শ্রদ্ধান্জলি
-

শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ও কাব্যবোধ
তাঁর প্রয়াণের প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় আগে কবি শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘তথাকথিত পাপবোধ আমার নেই। যে কাজ অপরের অনিষ্ট করে তা অপরাধ। ধর্মীয় আচরণকে আমি অবহেলা করতে চাই, যে-কারণে আমার আঙুলে আংটি নেই, আমার গলা থেকে পইতে পরিত্যক্ত আর কিছুকাল বোহেমিয়ান জীবনযাপন করার পর অবশেষে একজন অসবর্ণ নারীর পাণিগ্রহণ করেছি।’ আর তার সঙ্গে তিনি…
-

ভাষাসংগ্রামী রফিকুল ইসলাম স্মরণে
রফিকুল ইসলাম। ভাষাসংগ্রামী রফিকুল ইসলাম। জাতীয় অধ্যাপক ডক্টর রফিকুল ইসলাম। দীর্ঘ ছয় দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। আমাদের সংস্কৃতির, আমাদের সাহিত্যের, আমাদের জাতিসত্তার অনন্য এক ঠিকানা রফিকুল ইসলাম। আজ এই বিপন্ন মুহূর্তে স্যারকে নিয়ে কিছু লিখতে আমার কলম চলছে না। বিগত ১৯শে নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিতব্য স্মারক সংকলনে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল’…
-

হাসান আজিজুল হক : স্মৃতিতে সৃজনে অম্লান
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আমার সমবয়সী। এর কোলঘেঁষে পৈতৃক বসতভিটে, কাজলা তার নাম। দু-চোখ ভরে দেখেছি ও ভালোবেসেছি তরতর করে বেড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি। স্বাধীনতার পর উপাচার্য শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক খান সারওয়ার মুরশিদ কয়েকজন গুণী শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেন। কবি আতাউর রহমান, হাসান আজিজুল হক ও আবুবকর সিদ্দিক তাঁদের অন্যতম। কবি আতাউর রহমান ইহকালে নেই। সিদ্দিক স্যার শয্যাশায়ী। কদিন আগে…
-

হাসান আজিজুল হকের মুক্তিযুদ্ধের গল্প
বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে ছোটগল্পকার হিসেবে হাসান আজিজুল হকের অবদান অসামান্য। তিনি আমাদের ছোটগল্পে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অনন্য রূপকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ‘তারাশঙ্কর দ্বিতীয়বার পড়তে চাই না, কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সারাজীবন বারবার পড়বো।’ কথাটি বলেছেন বর্তমান সময়ের খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক (জন্ম ১৯৩৮, মৃত্যু ২০২১)। উক্তিটি থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, তাঁর…
-

হাসানের আত্মজ্ঞান ও আত্ম-উপলব্ধির সীমানা
তাঁর গল্প-উপন্যাসের মতো অসীম রায়ের ডায়েরিও বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তো সেই ডায়েরিতে ষাটের দশকের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ লেখকদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে অসীম রায় প্রশংসা করে হাসান আজিজুল হকের কথা লিখেছিলেন। বেশ জোরের সঙ্গেই তিনি বলেছিলেন যে, হাসানের ‘ভাষার উপর দখলটা বেশ ভালো।’ খুশিও হয়েছিলেন এইটা জেনে যে, তরুণ হাসান তো ‘আসলে বর্ধমানের…
-

হাসান আজিজুল হকের হেমিংওয়ে চর্চা ও অনুবাদ
মার্কিন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ের (জুলাই ২১, ১৮৯৯ – জুলাই ২, ১৯৬১) জন্ম শিকাগো নগরের শহরতলির ছোট শহর ওক পার্কে। বাবা ক্লেয়ারেন্স এন্ডমন্ডস হেমিংওয়ে পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। তাঁর ছিল দুটি নেশা – শিকার করা আর মাছ ধরা। তাঁর মা গ্রেস হল ছিলেন চার্চ-গায়িকা। বাবা-মা দুজনই চাইতেন হেমিংওয়ে তাঁদের মতো হোক। ফলে বাবা কিশোর…
-

তাহেরা খানমের বেলা অবেলার রঙরাগিণী
বাংলাদেশে নারীদের চিত্রকলাচর্চা শুরুর পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। সাতচল্লিশে ভারতভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রে, বিশেষত ধর্মের ওজর তুলে, নারীদের গৃহকোণে বন্দি রাখার একটা প্রবল প্রবণতা ছিল। সে-সময় যাঁরা সমাজের এই অর্গল ভাঙার পথ দেখিয়েছিলেন তাঁদের একজন তাহেরা খানম। সমাজের অন্ধ রীতিনীতি ও প্রথাবিরোধী এই শিল্পীর জন্ম ১৯৩৬ সালে বরিশালে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত প্রচলিত শিক্ষা সমাপনের পর ১৯৫৪-৫৫…
-

আমার আব্বি
যাঁকে নিয়ে আজ লিখছি, তিনি আমার পিতা। ‘আব্বি’ সম্বোধন করি তাঁকে। প্রায় সব কন্যাসন্তানের মতোই আমারও জীবনের প্রথম প্রেম যাঁর সঙ্গে, তিনি আমার আব্বি, কথাসাহিত্যিক বশীর আল্হেলাল। তাঁর আদি, পিতৃপ্রদত্ত নাম নেয়ামাল বশীর। অগ্রজের নাম ছিল নেয়ামাল বাসির। আরবি-ফার্সি-উর্দুর পণ্ডিত তাঁদের পিতার জ্ঞান-বিবেচনায় ত্রিশের দশকে তাঁর এই দুই সন্তানের জন্মের পর ‘বশীর’ আর ‘বাসির’ শব্দ-দুটো…
-

বেলাশেষের গান : স্বাতী তারা স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত
নক্ষত্রের পতন। ধীরে ধীরে সূর্যের আলোয় বিচ্ছুরিত ছটা ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। আপন প্রতিভার সক্ষমতায় তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তোলা। কি অভিনয়ে, কি নির্দেশনায়, নাট্য-রচনায় ও অনুবাদে, সাংগঠনিক কাজে, নাট্য-প্রশিক্ষণে, সংগীত পরিচালনায় ও পোশাক পরিকল্পনায় নিজের প্রাণমন সঁপে দিয়েছিলেন যিনি, তিনি স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। একেই বলে সাধনা। একটা কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন সারাক্ষণ। কীভাবে দিন পার হয়ে…
-

সিরাজীর সৃষ্টিসত্য
ব্যক্তিজীবনের সীমিত আয়ু পেরিয়ে ২৪ মে ২০২১ তারিখে আমার বন্ধু কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী চিরজীবনে প্রবেশ করেছে। এখন থেকে তার সুপুষ্ট রচনাসম্ভারই তার প্রধান পরিচয়। দেখতে দেখতে পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাট পেরিয়ে সত্তর পেরিয়ে তিয়াত্তরে প্রবেশ করেছিল সিরাজী। কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ পালকটি তখন তার মুকুটে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক রূপে প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত। তারপরেই দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে…
-

সিরাজীর প্রথম কাব্য : ‘শব্দে শব্দে বিয়া’
প্রথম কাব্যগ্রন্থ দাও বৃক্ষ দাও দিন থেকেই হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিসত্তা নিজের পথ সন্ধান করে নিতে চাইছিল। গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে, মোট ৪৫টি কবিতার সমাহার। তারপর শুধু লিখেই গেছেন অন্তরতাগিদে, একের পর এক কবিতাগ্রন্থ বের হয়েছে। বিবর্তিত ও বিকশিত হয়েছেন কি? সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে প্রবেশ করতে হয় তাঁর রচনার গভীরে, চিহ্নিত করতে হয়…
-

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : কবিতা ও গদ্যের মায়াভূমি
ঈহার অন্দরে জীবনের সত্তর বসন্ত অতিক্রম করে একাত্তরে এসে বাংলা কবিতামালঞ্চে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর উপহার-কুসুম ঈহা (২০১৯)। প্রারম্ভ কবিতা ‘কুয়ো’, সমাপ্তি এবং নামকবিতা ‘ঈহা’। ১৯৭৫-এ দাও বৃক্ষ দাও দিন দিয়ে যে-কাব্যিক অভিযাত্রাবিন্দুর অবতরণিকা, ২০১৯-এ ঈহায় এসে তা নবমাত্রাগামী। না হলে পুস্তকের সূচনাতে কী করে কবি উচ্চারণক্ষম – আমি কবিতা পাঠ করি না অশ্রু পড়ি অতল কুয়োয়।…
