স্মরণ
-

শ্রদ্ধা : আবুল হাসনাত
মৃত্যুর মুখ নানাভাবে সামনে আসে আমাদের। আমরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াই তার সামনে। শান্ত হয়ে আসে আমাদের কোলাহল। এই মুহূর্তে মনে মনে আমি প্রয়াত আবুল হাসনাতের সামনে দাঁড়িয়ে আছি করজোড়ে। ভাষা নেই। সন্ধ্যায় সাগরতীরে কাঁপতে-কাঁপতে ঘুরে ঘুরে উড়তে থাকা ছোট ছোট মথের ঝাঁকের মতো যারা জানে না কাল সকালে তারা কেউ বেঁচে থাকবে না। আজ থেকে…
-

আবুল হাসনাত : আমাদের সাহিত্যের ঋত্বিক
চারদিকে বিষাদের ছায়া। এত বেদনা, এত বিষাদ এভাবে পোহাতে হবে কখনো ভাবিনি। সব কেমন যেন বিবর্ণ ও ধূসর হয়ে উঠছে। একরাশ শূন্যতা ঘিরে ফেলছে আমাকে। কী ভয়াবহ দুঃসংবাদ – হাসনাতভাই আর থাকবে না এ-পৃথিবীতে? আমার মা যখন চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে তখন দলাপাকানো একটা কষ্ট দীর্ঘদিন ঝুলেছিল কণ্ঠলগ্ন হয়ে। ঠিক সেরকম একটা কষ্ট অনুভূত হচ্ছে…
-

‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি’
একটি স্ববিরোধী উক্তি দিয়েই শুরু করি। আবুল হাসনাত সাহেবকে আমি চিনতাম, না সত্যি সত্যি চিনতাম না। তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল পঁচিশ বছর আগে ঢাকায় ‘গণসাহায্য সংস্থা’র অফিসে। কেমন চুপচাপ একটা মানুষ, কথা প্রায় বলেনই না। তখন দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীর দক্ষ সম্পাদক। সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশে যখন এক উলটো হাওয়া বইছে, তখনকার দিনে দৈনিক…
-

আবুল হাসনাত-সম্পাদিত শিল্প ও শিল্পী পত্রিকা
ব্যক্তিগত স্তরে আবুল হাসনাতের সঙ্গে আমার তেমন পরিচয় ছিল না। তাঁকে জেনেছি তাঁর সম্পাদিত দুটি পত্রিকার মধ্য দিয়ে – কালি ও কলম আর শিল্প ও শিল্পী। কালি ও কলমে লেখার জন্য অনেক আগে একবার ফোন করেছিলেন আমাকে। খুব সম্ভব অরুণ সেনের কাছে আমার কথা শুনেছিলেন। কয়েকটা সংখ্যায় লিখেছিলাম তখন। কালি ও কলম ঢাকা থেকে প্রকাশিত…
-

প্রচারবিমুখ সম্পাদক
‘কিচ্ছু লিখতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে কলম ছুঁড়ে ফেলে দিতে।’ বুদ্ধদেব বসুর প্রয়াণে এই বাক্যদুটি দিয়ে অবিচুয়ারি লেখা শুরু করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। একেকটা মৃত্যু এতই মর্মবিদারক যে কিছু লিখতে ইচ্ছে করে না। জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাকের কবি আবুল হাসনাতের অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখে ঘোর অসময়ে চলে যাওয়াটাও তেমন, তাঁর প্রয়াণের পর খুব অভিমান হয় বিধাতার…
-

অনন্তের পথে আবুল হাসনাত
মাটির পৃথিবী ছেড়ে, আমাদের ছেড়ে সহসাই অনন্তের দিকে যাত্রা করলেন সবার অতি প্রিয়জন আবুল হাসনাত। আমরা তাঁকে জানি স্বল্পভাষী, উদার একজন সম্পাদক হিসেবে। সম্পাদকীয় আভিজাত্যের প্রাণপুরুষ কবি আহসান হাবীব এবং আবুল হাসনাতের সাহিত্যপাতায় লেখা ছাপা না হলে কবি/ লেখকের স্বীকৃতি অধরাই থেকে যাবে – এমন ভাবনায় উদ্বিগ্ন থাকতাম আমাদের তরুণ বয়সে। সাহিত্যক্ষেত্রে জনকের ভূমিকাই পালন…
-

কখন ছবি হয়ে যাই
আপনার সঙ্গে কিছু কাজের কথা ছিল হাসনাতভাই। বিদ্যাসাগর সংখ্যার জন্য এতো তোড়জোড়, এতো উৎসাহ, কিন্তু আপনার লেখা ছাড়াই সেটা ছাপতে গেল। পুরোটা একবার দেখে দিলেন না … এরকম কখনো হয়নি। এতো ঝড়ঝঞ্ঝা গেছে, কালি ও কলম কিন্তু হাতছাড়া করেননি, একটিবারের জন্যও কাজ থামিয়ে রাখেননি। এ-বছর সবকিছু কেমন এলোমেলো। আপনি কিন্তু ঘরে বসেই ঈদের ছোটগল্প সংখ্যা…
-

হাসনাত বেঁচে থাকবে তার লেখার মধ্যে – কাজের মধ্যে
হাসনাত আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এটি এত আকস্মিক এত অবিশ্বাস্য যে এটা মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। হাত-পা সব অসাড় হয়ে আসছে। এ এক অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় দুর্ঘটনা। এ যেন এক বজ্রপাত। আমি স্তব্ধ, হতবাক ও বাকরুদ্ধ। এক কঠিন দুঃসময় অতিক্রম করছি। এ শুধু আমার একার দুর্যোগ বা দুর্বহ ক্ষতি নয়, সবার জন্য এক বিশাল অপূরণীয় ক্ষতি।…
-

নেপথ্যের আড় ও প্রত্যয়ী নন্দনের বর্ম
আবাল্য হেডিং পড়া থেকে দৈনিক সংবাদের পাঠক হয়ে ওঠায় আমার নিজস্ব কোনো দায় নেই। বাবা সংবাদের পাঠক, একমাত্র সংবাদই পড়তেন, একেবারে নিরুপায় না-হলে অন্য কাগজে তাঁকে কখনো চোখ দিতে দেখিনি। আমাদের শহরে জাতীয় দৈনিকগুলো পৌঁছতে বিকেল প্রায় সন্ধেয় হেলে যেত। ততক্ষণে রেডিয়োয় বিবিসি-ভয়েস অব আমেরিকার ও আকাশবাণীর প্রচারে সিপাহসলার এরশাদ-সংক্রান্ত গতকালের প্রধান খবরগুলো বড়োদের জানা।…
-

তাঁর স্নেহসিক্ত কণ্ঠস্বর
হাসনাতভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল সম্ভবত ১৯৯৫ সালের শেষে অথবা ১৯৯৬ সালের শুরুর দিকে। তখন তিনি দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক আর আমি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ লেখক। সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী তখন ভীষণ আলোচিত, আকর্ষণীয়, সুপরিকল্পিত, সুসম্পাদিত, অভিজাত সাহিত্যপাতা। সংবাদপত্র হিসেবে দৈনিকটির ততটা জনপ্রিয়তা না থাকলেও সাহিত্যামোদী পাঠকরা বৃহস্পতিবারের সাময়িকীর জন্য অপেক্ষা করতেন এবং অতি অবশ্যই সংগ্রহ করতেন।…
-

দূরে থাকা একান্ত আপন মনের মানুষ
পরিচয়ের প্রথম থেকেই অনুভব করতাম, হাসনাতভাই আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তাঁর পুরো নাম আবুল হাসনাত। লেখালেখি করতেন মাহমুদ আল জামান নামে। আমি তখন ছাত্র ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের, যার তৎকালীন নাম ছিল ঢাকা কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস। আমার ঠিক উলটো ধরনের মানুষ ছিলেন তিনি। মার্জিত, গোছালো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। জ্ঞানীও ছিলেন। অন্যদিকে আমি ছিলাম অগোছালো, অপরিচ্ছন্ন,…
-

এমন বন্ধু আর কে হবে
হাসনাতভাইকে নিয়ে লিখতে বসেছি, ভাবছি, কোথা থেকে শুরু করব। তাঁকে কীভাবে চিনি, কবে থেকে চিনি, আমার জীবনে তাঁর ভূমিকা ও উপস্থিতি – এ-কথাটুকু বলা সহজ; কিন্তু এর অভিব্যক্তি অসীম। ১৯৯০-৯১ হবে, একজন শান্ত সুদর্শন সৌম্য অমায়িক ভদ্রলোক প্রায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে শিক্ষকদের রুমে আসতেন। আমিও তখন চারুকলায় পড়াই। সে-সময় সামান্য সৌজন্য ও কুশলবিনিময়ের মধ্য…
