কবিতা

  • চেতন-রোদে শূন্যতা চাষ

    হাসান হাফিজ রঙের দোলা গোলাপ-দোলা আত্মভোলা অাঁধার নাই জোনাকি চাঁদের আলো পথের দিশা ভুলতে পারাই নিয়ম স্বাভাবিক তোমার রঙে মন রাঙিয়ে অভিমানের আড় ভাঙিয়ে ভরিয়ে তুলি বিহবলতায় শান্ত এবং সরল চতুর্দিক পাপড়িকুঁড়ির স্বপ্নচুরি মনমহলার নিরল পুরী সকালসন্ধ্যা ওড়ায় ঘুড়ি, মেঘলোকে মন করতে চুরি নাই কোনো তার তুলনা-ছাঁদ কিংবা                     সমান জুড়ি শস্যবিফল বন্ধ্যা ঊষর…

  • কঠিন কোমল হ’য়ে ওঠে

    হাবীবুল্লাহ সিরাজী   কঠিন কোমল হ’য়ে ওঠে। আগুনের তেজ পেলে কঠিনও কোমল হ’তে জানে হাপরের হাওয়া দেয় পাঁজরের ভাঁজে – সম্মুখে বসেন পঞ্চানন। সিসে গলে, নৃত্যের ভঙ্গিতে ছাঁচে-ছাঁচে নদী জাগে, জাগে বর্ণমালা ব্যঞ্জনের দুই পার্শ্বে অবিভক্ত স্বর ভাষার অন্তর … কঠিন কোমল হ’য়ে ওঠে স্রোত ভাঙে পাতালের নতুন পাথর অমাবস্যা ভেঙে চাঁদ শস্য বিলি করে…

  • বিদ্রোহী ২০১১

    মুহম্মদ নূরুল হুদা জাহেদার আগেই গেলেন ফকির মোহাম্মদ। তবু ছেড়ে এলে বজলে করিম আর চকোর গোদার দরদ। তারপর আলী আকবর খান হয়ে কান্দিরপাড়। কিছুটা তো পায়ে হেঁটে, কিছুটা তো ট্রেনে। নববুই বছর আগে জন্ম হলো তালতলা লেনে। বটে সে-ও কলকাতা, বটে সে-ও নাগরিক কুঁড়ে। এতোটা বয়স গেল, তুমি কিন্তু নও থুত্থুড়ে। হবে যে কখন? যৌবন…

  • আশ্চর্য আগুন

    মৃণাল বসুচৌধুরী   সারাক্ষণ মুগ্ধতা চেয়েছো চেয়েছো মধুর ভাষালিপি                 গুহাচিত্রে                        মুগ্ধ পরম্পরা চেয়েছো নিষিদ্ধ মেঘ           চিত্রময় অকালবর্ষণ অলৌকিক সিঁড়ির দুধারে                 স্বচ্ছতোয়া নদীর আশ্লেষে                  চেয়েছো ঘনিষ্ঠ ঠোঁট                          সোহাগী সিঁদুর অনুক্রমে স্বপ্নের বিকল্প কিছু                  বোধির উত্তাপ চেয়েছো অভিজ্ঞ ছায়া                  মেধাশ্রিত প্রেম জতুগৃহ নয় প্রথাহীন পর্যটনে,       সুখের…

  • গুরু কৃপাহি কেবলম্

    গুরুদেব আমায় প্রচুর চিঠি লেখেন, কিন্তু পাঠানোর সময় ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেন, আমি জমিয়ে জমিয়ে তৈরি করি ছিন্নপত্র আমি গুরুদেবকে প্রচুর পোয়েট্রি পাঠাই, তিনি তা জমিয়ে জমিয়ে  মহাভারত করেন। কালোর দোকানে চা খেতে খেতে বলেন, গুন্ডা-মাস্তানে জগৎ ভরে গেল, এখন আর কবি কোথায়? দুপুরে খেতে বসে বলেন, কী অপূর্ব ডাল ভাই ছুটি! আর একটু দাও। সূর্যাস্তের সময় জানলা দিয়ে চেয়ে থেকে বলেন, দুনিয়া পুরো পুরিয়া হয়ে আছে গো। নাঃ ভাবছি দ্রুত্ ছেড়ে দেব, অলওয়েজ হোলহার্টেডলি বিলম্বিতে চলে যাব। মাঝে মাঝে ‘কাটিতে কাটিতে ধান এলো বরষা’য় টপ্পার সুর দেন, তিন তেহাই মেরে সমে এসে জিগ্যেস করেন, কাকে ডাকি বলো দেখি গাইতে? রামকুমার না শ্রীকুমার, বাপ না ব্যাটা, সেপাই না ঘোড়া? উত্তর করি না। জানি সমাধান সব তাঁর কাছেই। আমি শুধু তাঁর আয়না। সামনে বসিয়ে হাল্কা করে গোঁফ-দাড়ি ছেঁটে নেওয়া। উত্তর করি না। বরং নীরবে একটা-দুটো করে সাত-সাতটা কাণ্ড ঘটাই আর নিরীহ মুখে জিগ্যেস করি, ‘আচ্ছা সীতা কি আপনার বাবামশায়?’ জিগ্যেস করি, কেননা এত কাণ্ডর পরও, যদি তিনি রামায়ণটা শেষ করে দেন।

  • কুসুম বিবির ক্যাটওয়াক

    কুসুম বিবি শিখেছে এবার ক্যাটওয়াক শহর এখন দেখছে তার নেটওয়ার্ক। কুসুম বিবির গ্রাম ছিলো এক সবুজ ঘাসের ধানের আলে নক্সা আঁকা চরণপাতের। কুসুম বিবির বর ছিলো এক বর্গা জমির পান্তা খাওয়া গামছা কাঁধে স্মৃতি মমির। কুসুম বিবির শহর দেখা সাইবারে হটডগ আর পিজার জগৎ ধরলো তারে। কুসুম বিবির কথায় কথায় ইংরেজি টাইট-জিনসে লাগছে এখন ভীষণ ইজি। কুসুম বিবির প্লাস্টিকের অই জুতো জোড়া কোথায় ছিলো পা এতোদিন? বললো খোঁড়া… কুসুম বিবির ক্যাটওয়াকের হাইহিল সভ্যতারই সিঁড়ি ধরা আলোর মিছিল।০৭.০৯.০০৪

  • স্বীকারোক্তি

    অনুবাদ : হাসান ফেরদৌস ঈশ্বর, তুমি তো জানো আমি ভালোবাসি স্ট্রবেরির মিষ্টি আচার ভালোবাসি নারীর কৃষ্ণ মদিরতা আরো ভালোবাসি হিমশীতল ভোদ্কা, জলপাই তেলে মাখা হেরিং মাছ গরম মশলা ও লবঙ্গের ঘ্রাণ। তাহলে এ কেমন যুগাবতার আমি? তোমার দূত পাঠালে কেন আমারই কাছে? অনেকেই তো স্বীকৃত অবতার, আস্থাভাজন তারা মানবের আমার প্রতি আস্থা রাখে এমন আহাম্মক কই? কে না দেখেছে কেমন অনায়াসে পানপাত্র নিঃশেষ করি আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি খাদ্যভাণ্ডে লোভী চোখে দেখি পরিচারিকার নগ্ন গ্রীবা। অসম্পূর্ণ আমি, সচেতন নিজের সে-অপূর্ণতার। প্রকর্ষের আকাক্সক্ষী আমি অনায়াসে তাই চিনে ফেলি যা কিছু মহৎ। যদিও পুরোপুরি অলোকদ্রষ্টা নই তবু ঠিকই জানি কী ছিল অবশিষ্ট আমার মতো ক্ষুদ্রজনার জন্যে : ছিল আশার ক্ষণিক উৎসব, ছিল সদম্ভের সমাবেশ, কুঁজো, টুটাফাটাদের দৌড়-প্রতিযোগিতাআর ছিল সাহিত্য।

  • পুরাতন খেলা

    মনটাকে ঢেলে উপুড় করেছি মন যায় কুয়োতলা পাশের উঠোনে কাদের বৃষ্টি বন্ধু না ফেরিঅলা? কলসি হাঁটছে কোমর দুলিয়ে ভাব করব না আড়ি স্নানে চলেছেন শত সখি সনে দেবী ভিক্ষুক বাড়ি। কিঙ্করী মারে কলসির কানা আহা উহু এই মন জলে ঝাঁপ দেব, বেপাড়ার ছেলে লুফে নেয় হরতন! কলসি ভাঙার পুরাতন খেলা এখন ভেতরে ফুঁসছে মাঠের কিনারে সব জল ঢেলেছেলেটি মেয়েকে দুষছে।

  • অদ্ভুত রূপকথা

    রূপকথার মিথে মানুষগুলো ঘোরগ্রস্ত বিভ্রান্ত ভুলগুলো বুঝতে পারছে না নিজেদের অসুস্থতা নারী, নদী, নৌকা বিষয়ক রূপকথায় আস্থা ১০০% অন্ধ বিশ্বাস ২০০ ভাগ দীনের দত্যিদানবে। বাস্তববর্জিত কাল্পনিকতায় মন মুগ্ধ রঙিন রূপকথার গল্পগ্রন্থ পাঠ করে তারা পাঁচ বার কাঁদে, সাজায় সীমাবদ্ধ সংসার। রূপকথার সোনার কাঠি, রুপোর কাঠিমানুষকে বানিয়ে রেখেছে বানর।

  • গান গেয়ে বাজিমাত

    ঐ মেয়ে প্রেমের নামে মান-অভিমানে সারাক্ষণ পুরুষ ভালোবাসুক, প্রশংসা করুক সময়-অসময় সকাল না হতে শুরু হোক হার-মানা ছেলে-খেলা ভালো মেয়ে সত্যবাদিনী নিঃস্বার্থ অভিনয় জানা। ব্যস্ত থাক পুরুষের জাত সারাক্ষণ হাত ধরে সময় কাটাক, স্মরণ পিছু না হটে জন্মদিন উপঢৌকন না যেন বাদ পড়ে, দানের তালিকা দীর্ঘতর, তীব্র টান এক প্রাণ ঐ মেয়ের নামে। ঐ মেয়ে নিশ্চিত অন্যখানে করে গান, জন্মদিন অন্য কার আগ্রহ নেই জানার যা পাওয়া একার, শেষ নেই দাবি, দিন-রাত কেবল ভালোবাসার ঐ মেয়ে প্রেমের নামে দাম পেতে মন প্রসারিত মেতে থাকো দুঃসাহসে তার সাথে হরতালে চলোঐ মেয়ে নিশ্চিত সেমিনারে গান গেয়ে বাজিমাত।

  • গান গেয়ে বাজিমাত

    ঐ মেয়ে প্রেমের নামে মান-অভিমানে সারাক্ষণ পুরুষ ভালোবাসুক, প্রশংসা করুক সময়-অসময় সকাল না হতে শুরু হোক হার-মানা ছেলে-খেলা ভালো মেয়ে সত্যবাদিনী নিঃস্বার্থ অভিনয় জানা। ব্যস্ত থাক পুরুষের জাত সারাক্ষণ হাত ধরে সময় কাটাক, স্মরণ পিছু না হটে জন্মদিন উপঢৌকন না যেন বাদ পড়ে, দানের তালিকা দীর্ঘতর, তীব্র টান এক প্রাণ ঐ মেয়ের নামে। ঐ মেয়ে নিশ্চিত অন্যখানে করে গান, জন্মদিন অন্য কার আগ্রহ নেই জানার যা পাওয়া একার, শেষ নেই দাবি, দিন-রাত কেবল ভালোবাসার ঐ মেয়ে প্রেমের নামে দাম পেতে মন প্রসারিত মেতে থাকো দুঃসাহসে তার সাথে হরতালে চলোঐ মেয়ে নিশ্চিত সেমিনারে গান গেয়ে বাজিমাত।

  • শুয়ে আছি কড়া বিছানায়

    ফুল ফুটে আছে। ভূমির চরিত্র বাঁকাচোরা শুধু আমি তাকাইনি। আজ এ বৃষ্টির দিন – বিন্দু বিন্দু চুম্বনবারতা নেমে এল সন্তর্পণে। আমি বাড়িয়ে দিইনি হাত ফুরিয়ে যাবার ইচ্ছা মৃত্যুর সমান ক্লান্তি দিন দিন এত রুগ্ন, বালিশ সাপটে থাকে মাথা কতভাবে মারা যায় তোমাকে আমাকে। এমনকী আমরাও মারি পরস্পর  পদ্ধতি আবহমান – যদি বলা যায় সমস্বরে – চোর তুমি চোর – মাছিদের উত্তেজিত করে ঝাঁকে ঝাঁকে  হাসাহাসি উড়ে আসে আগুনের ধ্বক লাগে গায়ে আর  জ্বলে যাই জ্বলতে জ্বলতে ছুটি রাস্তার দুপাশ থেকে দয়া শব্দ করে লোক ছাই হয়ে যাই এত মরি ঘৃণিত হয়েছি এতবার তবু ভেজা ঘাসে বসে শীতল প্রার্থনা করি ঘাস লেগে থাকে গায়ে চড় পড়ে গালে চড় পড়ে ফাটে বীজতুলো ছড়াতে ছড়াতে চলে যায় ঘুরতে ঘুরতে ফের সিলিং ফ্যানের থেকে ঝুলিয়ে দিয়েছি দড়ি কী আদরে আশ্চর্য গলায়… এই আমি ভূমণ্ডল গভীর শ্যাওলাধরা কুয়োয় পড়েও দেখি আজ ভোর আমারই জন্য জেগেছিল কত পাকে, মিথ্যা পাকে জড়িয়ে যন্ত্রণা বেনারসি শাড়ি পোকা ধরা, ফুটো ফুটো মিথ্যের নির্মম ক্ষমতা চন্দনে সাজিয়ে দেয় ঘৃণ্য সহবাস ভয় পাই আতঙ্কিত শুয়ে থাকি যুগ যুগান্তর কঠিন মিথ্যের মারে মেরুদণ্ড ভাঙা  শুয়ে আছি কড়া বিছানায় তাল তাল কাদামণ্ড আমার শিয়রে।