শ্রদ্ধান্জলি
-

সিরাজীর সৃষ্টিসত্য
ব্যক্তিজীবনের সীমিত আয়ু পেরিয়ে ২৪ মে ২০২১ তারিখে আমার বন্ধু কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী চিরজীবনে প্রবেশ করেছে। এখন থেকে তার সুপুষ্ট রচনাসম্ভারই তার প্রধান পরিচয়। দেখতে দেখতে পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাট পেরিয়ে সত্তর পেরিয়ে তিয়াত্তরে প্রবেশ করেছিল সিরাজী। কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ পালকটি তখন তার মুকুটে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক রূপে প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত। তারপরেই দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে…
-

সিরাজীর প্রথম কাব্য : ‘শব্দে শব্দে বিয়া’
প্রথম কাব্যগ্রন্থ দাও বৃক্ষ দাও দিন থেকেই হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিসত্তা নিজের পথ সন্ধান করে নিতে চাইছিল। গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে, মোট ৪৫টি কবিতার সমাহার। তারপর শুধু লিখেই গেছেন অন্তরতাগিদে, একের পর এক কবিতাগ্রন্থ বের হয়েছে। বিবর্তিত ও বিকশিত হয়েছেন কি? সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে প্রবেশ করতে হয় তাঁর রচনার গভীরে, চিহ্নিত করতে হয়…
-

হাবীবুল্লাহ সিরাজী : কবিতা ও গদ্যের মায়াভূমি
ঈহার অন্দরে জীবনের সত্তর বসন্ত অতিক্রম করে একাত্তরে এসে বাংলা কবিতামালঞ্চে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর উপহার-কুসুম ঈহা (২০১৯)। প্রারম্ভ কবিতা ‘কুয়ো’, সমাপ্তি এবং নামকবিতা ‘ঈহা’। ১৯৭৫-এ দাও বৃক্ষ দাও দিন দিয়ে যে-কাব্যিক অভিযাত্রাবিন্দুর অবতরণিকা, ২০১৯-এ ঈহায় এসে তা নবমাত্রাগামী। না হলে পুস্তকের সূচনাতে কী করে কবি উচ্চারণক্ষম – আমি কবিতা পাঠ করি না অশ্রু পড়ি অতল কুয়োয়।…
-

শঙ্খ ঘোষ, স্রষ্টা ও সামাজিক
(৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩২ – ২১ এপ্রিল, ২০২১) আমরা সকলেই ইদানীং ‘পাবলিক ইন্টেলেক্চুয়াল’ কথাটার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, ইউরোপীয় দার্শনিক ইযুরগেন হাবেরমাসকে কথাটা উদ্ভাবনের কৃতিত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু কথাটাই হয়তো উদ্ভাবন করেছিলেন তিনি, মানুষের সংস্কৃতিতে বহু আগে থেকে এই দায়বদ্ধ বুদ্ধিজীবীর অস্তিত্ব ছিল। গ্রিক দার্শনিক সোক্রাতেসের কথাটা তো সকলের আগেই মনে পড়বে। নানা সংস্কৃতিতেই এই বুদ্ধিজীবীদের একটি…
-

শঙ্খ ঘোষের চিঠি : শিশিরকুমার দাশকে
সংগ্রহ ও ভূমিকা : ভূঁইয়া ইকবাল শঙ্খ ঘোষ (১৯৩২-২০২১) ও শিশিরকুমার দাশের (১৯৩৬-২০০৩) সম্পর্ক ছিল অগ্রজ-অনুজপ্রতিম। এই দুই মনীষী সাহিত্যশিল্পীর মধ্যে যে পত্রব্যবহার হয়েছিল তার কয়েকটি আমাদের হস্তগত হয়েছে। শঙ্খ ঘোষের কিছু চিঠি এখানে গ্রথিত হলো। শিশির দাশের কিছু পত্রাবলি শঙ্খ ঘোষ উপযুক্ত ভাষ্যসমেত সংকলন করেছেন পুরোনো চিঠির ঝাঁপি (২০১৯) গ্রন্থে। পত্রকার ও প্রাপক –…
-

প্রসঙ্গ : শঙ্খ ঘোষ
এই মুহূর্তে সমগ্র শিক্ষিত বাঙালি সমাজে এক স্তব্ধতা নেমে এসেছে শঙ্খ ঘোষের চলে যাবার কারণে। বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি চলে গেলেন বলে শুধু নয়, চলে গেলেন একজন প্রকৃত ‘ধার্মিক’ মানুষ – ধর্ম মানে যেখানে বিশুদ্ধ নৈতিকতা, বিশুদ্ধ মানবতা। কোনো সম্প্রদায়ভুক্ত খণ্ডিত মানুষের পক্ষে এই রকম একজন প্রকৃত ধার্মিক মানুষ হওয়া প্রায় অসম্ভব। পাশাপাশি তাঁর…
-

প্রয়াণলেখ
মৃত্যুর মতো অবধারিত আর কিছুই নেই, তবু কোনো কোনো মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় – এমন কেন হয়! কেন কোনো চলে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। অথচ এও তো জানি শরীরের অবসান কারো বিরাটত্বকে খাটো করতে পারে না, মানুষের বেঁচে থাকা তাঁর কীর্তিতেই। ২০২১-এর ২১ এপ্রিল প্রয়াণ হলো শঙ্খ ঘোষের, তাঁর অনুরাগীদের কাছে রয়ে…
-

এক দ্রোণাচার্যের কথা (তর্পণ : শ্রী শঙ্খ ঘোষ)
এক যুবক কবি ভিড়ের আড়ালে দূর থেকে বুদ্ধদেব বসুকে দেখছেন। মাঝখানে তাঁর দৃষ্টি ঢেকে কলেজ স্ট্রিটের রাস্তায় ঘণ্টি বাজিয়ে ট্রাম চলে যায়, কত হাজাররকম ব্যস্ততা ফুলেফেঁপে ওঠে। যুবক শুধু দূর থেকে দেখে যান স্বনামধন্য কবি ও সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুকে – নিজের পরিচয় দিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়াতে কোথাও যেন সংকোচ হয় তাঁর। … এই একই ঘটনার…
-

শঙ্খ ঘোষ : কিছুটা ব্যক্তিগত অনুষঙ্গে
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। মফস্বলের শহর থেকে সোজা রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে। কলাভবনে ছবি আঁকার পাঠ নিতে এসেছি। আমার কাছে এ একেবারে অন্যভুবন, বড় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে সময়। প্রথম বর্ষের পাঠশেষে কখন যে দ্বিতীয় ধাপে উঠে পড়েছি কে জানে! তাহলে আমরা একটু সিনিয়র, এবারে আরেক রকমের অপেক্ষা। নতুন ছেলেমেয়েরা ভর্তি হবে – এই ভেবে মনের মধ্যে প্রবল…
-

শঙ্খ ঘোষের কবিতা : একটি অলীক সংলাপ
(আধুনিক বাংলা কবিতার অলোকসামান্য ব্যক্তিত্ব শঙ্খ ঘোষ করোনাকবলিত হয়ে বিদায় নিলেন। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে। তাঁর কবিপ্রতিভার আলোচনা, বিশ্লেষণ বহু হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। আমরা এখন শোকের ভার লাঘব করতে পরলোকে বিশ্বাস স্থাপন করে ফিরে যাব স্বর্গোদ্যানে, যেখানে তিনি তাঁর সতীর্থ, গুণমুগ্ধ কয়েকজনের দেখা পেয়ে সংলাপে মগ্ন হয়েছেন। চলুন, আমরা চুপ থেকে ওনাদের…
-

কবি অলোকরঞ্জন ও তাঁর কাব্যপরিসর
এই তো সেদিনের কথা। ১৭ই নভেম্বর। একটু রাত করেই ঘুমোই। হঠাৎই ফেসবুকে ভেসে উঠল অলোকদার প্রয়াণসংবাদ। চমকে উঠলাম। সুশীলদা মানে আমাদের সুশীল সাহাকে ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম। ফোন বন্ধ। সারারাত জেগেই কাটল। ঘুমবো কী করে? মনে পড়ে এরকমই অবস্থা হয়েছিল সমালোচক অধ্যাপক উজ্জ্বলকুমার মজুমদারের প্রয়াণসংবাদে। যে কয়েকজন প্রথিতযশা মানুষের কাছে এসেছি, ভালোবাসা পেয়েছি তাঁদের মধ্যে…
-

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত : অধিবিদ্যার কবি
এক বেশ্যা অনায়াসে ভিতরমন্দিরে ঢুকে যায় বুদ্ধ মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল এক বেশ্যা ঢুকে যায় পেছন-দুয়ার ঠেলে দাঁড়ায় বৃদ্ধের ঠিক পাশে; দুটি দেবদারু দেয় দ্বারপ্রান্তে সযত্নে পাহারা কেউ যেন বুঝতে না পায়, কবিতা কি শুধু আবেগ আর প্রেমের, শুধুই কি বৃক্ষ, অরণ্য আর নীরবতার? প্রেম-প্রণয়ের বিপরীতে কবিতা যে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ হয়ে উঠতে…
