ছোট গল্প

  • মেহের জানের মা

    মেহের জানের মা

    ফাঁকা একটা প্রথম শ্রেণীর কামরার ভিতর দিয়া আসিয়া জমিলা রকীবাকে ছোট্ট একটা কুঠুরীর ভিতর প্রায় ধাক্কা দিয়া ঢুকাইয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিল। রকীবার পেটে পিঠে শাড়ীর নীচে চটের থলিতে সুপারী বাঁধা। হাতে মবিলের টিন। দেওয়াল ধরিয়া দাঁড়াইয়া সে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলিতে লাগিল। নিজের পেটের দিকে নজর পড়িতে মনে হইল যেন আট-নয় মাস। মেরা-জান যখন…

  • একরাত

    একরাত

    বায়েজিদ বোস্তামীর পাশের পাহাড়গুলো ঢেউ দিতে দিতে মিশে গেছে আকাশে। এদিকে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট। চারদিকে তারের বেড়া। গেটে সেন্ট্রি। তাঁবুর পর তাঁবু সাজান – যেন অসংখ্য ব্যাঙের ছাতা ফুটে আছে পাহাড়ের থলিতে। জিপ, লরি, ওয়াগন আসছে যাচ্ছে। সোলজাররা মার্চ করে একদল ঢুকছে, একদল বেরিয়ে যাচ্ছে। গেটের কিছুদূরে ঝাপ মেরে দলা হয়ে বসে আছে লিকলিকে আধা লেংটা…

  • আশ্চর্য দুপুর

    আশ্চর্য দুপুর

    এক কাপ চা গিলতে তিন ঘণ্টা সময় লাগার কথা নয়। তবে শুধু এক কাপ চা নয়। কাঁটা চামচ বিঁধিয়ে আস্ত ছ’ আনার একটা চপ্ সাবাড় কোরছিলাম। ঘটনাটা অবশ্য নিছকই আকস্মিক। পকেটে যার সাড়ে তের আনা পয়সা মূলধন, তার কাছে ত বটেই। তাঁতীবাজার থেকে হেঁটে আসছিলাম। সেপটেম্বরের ক্লাসিক্যাল রোদ। বিত্তবানদের চকচকে গাড়ীর ঢাকা চরকার মত ধাবমান…

  • প্রাণের চেয়ে প্রিয়

    প্রাণের চেয়ে প্রিয়

    ওরা এসেছে। হ্যাঁ নিশ্চয় ওরা। আনন্দে তোলপাড় করল বুক। কত দিন ওদের দেখিনি, আজ তিন তিনটে বছর ওরা আমার চোখের অন্তরাল। অনেক অনেকদিন পরে দেখা হবে ওদের সঙ্গে। আব্বা, আম্মা, বাচ্চু, মুন্নি – আমার ছোট ছোট ভাই বোনেরা। তাই আপিস থেকে যখন সাক্ষাৎকারের ‘শ্লিপ’ এলো, তখনই অধীর আগ্রহে উন্মুখ হয়ে উঠেছে মনটা। হবারই কথা। যে…

  • আদিম

    আদিম

    নদী আর গ্রাম পাশাপাশি। ইলশা আর সোনাকান্দি। সোনাকান্দি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। হাট, বাজার, মন্দির, মসজিদ, হিন্দু, মুসলমান, চাষাভুষা, জোতদার, জমিদার মিলে একাকার। কিন্তু পাশ দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা নদী আর নদী নেই। ক্রমশঃ উটের পিঠের মত কাঁচা মাটির স্তর জমাট হয়ে চর পরিধি বাড়াচ্ছে। সবুজ ঘাসের আস্তরণের নীচে নতুন মাটির জীবন আবাদ হচ্ছে। নদী মজে যাচ্ছে। কেবল…

  • গুহা

    গুহা

    হারামজাদীকে পেলে হয় …। অন্ধকার ঠাণ্ডা-ক্যান্টিনের এক কোণে রাখা পাতলা কাঠের টেবিলটা যেন আর্তনাদ করে উঠল। চায়ের জন্যে বাড়তি চিনি রাখার সবুজ প্ল্যাস্টিকের বাটিটা উল্টে পড়ল মেঝের উপর … হারামজাদীকে একবার পেলে হয় … আমি ভাঙ্গা ফ্যাঁস-ফেঁসে কর্কশ গলায় প্রায় হুঙ্কার ছেড়ে চেয়ারে বসলাম। সারাটা ক্যান্টিন থৈ থৈ করছে ভীড়ে, কিন্তু একটি বেয়ারা চোখের পলকে…

  • ষাটের শেষ : সত্তরের শুরু ‘বাঙলাদেশ’-এর ছোটগল্প

    ষাটের শেষ : সত্তরের শুরু ‘বাঙলাদেশ’-এর ছোটগল্প

    ষাট-দশকের শুরুতে যে তরুণ স্কুলের শেষ ক্লাসের ছাত্র, দশকের শেষে সেই তরুণটিই একজন উৎসাহী গল্প-লেখক। এমন ঘটনা আজকের বাঙলাদেশে বিরল নয়। পঞ্চাশের দশকে যারা বাঙলাদেশে সবচেয়ে প্রতিভাবান গল্পকার ছিলেন – পরের দশকে তাঁদের অনেকেই গল্প আর লিখলেন না, কিংবা এমন গল্প লিখলেন যা নতুন পাঠকের কাছে সাড়া তুলতে অক্ষম হলো। প্রতি দশকেই নতুন একদল গল্পকার…

  • সুখমণি

    সুখমণি

    সাগরের উত্তাল জলরাশির ভয় জয় করে যখন নৌকা ঢেউয়ের মাথায় দুলছিল তখন যাত্রীরা চিৎকার করছিল কি না তার মনে নেই, শুধু মনে ছিল, আজকের দিনটাই বুঝি শেষদিন, এরপর এ-পৃথিবীতে তার কোনো চিহ্ন থাকবে না। নৌকা কূলে ভেড়ার পর যখন দেখলো, দিব্যি বেঁচে আছে, তখন নিজের কাছেই সব অবিশ্বাস্য লাগছিল। তারপর শরণার্থীর মতো ভাসতে ভাসতে এই…

  • কিনু পুরুষ

    কিনু পুরুষ

    পু কুরে ঘাট হয়, ঘর হয় – এই কথা বোধহয় নতুন। বাপের ভিটায় জায়গা হয়নি কিনুর। তাই শাহজাহানদের পুকুরপাড়ে ঘর বেঁধেছে। রাস্তার পাশ দিয়ে লোকজন যাওয়ার সময় তাদের আর ঘাটের কথা মনে হয় না। কারণ ওই ঘর। চাঁচের বেড়া, কুটোর ছাউনি। পুকুরের চওড়া পাড় সবুজ ঘাসে এতটা মজবুত, কেউ কোনোদিন মাটি ভেঙে পড়তে দেখেনি। পুকুরটা…

  • বিসর্জনের রং

    বিসর্জনের রং

    ভোঁতা এবড়োখেবড়ো একটা রাস্তা হাজীগঞ্জের কাপড়িয়াপট্টি ধরে চলে গেছে ব্যাংকপাড়ার দিকে। যাওয়ার সময় ঝাপসা স্মৃতির মতো কুমোরবাড়ি ছুঁয়ে যায়। ব্যাংকপাড়ার পাশেই একটা খাল। বিকেল হলে স্বপ্না আন্টি খালপাড়ে বসে থাকে। জলে নিবদ্ধ চোখ স্থির হয়ে কী যেন দেখে। সুপ্রাচীন অন্ধকার ঠেলে ওই চোখে ভাঙা রোদ হরিয়ালের মতো দৌড়াতে থাকে। কাকে যেন খোঁজে আন্টি। পেছনে কুমোরদের…

  • সেই লোকটা আর মিঠুনের গল্প

    সেই লোকটা আর মিঠুনের গল্প

    মায়ের সঙ্গে হাঁটছি। মায়ের এক হাতে শক্ত করে আমার হাতটা ধরা। এভাবে হাঁটতে ভালোই লাগে, ঘুরে বেড়াতে। কত নতুন পথ। কত নতুন ঠিকানায় ঘোরাফেরা। অথচ হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। আবার যদি হারাইও – মা তো সঙ্গেই আছে। মাকে নিয়ে হারিয়ে যেতে বেশ লাগে। কত অজানা গন্তব্য। এ-সময় মনে হয়, কোথায় আছি, কোথায় যেতে হবে –…

  • সার্ভিসিং কোম্পানি

    সার্ভিসিং কোম্পানি

    ‘আহা, এ-জায়গাটা একদম ক্ষয়ে গেছে আপনার। শুকিয়ে চিমসে গেছে, ভেতরে রসটস নেই তেমন।’ খুবই মোলায়েম কণ্ঠে বলছিলেন ডাক্তার সাহেব, কিন্তু আয়েশা বেগমের চোখমুখ শুকিয়ে যেতে শুরু করল; আর যেটুকু রস অবশিষ্ট ছিল, তাও উবে গিয়ে ফ্যাকাসে দেখাতে লাগল। কিন্তু সেদিকে তাকানোর ফুরসত ছিল না ডাক্তার সাহেবের, নিবিষ্ট মনে তিনি পরীক্ষা করে যাচ্ছিলেন দেহের জোড়াগুলি, অপুষ্ট…