কিছু পঙ্ক্তি জুড়ে যে যাপন

শুধু কবিতার জন্যে, একটি পঙ্ক্তি অপরূপ করে

লিখবো বলে চেয়েছি তোমাকে খুব! র্যঁদার শহরে

পারীতে বাড়িতে গিয়ে সব শিল্পকর্ম শুষে তাঁর

বুঝতে চেষ্টা করেছি কী ভাবে রিল্কে তাঁর কবিতার

জন্যে সব জরুরি বিষয়গুলো খুঁজে নিয়েছেন!

টাকা টাকা আনে যে রকম, শিল্প শিল্প আনে, ধ্যান

আনে সেই শুদ্ধতাকে, উদ্যমকে করে প্রতিশ্রুত।

পাথর কি ছায়া থেকে তাকে ছেনে আনতে হলে দ্রুত

বুঝতে হবে নজরুল কী ভাবে নিবিড় রঙধনু

থেকে লাল রঙ ছেনে রাঙাতেন তোমাকেই, অনু-

ক্ষণ! তাঁর কী ব্যস্ততা পুরনো আঙ্গিক থেকে ফের

নূতনের আঙিনায় মত্ত হতে; কিংবা পঙ্ক্তিদের

উপমা কি চিত্রকল্প কী গভীর সুরে সমর্পিত

করে দিতে তাঁর মতো কে ছিলেন এমন শিল্পিত;

চেষ্টা করি বুঝে নিতে!

            কী ভাবে পাখিরা কথা বলে

বৃক্ষ কি ফুলের সঙ্গে, বাতাসেরা ভাঙনেও তোলে

ঢেউ; সুরে ফেরে কেউ আকাশের নীল দহলিজে

নক্ষত্র নক্ষত্র থেকে দূরে সরে; আমার কলিজে

জুড়োয় তোমাকে পেলে।

শত ধ্বংস মহামারী জুড়ে

খুঁজি শব্দ, উপমাকে লিখবো বলে ব্রহ্মাণ্ডকে খুঁড়ে

সিস্তিন চ্যাপেলে আমি কবিতাকে মিকেলাঞ্জেলোর

ভাস্কর্যের দিকে ঝোঁকাতে চেয়েছি। নের্ভালের ঘোর

অটমের পাতাঝরা হলুদার্দ্র গোধূলিতে ডুবে

ঝিম মারে – তা-ও দেখি। তোমার সুরভী যাবে উবে

সকল স্মৃতির মীড়, স্তব্ধ সঙ্গ, ঘন অঙ্গীকার –

যদি না তাদের ধরি, জমা রাখি উদ্যমে আমার!

কূট দিন আসে। যেন আমার হৃদয় এক পোড়ো

মাঠ – যাতে স্বপ্ন খিন্ন, অস্থিসার। সবুজেও জড়ো

হচ্ছে খুবই খড়-নাড়া; ফাঁপা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের স্বর

ফুসফুস থেকে নিংড়ে নিয়ে আসে প্রাণের মর্মর;

কিছুই রাখে না বাকি, শূন্য করে তোলে সে আমাকে;

দিগন্তে পোস্টার সাঁটে গোধূলিরা – রক্তাপ্লুততাকে।

আমার জন্মান্ধ বোধে ধস নামে। কে তীব্র সংঘাতে

লিপ্ত করে আমাকে নীরবে? যেন পরাজিত হতে

আসা এই খানে!

            তবু সে-ই সুখ, শোকে উৎস সে-ই;

শিল্প ছাড়া মানুষের শুদ্ধ কোনো ইতিহাস নেই

বলে কাছে টানি : বলি, থাকো; তুমি আমারই আঁধিতে

দিতে পারো কিছু আলো, কবোষ্ণতা, এই ক্ষুব্ধ শীতে।

জীবন! কে তুমি ভাই? বিন্যস্ত কি অবিন্যস্ত বেজে

ছুটে যাচ্ছো সেই খাদে : মৃত্যু কি তোমার কনে সাজে?

এপ্রিল নিষ্ঠুর বটে! কিন্তু দেখতে পাচ্ছি পত্রিকায়

পিকাসো, মাতিস, দালি এতদসত্ত্বেও দরোজায়

টোকা দেন, এ মাসেই। প্রদর্শিত হতে এই খিন্ন

নগরীতে। সঙ্গে শাগালও আছেন; যেন কী কিন্নর

কণ্ঠ বাজে বাতাসে, আকাশে দোলে নীলার্ত পরীরা

নক্ষত্রকে সঙ্গী করে। শিহরণে ফাঁপে সব শিরা

দেখা কি অদেখা সব অভ্যন্তরে; স্বপ্নার্ত অন্দরে

পাতাঝরাগুলো সুদ্ধ পাল তোলে দূর বন্দরের

উদ্দেশে, ভ্রমণে।

সেই দূর কালে পারীতে পিকাসো

আর মাতিসের দেখা হয়, ছিলো কী দীপ্র উচ্ছ্বাসও

তাতে; ফের ঢাকা একত্রিত করে দিলো!

            তুমি আর

আমি চলো, এ এপ্রিলে, ফের করি স্বপ্নার্ত শীৎকার;

উল্টোই ‘লে ফ্ল্যর’ কিংবা ‘মাদাম বোভারি’; ‘দুই আমি’

দস্টয়েভস্কির! যতো বৈরী হোক, করুক আসামি

তোমাকে আমাকে এই স্থবির দিনেরা, রক্তাপ্লুত

তা-ও যদি হয়, হই; দু’টো চোখে স্বপ্নকে আহুত

করি নক্ষত্রের রোদে; শোণিতকে ছেঁকে শুদ্ধ করে

হৃদপিণ্ডে ছড়াই প্রবাহ উষ্ণ; দিগন্তে যা’ ঝরে

দেখি ধরে কে রাখেন?

            সেই দেখা আনন্দে সম্ভার

আনে, শোকে সিঁড়ি খোলে পতনের বিপরীতে তার।

বার্সেলোনা থেকে যাচ্ছি মাদ্রিদে, পারীতে কারও খোঁজে?

কেবল খোঁজাই সার? খুঁজে তাকে কে কবে বরোজে

পায়? শিল্প তো গন্তব্য নয়, সে তো যাত্রা – দুর্মর ভ্রমণ;

শুধু কবিতার জন্যে, কিছু পঙ্ক্তি জুড়ে যে যাপন

করবো বলে চেয়েছি তোমাকে খুব – সেই চাওয়াটাকে

ভিজিও বৃষ্টিতে, রোদে উষ্ণ কোরো জন্মের নাটকে।

ভাঙনেও দিও ধরা, শোকে তুমি উদ্ভাসিত করে

দিও গুচ্ছ স্বপ্নদের, ধসে তুমি দিও অঙ্গীকারে

ফের কোনো উন্মোচন ভাঁজে ভাঁজে, দুর্দিনেরও মাঝে

যাতে থাকে তোমার সুরভীগুলো গুচ্ছ গুচ্ছ সাঁঝে

আন্দালুসিয়াতে : ঘন অলিভে কি কমলার বনে

সন্ধ্যা নামে পাহাড়ের ঢালু বেয়ে, শোকার্ত এ মনে

বাজে শুধু তোমাকে জড়িয়ে থাকা সেই গানগুলো

যেন তুমি মর্মজুড়ে মিশে আছো নক্ষত্রের ধুলো!

কী অদ্ভুত পুনরাবৃত্তিতে আমি লিপ্ত হচ্ছি, ফের

চাই, ফের চাই শুধু তোমাকেই; যেন আক্রান্তের

জন্যে এ-ই শ্রেয় শুধু! দেখি বাড়ি আরও বহু বাড়ি

কবরস্থ করে বুকে, সমুদ্র নোঙর তুলে পাড়ি

দ্যায় ফের অসমুদ্রে, আলবাট্রসেরা উড়ে গিয়ে

বিষাদকে উৎসারিত করে দ্যায় কী অদ্ভুত বিয়ে।

বিয়েরা জটিল; এই জন্যে, যে তা’ মিলনকে ছুঁয়ে

বিরহকে খোঁজে ফের; ঠিকানাকে করে বিভুঁইয়ের।

তুমিও পুনরাবৃত্তি করো! কী বিরাট সেই কীর্তি

ছোট্ট এই আয়ু জুড়ে বুঝি না তা; আশ্চর্য স্ফুর্তির

মধ্যে তুমি; এই ক্ষুদ্র কিন্তু তীব্র হৃদয়কে রুখে

দিলে অচিকিৎস্য করে; অফুরান কাতরানো অসুখে।

প্রভু, দ্যাখো, মানুষেরা ন্যুব্জ হাঁটে, কী বিলাপ করে

তারা দুঃখে! দুঃখ যেন বাতিঘর গন্তব্যে, বন্দরে;

মানুষের বুকে গুঁজে দিলে বলে অজস্র কবর,

তাই শোকার্ততাগুলো করে তাকে আশ্চর্য উর্বর।