সাহিত্যসৃষ্টি আর সাহিত্যসমালোচনার মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠভাবে পরিব্যাপ্ত। বোধকরি সে-কারণেই নিজের সাহিত্যসৃষ্টির আদর্শের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর সমালোচনাসাহিত্যের ধরন বিষয়েও জানাতে হয়েছিল। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘যে সমালোচনার মধ্যে শান্তি নাই, যা কেবলমাত্র আঘাত দেয়, কেবলমাত্র অপরাধটুকুর প্রতিই সমস্ত চিত্ত নিবিষ্ট করে, আমি তাকে ঠিক মনে করিনে।’ কেন তিনি ঠিক মনে করতেন না, তার কারণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য হচ্ছে, ‘এরূপ সমালোচনার ভিতর একটা জিনিস আছে যা বস্তুত নিষ্ঠুরতা – এটা আমাকে পীড়ন করে।’ সেইসঙ্গে তিনি আরো বলেছিলেন, ‘সাহিত্যিক অপরাধের বিচার সাহিত্যিকভাবেই হওয়া উচিত। অর্থাৎ রচনাকে তার সমগ্রতার দিক থেকে দেখতে হবে।’ কেননা সেটাকে ‘অনেক সময়ে টুকরো করতে গেলেই এক জিনিস আর হয়ে যায়। সমগ্র পটের মধ্যে যে ছবি আছে, পটটাকে ছিঁড়ে তার বিচার চলে না। – অন্তত সেটা আর্টের বিচার নয়।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৩৯৪ : ২২০-২২১)।
আমাদের সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য সম্পাদক-কবি-শিশুসাহিত্যিক আবুল হাসনাতের সাহিত্য সমালোচনার ধরনটি ছিল অনেকটাই রবীন্দ্রনাথের দ্বারা অনুপ্রাণিত। প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য (২০১৯) প্রবন্ধ সংকলনে আবুল হাসনাতের সাহিত্যসমালোচনার কিছু নমুনা রয়েছে। গ্রন্থটি হাতে নিলে আমাদের এ-কথাটিই মনে পড়ে যে, ‘একটি বইও মানবসংসারে সম্পর্কের মতো। শত বন্ধনে সে আবদ্ধ, সম্পন্ন।’ (সুনীলকুমার, ১৯৮১ : ভূমিকা)। নিজের লেখালেখি বিষয়ে আবুল হাসনাত বলেছিলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে সম্পাদনা কাজে যুক্ত থাকবার ফলে নিজের লেখালেখি অব্যাহত রাখা ছিল কষ্টকর। যদিও বিভিন্ন সময়ে লিখেছি কোনো না কোনো জিজ্ঞাসা নিয়ে – প্রবন্ধ, স্মৃতি বা কখনো চিত্রকলা বিষয়ে প্রত্যক্ষণের সমীক্ষা ও কবিতা। সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে কত বিষয়ে যে জিজ্ঞাসা জাগে এ বলে শেষ করা যায় না।’ সেখানে তিনি এ-ও বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকতা সৃজনশীল উদ্যোগের ঘাতক – এমন মন্তব্য করতেন বুদ্ধদেব বসুও। … তবু আমি লেখার ব্যাপারে উদ্যম হারাইনি। বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে লিখেছি। যখনই কোনো কিছু ভালো লেগেছে তা নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে স্থির থাকিনি।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ৯)।
২
রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের অন্তিম পর্বের এক রচনায় বলেছিলেন, ‘ডাঙার মানুষ যেসব খেলা খেলছে তা প্রচণ্ড খেলা –
জীবন-মরণ নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি। … তাতেই উত্তেজনার অন্ত নেই। এইসব দেখলে এ-কথা স্পষ্ট করেই বোঝা যায় যে, স্থানান্তরকে লোকান্তর বলে না। বিশেষ বিশেষ বেড়া বেঁধে সময়ের গতির মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়ে আমাদের জগতের বিশেষত্ব ঘটাই। তার মানেই হচ্ছে ছন্দ বদল হলেই রূপের বদল হয়।’ এই কথারই সূত্র ধরে তিনি আরো বলেছিলেন, ‘মানুষে মানুষে সুরের ঐক্য থাকতেও পারে; সবচেয়ে বড়ো অনৈক্য তালের। তালের দ্বারা জীবনের ঘটনাগুলো ভাগ করে, সাজায়, বিশেষ বিশেষ জায়গায় ঝোঁক দেয়। একেই বলে সৃষ্টি। জগৎ জুড়ে এই ব্যাপার চলছে। মহাকালের মৃদঙ্গ এক এক তাণ্ডব ক্ষেত্রে এক এক তালে বাজছে, সেই নৃত্যের রূপেই রূপের অসংখ্য বৈচিত্র্য।’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৪২৭ : ৬৫-৬৬)। আবুল হাসনাতের সাহিত্যসমালোচনা-বিষয়ক লেখালেখির দিকে তাকিয়ে, সৃষ্টি ও সাহিত্যের সেই অসংখ্য বৈচিত্র্যময় রূপের একটা আদল যেন আমরা দেখতে পাই। সমর সেন-সুভাষ মুখোপাধ্যায়-নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই তিনজন কবিকে নিয়ে আবুল হাসনাতের যে কাব্যিক বিশ্লেষণ, সেই সমালোচনার প্রক্রিয়াটি আমরা এখানে অনুধাবনের চেষ্টা করবো। তবে সেইসঙ্গে প্রখ্যাত সাহিত্য ও শিল্প-সমালোচক হার্বাট রিডের এই কথাটিও মনে রাখার চেষ্টা করবো – ‘The Faith of a Critic’ প্রবন্ধে রিড বলেছিলেন, ÔThere are no immutable canons of criticism, no perfect critics.Õ (Read, 1957 : 322).
৩.১
এইটি আমাদের অনেকেরই কম-বেশি জানা রয়েছে যে, কবিজীবনের শুরু থেকেই পাঠক-সমালোচকের আনুকূল্য পেয়েছিলেন সমর সেন। তাঁর প্রথম কাব্য কয়েকটি কবিতায় বুদ্ধদেব বসু দেখেছিলেন, ‘সমকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা, এবং কবির ব্যক্তিগত জীবন।’ সেইসঙ্গে তিনি অকপটে ঘোষণা করার মতো করে বলেছিলেন, ‘যে যুগে বিশ্বাস করা সহজ নয়, কবির পক্ষে সেটা দুঃসময়। বর্তমান সময়ের সংশয়াচ্ছন্ন অন্ধকার যে-তরুণ চিত্তকে আবিষ্ট করেছে, সমর সেন তারই প্রতিনিধি।’ আর সেই প্রতিনিধি ছিলেন বলেই, ‘দূর সমুদ্র হতে ভেসে আসে বিষণ্ন নাবিকের গান’ তিনি শুনতে পেয়েছিলেন। এসবের পাশাপাশি সমর সেনের কবিতায় বুদ্ধদেব বসু ‘একটি স্পর্শকাতর সুন্দর যৌবনকে’ও দেখতে পেয়েছিলেন।
যে-যৌবন শুনতে পায় দুরন্ত বসন্তের গান। (বুদ্ধদেব, ১৯৮৮ : ৫-৭)। অন্যদিকে, সমর সেনের কবিতায় ‘বাতাসে ফুলের গন্ধ আর কীসের হাহাকার’ পঙ্ক্তিটি পাঠ করার পরে বিষ্ণু দে-র মতো কবির মনে হয়েছিল – ‘সমর সেনের কাব্যলোকের জলবায়ুও একান্তই কবিতার, রবীন্দ্রনাথের কবিতার। রবীন্দ্রনাথের বিশেষ কোনো কবিতার নয়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অজস্র কবিতা, গান ও লিপিকা, শরৎ, আষাঢ় ইত্যাদি নানা লেখার মধ্যে দিয়ে দেশব্যাপী যে-আবহ সেই জলবায়ুই তাঁর সার্থক পটভূমি।’ (বিষ্ণু, ১৯৮৮ : ১১-১২)। আর কবি অমিয় চক্রবর্তীর দৃষ্টিতে সমর সেনের কবিতার জগৎটি ‘ঝর্ণা-ছন্দে’ নির্মিত। (অমিয়, ১৯৮৮ : ২১)।
৩.২
আবুল হাসনাত তাঁর সমালোচনায় একজন কবির সৃজনকর্মের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিস্বরূপের উদ্ভাসনকেও সবসময় গুরুত্বের চোখে দেখতেন। সমর সেনের আলোচনাতেও সেসবের ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি কবির কাব্যালোচনার পাশাপাশি তাঁর ‘সৃজনধর্ম, ব্যক্তিস্বরূপ, মস্কোয় অনুবাদক হিসেবে যাপন, সোভিয়েত সমাজব্যবস্থার প্রতি আস্থা থাকা সত্ত্বেও বাক-স্বাধীনতা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি এবং নাউ ও ফ্রন্টিয়ার পর্বে তাঁর সাংবাদিক জীবন’ সবকিছুই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সেইসঙ্গে সমর সেনের ‘এই সাংবাদিক জীবন কত যে বর্ণময়, ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ, অর্থকষ্টের কশাঘাতে দীর্ণ হলেও সংগ্রামের অঙ্গীকারে দীপ্ত’ ছিল সেটিও পাঠককে জানাতে চেয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘মুদ্রণ আর অঙ্গসৌষ্ঠবে কোনো চাকচিক্য ছিল না নাউ কিংবা ফ্রন্টিয়ারের। কিন্তু বক্তব্যে ও প্রতিবাদে সমর সেন সম্পাদিত এ-পত্রিকা হয়ে উঠেছিল বিবেকী কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রযত্নে এই পত্রিকাকে ঘিরে যে সাংবাদিক বৃত্ত বা লেখকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল, তাঁরাও সমাজের অসংগতি দূরীকরণে লেখনী ধারণ করেছিলেন।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ৯৭)
নকশাল আন্দোলনের সময় সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমর সেনের ‘বহুকৌণিক ভূমিকা’র কথাও গভীর শ্রদ্ধা আর সহানুভূতির সঙ্গে স্মরণ করেছিলেন আবুল হাসনাত। এই আন্দোলন বিষয়ে পুলকেশ মণ্ডল ও জয়া মিত্র এক যৌথ রচনায় বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের সামাজিক ও কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অবস্থা, শহরে স্বাধীনতা-উত্তর ধ্যানধারণা, আশা-হতাশার বিশৃঙ্খলা, গ্রামে ভূমি সম্পর্কের এক চূড়ান্ত অসাম্য – এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিম বাংলার সি. পি. আই. এম. এল.-এর গঠন, তার পশ্চাদভূমি ও তার নেতৃত্বাধীন আন্দোলন আমাদের কালের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন।’ এই আন্দোলনই জনমানুষের মুখে-মুখে ‘নকশালপন্থী আন্দোলন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ‘শুধু পশ্চিমবাংলা নয়, দেখা যায় সমস্ত ভারতবর্ষই এ সময়ে বিভিন্ন নামে গণ-আন্দোলনে বিশেষত যুবছাত্র আন্দোলনে ফেটে পড়েছিল।’ (পুলকেশ ও জয়া, ২০১২ : ৭)। আবুল হাসনাত এই আন্দোলনের সঙ্গে সমর সেনের যুক্ততাকে সমর্থন জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘কবি সমর সেন, সম্পাদক সমর সেন ও রাজনৈতিক সংকটকালে সমর সেনের বহুকৌণিক ভূমিকা এবং নকশাল আন্দোলনে পরিবর্তন-প্রয়াসী ছাত্র ও যুবকদের জন্য তাঁর সহমর্মিতা আমাদের ভাবনার পরিধিকে বিস্তৃত করে।’ পাশাপাশি তিনি এইটিও বলতে ইতস্তত বোধ করেননি যে, ‘সেকালে নিবেদিতপ্রাণ বহু বামপন্থী বুদ্ধিজীবী নকশাল আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তি আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নকে এতটুকুও উপলব্ধি করেননি।’ অন্যদিকে ভারতরাষ্ট্র ‘নকশাল আন্দোলনকে দমন করার জন্য যে-পন্থা গ্রহণ করেছিল তা যে সমর সেনের বিবেককে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল।’ সে-তথ্য জানিয়ে আবুল হাসনাত বলেছেন, ‘নকশাল আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পরে পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ও প্রতিভাবান সব ছাত্র এই আন্দোলনের অন্তর্নিহিত চেতনাকে বুকে ধারণ করে সমাজ পরিবর্তনে প্রয়াসী হয়েছিলেন।’
অন্য-আরো অনেকের মতো তিনি মনে করতেন যে, ‘এ-আন্দোলন ছিল কৃষক আন্দোলন, কিন্তু মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত শিক্ষিতজন ও শিক্ষার্থীদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা’য়। (হাসনাত, ২০১৯ : ৯৮)
৩.৩
এই কবির কাব্য-প্রতিভার পরিচয় দিতে গিয়ে আবুল হাসনাত বলেছিলেন, ‘সমর সেন তাঁর কালে (১৯৩৪-১৯৪৬) মাত্র বারো বছরের কাব্যসাধনার মধ্য দিয়ে এক প্রভাবসঞ্চারী ও আলোচিত কবি হয়ে উঠেছিলেন।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘কবি জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে রোমান্টিক কল্পনা তাঁকে আচ্ছন্ন করেছিল। এই রোমান্টিক বেদনার হাহাকার ও বাসনার ছাপ রয়েছে তাঁর প্রথম দিককার কবিতায়। তাঁর কবিতায় আছে কলকাতা শহর, মধ্যবিত্তের আকাক্সক্ষা ও হতাশা। তিনি এই বিষয়গুলোকে এমন এক ভাষায় রূপায়িত করেছিলেন, যা ছিল ভিন্নধর্মী।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ৯৯-১০০)। আর সে-কারণেই, আবুল হাসনাতের ভাষায়, ‘অবিশ্বাস্য খ্যাতিও তিনি অর্জন করেছিলেন সে-সময়ে। চল্লিশের দশকের কলকাতায় রাজনৈতিক আবহ, সংকট ও টানাপোড়েন বিশ্বস্তভাবে উঠে এসেছে সমর সেনের কবিতায়। কলকাতা এবং কলকাতা শহরে জীবনের অসংগতি নবীন এক ছন্দে রূপায়িত হলো তাঁর কবিতায়। নাগরিক জীবনের হতাশা, ক্লান্তি ও সংগ্রামের সঙ্গে শহর কলকাতার নগ্ন বাসনা এমনকি বারবণিতারাও উঠে এলো তাঁর কবিতায়।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ১০০)।
সমর সেনের কাব্য-প্রসঙ্গে গদ্যছন্দের কথা নানাভাবেই আলোচিত হতে দেখা যায়। তিনি নিজেও নিজের কবিতা রচনা নিয়ে স্মৃতিকথায় ঠাট্টা-মশকরা কম করেননি। যেমন কুকুরের কামড়ের স্মৃতি টেনে এনে এক জায়গায় বলছেন, ‘আমার মেজভাই বলতেন আমাকে কামড়ে কুকুরটা পাগল হয়ে যায় এবং আমার কবিতা লেখার মূলে কুকুরের কামড়।’ নিজের কবিতা নিয়ে সবসময়ই যে রসিকতা করেছেন, তা-ও কিন্তু নয়। তাঁর স্মৃতিকথায় এমনও বিবরণ পাচ্ছি, যুবক বয়সে ‘রাত বেশি হলে মমিনপুর থেকে হেঁটে [বাড়ি] ফিরতাম; রাস্তাঘাট জনহীন, মাঝেরহাট ব্রিজ পেরিয়ে ডাকাতের আস্তানা, ছিল সাপখোপ, কিন্তু বাড়ি পৌঁছিয়ে যেতাম ঠিক।’ এ-প্রসঙ্গে আরো বলেছিলেন, ‘তখন যৌবনের নানা অভিজ্ঞতার ফলে কবিত্বভাব প্রখর হয়েছে। কলকাতায় যাতায়াতের সময় ট্র্যামের গতিছন্দে কবিতার অনেক লাইন মনে দানা বাঁধতো – ট্র্যামের গতিছন্দ হয়তো গদ্যছন্দের মূলে ছিল।’ (সমর, ২০০৪ : ২৮)। এই প্রসঙ্গের সূত্র ধরেই আবুল হাসনাত বলেছিলেন, ‘শুধু গদ্যছন্দের জন্য নয়, বিষয়-প্রকরণের জন্যেও নয়, বহু তরুণের স্বপ্নের, আশা-আকাঙ্ক্ষার আশ্চর্য রূপকার হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এবং এই আশা-আকাক্সক্ষা, বাসনা ও হতাশা তাঁর সৃজন উদ্যানে অমোচনীয়ভাবে হীরক-দ্যুতির মতো প্রভাময় বলে আজো তিনি বাঙালি হৃদয়ে প্রাসঙ্গিক।’ তিনি এ-ও মনে করতেন, সমর সেনের ‘সমকালে চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে কবিতার যে অভিযাত্রা, সেখানে দারিদ্র্য, হতাশায় নিমজ্জিত মধ্যবিত্ত জীবনের গ্লানি তাঁকে পীড়িত করেছিল বলে তার রূপায়ণ তাঁর কবিতায় নতুন মাত্রা নিয়ে উন্মোচিত হয়েছিল। তাঁর চেয়ে সার্থকতর গদ্য কবিতা কারো কলম থেকে বেরোয়নি।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ১০০)।
৩.৪
সমর সেনের কবিতার পাশাপাশি তাঁর আত্মজীবনী সম্পর্কে আবুল হাসনাত মন্তব্য করেছিলেন, ‘আত্মজীবনী “বাবু বৃত্তান্তে” নিজেকে নিয়ে, তাঁর পরিপার্শ্ব নিয়ে যে তীক্ষ্ম পরিহাস ও কটাক্ষের পরিচয় পাই বাংলা সাহিত্যে এ-বিরল। এর সঙ্গে তাঁর কবিতা ও ডায়েরি পাঠের পর আমার তো কেবলই মনে হয়, রোমান্টিক হাহাকার, নারীর প্রতি অকৃত্রিম প্রেম, কাউকে পাওয়ার জন্য তাঁর রক্তে যে-বাসনার বীজ এবং এক সম্পূর্ণ ভিন্ন বলয় থেকে জীবনকে প্রত্যক্ষণ করে তুলেছিল। তাঁর ধমনিতে কবি-জীবনের মধ্য পর্যায় থেকে সমাজের প্রতি অঙ্গীকার অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে গিয়েছিল।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ১০১)। এসবের সমান্তরালে সরোজ দত্তের সঙ্গে সমর সেনের বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে এনে আবুল হাসনাত বলেছিলেন, ‘আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তৎকালীন সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, কতোভাবে তাঁকে যাতনা দিয়েছিল।’ তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার কারণে কলকাতার সনাতনী বামপন্থীরা যে সমর সেনের প্রতি প্রসন্ন ছিল না, সেইটিও আবুল হাসনাত তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছিলেন। কবি ও তাঁর কবিতার পাঠসূত্র বেয়ে এসে সমালোচক আবুল হাসনাত তাঁর লেখার সমাপ্তি টেনেছেন এইভাবে যে, সমর সেনের ‘কবিতায় জীবনের অনুষঙ্গ কিংবা পর্যবেক্ষণ আর স্বগতোক্তি আমাদের ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। আমরা প্রাণিত বোধ করি, সুন্দর হয়ে ওঠে অর্থময়।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ১০১-১০২)
৪.১
কবি-সমালোচক শঙ্খ ঘোষ তাঁর এক প্রবন্ধে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যকৃতি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘যা নেই তাকে মুঠোয় আনার আনন্দ, অভাব মেটানোর আনন্দ, সেটাই জীবনের কাজ, আবার সেটাই কবির কবিতা।’ আর কবিতায় যে-কথা ফুটে ওঠে, তাকে ‘বাঁচাতে গেলে তাই জীবনেরই কাছে পৌঁছতে হয়। আবার উলটো করে এ-ও বলা যায় যে, জীবনেরই কাছে পৌঁছে দিতে পারে ঠিক-ঠিক কথা, পাঁচিলভাঙা কথা, বা কবিতা, যে-কবিতা চায় “কথাগুলোকে/ পায়ের ওপর দাঁড় করাতে”।’ সুভাষ মুখোপাধ্যায় যে তাঁর গোটা জীবন জুড়ে কবিতায় এই কাজটিই করে গিয়েছেন, সেটি আমাদের নিশ্চিত করেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। (শঙ্খ, ২০১৯ : ১২২)। বলা যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা বিষয়ে সমালোচক আবুল হাসনাতের বক্তব্য শঙ্খ ঘোষেরই অনেকটা কাছাকাছি। তিনি বলেছেন, সুভাষের ‘কাব্যে মানুষের কথ্য ভাষা এবং চলিত কথা উঠে এসেছে, উঠে এসেছে মানুষের জীবন আর সংগ্রামের কথা। মুখের চলিত ভাষা দিয়ে কবিতা রচনা এবং ছন্দশৈলীতে নতুন মাত্রা সঞ্চার গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছিল বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত বাংলার প্রগতি সাহিত্য যেন বেড়ে উঠেছে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে।’ শুধুই কবি হিসেবে নয়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বহুমুখী প্রতিভা নিয়েও আবুল হাসনাত ছিলেন আবেগপ্রবণ; তাঁর ভাষায়, ‘কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় শুধু কবি ও গদ্য সাহিত্যিক হিসেবে নয়, বাংলা সাংবাদিকতার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। লিখেছেন আমার বাংলার মতো অসাধারণ একটি বই। রিপোটাজধর্মী এই বইটি খুব আদৃত হয়েছিল। দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের স্কেচে সমৃদ্ধ ছিল এই বই। এ ছাড়া তুরস্কের প্রগতিশীল কবি নাজিম হিকমতকে লোকপ্রিয় করে তোলে তাঁর অনুবাদ।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ১৭৯)। আবুল হাসনাতের কথায় কোনো ভুল নেই। যেমন রিপোটাজধর্মী গদ্য রচনায়, ঠিক তেমনই অনুবাদেও সুভাষের কৃতিত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। সুভাষের অনুবাদের মধ্যে দিয়েই আমরা নাজিম হিকমতের এই কথাগুলি জানতে পেরেছি : ‘সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে জীবন প্রতিফলিত। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে যা কিছু সংঘাত, সংগ্রাম আর প্রেরণা, জয়, পরাজয় আর জীবনের ভালোবাসা। খুঁজে পাওয়া যাবে একটি মানুষের সব ক’টি দিক। সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প, যা জীবন সম্পর্কে মানুষকে মিথ্যা ধারণা দেয় না।’ (সুভাষ, ১৯৯৩ : ৭৯)। আমাদের ধারণা, সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিজেও নাজিম হিকমতের এই কথাগুলি আমৃত্যু বিশ্বাস করতেন।
৪.২
সুভাষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপড়েনের কথা খুব চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছিলেন আবুল হাসনাত। তাঁর ভাষায় : ‘বুদ্ধদেবের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাহিত্যবোধগত দৃষ্টিভঙ্গিতে বৃহৎ ব্যবধান সত্ত্বেও বুদ্ধদেব তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন না। বরং স্নেহের ছায়ার বন্ধনে সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে বেঁধেছিলেন, তা কোনোদিন ম্লান হয়নি। প্রকাশ্যে তর্ক হয়েছে সাহিত্য নিয়ে, জীবনানন্দ দাশ নিয়ে, মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত কবিতা নিয়ে, তবু বন্ধুত্বে ও সখ্যে ফাটল ধরেনি। এমনকি শিল্পীর স্বাধীনতা প্রশ্নে বুদ্ধদেবের ভিন্ন মেরুতে অবস্থান সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বিষয়টি অনুকরণীয় হয়ে আছে। হয়ে উঠেছে তর্কেরও সৌন্দর্য। (হাসনাত, ২০১৯ : ১৭৯-১৮০)
তাঁর এই লেখাতেও আমরা দেখবো যে, কবির স্মৃতিকথাকে আবুল হাসনাত বেশ গুরুত্বের মঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত “ঢোলগোবিন্দের আত্মকথা” পাঠ করে আমরা দেখে নিতে পারি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিতে তাঁর জীবনপরিক্রমা। যেখানে ঠাকুরদা, পিতা এবং তাঁর বাল্য আর কৈশোরের কথা আছে। বিশিষ্ট গদ্যে তিনি আশ্চর্য এক শৈলীতে বর্ণনা করেছেন কলকাতার এক অন্ধ গলিতে বেড়ে ওঠা, ন্যায়পরায়ণ পিতার প্রতিমূর্তি, পিতার চাকুরির সূত্রে নওগাঁয় মুক্ত পরিবেশ ও আবহাওয়ায় বিচরণ।’ যা একটি কিশোরের আত্মবিকাশের জন্য প্রয়োজন ছিল। (হাসনাত, ২০১৯ : ১৮৪)। আবার সেই প্রসঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের সূত্রটাও টেনে আনেন শিল্পগত মাত্রা বজায় রেখে, সেখানে একটুও বাড়াবাড়ি নেই। আবুল হাসনাত বলেছেন, ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমাদের আলাপ মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে কলকাতায়। ভিয়েতনাম থেকে তিনি তখন ফিরেছেন। তিনি এলেন পার্ক সার্কাস কড়োয়া রোডের বাড়িতে। আমরা তখন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সহায়তায় এই বাড়িটিকে গড়ে তুলেছি আশ্রয়শিবিরের মতো। কলকাতার খ্যাতিমান বামপন্থীদের নিত্য যাতায়াত ছিল এই বাড়িটিতে। … সুভাষ এসেছিলেন কমরেড মণি সিংহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তাঁকে দেখে আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটতে সময় লেগেছিল। কোমল স্বর, ঝাঁকড়া চুল অবিন্যস্ত।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ১৮৭)
৪.৩
জীবনের শেষ পর্বে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রথম জীবনের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে আবুল হাসনাত বলেছেন, ‘পরিশেষে একটি কথা না বললেই নয়, শিল্পীর স্বাধীনতা ও ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে যে-মতবিরোধ হয় কমিউনিস্ট পার্টির, সেখানেও তাঁর ঋজু চরিত্রের বিশিষ্টতাকে আমরা নতুন করে উপলব্ধি করি। তিনি সরে গেলেন দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস থেকে, মানুষের জন্য তাঁর মঙ্গলাকাক্সক্ষা থেকে।’ তিনি আরো বলেছেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ‘জীবনের অন্তিম পর্যায়ে হয়ে উঠেছিলেন কংগ্রেস সমর্থক এবং কিছু পরে তৃণমূল সমর্থক। এই সময়ে কলকাতায় তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। কানে শোনেন না, চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ। অথচ মানবকল্যাণের চিন্তা এতটুকু ছেড়ে যায়নি।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ১৮৯)। আবুল হাসনাতের কথার সমর্থন খুঁজে পাওয়া যাবে সুভাষের অনেক কবিতায়। তিনি তাঁর ‘এখন ভাবনা’ শীর্ষক কবিতার শেষ স্তবকে বলেছিলেন : ‘গুচ্ছ গুচ্ছ ধানের মধ্যে দাঁড়িয়ে/ তার বলিষ্ঠ হাত দুটো আমি দেখতে পাচ্ছি -/ আমি শেষবারের মত/ মাটিতে পড়ে যাবার আগে/ আমার ভালোবাসাকে/ নিরাপদে তার হাতে/ পৌঁছে দিতে চাই।’ (সুভাষ, ১৯৯৩ : ১৫৯)
৫.১
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সম্পর্কে কেতকী কুশারী ডাইসনের মতো প্রাজ্ঞ সমালোচক বলেছিলেন, ‘আমি নিজে তাঁর কবিতার মেজাজ এবং বাগ্ভঙ্গির সঙ্গে একটা সামীপ্য বোধ করি। তাঁর বলার ভঙ্গিটা সহজ সহজ এবং অনাড়ষ্ট। তার মধ্যে কোনো ফাঁকা আড়ম্বর থাকে না।’ (কেতকী, ১৪১৮ : ১৫১)। আমরা মনে করি এই কারণেই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর সময়কালে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছিলেন। আবুল হাসনাতও অনেকটা একইভাবে বলেছেন, ‘শুধু কবি হিসেবে নয়, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবেও তিনি ঈর্ষণীয় সুনাম অর্জন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ যুগ-উত্তর সময়ের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় কবি ছিলেন তিনি।’ এর কারণ সম্পর্কে আবুল হাসনাতের অভিমত হচ্ছে, ‘বাংলা কবিতা যে নতুন আদল, প্রকরণ ও আধুনিকতা নিয়ে হিরের দ্যুতির মতো ঝলমল ও ছন্দের নবীন পরীক্ষায় সিদ্ধি অর্জন করেছে, তাতে তাঁর কৃতিত্ব কম নয়।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ১৭১)
৫.২
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার ছন্দ সম্পর্কে আবুল হাসনাত বলেছিলেন, ‘ছন্দ ছিল তাঁর কবিতার প্রাণ। তিনি কতভাবে যে ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন তা বলে শেষ করা যায় না। যে-কোনো নবীন কবির জন্য তাঁর রচিত কবিতার ক্লাশ গ্রন্থটি হয়ে উঠেছিল অবশ্যপাঠ্য। ছন্দে তিনি যত্ন ও মনোযোগের জন্য বহু তরুণকে দীপিত করেছেন।’ আর এরই সঙ্গে যোগসূত্র সামনে এনে নীরেন্দ্রনাথের কবিতা বিষয়ে তাঁর ভাষ্য হচ্ছে, ‘সরল নিরাভরণ ছিল তাঁর কবিতা। কোনো রহস্য ও দুর্বোধ্যতার আড়াল ছিল না তাঁর সৃজনে। তাঁর কথায়, কবিতায় ‘গদ্যই আমার মাতৃভাষা’। এই প্রকরণকেই নিজস্ব এক নির্মিতির সৌজন্যে প্রসারিত করেছেন। টানটান গদ্যে বলতে চেয়েছেন তাঁর অন্তরের বয়ান। ছন্দবাহিত এই বয়ান হয়ে উঠেছে ভিন্ন স্বর এবং ভিন্নমুখীন। কবিতার গঠন কারুকার্যে তাঁর কবিতাস্পন্দ নিজস্ব চরিত্র নির্মাণ করেছে।’ (হাসনাত, ২০১৯ ১৭১-১৭২)।
নীরেন্দ্রনাথের কবিতার আঙ্গিকের সৌকর্যের আরো একটি বৈশিষ্ট্যের দিকে আবুল হাসনাত আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘এই আঙ্গিকের প্রবর্তনাও তিনি ঘটিয়েছিলেন একান্ত নিজস্ব এক নির্মাণরীতির সৌজন্যে। যেন গদ্যেই কথা বলে যাচ্ছেন, টানটান টানা গদ্যে, অথচ ভেতরে ভেতরে আগাগোড়া সক্রিয় থাকছে ছন্দসমেত এক গঠন কারুকাজ।’ (হাসনাত, ২০১৯ ১৭১-১৭২)
৫.৩
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর আত্মজীবনীও আবুল হাসনাতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী রচিত “নীরবিন্দু” সমকালীন সমাজজীবনের জলছবিও। এই গ্রন্থে আছে পারিবারিক সমাজজীবন ও কলকাতায় বসবাসের অভিজ্ঞতা।’ হাসনাতের এই রচনাতেও উঠে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ-কথা। আবুল হাসনাত জানিয়েছেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বহু সংগীতশিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী যখন উদ্বাস্তু ও নিরাশ্রিত জীবনযাপন করছেন, তখন কলকাতার ১৪৪ লেনিন সরণিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতি। এই সমিতির তিনজন সম্পাদকের মধ্যে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন অন্যতম সম্পাদক, সভাপতি ছিলেন চিকিৎসক মনি বিশ্বাস।’ তাঁর বক্তব্যের জের টেনে আবুল হাসনাত আরো বলেছেন, ‘এই সমিতি বাংলাদেশের বহু লেখক, বুদ্ধিজীবী, সংগীতশিল্পী ও চিত্রশিল্পীকে
যে-উদার সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলেন, সে-স্মৃতি আমার কাছে আজো অম্লান। এ ছাড়া এই সমিতি বৃহৎ দুটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের অগণিত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও লেখক সংযুক্ত হয়েছিলেন এই সমিতির আহ্বানে।’ (হাসনাত, ২০১৯ : ১৭৪-১৭৫)
৬.
তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জানিয়েছিলেন, ‘সাহিত্যবিচারমূলক গ্রন্থ পড়বার সময় প্রায়ই কমবেশি পরিমাণে যে জিনিসটি চোখে পড়ে সে হচ্ছে বিচারকের বিশেষ সংস্কার; এই সংস্কারের প্রবর্তনা ঘটে তাঁর দলের সংস্রবে, তাঁর শ্রেণীর টানে, তাঁর শিক্ষার বিশেষত্ব নিয়ে। কেউ এ প্রভাব সম্পূর্ণ এড়াতে পারেন না।’ সেইসঙ্গে তিনি এ-ও বলেছিলেন ‘বলা বাহুল্য, এ সংস্কার জিনিসটা সর্বকালের আদর্শের নির্বিশেষ অনুবর্তী নয়। জজের মনে ব্যক্তিগত সংস্কার থাকেই, কিন্তু তিনি আইনের দণ্ডের সাহায্যে নিজেকে খাড়া রাখেন।’ এ-ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হচ্ছে – রবীন্দ্রনাথের মতে – ‘বিচারকেরা সেই হ্রাসবৃদ্ধিকে অনিত্য বলে স্বীকার করেন না; তাঁরা বৈজ্ঞানিক ভঙ্গি নিয়ে নির্বিকার অবিচলতার ভান করে থাকেন; কিন্তু এ বিজ্ঞান মেকি বিজ্ঞান, খাঁটি নয় – ঘরগড়া বিজ্ঞান, শাশ্বত নয়।’ আর সে-কারণেই সাহিত্যসমালোচনার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব ছিল অনেকটা এরকম – ‘মোটের উপর নিরাপদ হচ্ছে ভান না করা, সাহিত্যের সমালোচনাকেই সাহিত্য করে তোলা। সেরকম সাহিত্য মতের একান্ত সত্যতা নিয়ে চরম মূল্য পায় না। তার মূল্য তার সাহিত্যরসেই।’ (রবীন্দ্রনাথ : চতুর্দশ খণ্ড। ১৪২১ : ১৯৩)। আবুল হাসনাতের সাহিত্যসমালোচনার ক্ষেত্রেও ঠিক সেই একই বক্তব্য প্রাসঙ্গিক। শুধুই শিল্প-সাহিত্য নয়, মফিদুল হকের ভাষায়, জীবনের বিস্তার তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বিস্তর পঠনপাঠন আর জীবনভাবনার মধ্যে। (মফিদুল, ২০২০ : ৩৮)। সে-কারণেই তিনি সাহিত্য বিষয়ে নিজের মতামতকে কখনোই চরম আর সত্য বলে মনে করেননি কখনো। এইখানেই তিনি সমালোচক হিসেবে স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার। আবারো হার্বাট রিডের কথা আমাদের স্মরণ করতে হচ্ছে। রিড বিশ্বাস করতেন যে, ‘ÔCriticism is good and sane when there is a meeting of intention and appreciation.Õ (Read, 1957 : 322)।
আবুল হাসনাতের সাহিত্যসমালোচনাও ঠিক সেই একই বৈশিষ্ট্যের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে-কারণেই তাঁর সমালোচনার ধরন আমাদের বুদ্ধি ও ভাবনার জগৎকেই শুধু নয়, আমাদের সাহিত্যবোধকেও নিরন্তর জাগ্রত রাখতে উদ্দীপনা জোগায়।
সহায়কপঞ্জি
১. অমিয় চক্রবর্তী, ১৯৮৮। অনুষ্টুপ : সমর সেন বিশেষ সংখ্যা (সম্পাদনা : পুলক চন্দ), কলকাতা।
২. আবুল হাসনাত, ২০১৯। প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য, জার্নিম্যান বুকস, ঢাকা।
৩. কেতকী কুশারী ডাইসন, ১৪১৮। কোরক : নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সংখ্যা (সম্পাদনা : তাপস ভৌমিক), কলকাতা।
৪. পুলকেশ মণ্ডল ও জয়া মিত্র (সম্পাদক), ২০১২। সেই দশক (প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৪), প্যাপিরাস, কলকাতা।
৫. বিষ্ণু দে, ১৯৮৮। অনুষ্টুপ : সমর সেন বিশেষ সংখ্যা (সম্পাদনা : পুলক চন্দ), কলকাতা।
৬. বুদ্ধদেব বসু, ১৯৮৮। অনুষ্টুপ : সমর সেন বিশেষ সংখ্যা (সম্পাদনা : পুলক চন্দ), কলকাতা।
৭. মফিদুল হক, ২০২০। স্মৃতিতে অনুভবে আবুল হাসনাত, সংকলন ও সম্পাদনা : মতিউর রহমান, প্রথমা, ঢাকা।
৮. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৩৯৪। সাহিত্যের পথে (প্রথম প্রকাশ : ১৩৪৩), বিশ্বভারতী, কলকাতা।
৯. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৪২১। রবীন্দ্র-রচনাবলী : চতুর্দশ খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলকাতা।
১০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৪২৭। পথে ও পথের প্রান্তে (প্রথম প্রকাশ : ১৩৪৫), বিশ্বভারতী, কলকাতা।
১১. শঙ্খ ঘোষ, ২০১৯। লেখা যখন হয় না, পত্রভারতী, কলকাতা।
১২. সমর সেন, ২০০৪। বাবু বৃত্তান্ত ও প্রাসঙ্গিক (প্রথম দে’জ সংস্করণ : ১৯৮১), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
১৩. সুনীলকুমার চট্টোপাধ্যায়, ১৯৮১। প্রসঙ্গ ও প্রসঙ্গত : বিভূতিভূষণ, নাথ পাবলিশিং হাউস। কলকাতা।
১৪. সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ১৯৯৩। কবিতাসংগ্রহ : ১ (প্রথম প্রকাশ : ১৯৯২), (সম্পাদনা : সুবীর রায়চৌধুরী), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
১৫. Herbert Read, 1957. The Tenth Muse, Routledge & Kegan Paul Limited, London


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.