কবিতা
-
আমাদের মেঘমল্লার আমাদের হাওয়াগাড়ি
কথা ছিল – বৃষ্টি আসুক বা না আসুক মেঘমল্লার হবেই ভীমসেন যোশীই গাইবেন – আকাশে মেঘ দেখে এসব আসরের কথা ভেবে নিয়ে মিলেছি সবাই কিন্তু নান্দীপাঠ হচ্ছে মৃত্যু ও দালান-ভাঙার রাজনীতিতে মেতে উঠেছে ছিন্নপত্র উড়োখই আদেখ্লেপনার পৃষ্ঠপোষক সব চামড়াসর্বস্ব মধ্যবিত্ত নিজেদের কথাই কেবল বলে যাচ্ছি শ্রোতা পাই বা না পাই – ভুলে গেছি আজ মেঘমল্লার হবে – অন্তত মেঘমল্লার শোনার কথা ছিল। প্রচণ্ড গর্জনে ফেটে পড়ল বিদ্যুচ্চমক – শুরু হলো আজ রাতের মেঘমল্লার, তোমার একার জন্যে এর চেয়ে ভালো আর কী? নির্জনে রাজনীতি নেই, স্বার্থসিদ্ধি নেই – ঘৃণা নেই – অক্ষমের আস্ফালন নেই – হাওয়াগাড়ি আমাদের উড়িয়ে নিয়ে চলেছে মিশে গেছে মেঘ-গাড়ি-মন-পাখিরা! ১২-০৬-২০০৪
-
আড়াল
তুমি প্রথমে তোমার ওড়না দিয়ে একটা আড়াল তৈরি করলে তোমার সাথে আমার – তখনো তাতে তোমার গন্ধ স্পর্শ ছিল স্পষ্ট। তুমি বললে কারণটা সামাজিক খানিক আড়াল করা মঙ্গলজনক। তারপর ভারি চাদর পাতলা ওড়নাটাকে প্রতিস্থাপন করলো, তুমি বললে অতটুকু বিভেদ এক্ষেত্রে দুজনের জন্যেই ভালো। তারপর খুব দ্রুতই মোটা চাদরকে প্রতিস্থাপন করলো ছ’ইঞ্চি দেয়াল বারো ইঞ্চি আঠারো ইঞ্চি করে করে একসময় তা চীনের পাঁচিলের মতো দুর্ভেদ্য উঁচু আর দুর্লঙ্ঘ্য হয়ে গেল। আমরা দুজন চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। তুমি দুর্লঙ্ঘ্য দেয়ালের ওপারে থাকায় জিজ্ঞাসা করা হলো না – কেন এমন করলে, কেন এমন হলো?
-
দুনিয়ায় একটি দুপুর
আমি গ্রিক বলি আর তুমি বলো ল্যাটিন ল্যাটিন তা নিয়েই বাসে উঠি, বাস ওঠে আমার ওপর মিল দিতে আসে যন্ত্রবাঘ, তার গর্র ঘর্ঘর জাকির খান আসেন, তবলা বাজে ধিন তা তা ধিন রোদে ও ছায়ায় বলে একদিন এক কবিতা ছিল এ রকম দুইভাগে, তাতেই আহ্লাদ একদিন হয়েছিল তাতে হাসি পায়, হাসি পায় না, দাড়িগাঙ দিকচিহ্নহীন ছুটে চলে তার সঙ্গে পাল্লা দেয় সুনীলও নিখিলও তুমি কি লাতিং বলো, আর আমি বলে চলি গ্রিং? তোদের কি চিনি আমি, তোরা বুঝি আমাকে চিনিস ডিসকভারি চ্যানেল আপনি আসে, তাতে গোখরো, হিস হিস মন (আয়রনি!) যাবে চিতওয়ানে, সেই যে গো উতরোল র্যাফটিং… সেই যে গো হস্তিপৃষ্ঠ, গণ্ডারটি, বেঁচে থাকা দায় দৃশ্য এসে দৃশ্যে, দৃশ্য দৃশ্যে এসে দৃশ্যে মিশে যায় তুমি কি ওরাঙ বলো, তুমি কি ওটান, বল্ কী তোর খবরতা নিয়েই বাসে উঠব, বাস উঠবে আমার ওপর।
-
অবিরাম ঝরে পড়ো
অবিরাম, অবিরাম মনে পড়ে। অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারার মতো তুমি ঝরে পড়ো নিবিড় আকাশে! আজ স্বপ্নের মতো মনে হয় তোকে! আমের শাখার মুকুলিত সোঁদা গন্ধ মেখে মাতাল হাওয়ায় ভেসে ভেসে একদিন এসেছো হৃদয়, মনে পড়ে? হয়তো পড়ে না মনে। তোমার মনে কি পড়ে আমাদের তীরভাঙা ছোট ছোট ঢেউ! হয়তো সে ভুল স্রোতধারা – ফিরে গেছো বালুচর ছেড়ে! অবিস্মরণ, অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারার মতো তুমিঅবিরাম ঝরে পড়ো অদৃশ্য তিমিরে।
-
সঙ্গজালে ঘেরা খাঁচা
অর্ধচোখ বুজে বসে আছে, ওকে দেখি। গোটানো শরীর জুড়ে মৌনীভাব সুষ্ঠু অভিনয়। নিঃশব্দ চলনে ঢোকে ঘরে, অন্তর্তদন্ত সেরে চলে যায়, অভিজাত হাঁটা। জিভে আঁচড়ে নেয়া শাদা রোম কপালে বাদামি জয়টিকা। ও জানে ও পুরুষবেড়াল। ওর একাকিত্ব আর নির্ভয় ব্যক্তিতা সশব্দ যুদ্ধের আগে মহড়া, প্রস্তুতি দেখে বোঝা যায় অনিবার্য জননেতা, সমস্ত লক্ষণ ওর মধ্যে বর্তমান কোনও সমকক্ষ ওর প্রয়োজন নেই। মানুষই একমাত্র শুধু একাকিত্ব ভীরু অনর্থক সঙ্গজালে ঘেরা তার খাঁচাতার যাপিতজীবন।
-
বিব্রত সংলাপ
তুমি বারবার নতুন কিছু শুনতে চাইলে বোল্লে : ‘আমাকে নতুন কিছু শোনাও’ আমি বোল্লাম : ‘অমাবস্যার পুঞ্জপুঞ্জ অন্ধকার একদল কালো মুখোশ-পরা ডাকাতের মতো শিকার করতে চাইছে শাদা খরগোশের মতো কম্পমান চাঁদটাকে’ তুমি বোল্লে : ‘এর কোনো অর্থ নেই!’ আমি আবার বোল্লাম : ‘তুমি কী শোনোনি তিনটে মাছের আক্রমণে নিহত মাছরাঙা প’ড়ে আছে নদীর ওপারে’ তোমার চোখের তারা অবিশ্বাসে বারবার নেচে উঠলো : ‘এটা একটা প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ঘটনা, হ’তেই পারে না’ আমি এবার একটু উঁচু গলায় : ‘বিশ্বাস করো অরণ্যের অব্যাহত আক্রমণে দারুণ সংকুচিত হয়ে পড়ছে আমাদের শহরগুলো।’ ম্লান হেসে তুমি বোল্লে : ‘ব্যাপারটা বরং উলটো মানুষের হন্তারক হাতের কল্যাণে এ-দেশে পুষ্পল ঋতু আর দেখাই যায় না’ আমি এবার রেগে উঠলাম : ‘তুমি জানো সমুদ্র প্রত্যাখ্যান করেছে আমাদের নদীগুলোকে, তারা ফিরে আসছে তাতার দস্যুর তরঙ্গের মতো আমাদের গ্রাম ও শহরের দিকে।’ হেলায়-ফেলায় তুমি বোল্লে : ‘অমন অলক্ষুণে কথা শুনতেও নেই!’ আমি আবার বোল্লাম : ‘ঐ দ্যাখো হরিণশাবকের তাড়া খেয়ে দিশেহারা ডোরাকাটা বাঘগুলো দিগি¦দিক পালাচ্ছে ছুটে।’ তুমি ম্লান হেসে বোল্লে : ‘এমন সুদিন কখনো কি আসবে?’ বস্টন,…
-
গাব্রিয়েল জাইদের তিনটি কবিতা
অনুবাদ : আবুল মোমেন অনুরূপকে উৎসর্গিত গান অনুরূপ খুবই তৃপ্তিদায়ক! অনুরূপ আবিষ্কার। অনুরূপ পুনরুজ্জীবন। অনুরূপ কী সুস্বাদু! অনুরূপের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলা অনুরূপে নিজেকে পাওয়া। উহ্ অবর্ণনীয় অনুরূপ। সব সময় আমাদের অনুরূপই দিও। টেবিল সূর্য এখানেই ঈশ্বর। হারিয়ে গেছেন নিশ্চিত এক গ্লাস জলের অতলে। এখানেই ঈশ্বর। বাতাস, সূর্য, টেবিল ঈশ্বর নয়। আমার চোখও ঈশ্বর নয়।…
-
প্রত্যহ শবযাত্রায়
তুমি একদিনও ঠিক জেগে উঠছ না, অথচ প্রতিদিন কফিনের ভার নিয়ে আগরবাতির গন্ধমোড়ানো একটা লাশ সমাধিতে রেখে আসছ। ভেবেছ এইসব মৃত আত্মার করুণা নিয়ে তুমি উঠে দাঁড়াবে? কিংবা তোমার ঘন নিশ্বাসের অপেক্ষায় থেকে যারা ইতোমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে তাদের আঙুল কেটে জাগরণ দেবে আর বলবে : দ্যাখো, স্নায়ুর সমস্ত সংবেদনা নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি, ওঠো, এবার…
-
প্রত্যহ শবযাত্রায়
তুমি একদিনও ঠিক জেগে উঠছ না, অথচ প্রতিদিন কফিনের ভার নিয়ে আগরবাতির গন্ধমোড়ানো একটা লাশ সমাধিতে রেখে আসছ। ভেবেছ এইসব মৃত আত্মার করুণা নিয়ে তুমি উঠে দাঁড়াবে? কিংবা তোমার ঘন নিশ্বাসের অপেক্ষায় থেকে যারা ইতোমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে তাদের আঙুল কেটে জাগরণ দেবে আর বলবে : দ্যাখো, স্নায়ুর সমস্ত সংবেদনা নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি, ওঠো, এবার…
-
দুস্থ পদাবলি
লিখি আজ স্মৃতিকথা – অবিস্মৃত দুস্থ পদাবলি, হারানো সন্তানশোকে মুহ্যমান কবিতার পাণ্ডুলিপি কাঁদে! ২. দিন ছিল আলোভরা দিন ছিল কালো তাড়ানিয়া, লুপ্তপ্রায় স্মৃতিগুলি অন্ধকার দীর্ণ করে আজ। ৩. জমজ সন্তান ছিল – সেইদিন শালুমোড়া প্রচ্ছদে শোভিত, বইয়ের তাক থেকে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখত পৃথিবী পৃথিবীর রূপ দেখে ঘরকুনো জমজ কবিতা প্রকাশের ভয়ে ছিল ভীত।…
-
গাছ
এত হিংসা বিদ্বেষের কোন প্রয়োজন হতো এমন রক্তাক্ত ধারাপাত মানচিত্র জুড়ে! যদি মানুষেরা হতো শ্যামল-সবুজ বৃক্ষ বুকভরে তবে ছিল সজীব নিশ্বাস-স্বস্তি। বাগানে যখন দেখি পাতারা আনন্দে লুটোপুটি খায় যে-কোনো বাতাসে, ধর্মবর্ণপরিচয়হীন গাছপালা মানুষ হবে না। তবু গাছের স্বভাব যদি তাদের আত্মস্থ হতো – এমন আশায়হঠাৎ পাতার গন্ধে ভরে ওঠে আমার নির্জন সত্তা গহন রাত্রিতে।
-
মীরার ভজন
খঞ্জ ভিখিরির মতন আমি নিজে দু’হাত বাড়িয়েছি তোমার দিকদিশে; শূন্য পেয়ালায় দু’হাত রেখে, দ্যাখো, আমি কি আরো বেশি শূন্যতারই দিকে পাতিনি বারবার আমার দুটি হাত? খঞ্জ ভিখিরির মতন আগ্রহে দু’হাত বাড়িয়েছি তোমারই দিকে শুধু – আধুলি নয়তো বা একটি সিকি যেন তুল্য প্রতিমান! – তোমাকে দিতে পারি স্বপ্নমহলের সোনার চাবিকাঠি : বুকের খুব কাছে লুকোনো…
