাতচল্লিশে বাঙালি মুসলমান তার আইডেন্টিটি পেয়ে যায়। রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে প্রাণবিসর্জনে অনুমান হয়ে যায় তার মননমাত্রার প্রখরতা সম্পর্কে।

সাতচল্লিশ-পূর্ব বাংলাদেশের বাঙালির আচরণের সংকট, জাতিত্ব দ্বিধা প্রবল রকম ছিল; কারণ, প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে বাঙালি সারাক্ষণ প্রতিরোধী হলেও তারা কখনো শাসনযন্ত্রের চালিকাশক্তি হতে পারেনি। জাতিত্ব ও ধর্মীয় সংস্কৃতি এক পাত্রে ঢেলে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতায় বাঙালিত্ব টানাপড়েনের মুখে নিপতিত হয়। বলা চলে, অর্থনৈতিক আধিপত্যে উচ্চ-বর্ণের হিন্দুরা শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বড় হয়ে যায় ব০ ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার বিরোধিতা না করে নিজেদের আধুনিক শিক্ষা অর্জনের পথে বাঙালি রেনেসাঁসের গুরু দায়িত্বও তারা পেয়ে যায়। মুসলমানদের উদার একটি অংশ ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে থাকলেও তারা এ শিক্ষাকে আত্ম-উন্নতির বা প্রগতির বাহন না ভেবে হিন্দুর প্রতিদ্বন্দ্বী হবার কারণ হিসেবেই মনে করেছিল। হিন্দুদের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে অবাঙালি মুসলমানরা গোটা মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব স্কন্ধে তুলে নেয়। সাথে সাথে তাদের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাও বাড়তে থাকে। পরবর্তীকালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার ফলে তা আরো প্রাতিষ্ঠানিক মাত্রা পেয়ে যায়। অবাঙালি মুসলমানদের নিকট পূর্ব-বাংলার বাঙালি মুসলমানরা নানাভাবে নিগৃহীত হয়। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনামলে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দোটানায় বাঙালি মুসলমানরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়ে যায় – তারা অনাধুনিক-অনগ্রসর জীবনযাপন নিয়ে অনালোকিত সময় অতিবাহিত করে। তবে দীর্ঘ সময়ে তাদের মননচর্চা একেবারে রহিত হয়নি – প্রমাণ বিষাদ সিন্ধু-সহ সে-সময়ের নবনূর, আজীজন নেহার-এর মতো পত্রপত্রিকাগুলো। মূলত অর্থনৈতিক অনাস্থা, শহর বা নগর-বিচ্ছিন্নতা আর অবাঙালি মুসলিম নেতৃত্ব তাদের দ্বিধান্বিত ও অনালোকিত রাখার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। উল্লেখ হয়, রবীন্দ্রনাথের কথা, নজরুলও এ পরিপ্রেক্ষিতে স্মরণীয়। এঁরা ধর্ম-বর্ণের ঊধের্ব বাঙালি-চৈতন্যের মূলধারাকে সচল রাখেন। তাঁদের উদ্বোধনী মন্ত্রই ক্রমান্বয়ে সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ে বাঙালি মুসলমান নেতৃত্বের জন্ম দেয় এবং অবাঙালি ষড়যন্ত্র রুখে স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে নতুন স্বদেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়। প্রতিরোধী শক্তি হিসেবে বাঙালি হাজার বছরে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করলেও তার সৃজনী-প্রতিভার পরতে মননচর্চা কোনো-না-কোনোভাবে চালু ছিল। জীবনানন্দ, সুধীন দত্তরা কবিতা লিখেছেন যে মাটি ও ভূমিকে অবলম্বন করে তাই সাতচল্লিশোত্তর বাংলাদেশে হয়েছে প্রধান অবলম্বন। ধর্মীয় বিযুক্তি, অবাঙালি ষড়যন্ত্র, হিন্দু আধিপত্যবাদ ইত্যাদি নানা সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবতা উপেক্ষা করে, সমস্ত ধর্মবুদ্ধির মোহ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের ভাষা বাংলাকে আত্মস্থ করে তার অধিকারকে ছিনিয়ে নিয়ে স্বতন্ত্র স্বদেশভূমি প্রতিষ্ঠায় সে ব্রত হয়। হাজার বছরের সংগ্রামকে, তার প্রতিবাদী চরিত্রের অভীপ্সাকে সে কূলে পৌঁছে দেয়। এ পর্বে তার মননচর্চার বহুধা উল্লম্ফন নজরে আসে গল্প-উপন্যাস-কবিতা-নাটকে। নিজের ভাষা বাংলাকে জন্মভূমির প্রাঙ্গণে জয়ী দেখে এক আধুনিক সভ্য ও সুশীল সমাজের প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে সে। যে-বাক্যে আমি এ লেখাটি শুরু করেছি তার পরিপ্রেক্ষিত কিংবা যথোচিত উত্তর এখানে উচ্চারিত হলো। সে-কারণেই জন্মভূমি কিংবা জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে কোনো দ্বিধার কারণ আমি দেখিনি। যে-অর্জনে অর্জিত হয়েছে আমার দেশ, ভাষা – তা আমার হূদয়নিঃসৃত আকুতি, সেখানে মিশে আছে আমার চৈতন্যের, প্রাণনার উৎসের ফুলেল পটভূমি – সেটাই আমার জাতি পরিচয় আর বাঙালিত্ব। কিন্ত্ত এ নিয়ে এতো দ্বিধা কেন এখন? হাজার বছরের অর্জনকে বা দীর্ঘ শ্রমে-ত্যাগে অর্জিত মননবৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করার অর্থ কী?

সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ে বাংলা-সাহিত্যে যে আধুনিক জীবনবোধ রচিত হয় এবং সাংস্কৃতিক উল্লম্ফনতায় যে নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পায় তা প্রতিরোধী ভূমিকায় নিজের অর্জিত সত্তার আদর্শের স্বপ্ন। এ প্রগতির পথ স্বাধীন বাংলাদেশে থেমে নেই। সত্তর, আশি, নব্বুইয়ে জন্ম হয়েছে অনেক কবির। যদিও ষাটের কবিরা যেভাবে আমাদের এগিয়ে দিয়েছিলেন পরবর্তী কয়েক দশকের কবিরা তা পারেননি। গল্পকাররা স্বাধীন বাংলাদেশে বেশ সফল হয়েছেন; উপন্যাসে উল্লেখযোগ্য সফলতা আসেনি। ষাটের প্রতিরোধী শক্তিরা সত্তর, আশি, নব্বুইয়ে এখন বেশ জেঁকে বসেছে। ক্রমাগত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে পৌঁছে আবার পুরনো শক্তিতে উত্থিত। কবির ভূমিকা এবার কী? গল্পকার কী বলবেন, ঔপন্যাসিক তাঁর বৃহত্তর জীবনে কোন শক্তিকে তুলে ধরবেন? যে-মননধর্মে বাঙালি দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ধর্মবিযুক্ত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তা কয়েক দশকের ব্যবধানে ওই কুচক্রীদের মাধ্যমে নব্য-উপনিবেশবাদী তাণ্ডবে, ভিন্ন সাম্প্রদায়িক উল্লম্ফনে আবার বেরিয়ে এসেছে। পৃথিবীজুড়ে ইন্টারনেটের অবাধ-প্রবাহে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, মৌলবাদী উৎসব, মনোপোলার বিশ্বের পাওয়ার-প্রতিরক্ষা পদ্ধতি প্রতি মিনিটে উদ্ভাসিত আমাদের সম্মুখে। বাণিজ্যের দোটানায় নয়, মোহাচ্ছন্ন হয়ে প্রতি পেশার-বৃত্তির মানুষ অর্থকেই মোক্ষ ভেবে স্বার্থবুদ্ধিকে যে-কোনোভাবে ঊধের্ব তুলে যাবতীয় সুকুমার-প্রবণতাকে বিসর্জন দিয়েছে। শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি সর্বত্র চলেছে বাণিজ্যের অবাধ আধিপত্য। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ এ আধিপত্য বেড়াজালে সেঁধিয়ে গেছে। বিদেশী প্রভুদের নির্দেশে তাণ্ডবে ভুঁইফোঁড় শিক্ষার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রয়োগ চলছে। প্রত্যেকটি অঙ্গনে চলছে অসার, আবদ্ধ, প্রবল ভাবনার অবাধ প্রবাহ। এ পর্যায়ে সাহিত্যেও চলছে নিরবচ্ছিন্ন বেসাতি। রবীন্দ্রনাথের যুগের সময় থেকে বাংলাদেশ-বাঙালি অনেক এগিয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্ত্ত পৃথিবীজুড়ে, বিশ্বায়নের প্রকোপে আমাদের সময় ও  মননধর্ম চলছে উজান স্রোতে। মিডিয়ার জোরে সাহিত্য চলে গেছে নির্বাসনে, নিজেদের উচ্ছ্বাস, প্রচারণার মোহে হয়ে-ওঠা কবি অচিরেই হাঁটুজলে ডুবে নিজের মধ্যে নিজেকেই ডোবাচ্ছেন, অব্যাহতি দিচ্ছেন।

প্রগতির যুগে নিরন্তর প্রবাহে কিছুই আড়ষ্ট নয়, কিছুই থেমে থাকে না। নিরন্তর তা বয়ে চলেছে, প্রবহমান নদীর মতো। পৃথিবীর এগিয়ে চলা অব্যাহত আছে ব০ সমস্ত প্রবৃত্তি মেনে নিয়ে বলতে চাই, নতুন ধারার সাহিত্য চাই, বুদ্ধি-বিবেকসম্পন্ন রুচিশীল দগ্ধ সাহিত্যসেবী চাই। সাহিত্যকাররাই পাঠক গড়ে দিক, নতুন বুদ্ধিদীপ্ত পাঠক তৈরি করুক। ঘরে ঘরে, নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজের সাধ্যের সৃজনী মেধায় গড়ে উঠুক দেশ-জাতি-সচেতন নতুন প্রজন্ম। যে তথ্যপ্রবাহের যুগ চলছে সেখানে বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিকে ইতিবাচক করে কাজে লাগানোর যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। কবিরা শব্দ বুনবেন নিজের দেশ ও জাতিত্বের সচেতনতা থেকে – গল্পকাররা গল্পের ভূমি তৈরি করবেন সমাজ-নৃতত্ত্বের পটভূমি থেকে – ঔপন্যাসিকরা জীবনকে দেখবেন ঐতিহ্য ও ইতিহাস অনুষঙ্গী হয়ে। ভুঁইফোঁড় সাহিত্য বাঁচে না – তাই তা বিরত থাক। নিজে সংস্কৃতির মূলধারা পর্যবেক্ষণ করে, পঠন-পাঠনে অভিজ্ঞতায় তৈরি হয়ে নিজেকে সৃষ্টি করি কালের অনিবার্যতায় । বাঙালি কোনো সময়েই মননচর্চাকে বিসর্জন দেয়নি – কেন দেয়নি তার কারণ পাওয়া গেছে প্রতিরোধের মুখে – একালের লেখকরা সংগ্রামমুখর, দ্বন্দ্বমুখর। জীবনবাদী চরিত্র ও পঙ্ক্তিমালা তৈরির ফলেই বাংলাদেশ বাঁচবে, বাঙালিত্ব মহিমান্বিত হবে।