ছোট গল্প

  • চুড়ি

    চুড়ি

    বিশ্বজিৎ ঘোষ কার চুড়ি? কে রেখে গেছে চুড়িটা? কেনই-বা রেখে গেল? ইচ্ছে করে রেখে গেল, নাকি নিতে ভুলে গেছে? ক্লান্ত শরীরে এসব ভাবতে ভাবতেই শুয়ে পড়লেন রহমান সাহেব। নরম বিছানা। রাত অনেক হলো, কিন্তু ঘুম আসছে না। ড্রয়ারে পাওয়া মনোরম সোনার চুড়িটা তাঁকে পেয়ে বসেছে। বাগানবাড়িটার চারদিক নিস্তব্ধতা আর নীরবতায় মগ্ন হয়ে আছে। কোথাও কোনো…

  • সময়স্রোত

    সময়স্রোত

    কুয়াশাঢাকা শীতের ভোরে হাঁটছেন তিনি। গায়ে-মোড়ানো চাদরটা বারবার পড়ে যাচ্ছিল শরীর থেকে। ডান হাতে লাঠি থাকার কারণে বাঁ-হাত দিয়ে চাদর ঠিক করার চেষ্টা করছেন, পারছেন না। দাঁড়িয়ে পড়লেন লেকের ওপর দিয়ে চলাচলের ব্রিজের হাতল ধরে। এবার চাদরটা ঠিক করতে পারলেন। লাঠিতে ভর দিয়ে ঠকঠক করে আবার হাঁটতে গিয়েও থেমে তাকিয়ে রইলেন লেকের পানির দিকে। স্থির…

  • ডেউয়া

    ডেউয়া

    বৈশাখ মাসে লাফ দিয়ে খালটা পার হওয়া যায়, হাঁটুপানি। আসলে এটা কথার কথা, ভাটায় বুকপানি হলেও জোয়ারে একটু বেশিই, ঠাঁইহীন। রাখালগুলি যেমন বিল থেকে গরু নিয়ে ফেরার সময় মাথায় লুঙ্গি পেঁচিয়ে গরু নিয়ে সাঁতার দিতে পারে উলঙ্গ মেটে পাছা ডুবিয়ে ভাসিয়ে কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে, তেমন ভেবেছিল সে, জীবনটা এইভাবেই ঠিক পেরিয়ে যাবে ভাবনা…

  • রক্তমাংসের শরীর

    রক্তমাংসের শরীর

    খায়রুন নেসার স্বামী ব্যবসায়ী। টাকা-পয়সার তেমন অভাব নেই। বেশ চমৎকার শাড়ি, গয়না কিনে ভালোই সময় কাটে তার। ছেলেমেয়েরা ভালো স্কুল-কলেজে পড়ে দুজনেই বিদেশে। খায়রুন নেসার আবার এক ভূতে পাওয়ার অভ্যাস আছে। সময় পেলেই লেখেন। খায়রুন নেসার নামের মতো লেখাগুলি অবশ্য অনাধুনিক নয়। বেশ চনমনে আধুনিক গল্প। মাঝে মাঝে নিবিড় কবিতা। বেশ সুখী মনে হয় যখন…

  • ক্যাথারসিস এবং একটি সন্ধ্যা

    ক্যাথারসিস এবং একটি সন্ধ্যা

    অন্ধ্রের শ্রীধর ইধাপালাপ্পাকে দেখে ভাবনাটা এসেছিল। একখানা রঙিন পোস্টকার্ডের একদিকে তেলেগু ভাষায় লেখা ওর মায়ের চিঠি এবং অন্যদিকে বিশ^কর্মার মূর্তির ছবি। আমার জানা ছিল না পরদিনই বিশ^কর্মার পুজো, পূর্বদিন দেখেছিলাম মাঝারি সাইজের একটা ম্যারো কিনে এনেছিল সিটি সেন্টার থেকে। যাকে ঠিক চালকুমড়ো বলে তা এখানে এই ক্যামব্রিজে মেলা ভার। লন্ডনে গেলে বাংলাদেশি দোকানগুলিতে প্রচুরই মেলে…

  • পথ পসারিণী

    পথ পসারিণী

    আজকের দুপুরটা একটু অন্যরকম লাগছে। যেন ঝিরিঝিরি হাওয়ায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষও দুলছে। সাড়াশব্দহীন, একটুবা প্রগাঢ় রহস্যময়। জলাশয়ের বুকে ছোট ছোট ঢেউয়ের যেমন  কোনো শব্দ থাকে না, ঠিক এমনই একটা ক্ষীণ গতির কাছে বেমালুম বোকা বনে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছি। কী নেই, কিই-বা আছে … আমার কি চোখ টপকাচ্ছে? নাকি প্রকৃতির! নিজেকে নিজের ভেতর খুঁজে পাওয়ার অনিঃশেষ…

  • সংবর্ত

    সংবর্ত

    যত দূর চোখ যায়, তত দূর শুধু পানি আর পানি। দিগন্তে আকাশ আর পানির মিতালি, বিশাল জলরাশির আপন খেয়ালে ঢেউ ভাঙে ঢেউ হয়। আকাশে গাঢ় নীল, রোদের ঝিলিক ঢেউয়ের ঠোঁটে – চিকচিক করে ওঠে কখনো কখনো। কখনো বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে জলডাঙ্গা নদীর তীরে। এই রহস্যময় ঢেউগুলি নদীর তীরে আছড়ে পড়ে নাকি মহবত আলির বুকের…

  • গদ্যময়

    গদ্যময়

    গাপ্পুর মন ভালো নেই। এমনিতেই দিন দিন অসাড় হয়ে পড়ছে শরীরের কলকব্জা। তবু এক টুকরো চিনচিনে কষ্ট বুকের ভেতর, কিছুতেই ভেতর থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না সে। হিল্লিকে মনে পড়ে খুব। মনে হলেই একটা প্রশ্ন প্রায়ই কুরে-কুরে খায় ওকে। কিছু না বলে চলে যেতে পারলো হিল্লি? কেন, একমুখ হেসে কি বিদায় নেওয়া যেত না ওর…

  • মৃত্যুযাত্রা

    মৃত্যুযাত্রা

    চাঁদটাকে মাঠের ঠিক মাঝখানে এইভাবে গা এলিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে সে এতটাই ধাক্কা খায় যে তার তেমন অবাক হওয়ার কথাও আর মনে থাকে না। এতক্ষণ সে আকাশে চাঁদের অবস্থান দেখে দেখে দিক ঠিক করে পথ চলছিল। এই তো মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে সিগারেট ধরানোর জন্য চাঁদ আর রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠিটার দিকে…

  • তনুজার হেমন্তরাত

    তনুজার হেমন্তরাত

    মধ্যরাতে এরকম হয়, মধ্যরাতে জেগে ওঠে তনুজা, জেগে উঠে অন্ধকারের বিস্তারে নিজেকে হাতড়ে বেড়ায়। হাতড়াতে হাতড়াতে একসময় আর মনে করতে পারে না, আসলে সে কী খুঁজে পেতে চাইছে, এই মধ্যরাতে সেটা খুঁজে পাওয়ার দরকারই বা কী! একরাশ ক্লান্তি নিয়ে তখন থমকে বসে সে। আর জানালার পর্দাটা দুলে উঠলে অবশেষে কেন যেন মনে হয়, তৃষ্ণা –…

  • দরবার

    দরবার

    মুখোমুখি সিটে বসা ভদ্রমহিলার কপালের ভাঁজে চরম বিরক্তি। ঈশানের দিকে তিনি ঘন ঘন অগ্নিদৃষ্টি হানছেন। দাঁতে দাঁত পিষছেন, ‘উফ! মানুষের কমনসেন্সের এত অভাব!’ ফোনে ঈশানের লাগাতার কথা বলাই ভদ্রমহিলার বিরক্তির কারণ। কিন্তু কিছু করার নেই। কমনসেন্সের চাইতে বাড়িতে লাগাতার যোগাযোগ রাখাটা এখন অধিক জরুরি।  রজব আলীর ছুরির আঘাতে বাবা হাসপাতালে অথচ  তার অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট…

  • তলোয়ার

    তলোয়ার

    শ্রীরেখা মিত্রের চোখে জল। টিভিতে দেখছিলাম। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের প্রযোজিত সিনেমা সম্পর্কে যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছিলেন, তখন শ্রীরেখা কথা বলতে গিয়ে একসময় কেঁদে ফেলেন। এ-মাটির টান তাঁকে কাঁদায়। একসময় বলতে থাকেন – ‘মাদারীপুরের জমিদার ছিল আমাদের পূর্বপুরুষ। বিশাল বাড়ি, পুকুর, খামার। হাজার ঘর প্রজা। সব ফেলে দেশভাগের সময় আমার পিতামহ কলকাতায় চলে যান। মাদারীপুরের…