2025
-
পুঞ্জীভূত মেঘ
সব দেখাই দৃশ্য নয়, কোনো কোনো দেখা দৃশ্য হয়ে যায়। দৃশ্যের ভেতর দিয়ে দেখি, অনেক মানুষ ছিল দৃশ্যপটে পরে যারা নেই হয়ে গেছে। হেঁটে বেড়ানো চলিষ্ণু মানুষের কবরস্থান পুরোপুরি সুনসান, স্থির, খোদিত-না-খোদিত এপিটাফের বাগান! অনেক দৃশ্যের মধ্যে এই দৃশ্যও থেকে যেতে পারে, কেউ একজন এপিটাফ পড়তেই বাগানে আসে কবিতা ঘনিয়ে এলে ভারাক্রান্ত প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাসগুলো জমে…
-
নিসর্গের চিঠি
শালুকচোখা রাত্রি মুখ ডুবিয়ে ছিল জোছনাজলে, ঝিঁঝিঁর কণ্ঠে মিশে যায় সেকালের মৌনতা। আমি হেঁটে যাই নিসর্গ-শালিকের ছায়ায়, চোখে পড়ে এক জলমগ্ন প্রণয়ের কাগজপোকা ছায়া নেই, তবু চেনা কুয়াশা ছুঁয়ে যায় গ্রীবাদেশ। অলক্ষে সরে যায় নিচু-গলায় নদী – তার ঠোঁটে লেগে থাকে অপরাহ্ণের ভেজাপ্রান্তর। চোখে এখন ঘুম নয়, শুধু মেঠোপথের আর্দ্রতা – অদেখা পাখির পায়ে জড়িয়ে…
-
তোমরা আমায় কাঁদতে বোলো না
আমি নদীর কাছে রেখে এসেছি প্রেমময় অশ্রুজল, পাহাড়ের ওই ঝর্ণার কাছে ফেলে এসেছি বেদনার ক্রন্দন! বৃষ্টির জলে ধুয়ে নিয়েছি অব্যক্ত যন্ত্রণা, আমি যামিনীর কাছে দিয়ে এসেছি সমস্ত অঙ্গীকার। অনলের কাছে বিসর্জন দিয়েছি অভিশপ্ত অহংকার, আমার কোনো প্রেম নেই, কষ্ট নেই, হিংসা নেই! তোমরা আমায় কাঁদতে বোলো না। আমি দিশাহীন এক অনন্ত পথের যাত্রী, শিখা অনির্বাণের…
-
কফিনের নীরবতা
কফিন – শব্দহীনতার চাদর মুড়ে পোশাক চেটে খায় বিষাক্ত অমাবস্যা। আলোর শ্বাস নেই। কারাগারের শিলালিপিতে জমে থাকা কান্নার মতো বয়ে চলে একটি নদী – স্রোতহীন, স্মৃতিবহ। ধূসর ছায়া ঘষে ঘষে ঘুম পাড়ায় অতীত। মৃত বিবেক ধরে রাখা তামাটে এক দেহ – হেঁটে চলে দোদুল্যমান গুমোট কফিন হয়ে। তারপর – বুক চিরে উঠে আসে একটি পলেস্তারা-মাখানো…
-
শুধু মুখেই বলেন
আপনি শুধু মুখেই বলেন বৃষ্টি এলেই ভিজবেন হিজল, জারুল, সোনালু, কৃষ্ণচূড়ার সাথে সবুজ মাঠ, বৃষ্টি জমা জল, গোড়ালি ডুবিয়ে প্রিয় উপন্যাসের নায়িকা যেন – ভিজবেন, মন উড়িয়ে। সারাটা দুপুর, সারাটা বিকেল, সন্ধ্যা – রাতভর ভিজলো একটা শহর ওই দূর কোনো গ্রামের একলা একা তালগাছটার মতন আপনি শুধু মুখেই বলেন বৃষ্টি এলেই ভিজবেন…
-
আত্মজা
কাঠগোলাপের শুভ্র উচ্ছ্বাসে নিজেকে ছড়িয়ে দাও। দীর্ঘশ^াস, সংকট, জরাজীর্ণ ব্যথা শূন্যে উড়িয়ে দাও। তুমি বেরিয়ে এসো বন্ধনমুক্ত বিহঙ্গের পাখায় ভর করে। পাণিতে সন্ধ্যাবাতি আলোকবর্তিকাসম, দেখাও পথ আঁধারে ঢেকে যাওয়া গ্রহটিকে। দেহসৌষ্ঠবে বুনোফুলের সৌরভ, কণ্ঠে বজ্রনিনাদ, বেজে যাক রণতূর্য, আহবের ডঙ্কাধ্বনি ছড়িয়ে পড়ুক দিকে-দিকে। ঘুঙুরে, চুড়িতে, অলংকারে, আভরণে প্রতিধ্বনিত হোক প্রতিবাদ। অন্যায়, বৈষম্য, লাঞ্ছনার আবেষ্টনী ছত্রখান…
-

অগ্রন্থিত তিনটি অনুবাদ কবিতা
সংগ্রহ ও ভূমিকা : মুহিত হাসান বিদেশি কবিতার অনুবাদেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন কবি শহীদ কাদরী ((১৪ আগস্ট ১৯৪২-২৮ আগস্ট ২০১৬) । ভিনভাষার খুব বেশি কবিতার অনুবাদ তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি, এ কথা সত্য। কিন্তু যে অল্প হলেও যে-কটি কবিতার অনুবাদ তিনি করেছেন, তাতেই কাব্যানুবাদক হিসেবে কাদরীর দক্ষতা ও গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমান সংকলকের সম্পাদনায়…
-

ফনেচাচা : দ্বিতীয় পর্ব
আমাদের গ্রামে কোনো শিক্ষালয় ছিল না। তাই বাবাকে (শওকত ওসমান) ছোটবেলায় কাদামাটি ভেঙে পাশের গ্রাম নন্দনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হতো। নন্দনপুর আমাদের ঘর থেকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার তো হবেই। সম্ভবত ১৯২৬ সালে আমাদের পাড়ার অদূরে পুবদিকে স্থাপিত হয় সবলসিংহপুর জুনিয়র মাদ্রাসা, অর্থাৎ প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি। বাবা তাঁর লেখাপড়ার শেষের দিকে এই সুযোগ পেয়েছিলেন। আমাদের এই…
-

কাল
তেরো রাতের খাওয়া শেষ করেছেন দেবু ঠাকুর। বড়ঘরে হারিকেন জ্বলছে। রান্নাঘরে জ্বলছে পিতলের একটা কুপি। উঠোনের জমাট অন্ধকারের ওপর দু’ঘরের আলো এসে পড়েছে। একদিকে হারিকেনের আলো, আরেকদিকে কুপির। সেই আলোয় পুরো উঠোন আলোকিত হয়নি। কিছুটা হয়েছে। রাতের খাওয়ার পর উঠোনে পায়চারি করার অভ্যাস ঠাকুরের। বৃষ্টি না থাকলে পায়চারিটা তিনি নিয়মিত করেন। রাতের খাবারের পর আধঘণ্টার…
-

কলাকেন্দ্রে ভাস্কর ময়নুল ইসলাম পলের ‘পাথরের বৈভব’
গত শতাব্দীর আশির দশকে ঢাকার চারুকলা অঙ্গনের একদল তরুণ শিল্পী স্বকীয় পথ অনুসন্ধান ও শিল্পসৃজনে নিমগ্ন হয়েছিলেন। নিয়মিত আড্ডা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ে তাঁরা নিজেদের তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। ভাস্কর ময়নুল ইসলাম পল তাঁদেরই একজন। উল্লেখ্য, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ১৯৯১ সালে। ২০০০ সালে এই তরুণদের সম্মিলিত…
-

ইউভাল নোয়া হারারি – আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত একজন ইতিহাসবিদ
এই মুহূর্তে পৃথিবীর ‘সবচেয়ে মাথাওয়ালা’ লোকটি কে, এ-প্রশ্নে হয়তো অনেকেই অবাক হয়ে যাবেন। প্রাচীন পৃথিবীর ক্ষেত্রে এ-প্রশ্নটির যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ না থাকলেও বর্তমানের জটিল পৃথিবীতে জ্ঞানজগৎ এতটাই বিস্তৃত হয়ে পড়েছে যে, এককভাবে কাউকে এ-অভিধাটি দেওয়া অসম্ভব। দর্শনের নানা শাখা থেকে বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান আলাদা হয়ে গেছে অনেক আগেই, তাই জগৎ-জীবন ও সংসারকে দেখার ক্ষেত্রে…
-

মৃত্যুশয্যায় লেখা মাহমুদ দারবিশের একটি চিঠি
প্যালেস্টাইনের কিংবদন্তি কবি মাহমুদ দারবিশ মারা গেছেন ১৭ বছর হলো। তিনি তাঁর মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগে এ-চিঠি লিখেছিলেন ‘প্যালেস্টাইন সাহিত্য সম্মেলন’-এর আয়োজকদের উদ্দেশে – যখন তাঁরা তাঁকে দাওয়াত করেছিলেন সম্মেলনের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার জন্য। কিন্তু স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে সম্মেলনে উপস্থিত হতে না পেরে তিনি এ-চিঠিতে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু আশাবাদ ব্যক্ত করেন সাহিত্য ও রাজনীতির…
