সৃজনশীল সাহিত্যিক লেখালেখির উপাদানের জন্য তার পরিপার্শ্বকে গ্রহণ করে থাকেন। একজন লেখক তার বেড়ে ওঠা পরিবেশের নানান অভিজ্ঞতা, ঘটনা, কাহিনীকে সৃজনী-প্রতিভায় বিনির্মাণ করেন। আমরা লক্ষ করি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকারদের কোনো-না-কোনো লেখায় তাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন কিংবা আর্থসামাজিক পরিমণ্ডল প্রভাব বিস্তার করে আছে। আসলে কেউই তাঁর পারিপার্শ্বিকতাকে এড়িয়ে যেতে পারেন না। কোলোম্বিয়ার নোবেল-জয়ী ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর চারপাশের উপাদানগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেছেন। কোলোম্বিয়ার অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মার্কেসের সাংবাদিকতা পেশা, শৈশব-কৈশোরের পারিবারিক জীবনাচরণের অভিজ্ঞতা তাঁর একাধিক উপন্যাসের ভিত নির্মাণ করেছে। উপন্যাসের চরিত্র, কাহিনী, বর্ণনারীতি ইত্যাদি অনেকগুলো ক্ষেত্রে মার্কেস তাঁর বাল্যকালকে আশ্রয় করেছেন। শিশুকালে তাঁর মা এবং নানা-নানির কাছে শোনা গল্পের পরিবেশনরীতি, আরাকাটাকা গ্রাম (যেখানে মার্কেসের বাল্যকাল কেটেছে), পিতা-মাতার বিবাহপূর্ব রোমাঞ্চের বিচিত্র ঘটনাবলি গার্সিয়ার সাহিত্যের বিষয়বস্তু। উপরন্তু, কোলোম্বিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরশাসন, গৃহযুদ্ধ, দরিদ্রতা, সামাজিক সংকট ইত্যাদি তাঁর রাজনৈতিক ধারার উপন্যাসগুলোর বিষয়বস্তু হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। পেশায় সাংবাদিক মার্কেসের কয়েকটি উপন্যাসে জার্নালিজমের প্রভাব লক্ষণীয়। গাব্রিয়েল প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে সাহিত্যচর্চা করছেন। তাঁর সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে তাঁর পরিবার এবং পেশা দুটিই সমান্তরালভাবে উপস্থিত।
সৃজনশীল সাহিত্যজগতের বাইরে আরেকটি জগতে মার্কেসের পদচারণা রয়েছে, সেটি মূলত অনেকাংশে কূটনৈতিক। ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কেস ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসেন। ল্যাটিন আমেরিকার জনগণ গ্যাবো অর্থাৎ মার্কেসকে ভীষণ শ্রদ্ধা করে এবং তাঁর মতামতের গুরুত্ব দেয়। বিল ক্লিনটন
থেকে ফিদেল ক্যাস্ট্রো পর্যন্ত গার্সিয়ার ব্যক্তিগত বন্ধুদের সংখ্যা অগণিত, যাঁরা
বিবিধ রাজনৈতিক-সংকটে প্রভাবশালী মার্কেসের শরণাপন্ন হন। বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা, ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সাথে আমেরিকার সম্পর্কোন্নয়ন, জিম্মি-সংকট, মাদক চোরাচালানরোধ ইত্যাদি ব্যাপারে মার্কেসের সহায়তা নেওয়া হয়। স্প্যানিশভাষী, জগতকে মার্কেস এতটাই প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন
যে, ফিদেল ক্যাস্ট্রো
তাঁকে বলেছিলেন, ‘Most powerful man in Latin America.’ ১৯২৯ সালের ৬ মার্চ কিংবা তার একবছর আগে কোলোম্বিয়ার আরাকাটাকায় মার্কেসের জন্ম। লুইসা সান্তিয়াগা মার্কেস ইগুরান এবং গাব্রিয়েল এলিগিও গার্সিয়ার বিবাহের প্রথম সন্তান গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস সচরাচর তাঁর জন্মসাল ১৯২৮ বলে থাকলেও তাঁর পিতার বক্তব্যানুসারে মার্কেসের জন্ম একবছর আগে। বন্ধুজনের কাছে মার্কেস ‘গ্যাবো’ নামে পরিচিত। কর্নেল নিকোলাস রিকার্ডো মার্কেস মেখিয়া এবং ত্রাকিলিনা ইগুয়ারান কতেসের দুসন্তানের একজন মার্কেসের মা। এই কর্নেল হচ্ছেন কোলোম্বিয়ার হাজার দিনের যুদ্ধে (১৮৯৯-১৯০২) লিবারেল পক্ষের একজন হারু সৈনিক, যিনি আরাকাটাকার প্রথম অধিবাসী। কর্নেল এবং তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ মার্কেসের নানা-নানি মার্কেসের বাবা এলিগিও গার্সিয়ার সঙ্গে তাঁদের মেয়ের প্রণয়ের ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে অমত পোষণ করেছিলেন। কেননা এলিগিও জারজ এবং টেলিগ্রাফ-অফিসে সামান্য বেতনের একজন কর্মচারী। এলিগিও মার্কেসের মাকে প্রেমপত্র লিখতেন, রোমান্টিক কবিতা লিখে পাঠাতেন এবং তাকে উদ্দেশ্য করে প্রেমগীত গাইতেন। মেয়ের অবস্থা বেগতিক দেখে কর্নেল এবং তাঁর পরিবার কিছুকালের জন্য অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু ফিরে আসার পরও কর্নেল লক্ষ করলেন মেয়ের প্রেম অমলিন। কর্নেল তাঁর সর্বোচ্চ প্রভাব খাটালেন – এলিগিওকে রিওহাচায় বদলি করে। কিন্তু আরাকাটাকায় টেলিগ্রাফ-অফিসের এক বন্ধুর সহায়তায় এলিগিও তাঁর টেলিগ্রাফিক প্রেম চালিয়ে যান। এ-উদ্যোগে কর্নেল এবং তাঁর স্ত্রীর কিছুই করার ছিল না, অতএব তাঁরা শুভবিবাহে রাজি হলেন, কিন্তু একটি শর্তে- নবদম্পতিকে আরাকাটাকা ছেড়ে অন্য কোথাও বসবাস করতে হবে। প্রাক্তন মেডিক্যাল ছাত্র এলিগিও (যিনি ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন অর্থাভাবে) নববিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে রিওহাচায় স্থায়ী হলেন। কিন্তু লুইসার সন্তান-প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে পিতা-মাতা তাকে বাড়িতে এসে সন্তান প্রসব করতে বলেন। তাঁদের কথামতো লুইসা বাবার বাড়িতে এসে থাকেন। সেখানেই মার্কেসের জন্ম। নবজাতককে নানাবাড়িতে রেখে মার্কেসের বাবা-মা আবার রিওহাচায় ফিরে আসেন। সন্তানকে নানা-নানির কাছে রেখে আসার মূল কারণ দরিদ্রতা, ল্যাটিন আমেরিকায় যা ছিল বাস্তব।
আরাকাটাকায় মার্কেসের জন্ম এবং নানা-নানির সাথে টানা আট বছর বসবাসের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যের উপাদান যুগিয়েছে। গার্সিয়া মার্কেস তাঁর শৈশব এবং কৈশোরের আটটি বছরে নানার বাড়িতে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন। নানাবাড়ির অনেকগুলো চরিত্র তাঁর উপন্যাসে স্বনামে-বেনামে উপস্থিত হয়েছে। এর ভেতরে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মার্কেসের নানা এবং মা ও বাবা। মার্কেসের মায়ের সঙ্গে তাঁর বাবার দীর্ঘকালের প্রেম ও বিবাহ-পরিণতির পূর্বোল্লিখিত ঘটনাটি Love in the Time of Cholera উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয়।
এ-উপন্যাসের ঘটনাকাল ১৮৮০ থেকে ১৯৩০ সালের ভেতরে। ঘটনাস্থান একটি অনাম্নী ক্যারিবীয় পোতাশ্রয় শহর, উপন্যাসে শহরটির নামোল্লেখ করা হয়নি, তবে কার্তাখেনা এবং বার্রানকেজা মিলে কোনো একটি শহর হবে হয়তো। সেই শহরের বাসিন্দা ফ্লোরেনতিনো আরিসা ক্যারিবিয়ান রিভার কোম্পানিতে শিক্ষানবিশ টেলিগ্রাফার হিসেবে কর্মরত। আরিসা একাধারে কবি আবার দৈহিক প্রেমের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। একদিন টেলিগ্রাম বিলি করতে গিয়ে সুন্দরী ফেরমিনা দাসাকে দেখে সে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘদিন একনিষ্ঠ সাধনার পর তার সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়তে সক্ষম হয়। পরস্পরের দেখা-সাক্ষাৎ হলেও তাদের আবেগময় গোপন প্রণয় চলতে থাকে টেলিগ্রাম এবং চিঠিপত্র চালাচালির মাধ্যমে। এ-ঘটনা টের পেয়ে ফেরমিনার বাবা তাকে নিয়ে শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যায় এই উদ্দেশ্যে যে, কিছুদিন বাইরে থাকলে ফেরমিনা সবকিছু ভুলে যাবে। তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়, কেননা ফিরে আসার পর ফেরমিনা এই প্রেমপীড়িত যুবককে প্রত্যাখ্যান করে বসে এবং ডাক্তার খুবেনাল উর্বিনোকে বিয়ে করে। উর্বিনোর চেহারা উনিশ শতকীয় উপন্যাসের নায়কদের মতো, ভালো পরিবারে তার জন্ম, আকর্ষণীয় পোশাক পরেন, কেন যেন তাকে দেখলেই চোখ আটকে যায়। প্রেমভিখারি আরিসার কাছে ব্যাপারটি যন্ত্রণাদায়ক হলেও মারাত্মক কিছু নয়। ফেরমিনাকে অনন্তকাল ভালোবাসার শপথ নিয়ে সে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়, যদ্দিন না পর্যন্ত ফেরমিনা মুক্ত হয়। তার এই অপেক্ষার পালা শেষ হয় একান্ন বছর নয় মাস চারদিন পরে, যখন হঠাৎ করে, অবিশ্বাস্যভাবে, ১৯৩০ সালের কোনো এক রবিবার ডাক্তার উর্বিনো মৃত্যুবরণ করেন। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর সবাই যখন বাড়ি চলে যায় তখন ফ্লোরেনতিনো আরিসা টুপিটি তার বুকে চেপে ধরে ফেরমিনাকে বলে, ‘Fermina, I have waited for this opportunity for more than half a century, to repeat you once again my vwo of eternal fidelity and everlasting love.’ প্রচণ্ড আঘাতে এবং আতঙ্কে ফেরমিনা তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলে এবং জীবনে কোনোদিন সে যেন আর মুখ না দেখায় তার ঘোষণাও দেয়। উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ে এই পারস্পরিক মুখোমুখি হবার ঘটনাটি ঘটে এবং তারপর ফ্লাশব্যাকে পঞ্চাশ বছর আগে কোনো এক কলেরা-মৌসুমে ঘটনার বর্ণনা শুরু হয়।
আরাকাটাকা গ্রাম, নানার বাড়িতে কাটানো আটটি বছর মার্কেসের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। এ-সময়ের লব্ধ অভিজ্ঞতা মার্কেসের সাহিত্যজগৎ সৃষ্টি করেছে। লেখকের সাহিত্যচর্চায় তাঁর নানার অবদান অপরিসীম। নানা কর্নেল নিকোলাস মার্কেসের কাছ থেকে গাব্রিয়েল স্পেনের গৃহযুদ্ধ, যা পরবর্তীকালে কোলোম্বিয়ার স্বাধীনতা এনে দেয়, সহিংসতা এবং দমন-পীড়নের ঘটনাগুলো জেনেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর উপন্যাসে সংযোজন করেছেন। ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি কোলোম্বিয়ার জমি দখল করে সেখানকার কৃষকদের কলাচাষে বাধ্য করেছিল। এর বিরুদ্ধে শ্রমিক-ধর্মঘট শুরু হলে আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট কোলোম্বিয়া সরকার নির্মমভাবে গণহত্যা চালিয়ে ধর্মঘট দমন করে। নানার কাছ থেকে শোনা এই হত্যাযজ্ঞের কাহিনী মার্কেস তাঁর One Hundred Years Of Solitude উপন্যাসে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছেন। ১৯২৮ সালের ৭ অক্টোবর এই ধর্মঘট হয়েছিল।
মার্কেসের নানার স্বীকৃত এবং অস্বীকৃত অনেকগুলো সন্তান ছিল, যার প্রকৃত সংখ্যাটি কখনোই জানা যায়নি, যদিও সচরাচর ষোলোজনের কথা বলা হতো। এরা সবসময়ে কর্নেলের বাড়িতে আসা-যাওয়া করত। আট বছর বয়সী মার্কেস নানাবাড়িতে নতুন নতুন খালা-খালুদের দেখা পেতেন। নানার স্ত্রী (এবং চাচাতো বোন) ত্রাকিলিনা ছিলেন অত্যন্ত হিংসুটে। কিন্তু যখন তিনি শুনতেন কারো ছেলেপুলে হয়েছে তখন তার প্রতিক্রিয়া হতো One Hundred Years of Solitude উপন্যাসের উর্শুলা বুয়েন্দিয়ার মতো। উর্শুলা নবজাতক পেলেই তার ঘরে নিয়ে যেত। অবশ্য মার্কেসের নানি শিশুদের খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু তাঁর নানাবাড়িতে একটি আশ্চর্য ব্যাপার ছিল, ছেলেপুলেদের দেখে বলা যেত না কোনটি বিবাহের ফসল আর কোনটি বিবাহবহির্ভূত। মার্কেসের নানি ছিলেন কর্নেলের চেয়েও ভয়াবহ চরিত্র। তিনি এবং তাঁর বোনদের অনেকেই কর্নেলের বাড়িতে বিভিন্ন সময় বসবাস করেছেন। নানি ছিলেন ‘কী করিলে কী হয়’ জগতের। যেখানে মৃত্যুপুরী এবং ইহজগতের ভেতরে অবাধ চলাফেরা। তরুণ গ্যাবোকে তিনি যথেষ্ট স্নেহ করলেও তাঁর আধিদৈবিক কথাবার্তা শুনে গ্যাবো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ত। কিন্তু নানা তাকে আশ্বস্ত করতেন এই বলে যে, ‘ওর কথা শুনো না, ওসব মেয়েলি বিশ্বাস।’ মার্কেসের নানাবাড়িতে পুরুষ বলতে ছিলেন তাঁরা দুজন; নানা এবং মার্কেস। বাড়ির মেয়েরা ছিল ভয়াবহ রকমের কুসংস্কারাচ্ছন্ন – উন্মাদ। উন্মাদ এই অর্থে যে, তারা ছিল কল্পনাবিলাসী। মার্কেসের নানির কাছে প্রতিটি স্বাভাবিক ঘটনার একটি আধিদৈবিক ব্যাখ্যা থাকত। যদি একটি প্রজাপতি জানালা দিয়ে উড়ে আসত তাহলে তিনি ঘোষণা করতেন, ‘আজ একটি চিঠি আসবে।’ স্টোভে ফুটতে থাকা দুধ উপচে পড়লে বলতেন, ‘সাবধান হওয়া উচিত, বাড়িতে কেউ-না-কেউ অসুস্থ।’ রাতের বেলা নানি তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে সেইসব মানুষের গল্প করতেন যারা কোনো-না-কোনো কারণে তাদের মৃত্যুর ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। তাদের ভেতরে কারা বাড়িতে ফিরে এলো, কারা এলো না, এইসব আতঙ্ক-জাগানো গল্প। সে-কারণে মার্কেস ভাবত, তার নানাবাড়িতে প্রতিদিন প্রেতাত্মারা আসে, মৃতেরা ঘোরাফেরা করে।
মার্কেসের খালা ফ্রান্সিসকার মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই খালা অতিপ্রাকৃত-বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন। শহরবাসী তার কাছে শুভ-অশুভ ইঙ্গিতের ব্যাখ্যা চাইত। ফ্রান্সিসকা খালা পুরোপুরি সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় একদিন কাফনের কাপড় বুনতে শুরু করলেন। জানিয়ে দিলেন, এটা তার নিজের জন্য। যখন পিচ্চি গ্যাবিতো তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন’? তিনি বললেন, ‘কারণ আমি মরতে যাচ্ছি, বাছা।’ কাফনের কাপড়-বোনা যখন শেষ তখন তিনি শয্যা নিলেন আর কোনোদিন জাগলেন না। নিঃসঙ্গতার একশ বছর উপন্যাসে আমারান্তা বুয়েন্দিয়াও তার নিজের কাফনের কাপড় বুনেছিলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন। নানার বলা অনেক ঘটনাই মার্কেসের মনে দাগ কেটেছিল। তার মধ্যে একটি হচ্ছে নানার ডুয়েল লড়া। তিনি একবার দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রতিপক্ষকে গুলি করে মেরে ফেলেছিলেন। কিন্তু ঘটনাটি তাকে বেসামাল করে দেয়, You canÕt believe hwo a dead man weigh you down” এবং এই ডুয়েলের পরপরই তিনি আরাকাটাকায় গিয়ে বসতি গাড়েন। প্রতিবছর আরাকাটাকায় সার্কাসের দল এলে কর্নেল তার নাতিকে নিয়ে সার্কাস দেখতে যেতেন এবং অভিধান দেখে দেখে প্রাণিবিদ্যার পাঠ দিতেন। মার্কেস কখনোই ওই দিনটির কথা ভুলবেন না, যেদিন তাঁর নানা তাঁকে ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির দোকানে নিয়ে গিয়েছিলেন বরফ আবিষ্কার করাতে।
কর্নেল সবসময়ে উদ্গ্রীব হয়ে থাকতেন চাকরির পেনশনের চেকটির জন্য। হাজার দিনের যুদ্ধের সময় (১৮৯৯-১৯০২ খ্রি.) সরকার কথা দিয়েছিল, নিবেদিত সৈনিকদের কৃতজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ পেনশন দেবে। সেই চেকটি কখনোই আসেনি এবং কর্নেলের মৃত্যুর পর নানি ত্রাকিলিনা কিছুদিন ওই চেকটির অপেক্ষায় ছিলেন। এই ঘটনাটি মার্কেসের একটি অসাধারণ উপন্যাসের জন্ম দিয়েছে। ক্ষুদ্রায়তনের এ-উপন্যাসটির নাম No One Writes to the Colonel। ১৯৫৬ সালে প্যারিসে বসে মার্কেস উপন্যাসটি লিখেছিলেন। তখন তিনি অভাবগ্রস্ত, অর্থকষ্টে পীড়িত, নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া জোটে না, তাছাড়া নিঃসঙ্গ। অবশ্য তার বাড়িওয়ালি বাড়িভাড়া কমিয়ে দিয়ে মার্কেসের কষ্ট অনেকখানি লাঘব করেছিলেন। মোট এগারোবার মার্কেস উপন্যাসটির খসড়া করেন এবং তারপর সন্তুষ্ট হলেন যেটিতে সেটিও মনঃপূত না হওয়ায় বাক্সবন্দি করে রাখলেন। ১৯৬১ সালে তাঁর কয়েকজন বন্ধু এই খসড়াটি উদ্ধার করে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কেস এ-উপন্যাসে প্যারিসে বসবাসকালে তাঁর চরম অভাবগ্রস্ততাকে যেন কর্নেলের দরিদ্রতার মধ্য দিয়েই
ফুটিয়ে তুলেছেন।
yThe Colonel took the top off the coffee can and swa that there was only one little spoonful left. He removed the pot from the fire, pour half the water onto the earthen floor, and scraped inside of the can with a knife until the last scrapings of the ground coffee, mixed with bits of rust, fell into
the pot.”
তখন অক্টোবর মাস, বৃষ্টি-বাদলার চূড়ান্ত সময়। বর্ষা নিয়ে আসে কাশি আর বেদনা, সাথে থাকে অদ্ভুত অমঙ্গলের আশংকা। পঁচাত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধ কর্নেল গৃহযুদ্ধ শেষ হবার পরে আর কিছুই করেননি, কেবল অপেক্ষা ছাড়া। তিনি ছিলেন কর্নেল আওরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সহকর্মী। গত উনিশ বছর ধরে তিনি পেনশনের চেকটির অপেক্ষায় আছেন, কেননা হাজার দিনের যুদ্ধের (War of thousand days) সময় সরকার পেনশনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। চেকটির আশায় প্রতি শুক্রবার তিনি জাহাজঘাটায় যান সপ্তাহান্তের ‘ডাক’ আসার জন্য, কিন্তু পিয়নের কাছে তিনি প্রতিবার একটি কথাই শুনতে পান, ‘Nothing for the Colonel’। কর্নেল এবং তাঁর স্ত্রী শোকাকুল হয়ে যান যখন তাদের একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর কথা মনে পড়ে। গেরিলা-তৎপরতার সময় (গোপন পুস্তক বিলি করছিল) পুলিশের গুলিতে তাদের সন্তান অগাস্টিন নিহত হয়েছে। এই অগাস্টিনই ছিল তাদের আয়ের একমাত্র উৎস। অগাস্টিন কেবল একটি জিনিসই রেখে যেতে পেরেছে – একটি যুদ্ধ-মোরগ, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন, অত্র এলাকার শ্রেষ্ঠ যুদ্ধবাজ মোরগ। এই মোরগটির অনেক মূল্য। তারা নিজেরা ভালোভাবে খেতে না পেলেও মোরগটিকে খাইয়ে-দাইয়ে পুষ্ট করছে আগামী লড়াইয়ের জন্য। কিন্তু সংকটাপন্ন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এ-ও ভাবে, ‘When the corn is gone we will have to feed him on our own leavers.’ কোলোম্বিয়ার মোরগ-লড়াই একটি উল্লেখযোগ্য বিনোদন এবং লড়াই নিয়ে বাজি ধরা হয়ে থাকে। অ্যাজমায় আক্রান্ত কর্নেলের শয্যাগত স্ত্রী চাচ্ছেন, স্বামী মোরগটিকে ছাবার কাছে বিক্রি করুক। ছাবা শহরের সবচেয়ে ধনী লোক, তাঁর ছেলের ধর্মপিতা। কিন্তু কর্নেল মোরগটি পুষতে চাচ্ছেন। তাঁর বিশ্বাস, আসছে লড়াইয়ে মোরগটি জিতবে এবং তিনি বাজির টাকার একটি অংশ পাবেন আর তাঁর অর্থকষ্ট ঘুচে যাবে।
প্রতিবেশীরা দুর্দশাগ্রস্ত কর্নেলকে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এই যেমন, ডাক্তার তার পত্রিকাটি পড়া হয়ে গেলে কর্নেলকে পড়তে দেন, বিনা ফিতে চিকিৎসা করেন আর অগাস্টিনের সঙ্গীরা মোরগটিকে খাওয়ায়। কর্নেল-পরিবারের দরিদ্রতা চরম আকার ধারণ করলে মোরগ বিক্রির চাপ বাড়তে থাকে, কিন্তু কর্নেল নাছোড়বান্দা, তাই তিনি গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি করে অভাব সামাল দেন। গৃহস্থালি সামগ্রী বেচবার মতো যা ছিল তা বিক্রি প্রায় শেষ, সে-কারণে তাঁর স্ত্রী আগামী দিনগুলোর জন্য আতঙ্কিত, ‘What will we do if we can’t sell aûthing?’ মোরগ-লড়াইয়ের আরো চুয়াল্লিশ দিন বাকি এবং এই দিনগুলো কীভাবে কাটবে তা নিয়ে তাদের উদ্বেগের সীমা নেই। উপন্যাসটি কোলোম্বিয়ার সামাজিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্রায়ণ, একটি বাক্যেই যা ফুটে উঠেছে, ‘The first death from natural causes which we have had in maû years.’ মার্কেসের এ-উপন্যাসের অনেকগুলো চরিত্র তাঁর ওহ ঊারষ ঐড়ঁৎ (১৯৬২) উপন্যাসেও রয়েছে, যেমন-মেয়র, ছাবা, এবং ডাক্তার, তবে কর্নেল নেই। মার্কেস তাঁর উপন্যাস এবং ছোটগল্প-রচনায় হেমিংওয়ের ‘ওপবনধৎম ঞযবড়ৎু’ প্রয়োগ করেছেন। সমুদ্রে ভাসমান আইসবার্গের কিয়দংশ যেমন পানির উপরে দৃশ্যমান থাকে এবং সবচেয়ে ভয়ংকর বড় অংশটি থাকে পানির নিচে, ঠিক তেমনিভাবে ছোটগল্প, উপন্যাস-রচনার ক্ষেত্রেও একই কাজ করা যায়; লেখকের মূল লক্ষ্যটাকে আবডালে রেখে সামান্য ইঙ্গিত দিয়েই প্রকৃত ঘটনাটি বোঝানো সম্ভব। No one Writes to the Colonel Ges In Evil Hour এবং ছোটগল্প-সংকলন Big Mamas Funeral -এ মার্কেস এই কৌশলটি প্রয়োগ করেছেন। সহিংসতাকে সরাসরি উল্লেখ না করেও তার ভয়াবহতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘আমি সবসময় বসেই থাকতাম’- নানাবাড়িতে মার্কেস তাঁর শৈশবকে স্মরণ করেছেন এভাবে। তাঁর প্রথম উপন্যাস Leaf Storm -এ একটি সাত বছরের বালকের চরিত্র রয়েছে, যে উপন্যাসের পুরো ঘটনার সময়টি চেয়ারে বসে থাকে। চরিত্রটি শিশু মার্কেসের প্রতিনিধিত্ব করছে, তিনি বলেছেন, ‘Nwo I reali“ed that there is something in that boy, sitting in the small chair, in a house full of fears.’ উপন্যাসটি লেখার সময় থেকেই মার্কেস ভেবেছিলেন তিনি একজন বড় লেখক হবেন, কেউ তাঁকে ঠেকাতে পারবে না। আর তাঁর একটিই লক্ষ্য থাকা উচিত – বিশ্বের শ্রেষ্ঠ লেখক হওয়া। মার্কেস এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, তিনি Leaf Storm লিখেছেন তাঁর বন্ধুদের জন্য, যারা তাঁকে উৎসাহ যুগিয়েছে, বইপত্র ধার দিয়েছে। ১৯৫২ সালে খসড়াটি প্রকাশকের কাছে পাঠালে প্রকাশক ছাপতে অস্বীকৃতি জানান। মার্কেস তারপর পাণ্ডুলিপিটি বেঁধেছেদে বাক্সে রেখে দেন। ১৯৫৫ সালে তাঁর কিছু বন্ধু, যারা এই লেখাটি পড়েছিল, লেখাটি উদ্ধার করে অন্য এক প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করেন। লেখালেখির ব্যাপারে মার্কেস তাঁর বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞ। এক সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, ‘কেন লেখেন?’ উত্তরে মার্কেস বলেছিলেন, ‘So that my friends will like me.’ Leaf Storm অংশত অস্বাভাবিক বন্ধুত্ব এবং প্রতিশ্রুতি-রক্ষার গল্প। কাহিনীর ঘটনাস্থল মাকোন্দো। ১৯২৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বুধবার বিকেল ২.৩০ মিনিট থেকে ৩টা পর্যন্ত মোট আধাঘণ্টার কাহিনী। বৈকালিক নিদ্রার সময় একজন প্রাক্তন মিলিটারি কর্নেল, খোঁড়া, একটি কফিন নিয়ে আসে মাকোন্দোর গোরস্তানে দাফন করবার জন্য। বৃদ্ধ কর্নেল কফিনে-ভরা মৃতদেহটি গোরস্তানের কোথায় দাফন করতে হবে তার নির্দেশ দেয়। মৃত লোকটি একজন ডাক্তার, গলায় দড়ি দিয়েছে; এই দাফনের জন্য কর্নেল শহরের মেয়রের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি লাভ করে ঘুসের বিনিময়ে। কর্নেল চারজন গুয়াখিরো ইন্ডিয়ানের সাহায্যে কফিনটি নিয়ে চোখ-ধাঁধানো আলোতে কবরস্থানের দিকে দীর্ঘযাত্রার প্রস্তুতি নেয়। এই লাশটি দাফনে নিরাপত্তার প্রশ্নটি জড়িত ছিল, কেননা শহরবাসী ডাক্তারকে ঘৃণা করত। তারা চাচ্ছিল মৃতদেহটি খোলা অবস্থায় পড়ে থাকুক, পচে গলে যাক। কারণ এই ডাক্তার ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির বিরুদ্ধে কলাচাষীদের ধর্মঘটের সময় সরকারি পুলিশের নির্মম অত্যাচারে আহতদের চিকিৎসা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এর পেছনে তার যুক্তি ছিল, যেহেতু সে অনেক আগেই ওই পেশা ছেড়ে দিয়েছে তাই সবকিছু ভুলে গেছে। মাকোন্দোবাসী তার এই অসহযোগিতায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাকে বিষপ্রয়োগে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারপর থেকে লোকটি বলতে গেলে বন্দিজীবন কাটাতে থাকে। কিন্তু কর্নেলকে চিকিৎসার সময় তিনি তার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করেন যে, মৃত্যু হলে কর্নেল যেন তার কবরে মাটি দেন, অন্তত দেহটি যেন শিয়াল-কুকুরে না খায়। কর্নেল প্রতিশ্রুতি-মতো তার প্রাক্তন ভাড়াটিয়া এই ডাক্তারকে আজ কবর দিতে এসেছেন, নিরাপত্তার অভাব বোধ করা সত্ত্বেও।
উপন্যাসটি গার্সিয়ার প্রাণোচ্ছলতার সময়ে লেখা। বন্ধুদের সান্নিধ্যে মার্কেস সে-সময়ে তারুণ্যের দিনগুলো কাটাচ্ছিলেন। তিনি তখন ঊষ ঐবৎধষফ পত্রিকায় সাংবাদিকতার চাকরি করেন। এই পত্রিকা-অফিসে বসেই অবসর সময়ে মার্কেস তাঁর খসড়া লিখতেন। অফিসের লাইনো টাইপের একটানা ঘটর-ঘটর শব্দ তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখত। মেশিন থেমে গেলে মার্কেসের লেখাও থেমে যেত। লাইনো টাইপের শব্দকে মনে হতো বৃষ্টির শব্দ। সূর্যাস্তের পর মার্কেস চলে যেতেন, ঊষ জধংপধপরবষড়ং নামে একটি চারতলা দালানে। দালানটি ক্রাইম স্ট্রিটে – নিচের দুতলা আইনের অফিস, ওপরের দুতলা বেশ্যাপাড়া। পাড়ার ম্যাডামের সঙ্গে মার্কেসের চুক্তি ছিল রাতের বেলা যে-রুমটি খালি থাকবে তাতেই তিনি থাকবেন। মার্কেস সচরাচর পতিতাদের সাথে লাঞ্চ করতেন, এরাই ছিল তাঁর প্রকৃত বন্ধু, আর ওই সময়টি ছিল মার্কেসের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। নিঃসঙ্গ বেশ্যারা তাদের পেশাকে সবসময় ঘৃণা করত। মার্কেসের লেখায় এই যৌনকর্মীরা সবসময় সহানুভূতি পেয়েছে। মার্কেসের ভাড়া বাকি পড়লে তিনি তাঁর খসড়া পাণ্ডুলিপি বেশ্যালয়ের ম্যাডামের কাছে বন্ধক রেখে গিয়েছিলেন।
মার্কেসের মা ছিলেন এক রহস্যময় চরিত্রের নারী। তিনি বাড়ির সবকিছু অন্যদের আগেভাগেই জেনে ফেলতেন, বছরাধিককাল ঘর থেকে না বেরুলেও কোনো কিছুই তাঁর অজানা থাকত না। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তিনি মার্কেসকে বলতেন গতরাতে নিদ্রামগ্ন অবস্থায় দুনিয়াতে কী ঘটেছে। শহরের অন্যদের, বিশেষ করে বয়স্কদের সঙ্গে তার একটি অলৌকিক যোগাযোগ ছিল এবং মাঝে মধ্যে তিনি মার্কেসদের তাজ্জব বানিয়ে দিতেন কোনো কোনো ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করে, যা কেবলমাত্র ঐশ্বরিক শক্তির দ্বারাই জানা সম্ভব। ঈযড়ৎড়হরপষব ড়ভ ধ উবধঃয ঋড়ৎবঃড়ষফ (১৯৮২ খ্রি:) উপন্যাসে মার্কেসের মা লুইসা সান্তিয়াগা স্বনামে উপস্থিত হয়েছেন কথকের মা হিসেবে। ১৯৪৭ সালে বিশ্ববিদালয়ে শিক্ষাজীবন শুরুর আগে মার্কেস কিছুদিন ঝঁপৎব-তে তাঁর পরিবারের সাথে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। এখানে থাকাকালীন তিনি একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রেমের শক্তি এবং আতঙ্ক-সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কাজেতানো খেনতিলে নামে মার্কেসের এক বন্ধুকে মার্গারিতা চিকার ভাইয়েরা হত্যা করে। অভিযোগ ছিল, মার্কেসের এই বন্ধু চিকার সতীত্ব নষ্ট করেছে। ব্যাপারটি টের পাওয়া যায় যখন চিকার নববিবাহিত স্বামী বাসর রাতেই চিকাকে ফেরত পাঠায় এই বলে যে, চিকা অসতী। কাজেতানোর কারণেই এই অপমান, লজ্জা, যা চিকার পরিবারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। এই অপমান, লজ্জার প্রতিশোধ নিয়ে পরিবারের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্য চিকার ভাইয়েরা চিকার প্রাক্তন প্রেমিক কাজেতানোকে খুনের সিদ্ধান্ত নেয়।
The Autumn of the Patriarch মার্কেসের একটি উচ্চাকাক্সক্ষী উপন্যাস, রচনায় লেগেছিল সাত বছর। তিনি ল্যাটিন আমেরিকার স্বৈরশাসন এবং স্বৈরশাসকদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন এ-উপন্যাসে। মার্কেসের উদ্দেশ্য ছিল ল্যাটিন আমেরিকার স্বৈরশাসকদের একটি সংমিশ্রিত অবয়ব তৈরি করা, বিশেষ করে যারা ক্যারিবীয় অঞ্চলের। উপন্যাসটির থিম, অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, ‘স্বৈরাচার নয় ক্ষমতা’। বইটি ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয়। যদিও উপন্যাসটি সমালোচকদের উল্লেখযোগ্য প্রশংসা কিংবা স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেনি। তারা উপন্যাসটিকে ‘minor classic’ ছাপ মেরে দিয়েছে। এ-উপন্যাসে একটি কল্পিত ক্যারিবীয় জনগোষ্ঠীর একজন প্রাচীন স্বৈরশাসকের শাসনকালকে তুলে ধরা হয়েছে, যার বয়স ১০৭ থেকে ২৩২-এর মাঝামাঝি। চরিত্রটি-সৃজনে লেখক কল্পনা-বাস্তবের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। মার্কেস সৃষ্ট এই স্বৈরশাসকের সাথে ভেনিজুয়েলার স্বৈরশাসক হুয়ান ভিসেন্ডে গোমেজের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে জেনারেলের পচা-গলা মৃতদেহ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয়। উপন্যাসটি ল্যাটিন আমেরিকার জ্যান্ত দানবদের জীবন ও সময়ের চিত্রায়ণ, যারা স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ল্যাটিন আমেরিকাকে শাসন করে আসছে। মার্কেসের মতে, তাঁর এ-উপন্যাসটি ‘Poem of the solitude of power’। পানামার শাসক জেনারেল র্তরিখোস উপন্যাসটি পড়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে র্তরিখোস পানামার ক্ষমতা দখল করেন। মার্কেসের সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ তিনদিনের পানভোজনে রূপ নিলে দুজনের মাঝে বন্ধুত্ব হয়। তাঁদের এই বন্ধুত্ব জেনারেলের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত অটুট ছিল। জেনারেল, যিনি বইপত্র কদাচিৎ úড়তেন, মার্কেসের উপন্যাসটি পড়ে এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। মার্কেসকে তিনি জানান, এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ বই। মার্কেস কারণ জানতে চাইলে র্তরিখোস বলেছিলেন, ‘Because it’s true, we are all like that.’ The story of a Shipwrecked Sailor নিউজ-রিপোর্টিং রীতিতে লেখা উপন্যাস। উপন্যাসটি একটি সত্যঘটনার ওপর ভিত্তি করে রচিত। ১৯৫৫ সালে দুসপ্তাহ ধরে এল এসপেকতাদো পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে মার্কেস ১৪টি লেখা প্রকাশ করেন। লেখার শিরোনাম ছিল, ‘The Truth About ¸ Adventure’। এটি লুইস আলেখান্দ্রো বেলাসকো নামে কোলোম্বিয়ার এক নাবিকের জবানি, যিনি জাহাজ থেকে সাগরে পড়ে গিয়ে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিলেন, আর তার সঙ্গীরা সব মৃত্যুবরণ করেছিল। প্রকৃত অর্থে মার্কেস এই নাবিকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে চৌদ্দ পর্বের লেখাটি লিখেছিলেন। কোলোম্বিয়ার নৌবাহিনীর একটি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামার মোবিল বন্দর থেকে কার্তাখেনার দিকে যাবার পথে ওই নাবিক এবং তার সাত সঙ্গী, জাহাজের ওপরে দায়িত্ব পালনকালে ডেকে রাখা জিনিসপত্রের ধাক্কায় সাগরে পড়ে যায়। একটি জীবনতরিকে আশ্রয় করে বেলাসকো দশদিন ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটানা সংগ্রাম করে সাগরে টিকে থাকে। পরে বেলাসকো রাষ্ট্রকর্তৃক একজন বীরের মর্যাদা লাভ করেন তার এই কঠিন সংগ্রামের জন্য। সরকারের বক্তব্য, বেলাসকো ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে গিয়েছিলেন, যার ফলে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু এসপেকতাদো পত্রিকায় মার্কেসের প্রবন্ধ প্রকাশিত হবার পরে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে। জাহাজটি নিষিদ্ধ গৃহস্থালি পণ্যে মাত্রাতিরিক্ত ভর্তি ছিল, এই যেমন – রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন এবং সেগুলো রাখা ছিল ডেকে। আর ঢেউয়ের কারণে জাহাজ কাৎ হয়ে পড়লে ডেকের রেফ্রিজারেটরগুলো এদিক ওদিক হতে থাকে এবং তার ধাক্কায় বেলাসকোরা ছিটকে পড়ে। সত্য-প্রকাশের দায়ে মার্কেসকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। ১৯৭০ সালে ধারাবাহিক প্রবন্ধগুলো একটি বই-আকারে ঞযব ঝঃড়ৎু ড়ভ ধ ঝযরঢ়ৎিবপশবফ ঝধরষড়ৎ নামে প্রকাশিত হয়।
সংবাদ-পরিবেশনশৈলীর এ-রীতিটি মার্কেসের অন্যান্য উপন্যাসেও ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন – কোনো ঘটনাকে গ্রহণযোগ্যতা দিতে গিয়ে সাল, মাস, দিন, ঘণ্টা হুবহু উল্লেখ করা। উদাহরণস্বরূপ, কলেরা মৌসুমে প্রেম উপন্যাসে : ‘Florentino Ari“a, on the other hand, had not stopped thinking of her for a single moment since Fermina Daya had rejected him out of hand after a long and troubled love affair fifty one years, nine month, and four days ago.’ মার্কেসের মতামত হচ্ছে, কোনো ঘটনাকে গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার এটি একটি কৌশল। সাংবাদিকতায় কৌশলটি অবশ্য প্রয়োজনীয়। গল্প বলতে গিয়ে তাঁর নানিও এই কৌশলটি ব্যবহার করতেন। মার্কেসের নিঃসঙ্গতার একশ বছরে যার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে : ‘It rains for 4 years, 11 months, and 2 days following the massacre of the striking workers.’
মার্কেসের পারিপার্শ্বিকতালব্ধ অভিজ্ঞতার সার্থক সংযোজন ঘটেছে তাঁর ঙহব ঐঁহফৎবফ ণবধৎং ড়ভ ঝড়ষরঃঁফব উপন্যাসে। উপন্যাসটি ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়। এর ঠিক চৌদ্দ বছর আগে মার্কেস যখন তাঁর মায়ের সাথে মাতৃভূমি আরাকাটাকায় যাচ্ছিলেন পৈত্রিক বাড়িটি বিক্রির জন্য, তখনই তার মনে মাকোন্দো গ্রামটি দাগ কেটেছিল, শিশুকালে তিনি যে-মাকোন্দোর নাম শুনেছিলেন। ট্রেনে চড়ে যাবার পথে আবার সেই মাকোন্দো গাঁ মার্কেসের চোখে পড়ল এবং তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাঁর কল্পকাহিনীর গ্রামটির নাম হবে মাকোন্দো, যেখানে তাঁর মহৎ উপন্যাসটির ভিত্তিভূমি হবে। মার্কেস লিখবেন মাকোন্দোর ইতিহাস। এ-গাঁয়ের গোড়াপত্তনকারী বুয়েন্দিয়া পরিবার থেকে শুরু করে একাধিক জেনারেশনের জীবনাচরণকে তুলে ধরবে তাঁর উপন্যাস। মার্কেসের এই কল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৬৫ সালের একদিন, যখন তিনি একটি ছোট্ট ওপেল গাড়িতে চড়ে মেক্সিকো থেকে Acapulco যাচ্ছিলেন। রাস্তায় উপন্যাসের কাহিনীটি তাঁর মাথায় বাজতে শুরু করে। তিনি উপন্যাসের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন। তখনই তিনি Acapulco যাওয়া স্থগিত করে বাড়ি ফিরে আসেন এবং একটানা ষোলো মাস লিখে বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাসটি সৃষ্টি করেন। উপন্যাসটির কাঠামো, চরিত্র-নির্মাণ, বর্ণনারীতিতে মার্কেস তাঁর পরিবারকে আশ্রয় করেছেন। যেমন-তাঁর স্ত্রী মার্সিডেজ স্বনামে – একজন নীরব এবং গম্ভীর ফার্মাসিস্ট, যার লম্বা গ্রীবা, নিদ্রালু চোখ, নানি (উর্শুলা বুয়েন্দিয়ার অবয়বে), খালা ফ্রান্সিসকা আমারান্তা বুয়েন্দিয়ার অবয়বে)। অনেকদিন ধরেই মার্কেস এ-উপন্যাসটি লেখার চিন্তাভাবনা করছিলেন, কিন্তু পথ পাচ্ছিলেন না উপস্থাপনরীতিটি কী হবে? মেক্সিকো থেকে Acapulco যাবার রাস্তাটিই তাঁর পথ বাতলে দেয়; মার্কেস সিদ্ধান্ত নেন তাঁর নানির গল্প বলার ঢংটিই তিনি পরিবেশনরীতি হিসেবে গ্রহণ করবেন। মার্কেসের নানি
যে-কোনো গল্প একটানা বলে যেতেন, বলার সময় তাঁর মুখমণ্ডলের কোনো পরিবর্তন হতো না, মার্কেস যাকে বলেছেন, ‘With a brick face;উপন্যাসটি মাকোন্দো গ্রামকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে।
মাকোন্দো হচ্ছে এমন একটি জগৎ যেখানে ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটে, যেমন-প্লেগ, গৃহযুদ্ধ, পুত্র ও স্বামীহত্যা, প্রলয়, হারিকেন, বন্যা, মহামারি, রাষ্ট্রীয় মিলিটারি দ্বারা নিপীড়ন, ঔপনিবেশিক শোষণ। মাকোন্দো গাঁয়ে অলৌকিক ঘটনা বাস্তব। উপন্যাসটি একাধারে পারিবারিক বীরত্ব-গাঁথা, অতিকথা, পৌরাণিক কাহিনীতে সমৃদ্ধ ল্যাটিন আমেরিকার বাস্তবসম্মত বিনির্মাণ। আঞ্চলিক ইতিহাসের দ্যোতক, মাকোন্দোর সামগ্রিক ইতিহাসের শৈল্পিক উপস্থাপন। কর্নেল আওরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার কাহিনী শুরু হয় একটি অপরাধের শাস্তির মধ্য দিয়ে এবং একশ বছর পরে সমাপ্তি ঘটে শুয়োরের লেজঅলা একটি দানবশিশু-জন্মের ভেতর দিয়ে। জাদু-বাস্তবতা, সত্য, আধিদৈবিকতার মিশ্রণে সৃষ্ট নিঃসঙ্গতার একশ বছর উপন্যাসের অস্বাভাবিক চরিত্ররা।
১৯৬৭ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার পরে এক সপ্তাহে আট হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। প্রকাশের তিন বছরে ৫০০,০০০ কপি বিক্রি হয়েছে। প্রকাশের বিশ বছরের মধ্যে দশ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে স্প্যানিশভাষী জগতে এবং বিশ্বব্যাপী এর বিক্রির পরিমাণ ত্রিশ মিলিয়ন কপি। অদ্যাবধি উপন্যাসটির বিক্রি বেড়েই চলেছে। ১৯৭০ সালে কিউবা-ভ্রমণের সময় একদল চাষি মার্কেসকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তার জীবিকা কী?’ তিনি বলেছিলেন ‘আমি লিখি’। চাষিরা জানতে চাইল, ‘তিনি কী লেখেন’? উত্তরে মার্কেস বলেছিলেন, ‘আমি একটি বই লিখেছি, যার নাম One Hundred Years of Solitude।
‘মাকোন্দো।’ চাষিরা উল্লাসে চিৎকার দিয়ে উঠল। এখানেই মার্কেসের সার্থকতা, এটিই লেখকের পরম প্রাপ্তি। নিঃসঙ্গতা মার্কেসের উপন্যাসের একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। তাঁর চরিত্ররা বিভিন্নমুখী নিঃসঙ্গতা অনুভব করে। সন্তানকে হারিয়ে কর্নেল এবং তাঁর স্ত্রী নিঃসঙ্গ, উর্শুলা বুয়েন্দিয়া স্বামীকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ, এতটাই নিঃসঙ্গ যে, বৃদ্ধবয়সে তিনি বেঁচে আছেন না মরে গেছেন তার নাতি-পুতিদের সেটি বোঝাই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। ফ্লোরেনতিনো আরিসা প্রেম প্রত্যাখ্যাত হয়ে নিঃসঙ্গ, আমারান্তা বুয়েনদিয়া তার শীতল হৃদয়ের কারণে প্রেমহীন, তাই তিনি নিঃসঙ্গ, আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ক্ষমতার নিঃসঙ্গতায় ভোগে, কেননা অনেকদিনের শাসন তাকে স্বৈরাচারে পরিণত করেছে। মাকোন্দো গ্রামটি নিঃসঙ্গ, কেননা বহির্বিশ্বের সঙ্গে এর কোনো যোগাযোগ নেই। গৃহযুদ্ধ নিঃসঙ্গ করেছে মানুষদের, কেননা এতে পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের জগতে মাকোন্দো হচ্ছে সবচেয়ে প্রিয় গ্রাম, বুয়েন্দিয়ারা হচ্ছে প্রিয় পরিবারের একটি, আর নিঃসঙ্গতার একশ বছর হচ্ছে শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর একটি।
ল্যাটিন আমেরিকায় অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। ওই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর কর্ণধার, বিরোধীদল, কমিউনিস্ট বিদ্রোহীদের সঙ্গে মার্কেসের সুসম্পর্ক রয়েছে। তিনি ওই অঞ্চলে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। রাষ্ট্রপ্রধানরা ইউরোপ-আমেরিকার সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মার্কেসের সহায়তা নিয়ে থাকেন। তেমনিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাদকদ্রব্য-পাচাররোধ, জিম্মি-সংকট-নিরসন, কিউবার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে মার্কেসের শরণাপন্ন হয়। কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ফ্রান্সের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ, আমেরিকার বিল ক্লিনটন মার্কেসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীরা, ঘধৎপড় গেরিলারা মার্কেসকে সমঝোতাকারী হিসেবে বিশ্বাস করে। তিনি এল সালভাদর এবং নিকারাগুয়ার গৃহযুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতা করেছিলেন। মার্কেস মূলত রাজনীতির চেয়ে কূটনীতি বেশি পছন্দ করেন। ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে মার্কেসের বন্ধুত্ব অনেকদিনের। ক্যাস্ট্রো একজন দক্ষ পাঠক। মার্কেস কিউবায় গেলে তাঁর জন্য অনেক বইপত্র নিয়ে যেতেন। তবে রাজনীতি-বিষয়ে তাঁদের মাঝে সামান্যই আলাপ-আলোচনা হতো। মার্কেসের প্রিয় বইয়ের একটি হচ্ছে ড্রাকুলা। ক্যাস্ট্রো একবার তাঁর কাছ থেকে বইটি নিয়ে সারারাত জেগে পড়েছিলেন। সকালবেলা মার্কেসকে তিনি বলেছিলেন, ‘Gabriel, you screwed me! That book; I could not get a minute;s sleep.’ মার্কেসের মতে, ফিদেল একজন দক্ষ পাঠক, সম্পাদকের মতোই দক্ষ তিনি। মার্কেস তাঁর Chronicle of a Death Foretold উপন্যাসটির খসড়া ক্যাস্ট্রোকে দিয়েছিলেন সম্পাদনার জন্য, তাছাড়া ভেতরে কোনো অসঙ্গতি আছে কি-না তা-ও ক্যাস্ট্রোর চোখে ধরা পড়বে। ফিদেল সম্পর্কে মার্কেসের মতামত হচ্ছে, ‘I am perhaps the one person Fidel can trust in the world.’ ১৯৮১ সালে কোলোম্বিয়ার সরকার গার্সিয়া মার্কেসকে গ্রেফতারের পরিকল্পনা করে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি গ১৯ গেরিলাদের সাথে সংশ্লিষ্ট। ব্যাপারটি আগেভাগে জানতে পেরে তিনি মেক্সিকোর দূতাবাসে আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং দেশত্যাগ করেন। তাঁর এই নির্বাসন কোলোম্বিয়ার সরকারের জন্য দুর্যোগ বয়ে আনে; কোলোম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিশ্বে ভাবমূর্তি হারায়। দেশত্যাগ করে মার্কেস প্যারিসে যান বন্ধু ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁর কাছ থেকে ‘লিজিয়ন ডি অনার’ পুরস্কার নিতে। ১৯৮২ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অতএব এবার তাঁর গন্তব্য স্টকহোম। কোলোম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট বেলিসারিও বেতানকার ওই বছর ক্ষমতায় এসে মার্কেসকে জাতীয় মর্যাদায় দেশে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। তিনি বহুবার মার্কেসকে সিনিয়র মন্ত্রিত্বের পদ, রাষ্ট্রদূতের পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন, কিন্তু মার্কেস সবসময়ে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট বেলিসারিওর মতামত হচ্ছে, মার্কেস ‘Likes to be near power, but not to posses it for himself’। সাংবাদিক জন লি অ্যান্ডারসনকে মার্কেস বলেছিলেন, ‘ItÕs not my fascination with power, … ItÕs the fascination those who are powerful have with me. ItÕs they who seek me out, and confide in সব.’ মার্কেস যতই নিজেকে ক্ষমতাকাঠামো থেকে দূরে রাখুন না কেন সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকাবাসী তাঁকে পরম শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁকে অলিখিত ক্ষমতা অর্পণ করেছে। গ্যাবোর ওপর তাদের অগাধ আস্থা। ১৯৯৯ সালে মার্কেস ঈধসনরড় পত্রিকার মালিকানা কেনেন। সুইস ব্যাংকে রাখা তাঁর নোবেল প্রাইজের টাকা দিয়ে তিনি এই সাপ্তাহিক পত্রিকার মালিকানার বড় অংশ ক্রয় করেন। এ-পত্রিকায় মার্কেসের কলাম প্রকাশিত হবার পর থেকে পত্রিকার কাটতি চৌদ্দ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজারে উন্নীত হয়। কোলোম্বিয়ার মানুষ গ্যাবো কী বলে তা জানতে আগ্রহী। কূটনীতি, সংবাদজগৎ এবং সাহিত্যজগতের এই অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তিত্বকে ফিদেল ক্যাস্ট্রো ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
উপরেল্লিখিত তিনটি ক্ষেত্রে মার্কেস পদচারণা করলেও আন্তর্জাতিক আঙিনায় মার্কেস একজন সাহিত্যিক হিসেবেই বেশি শ্রদ্ধাস্পদ। আর মার্কেসের এই পরিচিতি এসেছে তাঁর One Hundred Years of Solitude উপন্যাসের মাধ্যমে। বিশ্বসাহিত্যের এই কালজয়ী উপন্যাসকে পেরুর খ্যাতনামা সাহিত্যিক মারিয়ো ভার্গাস য়োসা বলেছেন, ‘… সমসাময়িক বিশিষ্ট সাহিত্যকর্মের ভেতরে একটি দুর্লভ উদাহরণ যা পড়া যেতে পারে, উপলব্ধি করা যেতে পারে এবং সবাই উপভোগ করতে পারে।’ মার্কেসের নোবেলপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে ল্যাটিন আমেরিকা আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠে। ল্যাটিন আমেরিকার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকদের ব্যাপারে বহির্বিশ্বে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। সে-কারণে বলা যেতে পারে, মার্কেস সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকাকে নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।
সহায়ক গ্রন্থাবলি
Gabriel Garcia Ma©rquey- Edited by Harold Bloom, Chelsa House Publishers, Nwe York, 1989.
Gabriel Garcia Ma©rquey-Sean Dolan, Chelsa House Publishers, Nwe York, 1994.
প্রবন্ধ
The Power of Gabriel Garcia Ma©rquey -Jon Lee Anderson, Sept. 27, 1999; Nwe Yorker Profile.The Hearts Eternal Vwo – A Reviwe of Gabriel Garcia Ma©rqueyÕs Love in the Time of Cholera, The Nwe York Times, 10 April 1988, by Thomas Pynchon.


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.