হচ্ছে-হবে

বিষে বিষক্ষয়গল্পটা ফরাসি দেশীয়।

বছর চল্লিশ আগের খুশবন্ত সিংহ-সম্পাদিত বিশালাকার ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়াতে পড়েছিলাম (পাঠক-পাঠিকা জেনে আশ্বস্ত হবেন যে আমার বিদ্যের দৌড় ওই পর্যন্তই)।

সে যা হোক, আমার যা নীতি, ‘যদ্দৃষ্টং তল্লিখিতং’ অর্থাৎ যা দেখি তাই লিখি, সেই নীতি-অনুসারে গল্পটা বাংলায় লিখে ফেললাম তখনকার বাগবাজারের যুগান্তর-গোষ্ঠির অমৃত সাপ্তাহিকে আমার ‘কথায়-কথায়’ কলমে।

গল্পটা স্বামী-স্ত্রীর বাঁকাচোরা ভালোবাসা নিয়ে।

এ-বিষয়ে জীবনে, সাহিত্যে, সিনেমায় ফরাসিদের তুলনা নেই। যে-কোনো ভাষাতেই অবশ্য মূল গল্পটি লেখা হতে পারতো। এ-রকম বেদনাঘন সরস গল্প সহজে পাওয়া যায় না।

আর্সেনিক নামক একপ্রকার বিষ আছে। আগে লোকে এই বিষ-বিষয়ে প্রায় কিছুই জানতো না, কিন্তু আজকাল এপার-ওপার বাংলার সীমান্তের দুপাশের বাঙালিই জেনে না-জেনে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আর্সেনিক-মিশ্রিত পানীয় জল পান করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং নানারকম কঠিন অসুখে ভুগছেন, খবরের কাগজে সেসব ছবি নিয়মিতই প্রকাশিত হয়। হাতে-পায়ে দগদগে ঘা, দুস্থ সেইসব মানুষদের জন্যে আমাদের মায়া হয়, বোতলজাত পানীয়নির্ভর হয়ে আমরা তাদের দুঃখে কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করি।

অল্পমাত্রায় বহুদিন ধরে শরীরে আর্সেনিক গেলে এ-রকম হয়। কিন্তু যদি কাউকে বেশিমাত্রার আর্সেনিক ক্রমশ প্রয়োগ করা যায় প্রথম দিকে কিছুটা পেটব্যথা, পেটখারাপ, তারপর জ্বরজ্বর ভাব, ইত্যাদি, ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়, এরপর মৃত্যু। শোনা যায়, নেপোলিয়নকেও এভাবেই মারা হয়েছিল।

আমাদের এই ফরাসি গল্পের নায়িকাকেও নায়ক অল্প অল্প করে আর্সেনিক বিষ অনেকদিন ধরে গোপনে খাইয়ে গেছেন। অবশেষে মহিলা মৃত্যুশয্যায়।

নার্সিং হোমে প্রায় শেষ মুহূর্তে স্বামী তাঁকে দেখতে গিয়েছেন, কিছুটা পত্নীপ্রেমের জন্যে, কিছুটা আর্সেনিক বিষ কেমন কাজ করলো – সেটা জানার জন্যে। ভদ্রলোকের আর দেরি সইছিল না, তাঁর যুবতী প্রেমিকা তাঁকে ক্রমাগত বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।

মৃত্যুশয্যায় ভদ্রলোকের স্ত্রী ভদ্রলোকের হাত ধরে বললেন, ‘ওগো, আমি তোমাকে একা ফেলে চলে যাচ্ছি। আমার মৃত্যুর পরে তুমি একটা ভাল দেখে বিয়ে করবে কিন্তু।’ ভদ্রলোক স্ত্রীর কাঁধে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, ‘না, সে কখনোই সম্ভব নয়।’

একটু পরে স্ত্রী আবার বললেন, ‘ওগো, আমার এইসব সোনার হার, নেকলেস, হীরের দুল, হাতের চুড়ি-বালা সব ওই যাকে বিয়ে করবে তাকে দিয়ে দিয়ো।’ অনেকক্ষণ ধরে স্ত্রীর গয়নাগাটির কথা ভাবছিলেন ভদ্রলোক, এবার খুবই চিন্তিতভাবে বললেন, ‘ওগো, তা না হয় দিলাম। তোমার গলার হার কানের দুল এসব না হয় ওর হবে। কিন্তু ও তো বেশ গোলগাল, মোটাসোটা – তোমার চুড়ি-বালাগুলো যে ওর হাতে ছোটো হবে, গলবে না।’

এবার আর একটি বিষপ্রদানের গল্প।

যাকে বলে বিষে বিষক্ষয়, ওই আর কি।

এটাও স্বামী-স্ত্রীর গল্প। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ের দুচারমাস পরেই ঝগড়াঝাঁটি শুরু হলো। এ-রকম অনেক দম্পতিরই হয়, কিন্তু এদেরটা যেন একটু বাড়াবাড়ি। বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি আর গালিগালাজ চেঁচামেচির মধ্যে রইলো না। রীতিমতো চুলোচুলি, হাতাহাতি ব্যাপার।

সাধারণত এসব ক্ষেত্রে স্ত্রী বেচারি শ্বশুরবাড়িতে খুব বিচ্ছিন্ন, একলা হয়ে যান। নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে এই ঝগড়াটে সংসারে প্রায় আর কেউই ছিল না। একমাত্র তৃতীয় ব্যক্তি ছিল ভদ্রমহিলার দেবর, তাঁর স্বামীর কনিষ্ঠ ভ্রাতা।

স্বামী-স্ত্রীর লড়াইয়ে এই দেবরটি প্রথমে নির্বিকার এবং পরে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু বউদির ওপরে দাদার অত্যাচার বেড়ে যাওয়ায় সে বউদির পক্ষে চলে গেল এবং ঘটনা-পরম্পরায় বউদির প্রতি আসক্ত হলো। এখন পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ালেন দাদা।

এবার এসব ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে দেবর-বউদি মিলে দাদা নামক কাঁটাটি উৎপাটিত করলেন, নির্বিবাদে বিষপ্রয়োগ-সৎকারশ্রাদ্ধ সব মিটে গেল। তারপর একদিন যথাসময়ে দেবর-বউদি পরস্পরের পাণিগ্রহণ করলেন।

এখনো তাঁরা কিন্তু সেই পুরনো পৈতৃক বাড়িতেই বসবাস করছেন। সে-বাড়ির বাইরের ঘরে মৃত অগ্রজের একটি পুরনো ফটো রয়েছে, বউদি সেটা সরাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অনুতপ্ত ছোটভাই বলেছিলেন, ‘থাকুক’।’অকালে বিষক্রিয়ায় মৃত অগ্রজের ছবিটা দেয়ালে রইলো। কিন্তু আজকাল যারা বাইরের লোক এ-বাড়িতে আসে তারা দেয়ালের ফটো দেখে যদি গৃহস্বামিনীকে প্রশ্ন করে, ‘ইনি কে?’, তিনি নির্বিকার মুখে জবাব দেন, ‘ইনি আমার ভাসুর। অল্পদিন আগে মারা গেছেন।’