ছোট গল্প

  • গল্প নয়, জীবনকাহিনি

    গল্প নয়, জীবনকাহিনি

    পুরনো দিনের একটা গানের কথা মনে আছে আপনাদের? সেই যে – ‘গান নয় জীবনকাহিনি, সুর নয় ব্যথার রাগিনী’, রুনা লায়লা গেয়েছিলেন তাঁর অপূর্ব দরদি কণ্ঠে, সেটির কথা বলছি। গানটা বন্দিনী সিনেমার, লিপসিং করেছিলেন ববিতা, অনিন্দ্যসুন্দর তরুণী ববিতা। জানেনই তো, তিনি এমন এক নায়িকা, জীবনানন্দের ভাষায় যাকে বলা যায় – ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে পায়…

  • শূন্যের ছায়াতলে

    শূন্যের ছায়াতলে

    এক আপনার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি। সিগারেটটা বন্ধ করুন, অসহ্য গন্ধ! ক্যানভাসের ওপর আশিস মগ্ন হয়ে ছবি আঁকছে একমনে স্রোতের প্রতিক‚লে পাল তুলে একটা নৌকার তীব্র গতিবেগ। এক মুহূর্ত ফিরে তাকানোর সময় নেই। চারদিন ধরে ছবিটার পেছনে সময় দিয়ে প্রায় শেষ করে এনেছে। শরীরের মধ্যে নৃত্যের প্রস্তুতি চলছে ক্যানভাসের ওপর রংতুলির শেষ টাচ দেওয়ার মুহূর্তে।…

  • মাংসবৃত্তান্ত

    মাংসবৃত্তান্ত

    সিদ্ধান্তটা নিতে বারেকের কয়েক মাস দেরি হয়ে গেল। হোমসিকনেস। অভাব-অনটনের ঘানি টানতে টানতে মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে গেলেও বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও কাজের জন্য যেতে ওর মন সায় দেয় না। বিয়ের আগে যুবক বয়সে, গ্রামের অনেক দরিদ্র যারা নিজ গ্রাম ছেড়ে দূরদূরান্তে কাজের সন্ধানে বের হয়েছে, তাদের অনুরোধেও সে বাড়ি ছেড়ে কাজে যায়নি। সারা দিনে এক…

  • আলোকিত অন্ধকার

    আলোকিত অন্ধকার

    সন্ধেয় যখন জানতে পারে সাঈদুল, ভালো এক খবর, যাব কি যাব না ভাবনায় আরো একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে শেষমেশ পুরনো মাফলার দিয়ে মুখ-নাক ঢেকে বের হয়ে যায়। তখন আলিয়া পেছন থেকে ডাক দেয় – ‘বাবা এই সন্ধ্যার সময় কোথায় বের হলে? যা শীত পড়েছে, তোমার তো কোট-জ্যাকেটও নেই, আদ্যিকালের এক সোয়েটার, শীত কাটে না; কিছু লাগলে…

  • হোসাইনি কাহিনি

    হোসাইনি কাহিনি

    হোসাইনি পরিবার। জামাল হোসাইনি বাবা, তার দুই ছেলে – সায়েফ হোসাইনি ডাক্তার, আর ছোট ছেলে অমিত হোসাইনি অর্থনীতিতে পিএইচ.ডি। সায়েফ ইএনটি বিশেষজ্ঞ, প্র্যাকটিস ভালো। অমিত অস্ট্রেলিয়ায় থাকে, ভালো চাকরি করে। জামাল সাহেবের স্ত্রী মারা গেছেন অনেক আগে, ছেলেরা যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ে, আর বিয়ে করেননি। দারুণ গর্বিত পিতা জামাল সাহেব, অবশ্যই গর্ব করার বিষয়, একজন…

  • লক্ষ্মীমনির ঠিকানাবদল

    লক্ষ্মীমনির ঠিকানাবদল

    ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে। অজগরের মতো হেলেদুলে স্টেশন থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। পেটের মধ্যে পুরে নিয়েছে লক্ষ্মীমনিকে। নির্বিকার লক্ষ্মীমনির ভাবলেশহীন দৃষ্টি। তাকিয়ে আছে, বাগান নাকি খগেনমাঝি, কাকে দেখছে বোঝা গেল না। খগেনমাঝি চা-বাগানে রোজের শ্রমিক। সিলেটের সবচেয়ে বড় বাগানে কাজ করে। ওর পূর্বপুরুষরা বিহার থেকে এ-বাগানে এসেছিল। সেই থেকে এখানেই ওদের স্থিতি আর এখানেই শেষ। খগেনমাঝির…

  • সিধু-কানুর দ্রোহ

    সিধু-কানুর দ্রোহ

    (রকিবুল হাসান নিটোল ও সানজিদা বহ্নিকে) লিচু বাগানের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি। আমরা মানে – আমি, কৃষ্ঠু হাঁসদা আর হাঁসদার কোলের বাচ্চাটা। আমাদের পরিচয়ের বয়স বড়জোর দেড় ঘণ্টা। এইটুকু পরিচয়ে হাঁসদা আমাকে নিয়ে এগিয়ে চলছে, আর আমিও ওর পিছু পিছু পা ফেলছি। কিন্তু জনশূন্য এই লিচু বাগানটা যাতায়াতের পথ হয় কীভাবে সেটাই আমার মাথায় আসে…

  • ছায়াছন্ন

    ছায়াছন্ন

    জীবনে একবারই দুপুরবেলা ঘুমে চোখ লেগে এসেছিল জামিলা বেগমের। সে-ঘটনা যে সারাজীবন বিষাক্ত দুঃস্বপ্ন হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরবে, কে জানতো!  শরীরে যৌবন ঢুকি ঢুকি করছে সময়েও তার ঘুম পেত না। অথচ পিঠাপিঠি বড়বোন ভাত খেয়ে দুপুর উপুড় করে ঘুমে তলিয়ে যেত। জামিলা একা একাই তাদের বাড়ির সামনের বড় কাঁঠালগাছে ঝোলানো পিঁড়িতে বসে দুলতেন। মনে হতো,…

  • তিনি ও ভিখারি

    তিনি ও ভিখারি

    চোখ থেকে চশমাটি নামিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন তিনি চশমার দিকে। তারপর পাঞ্জাবির পকেট থেকে নরম কাপড়টি বের করে খুব যত্ন করে পরম মমতায় চশমার কাচ-দুটি ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে থাকেন, তবে তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে রাস্তার ওপাশের ফুটপাতে বসে থাকা ভিখারিটির দিকে। এবার তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ঠিক তাঁর নিজের নাকের চূড়ার ওপর। তিনি স্পষ্ট…

  • হরবোলা

    হরবোলা

    ঘেউ ঘেউ ঘেউ … মিয়াঁও মিয়াঁও মিয়াঁও … কিঁউ কিঁউ কিঁউ কিচ্ কিচ্ চক্ এরকম ডাকাডাকির শব্দ। ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে বেশ কয়েকজন রোগী, রোগীর সঙ্গী। অপেক্ষমাণ। সকলের সঙ্গেই শিশু আছে। কিংবা সকল শিশুর সঙ্গেই তার বাবা-মা কিংবা অভিভাবক আছেন। ডাক্তার শিশু-বিশেষজ্ঞ। এখানে কোনো কুকুর, বিড়াল কিংবা অন্য কোনো পশুপাখির চিকিৎসা করা হয় না। আর…

  • শ্রাদ্ধ

    শ্রাদ্ধ

    দোকানের নাম ‘শিব্রাম চক্কোত্তির বইয়ের দোকান’। দোকানের সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে প্রথমদিন শিব্রামবাবু ফিক করে হেসে ফেললেন। ভাবলেন, সাইনবোর্ড দেখে ক্রেতা তাঁর দোকানে ঢুকবে প্রফুল্লচিত্তে হাসিমুখে। কিন্তু তাঁর দোকানের নাম পড়ে তিনি ছাড়া আর কেউ কোনোদিন হাসলো না। বরং বিরক্ত হয়ে একজন জিজ্ঞেস করলো, এ কেমন নাম মশাই? আপনি কি শিব্রাম চক্রবর্তী? – আজ্ঞে। – আপনি…

  • রাবনা ব্রিজের অলৌকিক আঁধার

    রাবনা ব্রিজের অলৌকিক আঁধার

    কোথায় যেন পড়েছি – ‘মৃত্যু মানুষের প্রেমকে অমরত্ব প্রদান করে, নান্দনিক ও মহিমান্বিত করে।’ কারো গল্প কিংবা উপন্যাসে হয়তো। শরৎচন্দ্রের কোনো লেখায় কি? হতে পারে, নাও হতে পারে। ঠিক মনে করতে পারছি না। শরৎবাবু তো বলেছেন – ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়’ – এই দূরে ঠেলে দেওয়াই কি মৃত্যু? হতে পারে,…