বাখতিনের সাহিত্যতত্ত্বডায়ালজিজম ও কার্নিভালাইজেশন

এ-কালের সাহিত্য-সমালোচনা ও জ্ঞানচর্চায় মিখাইল বাখতিন এক অনিবার্য প্রভাবক ব্যক্তিত্ব। ভাষার বহুমাত্রিক আর্থ-বিস্তার সম্পর্কে তাঁর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা – ডায়ালজিজম, কার্নিভাল, স্পিচ জেন্র প্রভৃতি ধারণা ও পরিভাষা বিভিন্ন দেশে, বিশেষত পশ্চিমে, অত্যন্ত আলোচিত। সাহিত্য-সমালোচনায় বাখতিন-ঘরানা এখন প্রতিষ্ঠিত, বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যবিষয়। ভাষা, উপন্যাস ও বয়ান (ঘধৎৎধঃরাব) বিশ্লেষণে বাখতিনের উপস্থাপিত তত্ত্বকে গত তিন দশক ধরে ইউরোপ ও আমেরিকার সাহিত্যে আধুনিকতা-উত্তর নতুন নতুন তাত্ত্বিক ব্যাপ্তি ও রূপ-রূপান্তরের পেছনে প্রধানতম প্রেরণা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এমন গভীরতর প্রভাব-সঞ্চারের কারণেই পল দ্য মান বাখতিনকে আধুনিকতা-উত্তর বয়ান-বিশ্লেষণে উদ্ভাবনা ও পরিবর্তনের যুগের প্রধান নায়করূপে অভিহিত করেন (মান, ১৯৮৬ : ২)।

বাখতিন-সম্পর্কিত সাধারণ বিবেচনা ডায়ালজিজম ও কার্নিভাল-বিষয়ক ধারণা ও তত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাখতিনের দীর্ঘকালীন, বিচিত্রমুখী ভাবনাকে কোনো একক মাত্রায় সীমাবদ্ধ করা দুরূহ, এবং অনুচিতও। তিনি প্রথম জীবনে দর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বে কাজ করেছেন, ভাষার প্রকৃতি ও তার ব্যবহার এবং সেইসূত্রে উপন্যাসের গড়ন ও আত্মা-সম্পর্কিত মান নির্দেশ করেছেন, সংস্কৃতির জটিল মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং প্রায় সবক্ষেত্রেই উপস্থিত করেছেন নিজস্ব তত্ত্ব ও চর্চারীতি। কেউ কেউ ‘বাখতিনীয় দর্শন’ নামে এ-সবকিছুর সারাৎসার প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন, তবে তাতে তাঁর তত্ত্ববিষয়ক আলোচনার বহুমাত্রিক জটিলতা কিছুমাত্র কমেনি। বর্তমান প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য যেহেতু বাখতিনীয় সাহিত্যতত্ত্ব, সেজন্যে এখানে সামগ্রিক বাখতিনের জটিলতা ও নানামাত্রিক বিস্তৃতি আমরা কিছুটা এড়াতে পারব।

বাখতিনের জন্ম ১৮৯৫ সালের ১৬ নভেম্বর, মস্কোর নিকটবর্তী অরেল শহরে। ব্যাংক-কর্মকর্তা পিতার কর্মস্থল-বদলির সূত্রে তাঁর প্রথম জীবন কাটে অরেল, ভিলনিয়াস ও ওডেসায়। ছেলেবেলায় তাঁর দেখাশোনা করতেন এক জার্মান মহিলা। তার সাহচর্যে ওই বয়সেই জার্মান ভাষার ওপর ভালো দখল জন্মে তাঁর, এছাড়া লাতিন ও গ্রিকও শিখে নেন। ১৯১৩ সালে ওডেসায় স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই সেন্ট পিতের্বুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি হন। কয়েকটি ভাষায় দক্ষতার কারণে, বড়ভাই নিকোলাইয়ের আদর্শ অনুসরণ করে ওখানে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান-বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। প্রথম   জীবনে বাখতিনের ওপর গভীর প্রভাব পড়েছে এই নিকোলাইয়ের। ১৯১৮ সালে দুভাইয়ের ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর আর কখনো দেখা হয়নি তাদের। নিকোলাই হোয়াইট গার্ডের চাকরি দিয়ে জীবন শুরু করে শেষ করেন ইংল্যান্ডে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে। ১৯৫০ সালে ওখানেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

১৯১৮ সালের বসন্তে বিপ্লবের অব্যবহিত-উত্তরকালীন বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনা এড়াতে মফস্বলের দিকে চলে যান বাখতিন; প্রথমে কিছুকাল নেভেলে, পরে ভিটভস্কে বাস করতে থাকেন। উভয় শহরেই স্থানীয় বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ ঘটে তাঁর এবং সেই সূত্রে আলোচনা, বিতর্ক, বক্তৃতা, ইশতাহার-রচনার মধ্য দিয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এ-সময় তিনি প্রথমবারের মতো জ্ঞান-আহরক আত্ম, শিল্পের সঙ্গে অভিজ্ঞতার সম্পর্ক, মানুষ হিসেবে অন্য মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ে ভাবতে আরম্ভ করেন; গ্রিক, হেলেনিস্টিক ও আধুনিক ইউরোপীয় দর্শনপাঠও অব্যাহত থাকে। এর পূর্বেই প্রাতিষ্ঠানিক আবহে ধ্রুপদ গ্রিক এবং লাতিন সাহিত্য ও ভাষার ওপর ব্যাপক পড়াশোনা করেন। ফলে তরুণ-বয়সে একদল অনুরাগী সৃষ্টি করতে সমর্থ হন তিনি, পরে যাদেরকে ‘বাখতিন-সার্কেল’ নামে অভিহিত করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন সংগীতজ্ঞ ভ্যালেন্টাইন ভলোশিনভ ও সাংবাদিক মেদভেদভ। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত স্থানীয় কমিউনিস্ট ফোরাম ও বাখতিন-সার্কেলে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী সদস্য।

তখন জার্মানি ও রাশিয়ায় নব্য-কান্টীয় দর্শনের জাগরণকাল। অতি ভাববাদী (লাইবনিজ) ও অতিমাত্রায় মনকেন্দ্রিক স্পর্শকাতর দর্শনের বদলে কান্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন মন ও পৃথিবীর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ওপর। নব্য-কান্টীয়রা এই দর্শন অঙ্গীকার করেও কিছুটা ভিন্নভাবে জগৎব্যাপী একক সত্তায় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বাখতিনের উত্তরকালীন ‘ডায়ালগ’ কান্টের মিথস্ক্রিয়ার সঙ্গে অনেক দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ।

এ-সময় মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হারমেন কোহেন প্রতিষ্ঠা করেন দর্শনের মারবুর্গ স্কুল। বাখতিন এ-স্কুলের সঙ্গে জড়িত থাকলেও সর্বব্যাপী একক সত্তায় বিশ্বাস স্থাপন করেননি। এই আবহের কারণেই হয়তো, ১৯১৮ সাল থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে দর্শন-বিষয়ে কিছু প্রাথমিক রচনা সম্পন্ন করেন তিনি।

১৯২৪ সালে আবার পেট্রোগ্রাদে (পিতের্বুর্গ) ফিরে আসেন বাখতিন। তখন থেকে তাঁর জীবনে অত্যন্ত কঠিন এক পর্যায় শুরু হয়। এরই মধ্যে ডানপায়ের পঙ্গুত্বে আক্রান্ত হন তিনি। তাছাড়া, অর্থোডক্স ক্যাটাকম্ব চার্চের অনুগতদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কারণে রাজনৈতিকভাবেও সন্দেহের শিকার হন। এসব কারণে স্বাভাবিক চাকরি পাওয়া সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। এ-দুঃসময়ে জীববিজ্ঞানী ইভান কানায়েভ তাঁর অ্যাপার্টমেন্টটি ধার দেন বাখতিন-পরিবারের বসবাসের জন্য। বাখতিনের স্ত্রী পুরনো কার্পেট দিয়ে জীব-জানোয়ারের প্রতিকৃতি বানিয়ে বিক্রি করে সে-অর্থে সংসার চালাতেন। লেখার জন্য অতি প্রয়োজনীয় চা ও সিগারেটের পয়সাও অনেক সময় জুটত না। কিন্তু বিপর্যয়কর সময়ে ১৯২৪ সাল থেকে পরবর্তী ছয়টি বছর বাখতিনের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ। ধারণা করা হয়, তখন বন্ধু মেদভেদেভের নামে প্রকাশিত The Formal Method in Literary Study (1928), ভালোশিনভের নামে প্রকাশিত Freudianism : A Critical sketch (1927), Marxism and the Philosophy of Language (1929) এবং কানায়েভের নামে প্রকাশিত Contemporary Vitalism (১৯২৬) আসলে তাঁরই রচনা। এ-সময় নিজ নামে প্রকাশিত তাঁর একমাত্র রচনা

Problems in the Work of Dostoevsï (১৯২৯) আমাদের আগ্রহের বিষয়।

১৯২৯ সালে গ্রেফতার হন বাখতিন, খুব সম্ভবত গোপন কোনো চার্চের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে। তবে তাঁর স্ত্রী পূর্ব-বন্ধুত্বের সূত্রে গোর্কির স্ত্রীর মাধ্যমে ডেথ ক্যাম্পের নির্বাসন থেকে তাঁকে রক্ষা করতে সমর্থ হন। কাজাখস্তানে নির্বাসনের লঘুদণ্ড পান বাখতিন। ওখানেই রচনা করেন গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ Discourse in the Novel (১৯৩৪-৩৫)। ১৯৩৪ সালে তাঁর শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরো দুবছর ওখানে থাকেন বাখতিন। এরপর লেনিনগ্রাদে ফিরে এলেও ১৯৩৭ সালে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য আবার পালিয়ে যান ছোট শহর সাভেলোভোয়। ওখানে স্কুলশিক্ষকের একটি কাজ পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে ১৯৪১ সালে র‌্যাবলের১ উপন্যাস-বিষয়ে গবেষণাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ রচনা জধনবষধরং ধহফ ঐরং ডড়ৎষফ লেখা শেষ করেন বাখতিন; গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় আরো পঁচিশ বছর পর।

যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো তাঁর ডাক আসে সারনস্কের স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রুশ ও বিশ্বসাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বগ্রহণের জন্য। ওখানে তিনি অচিরেই জনপ্রিয় কিংবদন্তিতে পরিণত হন।

ষাটের দশকের প্রথম দিকে গোর্কি ইনস্টিটিউটের কজন তরুণ বুদ্ধিজীবী – ভাদিম কুশিনভ, সের্গেই বোখারভ ও জর্জি গেচেভ সারনস্কে – বাখতিনের অবস্থানের খোঁজ পেয়ে তাকে অখ্যাতির

অন্তরাল থেকে জনসমক্ষে উপস্থিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় দস্তয়ভস্কি-সম্পর্কিত গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ। ১৯৬৫ সালে Rabelais and His World প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তাঁকে নিয়ে আসা হয় মস্কোতে। কিন্তু মস্কোতে বসবাসের অনুমতি পাওয়া তখন কঠিন ব্যাপার। তাঁর এক অনুরাগী, তৎকালীন কেজিবি-প্রধান আন্দ্রোপভের কন্যার সুপারিশে রাষ্ট্রীয় হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা হয়। ওখানে শেষবয়সে নতুন কোনো রচনায় হাত দেননি তিনি, পুরানো লেখাজোখা সংশোধন-পরিমার্জন করে সময় কাটে তাঁর। ১৯৭১ সালে স্ত্রী এলেনা আলেক্সান্দ্রোভার মৃত্যুর পরবর্তী কয়েক মাস বাখতিন শোকাভিভূত নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। পরের বছর মস্কোয় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি মেলে। ততদিনে তাঁর সময় শেষ হয়ে এসেছে। ১৯৭৫ সালের ৭ মার্চ ভোরে মৃত্যুবরণ করেন বাখতিন।

১৯৭০-এর দশকেই বাখতিনের রচনা ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হতে থাকে। ১৯৮১ সালে কয়েকটি প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর The Dialogic Imagination। এতে Discourse in the Novel (1934-35), Form of the Time and the Chronotope in the Novel (1937-38) এবং The Problem of Speech Genere (১৯৫২-৫৩) প্রবন্ধ তিনটি সংযোজিত হয়। Problems of DostoevsïÕs Poetics (1929), Rabelais and His World (১৯৬৫) এবং উপরোক্ত তিনটি প্রবন্ধ বাখতিনের সাহিত্যতত্ত্বের ভিত্তি। তাঁর সাম্প্রতিক খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার পেছনেও রয়েছে এ-কটি রচনার প্রভাব।

বাখতিনকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন ফরাসি কাঠামোবাদী ও উত্তর-কাঠামোবাদীরা। তারা দেখেন যে, বাখতিনের তত্ত্বে ভাষার ডায়ালজিক প্রকৃতিতে তাদের চিন্তাভাবনার সহায়ক সূত্র রয়েছে। বাখতিনের মতো ওরাও মনে করেন, ভাষা মূলত বহু-অর্থবোধক। বাখতিন ভাষার এ-স্বভাবকে বলেন ডায়ালজিক। ভাষার বহু-আর্থব্যঞ্জনার মূল কারণ এই যে, প্রতিটি উচ্চারণই তার পূর্ববর্তী উচ্চারণ এবং প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পরবর্তী সম্ভাব্য উচ্চারণের চিহ্ন বহন করে চলে। এ-বক্তব্যের জন্য আমরা বাখতিনকে রোঁলা বার্থ ও জ্যাক দেরিদার পূর্বসূরি বলে অভিহিত করব। অন্যদিকে, ফরাসি পরম নারীবাদী জুলিয়া ক্রিস্তেভা বাখতিনের এ-বক্তব্যে খুঁজে নেন ইন্টারটেকচুয়ালিটির ধারণা, যেখানে প্রতিটি টেক্সটই তার পূর্ববর্তী কোনো টেক্সটের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং পরবর্তী কোনো টেক্সটের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য উন্মুক্ত।

বাখতিনের সাহিত্যতত্ত্ব প্রধানত উপন্যাসে ব্যবহার্য ভাষার প্রকৃতি ও ক্রিয়াশীলতা এবং উপন্যাসের গড়ন ও বয়ান সম্পর্কে আলোচনা। সে-কারণে তাঁর সাহিত্যতত্ত্বকে উপন্যাসবিষয়ক তত্ত্বও বলা যায়। ডায়ালজিজম, কার্নিভাল, স্পিচ জেন্র, ক্রোনোটপ প্রভৃতি নতুন ধারণাগুলো তার তত্ত্বের কাঠামো গঠন করেছে। এর মধ্যে ডায়ালজিজম ও কার্নিভালাইজেশনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়ালজিজম প্রথমত ভাষা-সম্পর্কিত তত্ত্ব। এর মূলে রয়েছে এই ধারণা যে, ভাষা ডায়ালগের মাধ্যমে, কিংবা বলা যায় ডায়ালজিক বিনিময়ের মাধ্যমে, ক্রিয়াশীল। সাধারণ অর্থে ডায়ালগ হলো পারস্পরিক কথাবার্তা – সংলাপ। সংলাপের ধর্ম কথা বলা এবং শোনা অর্থাৎ কথার পারস্পরিক বিনিময়। ডায়ালজিজমে সংলাপের আর্থ-ব্যঞ্জনা আরো বিস্তৃত। এতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দুই বা ততোধিক বক্তা-শ্রোতার সেই সম্পর্ক, যা তাদের মধ্যে সংলাপ বা কথাবার্তা সম্ভব করে তোলে। বক্তা এবং শ্রোতা দুজন পরস্পর থেকে ভিন্ন, তারা হয়তো একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করছে, অতএব ভিন্ন আর্থ-ব্যঞ্জনায় : এইসব ভিন্নতা একত্রে যুক্ত হয়ে থাকছে সংলাপ-সংঘটনের সম্পর্কের ভিত্তিতে। সংলাপে সবসময় একাধিক অর্থ থাকে, অর্থাৎ বক্তাদের অর্থবোধেও কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। যখন বক্তা কথা বলেন তখন তিনি শব্দ-নির্বাচন, অর্থ-নির্দেশের সময় শ্রোতার অর্থবোধকেও বিবেচনায় রাখেন। বাখতিন বলেন, তখন প্রকৃতপক্ষে শ্রোতার শব্দ ও অর্থবোধ এবং বক্তার শব্দ ও অর্থবোধের মধ্যে ডায়ালজিক-বিনিময় ঘটে এবং এভাবেই বক্তার আবেগ আকাক্সিক্ষত শব্দ, বাক্য ও অর্থ খুঁজে নেয়। এরূপ বিনিময় কেবল সংলাপেই নয়, ভাষার অন্যান্য ব্যবহার এবং সাংস্কৃতিক বিন্যাসেও ঘটে। যেমন – কোনো রচনার সঙ্গে তার পূর্ববর্তী রচনার, একই শব্দের বিভিন্ন যুগের অর্থের ডায়ালজিক-বিনিময়।

বাখতিনের কাছে ভাষা হলো কথা বা বাচন, প্রথমত ও প্রধানত মৌখিক জিনিস। এর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় রূপ পাওয়া যায় গণসমাজের কথাবার্তায়। যখন এ-ধরনের কথা বা বাচনে কোনো উপন্যাসের মূল অবয়ব গঠিত হয় তখন উপন্যাসটি নিজের মধ্যে ধারণ করে গণসংস্কৃতির সম্ভাব্য সবচেয়ে বিস্তৃত রূপ এবং এভাবে তা লাভ করে উঁচুমাত্রার শৈল্পিক সম্ভাবনা (সেভস্তোভা, ১৯৯২ : ৭৪৬)। এই ‘কথা’ বা বাচনের ভাষার চরিত্র হলো ডায়ালজিক বা সংলাপধর্মী; বাস্তব বা কাল্পনিক সংলাপের মধ্য দিয়েই রূপান্তরিত হয় কোনো অবস্থা বা ঘটনা। ডায়ালজিক সম্পর্ক কেবল উচ্চারিত ভাষায় নয়, অনুচ্চারিত চিন্তায়ও থাকে, কারণ ওখানেও নিয়ত আত্ম ও ‘অন্যে’র মধ্যে সংঘটিত হচ্ছে ডায়ালগ। তেমনি টেক্সটের মধ্যেও আছে ডায়ালজিক সম্পর্ক। ভাষার এই ডায়ালজিক প্রকৃতির জন্য আমরা অন্য কোনো উচ্চারণ, কোনো বাচনশ্রেণি বা টেক্সটে সন্ধান করতে পারি তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমরূপী উপাদানগুলোর চিহ্ন।

সাহিত্য যোগাযোগেরই এক মাধ্যম, অতএব জ্ঞানার্জনের উপায়। এই যোগাযোগ ঘটে ডায়ালগ বা সংলাপধর্মী পারস্পরিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। উপন্যাসে একই সময়ে বিভিন্ন স্তরে ডায়ালজিক লেনদেন চলে। যেমন ভাষাকে অর্থ-প্রদানকারী দুটি শক্তি হলো : প্রথমত, কেন্দ্রমুখী টান, যা সবকিছুর ওপর এমনভাবে অর্থ-আরোপ করতে চায় যাতে সবকিছু একত্রে সংসক্ত বলে মনে হয়; দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রাতিগ টান, যা সবকিছুকে বিচ্ছিন্নভাবে অর্থবহ করতে চায়। টেক্সটে শব্দ ও বাক্য অর্থ পায় এ-দুয়ের ডায়ালজিক লেনদেন বা বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। আবার শব্দ ও বাক্যের সামাজিক বৈশিষ্ট্য এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও চলে ডায়ালজিক বিনিময়। যেমন – গাছ শব্দটি ভাষার সামাজিক অর্থে যে-কোনো গাছকে বোঝায়, কিন্তু কোনো ব্যক্তি যখন গাছ শব্দটি ব্যবহার করে তখন তার মধ্যে তার স্থান ও সংশ্লিষ্ট কালে নির্দিষ্ট কোনো গাছের অভিব্যক্তি ঘটে। শব্দের বিকাশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের অর্থের মধ্যেও থাকে ডায়ালজিক সম্পর্ক। সবশেষে লেখক, তার ও তারই সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যেও ডায়ালজিক লেনদেন চলে, তেমনি রচনা-পাঠের সময় ডায়ালজিক বিনিময় হয় পাঠক, চরিত্র ও লেখকের মধ্যে।

ভাষার এই ডায়ালজিক চারিত্রের একটি প্রায়োগিক দৃষ্টান্তের উল্লেখ করতে পারি আমরা। Joyce, Bakhtin, and the Literary Tradition (১৯৯৬) গ্রন্থে কেইথ বুকার জয়েসের টেক্সটের সঙ্গে পূর্ববর্তী হোমার থেকে দস্তয়ভস্কির মতো বিভিন্ন লেখকের টেক্সটের সম্পর্ক খুঁজে বের করেন। কারণ মহৎ ঔপন্যাসিক হিসেবে জয়েস পূর্ববর্তী টেক্সটগুলোর সঙ্গে তাঁর টেক্সটকে ডায়ালজিক সম্পর্কে সম্পর্কিত করেছেন।

এ-সম্পর্কের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক পোয়েটিক্স বলে একটি জিনিস নির্দেশ করেন বাখতিন। ভাষার ব্যবহার তাঁর পূর্ববর্তী রচনাগুলোর অর্থের দ্বারা রঞ্জিত; সকল ভাষাই পূর্বে ব্যবহৃত হয়েছে এবং পূর্বের ব্যবহারের অর্থ বয়ে নিয়ে এসেছে বর্তমানে, তা বহন করে নিয়ে যাবে ভবিষ্যতের দিকেও। সুতরাং যে-কোনো উচ্চারণ পূর্ববর্তী উচ্চারণজনিত অর্থ ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে ডায়ালজিক মিশ্রণের ফল। ‘‘আমাদের কথা অর্থাৎ (সৃজনশীল কাজসহ) আমাদের সকল উচ্চারণ ‘অন্য’-দের শব্দে ভরা, বিভিন্ন মাত্রার অন্যতা বা বিভিন্ন মাত্রায় ‘‘আমাদের নিজ’’-তা এবং বিভিন্ন মাত্রার সচেতনতা ও বিচ্ছিন্নতায় পূর্ণ। ‘অন্য’-দের এইসব শব্দ বহন করে আনে তাদের নিজস্ব অভিব্যক্তি, তাদের নিজস্ব বিকাশমান স্বর, …আমরা তা মিশিয়ে নিই, পুনর্বিন্যস্ত ও পুনরুচ্চারণ করি’’ (বাখতিন, ১৯৮১ : ৮৯)। এই বক্তব্যের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল বাখতিনের উপন্যাসতত্ত্ব।

বাখতিন উপন্যাসকে বলেন নির্দিষ্ট বর্গের বাচন। তবে যে-ধরনের বাচনই হোক, তা পূর্ব-নির্ধারিত নয়, অতএব পুনরুৎপাদন নয় কেবল। নির্দিষ্ট কোনো বক্তা যখন বাস্তব বা ধরে নেওয়া কিংবা কাল্পনিক কোনো শ্রোতার সঙ্গে বাক্যালাপ করতে চান তখনই বক্তার শব্দ গড়ন ও বিন্যাস পেতে আরম্ভ করে। এখানে বক্তার অন্তর্গত চিন্তা-প্রবাহকেও হিসাবে ধরতে হবে, বাখতিন যাকে বলেছেন অন্তর্গত বাচন বা মনোলগ। কিন্তু উপন্যাসে থাকবে বহির্মুখী বাচনের প্রাধান্য। অন্তর্গত বাচন নিজের মধ্যে নিজের সঙ্গে কিংবা কাল্পনিক ‘অন্যে’র সঙ্গে বাক্যালাপ। অন্তর্গত বাচনের মধ্য দিয়ে চরিত্র যেমন খুব বেশি বিকশিত হয় না, তেমনি

বাস্তবতাও খুব একটা অভিব্যক্ত হয় না। অন্তর্গত বাচনকে বাখতিন কেবল দ্বিতীয় স্তরের বাচনই বলেননি, একে অভিহিত করেছেন একরকম কল্পনা বা বিভ্রম বলে। কেবল বহির্মুখী ডায়ালজিক বাচন হৃদয়ঙ্গমের জন্যই যৌক্তিক মনোলগ ব্যবহার করা যায়।

কিন্তু যে-বর্গের বাচনই হোক, তা বক্তা ও শ্রোতার (যিনি আবার বক্তার ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হন) সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তা নির্ধারিত হয় উচ্চারণের স্থান ও কালের দ্বারা, নির্দিষ্ট স্থানের কালের দ্বারা। নির্দিষ্ট স্থানে কালের অবস্থাকে বাখতিন বলেছেন ‘ক্রনোটপ’ (ঈযৎড়হড়ঃড়ঢ়ব)। ‘সাহিত্যে ক্রনোটপের নিজস্ব বর্গীয় গুরুত্ব রয়েছে। এমনকি বলা যায়, ক্রনোটপই বাচনের বর্গ ও বর্গীয় স্বকীয়তা নির্ধারণ করে। ক্রনোটপ হলো বাচনের (বিভিন্ন অংশের) গাঁটছড়া বাঁধার জায়গা’ (বাখতিন, ১৯৮১ : ২৫০)। বাখতিনের ক্রনোটপকে সহজ বোঝার জন্য আমরা আমাদের ভাষায় তাকে বলতে পারি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানে নির্দিষ্ট কালের সমাজ-সংস্কৃতিসহ সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রভাবে নির্ধারিত বয়ানের রূপ, যা আংশিকভাবে শাসন করে আমাদের চিন্তা ও বাচন। এতে যুক্ত থাকে বয়ানের কাল ও স্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ছাপ। ক্রনোটপকে লোককাহিনীর মটিফ বা ক্রিয়ার কাছাকাছি অর্থবোধক বলে ধরে নেওয়া যায়, যা বয়ানের একধরনের গড়নের পেছনের কারণ। গ্রিক রোমা›স ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাখতিন অ্যাডভেঞ্চার ক্রনোটপের কথা বলেছেন। কিস্সায় নায়ক রাক্ষস হত্যা করে এবং রাজকন্যাকে বিয়ে করে; এটি বাখতিনের অ্যাডভেঞ্চার ক্রনোটপ, যা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় (আদিমকাল) এবং নির্দিষ্ট স্থানের (জঙ্গলময় পরিত্যক্ত রাজবাড়ি বা এ-রকম

কিছু) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। একটি উপন্যাসে একাধিক ক্রনোটপ সক্রিয়

হতে পারে, সেখানে ক্রনোটপগুলোর দ্বারা শাসিত বিভিন্ন বর্গের

বাচন নিজ নিজ স্থান করে নেবে। ক্রনোটপগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক হবে ডায়ালজিক।

বাখতিন বলেন, একটি বিশেষ বাচনবর্গ হিসেবে উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নিজের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন (জনের) ভাষা আত্মীকৃত করে নেওয়ার স্বভাব : ‘স্বরের ও হেটারোগ্লসিয়ার বৈচিত্র্য প্রবেশ করে উপন্যাসে এবং শৈল্পিক কাঠামোর মধ্যে নিজেদের বিন্যস্ত করে নেয়। এ-দিকটি একটি সাহিত্যিকবর্গ হিসেবে উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য’ (বাখতিন, ১৯৮১ : ৩০০)। বাখতিনের হেটেরোগ্লসিয়া হলো ভাষার বিশাল ব্যাপ্তির মধ্যে ভাষাদ্বারা সৃষ্ট পৃথিবীকে উপলব্ধি করার উপায় (হলকুইয়িস্ট, ১৯৯৭ : ৬৯)। যে-ধরনের বাচনকে আমরা সাহিত্যিক রচনা বলি হেটেরোগ্লসিয়া তার মধ্যে অর্থ-নির্দেশনার প্রক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে হেটেরোগ্লসিয়া বলতে কেবল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-গোষ্ঠী কর্তৃক শব্দের ব্যবহারিক বৈচিত্র্যই বোঝায় না, উপন্যাসের সমগ্র সামাজিক-সাংস্কৃতিক পটভূমির বৈচিত্র্যও বোঝায়। ভাষা মিথস্ক্রিয়া করে গতিময়তার ভিত্তিতে, বিশেষ করে ‘উঁচু’ ও ‘নিু’ ভাষার বৈপরীত্যের মধ্যে। এভাবে উপন্যাসে ডায়ালগ সমাজের ভাবকেন্দ্রিক সংঘাতকেও সামগ্রিকভাবে তুলে ধরে।

ভাষার ডায়ালজিক প্রকৃতির ভিত্তিতে বাখতিন উপন্যাসের বিকাশে দুটি ধরন নির্দেশ করেন। প্রথমোক্ত ধরনের উপন্যাসের ভাষায় হেটেরোগ্লসিয়াকে দমন করে একক সাহিত্যিক স্বর বিকশিত করা হয়। দ্বিতীয় ধরনের উপন্যাসে হেটেরোগ্লসিয়াকে আত্মীকৃত করে নিয়ে বহুজনের কণ্ঠস্বর ধারণ করা হয়।

অতএব বাখতিন মনে করেন, উপন্যাসে বহুজনের কণ্ঠস্বর অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত এবং সেইসব স্বর পরস্পরের সঙ্গে বিন্যস্ত হবে ডায়ালজিক সম্পর্কে। উপন্যাসটিতে সংশ্লিষ্ট সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় উপন্যাসের বয়ানে সেইসব কণ্ঠস্বরের সঙ্গে তাদের পরিপার্শ্ব ও রুচি, অভিব্যক্তিও সঞ্চারিত হবে। এবং এর ফলে জায়গা করে নেবে সেই সমাজের প্রচুর বাস্তব উপাদান। ‘উপন্যাসে অবশ্যই তার যুগের পূর্ণ ও বোধগম্য অভিব্যক্তি থাকতে হবে, সেই যুগের সকল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভাষার চিহ্ন থাকতে হবে। উপন্যাস হবে হেটেরোগ্লসিয়ার ক্ষুদ্র বিশ্ব’ (বাখতিন, ১৯৮১ : ১১০-১১১)। উপন্যাসের বয়ান হবে বহুস্বরিক (চড়ষুঢ়যড়হরপ)। বাখতিন তাই মনোলোজিক উপন্যাসকে অত গুরুত্ব দেননি। ডায়ালজিক উপন্যাসই তাঁর আদর্শ, যেমন দস্তয়ভস্কি বা র‌্যাবলের রচনা।

আমরা এখানে শিল্পোত্তীর্ণ উপন্যাসের আরেকটি বাখতিনীয় মানদণ্ড পাচ্ছি : সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির ভাষা অন্তর্ভুক্ত করে বাস্তব সংস্কৃতির অধিকতর প্রতিফলন নিশ্চিত করা – এটিই উপন্যাসকে দেয় বৃদ্ধি ও ক্রমশ বিকশিত হওয়ার ক্ষমতা। কোনো নির্দিষ্ট নিয়মকানুনের মধ্যে ঘুরে-ফিরে একই জিনিস সৃষ্টি হওয়ার বদলে উপন্যাস বারবার তার নিজের রীতিনীতিকেই চ্যালেঞ্জ করবে এবং সমকালীনতার স্পর্শে থেকে চিরকাল নতুন নতুন রূপে আবির্ভূত হবে।

উপন্যাসের চরিত্র-নির্মাণেও বাখতিন দৃষ্টান্তমূলক আদর্শ উপস্থিত করেছেন। উপন্যাসে লেখক কিংবা সংশ্লিষ্ট চরিত্র নিজে নিজেকে বর্ণনা করবে না। বরং ‘অন্যে’র (অন্য চরিত্রগুলোর) সঙ্গে ডায়ালজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ‘অন্যে’র উপলব্ধির মধ্যে নিজের সম্পর্কে সচেতন হবে ও জানবে। তিনি দেখান যে, দস্তয়ভস্কির উপন্যাসকে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বলা হলেও তাঁর চরিত্রগুলোর মনোগত গভীরতা উন্মোচিত হয়নি। লেখক তাদের মনের গহিনে প্রবেশ না করে বহিরঙ্গে অবস্থান করেছেন। অন্যরা কীভাবে তাদের দেখে ও উপলব্ধি করে বলে মনে হয় তা বোঝার চেষ্টা করে তাঁর চরিত্রগুলো। তিনি বলেন, সে (অর্থাৎ চরিত্রটি) কে তা কিন্তু আমরা তাঁর উপন্যাসে দেখি না, সে কীভাবে নিজের সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে তা-ই দেখি। আমাদের কল্পনা নায়কের বাস্তবতার মধ্যে মূর্ত হয় না, সেই বাস্তবতা সম্পর্কে নায়কের সচেতন হয়ে ওঠার মধ্যে আমাদের কল্পনা মূর্ত হয় (বাখতিন, ১৯৮৪.খ : ৮৯)। আমরা দেখি দস্তয়ভস্কির চরিত্রগুলো, অন্তত আংশিকভাবে, নির্মিত

হচ্ছে ‘অন্য’দের চিন্তা, সংলাপ ও উপলব্ধির দ্বারা। তিনি

চরিত্রগুলোকে চরিত্রের নিজের, লেখকের ও ‘অন্য’দের সংলাপের মধ্য দিয়ে মূর্ত করেন।

সুতরাং দস্তয়ভস্কির উপন্যাস বহুস্বরিক, কারণ সেগুলো বিভিন্ন চৈতন্যের সংলাপের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। দস্তয়ভস্কির ইতিহাস-চেতনা-প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দস্তয়ভস্কি ইতিহাসকে মসৃণ স্রোতরূপে দেখেননি, বরং একগুচ্ছ দৃশ্যসজ্জারূপে অঙ্কন করেন (বাখতিন, ১৯৮৪.ক : ২৮)। কিন্তু গ্যোয়েতে সম্পর্কিত আলোচনায় তিনি

দেখান গোয়েতে ইতিহাসকে আঁকেন মসৃণ, অবিরাম স্রোতধারারূপে; তার এখানে-সেখানে ক্রমিক ও স্থিতিশীল পরিবর্তন (বাখতিন,

১৯৮১ : ৪২)।

বাখতিন মহৎ উপন্যাসের যেসব মানদণ্ড উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার্নিভাল। তিনি উপন্যাসে কার্নিভালসদৃশ প্রাণময়তা ও শক্তির উৎসারণের ওপর জোর দিয়েছেন। র‌্যাবলের উপন্যাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কার্নিভালের ধারণা সংগঠিত করেন তিনি। মধ্যযুগে সংঘটিত নিয়মিত কার্নিভালের ধারণা থেকেই তিনি তাঁর ‘কার্নিভালে’র তত্ত্ব

প্রস্তাব করেন। কার্নিভাল২ হলো উৎসবধর্মী প্রাণময়তা ও তেজোদীপ্তি স্ফুরণের সময় ও অবস্থা, যখন সামাজিক আচার-প্রথার সীমানাগুলো ভেঙে পড়ে এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির ও অবস্থার মানুষ পরস্পর একাত্ম হয়ে যায়। এ-অবস্থাটি মধ্যযুগের চার্চশাসিত ক্যাথলিক সমাজের কঠিন রক্ষণশীল নিয়মাচারের শীতলতার বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ, তখন স্বাভাবিক নিয়ম-শৃঙ্খলা ও পদক্রমিক বিভেদ লুপ্ত হয়ে যেত।

বাখতিন র‌্যাবলের উপন্যাসের আলোচনায় দেখান যে, কার্নিভালের অপরিমেয় শক্তি ও প্রাণময়তা র‌্যাবলের উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডায়ালজিক ভাষিক কৌশল এবং দৈহিক চিত্রকল্পের ব্যবহার। বাখতিন ইঙ্গিত করেন, উপন্যাসে কার্নিভালাইজেশনের মাধ্যমে প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি এবং শ্রেণি-শোষণের বৃত্তটির বিরুদ্ধে কার্যকর আবেগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

ইউরোপ-আমেরিকার পণ্ডিতরা আবার কার্নিভালের অন্য ব্যাখ্যাও প্রদান করেছেন। তাঁরা মনে করেন, কার্নিভালকে পাঠ করতে হবে প্রতীকী অর্থে। স্ট্যালিনসহ কমিউনিস্ট শাসকদের দ্বারা বঞ্চিত ও নির্যাতিত হয়েছিলেন বাখতিন। স্বাধীন মতপ্রকাশেরও সুযোগ ছিল না তাঁর। তিনি হয়তো মধ্যযুগের চার্চের কঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলার সঙ্গে সাদৃশ্য দেখেছেন স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়নের লৌহ-কঠিন আইন-কানুনের। চার্চের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে কার্নিভালের বিস্ফোরণের প্রতীকের মধ্যে তিনি স্ট্যালিনের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

উপন্যাসের বয়ানে দেহের ব্যবহারও বাখতিনের কাছে আলাদা বিশেষত্ব বহন করে। এ-দেহ হলো বাখতিনের Grotesque Body, বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয় এমন সব কর্মতৎপরতায় সক্রিয় দেহ। যেমন – যৌনকর্ম, মলমূত্রত্যাগ, খাদ্যগ্রহণ ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে ‘অন্যে’র সঙ্গে এবং বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে দেহের তথা ব্যক্তির লেনদেন। এগুলো মানুষকে অবয়বগত পৃথিবীতে অবয়ববিশিষ্ট জৈবিক প্রাণীর মর্যাদায় দাঁড় করায়। অথচ সচরাচর দেহকে দেখা হয় একটি খুঁতহীন ধ্রুপদ জিনিস হিসেবে, যৌনকর্ম বা মলমূত্রত্যাগ বা খাদ্যগ্রহণের মতো কাজগুলো মনে করা হয় ‘নিুস্তরে’র ব্যাপার। কিন্তু (ব্যক্তির) দেহের সঙ্গে ‘অন্যে’র এবং পৃথিবীর সম্পর্কস্থাপনের উপায় হলো এইসব ক্রিয়া। মানুষ পৃথিবীর থেকে (খাদ্য) গ্রহণ করে, আবার (মলমূত্রের আকারে) পৃথিবীকে ফিরিয়েও দেয় এবং অন্যের দেহকে সে (যৌনকর্ম-উপলক্ষে) নিজের মধ্যে প্রবেশ করতে দেয় (বা সে প্রবেশ করে অন্যের দেহে) এইসব তথাকথিত নিু-স্তরের কাজের মাধ্যমে। এর মধ্যে দেহ কেবল হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু সেই হয়ে ওঠা কখনো শেষ হয় না। (কারণ দেহ জন্ম নেয়, আবার জন্ম দেয়, মৃত্যুবরণ করে এবং এভাবে এ-প্রক্রিয়া অবিরাম চলতে থাকে)। বাখতিন বলেন, এ-সম্পর্ক ও তার প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করার অর্থ হলো ইতিহাসকে অস্বীকার করা। কিন্তু, ‘অনিঃশেষ ও উন্মুক্ত দেহ (যেহেতু তা মৃত্যুবরণ করে, জন্ম দেয়, আবার মরে যায়) কোনো সুনির্দিষ্ট সীমানা দিয়ে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এটি পৃথিবীর সঙ্গেই মিশে আছে’ (বাখতিন, ১৯৮৪.খ : ২৬-২৭)।’ মাঝে মধ্যে এ-মিশ্রণের বিচিত্রমুখী গতি ও দৈহিক কর্মপ্রক্রিয়ার স্ফুরণ ঘটে কার্নিভাল বা কার্নিভালসদৃশ অবস্থায়। এর ফলে আমরা দেখি সাবজেক্ট বা ব্যক্তি সরাসরি যুক্ত হয় ইতিহাসের সমকালীন স্রোতের সঙ্গে। বস্তুময় দেহের নিুস্তর এবং ক্রমশ ক্ষয়, উৎপাদন ও পুনঃক্ষয়ের গোটা প্রক্রিয়াটি সময়, এবং সামাজিক-ঐতিহাসিক রূপান্তরের সঙ্গে এই অনিবার্য সম্পর্ককে উপস্থাপন করে (বাখতিন. ১৯৮৪. খ: ৮১)। পৃথিবীর সঙ্গে ব্যক্তির এই সংযুক্তি-সম্পর্ক বিপন্ন করে তোলে কান্টের সাবজেক্ট ও অবজেক্টের ধারণাকে। কান্টের দর্শনের অনুকরণে এতদিন ধরে আমরা ব্যক্তিকে মনে করেছি একটি কেন্দ্র এবং এ-ধারণার ভিত্তিতে আর সমস্ত বিষয় সম্পর্কে আমাদের

চিন্তাভাবনা বিন্যস্ত হয়েছে। কিন্তু বাখতিন আমাদের দেখিয়ে দেন ব্যক্তি কোনো কেন্দ্র নয়। ব্যক্তি আরো সব ব্যক্তির সাপেক্ষে অস্তিত্ব ধারণ করে, ‘অন্যে’র সঙ্গে ডায়ালজিক সম্পর্কে নিজেকে উপলব্ধি করতে পারে। এজন্য বাখতিন বলেন, ব্যক্তি কেবলই একটি ‘ঘটনা’।

বাখতিনের অদ্ভুত দেহ এবং পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্ক বোঝার জন্য আমরা মিশেল ফুকোর জ্ঞানতত্ত্বের সাহায্য নিতে পারি। ফুকো বলেন যে, পশ্চিমের চিন্তাজগতে এতদিন ধরে ব্যক্তি কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় থেকেছে (ফুকো, ১৯৭২ : ২০২-৩)। সেই কেন্দ্রটি তার চারপাশ দেখেছে এবং বিবেচনা করেছে গোটা পরিপার্শ্বকে। কিন্তু পৃথিবীকে দেখতে হবে ব্যক্তিসহ একটি গোটা বিন্যাস হিসেবে এবং তাহলেই যথাযথ জ্ঞানার্জন সম্ভব। অর্থাৎ আমি-কেন্দ্রিক

চিন্তা-প্রক্রিয়া পরিহার করা জরুরি। ফুকো এমনকি ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন যে, আগামীদিনের জ্ঞানচর্চায় ব্যক্তির মৃত্যু অবধারিত। বাখতিনও এই ব্যক্তিকে কেন্দ্রীয় বিষয়ের মর্যাদা দেননি। বরং তিনি বলেন ‘অন্যে’র সাপেক্ষেই ব্যক্তি নিজেকে উপলব্ধি করবে।

বাখতিন বলেন, দেহকে ‘উচ্চ’ ও ‘নিু’ অংশে ভাগ করার প্রতিষ্ঠিত রীতি আসলে সমাজে আধিপত্যশীল শ্রেণিকর্তৃক অন্য শ্রেণিগুলোকে শোষণের দৃষ্টান্ত। উপন্যাসে এই রীতি ভাঙা প্রয়োজন। র‌্যাবলের উপন্যাস-বিশ্লেষণে খুলে খুলে দেখান, র‌্যাবলে দেহের ‘নিুস্তর’ ও তাঁর কাজকর্মকে গুরুত্ব দিয়ে ঊর্ধ্বাংশের আধিপত্য ভেঙে ফেলেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে আধিপত্যের প্রতীকটিকে বিপর্যস্ত করেছেন। স্ট্যালিব্রাস ও হোয়াইট বাখতিনের অনুকরণে বলেন যে, দেহ এবং সাহিত্যকর্মকে ‘উচ্চ’ ও ‘নিু’-স্তরে ভাগ করার মধ্যে নিহিত রয়েছে শাসকশ্রেণিকর্তৃক শাসিতশ্রেণিকে শোষণের ধারণা। তাঁরা মনে করেন, সাহিত্য ও লেখার পদক্রমিক বিভাজন আসলে আরো জটিল ও বিস্তৃত সাংস্কৃতিক বিন্যাসের উদাহরণ, যেখানে মানবীয় দেহ, আকার, গঠন, ভৌগোলিক পরিসর ও সমাজের গড়ন সবই উঁচু-নিচু পদক্রমের ভিত্তিতে আসঞ্জিত অবস্থায় বিন্যস্ত হয়েছে (স্ট্যালিব্রাস-হোয়াইট, ১৯৮৬ : ২)। এই বিন্যাস ভেঙে ফেলতে পারে বাখতিনকর্তৃক চিহ্নিত কার্নিভালের শক্তি। বাখতিন এর মধ্যে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় অভিব্যক্ত করেন বিপ্লবের ধারণা। এজন্য হলকুয়িস্ট মন্তব্য করেন যে, বাখতিনের কার্নিভাল হলো… স্বয়ং বিপ্লব।

উপন্যাসের কার্নিভালাইজেশন বাখতিনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কারণ কার্নিভাল সত্য-উদ্ঘাটনেও সহায়তা করে, পরিচিত জিনিসকে ভিন্নভাবে দেখায়, হয়তো আদতে যা আসল সত্য। যেমন – প্রকৃত আনুষ্ঠানিক কার্নিভালে শ্রেণি ও পদক্রমিক বিভেদ লুপ্ত করে সকল মানুষ একাত্ম হয়ে যাওয়ায় প্রমাণ হয়ে যে শ্রেণি ও পদক্রমিক বিন্যাস আসলে কৃত্রিম, প্রাকৃতিক কোনো নিয়ম নয়।

বাখতিনের কার্নিভাল – কার্নিভালাইজেশন পশ্চিমের সাহিত্যচিন্তায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে। অনেকে আধুনিক সাহিত্যের মধ্যে কার্নিভালাইজেশনের ধারণা প্রয়োগ করে নতুন বিশ্লেষণ উপস্থিত করেন। ম্যাক্স ন্যানি জেমস জয়েসের ইউলিসিস, টি.এস. এলিয়টের ওয়েস্ট ল্যান্ড এবং এজরা পাউন্ডের ক্যান্টোসকে উনিশ শতকের ভিক্টোরীয় রীতির সাহিত্যের বিরুদ্ধে কার্নিভালাইজেশনের স্ফুরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, গোটা আধুনিক সাহিত্যটিই পূর্ববর্তী সাহিত্যিক রীতি ও চিন্তার কার্নিভালাইজেশন।

শুরুতে আমরা উল্লেখ করেছি, বাখতিনের ডায়ালজিজম জটিল ও বহুমাত্রিক ভাবনার বিষয়। এ-নিয়ে বিতর্কও রয়েছে, এখনো বাখতিন সম্পর্কে বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা অব্যাহত। এ-প্রবন্ধে স্বল্পপরিসরে ডায়ালজিজম ও কার্নিভালাইজেশন গুরুত্বের আলোকে উপন্যাস-বিষয়ে বাখতিনের মতামতের সার-বক্তব্য তুলে ধরেছি আমরা।

বাখতিন মনে করেন, কোনো সাহিত্যিক রচনাকে ভালোভাবে বোঝার উপায় একটিই – ডায়ালজিজমের আলোকে তার বিশ্লেষণ করা ও তার মান নির্ধারণ করা (যেমন – র‌্যাবলে বা দস্তয়ভস্কির রচনা প্রশংসাযোগ্য)। মোটা অর্থে বলা যায়, সাহিত্যিক উৎকর্ষ (বাখতিন যাকে বলেন ‘Dcb¨vmZ¡Õ-Novelness) বিশ্লেষণের অর্থ হলো এমন কোনো সাংস্কৃতিক তৎপরতা-বিশ্লেষণ, যাতে ভাষাকে ডায়ালজিক প্রকৃতিসমেত ব্যবহার করা হয়েছে (হলকুয়িস্ট, ১৯৯৭ : ৬৮)।

ডায়ালজিজমে উপন্যাসই হলো জীবনের মহত্তম গ্রন্থ। কারণ মানুষের অদ্ভুত দেহের সঙ্গে তার পরিপার্শ্বের ডায়ালজিক সম্পর্ক উন্মোচিত করে তা আমাদেরকে ‘বুর্জোয়া সমাজের শৃঙ্খলিত, নিঃসঙ্গ দেহের বিভ্রম’ থেকে মুক্তি দেয়; বুর্জোয়া সমাজের আত্মকেন্দ্রিকতা ও অতিমাত্রার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অর্থহীনতা নির্দেশ করে। অন্যদিকে, দেহের আবেগ ও তৎপরতার (তথাকথিত নিুস্তরের ক্রিয়াদির) কার্নিভালাইজ্ড অভিব্যক্তিও দেখিয়ে দেয় এ-দেহ শৃঙ্খলিত নয়, নিঃসঙ্গ দেহ নয়, তা পৃথিবীর অংশ এবং জৈবিকভাবেই পৃথিবীর সঙ্গে ডায়ালজিক সম্পর্কে সম্পর্কিত। স¥রণ করা যেতে পারে, দস্তয়ভস্কি নিজেও বুর্জোয়া

সমাজে দেহের বিচ্ছিন্নতা, অতিমাত্রার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মকেন্দ্রিকতার সমালোচনা করেছেন। বাখতিন দস্তয়ভস্কির উপন্যাসকে দিয়েছেন মহান সৃষ্টির স্বীকৃতি। এ-কথা মনে রাখলে কার্নিভালকে সমাজতান্ত্রিক রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে বাখতিনের প্রতীকী বিদ্রোহী বলতে মন সায় দেয় না।

গ্রন্থতালিকা

১. Mikhail Mikhailovich Bakhtin, K. Problems of Dostoevsï’s Poetics, trans. & ed. Caryl Emerson, Minneapolis : University of Minnesota Press, 1984.

খ. Rabelais and His World, trans. Helene Ismolosï, Bloomington : Indiana University Press, 1984.

গ. The Dialogic Imagination, ed. Michael Holquist, trans. Michael Holquist & Caryl Emerson, Austin : University of Texas Press, 1981.

২. Michael Foucault, The Archaeology of Knowledge, trans. A.M Sheridan-Smith, Nwe York : Harper and Row, 1972.৩.

গ. Keith Booker, Joyce, Bakhtin and the Literary Tradition : Toward a Comparative Cultural Poetics, University of Michigan Press, 1996.

৪. Michael Holquist, Dialogism, Bakhtin and his World, London : Routledge, 1997.

৫.  Michael Gardiner, The Dialogics of Critique : M. M. Bakhtin and Theory of Ideology, London : Routledge, 1992.

৬. Paul de Mann, The Resistance to Theory, Minneapolis: University of Minnesota Press, 1986.

৭. Peter Stallybrass and Allone White, The Politics and Poetics of Transgression, Ithaca, N.Y. : Cornell University Press, 1986.

প্রবন্ধ

১. Ann Jefferson, yRealism Reconsidered : Bakhtins Dialogism and the Will to refernceÕÕ, Australian Journal of French Studies, 23 (2), May-August 1986.

২. Maria Shevtsova, Dialogism in the Novel and Bakhtin’s Theory of Culture, Nwe Literary History, Vol 23, No. 3, Baltimore : John Hopkins University Press. Summer 1992.

টীকা

১. ফ্রাঁসোয়া র‌্যাবলে (১৪৯৪-১৫৫৩), ফরাসি মানবতাবাদী স্যাটায়ারিস্ট ও চিকিৎসক। তাঁর বিখ্যাত রচনা Pantagruel (১৫৩২) ও Gargantua (১৫৩৪) বিশ্বসাহিত্যে এখনো উচ্চমূল্যে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর রচনাকে অনেকে পৃথিবীর প্রথম উপন্যাসের মর্যাদা দিয়েছেন। র‌্যাবলের রচনা প্রধানত সংলাপধর্মী, ব্যঙ্গরসাত্মক – চমৎকার শব্দ ও বাক্যবন্ধে সমৃদ্ধ। সমকালীন ফরাসি সমাজের বাস্তবতার ডকুমেন্টেশন হিসেবেও ওগুলো অমূল্য। ২. কার্নিভাল রোমান ক্যাথলিক সমাজের ধর্মকেন্দ্রিক আনন্দোৎসব। সম্ভবত শুরুতে এটি ছিল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে কার্নিভাল অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত জানুয়ারি মাসেই কার্নিভাল পালিত হয়ে থাকে। কার্নিভালের সময় শ্রেণি বা সামাজিক অবস্থানগত বিভেদ ভুলে সমাজের সমস্ত লোক একাত্ম হয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যেই কার্নিভালের সবচেয়ে বর্ণিল বিকাশ ঘটেছিল। তখন নাচগান, মল্লযুদ্ধ, শিকার, শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মেতে উঠত গোটা সাম্রাজ্য। আধুনিক যুগে ব্রাজিলে, বিশেষত, রিও ডি জেনিরোতে খুব ঘটা করে কার্নিভাল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আমাদের এখানে চৈত্রসংক্রান্তির সময় অনুষ্ঠিত মেলা বা নববর্ষ অনুষ্ঠান দিয়ে কার্নিভালকে কিছুটা বোঝা সম্ভব।