গত শতকের ষাটের দশক ছিল আমাদের প্রজন্মের জেগে ওঠার কাল। রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের মন্ত্রোপম কবিতা ‘রূপনারানের কূলে’র আলোকে বলতে চাই, কৈশোর পেরুতে পেরুতে আমরা জেনেছি এ-জগৎ স্বপ্ন নয়, আন্দোলন-সংগ্রামে সত্যিই রক্তের অক্ষরে লেখা হচ্ছিল আমাদের কালের রূপ। তার ভেতর দিয়ে পাড়ি দিতে দিতে আঘাতে-বেদনায় আত্মোপলব্ধির পথরেখা ফুটে ওঠে। আভাসে যেন বুঝতে পারি সত্য কত কঠিন; চেষ্টা ছিল আমাদের জীবনের সেই কঠিন বাস্তবতাকে ভালোবাসার, তার সঙ্গে বোঝাপড়ার। আসলে কেবল আমাদের কতিপয়ের নয়, এ ছিল একটি জাতির জাগরণের কাল, স্বপ্ন দেখা ও তাকে সত্য করে তোলার যূথবদ্ধ সংগ্রামের মধ্যগগন। সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেন আমাদের ষাটের দশক এবং তার আগের পঞ্চাশের দশককে বাঙালি মুসলমানের জাগরণের কাল আখ্যায়িত করেছিলেন।
এই দুই দশকের জাগরণের কালে হাসনাতভাই, এবং তাঁদের পিছন পিছন আমরাও, পরিবারের গণ্ডি ভেঙে দেশ এবং বিশ্বজগতের প্রতি উন্মুখ জিজ্ঞাসা নিয়ে পথ চলতে শুরু করি। আজ এই ভাষণের মধ্য দিয়ে আমাদের হাসনাতভাই, সম্পাদক ও কবি-লেখক, বিশেষত কালি ও কলম সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক আবুল হাসনাতকে, কেবল স্মরণ করব না, তাঁকে শ্রদ্ধা জানাব তাঁর কর্ম ও চিন্তা জগতের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। কারণ এই ধারার সঙ্গে আমাদের অনেকেরই বিকাশের সম্পর্ক গভীর। আর ব্যক্তি মানুষের প্রস্তুতির ওপরই নির্ভর করে তার ব্যক্তিত্বের প্রস্ফুটন, যে-ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করে দেয় মানুষটির দেওয়ার সামর্থ্য, ইচ্ছার গতিপ্রকৃতি, অভিরুচি, উচ্চতা ইত্যাদি। তেমন মানুষদের সম্মিলনের ভিত্তিতেই সম্ভাবনা তৈরি হয় গণমানুষের মুক্তির।
তবে গণমুক্তি বা মানুষের মুক্তির প্রশ্নটি সাধারণত রাজনীতির কাঁচ দিয়ে দেখা ও বিচারই প্রচলিত রীতি। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সত্ত্বেও সমাজে মানবিক সংকটের বিস্তার দেখতে দেখতে আজ মনে হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের বিষয় হতে হবে যে-মানুষের মিলনে গড়ে ওঠে গণমানুষ, সেই ব্যক্তি-মানুষের মানসগঠন ও শারীরিক-বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সার্বিক অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা। তার জন্যেই রাজনীতির প্রয়োজন, প্রয়োজন আন্দোলন, সংগ্রাম, স্বাধীনতা। যোগ্য মানুষ, যোগ্য ব্যক্তি-মানুষ তৈরির সঠিক আয়োজনে মূল অনুষঙ্গ তো উপযুক্ত শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার মুক্ত পরিবেশ। আমরা সে-আলোচনায় হাসনাতভাইয়ের চর্চার ক্ষেত্রগুলো, অগ্রাধিকার এবং আনুষঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ের কথা বলব।
দুই
ষাটের দশকে শিল্প-সাহিত্যসহ সৃজনে-চিন্তনে অগ্রসর মানুষ আর উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের তরুণদের মধ্যে বামপন্থার জোয়ার চলছিল। আদতে এই প্রবণতা শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশক থেকেই। তখন থেকেই, বিশেষত ভাষা-আন্দোলনের পরে, তরুণদের মধ্যে বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনা প্রসারিত হয় এবং নানামুখী সৃজনশীল কাজের ঝোঁক বাড়ে। বলা যায় তখন এ-প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বজুড়ে। এ দুই দশকব্যাপী এশিয়া এবং বিশেষত আফ্রিকায় উপনিবেশের অবসান ঘটেছে, প্রায় সব দেশেই স্বাধীনতা এসেছে বামঘেঁষা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে। এই উন্মাদনা এদেশেরও
শিল্পী-সাহিত্যিক এবং তরুণদের মধ্যে জিয়নকাঠির কাজ করেছিল।
সাহিত্যপাঠ এঁদের জন্যে হয়ে উঠেছিল আবশ্যিক, অনেকেরই বিশেষ পক্ষপাত ছিল কবিতার প্রতি। নিজে লেখা এবং নিজেরা মিলে প্রকাশনায় মেতে ওঠা – সেও ছিল ওই সময়ের ভালোবাসার ও সময়যাপনের প্রিয় মাধ্যম। এভাবে জানা হয়ে যায় অনেক বই, প্রচুর কবি-লেখকের নাম। বই এবং পেছনের সৃজনশীল মানুষদের সঙ্গে পরিচয় ক্রমে গভীর-গভীরতর হতে থাকে। সন্ধানী চোখের অন্বেষণ থামে না, ক্ষুধিত প্রাণ তাতে জোগায় ইন্ধন। এভাবেই আমরা পৌঁছে যাই যেন উৎসে, বিপ্লবী সৃজনশীলতার ঝর্নাতলায় – রুশ বিপ্লব, গোর্কি-মায়াকোভস্কি, মা-ইস্পাত, পেয়ে যাই আইজেনস্টাইন-পুদোভ্কিনের ছবির খবর। পরিচয় হয় পিকাসো, চ্যাপলিনের কাজের সঙ্গে, বুঝতে শুরু করি এসব কাজের তাৎপর্য। জানা হয় ঢাকাতেই গড়ে ওঠা প্রগতি লেখক সংঘের কথা, প্রগতিশীল গল্পকার সোমেন চন্দের নৃশংস হত্যার কথা। ঘরের কথা যেমন জানি তেমনি জানতে পাই স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের কথা, প্রজাতন্ত্রীদের বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া কবি-লেখক-চিত্রকরদের পরিচয়, এ-কাজের তাৎপর্য নিয়ে ভাবতে ভাবতে তাঁরা হৃদয়ের গভীরে বাঁধা পড়েন। এদিকে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ’র কথাও বাদ যায় না। এই সূত্রে উপমহাদেশ-জোড়া খ্যাত বহু কৃতী মানুষের সঙ্গে ঘটে যায় আত্মিক মেলবন্ধন, পরিচয় ঘটে তাঁদের সৃষ্টিশীল কাজের সঙ্গে – সাজ্জাদ জহির, মুলক্রাজ আনন্দ, সলিল চৌধুরী, ছেঁড়াতার, নবান্ন, কোনো এক গাঁয়ের বধূ ইত্যাদি। সন্ধান মেলে পরিচয় পত্রিকার এবং পূর্বাশা, চতুরঙ্গ, নতুন সাহিত্য, অগত্যা, সমকাল এবং আরো অনেক।
কিন্তু কেবল সংকীর্ণভাবে সমাজতান্ত্রিক বলয়ে আবদ্ধ থাকলে তো হবে না, কীভাবে যেন সে-ই বোধও তৈরি হয়েছিল আমাদের মধ্যে। তখন, সেই ষাটের দশকেই, মস্কো থেকে আসতে থাকল অবিশ্বাস্য সস্তা দামে রুশ ভাষার ধ্রুপদী সাহিত্য, দারুণ সব অলংকরণে সমৃদ্ধ শিশু-কিশোরদের বই; বিজ্ঞান, দর্শনসহ নানা বিষয়ের সমৃদ্ধ বইয়ের বাংলা অনুবাদ। এতই সস্তা ছিল যে ছাত্রাবস্থাতেই দু-হাতে কেনা যাচ্ছিল বই, গোগ্রাসে পড়তেও বাধা ছিল না। জগৎটা বড় হতে থাকল। একটু সচেতন সবারই ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার তৈরি হতে থাকল, পছন্দের কবি-লেখকদের ও বইয়ের তালিকা দীর্ঘ হতে থাকল। এমনকি পছন্দের ক্ষেত্রেরও বিস্তার ঘটতে শুরু হলো।
লেনিন চলচ্চিত্রের গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন বিপ্লবের গোড়াতেই, বিপ্লবের পরপরই তিনি ঘোষণা করেছিলেন – The cinema is for us the most important of the arts; গুরুত্বের কারণেই তিনি ১৯১৯ সালে চলচ্চিত্রশিল্পকে জাতীয়করণ করেছিলেন। নাগরিক বাঙালির জীবনে আজ হয়তো সুরের পিপাসা কমে এসেছে, কিন্তু এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন সেকালের অগ্রসর মানুষ। ফলে সেই জাগরণের কালে রাজনীতির সঙ্গে সংগীত ও সংস্কৃতির বন্ধন গড়ে উঠেছিল স্বাভাবিক আবেগ, ভালোবাসা থেকেই।
ওপরে যেসব ক্ষেত্র নিয়ে তরুণদের মধ্যে আগ্রহ তৈরির কথা হলো, তার সূচনা হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে। সেই দশকেই অনুপম সেন-বর্ণিত জাগরণের কুশীলবদের আবির্ভাব, তাঁরাই পূর্ববঙ্গে কাব্য-কথাসাহিত্য, চিত্রকলা, নাটক, চলচ্চিত্রসহ নানা বিষয়ে উদ্দীপ্ত চেতনায় কাজের সূচনা করেছিলেন। এ-পর্বের উজ্জ্বল এক ব্যক্তিত্ব হলেন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তাঁর কথা আলাদাভাবে বিশেষ করে উল্লেখের কারণ তিনি আমৃত্যু এই জাগরণের বর্তিকা বহন করেছেন, দীর্ঘদিন এই ধারার অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন এবং আজ যাঁকে নিয়ে এ-আয়োজন তাঁর সম্পাদিত সাহিত্যপত্র কালি ও কলমের প্রাণপুরুষ ছিলেন। হাসনাতভাইকে স্মরণ করে যে-কথাগুলো সাজিয়েছি তাতে আনিসস্যারেরও আগ্রহ ও সংলগ্নতা কম ছিল না। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অভিভাবকের, পথপ্রদর্শকের। বলা বাহুল্য, তিনি একা ছিলেন না, তাঁর সহযাত্রী ছিলেন প্রতিভাবান সৃজনশীল একঝাঁক তরুণ, যাঁরা এই বাংলায় আধুনিকতার যাত্রাপথে অগ্রসেনার ও পরে অভিভাবকের ভূমিকা নিয়েছিলেন। তখন এই সম্পন্ন সাংস্কৃতিক আবহের মধ্যেই এগিয়েছিল বামরাজনীতি, সেখানেও নতুন যুগের তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছিল।
এখন একবার যদি হাসনাতভাইয়ের জীবনের দিকেও তাকাই তাহলে দেখব, উপরে যত সব ক্ষেত্রের কথা বলা হলো প্রায় সব বিষয়েই তাঁর আগ্রহ ছিল। খোঁজ নিলে সেকালের আরো অনেকের মধ্যে এরকম বহু শিল্পের প্রতি অনুরাগের সন্ধান মিলবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এতে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে মাত্রাগত পার্থক্য থাকতে পারে, ভাসা-ভাসা ভালোবাসার দেখনদারি কিছু থাকলেও খাঁটি ভালোবাসা, সৃষ্টির তীব্র আগ্রহ, তাতে প্রতিভার ছোঁয়াও থাকত বলেই পর্বটা ছিল গতিশীল। এই ব্যক্তিগত ভালোবাসার গভীরে থাকে মানুষ, গণমানুষের ভাগ্য ও ভাগ্য পরিবর্তন নিয়ে চিন্তা, তাতে তৈরি হয় রাজনীতি-সচেতনতা, তারই সূত্রে অনেকেই যুক্ত হন সংগঠনের সঙ্গে, কেউ কেউ সরাসরি জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। সেইসঙ্গে সামাজিক ও মানবকল্যাণের নানা ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দায় গ্রহণে উৎসাহের ঘাটতি ছিল না। সচেতন এই মানুষদেরই জাতির ইতিহাসের যাত্রাপথে সময়ের দাবি পূরণে, উপলক্ষের উদযাপনে কিংবা প্রতিকূল সময়ের গ্রহণ কাটাতে বড় কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজনের দায় নিতে হয়েছে বারবার। এভাবে ভাবনার জগৎ, চলার পথ, করণীয় নির্ধারিত হয়েছে, কাজের পরিসর গেছে বেড়ে।
ফলে এ কেবল ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার গড়া বা রাজনীতির পথ ধরে ব্যক্তিগত অর্জনের সম্ভাব্য লক্ষ্য পূরণ নয়, নয় কেবল ব্যক্তিগত শিল্পযাপন। কারণ এর মধ্যে মানুষ, জাতি, দেশ, আন্তর্জাতিকতা, বিশ্বমানবতা, ইতিহাস এবং জীবন ও জগতের প্রতি দায়পালনের দায় মাথায় নিতে হয়েছে। কোথা থেকে একটা মহত্বের বোধ যেন মনের মধ্যে গভীর আবেগ সঞ্চার করে, বিবেক-বিবেচনাও সাথি হয়। এই বোধ তৈরি হয় যে, আমরা দেশের, মানুষের, জগতের এবং ইতিহাসের, ভবিষ্যতের। তাই বড় কথা হলো, জীবন কিছুটা হলেও অর্থবহ করে তোলার, জীবনের দায় কিছুটা হলেও পরিশোধের, অনাগতের ও ভবিষ্যতের পথ সচল রাখায় কিছুটা হলেও অবদান রাখার, সেইসঙ্গে অতীত এবং ঐতিহ্যের সম্পদ সংরক্ষণের দায় ইত্যাদি নতুনতর বোধ অন্তরে সাড়া ফেলে দেয়। আর এর ফলে অনেক পরে যখন জলবায়ু পরিবর্তন, প্রকৃতির বিপন্ন প্রাণ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা বামিয়ান ও পার্মার মতো প্রত্নসম্পদের ধ্বংসযজ্ঞে কোনদিকে হবে আমাদের অবস্থান তা ইস্যু তৈরির সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা হয়ে যায়।
তিন
আমরা লক্ষ করেছি নিশ্চয় যে, একজন আবুল হাসনাত বা তাঁর সময়, এবং আরো অন্য কালেও, সেই সুবাদে একালেও, আরো অনেকেই আছেন যাঁদের পছন্দ বহুমুখী। যেহেতু হাসনাতভাইকে আপাতত আমাদের কালের প্রতিনিধি হিসেবে পেয়েছি তাই তাঁর পছন্দের ক্ষেত্রগুলো যদি তালিকাবদ্ধ করি তাহলে কী দাঁড়ায় তা এবার দেখা যাক। এ-বিষয়টা একালের জন্যে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও, খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। সে-আলোচনা পরে করব, আপাতত তালিকাটা দেখি। বলে রাখা ভালো এ নেহায়েত আমারই তৈরি তালিকা, তবে অন্ধকারে ছোড়া ঢিলের কোনোটাই ফসকাবে বলে মনে হয় না। হাসনাতভাইয়ের পছন্দ – কবিতা, কথাসাহিত্য, চিত্রকলা, বই, বন্ধু, গান, চলচ্চিত্র, পছন্দের মানুষের সঙ্গ ও আড্ডা, ক্ষণকালীন একাকিত্ব, একাকী কল্পনা ও ভাবনায় ডুব দেওয়া, ভ্রমণ ইত্যাদি ইত্যাদি। তালিকাটিকে আরো জীবনঘনিষ্ঠ করার জন্যে আমরা হয়তো ষাটের দশকের রুচি মাথায় রেখে তাঁর প্রিয় কবি, ঔপন্যাসিক ইত্যাদি ব্যক্তি-নামও সাজাতে পারি। এবারো বলে রাখি, এ নিতান্ত তাঁর হয়ে আমারই তৈরি নামমালা – কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, চিত্রকর পটুয়া কামরুল হাসান, পরিচালক সত্যজিৎ রায়, ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে হয়তো মতিভাই (প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান) বা স্ত্রী নাসিমুন আর মিনু প্রমুখ। তবে নির্ঘাৎ জানি এ-তালিকা আদতে তাঁর প্রতি ঘোরতর অবিচার। কেননা, আমার আন্দাজ তাঁর পছন্দের কবির তালিকায় এক্ষুনি আরো দশজনের নাম যোগ করা যাবে, যেমন – শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নাজিম হিকমত, পাবলো নেরুদা, লুই আরাগঁ, মায়াকোভস্কি, ফেদারিকো গার্সিয়া লোরকা। এভাবে অন্য ক্ষেত্রেও দীর্ঘ তালিকা তৈরি করা যাবে। তবে তার প্রয়োজন নেই, আমাদের আলোচনার জন্যে এটুকু যথেষ্ট।
দেখা যাচ্ছে, আমরা যদি একজন আবুল হাসনাতের পরিচয় অনুসন্ধান করি তাহলে একটিমাত্র পরিচয়ে তা শেষ হচ্ছে না, তাঁর অনেক পরিচয়, ঠিক যেভাবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন তাঁর বিখ্যাত Identity and Violence বইয়ে নিজের পরিচয় সাজিয়েছেন – I can be, at the same time, an Asian, an Indian citizen, a Bengali with Bangladeshi ancestry, an American or British resident, an economist, a dabbler in philosophy, an author, a sankritist, a strong believer in secularism and democracy, a man, a feminist, a heterosexual, a defender of gay and lesbian rights with a nonreligious lifestyle, from a Hindu background, a non-Brahmin, and a non-believer in an afterlife (and also in case the question is asked, a non-believer in a before-life as wall). তালিকাটি কম দীর্ঘ নয়, তা সত্ত্বেও এরপরে তাঁকে বলতে হয়েছে, ÔThis is just a small sample of diverse categories to each of which I may simultaneously belong – there are of course a great many other membership categories too which, depending on circumstances, can move and engage me’.
মানুষের এই বহু পরিচয়, যা গড়ে ওঠে তার নানা আগ্রহ ও পছন্দের ভিত্তিতে, তার এত গুরুত্ব কেন? কারণ কেউ যদি একক পরিচয়ে, অর্থাৎ single identity-তে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে তাহলে তার মানবিক গুণাবলির বিকাশ ব্যাহত হবে। সব শিশু নানা বিষয়ে নানামুখী আগ্রহ নিয়েই বড় হয়। মানুষ মৌলিকভাবে বহুমুখী এক প্রাণী, তার জীবনও গড়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ও কৃত্যের সম্ভার নিয়ে। হঠাৎ করে কেউ যদি কেবল ধর্মের প্রথা পালনে, কেউবা কেবল শরীরসাধনেই সবটুকু একাগ্রতা-আগ্রহ ঢেলে দেয় তাহলে তার মানবিক বিকাশ ব্যাহত হতে বাধ্য। কারণ শৈশব থেকেই মানুষকে জীবন যাপন করতে করতে নানা আকর্ষণ, আগ্রহ, বৈচিত্র্যকে সামলেই এগোতে হয়, এর মধ্যে তাকে বুদ্ধি খাটিয়ে, বিবেচনা শক্তি প্রয়োগ করে কখনো কখনো আগ্রহ বদলাতে হয়, কখনো কোনোটি বাদ দিয়ে নতুন কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে নিতে হয়। মনে রাখতে হবে, মানবজীবন উত্তরোত্তর জটিল হচ্ছে, টানাপোড়েন বাড়ছে, নানামুখী আকর্ষণের ইন্দ্রজালে ছেয়ে যাচ্ছে। বিপরীতধর্মী বিষয় তাদের মধ্যে আগ্রহের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে, দোলাচলে মন খেই হারাতে পারে, হর্ষ ও হতাশা, প্রাপ্তির আনন্দ ও অপ্রাপ্তির দুঃখ যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ এ-জীবনে। তাই পছন্দের ক্ষেত্র বাড়ানো ও বাছাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে যুক্তি-বিবেচনার শক্তি তৈরি হওয়া জরুরি। নয়তো এই জরুরি কাজে সে ভুল করবে, নয়তো অপ্রতুল ক্ষেত্রের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে মনোবৈকল্যের শিকার হবে।
এদিকে চলার পথে তার নতুন নতুন পরিচয়ও যুক্ত হয়, তাতে আত্মপরিচয়ের তালিকায় পরিবর্তনও ঘটবে। ছেলেবেলায় একটা মজার – ছেলেমানুষের জন্যে যা ছিল মজাদার তা আদতে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা – দৃশ্য দেখতে পেতাম স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে। তখন স্টেডিয়ামে কেবল ফুটবল খেলাই হতো যা দর্শকরা গ্যালারিতে বসে উপভোগ করতেন। প্রায়ই দেখা যেত চট্টগ্রাম বনাম নোয়াখালী জেলার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় দর্শকদের উত্তেজনার পারদ বাড়তে বাড়তে গালাগাল, ঢিল ছোড়াছুড়ি এবং শেষে কখনো মারামারি পর্যন্ত গড়াত। পরে দেখেছি
আবাহনী-মোহামেডানের খেলায়ও এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে। এ হলো খেলা চলাকালীন পক্ষপাতভিত্তিক সাময়িক উত্তেজনা, তবে তা কখনো কখনো মাত্রা ছাড়িয়ে বড় রকমের সংকটও তৈরি করেছে, এখনো করে। শুনেছি ফুটবলপাগল মহাদেশ ল্যাটিন আমেরিকায় একবার দুই প্রতিবেশী দেশের ফুটবল খেলাকে ঘিরে সীমান্তে সৈন্য সমাবেশের মতো ঘটনাও ঘটেছিল। অনেক সময় কিশোর পুত্র বা কন্যার শখ তাদের এতই ভূতগ্রস্ত করে তোলে যে তা মেটানোর বায়না থেকে পারিবারিক বিপর্যয় ও মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিও ঘটে যায়। আবার পরিবারের অজ্ঞাতে সন্তানের জঙ্গি দলে যোগ দেওয়ার ঘটনাও তো ঘটছে।
আমাদের সমাজে প্রায়ই ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতার চরম প্রকাশ দেখতে পাই। মানুষ দ্রুত নানা স্বার্থ ও হিসেবের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিবদমান যুযুধান দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এ-বিষয়ে অর্মত্য সেন একই বইতে লিখেছেন – Violence is fomented by the imposition of singular and belligerent identities on gullible people, championed by proficient artisans of terror. ফলে বোঝা দরকার সাময়িক একক পক্ষপাতও সমাজে বিপর্যয় ঘটাতে পারে, এরকম মানুষই জঙ্গি হয়ে ওঠে। মনের এরকম কোনো ঘোরগ্রস্ততায় (obsession) মানুষ আত্মঘাতী হতে পারে, পারে সন্ত্রাসী হয়ে উঠতে।
এ নিয়ে গভীর দার্শনিক আলোচনাও করেছেন অমর্ত্য সেন তাঁর পূর্বোক্ত বইয়ে। অসহিষ্ণু এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিংস হয়ে ওঠা সমকালীন পৃথিবীতে সমঝোতার বাতাবরণ তৈরি করতে হলে কী প্রয়োজন, তা-ও তিনি বলেছেন – The hope of harmony in the contemporary world lies to a great extent in a clear understanding of the plurality of human identity, and in the appreciation that they cut across each other and work against a sharp separation along one single hardened line of impenetrable division.
আর এর অভাবে? – The neglect of the plurality of our affiliations and of the need for choice and reasoning obscures the world in which we live, pushes us in the direction of the terrifying prospects portrayed by Matthew Arnold in (his poem) ‘Dover Beach’:
And we are here as on a darkling plain
Swept with confused alarms of struggle and flight,
Where ignorant armies clash by night.
চার
আমরা যখন এ-পৃথিবীতে এক অসহিষ্ণু, অনুদার, সহিংস কাল অতিবাহিত করছি, যখন ব্যাপক মানুষের মধ্যে লোভ, ভোগ এবং জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে অন্যের ন্যায্য অধিকার হরণ ও নিজের পক্ষে অন্যায্য অনুচিত প্রাপ্তির উন্মত্ততা দেখি তখন মানুষমাত্রের জন্যে সাংস্কৃতিক বহুত্ব এবং বহুমুখী আগ্রহের গুরুত্ব কতটা তা উপলব্ধি করি। তাই প্রয়োজন এমন শিক্ষাব্যবস্থা যা ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের বহুমুখিতার বিকাশ নিশ্চিত করবে। শিক্ষার্থী চর্চার মাধ্যমে এই বহুত্ব উপলব্ধি ও উপভোগের সক্ষমতা অর্জন করবে, পারবে স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দের ক্ষেত্র বাড়াতে, বদলাতে বা নিজেই অগ্রাধিকারের নতুন-নতুনতর বিন্যাস গড়ে নিতে। বোঝা কঠিন নয় যে, এই সক্ষমতা অর্জন করতে হলে যুক্তি-বিবেচনার সামর্থ্য প্রয়োজন। শিক্ষার কাজ তো এটাই, একজনকে নিজের বিবেচনা শক্তি প্রয়োগে এবং তার পক্ষে সঠিক তথ্য, জ্ঞান, কাজ করণীয় আহরণ ও বাছাই-নির্ধারণ করায় দক্ষ করে তোলা। একটু ব্যক্তিগত হলেও প্রসঙ্গত বলি, প্রায় অর্ধশতক ধরে শিশু শিক্ষার কাজে নিয়োজিত থেকে এভাবেই শিশুদের গড়ে তুলতে চেয়েছি আমরা। খানিকটা রবীন্দ্রনাথের ভাবনার আলোকে আমরাও মনে করেছি শিক্ষার আধার হলো সংস্কৃতি। প্রথমত শিক্ষাঙ্গনের থাকবে এমন একটি সজীব প্রাণবন্ত মুক্ত পরিবেশ যেখানে শিশু-কিশোররা পড়বে-করবে নির্ভয়ে। শিশু বয়সে পড়াশোনা আদতে এক ধরনের সাংস্কৃতিক কাজ, তাই প্রাথমিকেই বৈচিত্র্যময় কাজের মাধ্যমে তাদের অর্জিত হতে হবে সাংস্কৃতিক সাক্ষরতা বা cultural literacy। এই স্বাক্ষর কিশোরের শিক্ষাযাত্রা ক্রমেই তাকে বহু পছন্দের জগতে পৌঁছে দেবে, একসময় তৈরি হবে তার প্রধান ও অনুষঙ্গী ক্ষেত্রসমূহ।
মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতি নিছক আর্ট বা শিল্পকলা নয়, এর বিস্তার নিত্যদিনের প্রতিটি কাজ-সাজ, চলা-বলা, শখ-প্রবণতা, সকল কর্মকাণ্ডেই প্রকাশ পাবে। কিন্তু আমাদের পরীক্ষানির্ভর মুখস্থবিদ্যার ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষায় বৈচিত্র্য ও বহুত্বের স্বাদ-সামর্থ্য নিয়ে সংবেদনশীল, রুচিশীল, আত্মবিশ্বাসী মানুষ হয়ে ওঠার কোনো অবকাশ এতে রাখা হয়নি। এ প্রসঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে শুধু বলব সংকটটা, অমর্ত্য সেনের ভাষায়, miniaturisation of man; আর চেক-হাঙ্গেরিয়ান চিন্তক V. Kinsky এ-বিষয়ে বই লিখে তার শিরোনাম দিয়েছেন Dwarfing of Man – মানবের বামনায়ন।
শংকিত চিত্তে নিজের এবং উপস্থিত সকলের কাছে প্রশ্ন রাখি – আমরা কি স্বেচ্ছায় মানবের এই ক্ষুদ্রায়ন বা বামনায়নের পথে হাঁটছি না? সামাজিক জীব মানুষ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সহজাতভাবেই তার অভাব পূরণ করে নেয়। মান সংস্কৃতির ঘাটতি ও শূন্যতায় উপস্থিত মত নিজ প্রবৃত্তির আবেগে এবং বয়সোচিত সংবেদনশীল স্বভাবে অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত প্ররোচিত হয়ে এমন কিছু গ্রহণ করে যা অনুকরণ করা যায়; কিন্তু তার মাধ্যমে আত্মবিকাশের সুযোগ থাকে না বলে আত্মপরিচয়ের বৈচিত্র্যও তৈরি হয় না। এভাবে ব্যক্তির বিকাশও ঘটে না, সম্পন্ন পরিণত ব্যক্তিত্বও গড়ে ওঠে না। বরং তাতে যেন কিছু প্রজন্ম গড়ে উঠছে সাংস্কৃতিক উদ্বাস্তু বা cultural refugee হিসেবে।
মানববিকাশের এই সংকট গভীর হলে সে-সমাজে গণতন্ত্র যথার্থ রূপে বিকশিত হতে পারে না। গণতন্ত্রের অভাবে অনেক সময় রাষ্ট্র ও সমাজ একাকার হয়ে মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নিয়ে মানবিক বিকাশের সর্বনাশ ঘটায়। ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর বিখ্যাত On Liberty বইয়ে লিখেছেন – ‘A state which dwarfs its men, in order that they may be more docile instruments in its hands even for beneficial purposes will find that with small men no great thing can really be accomplished.’
পাঁচ
ওপরের আলোচনা আজ এ-কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, কেবল দেশের নয়, বিশ্বসমাজে মানবজাতির চরম অবক্ষয় এবং গভীর সংকটের ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাচ্ছি। বলা বাহুল্য, পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়েই আজ বিজ্ঞানীরা শংকিত হয়ে আছেন। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল এরিখ দ্বিধাহীন চিত্তেই বলেছেন, এখন আমরা পৃথিবীর ইতিহাসে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির পর্যায়ে রয়েছি। প্রায় ছয় কোটি বছর পরে এমনটা যে ঘটতে চলেছে তার দায় মানুষ এড়াতে পারবে না। এই সম্ভাব্য বিপর্যয় নিয়ে সতর্কবাণী দিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা বহুকাল ধরে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মার্টিন রিজ তো ১৯৯৫ সালেই আস্ত বই লিখেছেন একবিংশ শতাব্দীকে মানবজাতির চূড়ান্ত শতাব্দী আখ্যা দিয়ে – বইয়ের নাম Our Final Century। যুদ্ধ ও সহিংসতা বাড়ছে, গণতন্ত্র ও পরমতসহিষ্ণু উদারতা কমছে, ভোগের সঙ্গে লোভ বাড়ছে, ত্যাগ ও দানের মনোভাব ক্ষীয়মাণ, বিবাদ-সংঘাত ও বলপ্রয়োগে মীমাংসার মনোভাব বাড়ছে, কমছে ছাড় দিয়ে হলেও বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ চিন্তার। পৃথিবী যেমন উত্তপ্ত হচ্ছে, সমাজমানসও তারই পথ ধরেছে। বিপরীতে হাসনাতভাইয়ের জীবনে, এমনকি তাঁর জীবনের সূচনাপর্বের দশকটির যে-চিত্র আমরা পাই তাতে আত্মপরিচয়ের বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এক মানবিক জীবনেরই ইশারা পাই। বলা বাহুল্য হাসনাতভাইকে কোনো মহামনীষী হিসেবে চিত্রায়িত করতে চাইছি – তা নয়, শুধু চাইছি একজন সচেতন জিজ্ঞাসু প্রাণবান মানুষ কীভাবে নিজের জীবনকে, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, কিছুটা হলেও সফল ও তাৎপর্যময় করে তুলতে পারেন তারই দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে। দশজনের সঙ্গে মিলে কিংবা একাকী সময়ে অথবা আনন্দ উদযাপনে বা নানা চাপের মুখেও ভেঙে না পড়ে টিকে থাকার ও উৎরে যাওয়ার সামর্থ্য কীভাবে অর্জিত হয় সেটাই চাওয়া এবং সেদিকে মনোযোগ আকর্ষণই উদ্দেশ্য। এটা হতে হবে কোনো বাড়তি দাবি বা রূঢ়তা-মূর্খতা-ক্ষমতার দাপট ছাড়াই সমঝোতাপূর্ণ জীবনের নকশা তৈরির মাধ্যমে। এটা জরুরি, গুরুত্বপূর্ণ।
অথচ এ-সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে আরো অনেক কাজ তো বাকি পড়ে আছে – কে বোঝাবে বা কীভাবে এ-সমাজ বুঝবে যে, ধর্ম রেখেই বিজ্ঞান চর্চা করা যায়, ধর্ম পালন করেও সংস্কৃতি ও কলাচর্চায় অসুবিধা নেই, নারীর জন্যে আরো পরিসর, ভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্যে সমানাধিকার এমনি কত বিষয় বাকি রয়েছে। রয়েছে আমাদের অভীষ্ট গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা মানবাধিকারের ইস্যুগুলোর সুষ্ঠু সমাধানের কাজ। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইহকালের জীবনকে তাৎপর্যময় ও সার্থক করে তুলতে প্রয়োজন এ-জীবনে আনন্দ ও সৌন্দর্যের সমন্বয়ের আয়োজন, যা প্রধানত মেলে সুকুমার কলা থেকে। কিন্তু শিল্পকলা নিয়ে সমাজের বিভ্রান্তি আজো কাটেনি। বরং নতুন করে যেন তা সমাজমানসে জাঁকিয়ে বসছে। অথচ বহুকাল ধরে মুসলিম চিন্তাবিদরা এ নিয়ে লিখে গেছেন। আমরা এখানে তেমন একজন বুদ্ধিজীবীর উদ্ধৃতি তুলে ধরছি –
কিসের জন্য জানি না, কার দোষে জানি না, আমাদের সমাজ জীবন হইতে নিঃশেষে বিসর্জন দেওয়া হইয়াছিল কালচারের সবচেয়ে সুকুমার সবচেয়ে মধুর সবচেয়ে স্নিগ্ধ সবচেয়ে সজীব সবচেয়ে প্রাণবন্ত প্রকাশ যে নাচ-গান তাকেই। আব্বাসুদ্দিন [লেখকের বানান] ও বুলবুলের অসামান্য প্রতিভাও তার সম্যক পুনরুদ্ধার ঘটাইতে পারে নাই। কে কবে পাক বাংলার মুসলিম কুষ্টি-জীবনে এই ভেণ্ডালিযম চালাইয়াছিল, সে বিতর্কে সময় নষ্ট না করিয়া অবিলম্বে তার পুনরুদ্ধারের কাজে লাগিয়া যাইতে হইবে।
এ-বক্তব্যের লেখক আবুল মনসুর আহমদ হিন্দু ও মুসলমানের সাংস্কৃতিক পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন থেকেও এবং ইসলাম ও মুসলিম ঐতিহ্য সম্পর্কে জেনেও শিল্পকলার পক্ষে নিঃশর্ত দৃঢ় বক্তব্য দিয়েছেন। একই সূত্রে সাংস্কৃতিক সমন্বয়বাদী চিন্তার বুদ্ধিজীবী কাজী মোতাহার হোসেনের ‘আনন্দ ও মুসলিম গৃহ’ প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করা যায়। উল্লেখ করা যায় আবুল হুসেনের ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’ ও ‘আদেশের নিগ্রহ’ এবং কাজী আবদুল ওদুদের ‘সম্মোহিত মুসলমান’ প্রভৃতি প্রবন্ধের কথা। মনে রাখতে হবে, এঁরা সকলেই কিন্তু গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন। তাঁরা যখন বাঙালি মুসলমানের জীবনে প্রকৃত আনন্দের অভাব দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন আমরা সেই একই সময়ে অর্থাৎ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বাঙালি মুসলমানের জাগরণের কথা বলছি। আসলে সেই জাগরণ ছিল দেশের কয়েকটি নগরের শিক্ষিত সমাজের মধ্যে সীমিত, যে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল তখন, তাতে প্রাণের জোগানদার ছিলেন মুষ্টিমেয় আলোকিত ব্যক্তি ও পরিবার, আর সে-কার্যক্রমকে ঘিরে কলারসিক জীবনবাদী যেসব মানুষজনের সংযোগ ঘটেছিল তার পরিসরটিও বড় ছিল না। ষাটের দশক জুড়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূত্রে তার বিকাশ ঘটলেও গ্রামাঞ্চলের আমজনগণকে তার রাজনীতি ছুঁয়েছিল বটে কিন্তু সংস্কৃতি ছুঁতে পারেনি। ফলে পঞ্চাশ-ষাট দশকের জাগরণ শেষ পর্যন্ত পূর্ণ বিকশিত হয়নি, পারেনি টেকসই হতে।
তবে আমাদের গ্রামসমাজ এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ সংস্কৃতি ছিল অসাম্প্রদায়িক, সমন্বয়ধর্মী, মানবতাবাদী। গ্রামসমাজকে ইসলামের রক্ষণশীল কট্টর পন্থার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা ওয়াহাবী মতবাদের অনুসারীরা সেই ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে দীর্ঘকাল ধরে চালিয়ে গেলেও তা এ-মাটিতে এবং সাধারণের মনে ঠাঁই পেতে শুরু করেছে আশির দশক থেকে। তখন বামপ্রগতির রাজনীতির অবক্ষয়ের এবং মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতামুখী আপসকামিতার সুযোগে সমাজে ধর্মভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যের ওয়াহাবী মতবাদের অনুসারী সংস্কৃতির প্রভাব বেড়েছে, যা ক্রমান্বয়ে একদিকে মুসলিম সামাজিকমানসকে আচ্ছন্ন করেছে আর অন্যদিকে নানা আন্তর্জাতিক অন্যায্য ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নিজেই ক্রমে কট্টর চরমপন্থী রূপ ধারণ করেছে। তার আঁচ এদেশেও লাগছে এবং এর দাপটে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সেক্যুলার সমন্বয়বাদী মানবিক সংস্কৃতির ধারা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, সেই সঙ্গে মূলধারার রাজনীতির আপসকামিতা ও পশ্চাদপদতার কারণে, তা আজ ক্রমে দুর্বল, স্তিমিত হয়ে পড়েছে।
সংস্কৃতিহীন শিক্ষা যেমন উন্নত দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করতে পারে না তেমনি সংস্কৃতিহীন রাজনীতি হারায় দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার, দুর্নীতির বাহন, মানবপীড়নের মাধ্যম। এ কেবল আমাদের সংকট তা নয়। বিশ্বের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে অধিকাংশ দেশেই চলছে এরকম সংকট। আমরা বুঝতে পারি বিভিন্ন দেশে কোনো কোনো গোষ্ঠী, যাঁরা সংখ্যায় কম হবেন না, তাঁরা তাঁদের বহুপরিচয়ের মধ্যে, সাময়িকভাবে হলেও, একটি কোনো পরিচয়কেই প্রধান করে তুলছেন। মার্কিন নির্বাচনের প্রচারণায় তাই একেক জায়গায় একেক ভোটারগোষ্ঠীর কাছে তোষামোদের ভিন্ন ভিন্ন বয়ান তুলে ধরতে দেখা যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীকে।
এতে ঘনায়মান সংকটের প্রকৃতিটা বোঝা যায়। মানুষও মৌলিকভাবে প্রাণীই – ক্ষুধা, ভয়, নিরাপত্তা, যৌনতা, হিংসা ইত্যাদি তারও জন্মসূত্রে প্রাপ্ত আদি প্রবণতা, এগুলোর সমাধান তার মৌলিক চাহিদা যা তার সত্তার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে গাঁথা। তুলনায় সাংস্কৃতিক বহুত্ব ও আত্মপরিচয়ের বৈচিত্র্য তার অর্জিত বিষয় – দেহ বা দেহজাত নয়, এসবের যোগ মানসের সঙ্গে। কিন্তু আজ রাজনীতি খেলছে মানুষের আদি অচ্ছেদ্য প্রবণতা নিয়ে – তার অন্যান্য অর্জিত প্রবণতা, অন্য বহুতর পরিচয় এবং সেসবের সংবেদনশীলতার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে। তাতে চাপা পড়ে যাচ্ছে মানুষের অর্জিত গুণাবলি, তার জীবনের বহুমাত্রিকতা, সমাজের বহুরৈখিকতার বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব। এভাবেই ঘটছে মানবের বামনায়ন বা মিনিয়েচারাইজেশন। জন স্টুয়ার্ট মিলের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় কিছু করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলছে মানুষ।
ছয়
এ-আলোচনার সূত্রপাত করেছিলাম বাঙালি মুসলমানের রেনেসাঁসের প্রসঙ্গ টেনে – পরিসরে, সৃজনে ও প্রভাবে হোক তা সীমিত, তবু সেই জাগরণ আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা ও পুঁজি দিয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, স্বাধীনতার পরেও তাকে পূর্ণতা দেওয়ার কাজ করা যায়নি। বরং বারবার প্রমাণিত হয়েছে আমাদের ক্ষুদ্রতা, অযোগ্যতা, ক্রমবামনায়ন। যারা রেনেসাঁসের পথেই চলতে চেয়েছিলেন, যেমন হাসনাতভাই, তাঁদের জন্যে চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। ঘরের এবং বিশ্বের পরিবর্তন তাতে আরো ইন্ধন দিয়ে চলেছে। সমাজে রক্ষণশীলতা ও ভোগবাদিতা বেড়েছে, আবার প্রথার অন্ধ অনুশীলন বেড়েছে। বিচারবোধ, যুক্তি চর্চার যথোচিত তীক্ষèতা যেমন তেমনি সুকুমার বৃত্তির চর্চা ও সমঝদারিতে যোগ্যতার ও আগ্রহের দৈন্য চলছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ব্যবস্থার কারণে জ্ঞানের ক্ষুধামান্দ্য চলছে। এখানে বলা যায় অতিমারির মত জীবনে বোধ, বুদ্ধি এবং রসের অনটনে ভুগছে সমকালীন বিশ্বসমাজ। ১৯২৬-এ ‘শিখা গোষ্ঠী’ যে সলতেটি জ্বালিয়েছিল তার বার্তা ছিল – ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ জ্ঞানের অসীমতা, সার্বভৌমত্বকে সমাজ ভয় পায়, মুক্তবুদ্ধির চর্চা তাই বাধাগ্রস্ত হয়। তেমন পরিবেশে মতপ্রকাশের প্রকৃত স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যথার্থ নিরীক্ষা অসম্ভব।
এটুকু বলে আমাদের সন্ধান করতে হবে করণীয়। বন্ধ্যত্ব কাটাতে আমরা হাত পাততে পারি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কাছে, তার কুশীলবদের পিতৃপুরুষ শিখাগোষ্ঠী এবং তাঁদেরও পূর্বসূরি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বা ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতো মনীষীদের জীবন ও কর্মের মধ্যে ভাবনা ও প্রেরণা খুঁজে নিতে পারি। পারি রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর থেকে রোকেয়া, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে কাজী নজরুল, জগদীশচন্দ্র থেকে জামাল নজরুলের জীবন ও কাজ থেকে প্রেরণার পুঁজি পেতে।
নতুনভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার স্বার্থমগ্ন যুদ্ধবাজ নীতির বিপরীতে আবারো সর্বসাধারণের কল্যাণের উপযোগী রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার চিন্তাধারা এবং নতুন কালের এসব ভাবনা ও কাজকে রূপায়ণ-ধারণের উপযোগী সংস্কৃতি চর্চাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিচ্ছিন্নতা, আত্মকেন্দ্রিকতার খোলস ভাঙতে হবে; সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, নাটক, চলচ্চিত্র, স্থাপত্য, ভাস্কর্যের রস-রূপের খোঁজ পেতে হবে, জীবনের দায় হিসেবেই এসবেরও চর্চায় মেতে উঠতে হবে নতুন প্রজন্মকে। এজন্যে সর্বাগ্রের কাজ হলো শিক্ষায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা, আজকের প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয় শিক্ষার্থীকে অ্যাক্টিভ বা সক্রিয় শিক্ষার্থী হয়ে ওঠার পরিবেশ দিতে হবে। শিশু অমিত সম্ভাবনার অধিকারী, তাদের অভিযোজনের ক্ষমতা সীমাহীন, কাজে যদি থাকে সৃজনশীলতার আনন্দ তাহলে তারা হার মানাতে পারে আলাদিনের চেরাগের দৈত্যকেও। সেই শিশুই পারে ভবিষ্যতের পরিণত রুচিশীল প্রাণবান ভারসাম্যপূর্ণ নাগরিকসমাজ গড়ে তুলতে।
তারা পারে কারণ তাদের মধ্যে এমন কিছু শক্তির ভ্রূণ আছে যার কোনো সীমা নেই, যা চর্চায় কেবলই বাড়ে। তাদের থাকে অপার বিস্ময় বা বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা, অসীম আনন্দ অর্থাৎ আনন্দিত হওয়ার অসীম ক্ষমতা, অফুরন্ত প্রাণশক্তি এবং সীমাহীন কৌতূহল। কিন্তু আমাদের পারিবারিক জীবন এবং সামাজিক শিক্ষা তার দেহ ও মনের চোখে ঠুলি পরায়, কপাট টেনে দেয়। এ অবস্থায় গোড়ায় হাত দিতে হবে, যাতে শিশু মানুষ হতে পারে এবং এই হওয়ার প্রক্রিয়া যেন চলমান থাকে আগাগোড়া জীবনব্যাপী। অব্যাহত বিকাশমান মানুষ তৈরি হওয়ার পথ খুলে গেলেই হাসনাতভাই এবং তাঁর সময়ের এবং পূর্বসূরি আলোকিত মানুষদের পথ ধরে এগোবার দিশা পাওয়া যাবে। পঞ্চাশ ও ষাট দশক থেকে যত অনুষঙ্গ তাঁদের জীবনের পাথেয় হয়েছিল তাতে সেই ধারাবাহিকতায় নতুন নতুন অনুষঙ্গ সংযোজন করে করে এগোতে হবে একালের পথিক অভিযাত্রীদের। উত্তরসূরিদের খুঁজে নেওয়া ও গড়ে তোলাই আজ আমাদের প্রজন্মের বেলাশেষের বড় কাজ। সম্ভবত সেটাই হবে হাসনাতভাই এবং সেই
প্রজন্মের সচেতন অগ্রসর মানুষদের জীবনব্যাপী প্রয়াসের যথার্থ স্বীকৃতি।
(পহেলা নভেম্বর ২০২৪ তারিখে কালি ও কলম-আয়োজিত ‘আবুল হাসনাত স্মারক বক্তৃতা’ অনুষ্ঠানে পঠিত)


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.