বাঙালির জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে ‘বুদ্ধিজীবী’ (Intellectual) ধারণাটি-সম্পর্কে অস্বচ্ছতা একরকম সয়ে-যাওয়া অস্বাভাবিক বিষয়ের মতো। পরিভাষাটি আমাদের এখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত। অথচ কে বুদ্ধিজীবী, কেন তিনি বুদ্ধিজীবী, কী তাঁর দায়িত্ব ও দায়ভার- এসব জরুরি বিষয় গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়নি। এ-সম্পর্কে বিদগ্ধজনের বিচ্ছিন্ন মন্তব্য, বুদ্ধিজীবীর দু-একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিরল আলোচনা এবং পরিভাষাটির যথেচ্ছ ব্যবহার-অপব্যবহার ‘বুদ্ধিজীবী’-সম্পর্কে আমাদের মধ্যে যথেষ্ট অস্পষ্টতা ও কিছুটা বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করে রেখেছে। এ-পরিপ্রেক্ষিতে কালি ও কলমের জ্যৈষ্ঠ, ১৪১১ সংখ্যায় শহিদুল ইসলামের ‘কে বুদ্ধিজীবী’ শিরোনামের সংক্ষিপ্ত নিবন্ধটি একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা বলে মনে হয় – বিশেষ করে বিষয়টি-সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উদ্বোধনের কারণে, লেখাটির অন্তর্গত বক্তব্যের জন্যও।
নিবন্ধ-লেখক কয়েকজন পণ্ডিত-বুদ্ধিজীবীর মতামত উল্লেখ করে বুদ্ধিজীবী ও তার তৎপরতা-সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে এডওয়ার্ড ডব্লিউ. সাঈদ তাঁর Representation of the Intellectual (১৯৯৬) গ্রন্থে বুদ্ধিজীবী-সম্পর্কে যে-বক্তব্য উপস্থিত করেছেন তা-ই শহীদুল ইসলামের মূল অবলম্বন। এ-দিক থেকে নিবন্ধটি সাঈদের গ্রন্থের আলোচনার প্রয়াস বললে ভুল হয় না। র্যান্ডম হাউজ ইনকরপোরেশনের এক শাখা প্যান্থন বুকস ১৯৯৪ সালে বইটি প্রকাশ করে, আরেক শাখা ভিন্টেজ বুকস বের করে ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৩ সালে বিবিসি থেকে প্রচারিত সাঈদের রিথ বক্তৃতার সংকলন Representation of the Intellectual ইউরোপ ও আমেরিকায় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। এতে বুদ্ধিজীবী-সম্পর্কে তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক মতামত ও অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বুদ্ধিজীবীর যথাযথ পরিচয়প্রদান এবং সমাজে তার দায়িত্ব ও ভূমিকা-সম্পর্কে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন একটি ধারণা উপস্থিত করেন সাঈদ, যা প্রচল বিশ্বে যথেষ্ট কার্যোপযোগী। এ-গ্রন্থটি নির্ভর করে রচিত নিবন্ধ ‘কে বুদ্ধিজীবী’-তে অনালোচিত এবং কিছুটা বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপিত কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করার জন্য আমার এ-প্রতিক্রিয়া; আসলে এটিকে প্রতিক্রিয়া নয়, এক অর্থে নিবন্ধটির সংযোজনী বলেও চালিয়ে দেওয়া সম্ভব।
শহিদুল ইসলাম যে-জ্ঞানতাত্ত্বিক পটভূমিতে বুদ্ধিজীবী-ধারণাটি ব্যাখ্যা করেছেন, তা যথাযথ নয়। এ-কারণে তাঁর আলোচনায় বুদ্ধিজীবী সংজ্ঞার্থ ও প্রায়োগিক ব্যাপ্তি নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। যেসব পণ্ডিতকে তিনি উদ্ধৃত করেছেন তাঁদের মতামত-সম্পর্কে বিভ্রান্তিও দুর্লভ নয়। তার চেয়ে বড় কথা, বুদ্ধিজীবী, তার বৈশিষ্ট্য, যোগ্যতা ও ক্ষমতা, তার দায়িত্ব ও কর্তব্য-সম্পর্কে সাঈদের বক্তব্য-ব্যাখ্যাতেও গোলযোগ রয়ে গেছে। একটি বিষয়-সম্পর্কে বলার মতো জরুরি কথা আছে আমাদের।
সাধারণভাবে প্রচলিত ধারণায় বুদ্ধিজীবীর ভাবমূর্তির সাথে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা, পাণ্ডিত্য ও পণ্ডিতি মনোভাবের একটি নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করা আছে। নিবন্ধটি পড়ে মনে হয়, শহিদুল ইসলামও সাধারণীকৃত এ-গণধারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন। উচ্চশিক্ষিত মানুষমাত্রই যে বুদ্ধিজীবী নয়, তা বোঝানোর জন্যই আলোচনার শুরুতে বেশ উল্লেখযোগ্য এক অংশ ব্যয় করে ফেলেন তিনি। তিনি নিজের একটি প্রবন্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লিখেছেন, সেদিন আমি প্রশ্ন তুলেছিলাম, ‘শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী কি সমার্থক?’ অতঃপর তিনি বিনয় ঘোষকে সাক্ষ্য মেনে মন্তব্য করেছেন যে, বিনয় ঘোষও মনে করেন বিদ্বান হলেই বুদ্ধিজীবী হয় না। এ-কারণেই শহিদুল ইসলাম Intellectual -এর প্রতিশব্দ হিসেবে বুদ্ধিজীবীর বদলে বিনয় ঘোষের বিদ্বৎজন কথাটি পছন্দ করেন; শব্দটির মধ্যে ‘বিদ্যা’র গুরুগম্ভীর কড়মড় পরিষ্কার।
লেখক উচ্চশিক্ষা ও বুদ্ধিজীবীর সম্পর্ক বিষয়ক বিতর্কে সাঈদকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ব্যবহার করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘দুর্বল ও নামগোত্রহীন মানুষের সঙ্গে থাকাই আজকের পৃথিবীতে বুদ্ধিজীবীর প্রধান দায়িত্ব। এ-সম্পর্কে সাঈদের মনে কোনো দ্বিধা নেই। তাই আজকের সভ্যতায় কেউ যদি বিদ্যার জাহাজ হয়েও সেই বিদ্যার ভারে নুইয়ে থাকেন এবং সমাজ ও মানুষের কোনো কাজে না আসেন, তাকে বুদ্ধিজীবী বলা যাবে না। বিনয় ঘোষ ১৯৭৩ সালে এ-ধরনের পণ্ডিত-সম্পর্কে এই বলে মন্তব্য করেছিলেন, “মহাবিদ্বান কেউ যদি অগাধ জ্ঞানসমুদ্রে ডুব দিয়ে তলিয়ে থাকেন এবং কেবল ভুড়ভুড়ি কাটেন, যদি তাকে দেখা না যায়, তার চিন্তাভাবনার কথা জানা না যায় তাহলে জ্ঞান-তপস্বী ‘স্কলার’ হলেও সামাজিক অর্থে ইন্টেলেকচুয়াল নন।”
এখানে, উচ্চশিক্ষিত মাত্রই বুদ্ধিজীবী কি-না সে-বিতর্কে সাঈদের বক্তব্য প্রাসঙ্গিক নয়। সাঈদের বক্তব্যের অংশবিশেষ এমনভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেন মনে হয় সাঈদের কাছেও উচ্চশিক্ষা ও বুদ্ধিজীবীর সম্পর্ক বিষয়ক বিতর্ক জরুরি। কিন্তু আদতে সাঈদ তাঁর গ্রন্থের ওই অংশের আলোচনায় কথা বলেছেন বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব নিয়ে। তাঁর গ্রন্থটির সর্বত্র তিনি যা বলতে চেয়েছেন তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই যে, বুদ্ধিজীবী ক্ষমতা এবং মানুষের ওপর ক্ষমতার আপতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, ক্ষমতাহীনদের সমর্থন করবেন। সাঈদের এ-বক্তব্যের সঙ্গে বিদ্যার জাহাজ হওয়া আর বুদ্ধিজীবীর প্রসঙ্গ টেনে-আনা তার অন্যরকম অপব্যবহার। সাঈদের বক্তব্য এবং লেখক ও বিনয় ঘোষের বক্তব্যের অভিমুখ ও পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন। বুদ্ধিজীবীর দায়-দায়িত্বের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সম্পর্ক অনিবার্য নয়।
জুলিয়ান বেন্ডা কিংবা গ্রামসিও বুদ্ধিজীবীর সাথে শিক্ষার সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য মনে করেননি। বুদ্ধিজীবীর পরিচয় ও তার দায়িত্ব-কর্তব্য-সম্পর্কে এ-দুজন বুদ্ধিজীবীর মতামত গত কয়েক দশক ধরে বহু-ব্যবহৃত দুই বিপরীত মেরুর গুরুত্ব পেয়ে আসছে। গ্রামসি কেবল এটুকু বলেছেন যে, জৈব বুদ্ধিজীবীরা প্রধানত টেকনিক্যাল জ্ঞানের বদৌলতে বুদ্ধিজীবী। সাঈদও তাঁর গ্রন্থে কোথাও বলেননি বুদ্ধিজীবী হওয়ার জন্য আদৌ উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন আছে; বরং তিনি বুদ্ধিজীবীর কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও দায়িত্ব-কর্তব্য নির্দেশ করেন, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে চিহ্নিত করে। যাহোক, আমরা এ-ব্যাপারে দীর্ঘ বিতর্কে না গিয়ে কেবল এটুকু বলে শেষ করব যে, সাঈদ তাঁর গ্রন্থে বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে বিদ্যার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তোলেননি, কথা বলেছেন আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ে – বুদ্ধিজীবীর মানবিক বৈশিষ্ট্য, তার দায়-দায়িত্ব, ক্ষমতার সাথে তার সম্পর্ক, তার কাজের ধরন ও কৌশল এবং তার পরিপার্শ্ব নিয়ে। শহিদুল ইসলাম তাঁর নিবন্ধে বুদ্ধিজীবী-সম্পর্কে এই আলোচনা-রেখাটি এড়িয়ে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসংক্রান্ত বিতর্ক তুলে বুদ্ধিজীবীর মূল বৈশিষ্ট্যগুলোকে গৌণ করে ফেলেন। এ-কারণে তাঁর লেখায় বুদ্ধিজীবীর পরিচয়-সম্পর্কিত অস্পষ্টতা অনড় থেকে যায়। আমরা এখানে সাঈদ ও গ্রামসির আলোকে বুদ্ধিজীবী-সম্পর্কে একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।
সাঈদের মতে, বুদ্ধিজীবী সেই মহৎ বৈশিষ্ট্য বা গুণের অধিকারী ব্যক্তি যার তাড়নায় তিনি জনসমাজের জন্য ও জনসমাজের মধ্যে কোনো বক্তব্য, মনোভাব, দর্শন, বা মতামত রূপায়িত করেন, তা উচ্চারণ করেন ও তার প্রতিনিধিত্ব করেন। সমাজে এ-ভূমিকা পালনের জন্য তার সুযোগ রয়েছে। আবার এ-ভূমিকা পালন করতে হলে বুদ্ধিজীবীর মধ্যে এমন এক আত্মসচেতনতা কাজ করতে হবে যে, তার দায়িত্বই হলো বিব্রতকর প্রশ্ন তোলা, রক্ষণশীলতা, কর্তৃত্ব ও অন্ধ বিশ্বাস (সৃষ্টির পরিবর্তে এগুলো) মোকাবিলা করা; তার মধ্যে এমন বোধ কাজ করবে যে, সরকার বা করপোরেশনগুলো কর্তৃক করায়ত্ত হওয়ার মতো কেউ নন তিনি। বরং তিনি এমন কেউ, যার প্রধান দায়িত্ব হলো ওইসব ব্যক্তি, ঘটনা বা বিষয়াবলি তুলে ধরা, যা নিয়মিত ভুলে যাওয়া হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী তা করবেন এই বৈশ্বিক নীতি মেনে যে, সকল মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন শক্তি ও জাতিসমূহের নিকট থেকে (স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের ব্যাপারে) গ্রহণযোগ্য মানের আচরণ আশা করেন ও তা পাওয়ার অধিকার রাখেন। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই মান ভঙ্গ করলে বুদ্ধিজীবীকে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে হবে এবং সাহসের সাথে লড়াই করতে হবে (সাঈদ, ৯৬: ১১-১২)।
সাঈদ বলেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা নির্দিষ্ট ভাষা, ঐতিহ্য ও ইতিহাসবিশিষ্ট সমাজের সদস্য, যার নিয়ত চাপ পড়ে তার তৎপরতার ওপর। তেমনি বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে একটি সম্পর্ক থাকে প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংঘ, পেশাজীবী সংঘ ও বৈষয়িক ক্ষমতার সাথে, যা বর্তমান পৃথিবীতে বুদ্ধিজীবীদের উল্লেখযোগ্য মাত্রায় করায়ত্ত করে নিয়েছে। সাঈদ বলেন, ‘আমার মতে প্রধানতম বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব হলো ওইসব চাপ থেকে তুলনামূলক স্বাধীনতা খুঁজে নেওয়া। অতপর, বুদ্ধিজীবীকে আমি মনে করি পরবাসী, প্রান্তবর্তী, অপেশাদার এবং এমন এক ভাষার অধিকারী যা ক্ষমতার মুখের ওপর সত্য উচ্চারণের চেষ্টা করে’ (সাঈদ, ৯৬ : xvi)।
ভাষা কীভাবে ভালোভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং কখন ভাষায় হস্তক্ষেপ করতে হয় সে-সম্পর্কিত জ্ঞান, সাঈদের মতে, বুদ্ধিজীবীর দুটি বিরল গুণ (সাঈদ, ৯৬:২০)। বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব-সম্পর্কে সাঈদের বক্তব্য ঋজু ও পরিচ্ছন্ন। তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবী যে-কোনো কর্তৃত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবেন। যেমন, পৃথিবীর দেশে দেশে বিদ্যমান প্রচলিত পদ্ধতির সরকারগুলোর কর্তৃত্ব। সরকারগুলোর কর্তৃত্ববাদী ভূমিকার মুখে পশ্চিমের উত্তরাধুনিকতাপন্থি বুদ্ধিজীবীদের একাংশ উদাসীন; যেমন লিওতার্দ উত্তরাধুনিক চিন্তনভঙ্গির দোহাই পেড়ে মন্তব্য করেন, বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব-কর্তব্য আধুনিকতার জিনিস এবং বর্তমান উত্তরাধুনিক ভাবনাভঙ্গির প্রভাবকালে অচল। এর জবাবে সাঈদ বলেন, সরকারগুলো এখনো প্রকাশ্যে মানুষকে দমন করছে, ন্যায়বিচারের ভয়াবহ ব্যত্যয় হচ্ছেন, ক্ষমতাকর্তৃক বুদ্ধিজীবীদের করায়ত্ত করার প্রক্রিয়া তাদের কণ্ঠ থামিয়ে দিচ্ছে এবং প্রায়শই পথভ্রষ্ট হচ্ছেন বুদ্ধিজীবীরা। এসব কারণে বুদ্ধিজীবীদের করার মতো বহু জরুরি কাজ রয়ে গেছে (সাঈদ, ৯৬ : ১৮)।
এখানে স্বীকার করতে দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে, পশ্চিমা সরকারগুলো অন্য দেশে নিয়মিত আগ্রাসন চালালেও নিজের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ও আচরণে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলো শোষণ-পীড়ন-দমন পরিচালনা করে নিজেদের জনগণের ওপরে। সুতরাং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব আরো ব্যাপক ও জরুরি এবং তার নিরপেক্ষতা আরো গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারি।
কিছু তথ্যগত বিভ্রান্তিও রয়ে গেছে শহিদুল ইসলামের প্রবন্ধে। যেমন, এক জায়গায় তিনি সাঈদের বক্তব্যকে মিশেল ফুকোর বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘ফুকো বলেন, বুদ্ধিজীবী ছাড়া আধুনিক ইতিহাসে কোনো বিপ্লব সংঘটিত হয়নি, তেমনি বুদ্ধিজীবী ছাড়া পৃথিবীতে প্রধান কোনো প্রতিবিপ্লবও সংঘটিত হয়নি। তাই ফুকো বুদ্ধিজীবীদের যে-কোনো আন্দোলনের মা-বাবা, অবশ্যই পুত্র-কন্যা, এমনকি ভাইপো-বোনপো বলে উল্লেখ করেন।’ এটি আসলে সাঈদের কথা, রিপ্রেজেন্টেশনের প্রথম অধ্যায়ের ১১ নম্বর পৃষ্ঠার অংশ।
সাঈদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মমগ্ন বুদ্ধিচর্চার (যা মূলত নান্দনিকতার দোহাই পেড়ে রাজনৈতিক-বিতর্ক থেকে আত্মমুখী পলায়ন, তার) বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে, Private Intellectual বলে কিছু নেই। কারণ বুদ্ধিজীবীর চিন্তা প্রকাশিত হওয়ামাত্র সমাজের সাথে সম্পৃক্ত হয় এবং সে-সূত্রে বুদ্ধিজীবী প্রবেশ করেন গণসমাজে। শহিদুল ইসলাম Private কথাটি বুঝতেও ভুল করেন। তিনি একে Privati“ation -এর সঙ্গে সম্পৃক্ত মনে করে মন্তব্য করেন, ‘বর্তমানের এই রমরমা Privati“ation -এর যুগে বুদ্ধিজীবীর Privati“ation সম্ভব নয়।’
সাঈদ বলেন, ‘বুদ্ধিজীবীর তৎপরতা পরিচালিত হবে বৈশ্বিক মানদণ্ডে। তিনি অপর ব্যক্তি বা অপরের জাতি বা রাষ্ট্রের যে-কাজকে গর্হিত মনে করবেন তা নিজের এবং নিজ জাতি ও রাষ্ট্রের জন্যও অনুচিত ভাববেন। কিন্তু সাঈদ অভিযোগ করেন, অনেক পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী নিরপেক্ষতার এ-নীতি মেনে চলেন না। তারা নিজের দেশ ও জাতির প্রতি চরম পক্ষপাতিত্ব দেখান।’ উদাহরণ হিসেবে সাঈদ ফরাসি বুদ্ধিজীবী অ্যালেকসিস দ্য টকোভিলের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, ‘টকোভিল আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠীর দ্বারা কালোদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের প্রতিবাদ করেন। কিন্তু ১৮৩০-৪০-এর দশকে ফ্রান্স কর্তৃক আলজেরিয়া দখল ও মুসলমানদের ব্যাপক হারে হত্যা করার ঘটনাকে সমর্থন করেন। কারণ টকোভিল মনে করেন, মুসলমানরা নিম্নস্তরের ধর্মবিশ্বাসী বলে তাদেরকে এভাবে সুশৃঙ্খল করার প্রয়োজন আছে।’
সাঈদের এ-বক্তব্যের বিভ্রান্তিকর এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন শহিদুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, বুদ্ধিজীবীকে কোনো না কোনো মত ও পথের সমর্থক হওয়া উচিত, তার উদাহরণ হিসেবেই নাকি সাঈদ টকোভিলকে উল্লেখ করেছেন। আমরা এখানে প্রথমে শহিদুল ইসলামের নিবন্ধ থেকে সংশ্লিষ্ট অংশটি তুলে ধরছি। তিনি লিখেছেন : “ফুকো বলেন, ‘একজন মতাদর্শহীন ব্যক্তিকে লেখক বলা উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং অতিরঞ্জিত করা। প্রত্যেক বুদ্ধিজীবীই কোনো না কোনো মত ও পথের সমর্থক। তার একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকে।’ উদাহরণ হিসেবে সাঈদ Culture and Imperialism গ্রন্থ থেকে একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি বুদ্ধিজীবী Alexis De Tocqueville আমেরিকার গণতন্ত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন এবং ইন্ডিয়ান ও কালো ক্রীতদাসদের সঙ্গে তারা যে-ব্যবহার করত তার তীব্র সমালোচনা করেন। কিন্তু সেই তিনিই ১৮৩০-৪০-এর শেষে ফ্রান্সের উপনিবেশবাদী নীতি এবং আলজিরিয়া-দখলের সমালোচনা করেন না।”
উদ্ধৃতিটির অর্থ দাঁড়াচ্ছে এই যে, সাঈদ মনে করেন, ‘কোনো না কোনো মত ও পথের সমর্থক’ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে টকোভিল ফ্রান্সের উপনিবেশবাদী নীতি ও আলজিরিয়া-দখলের সমালোচনা করেননি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সাঈদের বক্তব্য প্রায় বিপরীত। তিনি লেখেন : One of the shabbiest of all intellectual gambits is to pontificate about abuses in some one else society and to execuse exactly the same practices in oneÕs own. For me the classical example of this is provided by the brilliant ninteenth century French Intellectual Alexis de Tocqueville (সাঈদ, ৯৬ : ৯২)। উপরের বাক্যদুটি থেকে যে-কেউ বুঝতে পারবেন, অত্যন্ত ‘সঙ্কীর্ণ ও পক্ষপাতমূলক’ বুদ্ধিবৃত্তিক চালবাজির উদাহরণরূপেই সাঈদ টকোভিলের বিষয়টি উল্লেখ করেন। টকোভিলের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা-সম্পর্কে সাঈদ আরো বিস্তৃত আলোচনা করেছেন তাঁর Culture and Imperialism গ্রন্থে (দ্র: সাঈদ, ৯৪ : ২২১, ২৫০)। অথচ শহিদুল ইসলাম বলতে চেয়েছেন, কোনো-না-কোনো রাজনৈতিক মতের সমর্থক না হলে যে লেখক বা বুদ্ধিজীবী হওয়া যায় না তার উদাহরণ হিসেবেই টকোভিলের উল্লেখ এবং শহিদুল ইসলামের ভাষাতেও বলব, টকোভিলের সে-রাজনৈতিক মতাদর্শ হলো ‘মুসলমানরা একটি নিম্নস্তরের ধর্মে বিশ্বাস করে। কাজেই তাদের সংশোধন করতেই হবে (দেশ দখল ও গণহত্যার মাধ্যমে)।’ এ-প্রসঙ্গে আমরা বিশ শতকের আরেক বুদ্ধিজীবী ফ্রাঞ্জ ফানোর কথা স্মরণ করতে পারি, যিনি আলজেরিয়ায় ফরাসি উপনিবেশের বিরুদ্ধে বলেছেন।
সাঈদ বহু পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীর সাম্রাজ্যবাদী কপটতা ও খ্রিষ্টীয় মৌলবাদী-প্রবণতা খুলে খুলে দেখিয়েছেন। তিনি এমন আরো অনেক দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন ওরিয়েন্টালিজম (১৯৯৫) ও কাভারিং ইসলাম (১৯৯৭) গ্রন্থে। সাঈদ মনে করেন, ইসলামি মৌলবাদ-বিষয়ে পশ্চিমের বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্যে কপটতা রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি উপলব্ধি করি, পশ্চিমে ইসলামি মৌলবাদ-সম্পর্কে বানোয়াট সতর্কতামূলক ও ত্রুটিপূর্ণ আলোচনাগুলো জনসমর্থন হারাচ্ছে। কারণ ওগুলোয় ইহুদি ও খ্রিষ্টীয় মৌলবাদের সঙ্গে ইসলামি মৌলবাদের তুলনা করা হয়নি।’ (সাঈদ, ১৯৯৬, ৬০)। সাঈদ নিজেও এই কপটতা ও মৌলবাদী মনোভাবজাত ক্ষোভের শিকার (দ্র: সাঈদ, ১৯৯৫, ৩৩০-৩৩৩)।
বুদ্ধিজীবী-সম্পর্কে গ্রামসির বক্তব্য বুঝতেও ভুল করেছেন শহিদুল ইসলাম। তিনি লিখেছেন, ‘গ্রামসি বুদ্ধিজীবীদের দুটি গ্রুপে ভাগ করেন। এক, ঐতিহ্যবাহী এবং দুই, জৈব বুদ্ধিজীবী। প্রথম দলে আছেন শিক্ষক, যাজক, পুরোহিত, মোল্লা এবং প্রশাসক। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই কাজ করে চলেন। …গ্রামসি বিশ্বাস করেন যে, জৈব বুদ্ধিজীবীরা সমাজে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। তারা চিন্তার পরিবর্তনের জন্য নিরলস সংগ্রাম করে চলেন। নিজেদের সামাজিক ভূমিকা বাড়িয়ে চলেন। অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধিজীবীরা একই স্থানে স্থবির থাকতে পছন্দ করেন।’
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, গ্রামসির মতামত-সম্পর্কে এ-ধারণা শহিদুল ইসলাম কোত্থেকে নিয়েছেন – সাঈদের আলোচ্য গ্রন্থে গ্রামসি-সম্পর্কে প্রদত্ত মতামত থেকে, নাকি সরাসরি প্রিজন নোটবুক থেকে। যা-ই হোক, আমরা প্রথমে সাঈদের গ্রন্থর্বর্তী মতামতের সঙ্গেই তুলনা করি। সাঈদ লিখেছেন, ‘গ্রামসি মনে করেন, জৈব বুদ্ধিজীবীরা সরাসরি সম্পর্কিত বিভিন্ন শ্রেণি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, যেগুলো বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহার করে আরো মুনাফা, আরো নিয়ন্ত্রণ আরো ক্ষমতালাভের কাজে। … আজকের জামানায় বিজ্ঞাপন-বিশেষজ্ঞ বা জনসংযোগ-বিশেষজ্ঞ যিনি কোনো এয়ারলাইনস বা ডিটারজেন্ট কোম্পানির বাজার বাড়ানোর কৌশল উদ্ভাবন করেন, গ্রামসির মতে, তিনি জৈব বুদ্ধিজীবী। এদের উদ্ভব পুঁজিবাদী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে। বোঝাই যাচ্ছে, সমাজ-গঠনে এইসব টেকনিশিয়ান বুদ্ধিজীবীদের অবদান স্বীকার করেন গ্রামসি। কিন্তু তাদের দেখেন নেতিবাচক দৃষ্টিতে’ (সাঈদ, ৯৬ : ৪)। অর্থাৎ সাঈদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামসির জৈব বুদ্ধিজীবী আক্ষরিক অর্থেই ‘বুদ্ধি’ প্রয়োগ করেন নিজের ও তার কোম্পানি বা করপোরেশন বা শ্রেণির বা সংঘের মুনাফা, প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য। নৈতিক দায় বা মানবিকবোধ নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই তাদের। এবার দেখা যাক বুদ্ধিজীবী-সম্পর্কে প্রিজন নোটবুকে কী লিখেছেন গ্রামসি।
গ্রামসি বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আলোচনা করেছেন শ্রেণিসম্পর্ক, তাঁর উদ্ভবের প্রক্রিয়া ও সামাজিক ভূমিকার ভিত্তিতে। তিনি বুদ্ধিজীবীর নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা প্রদান করেননি। এর কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি মনে করেন, বুদ্ধিজীবীরা কোনো স্বতন্ত্র সামাজিক শ্রেণি বা উপশ্রেণি নন। বরং বুদ্ধিজীবী শ্রেণিগুলোরই অন্তর্ভুক্ত উপাদান এবং প্রতিটি শ্রেণিরই শ্রেণিভিত্তিক চিন্তাধারায় প্রাণিত নিজস্ব বুদ্ধিজীবী-দল রয়েছে। আবার প্রত্যেক মানুষেরই একজন বুদ্ধিজীবী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে, যেহেতু তার রয়েছে বুদ্ধি প্রয়োগ করার ক্ষমতা।
গ্রামসি বলেন, ‘All men are intellectual, one could therefore say; but not all men have in society the function of intellectual’ (গ্রামসি, ৯৮ : ৯)। তাঁর এই বক্তব্য থেকে আমরা বুঝতে পারি, গ্রামসি বুদ্ধিজীবী বলতে তাদেরকেই বুঝিয়েছেন যারা প্রধানত বুদ্ধিনির্ভর কাজ-কর্মে জড়িত এবং সে-কর্ম তার শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে এবং সমাজকে কোনো-না-কোনোভাবে প্রভাবিত করে অথবা প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এ-মানদণ্ডের আলোকে গ্রামসি বুদ্ধিজীবীদের দুটি ধরনে ভাগ করেন : এক, ঐতিহ্যবাদী বুদ্ধিজীবী, দুই, জৈব বুদ্ধিজীবী। ঐতিহ্যবাদী বুদ্ধিজীবীদের পরিচয় সঠিকভাবেই তুলে ধরেছেন শহিদুল ইসলাম। কিন্তু জৈব বুদ্ধিজীবীদের বুঝেছেন অপূর্ণভাবে। তিনি ভালোমন্দের দ্বৈততার ধারণায় পা রেখেছেন। তাই যেহেতু ঐতিহ্যবাদী বুদ্ধিজীবীরা ‘মন্দ’, তাই জৈব বুদ্ধিজীবীরা তার কাছে ‘ভালো’। শহিদুল ইসলাম গ্রামসির নামে জৈব বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক ভূমিকার একরকম তারিফ করেছেন। কিন্তু গ্রামসি নিজে তা করেননি। তার নিকট জৈব আর ঐতিহ্যবাদী – উভয় দলের ভূমিকাই নেতিবাচক, যেহেতু বর্তমান পৃথিবীতে সক্রিয় জৈব বুদ্ধিজীবীরাও শিল্পায়িত বুর্জোয়া সমাজের উৎপাদন।
গ্রামসি বলেন, In the modern world, technical education, closely bound to industrial labour even at the most primitive and unqualified level, must form the basis of the new type of intellectual. (গ্রামসি, ৯৮ : ৯)। এ-বক্তব্য দ্বিতীয়োক্ত ধরনের বুদ্ধিজীবী-সম্পর্কে। গ্রামসি পরিষ্কার বলতে চেয়েছেন যে, শিল্পায়িত সমাজে প্রকৌশলগত শিক্ষা ওই ধরনের বুদ্ধিজীবীদের ভিত্তি, এমনকি কৌশলগতজ্ঞান খুব প্রাথমিক পর্যায়ের হলেও। জৈব বুদ্ধিজীবীদের পেশাগত অবস্থান নয়, বরং তার তৎপরতার সামাজিক ভূমিকা তার বুদ্ধিজীবিতা নির্ধারণ করে। এই বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো তার শ্রেণির রুচি, চিন্তাভাবনা, ধারণা, আকাক্সক্ষার বিস্তার ঘটানো। যেমন, একজন বিজ্ঞাপন-বিশেষজ্ঞ গ্রামসির জৈব বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টান্ত। কারণ, ওই বিশেষজ্ঞ মানুষটি পণ্যের প্রচার ও প্রসারের কৌশল উদ্ভাবন করে পণ্যের ব্যবহার বাড়াচ্ছেন, সমাজে ওই পণ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট রুচি গড়ে তুলছেন এবং এভাবে তার এবং তার কর্তৃপক্ষের মুনাফা, নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করছেন (গ্রামসি, ৯৮ : ৩)। সে-অর্থে একজন ইঞ্জিনিয়ার বা ফ্যাশন ডিজাইনার বা যুদ্ধবাজ মারণাস্ত্র-বিশেষজ্ঞও জৈব বুদ্ধিজীবী।
গ্রামসি বলেন, বুদ্ধিজীবীর উদ্ভব দুভাবে। প্রথমত, প্রতিটি শ্রেণি/সামাজিক গোষ্ঠী বিকশিত হওয়ার সময় ওই শ্রেণির নিজস্ব বুদ্ধিজীবী-দলেরও বিকাশ ঘটে। এরা প্রধানত জৈব বুদ্ধিজীবী। আবার প্রতিটি শ্রেণি বিকশিত হয়ে প্রাক-অস্তিত্ববান একদল বুদ্ধিজীবীর দেখা পায়। এরা প্রধানত ঐতিহ্যবাদী বুদ্ধিজীবী (গ্রামসি, ৯৮ : ৫-৬)। যেমন, শিক্ষক, আমলা, ধর্মযাজক ইত্যাদি। গ্রামসি ইতালির পরিপ্রেক্ষিত থেকে ব্যাখ্যা করে দেখান যে, ঐতিহ্যবাদী বুদ্ধিজীবীরা প্রধানত গ্রামাঞ্চল বা মফস্বল শহরে উদ্ভূত, আর জৈব বুদ্ধিজীবীরা মূলত শিল্পায়িত বড় বড় শহর এলাকার মানুষ (গ্রামসি, ৯৮ : ১৪)।
গ্রামসির ঐতিহ্যবাদী বুদ্ধিজীবীরা চিন্তাভাবনায় স্থবির, যুগের পর যুগ ধরে একই ধরনের কাজ করে চলেন। সুতরাং এরা সামাজিক পরিবর্তনে গ্রহণযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন না। আবার জৈব বুদ্ধিজীবীদের মনে করেন আধিপত্যশীল শ্রেণির মুনাফা বৃদ্ধি, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রসার এবং শ্রেণিগত চিন্তাভাবনা-বিস্তারে নিয়োজিত। তাই এদের ভূমিকাও কাম্য নয়।
আসলে বুদ্ধিজীবী-সম্পর্কে গ্রামসির আলোচনাকে বুঝতে হবে সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের পটভূমিতে। একসময় কওটস্কির অনুসরণে এমন মত প্রবল হয়ে উঠে যে, বুর্জোয়াদের দল থেকে বের হয়ে আসা বুদ্ধিজীবীরা সমাজতান্ত্রিক বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পর এক পর্যায়ে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে সচেতনতা জাগানো এমনকি নেতৃত্বের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু এমন ‘এলিট’ সৃষ্টির বিপক্ষে দৃঢ় মত ব্যক্ত করেন লেনিন। তিনি ঘোষণা করেন, শ্রমের কোনো বিভাজন থাকবে না, শ্রমিকদের সচেতন ও সংগঠিত করার দায়িত্ব স্বয়ং বিপ্লবী দলের। সেখানে বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক সকলেই এক হয়ে একটি একক সামগ্রিক শক্তিতে পরিণত হবে। লেনিনের এই বক্তব্যকে বিস্তৃত করে গ্রামসি মত ব্যক্ত করেন যে, জাগ্রত সর্বহারা শ্রেণি তার বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পথে নিজেই সৃষ্টি করে নেবে তার নিজস্ব জৈব বুদ্ধিজীবীদল। পার্টির দায়িত্ব হবে এদেরকে অনুকূলে কাজে লাগানো। গ্রামসি শিল্পায়িত পুঁজিবাদী সমাজে বিকশিত জৈব বুদ্ধিজীবীদের ইতিবাচক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি, তাদের উদ্ভবের প্রক্রিয়া ও ভূমিকা ব্যাখ্যা করে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন যাতে বোঝা যায় সর্বহারা শ্রেণির নিজস্ব বুদ্ধিজীবীদের উদ্ভব কীভাবে হবে এবং কীভাবে তাদের ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে হবে।
আমাদের সম্ভবত ব্যাখ্যা করে দেখানোর প্রয়োজন নেই যে, সাঈদ গ্রামসির এই পরোক্ষ সংজ্ঞায়নের ব্যবহারিক উপযোগিতা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করলেও নিজের আলোচনায় তা সর্বাংশে মেনে নেননি। শহিদুল ইসলাম নিজেও তা উল্লেখ করেছেন। সাঈদ বরং গ্রামসি ও জুলিয়ান বেন্ডার-নির্দেশিত সংজ্ঞা এবং আজকের দুনিয়ায় প্রচল ধারণার সমন্বয়ে বুদ্ধিজীবীর একটি কার্যোপযোগী পরিচয় নির্দেশ করেছেন।
আরেকটি বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। এডওয়ার্ড ডব্লিউ. সাঈদের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা চালিয়ে যেতে হলে আজকের বুদ্ধিজীবীকে প্রধানত চারটি চাপ সহ্য করে এগুতে হবে। এ-চাপগুলোর মিলিত অভিঘাতের রূপটিকে তিনি বলেছেন পেশাদারিত্ব। শহিদুল ইসলাম এ-চারটি চাপের কথা কেবল উল্লেখ করেছেন, হতে পারে পরিসরগত সীমাবদ্ধতার কারণে। সাঈদ যে-অবস্থাটিকে তৃতীয় ধরনের চাপ বলে বর্ণনা করেছেন শহিদুল ইসলাম সেটিকে বলেছেন কেন্দ্রিভূত শক্তি। সাঈদের মতে তা হলো, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতি অনিবার্য প্রবল টান, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রয়োজন ও সুবিধার প্রতি, ক্ষমতা কর্তৃক সরাসরি নিযুক্তি হওয়ার প্রতি তীব্র ঝোঁক (সাঈদ, ৯৬ : ৮০)।
ক্ষমতার প্রতি অনিবার্য টানের যে-বিষয়টি উল্লেখ করেছেন সাঈদ, তা আমাদের দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা এবং এ-কারণেই আমি এ-বিষয়টি একটু বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করলাম। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে (ক্ষমতাকর্তৃক) নিযুক্তি পাওয়ার আকাক্সক্ষা, পুরস্কারপ্রাপ্তি, প্রচার-মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত সুযোগ পাওয়া প্রভৃতি প্রলোভন আমাদের এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। এ-বাস্তবতা এখানে এতই প্রবল ও পরিষ্কার যে, এ-বিষয়ে আরো বিস্তৃত করে বলার প্রয়োজন নেই। শুধু এটুকুই বলব যে, বুদ্ধিবৃত্তিক বোধ, সততা, সাহস আজ এখানে দুর্লভপ্রায়।
শেষে আরেকটি কথা যোগ করতে হয়। শহিদুল ইসলামের লেখাটির যে-দিকগুলো অপূর্ণ মনে হয়েছে কেবল সেগুলোই আমি আলোচনা করেছি। নিঃসন্দেহে তাঁর লেখার ইতিবাচক দিক অনেক বেশি। আর তা তো পাঠকের সরাসরি বিবেচনার আওতায়ই রয়ে গেল!
গ্রন্থতালিকা :
১। Antonio Graamsci, Selection From the Prison Notebooks, ed. & trans- Quintin Hoare and Geofry Noel Smith; (London) Lawrence & Wishant Ltd, 1998.
২। Edward W. Said, Culture and Imperialism; (Nwe York) Vintage Books, 1994.
৩। Edward W. Said, Orientalism; (London) Penguin Books, 1995.
৪। Edward W. Said, Representation of the Intellectual, (Nwe York) Vintage Books, 1996.


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.