প্রবন্ধ

  • কলকাতা এক ঝলক

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত  খেলাচ্ছলেঁ হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্তর দশকের শুরুর দিকেও প্রত্ন ভারততত্ত্বের দাপট ছিল অব্যাহত। কে না জানে নাৎসি ফুরারের ব্যক্তিগত অভীপ্সায় গোটা জার্মানিজুড়ে তেরোটি – বলা বাহুল্য একটি অমাঙ্গলিক সংখ্যা – চেয়ারে অধিষ্ঠিত ছিলেন ইন্ডোলজির বাঘা-বাঘা দিগ্গজ পন্ডিত যাঁরা পরস্পরের সঙ্গে সংস্কৃতেই সংলাপ চালাতেন। এই ভয়াবহ আবহ এক ঝটকায় সরিয়ে দেওয়ার মন্দ্রণায় যখন আমরা দুই…

  • নতুন অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    মোহীত উল আলম  ফকরুল আলম এবং রাধা চক্রবর্তী রবীন্দ্র-সাহিত্য নতুনভাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করার জন্য একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। তাঁরা দ্য এসেনশিয়াল টেগোর শিরোনামে আটশো উনিশ পৃষ্ঠার কলেবরে এক খন্ডে সমাপ্ত রবীন্দ্রনাথের বিভিন্নধর্মী রচনার ইংরেজি অনুবাদ সম্পাদনা করেছেন। শক্ত মলাটে বাঁধাই এ অমনিবাস খন্ডটি প্রকাশ করেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের পক্ষে বেলন্যাপ প্রেস। প্রকাশকাল ২০১১। গ্রন্থটির…

  • বাংলাদেশের উপন্যাস : একটি সরল পাঠ

    মোস্তফা তারিকুল আহসান উপন্যাস প্রত্যয়টির সঙ্গে পরিচিত সবাই জানেন, ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের পর, ব্যক্তি মানুষ যখন জেগে ওঠে অর্থাৎ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জন্মের পর উপন্যাসের আবির্ভাব হয়।  সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। মহাকাব্যের বিশাল পটভূমিতে ব্যক্তিজীবনের অনুভূতি-ক্লেদ পাঠক ঠিকমতো খুঁজে পেত না। মহাকাব্যের যুগ শেষ হওয়ার পরই সে-কারণে উপন্যাসের যুগ বোধহয় শুরু হয়। অসম্ভব এক সম্ভাবনাকে মানুষের সামনে প্রতিভাত…

  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আমাদের সাহিত্য

    রফিকউল্লাহ খান বাঙালি জীবনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা বৈপ্লবিক যুগান্তরের সম্ভাবনায় তাৎপর্যবহ ও সুদূরপ্রসারী। ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসন-বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনের অনিঃশেষ চেতনা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের মতো শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের গণজাগরণ ও বৈপ্লবিক চেতনার স্পর্শে এক অপরিমেয় সম্ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে আমাদের সাহিত্যলোক। সেই উজ্জীবনী…

  • গড়শ্রীখণ্ড ও অমিয়ভূষণ

    ক. প্রাক-প্রসঙ্গ মহামানবদের কিছু কিছু উক্তি কখনো কখনো ভুলে যাওয়াই ভালো। যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দুজন মহামানব গড় শ্রীখণ্ড সম্পর্কে যে-দুটি মন্তব্য করেছিলেন, সে-দুটি পাশাপাশি রাখলে গড় শ্রীখণ্ড না-পড়া পাঠক হকচকিয়ে যাবেন। উক্তিদুটি তুলে ধরা যাক। প্রথম উক্তি রাজশেখর বসুর। তিনি গড় শ্রীখণ্ড-প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘কি ভাষা! পড়া যায় না।’ অন্যদিকে পূর্বাশা-সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য ১৩৬০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় সার্টিফিকেট দিচ্ছেন এই বলে, ‘তরুণ কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অমিয়ভূষণ মজুমদারই এমন একজন লেখক যিনি বহুবিধ কোণ থেকে জীবনকে দেখতে জানেন।… গড় শ্রীখণ্ড তাঁর প্রথম উপন্যাস। আমাদের আশা আছে এ-রচনাটি তাঁকে বাংলা উপন্যাসের আসরে সম্মানের আসন দান করবে।’ অতএব আমাদের আপাতত দেরিদাপন্থি হওয়াই ভালো। কে লিখেছেন, সেই লেখা সম্পর্কে কে কী বলেছেন Ñ এসব নিয়ে না ভেবে সরাসরি টেক্সটে প্রবেশের যে-প্রস্তাবনা জাক দেরিদা করেছিলেন, সেটি মেনে চলতে পারলে মনে হয় ভালোই হতো। কিন্তু পুরোপুরি মেনে চলা কোনো পাঠকের পক্ষেই সম্ভব নয়। আরেকটি জরুরি কথা। বলা হয়ে থাকে যে, অমিয়ভূষণ ছিলেন প্রচারবিমুখ, নিভৃতচারী। হয়তো তাঁর প্রথম জীবন সম্পর্কে কথাগুলো খাটে। কিন্তু শেষ জীবনে তিনি এসেছিলেন আলোকবৃত্তের একেবারে কেন্দ্রে। নিজের সম্পর্কে কথাবার্তা বলেছেন ও লিখেছেন প্রচুর। কাজেই অমিয়ভূষণের জবানি দিয়েই কিংবা তাঁর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেই ধাপে ধাপে তাঁর রচনাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। গড় শ্রীখণ্ড-প্রসঙ্গেও এ-কথা সমভাবে প্রযোজ্য।সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অমিয়ভূষণের উপন্যাস, গল্প তথা অমিয়ভূষণ-লিখিত যে-কোনো রচনাকেই ক্লাসিক বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একশ্রেণির সমালোচক এবং আকাশে নাক বেঁধে রাখা বোদ্ধাপাঠক (!) অমিয়ভূষণের লেখায় যে-অসংগতি থাকতে পারে, তা মেনে নিতে রাজি নন। কোন কোন গুণের সন্নিবেশ ঘটলে কোনো রচনা ক্লাসিকত্বপ্রাপ্ত হয়, তা এই নিবন্ধকারের কাছে পরিষ্কার নয় বিধায় এই রচনাটিতে ‘উক্ত’ শব্দ প্রযোজ্য হবে না। মনে রাখা দরকার, ক্লাসিক উপাধি ছাড়াই অনেক সাহিত্য ‘উৎকৃষ্ট সাহিত্য’ বলে পরিগণিত হতে পারে। ব্যক্তিগত সমীক্ষায় দেখা গেছে, অমিয়ভূষণের গুণমুগ্ধ ভক্তের সংখ্যা যতটা, অভিনিবেশী পাঠকের সংখ্যা তার চাইতে ঢের কম। তাঁর গুণমুগ্ধরা তাঁর রচনার চাইতে সাক্ষাৎকার, মন্তব্য ও সমালোচনা পড়েই অমিয়ভূষণের অন্ধ স্তাবকতা করে থাকেন। এই রকম কিছু স্তাবকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, ‘আমাদের একপাশে সোশ্যাল রিয়ালিজম আর অন্যপাশে দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক স্ট্রিম অব কনসাসনেসের চোরাপাহাড়। এই দুটি থেকে অব্যাহতি কামনা করেছিলেন তিনি। তাহলে অন্তত পাঠক হিসেবে রিলিফ পাওয়া যায়। অমিয়ভূষণে এই রিলিফ মিলবে না। বিশেষত স্ট্রিম অব কনশাসনেসের ব্যবহারে নিজের সিদ্ধি নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত ছিলেন তিনি। সুতরাং চোরাপাহাড়ে পথ রুদ্ধ দেখলে পাঠকের হতবাক না হওয়াই উচিত।’ খ. উপন্যাস বলতে অমিয়ভূষণ নিজে কী বুঝতেন বা বোঝাতে চাইতেন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত উত্তরাধিকার পত্রিকার অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৯৪ সংখ্যায় প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে অমিয়ভূষণ বলেছিলেন, ‘আমি শেষের কবিতাকে উপন্যাস মনে করি না। উপন্যাস ও-জিনিস নয়। গোরা, ঘরে বাইরে, চতুরঙ্গ Ñ এগুলোকে আমি উপন্যাস বলি। নৌকাডুবিকেও বলি। কিন্তু চোখের বালি Ñ তাকে উপন্যাস বলি না।’ তাহলে তিনি কাকে বলছেন উপন্যাস? এ-বিষয়ে তাঁর নিজেরই একটি প্রবন্ধ রয়েছে। নাম ‘উপন্যাস সম্বন্ধে’। আমরা যদি সেই প্রবন্ধের দ্বারস্থ হই, তাহলে কিছুটা সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, উপন্যাস সম্পর্কে ধারণা স্বচ্ছ হলে অনেক সমস্যা কেটে যায়। তবে মনে রাখা দরকার, কেউ কোনোদিন কোনো শিল্প সম্পর্কে জলবৎ তরলং স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারেনি। পুরো প্রবন্ধ আদ্যোপান্ত পাঠ করার পরে স্বীকার করতে পাঠক বাধ্য হন যে, অমিয়ভূষণও ‘উপন্যাস সম্বন্ধে’ কোনো স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারেননি। ওই প্রবন্ধে উপন্যাস কী Ñ তা না বলে তিনি মূলত বলতে চেয়েছেন কী কী আসলে উপন্যাস নয়। যেমন, সাধারণ প্রচলিত মত হচ্ছে, নরনারীর নামযুক্ত ঘটনাবলিকেই উপন্যাস বলা হয়ে থাকে। অমিয়ভূষণ এই সরলীকৃত সংজ্ঞাকে বিদ্রƒপ করেছেন তীক্ষèভাবে। প্রবন্ধে আরেকটি সরলীকৃত ধারণাকেও তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। পূর্বসূরি একজন সাহিত্যতাত্ত্বিক উপন্যাসকে পোর্টম্যান্টোর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, অর্থাৎ এতে, পোর্টম্যান্টোতে যেমন, তোমার সবকিছু রাখতে পারো…

  • শেক্সপিয়র-সমালোচনা সাম্প্রতিকধারাএবংআমাদেরপরিপ্রেক্ষিত

    শেক্সপিয়র-সমালোচনা সাম্প্রতিকধারাএবংআমাদেরপরিপ্রেক্ষিত

    কাজী মোস্তাইন বিল্লাহ শেক্সপিয়র-বিষয়ে এই প্রবন্ধটির লক্ষ্য দুটি : এক. শেক্সপিয়রের সাম্প্রতিক সমালোচনার প্রতি আলোকপাত করা; দুই. তারই আলোকে আমাদের শেক্সপিয়র-চর্চার সম্ভাবনা সম্পর্কে মন্তব্য করা। সাহিত্য-রুচিতে ডানপন্থি আমেরিকান সাহিত্য-সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম (Harold Bloom) সম্প্রতি শেক্সপিয়র-বিষয়ে Shakespeare : The Invention of the Human নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। ব্লুম-প্রভাবের আশংকা (anxiety of influence) শীর্ষক সাহিত্যতত্ত্বের প্রবর্তক। মাত্র কয়েক বছর আগে পশ্চিমা-সাহিত্যের সূচক (western literary canon) নির্মাণে তিনি যে-বিচারবোধ প্রয়োগ করেন তাতে রক্ষণশীলতার ছাপ স্পষ্ট। শেক্সপিয়র গ্রন্থেও তিনি সাহিত্যতত্ত্বের ‘চলতি হাওয়ার  বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সাহিত্যতত্ত্বের জন্য তাঁর তেমন কোনো সহানুভূতি নেই। শেক্সপিয়রকে তিনি মূল্যায়ন করতে চান ভিন্ন নিরিখে। সাহিত্যের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, ইত্যাদি প্রশ্ন সাহিত্য-সমালোচনার মূল লক্ষ্য হলেও ‘সাহিত্যতত্ত্ব’ শীর্ষক একটি স্বতন্ত্র শাখা সৃজনশীল রচনার পাশাপাশি বিকাশলাভ করেছে। সাধারণ দোষ-গুণের হিসাবের পর ক্রমান্বয়ে সাহিত্য-আলোচনা স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি তত্ত্বের (লিটারেরি থিয়োরি) রূপ নিয়েছে। সাহিত্য-বিচারে এর গুরুত্ব এখন এত বেশি যে বর্তমান সময়কে তত্ত্বের কাল বললে অত্যুক্তি করা হবে না। সাহিত্যতত্ত্ব বেশ জটিল, অনেক সময়ে দুরূহ জগৎ-সভ্যতা-মনন ইত্যাদি যেভাবে বিবর্তিত হচ্ছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সাহিত্য-বিচারের লেন্স পালটাতে হচ্ছে; নতুন করে দেখতে, শিখতে হচ্ছে। নতুন নতুন টার্মস, বৈপ্লবিক সব ধারণা দ্রুত এবং এত ব্যাপকভাবে চলে এসেছে যে, অনেক সময় এর সঙ্গে তাল মেলানো যায় না। তত্ত্বের এই অগ্রগতিকে সবাই যে স্বাগত জানিয়েছেন, তেমনও নয়। সাহিত্যতত্ত্ব-বিষয়ে ডান ও বামপন্থিদের স্বাভাবিক মতপার্থক্যের কথা বাদ দিলেও তাত্ত্বিকদের অনেকেই স্বতন্ত্রভাবে অপছন্দের লক্ষ্য বাছাই করে সেটিকে আক্রমণ করেছেন। যেমন, টেরি ইগলটন (ঞবৎৎু ঊধমষবঃড়হ) নিজে একজন মার্কসীয় সাহিত্যতাত্ত্বিক, কিন্তু মানব-চিন্তার বিবর্তনের ধারাক্রমে বিকশিত উত্তর-আধুনিকতার (ঢ়ড়ংঃ-সড়ফবৎহরংস) প্রতি তিনি অপ্রসন্ন। তত্ত্বের জগতে উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে যে-চাঞ্চল্য চলছে তার সঙ্গে দ্রুত পা না চালিয়ে চেতনায় বিকশিত গতিতে হ্রাস টেনে উত্তর-আধুনিকতার আঁধারকেই আলোকিত করতে চেয়েছেন বেশি করে এবং এজন্যই বোধহয় উত্তর-আধুনিকতা-বিষয়ে তাঁর গ্রন্থের নাম রেখেছেন The Illusion of Post Modernism। উত্তর-আধুনিকতা-বিষয়ে ইগলটনের বড় আপত্তি হলো এটি রাজনীতিতে বিপ্লবী, কিন্তু আর্থিক-বিষয়ে শোষণের সহযোগী (radical in politics, but complicit…

  • রবীন্দ্রনাথের মরণদর্শন

    রবীন্দ্রনাথের মরণদর্শন

    আবদুশ শাকুর মৃত্যুদর্শনকে মরণদর্শন লিখলাম, বিষয়টা জীবনদর্শনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিধায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) মরণদর্শন গড়ে ওঠে তাঁর প্রায়-তেইশ বছর বয়সে লোকান্তরিতা নতুন বউঠাকুরাণী কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু (১৮৮৪) থেকে, কবির তেরো বছর দশ মাস বয়সে প্রয়াতা মাতা সারদা দেবীর মৃত্যু (১৮৭৫) থেকে নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনস্মৃতির ‘মৃত্যুশোক’ অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘আমার চব্বিশ বছর (আসলে বাইশ বছর এগারো মাস তেরো দিন) বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে-পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মুত্যৃকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়Ñকিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই।’ রবীন্দ্র-রচনাবলী, খ ১৭, পৃ ৪২৩। তাছাড়া তেতালায় মাতার মৃত্যুর সময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নিচের তালায় নিদ্রিত, বড়ো বউঠাকুরাণী সর্বসুন্দরী দেবীর মৃত্যুর (১৮৭৮) সময় কবি আমেদাবাদে অবস্থান করছিলেন, শিলাইদহে জ্যেষ্ঠ ভগ্নীপতি সারদাপ্রসাদের মৃত্যুর (১৮৮৩) সময় রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় নিজের বিবাহবাসরে। কিন্তু বিয়েটির মাত্র চার মাস দশ দিন পর প্রায়-দুদিনের করুণ সংগ্রামে পরাজিতা (কবি যাঁকে ‘জীবনের ধ্রুবতারা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, সেই) নতুন বৌঠানের মৃত্যু ঘটল, বলতে গেলে, তাঁর চোখের সামনে। রবিজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন, ‘কাদম্বরী দেবীর চিকিৎসা বিষয়ে যে ব্যাপক ও বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় তাতে মনে হয়, সুনয়নী দেবীর বর্ণনা-মতো আফিম-সেবনের ফলে মৃত অবস্থায় তাঁর দেহ আবি®কৃত হয়নি, তাঁর জীবনরক্ষার জন্য বহু ডাক্তার প্রাণপণ চেষ্টা করার সুযোগ পেয়েছেন … ৮ ও ৯ বৈশাখ দুদিন ডাক্তাররা তাঁর জীবন রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সম্ভবত ৯ বৈশাখ [রবি ২০ Apr] রাত্রে বা ১০ বৈশাখ [সোম ২১ অঢ়ৎ] প্রভাতে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।’ রবিজীবনী, খ ২, পৃ ২০৬। অর্থাৎ রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বর্ণিত ও বহুলপ্রচলিত ৮ বৈশাখ ১২৯১ বা ১৯ এপ্রিল ১৮৮৪ তারিখটি তথ্যসমর্থিত নয়। মৃত্যু-তারিখটি নিয়ে বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ এই যে আত্মহত্যাকারিণীর মৃত্যুসংবাদটি কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। সেটা না-হওয়ার কারণ হয়তো ‘নূতন বধূঠাকুরাণীর মৃত্যু হওয়ায় খবরের কাগজে উক্ত সম্বাদ নিবারণ করার জন্য ব্যয় বিঃ ১ বৌচর … ৫২’ (প্রাগুক্ত, পৃ ২০৭)। যাহোক, কাদম্বরী দেবীর  অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়ে সোমেন্দ্রনাথ, দ্বিপেন্দ্রনাথ এবং অরুণেন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথও শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সবিস্তার প্রত্যক্ষ করা এবং তাঁর সর্বসত্তাকে নাড়া দেওয়া এই মৃত্যুটি থেকে পাওয়া প্রথম শোক অপরিশ্রুত রূপ পরিগ্রহ করে ‘পুষ্পাঞ্জলি’ শীর্ষক সমসাময়িক রচনায় (র-র, খ ১৭, পৃ ৪৮৬-৯৬)। কাদম্বরী দেবীর স্মৃতি-সুরভিত এই সব অনুচ্ছেদ,…

  • লাইক ফতেহ্আলীর সঙ্গে কল্পসংলাপ

    লাইক ফতেহ্আলীর সঙ্গে কল্পসংলাপ

    ভারতের উদ্যানশিল্পী লাইক ফতেহ্আলীর সঙ্গে সাক্ষাতের বাসনা অনেকদিনের, তিনি সেদেশের অনেকগুলি পার্ক ও উদ্যানের নির্মাতা, সালিম আলীর সঙ্গে পাখিবিষয়ক একটি বই এবং এককভাবে Gardens I Gardening নামের দুটি বই লিখেছেন। তাঁর কোনো বাগান দেখার সুযোগ আমার ঘটেনি, সাক্ষাৎ তো নয়ই, যদিও এমন আকাক্সক্ষা অনেকদিনের। তাই ঢাকার আজিজ মার্কেটে তাঁর গার্ডেন্স্ বইটির বঙ্গানুবাদ (অনুঃ দেবীপ্রসাদ চক্রবর্তী,…

  • বাখতিনের সাহিত্যতত্ত্বডায়ালজিজম ও কার্নিভালাইজেশন

    এ-কালের সাহিত্য-সমালোচনা ও জ্ঞানচর্চায় মিখাইল বাখতিন এক অনিবার্য প্রভাবক ব্যক্তিত্ব। ভাষার বহুমাত্রিক আর্থ-বিস্তার সম্পর্কে তাঁর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা – ডায়ালজিজম, কার্নিভাল, স্পিচ জেন্র প্রভৃতি ধারণা ও পরিভাষা বিভিন্ন দেশে, বিশেষত পশ্চিমে, অত্যন্ত আলোচিত। সাহিত্য-সমালোচনায় বাখতিন-ঘরানা এখন প্রতিষ্ঠিত, বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যবিষয়। ভাষা, উপন্যাস ও বয়ান (ঘধৎৎধঃরাব) বিশ্লেষণে বাখতিনের উপস্থাপিত তত্ত্বকে গত তিন দশক ধরে ইউরোপ ও আমেরিকার…

  • হুমায়ুন আজাদ  কৃতি, কীর্তি, স্মৃতি এবং অশ্রু

    হুমায়ুন আজাদ কৃতি, কীর্তি, স্মৃতি এবং অশ্রু

    একটি সংবাদ এবং … শুক্রবার ছুটির দিন, নিয়মমাফিক অলস এবং মন্থরভাবে শুরু হয় গত ১৩ আগস্ট আমার জীবনে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে আছি টেবিলে নাশতার অপেক্ষায়। তখন সকাল নটা। বন্ধু ড. মুহাম্মদ সামাদ আমার বাসায় এসে তৎক্ষণাৎ তাঁর সঙ্গে যেতে বললেন। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে হুমায়ুন আজাদের বাসায় উপস্থিত হলেন। ফুলার রোডে আমার বাসা থেকে…

  • মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কের নানা স্তর

    মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কের নানা স্তর

    মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কের নানা স্তর অম্লান দত্ত দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষের সঙ্গে মানুষ, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি। ভিন্ন দুই ক্ষেত্র। উভয় ক্ষেত্রেই আছে সম্পর্কের নানা স্তর। তুলনা করে দেখলে গভীর কিছু মিল-অমিল চোখে পড়ে। বিষয়টা ভেবে দেখবার যোগ্য। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা হতে পারে সহযোগিতার, প্রতিযোগিতারও। সীমাবদ্ধ সম্পদের বণ্টন নিয়ে ঘটে দ্বন্দ্ব। সম্পদের বর্ধনের জন্য…

  • মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ‘নর-নারী’ নারীমুক্তির সরলপাঠ

    মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪) আমাদের একজন প্রধান প্রবন্ধকার। প্রাক-পাকিস্তান আমল থেকে ১৯৫৪ সালের ৮ নভেম্বর তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি নানা বিষয়ে অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষাসহ খুব কম বিষয়ই আছে যা নিয়ে তিনি লেখালেখি করেননি। আর এ-সব বিষয়েই তিনি তাঁর গভীর জ্ঞান, তীব্র অনুসন্ধিৎসা, প্রখর যুক্তিবোধ ও মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এ-ব্যাপারে…