সকল রসের ধারা

সকল রসের ধারা

দেবব্রত চক্রবর্তী

প্যারিসের গ্যালারি পিগালে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনী হলো ১৯৩০ সালে। বিদেশে এই তাঁর প্রথম প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর সাফল্যে অভিভূত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ড থেকে ওই বছরের ২৯ জুন নন্দলাল বসুকে এক চিঠিতে লিখেছেন -
‘আমার ছবিগুলি শান্তিনিকেতন চিত্রকলার আদর্শকে বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এই খ্যাতির অংশ তোমাদের প্রাপ্য। কেননা তোমরা নানা দিক থেকে তোমাদের আলেখ্য উৎসবে আগ্রহে আনন্দে অন্তরে অন্তরে আমাকে উৎসাহিত করেছ। তোমরা রূপকলার প্রাণ নিকেতন ওখানে গড়ে তুললে - এ তো আর্ট স্কুল নয়, এ যে নীড়, তোমাদের জীবন দিয়ে এ রচিত। সেই জন্য এই হাওয়াতে আমার বহুকালের অফলা একটা শাখায় হঠাৎ ফল ধরল।’

Art Camp Activity 2

Art Camp Activity 2



চিত্রী রবীন্দ্রনাথের এই উক্তি আমাদের দেশের চিত্রকলার আন্তর্জাতিক সম্মানকে আমাদের কাছে তুলে ধরে। বহুমুখী প্রতিভায় রবীন্দ্রনাথ চিত্রীরূপে আবির্ভূত হন প্রায় জীবনের অপরাহ্ণে পৌঁছানোর পর। ভারতীয় আধুনিকতা (শিল্পকলার ক্ষেত্রে) ১৯১৯-২০ থেকে শুরু করে এই সময়ে এসেও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এখন আমরা যে-বিশ্বায়নের কথা বলি তা অনেককাল আগে রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন। শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীর পরিকল্পনায় এবং পরে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯১৬ সালের ২২ আগস্ট পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে লিখেছিলেন (জাপান থেকে) - ‘আমাদের নব্যবঙ্গের চিত্রকলার আর একটু জোর, সাহস এবং বৃহত্ব দরকার।’ ওই একই বছর ২৪ আগস্ট অবনীন্দ্রনাথকে ওখান থেকে লিখেছিলেন, - ‘আমাদের দেশে আর্টের হাওয়া বয় নি, সমাজ জীবনের সঙ্গে আর্টের কোনো নাড়ির যোগ নেই।’ ওই সময়ে সমরেন্দ্র ঠাকুরকে লিখেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের আর্ট যদি পুরো জোরে সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে এগোতে পারে তা হলে গভীরতায় এবং ভাব ব্যঞ্জনায় তার কাছে কেউ লাগবে না।... আমাদের আর্টিস্টদের তুলির সামনে অসীম ক্ষেত্র দেখতে পাচ্ছি।’
শান্তিনিকেতনের কলাচর্চার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিশিষ্ট চিত্রী, ভাস্কর, শিল্প-গবেষক এবং ঐতিহাসিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপস্থিত করেছিলেন। ১৯২১ সালে শিল্পবোদ্ধা  এবং ঐতিহাসিক স্টেলা ক্রামরিশ, ১৯২২ সালে ফরাসি শিল্পী (পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট) অাঁদ্রে কারপেলেকে নিয়ে আসেন। কিছুদিন শিল্প-বিষয়ে বক্তৃতা দেন চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজও। ১৯২৪ সালের মে-জুন মাসে রবীন্দ্রনাথ চীন ও জাপান পরিভ্রমণ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি নিয়ে আসেন ভাস্কর লিজা ফন পটকে। এঁর কাছে প্রাথমিক ভাস্কর্যের পাঠ নেন রামকিঙ্কর। পরে ভাস্কর্যের পাঠ দিতে আসেন মার্গারেট মিলওয়ার্ড এবং বের্গম্যান।
ছবি অাঁকতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার করেছিলেন এক আকারের জগৎ। ১৯২৮ সালে (১৩ অগ্রহায়ণ, ১৩৩৫) লিখেছিলেন নির্মলকুমারী মহলানবীশকে - ‘এর আগে আমার মন আকাশে কান পেতেছিল, বাতাস থেকে সুর আসত, কথা শুনতে পেত, আজকাল সে আছে চোখ মেলে রূপের রাজ্যে, রেখার ভিড়ের মধ্যে। গাছপালার দিকে তাকাই, তাদের অত্যন্ত দেখতে পাই - স্পষ্ট বুঝি জগৎটা আকারের মহাযাত্রা।... আবেগ নয়, ভাব নয়, চিন্তা নয় রূপের সমাবেশ।’
সম্প্রতি ‘ক্যালকাটা পেইন্টার্স’ শিল্পী দলের একটি উল্লেখযোগ্য শিল্প-কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সাঁতরাগাছির কোনা এক্সপ্রেস হাইওয়ের ওয়েলকাম গ্রুপের (আইটিসি) ফরচুন পার্ক পঞ্চবটিতে। যার সময়কালের বিস্তৃতি ছিল ২২ থেকে ২৫ মার্চ, ২০১২ পর্যন্ত। এ-কর্মশালায় কলকাতা এবং নতুন দিল্লির আমন্ত্রিত শিল্পীদের পাশাপাশি ছিলেন বাংলাদেশের শিল্পীরাও। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল ২০১০ সালের শুরুতে বাংলাদেশে গিয়ে বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে একটি বড়মাপের শিল্প-কর্মশালায় অংশগ্রহণ এই দলের। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে ‘পথচলা ও সখ্য’ এই শিরোনামে ক্যালকাটা পেইন্টার্সের প্রদর্শনীর সময়কালের বিস্তৃতি ছিল ৫ থেকে ১১ জানুয়ারি, ২০১০ পর্যন্ত। পরে বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে ক্যালকাটা পেইন্টার্সের যোগদান শিল্পশিবিরে। ৬ থেকে ১০ জানুয়ারি নড়াইলের কান্ট্রি সাইড অ্যান্ড গলফ রিসোর্টে মধুমতি আর্ট ক্যাম্প।

Art Camp Activity

Art Camp Activity



ক্যালকাটা পেইন্টার্সের শিল্পীসদস্যরা অর্থাৎ যাঁরা ফরচুন পার্ক পঞ্চবটিতে অংশগ্রহণ করলেন তাঁরা হলেন - অনিতা রায় চৌধুরী, অনিমেষ নন্দী, বরুণ রায়, বিপিন গোস্বামী, ধীরাজ চৌধুরী, দ্বিজেন গুপ্ত, গৌতম ভৌমিক, ঈশা মহম্মদ, নিখিলেশ দাস, প্রদীপ মন্ডল, প্রকাশ কর্মকার, শ্যামশ্রী বসু, শিবপ্রসাদ কর চৌধুরী, শুভব্রত নন্দী, সুব্রত ঘোষ, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুশান্ত চক্রবর্তী, তপন ঘোষ, ওয়াসিম কাপুর এবং আমি। উপস্থিত না থেকে ছবি পাঠিয়েছেন যোগেন চৌধুরী, অমলনাথ চাকলাদার, নীবেস সেনগুপ্ত।
বাংলাদেশের যে-শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - কাইয়ুম চৌধুরী,  রফিকুন নবী, মাহমুদুল হক, তাহেরা খানম এবং ফরিদা জামান। যাঁরা ছবি পাঠিয়েছেন তাঁরা হলেন - সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবদুস শাকুর, বীরেন সোম, হাশেম খান, কনক চাঁপা চাকমা, মাহবুবুর রহমান, মোহাম্মদ ইকবাল, মনিরুল ইসলাম, রনজিৎ দাস, শেখ আফজাল হোসেন প্রমুখ। কলকাতা ও নতুন দিল্লির আমন্ত্রিত শিল্পীরা হলেন - দীপ্তি চক্রবর্তী, মনোজ দত্ত, সন্তোষ ভার্মা, অসিত পোদ্দার, স্বাগতা বোস, ব্রততী মুখোপাধ্যায়, সুহাস রায়, তপন কুমার মিত্র, শুভঙ্কর মৈত্র এবং উমা রায় চৌধুরী। সুহাস আসতে পারেননি, ছবি পাঠিয়ে দিয়েছেন।
রবীন্দ্র জন্মসার্ধশতবর্ষের এই শিল্প-কর্মশালায় প্রকাশিত পুস্তিকার নাম সকল রসের ধারা।
২২ মার্চের উদ্বোধনী সংগীত অদিতি গুপ্তের এবং বেদগান গৌতম ভৌমিকের, সদ্য প্রয়াত বিশিষ্ট শিল্পী বিজন চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, যিনি এই শিল্পী দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন তারিক মহম্মদ আরিফুল ইসলাম (অ্যাক্টিং ডেপুটি হাইকমিশনার বাংলাদেশ), ফরচুন পার্ক পঞ্চবটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর এস দে এবং বিশিষ্ট শিল্পীরা। সম্মান জ্ঞাপন করা হয় শিল্পীদের; তাঁরা হলেন - রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, গণেশ হালুই, শানু লাহিড়ী,  সুহাস রায়, সুনীল দাস, প্রকাশ কর্মকার, উমা সিদ্ধান্ত এবং শঙ্কর ঘোষ।
সমগ্র অনুষ্ঠানের ভাবনায় ধীরাজ চৌধুরী, বরুণ রায় এবং দ্বিজেন গুপ্ত।
২৩ মার্চ শিল্প-কর্মশালা শেষে ‘ক্যালকাটা পেইন্টার্স’ দলের শিল্পীদের দল প্রসঙ্গে নিজস্ব আলোচনা এগিয়ে চলার নানা পরিকল্পনা এবং প্রস্তাবনা।
২৪ মার্চ সন্ধ্যায় এক বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন। ‘শিল্পীদের অন্বেষণে রবীন্দ্রনাথ’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ঈশা মহম্মদ। আলোচনায় অংশগ্রহণে - বরুণ রায়, ঈশা মহম্মদ, ধীরাজ চৌধুরী এবং আমি। সুব্রত ঘোষের রবীন্দ্রভাবনা ও গবেষণা বিষয়ক উপস্থাপনায় স্লাইড শোর মাধ্যমে বক্তব্য তুলে ধরা।

আদি গোলাপ ও তার আদি কবি

আবদুশ শাকুর
গোলাপের লিখিত ইতিহাসে চোখ বুলালে দেখা যাবে - খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তবিংশতি শতকের সারগনের আমলের রাজসমাধিভূমে স্যার লেনার্ড উলির প্রাচীনতম আবিষ্কার-পরবর্তী বেশ কয়েকটি শতাব্দী যাবৎই ফুলটি দলিলবিহীন। তবে ধরে নেওয়া চলে যে, ইরাকি-তুর্কি মাতৃভূমি থেকে হাঁটি-হাঁটি-পা-পা তার জয়যাত্রা শুরু করে জলে-স্থলে বাণিজ্যপথে চলে উদ্যমী পুষ্পটি পৌঁছে গিয়েছিল ক্রিটে, গ্রিসে, আফ্রিকার উত্তরে, মিশরে - সওদাগরি কারোয়ানের সখের সঙ্গিনী হয়ে। এমনি করে হাজার বছর ধরে অলক্ষে পথ চলার পরে অবশেষে গোলাপের দেখা মেলে খ্রিষ্টপূর্ব ষোলো শতকের ক্রিটের দেয়ালচিত্রে আর মৃৎপাত্রের গায়ে অাঁকা ছবিতে।

Wild Spirit

Wild Spirit



খ্রিষ্টজন্মের সাতশো বছর পূর্বের মহাকাব্য ইলিয়াড-ওডিসির দুটিতেই গোলাপের উল্লেখ রয়েছে, তবে বিশেষ গোলাপের নয়, গোলাপবিশেষের - শৈলীগত বাগ্ভঙ্গিমায়, যেমন ‘দ্য রোজি ফিঙ্গার্ড ডন’। তদানীন্তন গ্রিসের স্মির্না বা বর্তমান তুরস্কের ইজমিরবাসী হোমারের বর্ণনায় অ্যাকিলিসের ঢাল ছিল গোলাপখচিত, নিহত হেক্টরের সর্বাঙ্গে আফ্রোদিতি লেপন করেছিলেন গোলাপেরই মলম। প্রেমের অধিষ্ঠাত্রী গ্রিক দেবী আফ্রোদিতি এবং রোমান দেবী ভিনাস, উভয়ের প্রতি উৎসর্গিত পুষ্পটি ছিল অভিন্ন - পাটল বা হাল্কা লাল রঙের অবিকল্প গোলাপ।
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে গ্রিসের লেসবসবাসিনী গীতিকবি সাফোর (খ্রি.পূ. ৬১০-৫৭০) বাণীবন্দনাতেই গোলাপ পুষ্পকুলের রানিরূপে প্রথম অধিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে, বিগত দুই হাজার সাত শতাধিক বছরের ইতিহাসে, এই পৃথিবীতে গোলাপই একমাত্র রাজন্য যিনি তাঁর রাজমুকুটখানি হারাননি - বরং সাম্রাজ্যটিও নিরবধিই বিস্তার করে চলেছেন।
লেসবসের এই কালজয়ী গীতিকবির যে-গানে গোলাপের পুষ্পরানি হিসেবে অভিষেক ঘটেছিল সেটির উদ্ধৃতি দেওয়া গেল সরাসরি গ্রিক থেকে ইংরেজি অনুবাদে :
Song of Rose
‘Would Jove appoint some flower to reign,
In matchless beauty on the plain,
The Rose (mankind will all agree),
The rose the queen of flowers should be;
The pride of plants, the grace of bowers,
The blush of meads, the eye of flowers;
Its beauties charm the gods above,
Its fragrance is the breath of love;
Its foliage wantons in the air,
Luxuriant like the flowing hair;
It shines in blooming splendour gay,
While Zephyrs on its bosom play.
Translation : F. Fawkes
আরেকটি ইংরেজি অনুবাদ :
For Zeus chose us a king of the flowers in his mirth,
He would call to the rose, and would royally crown it;
For the rose, ho, the rose! is the grace of the earth,
Is the light of the plants that are growing upon it!

For the rose, ho, the rose! is the eye of the flowers,
Is the blush of the meadows that feel themselves fair,
Is the lightning of beauty that strikes through the
bowers
On pale lovers that sit in the glow unaware.

Ho, the rose breathes of love! ho, the rose lifts the cup
To the red lips of Cypris invoked for a guest!
Ho, the rose having curled its sweet leaves for the
world
Takes delight in the motion its petals keep up,
As they laugh to the wind as it laughs from the west.

আর্কেয়িক গ্রিস ও ক্ল্যাসিক্যাল গ্রিসের যুগসন্ধিক্ষণিক গীতিকবি সাফোর এ-গান যত পড়ি তত ভালো লাগে এবং ততবারই মনের গহনে দুটি প্রশ্ন জাগে : কী গোলাপ দেখে প্রাচীন এই গ্রিক কবি এমন উচ্ছ্বসিত গোলাপ-প্রশস্তি লিখে ফুলের সিংহাসনে গোলাপকে চিরস্থায়ী করলেন এবং নিজেও গোলাপের মতোই নিত্যউদ্ধৃত রইলেন? তাঁর দেশ ও কালের খ্যাতিমান অন্য কবি কি সে-গোলাপ দেখেননি?
প্রথম প্রশ্নটির জবাব। এককালের এশিয়া মাইনরের অংশ লেসবস দ্বীপে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে সাফো দেখেছিলেন সম্ভবত পাঁচ-পাপড়ির সহজ-সরল বিনম্র সুন্দর ওয়াইল্ড রোজ বা বন্য গোলাপ, যে আপন খেয়ালে নিজে নিজে ফোটে - কি অরণ্যে কি উদ্যানে, যাকে ব্রিড করে কেউ ফোটায় না। বন্য অভিহিত এই গোলাপ প্রাকৃতিক উদ্ভিদবিশ্বের সুন্দরতম অংশটি। এর বৈজ্ঞানিক ও প্রায়োগিক নাম স্পিশিজ রোজ।
কেউ ফোটায় না বলেই বর্তমান বিশ্বে ওয়াইল্ড বা স্পিশিজ-রোজের টাইপ মাত্র একশ, যেখানে ব্রিড-রোজের ভ্যারাইটি প্রায় তিন হাজার। প্রাকৃতিক এই আদিম গোলাপের পাপড়ির সংখ্যা সর্বোর্ধ্ব পাঁচ, কদাচিৎ চারও দেখা যায়। কিন্তু পাঁচের বেশি দেখলেই বুঝতে হবে ওটা নির্ভেজাল আদিম নয়, ব্রেড-রোজ বা কৃত্রিম গোলাপ। মাত্র পাঁচটি পাপড়ি আনুভূমিক থাকে বলে একমাত্র এই বন্য গোলাপেই গোলাপের প্রতিটি পাপড়ির পূর্ণ রূপ একনজরে দর্শন ও রসাস্বাদন সম্ভব হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের কবি অ্যানাক্রিয়নের স্তবগানে গোলাপের ধরাধামে আবির্ভাব বর্ণিত হয়েছে সবিস্তারে - যেমন কীভাবে প্রেমদেবী আফ্রোদিতির সমুদ্র থেকে অভ্যুত্থানের অভিঘাতপ্রসূত শুভ্র সমুদ্রফেনা থেকে অভ্যুদয় ঘটেছিল তাঁর যোগ্য প্রতিনিধি গোলাপের। এ কবির দেখা গোলাপও ছিল প্রাকৃতিক, বৈজ্ঞানিক মূল্য সংযোজিত নয়।
সাফো এই ন্যাচারাল স্পিশিজ রোজ বা প্রাকৃতিক বন্য গোলাপ ছাড়া কোনো কালচার্ড বা কাল্টিভার রোজ দেখেননি। কারণ রোজ-কালচারের সূচনাই হয় সাফোর কাল থেকে দেড় হাজার বছর পরে, সেও তাঁর দেশ থেকে বহু হাজার মাইল দূরে - দূরপ্রাচ্যের সুদূর চীনদেশে। তাঁর উপমহাদেশ ইউরোপে কাল্টিভার রোজ বা বর্ণ-সংকর গোলাপের চর্চা শুরু হয় সাফোর সময়ের আড়াই হাজার বছর পরে।
জাপানি উদ্ভিদবিদ মিকিনোরি ওগিসু তাঁর মাই ওয়ার্লড অফ প্লান্টস-নামক গ্রন্থে লিখেছেন : চীনদেশের জনগণ প্রকৃতি-সৃজিত প্রাচীন গোলাপের সংকরায়ণ-পদ্ধতি শিখে কাল্টিভার বা মনুষ্য কর্তৃক মূল্য-সংযোজিত আধুনিক গোলাপের উদ্ভাবন ও উৎপাদন করে আসছেন হাজার বছর আগে থেকে, যেখানে ইউরোপ-আমেরিকায় কাল্টিভার রোজের ইতিহাসের বয়স মাত্র শ-দুয়েক বছর।
প্রতিটি রাজবংশেই চৈনিক বিবুধমন্ডলী মনমাতানো সৌরভময় বন্য গোলাপের সৌন্দর্যে আবিষ্ট ছিলেন। কাব্যে কেবল গোলাপেরই গান গাইতেন তাঁরা। আজ সেসব কবিতা পড়েই আমরা বুঝতে পারি সেকালের জনগণ কেমন বিমোহিত ছিলেন অনাড়ম্বর সেই প্রাকৃতিক গোলাপের মনোহর পারিপাট্য দেখে। সং-বংশের রাজত্বকালের (খ্রি. ৯৬০-১২৭৯) মহৎ কবি চেন কানজেং কর্তৃক আদিম গোলাপ উৎকীর্তিত হয়েছে বিশ্বের সমস্ত পুষ্পের চেয়ে বেশি রোমান্টিক বলে। উত্তর চীনের সং-ডিন্যাস্টিতে গোলাপের সম্মানে অন্যান্য অনেক স্বনামধন্য উদ্ভিদকেই অনেক জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে।
চীনের জিয়াংসু প্রদেশের ফরেস্ট্রি অ্যাকাডেমির প্রফেসর ওয়াং গুয়োলিয়াং তাঁর ত্রিশ বছরের গবেষণার ফসল ‘হাজার বছর আগের চাইনিজ সং ডিন্যাস্টির প্রাচীন গোলাপ’ শীর্ষক একটি মিমিয়োগ্রাফে বলেছেন যে, চীনের প্রাকৃতিক গোলাপের বৈচিত্র্য এবং সৌন্দর্য এখনও তাঁকে স্তম্ভিত করে। মিমিয়োগ্রাফটিতে তিনি চীনের শাংরিলা ডিস্ট্রিক্টের আদিম গোলাপ আর রোজ-কাল্টিভেশনের সুদীর্ঘ ইতিহাস-সমৃদ্ধ প্রাচীন গোলাপের কিছু নির্বাচিত ভ্যারাইটি নিয়ে চাঞ্চল্যকর আলোচনা করেন।
আলোচনার ফোরামটি ছিল ‘ম্যানহাটন রোজ সোসাইটি’ কর্তৃক এই ‘প্রাকৃতিক গোলাপ’-বিশেষজ্ঞের সম্মানে আয়োজিত ‘ডিনার উইথ ডক্টর ওয়াং গুয়োলিয়াং’। এই ইভেন্ট থেকেই আমি জানলাম : গোলাপবিশ্বের প্রবীণ ও নবীন দুই নেতা চীন ও যুক্তরাষ্ট্র প্রাকৃতিক গোলাপের প্রতি এখনও কত গভীরভাবে উৎসাহী। জানলাম ‘ম্যানহাটন রোজ সোসাইটি’র ‘স্কাইস্ক্রেপার্স অ্যান্ড রোজেস’-নামক নিউজলেটারে প্রকাশিত ইভেন্টটির ওপর দীর্ঘ প্রতিবেদন থেকে।
ভেবে বিস্মিত হলাম যে যুক্তরাষ্ট্র গোলাপ বানানোতেও বোমা বানানোর মতোই পারদর্শী। এ কারণেই বাকি বিশ্ব কর্তৃক উদ্ভাবিত গোলাপের নিবন্ধনও করতে হয় ‘আমেরিকান রোজ সোসাইটি’ কর্তৃক প্রবর্তিত ও পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল চেকলিস্টে। প্রযুক্তির প্রতীক স্কাইস্ক্রেপার্সের সঙ্গে প্রকৃতির প্রতীক গোলাপের এই মেলবন্ধন সর্বগ্রাসী বিভ্রান্তির চলমান এই কালটিতে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে।
কদাচিৎ সাদা দেখা গেলেও বন্য গোলাপ সাধারণত আরক্ত বর্ণ বা পাটল রঙেরই হয়। বরং ‘গোলাপি রং’ কথাটি সাফো-বর্ণিত সেই প্রাকৃতিক গোলাপেরই সৃষ্টি। যে-কোনো মিশ্র রঙে গোলাপি আভা বর্ণনাটাও আদিম গোলাপেরই অবদান, যেমন - গোলাপি লাল, গোলাপি বেগুনি।
এই না-শুঁকে পাওয়ার মতো সুরভি-বিলানো প্রাকৃতিক গোলাপ আজ সবার বাগান থেকেই নির্বাসিত। অথচ ওয়াইল্ড রোজ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো সকল বড় মহাদেশেরই নেটিভ। এশিয়া-ইউরোপের সহজাত গোলাপগুলির কথা আমার গোলাপনামা গ্রন্থে সবিস্তারে বলা হয়েছে। এখানে তাই শুধু আমেরিকার কিছু প্রাকৃতিক গোলাপের উল্লেখ করছি।
যেমন ইস্ট কোস্টের রোজা ক্যারোলাইনা, রোজা পালুস্ট্রিস বা সোয়াম্প রোজ (ক্যারোলাইনার মতো এটাও শ্রাবরোজ), রোজা আরকানসানা বা প্রেইরি রোজ (মধ্য-যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয়), রোজা ভার্জিনিয়ানা বা ভার্জিনিয়া রোজ, রোজা উড্সি বা উডস ওয়াইল্ড রোজ (রকি মাউন্টেন রোজ), রোজা নুটকানা বা নুটকা রোজ (এর নিবাস প্যাসিফিক কোস্টের আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত)।
একই মৌসুমে বারবার ফোটার আধুনিক গোলাপ উদ্ভাবনের পর বাগানে প্রাকৃতিক গোলাপের জনপ্রিয়তা হ্রাসের এক কারণ তো এর বছরে কেবল একটিবার ফোটা, তাও মাত্র দুসপ্তাহের জন্য।
কিন্তু প্রাকৃতিক গোলাপের নিরিবিলি সৌন্দর্য তো অবিকল্প। মনে মনে ‘ওয়াইল্ড চাইল্ড’, অথবা ‘ওয়াইল্ড স্পিরিট’-নামক নীরব সৌন্দর্যের পাঁচ-পাপড়িবিশিষ্ট সিঙ্গলরোজের সঙ্গে শতাধিক পাপড়ি সংবলিত হাইব্রিড-টি রোজ ‘বেলিন্ডা’জ ড্রিম’ বা ‘কোয়ায়েটনেস’-এর সরব ঐশ্বর্যের পার্থক্যটা পরখ করে বুঝে নিন।
উদ্যানের ল্যান্ডস্কেপশিল্পীগণ তাই এশিয়ার জাপান-কোরিয়া-চায়নার ওয়াইল্ড রোজ রুগোসার সঙ্গে ক্রসব্রিডিংয়ের মাধ্যমে সিঙ্গল-ব্লুমিং বন্য গোলাপকে রিপিট-ব্লুমিং রোজ বানানোর চেষ্টায় কিছুটা সাফল্য অর্জন করে সুন্দর একটি ভিন্ন রূপের গোলাপ পেয়ে যথাযোগ্য নাম দিয়েছেন ‘নিয়ারলি ওয়াইল্ড রোজ’।

এবার দ্বিতীয় প্রশ্নটির জবাব দেওয়া যাক - গীতিকবি সাফোর দেশ ও কালের খ্যাতিমান অন্য কোনো কবি কি সে-গোলাপ দেখেননি? যে-গোলাপ সাফো দেখেছিলেন? যেমন তাঁর সমসাময়িক কবি আলসিউস? যিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন সমকালীন রাজনীতিক ডামাডোল নিয়ে লিখে? আসলে যার যা দেখার তিনি তাই দেখেছেন। রোমান্টিক প্রকৃতির ইন্দ্রিয়সেবী গীতিকবি সাফো মানুষের দলাদলির বদলে গোলাপের ঢলাঢলি দেখেছেন। যেমন দেখেছেন পারস্য কবি ওমর খৈয়াম (খ্রি ১০৪৮-১১৩১)। তিনিও গোলাপ নিয়ে মাতামাতি করেছেন, কোনো কাল্টিভার রোজ দেখে নয়, একমাত্র প্রাকৃতিক গোলাপ দেখে, যা নিরুচ্চার সরল সৌন্দর্যের এক চিরন্তন প্রতীক।
সোচ্চার জটিল সৌন্দর্যের গোলাপ নিয়ে প্রথম কাব্য রচনা করেছেন সম্ভবত চীন দেশের সং-বংশের রাজত্বকালের কবিকুল, যাঁদের দেশে তাঁদের কালের আগে থেকেই প্রকৃতির কাজে হাত লাগিয়ে সংকর-প্রজনকগণ single গোলাপের বহুগুণ বেশি পাপড়ি সংবলিত একালের semi-double, double, full, very full ইত্যাদি সংজ্ঞায়িত গোলাপের জটিল সৌন্দর্য সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন।
ওমর খৈয়ামের কবিতাকে প্রমথ চৌধুরী বলেছেন :
‘ফুলের মতো ফুটে ওঠা দর্শন, যেমন হালকা যেমন ফুরফুরে, তেমনি সুন্দর তেমনি রঙিন। এর প্রতিটি হচ্ছে ইরানদেশের গোলাপ। এ গোলাপের রঙের সম্বন্ধে ওমর জিজ্ঞাসা করেছেন,
‘দীর্ণ-হিয়া কোন্ সে রাজার
রক্তে নাওয়া এই গোলাপ -
কার্ দেওয়া সে লাল্চে আভা,
হৃদয়-ছ্যাঁচা শোণিত-ছাপ’।
ওমরের কবিতার রস গোলাপফুলের আসব, সে রস পান করলে মানুষের মনে গোলাপি নেশা ধরে...।’
যেমন কান্তি ঘোষের অনুবাদে :
সদ্য ফোটা এই যে গোলাপ, গন্ধ-প্রীতি-উজল মুখ,
বল্ছে না কি - মিথ্যা এ সব, এই ক্ষণিকের দুঃখ সুখ।
পৃথ্বী-বুকে উঠছে ফুটে গর্বে পরি’ রঙিন সাজ -
- পাপড়ি টুটে ছড়িয়ে মোদের জীবন-রেণু পথের মাঝ।
ঐহিক প্রেমী ওমরের, কান্তি ঘোষের অনুবাদে যিনি বলেন ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও,/ বাকীর খাতায় শূন্য থাক্/ দূরের বাদ্য লাভ কি শুনে?/ মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক’, নগদ চাহিদার তালিকায় গোলাপের বাইরে আছে শুধু একটি ‘দিওয়ান’ মানে একটি কাব্যগ্রন্থ। যেমন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অনুবাদে :
বনচ্ছায়ায় কবিতার পুঁথি পাই যদি একখানি
পাই যদি এক পাত্র মদিরা আর তুমি যদি রাণী
সে বিজনে মোর পার্শ্বে বসিয়া গাহো গো মধুর গান
বিজন হইবে স্বর্গ আমার, তৃপ্তি লভিবে প্রাণ।

এই কবিতার পুঁথিখানিও আমার মতে কেবল একটি শৈলীর, তথা গজল-নামক গীতিকবিতার - যা সুর সহযোগে শ্রাব্য। উল্লেখযোগ্য যে ফারসি গজল রচনার সূচনা বস্ত্তত জ্যোতির্বিদ কবি এই ওমর খৈয়াম থেকেই। আজ পর্যন্তও ফারসি কাব্যের শ্রেষ্ঠতম ফসল গজল। বলা হয় : ‘পারস্য হয়ে ভারতবর্ষে আগত মুসলমানদের শ্রেষ্ঠতম উপহার তাজমহলের পরে গজল’।
আসল কথা কাব্যজগতের ঐহিক প্রেমের একমাত্র ঘরানা গজলই মেলে পুষ্পভুবনের জাগতিক প্রেমের একমাত্র সখী গোলাপের সঙ্গে। গজলের প্রতিটি দ্বিপদী সার্বভৌম একটি শব্দার্থগত সত্তা, একটা আলাদা কবিতা। তেমনি প্রতিটি গোলাপও যেন স্বতন্ত্র একটি নন্দনতত্ত্বগত সত্তা, জনৈকা অন্যরূপা নায়িকা।
সম্ভবত এ-কারণেই গোলাপবাগানে কর্মরত আমি অন্যমনে আস্ত একটি বাক্য উচ্চারণ করে ফেলেছিলাম একদিন, ‘দেখি না তো গোলাপের কোলাহল রমণীর দলে’ - যখন যৌবনবতী একদল সহকর্মীপত্নী হই হই করতে করতে বাগানে ঢুকে আমাকে ঘিরে ধরেছিল গোলাপের জন্য। পাঁচটি গোলাপ পাঁচটি হাতে দেওয়ার সময়ও দেখলাম যে গোলাপগুলোর রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণের বৈচিত্র্যের কোলাহল এই পাঁচ রমণীর দলে মোটেই নেই। থাকবে কী করে? নারীর রূপ তো কেবল ত্রিমাত্রিক, প্রতিপক্ষে গোলাপের জৌলুস যে বহুমাত্রিক।
আসলে আমি তখন চারপাশের বিচিত্র সব গোলাপের রূপের, রসের, বর্ণের, গন্ধের একটা কোলাহলের মাঝখানেই দাঁড়িয়েছিলাম এবং সুন্দর সুন্দর নামধারী নানা প্রকারের আধুনিক গোলাপ চারপাশ থেকে আমার সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছিল একের পর এক।
‘ক্রিশ্চান ডিয়র’ ডেকে বলে : আমি অনিন্দ্যসুন্দর। বললাম, সৌরভ তো নেই তোমার। অমনি কলকলিয়ে ওঠে ‘এনা হার্কনেস্’ - সুরভি আমার অপার। বললাম, বাঁধুনি তোমার বড়ই আলগা। হেঁকে ডাকে দূর থেকে ‘প্রেশাস্ প্ল্যাটিনাম্’ - দ্যাখো আমার কেমন ঠাসবুনট। বললাম, তুমি-যে বেজায় কঠিন; ঠিক ইরানি রমণীপ্রায়; পাপড়ি খোলা সত্যি দায়। সুদূর থেকে ‘ক্রিম্সন্ গ্লোরি’ বারতা পাঠায় সুবাস সহকারে - আমি ছিমছাম পেলবমসৃণ কিনা, একটু হাত বুলিয়ে দেখতে পার না? বললাম, গঠন তোমার মনোহরণ ঠিকই, তবে পাঞ্জাবি নারীর মতনই ক্ষণস্থায়ী।
এসব শুনে বুঝি ক্ষেপেই যায় বাগানের গোটা দলটি, খলখলিয়ে ওঠে একই সঙ্গে সকলে - [আমি বহুরঙ্গিণী ‘মাস্কারেড্’, টিনসেল-টাউনের শাবানা আজমির মতো। আমি বলিউডের ‘রেখা’র মতো কেতাবি গঠনের ‘কর্ডেস্ পার্ফেক্টা’। আমি ‘রাম্বা’ যাকে বলে ডান্সিং-রোজ, নৃত্যপটিয়সী মমতাশঙ্করের মতো। মমতাজমহলের মতো ঘাগরা-পরা ‘ফ্রেগ্র্যান্ট্ ক্লাউড্’ আমি। আমি শাশ্বত বাংলার নববধূর মতো ঘোমটা-ঢাকা ‘প্রিন্সেস’। ‘এভেন্জেলিন্ ব্লুস্’ বলে ডাকে আমাকে সকলে - যদিও গোলাপের গোত্রে আমিই কেবল বাংলার নায়িকাশ্রেষ্ঠা ‘সুচিত্রা সেন’, যার বয়েস যত বাড়ে রূপরসও ততই বাড়ে।]
বুঝলাম যে এ এক মহান সমস্যা, রভসের এই মহোৎসবে। কেবল ফর্মের লোভেই কি অাঁচল ধরে বসে থাকব প্রিয়দর্শিনী ‘মালা রুবিনস্টিনে’র? কী করে কাটাব ঘোর সৌরভের, রক্তলাল ‘ক্রাইস্লার ইম্পিরিয়্যালে’র? না কি রোখা যাবে দূরবর্তী ওই গ্রীবা বাড়িয়ে মুখিয়ে থাকা গোলাপি-গোলাপ ‘সেঞ্চুরি টু’র মলিন নিবেদনের করুণ আকর্ষণ? ওপাশের খরযৌবনা এপ্রিকট্ রঙের ‘লেডি এল্গিনে’র তো খোলা নিমন্ত্রণ, সান্নিধ্যের অধীরতা যার প্রস্ফুটনের প্রমত্ত ধরনেই সোচ্চার। অন্তরঙ্গ সঙ্গ পাওয়ার তর তার সইবে না যে মোটেও, বিকেল খোয়ালেই ফেটে পড়বে সে উষ্মায়; আর রাতটি পোহালে তো ঝরেই পড়বে হতাশায়। তাহলে উপায়?
ওদিকে অদূর-শয্যায় রূপসী ‘ডাচগোল্ড’ তার সর্ব অঙ্গে সোনালি হলুদ মেখে তারিয়ে তারিয়ে চারিয়ে চলেছে ফুলশয্যার নেশাই। আবার র্যাচকুয়েল্ ওয়েল্শের লোভনপ্রবণ দেহধারিণী বেগনিরানি ‘লেডি এক্স’ কি কুল্লে বেরসিক বলেই তিরস্কার করবে না আমাকে এই মর্মে যে, খেমটানাচুনি নই বলে ম্যাজেন্টার স্নিগ্ধতা বুঝি ধমনীর পিনাকেতে সেক্স্যাপিলের ধিনাকেটে বোল্ তোলে না? শুনে বলবে ‘ব্লু মুন’ : ধরায় না কি ধূম্রধূসর ধূমল বরণ আমার, একান্ত আসঙ্গের গন্ধমদির নেশা? একটুখানি ঘোমটা তুলে বলে উঠবে আরেক জন : গভীর কমলা বলেই কি ‘সুপারস্টারে’র গুণ্ঠিত সৌষ্ঠব কুণ্ঠিত থেকে যাবে - উগ্ররাতুল ‘ক্যানেস্টা’র লোভনসঙ্কুল ফুটনের এই রমিত রঙ্গনে?
কোলাহলে হতভম্ব হলেও অস্বীকার আমি করতে পারছিলাম না যে, গূঢ় আবেদনের বিচারে কুহকিনী গোলাপ তো রহস্যময়ী রমণীর সকল শ্রেণিরই বিকল্প হতে পারে। এমনকি নারীতে অলভ্য, তেমন অনেক শ্রেণিরও রূপ পরিগ্রহ করতে পারে গোলাপ। তাছাড়া পরিপার্শ্বের অন্তঃসারশূন্য তৎপরতার ক্লান্তিকর হল্লা থেকে গোপনে সরে গিয়ে নিজের ভিতর বসবাস করি বলে, নিভৃত-নির্জন জীবনটিকে ভরে তোলার জন্যেই তো গোলাপের শরণ নিয়েছিলাম আমি।
নারীর অভাবও অন্যতম কারণ আমার নির্জনতার। বস্ত্তত অভাব আমার নারীর নয়, নায়িকার; যিনি চিরায়ত প্রেমিকের শাশ্বত প্রেমাস্পদা। গোলাপসুন্দরী সত্যি কিন্তু সেই চিরন্তনী নায়িকা-লক্ষণা। নায়িকার যত লীলা, যত মহিমা, সংবেদিতা, বিচিত্রমর্মিতা, নিত্যনবতা, রঙ্গপ্রবণতা, রহস্যপ্রিয়তা, লাজুকতা, নাজুকতা, বর্ণাঢ্যতা, দুর্বোধ্যতা, হাস্য-লাস্য সবই-যে লভ্য এক গোলাপেরই কাছে।
একসময় হয়রান হয়ে ভাবলাম, হায়! গোলাপজগতের এই আধুনিকাদের রূপবৈচিত্র্য আর হাস্যলাস্যের ভাবলীলা যদি সাফো দেখতে পেতেন তাহলে নিশ্চয় গানে গানে গোলাপধোলাই করে দিতেন আজকের এই নোংরা জগৎটাকে। প্রতিটি জগদ্বাসী পেত গোলাপি সুরভিঋদ্ধ মনের মতো একটি নিলয়।
হাঁ, যা বলছিলাম। গজলের প্রতিটি দ্বিপদী সার্বভৌম একটি শব্দার্থগত সত্তা, একটা আলাদা কবিতা। তেমনি প্রতিটি গোলাপও যেন স্বতন্ত্র একটি নন্দনতত্ত্বগত সত্তা, জনৈকা অন্যরূপা নায়িকা।
এজন্য আমার মনে হয় - প্রতিটি গোলাপ যেন একটি গজল। আবার প্রতিটি গজল যেন একটি গোলাপ। পুষ্পের ভুবনে যেমন কেবলমাত্র গোলাপই দৈহিক প্রেমের অবিমিশ্র প্রেরণা, কাব্যের জগতেও তেমনি কেবলমাত্র গজলই শরীরী প্রেমের অবিমিশ্র অভিব্যক্তি - তবে কেবল অপুরস্কৃত প্রেমের। কিন্তু যত পুরস্কারহীনতার হাহাকারই হোক না কেন গজল, তার কাঙ্ক্ষিত প্রতিদান অবশ্য ইন্দ্রিয়জ বাসনারই। গোলাপও এমনি ইন্দ্রিয়জ বাসনারই প্রতীক।
তেমনি ইন্দ্রিয়জ কামনার প্রতিমূর্তি গীতিকবি সাফোই তো হবেন গোলাপের সমঝদার, গাইবেন গোলাপের গান। যেমন তাঁর রাজনৈতিক গোলযোগপূর্ণ কালের অন্য কবি লিখেছেন রাজনৈতিক প্রলাপের কথা।

কে ছিলেন এই নারী? মহামতি সক্রেটিসেরও (খ্রি.পূ. ৪৭০-৩৯৯) ১৪০ বৎসর পূর্বেকার, মহাকবি হোমারের খ্রি.পূ. সপ্তম শতক ছোঁয়া - অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮ শত বৎসর পূর্বকালের জীবনধারিণী? নানাবিধ বিষয়ে ইতিহাস সৃষ্টিকারিণী? কী তাঁর পরিচয়?
তিনি ছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের গ্রীসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র লেসবস দ্বীপবাসিনী। বিত্তবান সারকাইলাসের স্ত্রী সাফো জীবনের যাপনে চলনে বলনে ছিলেন জনৈকা সম্ভ্রান্ত ‘অ্যারিস্টোক্র্যাট’। তাই তিনি চলতে পারতেন যেমন খুশি তেমন। ছিলেন সহজাত গীতিকবি এবং নিবেদিতচিত্ত শিক্ষয়িত্রী। পরিচালনা করতেন লেসবসের প্রধান শহর মিটিলিনে নিজের প্রতিষ্ঠা করা অবিবাহিতা মেয়েদের ‘থিয়াসস’, মানে বিশেষ গোষ্ঠীর ট্রেনিং-অ্যাকাডেমি।
তাঁর ছাত্রী হিসেবে দূর দূর থেকে আসা কুমারীদের সঙ্গে কবিতা লেখা, আবৃত্তি করা ছাড়াও নিত্য মিথস্ক্রিয়াতেই কাটত সাফোর প্রতিটি দিন। (এঁর আদলেই তো সক্রেটিসের দিন কাটত ছেলেদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াতে। অতএব এ-ব্যাপারে সক্রেটিসকে সাফোর ভাবশিষ্য ভাবা যায় না কি?)।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিতে তাদের ছিমছাম ফিটফাট অর্থাৎ সন্মোহক করে গড়ে তুলতেন সাফো, সম্ভবত আসন্ন বিবাহের জন্য। ‘আনওয়েড’ ছাত্রীদের সঙ্গে এই শিক্ষিকার অন্তরঙ্গতা এতখানি বেড়ে যেত যে বিদায়কালে প্রত্যেককেই একটি করে ‘ওয়েডিং সং’ লিখে দিতেন তিনি। গানগুলোর কাব্যভাষা হতো ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশে খোলামেলা, যেমন :
Please
Come back to me, Gongyla, here tonight,
You, my rose, with your Lydian lyre.
There hovers forever around you delight :
A beauty desired.
Even your garment plunders my eyes.
I am enchanted : I who once
Complained to the Cyprus-born goddess,
Whom I now beseech
Never to let this lose me grace
But rather bring you back to me :
Amongst all mortal women the one
I most wish to see.
—Translated by Paul Roche

To Andromida
That country girl has witched your wishes,
all dressed up in her country clothes
and she hasn’t got the sense
to hitch her rags above her ankles.
—Translated by Jim Powell

হোমারের মতো দেবতাকে সম্বোধন নয়, মহাকাব্যিক বয়ানও নয়; সাফোর কবিতায় ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির কথা, ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তির বারতা - সবই ব্যক্তিগত প্রেমবিষয়ক। গীতিকবিতার ইতিহাসে এটা প্রথম ঘটে সাফোর লিরিকেই। তিনি গান লিখতেন এবং সুর দিতেন ‘লায়ার’ বা বীণা বাজিয়ে সোলো গাওয়ার জন্য। গীতিকবিতার Lyric নামকরণ হয় সাফোর Lyre থেকেই। লিরিকের জন্য নিজস্ব একটি ছন্দও উদ্ভাবন করেছেন এই কালজয়ী লিরিসিস্ট, যেটি ‘সাফিক মিটার’ নামে প্রচলনে এসে অব্যবহিত পরবর্তী গীতিকবিদের ওপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিল। নীলনয়না রূপসী Sappho-র দৃষ্টান্তেই ‘নীলকান্তমণি’-নামী প্রেশাস স্টোনের নামকরণ হয় Sapphire।
সাফো তাঁর প্রয়াণ-পরবর্তী দুশো বছর সাফার করেন তাঁর তথাকথিত সমকামিতার রটনায়। তবু খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় শতকে তাঁর নয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার প্রথম কারণ হোমারিক ও অ্যাট্টিক গ্রিক ভাষার উত্থান ও জটিল লেসবিয়ান তথা ইয়োলিয়ান আঞ্চলিক ভাষার পতন - যে আঞ্চলিক সুরেলা ভাষায় সাফো গান লিখতেন। তাঁর কাব্যভাষা ছিল আন্তরিক আঞ্চলিক, আনুষ্ঠানিক সাহিত্যিক নয়।
দ্বিতীয় কারণ কবি অ্যানাক্রিয়ন কর্তৃক আনীত সমকামিতার অভিযোগে তাইতিয়ান-নামক চার্চম্যানের আদেশে ১৪১ খ্রিষ্টাব্দে সাফোর পান্ডুলিপি ধ্বংসকরণ। তেমনি ‘কামোদ্দীপক’ জ্ঞান করে সাফোর ভক্তদের স্মৃতিবাহিত বাকি কবিতাগুলোও ১০৭৩ সালে পোপ গ্রেগরির নির্দেশে দাহন হলো তৃতীয় কারণ।
আবার তার অনেকখানি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় অক্সিরাইনচুস -স্তূপের প্রাচীন রাবিশের মধ্যে পাওয়া ইজিপ্সিয়ান প্যাপিরাসের টুকরা-টাকরা থেকে, ১৮৯৮ সালে। এই অন্ত্য উনিশ শতকের ভিক্টরীয় রক্ষণশীলতার চূড়ান্ত পর্বের ইংল্যান্ডে নারীসমাজের সমকামিতার পরিভাষা হিসেবে ব্যবহারে চলে আসে Lesbian ও Sapphic শব্দ দুটি এবং সেখান থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে স্থায়ী হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ ইউরোপিয়ান রেনেসাঁসের পর থেকে ‘বৈকৃতকাম’ নারী সাফোর আদৃতি ও উদ্ধৃতি দিন দিন ‘বিপজ্জনক’ হারে বেড়ে চলা।
বেড়ে চলার কারণ তাঁর গীতিকাব্যের প্রতি কণিকার ধ্বনিমাধুর্য ও মোহগ্রস্তকর প্রসাদগুণ। রচনাশৈলীর নিহিত কাব্যবোধের সূক্ষ্মতা ও গভীরতার জন্য রোমাঞ্চকর এ-কবি সর্বকালেই সাদরে উদ্ধৃত। বস্ত্তত তিনি বেঁচেও আছেন কেবল ব্যাপক উদ্ধৃতির মাধ্যমেই। তাঁর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব পাঠকদের মধ্যে মুগ্ধবিস্ময় সৃষ্টি করে, যা তাঁর কাব্যের সর্ব অঙ্গেই অনুভবনীয়। সাফোর কাব্যভাষায় আছে তাঁর জন্মস্থান ইয়োলিয়ার লৌকিক বাকপ্রপঞ্চ আর হোমারীয় মহাকাব্যিক শব্দস্পন্দের রেশঋদ্ধ কবিপ্রসিদ্ধির ঐশ্বর্য।
তাঁর শব্দ নির্বাচন ও বিন্যাস ছিমছাম, প্রকাশ ঋজু, বর্ণময় এবং সর্বোপরি চমকপ্রদ। নিজের রচনা থেকে তফাতে দাঁড়াতে পারেন সাফো। সেখান থেকে নিজের ভাবাকুলতা ও বেদনাতুরতার বিচার করতে পারেন নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিজনিত দোষগ্রাহীতার সঙ্গে। সারকথা : অবিক্ষুব্ধ ও সুশান্ত মুহূর্তে স্মরিত হলেও তাঁর কাব্যাশ্রিত উদ্দাম আবেগ জোর হারায় না আদৌ। সাফোর বিদ্যায়তনের কুমারীদের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় প্রধান তৎপরতা ছিল নাচ, গান, আবৃত্তি এবং ক্ষেত্রবিশেষে দাম্পত্যজীবনের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ‘সিমিউলেশন’ কিংবা কপট অভিনয়।
সাফোর কবিতার ভরকেন্দ্র বরাবরই প্রেমানল। এই প্রেম ছিল প্রায়শই তাঁর অ্যাকাডেমির নারীসম্প্রদায়ের প্রেমোদ্দীপ্তকর সমলৈঙ্গিক কামকেলি দ্বারা প্রাণিত, স্থানকালের দূরত্বে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকাদের বিহবলকর বিরহযাতনা কর্তৃক উদ্দীপিত। এই প্রেম ছিল এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী আফ্রোদিতির প্রণোদনায় তাড়িত শক্তির কবল থেকে নিতান্তই নিষ্কৃতিহীন। প্রেমের প্রতীকী এই দেবীটি ছিলেন গোষ্ঠীটির প্রেরণা। প্রেমের দেবী এবং মানবীদের মধ্যস্থস্বরূপিণী ছিলেন গীতিকবি সাফো।
‘ওড টু আফ্রোদিতি’ কবিতায় এ-কবি তাই বরাবরের মতো তাঁর কামদেবীকে আবাহন করেন, তিনি যেন কবির কাঙ্ক্ষিতা কুমারীটিকে বুঝিয়ে তাঁর প্রেমাস্পদা হতে রাজি করান। সাফোর কবিতায় সঘনদৃষ্ট পরিস্র্ুত চিত্রে থাকে পুষ্প, মাল্য, প্রাকৃতিক দৃশ্য, ধুপধুনোর ধূম্রাচ্ছন্ন বেদি, দেহ ও কেশ সিঞ্চনের আনুষঙ্গিক সুগন্ধ অনুলেপনসামগ্রী - এককথায় প্রেমদেবী আফ্রোদিতির পূজাবিধির যাবতীয় উপচার।

সাফোর আদৃতির বহরটা এবার ইতিহাস জুড়েই দেখুন। অ্যাথেন্সের আইনপ্রণেতা ও কবি সোলোন (খ্রি.পূ. ৬৩৮-খ্রি.পূ. ৫৫৮) সাফোর একটা গান শুনে বলেছেন গানটা আমাকে শেখাও - এটা শিখে আমি জীবন শেষ করতে চাই। প্লেটো (খ্রি.পূ.৪২৭-৩৪৭) তাঁর অ্যান্থলজিয়া প্যালাটিনার এক এপিগ্রামে বলেছেন :
Some say the Muses are nine : how careless!
Look, there’s Sappho too, from Lesbos, the tenth.
রোমান কবি কাতুল্লুস (খ্রি.পূ. ৮৪-৫৪) সাফোর গান অনুবাদ করেছেন জাঁকজমকের সঙ্গে। মার্কিন কবি ও লেখিকা গার্টুড স্টিন সাফোর স্বকাল থেকে অনেক অগ্রসর ‘ও মুন’, ‘ও সি’, ‘ও লাভ’ সম্বোধিত কবিতা পড়ে মুগ্ধবিস্ময়ে চমকে উঠে মন্তব্য করেছেন : এপিক কবি হোমারের ‘রোজি ফিঙ্গার্স’ থাকে বীর্যের প্রতীক সূর্যোদয়ের সঙ্গে, আর লিরিক কবি সাফোর ‘রোজি ফিঙ্গার্স’ থাকে প্রেমের প্রতীক চন্দ্রোদয়ের সঙ্গে। তাই সাফোর কাব্যে প্রেম সততই জ্যোৎস্নায় ভাসে।
সাফোর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা, এমনকি তাঁকে সিসিলিতে নির্বাসিত করা; এইসবের মূল কারণ - তিনি ছিলেন তাঁর কাল থেকে অনেক অনেক এগিয়ে। তাঁর ‘সিঙ্গল উইমেন’স অ্যাকাডেমি’ একাই যথেষ্ট ছিল সমাজকে ক্ষ্যাপানোর জন্য। যেমন একালের রবীন্দ্র-বিদূষণের প্রধান কারণও ছিল স্বকাল থেকে তাঁর বেজায় বেশি এগিয়ে থাকা - যথা ভদ্র ঘরের শিক্ষিত মেয়েদের অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পীরূপে মঞ্চস্থ করা।
গোলাপপ্রেমী সাফো যে বৈকৃতকাম ছিলেন না, তার চূড়ান্ত প্রমাণ হলো তাঁর বিবাহ ও সন্তান জনন। লেসবিয়ান নারী যেখানে পুরুষকে অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে ঘনিষ্ঠ হতে দেন না - সেখানে পুরুষের ঔরসে তাঁর গর্ভে সন্তান ধারণ করার কথা ভাবাও যায় না। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার অষ্টম খন্ড মাইক্রোপিডিয়া লিখেছে - এটা নিশ্চিত যে, সাফো এক কন্যাসন্তানের জননী হয়েছিলেন। কন্যাটির নাম রেখেছিলেন নিজের মায়ের নামে, ক্লিস।
এ ছাড়াও ল্যাটিন কবি ওভিদ (খ্রি.পূ. ৪৩-খ্রি. ১৮) বর্ণিত লেজেন্ডে আছে - ফাওন-নামের এক তরুণ নাবিক কর্তৃক প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে মাত্র ৩০ বছর বয়সে (না কি ৪০?) সাফো সমুদ্রতীরবর্তী অতিউচ্চ এক পর্বতগাত্র থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। পুরুষের জন্য কোনো সমকামী নারীর আত্মহত্যা করা অকল্পনীয়। কথানকটি শ্রুতিনির্ভর হলেও আমি বলব - সমকামী নারী বিষমকামী প্রেমিকার শ্রুতি সৃষ্টি করে না।
সারকথা, প্রাণবন্ত এই কালজয়ী গীতিকবির কামবিকৃতির মিথ্যা কোনো গল্পগাছা শুনতেও প্রস্ত্তত নই আমি। কারণ তাঁর সঙ্গে দেখা না হলে গোলাপের দেশটা আমার দেখা হতো না, তিনি দেখিয়ে না দিলে এমন একটি ফুলের পথে আমার চলা হতো না। ভাবতে আমার ভালো লাগে যে, স্বতন্ত্র শ্রেণির বাংলা গানের স্রষ্টা জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় হয়তো সাফো আর গোলাপকে মনে রেখেই এই অবিস্মরণীয় গানটির কথা আর সুর রচনা করেছিলেন - ‘তোমার সঙ্গে দেখা না হলে/ ভালোবাসার দেশটা আমার দেখা হত না/ তুমি না হাত বাড়িয়ে দিলে/ এমন একটি পথে আমার চলা হত না’।
আনীত অভিযোগ সমকামিতার চিহ্নমাত্র দ্রষ্টব্য নয়, তাঁর অবিনষ্ট কবিতানিচয়ের কোথাও। তবু ইউরোপের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠা নারী গীতিকবি লেসবসের সাফোকেই সমকামী নারীর প্রোটোটাইপ বা আদিরূপ জ্ঞান করে নারীসমাজের সমকামিতার জাত্যর্থরূপে সর্বকালের জন্যই স্থায়ী হয়ে গেল ‘সাফ্ফিজম’ বা ‘লেসবিয়ানিজম’ শব্দদ্বয়। অসত্য এভাবেই ইতিহাসের ঘাড়ে চেপে বেঁচে থাকে কাল থেকে কালে।

এখানে প্রসঙ্গক্রমে সেই পুরুষসমাজের সমকামিতার একটুখানি বিবরণ পরিবেশন করতে হয় গ্রিসেরই মান্যগণ্যগণের বচন ও লিখন থেকে - যাঁরা তাঁদের নারীসমাজে সমকামিতা প্রবর্তনার দায়ভার চাপিয়ে সাফোর মতো চিরস্মরণীয় কবির সমস্ত কবিতা বারবার বিলোপনের হিংসাত্মক তৎপরতা চালিয়ে সকল কালের এবং সকল দেশের কাব্যপ্রেমীদের বঞ্চিত করেছেন।
বহুদেবতাবাদী প্রাচীন গ্রিক পৌত্তলিকদের সমকামী ফুর্তিবাজির ওপর একটি গবেষণাপত্র থেকে প্রাসঙ্গিক কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি। আন্তর্জালে হালে আপলোড করা গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ‘Homosexual and pedophile revelry in ancient, idolatrous Greece’ by J. Tachos, Supervision : Thomas Ph. Dritsas।

খ্রি.পূ. তৃতীয় শতাব্দীর দার্শনিক ম্যাক্সিমুস লিখেছেন, সাফোর (খ্রি.পূ. ৬১০-৫৭০) ছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সক্রেটিসের (খ্রি.পূ.৪৭০-৩৯৯) ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মতোই। পুরুষদের ভালোবাসার সক্রেটিক-শিল্প ছাড়া সাফোর নারীদের ভালোবাসাকে আর কী বলা যায়?
ম্যাক্সিমুসের মতে কবি সাফো আর দার্শনিক সক্রেটিস ভালোবাসার চর্চা করেছেন তাঁদের নিজ নিজ ধরনে - একজনের প্রেমাস্পদা নারী, আরেকজনের প্রেমাস্পদ পুরুষ। কারণ তাঁরা দুজনেই বলেছেন যে তাঁরা অনেককে ভালোবেসেছেন এবং সকল সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন দুজনেই। সক্রেটিসের কাছে আলসিবিয়াডিস, কারমিডিস এবং ফিড্রাস-নামক পুরুষগণ যা ছিলেন - সাফোর কাছে তা-ই ছিলেন গিরিন্না, আত্থিস এবং অ্যানাক্টরিয়া-নাম্নী নারীগণ।
সাফোর সমকামিতাকে দেখতে হবে গ্রিসের খ্রি.পূ. সপ্তম শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে। আলসিউস এবং পিন্দারের কবিতাও তাঁদের বৃত্তের পুরুষ সদস্যদের প্রতি অনুরূপ প্রেমের বন্ধনের বন্দনা গায়। সাফোর কালে গ্রিক পুরাণের অনেক চরিত্রও সমকামী হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন হোমারের কাব্যে জিউসের সেবক গ্যানিমিড হয়ে যায় জিউসের প্রেমাস্পদ, অ্যাকিলিস এবং পেট্রোক্লুসও সমকামী যৌন সম্পর্কের ডৌলে অঙ্কিত।
মেগারার কবি থিওগ্নিস মনে করেন, প্রথমে খেলাধুলার মাঠে দৃষ্ট সুগঠিত দেহের নগ্নতাই গ্রিকদের মনে বালমেহনের স্পৃহা জাগায়। যেমন তাঁদের কবি সোলোন বলেন :
‘সেই প্রেমিকই সুখী যে মাঠে কাজ করে নগ্নদেহে এবং কর্মশেষে ঘরে ফেরে সারাদিনের শয্যাসঙ্গী হিসেবে একটি সুন্দর ছেলেকে নিয়ে।’
প্লুটার্কের মতে প্রাচীন গ্রিসের থিবিসে বালমেহনের প্রতিষ্ঠান প্রবর্তিত হয়েছে শিক্ষাগত কৌশল হিসেবে, যাতে বালবয়সেই তাদের বয়সগত হিংস্রতা দমিত হয় এবং যুবাবয়সেই তাদের চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের উগ্রতা প্রশমিত হয়। এই ব্যবহারিক বা ক্রিয়াসিদ্ধ প্রশিক্ষণকর্মে নিয়োজিত প্রেমিকের বয়স হতো বিশের বেশি আর প্রেমাষ্পদের বয়স হতো বিশের কম। পেডার্যা স্টি বা বালমেহন সমগ্র গ্রিসে সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে গ্রিক ইতিহাসের আর্কেইক পেরিয়ডের শেষ এবং ক্ল্যাসিক্যাল পেরিয়ডের শুরুর সময় - অর্থাৎ খ্রি.পূ. ৬৫০-৬২৫ সালের দিকে।
পুরুষসমাজের সমকামিতার ওপর সক্রেটিস এতই মূল্য আরোপ করেছেন যে, তাঁর মতে সমকামী প্রেমিক ও প্রেমাষ্পদ এতই সুখী ও তৃপ্ত যে তাঁদের দ্বারা গঠিত সেনাদল সমগ্র বিশ্ব জয় করতে পারে (যেমন বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার করেছে?)। না হলে জিউস, পসিডন, অ্যাপোলো, অরফিউসের মতো প্রধান দেবতাগণ তাঁদের সমকামী কামনা মেটাতে পঞ্চাশ জন তরুণ পুরুষ নিয়োগ করতেন না।
অ্যাথেন্সের বৈকৃতকাম সমাজের ওপর ব্যঙ্গাত্মক কাব্যনাটক লিখে চিরস্থায়ী খ্যাতি অর্জনকারী অ্যারিস্টোফানিসই পায়ুমেহনের মতো নোংরা কর্মকে নির্মম কশাঘাত করে গেছেন। যেমন পরিণত বয়স হয়ে যাওয়ার পরেও যেসব পুরুষ তাদের পায়ু দান করে বা বিক্রি করে তারা এই কমিক ড্রামাটিস্টের ভাষায় নিন্দিত হয়েছে ‘ওয়াইড আর্সেস’ বলে। বহুলপ্রবিষ্ট বলে তাদের ঘৃণাভরেই এই নাট্যকার ‘প্রশস্ত পায়ু’ অভিহিত করেছেন।
মহান দার্শনিক সক্রেটিসকে ‘বয়-ক্রেজি’ বলে বর্ণনা করেছেন প্লেটো। তাঁর ভাষ্যমতে, সক্রেটিস স্বীকারোক্তি করেছেন যে তিনি বয়ঃসন্ধিক্ষণিক বালকদের দেখে একান্তই কাহিল এবং সংজ্ঞাহারা হয়ে পড়তেন। সে-অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার জন্যই তিনি এই সম্মোহক বালকদের দর্শনবিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার কাজে নিমগ্ন হতেন এবং সাক্ষাৎ ফললাভ করতেন।
ভাবতে ভারি মজাই লাগে যে, কামপ্ররোচক বালকদের প্রতি অনুভূত নিজের জমাট বাঁধা কামতাড়নাকে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে উড়িয়ে দিতেই তাদের জটিল দর্শন শিক্ষা দেওয়ার ব্রত নিয়েছিলেন উদযাপিত এই মহান শিক্ষক। সক্রেটিসের ‘বয় ক্রেজ’ এবং তা থেকে আত্মরক্ষার বিষয়টি প্রত্যয়িত হয় তাঁর আরেক ছাত্র জেনোফোন (খ্রি.পূ. ৪৩০-৩৫৪) কর্তৃক। এভাবে সক্রেটিস তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তেই প্রমাণ পেয়েছেন যে আকর্ষণীয় বালকেরা তাঁর মধ্যে কেবল যৌন উত্তেজনাই সৃষ্টি করত না, নৈতিক জ্ঞানগম্যি এবং শক্তিও সৃষ্টি করত। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে, সক্রেটিস খ্রি.পূ. ৩৯৯ সালে প্রাণদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন - ‘বালকদের ব্যভিচারে প্ররোচিত করার’ দায়ে। তাঁর শিষ্য প্লেটোর মতে দুজন পুরুষের মধ্যেকার প্রেমই একমাত্র প্রকৃত প্রেম। তিনি তাই এ-বিষয়টির প্রতি তাঁর দুটি ‘ডায়ালগ’ই উৎসর্গ করেছেন - ‘দি সিম্পসিয়াম’ ও ‘দি ফিড্রাস’।
গ্রিসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই দুই দার্শনিকের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতেই সেকালের গ্রিসের পুরুষ-সমকামিতার বহরটা মেপে দেখতে হয়। তা ছাড়া পুরুষতান্ত্রিক গ্রিকসমাজ কর্তৃক গোলাপের মহিমময়ী আদি গ্রিককবি সাফোর বিরুদ্ধে পুরুষমহলের সঘন উচ্চারিত সমকামী অভিযোগে চরিত্রহননের ঐতিহাসিক বিবরণ পড়তে পড়তে পুরুষ হিসেবে আমার নিজের ওপর ঘেন্নার ভার বাড়তে বাড়তে শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। সেই শ্বাসরুদ্ধকর ভার কিঞ্চিৎ লাঘব করার অপরিহার্য প্রয়োজনেই শ্বাসমুখোশ পরে আর্কেয়িক অর্থাৎ প্রি-ক্ল্যাসিক্যাল গ্রিসের জাতীয় সমকামিতার দুর্গন্ধময় নোংরামি কিছুটা ঘাঁটতে হচ্ছে আমাকে প্রসঙ্গক্রমে, অনভিপ্রেত হলেও।
প্রাচীনকালীন গ্রিসের পুরুষসমাজ দেশগতভাবে আসক্ত ছিল কেবল সাধারণ সমকামিতা sodomy বা পায়ুকামিতায় নয়, বিশেষ সমকামিতা pederasty বা বালমেহনে। বিখ্যাত গ্রিক ইতিহাসবিদ থিউসিডাইডিস (খ্রি.পূ. ৪৬০-৩৯৯) গ্রিসের এই স্বভাবসুলভ পুরুষ-সমকামিতার - বিশেষত মহান নাট্যকার ইসকিলাস (খ্রি.পূ. ৫২৪-৪৫৬) ও সফোক্লিস (খ্রি.পূ. ৪৯৫-৪০৬)-এর এই অপকর্মের বিবরণ বিশেষ ঘৃণাভরে লিখে গিয়েছেন।
প্রখ্যাত অ্যাথিনিয়ান বাগ্মী ডেমোস্থেনিস ছিলেন ‘পারমানেন্ট হোমোসেক্সুয়্যাল’। বস্ত্তত এই প্রবাদপ্রতিম বক্তা ছিলেন ‘ট্র্যান্সভেস্টাইট’, বিপরীত লিঙ্গের ভূমিকায় চরম অনুরক্ত এই অনলবর্ষী বক্তা নারীদের পোশাক পরে থাকতে ভালোবাসতেন। তথ্যটি ইসকিনিস তাঁর দুটি বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন - একটি রাজনীতি বিষয়ক ও একটি বিচার সম্বন্ধীয়।
স্পার্টানরা তাঁদের অতিথিগণকে আপ্যায়িত করতেন তাঁদের চোখের সামনে কুমারী মেয়েদের নগ্ন করে। অতঃপর যাঁর যাঁর পছন্দসই নগ্নাদের শয্যায় নিয়ে যৌনলীলায় লিপ্ত হওয়ার আহবান জানাতেন - তবে স্বাভাবিক যোনিপথে নয়, অস্বাভাবিক পায়ুপথে। ল্যাকনিয়ার রাজধানী স্পার্টার সূত্রেই প্রাচীন হেলেনীয়রা এই যৌনবিকৃতিকে ‘দি ল্যাকনিক স্টাইল’ বা ‘ল্যাকনাইজিং’ বলত।
এমনকি সমকামী ছিলেন গ্রিক পুরাণের দেবতা জিউসও। তাঁর ‘বয়-লাভার’ গ্যানিমিডিসকে চিলের মতো ছোঁ মেরে মুঠি ভরে নিয়ে দেবতা উড়ে চলেছেন স্বর্গপানে - ছবিটি নিশ্চয় পাঠকের চোখে ভাসছে। হোমার যদিও তাকে দেবতাদের ‘ওয়াইন-পোরার’ বলতে চেয়েছেন, খ্রি.পূ. ষষ্ঠ শতকের থিয়োগনিসের কাব্যে কামোদ্দীপক বালকটিকে দেবরাজের সমকামের ‘চাইল্ডিশ থিং’ বলা হয়েছে। সাফোর সমসাময়িক গীতিকবি অ্যানাক্রিয়ন (খ্রি.পূ. ৫৬৯-৪৭৫) একটি কবিতায় তাঁর লাম্পট্যের এক মস্তির দিনে বালপ্রণয়ী স্মের্ডিয়াসের সঙ্গে কতবার অস্বাভাবিক কামলীলা সাঙ্গ করেছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন সগর্বে।
বিস্ময়কর যত প্রতিভা-প্রসবিনী দেশটির সমকামিতার প্রতি আসক্তির শীর্ষ থেকে অবরোহন শুরু হয় tyranny বা স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর। পতন ঘটে খ্রি.পূ. ৫০৮ সালে পারসিট্রেটাস ১-কে ও ৫১০ সালে তাঁর পুত্র স্বৈরশাসক হিপারকাসকে বধের ফলে।
তাঁদের হননকর্ম সাধন করে এক সমকামী কাপ্ল, সক্রিয় সমকামী অ্যারিস্টোজিটন আর নিষ্ক্রিয় সমকামী হার্মোডিওস - তাও সমকামঘটিত হানাহানির জের ধরেই। এই পটভূমিতে খ্রি.পূ. ৫০৮ সালে ক্লিস্থিনিসের সংস্কারে অ্যাথেন্সে দীর্ঘকালীন স্বৈরতন্ত্রের ইতি ঘটলে ক্ষমতাসীন হয় ‘অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র’, যাকে মনে করা হয় ‘প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে’র পূর্বসূরি।
এহেন মহৎ কর্ম সম্পাদনকারী সমকামী দম্পতিটির সম্মানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সময়েও অ্যাথেন্সের থিয়েটার হলের সামনের সারিতে দুটি মুখ্য সিট রিজার্ভ রাখা হতো, এ-কথাটি স্মরণ করাতে যে-সমকামীরা সমাজের জন্য কত বড়ো মাপের কাজ করতে পারে। এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সুযোগটিকে দার্শনিক কাজে লাগিয়ে প্লেটো তাঁর ‘সিম্পোসিয়ামে’ বললেন - সমকামিতা সন্তান জন্ম দিতে না পারলেও চর্চাটা সুন্দর ধারণা ও শিল্পের জন্ম দিতে পারে, এমনকি সুদূরপ্রসারী মূল্যের তৎপরতারও সৃষ্টি করতে পারে।
উপরে বর্ণিত তথ্য ও তত্ত্ব ভিন্ন ভিন্নরূপে পরিবেশন করেন থিউসিডাইডিস ও অ্যারিস্টটল। অর্থাৎ টির্যাথন্ট পারসিস্ট্রেটাস-১ ও তাঁর পুত্র ইপারকাসকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকল্পে হত্যা করেননি পুরুষ সমকামী জুটি অ্যামোডিয়াস আর অ্যারিস্টোজিটন। প্রথমত, সিসেরো (খ্রি.পূ. ১০৬-৪৩) যাঁকে গ্রিক ইতিহাসশাস্ত্রের জনক বলে অভিহিত করেছেন সেই হেরোডোটাসের (খ্রি.পূ. ৪৮৫-৪২৫) মতে আলোচ্য সমকামী-যুগল অ্যাথেনিয়ান ছিলেন না, ছিলেন ফিনিশিয়ান বংশধারাজাত।
অতঃপর তাঁরা বলেন যে সমকামী আরমোডিউস এবং তাঁর শয্যাসঙ্গী অ্যারিস্টোজিটনের কারুরই রাজনীতি কিংবা গণতন্ত্রের সঙ্গে কোনো সংস্রব ছিল না। তাঁরা টির্যােন্ট হিপিয়াস আর তাঁর ভাই হিপারকাসকে বধ করেছেন রাজনৈতিক প্রতিরোধহেতু নয়, সমকামী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে। যৌনকর্মের সুযোগ দেওয়ার হিপারকাসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আর্মোডিউস। প্রতিশোধস্বরূপ হিপারকাস আরমোডউসের বোনের সঙ্গে অশালীন ব্যবহার করে। এরই প্রতিশোধ হিসেবে আর্মোডিউস তার লাভার অ্যারিস্টোজিটনকে সঙ্গে নিয়ে হিপারকাসকে হত্যা করে।
ব্যাপারটা ছিল ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে সমকামিতায় ব্যক্তিবিশেষের অসম্মতি ও সমকামী প্রেমসংশয় জনিত, রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটিত নয়। ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস বর্ণিত এ-তথ্যটি সম্পূর্ণ প্রত্যয়ন করেন দার্শনিক অ্যারিস্টটল (খ্রি.পূ. ৩৮৪-৩২২)। এরকম সমকামী লালসাজনিত হানাহানি ছিল সেকালীন গ্রিসের সমগ্র দেশটি জুড়ে। নষ্টামিটি ব্যাপকতম হারে বিরাজমান ছিল পুরুষসমাজের উচ্চতম স্তরে।
কিওস দ্বীপের এক সরকারি ভোজসভায় অতিথিদের দ্রাক্ষারস পরিবেশনরত সুদর্শন বালকটিকে দেখামাত্র কামোন্মত্ত নাট্যকার সফোক্লিস নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উপস্থিত মেহমানদের সামনেই ছেলেটির ওপর চড়াও হন। আরেকবার অ্যাথেন্সে সমকামোন্মাদ এই অমর নাট্যকার আকর্ষণীয় এক নবীন যুবককে নগর-দেওয়ালের বাইরে নিয়ে গিয়ে নিজের বিকৃত কামতৃষ্ণা নিবারণ করেন।
যৌন অপকর্মে অভিজ্ঞ এই বালক ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষিত হওয়ার ক্ষোভে অপকর্মটি শেষ হতেই নিজের বস্ত্রের বদলে সফোক্লিসের ড্রেস পরে নগরে পালিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে বালকের পরিত্যক্ত বেখাপ লেবাসটি পরে গোটা নগরবাসীর চোখে হাস্যাস্পদ হয়ে ঘরে ফেরেন দেশের সেই উদযাপিত নাট্যকার। এই যৌন আবেদনময় ছেলেটির সঙ্গে বালমেহনে মাঝেমধ্যে লিপ্ত হতেন অবিস্মরণীয় গ্রিক ট্র্যাজিক-ড্রামাটিস্ট ইউরিপিডিস (খ্রি.পূ. ৪৮০-৪০৬)। পরে কেলেংকারিটির কথা শুনে তিনি সফোক্লিসের প্রতি বিদ্রূপের বাণ হেনে বলেন - ওই বালক তো তাঁর বারবার ব্যবহার করা বাসি মাল!
এই হলো বিশ্বের সবচেয়ে মহিমান্বিত পৌত্তলিক সমাজের পুরুষদের নৈতিক অধঃপতনের নমুনা। তাঁদের দার্শনিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, নান্দনিক সকল স্তরেরই গর্বের ধন সমকামী যৌন বিকৃতি। ভালোবাসার টানে পুরুষকে পুরুষের দেহদানকে বলা হতো মহান। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে পুরুষের কাছে পুরুষের দেহ বিক্রি করাকে বলা হতো ‘ফোরনিকেশন’। প্রতি বছর পার্লামেন্টারি বডি ফোরনিকেশন-ট্যাক্স নিলামে তুলত।
বিখ্যাত অ্যাথেনিয়ান আইন-প্রণেতা সোলোন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকের সঙ্গে সমকামী সম্পর্কের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন তাঁর কবিতায়। একটি কবিতায় তিনি বলেন সেই পুরুষটি ঈর্ষণীয় যার চারটি বস্ত্ত আছে। প্রথমত, ভালোবাসায় ব্যবহার করার মতো বালক। দ্বিতীয়ত, রেসের ঘোড়া। তৃতীয়ত, শিকারি কুকুর। চতুর্থত, প্রবাসী বন্ধু। আরেকটি কবিতায় বর্ণিত হয়েছে বালকদেহের কোন কোন নির্দিষ্ট স্থান উপভোগ করতে তাঁর নিজের বেশি ভালো লাগে। প্লুটার্ক লিখেছেন : সোলোন আর পেসিস্ট্রেটাসের মধ্যেকার সমকামী সম্পর্কের ভিত্তি ছিল প্রথম জনের গুণ আর দ্বিতীয় জনের রূপ।
থিওক্রিটাসের ওপর ধারাভাষ্যে গ্রিসের মেগারা অঞ্চলের অধিবাসীদের সম্পর্কে একটি বিবৃতি আছে যে তারা স্থানীয় হিসেবে ডিওক্লিয়াস-নামক পুরাণকীর্তিত এক নায়ককে পূজ্য জ্ঞান করে - যে তার ভালোবাসার বালকের প্রতিরক্ষায় নিজের প্রাণ দান করে। এই মহান নায়কের স্মরণানুষ্ঠানে পুরুষ সমকামীদের বাৎসরিক চুম্বন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীকে একটা মহামূল্যবান মালা পুরস্কার দেওয়া হয় যা বিজেতা তার মাতাকে উপহার দেয়।
অ্যাথেনায়স সাক্ষ্য দেন যে ক্রিটের অধিবাসীদের মতো গ্রিসের আরেক অঞ্চল চাল্কিসের বাসিন্দারাও পুরুষদের সমকামী অপকর্মে সমান উন্মত্ত ছিল। বালমেহনের জন্য অঞ্চলটির অভিজাত এলাকার স্থানে স্থানে মাগীবাড়ির মতো বিশেষ বালকবাড়ি ছিল - যেগুলোকে পেশাদার সমকামী পুরুষসমাজ স্রেফ ‘বাড়ি’ই বলত। এই অপকর্মটার চর্চা এমনি ব্যাপক ছিল যে বেশির ভাগ বালককে বাধ্য করে আনা হতো এ ঘৃণ্য পেশায়।
দুজন প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মধ্যে অবাধ ও অবাণিজ্যিক যৌনসম্পর্ক শুধু আইনসংগতই ছিল না, মহৎ বলেই গণ্য হতো - বরং পুরুষ ও রমণীর মধ্যেকার যৌনসম্পর্কের চেয়েও মহত্তর। কেবল পেশাদারিতে গড়ালেই বিবেচিত হতো ইতর ও লজ্জাজনক বলে। আইনি দৃষ্টিতেও এই পেশাদার সমকামী দম্পতিই আখ্যায়িত হতো ‘ফোরনিকেটর’ ও ‘ফোরনিকেটেড’ পরিভাষায়। নিষিদ্ধ হতো এদের মন্দিরে প্রবেশ, পূজা-আর্চা। এরা বঞ্চিত হতো অনেক রাজনৈতিক অধিকার থেকেও।
অথচ চালু ‘হোর-হাউস’গুলোর মালিকানা ছিল রাষ্ট্রের। সরকারই এগুলো বড় ব্যবসায়ীদের কাছে লিজ দিয়ে ‘হোমো-ফোরনিকেশন’ ফি আদায় করত। ফলে এসব ‘হাউস’-এর যাবতীয় ক্রিয়াকলাপ অবাধেই চলতে পারত, সরকারের কোষাগারে জমা পড়ত পার্লামেন্টে পাশ করা ‘ফোরনিকেশন ট্যাক্স’। অ্যাথেন্সের রাজ্য-পরিচালিত ‘হোর-হাউস’গুলোতে কাজ করতে বাধ্য করা হতো অন্যান্য গ্রিক রাজ্য থেকে আনা দাস ও যুদ্ধবন্দিদের - যারা তাদের এসব ঘৃণ্য ‘সার্ভিস’-এর জন্য কোনো মজুরি পেত না। তার মানে, পুরো ফোরনিকেশন-জাত আয় ইজারাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী আর ইজারাদাতা সরকারই আত্মসাৎ করত।
যৌন সম্ভোগের সামগ্রী সাত থেকে আঠারো বছর বয়সের বালকদের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক বিশেষণটি, ‘চাইল্ডিশ থিংস’, গ্রিক পুরুষসমাজের সমকামিতার প্রশংসাকালে প্রথম ব্যবহার করেন ব্যাকিলাইডিস এবং ট্র্যাজিক নাট্যকবি সফোক্লিস ও ইউরিপিডিস। ‘বয়-লাভার’ অর্থে ক্লীবলিঙ্গ ‘থিংস’-শব্দটি বহুবচনে ব্যবহারের মধ্যে উহ্য থাকত তাদের প্রতি পায়ুকামীদের তাচ্ছিল্যবোধ - হতভাগা বালকটি যেন প্রাণী নয় বস্ত্ত। উদাহরণত পায়ুকামী শ্রেণির ধৃষ্টদল কখনও বলত না - ‘অ্যারিস্টিপ্পস ও তাঁর লাভার ক্র্যাটিপ্পস’, সর্বদাই বলত - অ্যারিস্টিপ্পস ও তাঁর ‘চাইল্ডিশ থিংস’। যেন তাঁরা বলছেন - অ্যারিস্টিপ্পস ও তাঁর ‘ফুর্তির সামগ্রী’। সামগ্রীগুলো হলো একটি বালকের বালসুলভ মসৃণ কোমল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, যে কিনা প্রাণী হিসেবে বিচরণশীল।
হেরোডোটাসের একটি লিপিবদ্ধ ভাষ্য রীতিমতো রোমহর্ষক। কেরকিরা বা কোরফুর প্রাচীন গ্রিসীয় সব বালক একত্র করে তাদের মধ্য থেকে তিনশো সুদর্শন অল্পবয়স্ক বালক বাছাই করে জাহাজে তুলে লিডিয়ার রাজা অ্যালিয়াটিসের কাছে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন পেরিয়েন্ডার - যাতে খাসি করে ছেলেগুলোকে তাঁর হারেমে লাভার-বয় হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন এই লম্পট রাজন্।
সৌভাগ্যক্রমে কুমতলবটির খবর পেয়ে সামোস দ্বীপের বাসিন্দারা কৌশলে জাহাজটির দখল নিয়ে বালকগুলোকে কেরকিরায় ফেরৎ পাঠিয়ে দেয়। পেরিয়েন্ডারের এই অপকর্ম প্রমাণ করে যে তাঁরও অল্পবয়স্ক বালকদের হারেম ছিল এবং উপহারস্বরূপ বন্ধুবান্ধব ও মিত্ররাজন্যদের ‘সেবা’য় পাঠিয়ে দিতেন তিনি উদ্বৃত্ত বালকগুলোকেই।
নিজেদের সমকামিতার জন্য গর্বিত প্লুটার্ক ও অ্যাথেনেয়সের মতে সমকামিতার সবচেয়ে খোলামেলা ব্যবহার আছে ইস্কিলাসের দুটি ট্র্যাজেডিতে - ক্যাবিরয় আর মিরমিডনসে। দ্বিতীয়টিতে অ্যাকিলিস আর প্যাট্রোক্লুস উপস্থাপিত হয়েছেন ‘হোমোসেক্সুয়াল কাপল’ হিসেবে।
মোটকথা, প্রি-ক্ল্যাসিকেল গ্রিসের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সমকামিতার সমঝদারি ছিল সমগ্র দেশটি জুড়েই। নারীসমাজে ছিল না বলে, কেবল গ্রিসের নয়, সেকালীন বিশ্বেরই সর্বশ্রেষ্ঠা নারী গীতিকবি সাফোর নিম্নোদ্ধৃত মহান পঙ্ক্তিমালার জন্যও তাঁর বাসভূমি লেসবসের নারীদের পাইকারি হারে কবি-পন্ডিত মহল কর্তৃক ‘হোর’ অভিহিত হওয়ার জন্য সমগ্র বিশ্বের আজকের পুরুষসমাজটিকেও লিখিতভাবে ক্ষমা চাইতে হবে বলে মনে করি আমি। সেই ক্ষমাটিই আমি চেয়ে নিচ্ছি বক্ষ্যমাণ রচনাটির মাধ্যমে।
অথচ পুরুষসমাজের এমন একটি সমকামী জাতির দেশ গ্রিসের নারীসমাজের গীতিকবি সাফোর বিরুদ্ধে উচ্চারিত তথাকথিত সমকামী তৎপরতার সূত্র ধরে তাঁর অঞ্চল লেসবসের নামানুসারে পুরুষসমাজ নারীসমাজের সমকামিতার অভিধা পর্যন্ত প্রবর্তন করেছে ‘লেসবিয়ানিজম’, যা পরবর্তীকালে বিশ্বময় প্রচলিত হয়ে গেছে নারীর যৌনবিকৃতির পরিভাষা হিসাবে। লেসবস অঞ্চলের নারীদের ব্যভিচারিণী এমনকি বেশ্যা অভিহিত করতেও দ্বিধা বোধ করত না প্রাচীন গ্রিসের অন্যান্য অঞ্চল। সমকামিতার ক্ষেত্রে গ্রিক নরপুঙ্গবদের উদ্ধৃত রেকর্ডের দৃষ্টান্তে এ কেমন আজব ব্যাপার ভেবে দেখুন তো একবার।
পাঠকের জানার কৌতূহল হতে পারে - খোলামেলা চলার এবং পরস্পরে অন্তরঙ্গ মেলামেশা করার লেসবস-নামক অতি বিশিষ্ট এই অঞ্চলটি কোথায়? এলাকাটির অবস্থান এশিয়া মাইনরের উত্তর উপকূলজুড়ে, হোমারের নিবাস তদানীন্তন গ্রিসের স্মির্না বা বর্তমান তুরস্কের ইজমিরের নিকটে এবং গোলাপের আদি নিবাস ইরাক ও তুরস্কের মধ্যবর্তী ফ্রিজিয়ার কাছে।
‘সমকামী নারী’ - এই অপবাদের ভিত্তিতেই নিষিদ্ধঘোষিত ও দগ্ধীভূত করে স্বকালের বিশ্বশ্রেষ্ঠ গীতিকবি সাফোর প্রায় সব অমর কবিতাকেই ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। পূর্ণরূপে রক্ষা পেয়েছে কেবল একটি কবিতাই - ‘আফ্রোদিতি’। এর সর্বাঙ্গসুন্দর শৈল্পিক উৎকর্ষের প্রতি পরম শ্রদ্ধা জ্ঞাপনপূর্বক কবিতাটিকে পুরোপুরি কোট করেছেন খ্রি.পূ. চতুর্থ শতকের ডায়োনিসিয়াস :
‘এ কবিতায় কাব্যভাষার লাবণ্য ও শ্রুতিসুখকর প্রভাবের সৃষ্টি হয় সন্ধিস্থলগুলোর সুসংবদ্ধতা ও স্নিগ্ধকোমলতা থেকে। শব্দগুলো যেন আদরে সোহাগে জড়িয়ে জমিয়ে একে অন্যের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে গুটিসুটি মেরে বসে আছে, যেন অক্ষরগুলোর পরস্পরের প্রতি স্বাভাবিক প্রীতি ও অনুরক্তি হেতু দল বেঁধে গেঁথে আছে তারা।’
সাফোর অতিবিখ্যাত একটি প্রেমের কবিতায় অবিবাহিতা নারী বর্ণিত হয়েছে যেন ‘বৃক্ষশাখে রাঙা হয়ে ওঠা একটি মিঠে আপেল’ :
‘Like the sweet apple that reddens at the end of the bough
Far end of the bough
Left by the gatherer’s swaying.
Forgotten so thou
Nay, not forgotten, ungotten, ungathered till now.’

আরেকটি কবিতায় আছে :
... and she outshines the ladies of Lydia,
as when the sun goes down,
the rose-fingered moon at sunset,
surpassing all the stars...’

আরেকটি স্পর্শকাতর কবিতায় আছে :
‘This is my fair girl-garden : sweet they grow,
rose, violet, asphodel and lily’s snow,
which the sweetest is, I do not know,
for rosy arms and starry eyes are there.
Honey-sweet voices and cheeks passing fair.
And these shall men, I mean, remember long;
for these shall bloom for ever in my song.’

সাফোর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কবিতায় আছে :
‘I just really want to die.
She, crying many tears, left me
And said to me :
“Oh, how terribly we have suffered,
we two, Sappho,
really I don’t want to go away.’

উত্তরে সাফো জনৈকা পাকা বয়স্যার ঢঙে বস্ত্তত কাব্যিক সংলাপটির সূত্র ধরে ছাত্রী-বান্ধবীটিকে তাঁর সম্ভবশ্রেষ্ঠ পরামর্শটি দান করেন :
‘Go and be happy, remembering me
For you know how we cared for you.
And if you don’t, I want to remind you
...and the lovely things we felt
with many wealths of violets
and roses and crocuses
and...you sat next to me
and threw around your delicate neck
garlands fashioned of many woven flowers
and with much...costly myrrh
...and you anointed yourself with
royal...’

পোকায় কাটা অরিজিন্যাল প্যাপিরাসের ফাঁক এবং ছিদ্রগুলোর ভেতর দিয়ে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া অংশগুলোকে মানসদৃষ্টিতে অবলোকন করলে আমরা বিস্ময়কর যত আন্তঃক্রিয়ার নিযুতাংশগুলোর সবই দেখতে পাব - যেমন বাংলা অনুবাদে উদ্ধৃত নিচের কবিতাটিতে দেখতে পাচ্ছি।
সাফোর বহুলপঠিত এই কবিতার বাংলা অনুবাদ নিচে উদ্ধৃত হল অনুবাদকের গ্রন্থ আলীবাবার গুপ্ত ভান্ডার থেকে :

জনৈক সৈনিক-ঘরণীকে (‘Fragment 16’)
কেউ বলে ঘোড়সওয়ারের সার, কেউ বলে,
পদাতিক বাহিনী, ফের, কারো
মতে, দুরন্ত যে দাঁড়ে বয়

আমাদের নৌতরণী, পোড়া পৃথিবীতে সব চেয়ে
নয়নাভিরাম তা-ই। তবে, বলি আমি,
যাতে মজে মন তা-ই মনোরম, শোভন শ্রীময়।

প্রমাণ? অতীব সোজা। বলি,
হেলেন কি - দেশ-দুনিয়ার
তামাম পুরুষ ছেনে চরম কুসুমখানি বেছেছিলো সেরা যে
রমণী -

ধুলোয় মেশালে শেষে ট্রয়ের গৌরব যে, তাকেই
করেনি বরণ-দান পুরুষের পরম সম্মানে?
ইছামতী তারই সাধে, গেল তো সে তারই সাথে -
ভুলে
অপত্যের প্রীতি-ঋণ, পিতা-মাতা,পরিবার -
দূরে, বহু দূরে।
অতএব, আনক্তোরিয়া! (যদিও-বা
দূরে আছ বলে ভালো, বেশ আছ আমাদের ভুলে),
মধুর তোমার ওই চরণ সম্পাত,
তোমার চোখের কোণে আলোর মিহিন কণা, হঠাৎ ঝিলিক,
রূপের বাহারে অনুপম
লিডিয়ার অশ্বরা বা বর্মধারী রাজকীয় পদাতিক বাহিনী
যত, তার ঢের বেশি, বহু বহু গুণ বেশি, মাতাবে আমায়।
অনুবাদ : শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়

হোমারের ‘rosy-fingered dawn’-এর এক বিস্ময়কর পরিবর্তন আনেন সাফো এবং বলেন, ‘rosy-fingered Moon’, যা মনুষ্যজগতের দুটি ভুবনের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা এঁকে দেয়। একটি হলো হোমারের ‘Black earth’ বা ‘কৃষ্ণ মেদিনী’র ওপর তৎপর তলোয়ার আর নৌবহরের পুরুষের জগৎ। অন্যটি সাফোর নারী ও প্রেমিকের পৃথিবী যা তাদের প্রাণের ধন।
দ্রাক্ষাসব ও ভোজসভা জাতীয় কিছুই পাওয়া যাবে না সাফোর কবিতায়। তাঁর কবিতার নিখিলে উদ্রিক্ত হয় উন্মুক্ত ও উদার প্রকৃতির ক্রোড়স্থ ইন্দ্রিয়জ হর্ষ ও উল্লাসের মেলায় বহিরঙ্গনসুলভ স্বাচ্ছন্দ্য ও ঔজ্জ্বল্য। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর পুরুষ প্রতিরূপদের সকলকেই ছাড়িয়ে যান। সাফোই প্রথম পূর্ণচন্দ্রকে বর্ণনা করেন ‘রজত’ বলে - যা থেকে তাঁর প্রস্থানের হাজার হাজার বছর পরের গীতিকবিগণ আজও লিখে যান ‘রূপালি চাঁদ’।
অ্যাথেন্সের আইনপ্রণেতা ও কবি সোলোন ডিনারের ওয়াইন পানরত তাঁর ভাগ্নের কণ্ঠে সাফোর একটা গান শুনে বলেছেন এটা আমাকে শেখাও। কারণ I want to learn it and die। আমরা যদি সবিস্তারে পড়ে বা শুনে জানতাম গানটি শুনে কী ধরনের অনুভব চারিয়ে গিয়ে সোলোনের মনটিকে বিবশ করেছিল, তবেই বুঝতে পারতাম কেমন উদ্বুদ্ধকর বস্ত্ত ছিল সাফোর কবিতা।
কিন্তু ছিঁটেফোঁটা ছাড়া তাঁকে পড়ার সুযোগ থেকে সকল পাঠককেই চিরতরে বঞ্চিত করা হয়। এমন একজন চিরন্তন কবির তাবৎ সৃজন বারবার ধ্বংস করে দেয় প্রাচীন গ্রিসের পুরুষশাসিত সমাজ বিনা বিচারে বিনা প্রমাণে শুধুমাত্র এই অভিযোগে যে মহতী গীতিকবি সাফো ছিলেন নারী-সমকামিতার প্রোটোটাইপ বা মূর্তিমতী আদিরূপ।
ওই অভিযোগটির সূত্র ধরে আমরাও তো প্রশ্ন তুলতে পারি - নারী-সমকামিতার প্রোটোটাইপ সাফো হলে, পুরুষ-সমকামিতার প্রোটোটাইপ কে? ট্র্যাজিক নাট্যকার ইসকিলাস? কালজয়ী নাট্যকার সফোক্লিস? না কি মহত্তম দার্শনিক সক্রেটিস?

নিসর্গের ভেতর বাড়িতে

জাহিদ মুস্তাফা

ছবি আকায় নিসর্গ সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত বিষয়। শিল্পীরাই পছন্দ করেন নিসর্গ নিয়ে আকতে। উদার প্রকৃতির বিস্তৃত ভুবন, সৌন্দর্যের সহস্র পর্দার রহস্যময়তা সৃজনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন প্রায় সব চিত্রকর। সুদূর কানাডায় বসবাসকারী শিল্পী আলমগীর হক প্রকৃতি নিয়ে প্রকৃতিকে অনুভব করে নিজের চিত্রপট সাজিয়েছেন। ‘অনুভবে নিসর্গ’ শীর্ষক একক ছাপচিত্রের এ-প্রদর্শনী হয়ে গেল ঢাকার ধানমন্ডিতে বেঙ্গল শিল্পালয়ে। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে এ-প্রদর্শনী চলেছে ৬ মার্চ পর্যন্ত।
আলমগীর হক সত্তরের দশকের চিত্রশিল্পী। জন্ম তাঁর ঢাকায় ১৯৫৩ সালে। ১৯৭৫ সালে তৎকালীন চারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগে স্নাতক এবং ১৯৭৯ সালে ভারতের বরোদার এমএস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। দেশ-বিদেশে তাঁর একক প্রদর্শনীর সংখ্যা পনেরোটি। এছাড়া প্রচুর যৌথ ও দলীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে তাঁর অংশগ্রহণ আছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে। ২০০০ সালে কানাডার সাসকাচুয়ান আর্টস বোর্ড প্রদত্ত ইনডিভিজুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স গ্র্যান্ট এবং ১৯৯৫ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় যিনি প্রিন্টস ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
এচিং ও অ্যাকুয়াটিন্ট ছাপচিত্র মাধ্যমকে বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে অধিকমাত্রায় প্রচলন ঘটাতে আলমগীর হকের প্রচেষ্টা। আমরা লক্ষ করে আসছি সেই আশির দশক থেকেই। আশির দশকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে তাঁরই পরিচালনায় আগ্রহী তরুণ ও নবীন শিল্পীদের নিয়ে বেশকটি ছাপচিত্র কর্মশালা হয়েছে। এরকম একটি কর্মশালায় আমিও ছিলাম একজন প্রশিক্ষণার্থী। তখন দেখেছি - তাম্রতক্ষণের কলাকৌশলে, ছাপচিত্র-জ্ঞানে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কুশলী। দেশে থাকতেই তিনি শিল্পবোদ্ধাদের মনোযোগ আকর্ষণে সমর্থ হয়েছিলেন।
মজার ব্যাপার হলো, আলমগীর হক পড়েছেন পেইন্টিং নিয়ে, তবে তাঁর মূল ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠেছে ছাপচিত্র। ছাত্রাবস্থা থেকেই। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি চারুকলায় শ্রেষ্ঠ প্রিন্টমেকারস পুরস্কৃত হন। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৮ সালে তিনি প্রিন্ট সোসাইটি অফ পোল্যান্ডের ডাইরেক্টরি অফ প্রিন্টমেকারসে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সম্মান অর্জন করেন। ১৯৯০ সাল থেকে আলমগীর হক কানাডায় বসবাস করছেন।
প্রবাসে শিল্পী ছাপচিত্রের করণকৌশল নিয়ে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিজের কাজের একটি গতিপথ নির্মাণ করেছেন। এসিডের বদলে প্রকৃতিবান্ধব কৌশল হিসেবে লবণ প্রয়োগ করে এচিং নির্মাণে এগিয়ে এসেছেন শিল্পী। তাঁর এই টেকনিক শিখিয়েছেন সদ্যপ্রতিষ্ঠিত সফিউদ্দীন বেঙ্গল প্রিন্ট স্টুডিওর প্রথম কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের।

Angik O Ronger Bishoy - 6

Angik O Ronger Bishoy - 6



‘অনুভবে নিসর্গ’ প্রদর্শনীতে শিল্পী-কৃত ছাপচিত্রের সংখ্যা ছিল ঊনষাটটি। এ-কাজগুলোয় প্রকৃতির নানা রূপবৈচিত্র্য শিল্পী তুলে ধরেছেন। বিদেশে অবস্থানের ফলে - নানা দেশের শিল্প ও শিল্পীকে প্রত্যক্ষ করে তাঁর অর্জিত জ্ঞান ও বোধের মধ্য দিয়ে যে আন্তর্জাতিকতার বিস্তার ঘটেছে তার অনুরণন আমরা পেয়ে যাই আলমগীর হকের ছাপচিত্রে। তাঁর এসব ছাপচিত্র দেখে অনুভব করি তাঁর সৃজন গহন ও বৈচিত্র্যসঞ্চারী। নিসর্গের কত ফর্ম-রং-রেখার বিবরণ বিধৃত সেখানে। তবে তা বদলে বদলে যায় সময়ের সঙ্গে, আলোছায়ার তারতম্যের মতো। নিসর্গের বিমূর্তায়ন তাঁর সৃজনকে আরো গহন, আরো গভীর করেছে। সৃজনের জন্য তাঁর উন্মুখতা, প্রকৃতির ভেতরকার সৌন্দর্য অবলোকনের তৃষ্ণা আমরা প্রত্যক্ষ করি চিত্রপটে।
এচিং ও অ্যাকুয়াটিন্ট মাধ্যমে ১৯৯৫ সালে আকা ‘ফর্মের বিষয় ও বর্ণ-৮’ শীর্ষক চিত্রকর্ম শিল্পীর একটি অসামান্য কাজ। জ্যামিতিক ফর্মের আয়োজন ও বর্ণের চমৎকার প্রয়োগে আলোছায়ার চমৎকারিত্বে দারুণ দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে এটি। ৯০ গুণিতক ৬১ সেন্টিমিটার পরিমাপের কাগজে ৭৬ গুণিতক ৪৬ সেন্টিমিটার ছাপ। ছাপের ফাঁকে ফাঁকে সাদা কাগজের রেখা যেন আলো-হাওয়ার দ্যোতনা আনে দর্শক মনে। বেগুনি রঙের ওপর কালো, সবুজ রঙের ছাপ ও টেক্সচার মিলে যে সৌন্দর্য নির্মাণ করে তা আরো বিকশিত হয়েছে হলুদাভ ও সবুজাভ জানালা ও দরজার আহবানে।
আরেকটি এচিং অ্যাকুয়াটিন্ট ছাপচিত্র - শিরোনাম ‘প্রিন্ট-দশ’ - বর্ষণের আগের ঘোরতর কালো আকাশের বুকে ছাইরঙা মেঘের মতো মৃদু আলোর উৎসারণ যেন। টার্কিশ ব্লু বর্ণের চোখ-সওয়া রঙের পরিপ্রেক্ষিতে গড়েছেন - ‘রিফ্লেকেটেড ইমেজ’। মধ্যবর্তী দরজার ধূসরতার দুপাশে ডানামেলা যোগ চিহ্ন যেন সৌন্দর্যে অবগাহনের আহবান জানাচ্ছে।
১৯৯৫ সালের আরেকটি প্রিন্ট - যার মাধ্যম জলহীন লিথো। শিল্পী এর চারপাশে যেন রোলার দিয়ে জায়গা করে, ঠিক মাঝখানে ওই প্রিন্ট আম্বার বর্ণের হালকা টোনে কিছু ইমেজ আরোপ করায় কাজটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘নীল ও নীলাভ’ সবুজ নামে আরেকটি লিথো ছাপচিত্রে দুটি বর্ণের টোনাল ইমেজ এবং কম্পোজিশনের সহজতার মজাটা পাওয়া যায়। দুটি কাজই ১৯৯৫ সালে করা।
শিরোনামহীন কয়েকটি ল্যান্ডস্কেপ করেছেন শিল্পী আলমগীর হক সাম্প্রতিককালে। এগুলোও জলহীন লিথো ছাপচিত্র। জমির জ্যামিতিক বিন্যাস রেখে, তার ওপর বৃক্ষ কিংবা পাতার কিছু ইফেক্ট এনেছেন। একধরনের স্বাচ্ছন্দ্য আছে তাঁর এসব কাজে, যা দেখে মনে হয় শিল্পী তাঁর চিত্রপটের সীমানাকে যুক্ত করতে চাইছেন। আমেরিকান পপ আর্টের বর্ণলেপনের ধরনটা কোনো কোনো লিথো ছাপচিত্রে পাওয়া যায়। যেমন - শিরোনামহীন ‘ল্যান্ডস্কেপ ১৭’ শীর্ষক ছাপচিত্রটিতে লাল, কালো, নীল বর্ণের উচ্ছ্বাসটা তদ্রূপ।
সতেরো-আঠারো বছর আগের ছাপচিত্রগুলোর ধরন একরকম। ফর্ম ও জ্যামিতিক বিশ্লেষণে সেগুলো নিয়ম মেনে আয়োজন করা যেন। এমন কাজ দেখার জন্য আগে থেকেই তৈরি আমাদের চোখ। কিন্তু সর্বশেষ কাজগুলো যেন বন্ধনহীন, বলগাহারা, মুক্ত। যেন বহুকালের আদল ভেঙে মুক্তবাতাসে বুকভরে শ্বাস নেওয়ার মতো স্বতঃস্ফূর্ততা এসব ছাপচিত্রকলায়। পেইন্টিংয়ের গুণাবলি তিনি তুলে এনেছেন নিজের ছাপাই ছবিতে। নিসর্গের ভেতর বাড়ির সৌন্দর্যকে বিশ্লেষণ করে গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে অর্জিত তার রূপ-রস-রং তিনি তুলে ধরেছেন নিজের চিত্রপটে। ফলে বিমূর্ত রীতিতেও প্রকৃতির  ভিতরকার প্রাণসঞ্চারী আবেদন সার্থকভাবে ফুটে ওঠে আলমগীর হকের চিত্রকর্মে। খুব সূক্ষ্মভাবে এসব অনুষঙ্গ পরিস্ফুট হয়েছে তাঁর কাজে। আর দীর্ঘকালের প্রবাসজীবনে তাঁর মনে যে আন্তর্জাতিকতা বোধের সৃষ্টি করেছে তা দিনকে দিন ঔজ্জ্বল্য পেয়েছে। নিজের  বোধ আর অভিজ্ঞতার সঙ্গে বহু সংস্কৃতির শিল্প অভিঘাত মিলে আলমগীর হক ছাপচিত্রী হিসেবে অনেকটাই পরিণত হয়েছেন, পরিশীলিত হয়েছেন। এসব বিবেচনায় বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত এ-প্রদর্শনীটি হয়ে উঠেছে তাৎপর্যময়।

কাইয়ুম চৌধুরী : জীবনের অন্যতম বন্দনা

মফিদুল হক

বাংলাদেশের প্রবীণ শিল্পী এবং শিল্পসম্ভারে জনচিত্ত, আলোড়িত ও সমৃদ্ধ করে চলা সৃজনমুখর চিত্রকর কাইয়ুম চৌধুরীর অশীতিতম জন্মদিন উপলক্ষে সাম্প্রতিককালে অঙ্কিত তাঁর আশিটি ছবি নিয়ে যে বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আত্মানুসন্ধান’। প্রবীণ কোনো শিল্পীর এতো কাজ একসঙ্গে দেখতে পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়, শিল্পীর কাজের গভীরতা ও মাত্রা মেলে ধরা এসব ছবির মুখোমুখি হয়ে ভাবতে হয় রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে কাইয়ুম চৌধুরী জীবনভর যে-আকুতির রূপায়ণ ঘটিয়েছেন তা স্বদেশের ও স্ব-সমাজের আত্মানুসন্ধান বটে, তবে এ আত্মকথা নয়, আত্মারই কথা। খটকা লাগে শিরোনামার ইংরেজি অনুবাদে, ‘কোয়েস্ট ফর দ্য সেলফ’ কি প্রকৃত অর্থে ‘কোয়েস্ট ফর দ্য সোল’ নয়? বাংলায় দুইয়ের ধ্বনিগত ও অর্থগত মিল রয়েছে, কিন্তু ইংরেজিতে বেছে নিতে হবে একটি অভিধা, আত্ম অথবা আত্মা। আবার ছবি দেখতে দেখতে এমনও মনে হতে পারে, এ-বুঝি ‘আত্ম’ থেকে আত্মার দিকেই যাত্রা, যে-যাত্রাপথে শিল্পের পাথেয় কেবল সঞ্চয় করেননি কাইয়ুম চৌধুরী, সতত সর্বত্র তা বিলিয়ে চলেছেন এবং ব্যবহারিক শিল্পে সৃষ্টিশীলতার যোগ ঘটিয়ে জনচিত্তে কি বিপুল শিল্প-বিপ্লবই তিনি ঘটিয়ে দিয়েছিলেন, যে খ্যাতি ও অবদান আবার তাঁর শিল্পীসত্তার জন্য বিড়ম্বনারই কারণ হয়ে উঠেছিল নানাভাবে।

Qayyum Chowdhury

Qayyum Chowdhury



আশিতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বড়মাপের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে - এমন অভিপ্রায় বেঙ্গল গ্যালারি অনেক আগেই ব্যক্ত করেছিল। প্রকৃত অর্থে বলা যায়, এই প্রদর্শনীর কিউরেটর বেঙ্গল শিল্পালয়ের পরিচালক সুবীর চৌধুরী। তাঁর পরিকল্পনা ও প্রণোদনাতে এমন বিশাল আয়োজন সম্ভব হয়েছে, শিল্পীও তাতে সায় দিয়েছেন। ফলে প্রদর্শনীর চিত্রকর্মের বড় অংশ জন্মোৎসবের কথা স্মরণে রেখে সৃজিত। প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ শিল্পপথ পাড়ি দিয়ে আশিতম জন্মদিনে এসে কাইয়ুম চৌধুরী কোন শিল্পচেতনা-উদ্ভূত শিল্পরূপ আমাদের সামনে মেলে ধরতে চাইছেন তার দলিল হয়ে আছে এ-প্রদর্শনী। তবে এমন দলিলের পাঠগ্রহণ খুব সহজ নয়, কেননা এর আপাত-সারল্যের অন্তরালে রয়েছে যে-গভীর চিত্রভাবনা তা অনেক সময় বুঝে-ওঠা দুষ্কর হয়।
তবে সর্বাগ্রে বিচার করতে হয় আশি বছরে এসে কী বলতে চেয়েছেন শিল্পী। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে মনে পড়তে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা, জন্মদিন ঘিরে অজস্র লেখা তিনি উপহার দিয়েছেন; কিন্তু সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে আশিতম জন্মদিন উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণ ‘সভ্যতার সংকট’, যা হয়ে আছে কবির টেস্টামেন্ট অব লাইফ, শেষ অভিভাষণ। ১৯৪১ সালের গোড়ার সময় থেকে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শারীরিকভাবে পীড়িত, বৈশাখে জন্মোৎসব পালনের মতো উদ্যম তাঁর ছিল না; কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং স্বদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের রুদ্ররূপ তাঁকে এতোটাই বিচলিত করেছিল যে, কিছু বলবার তাগিদে তিনি অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। এর ফলে রবীন্দ্রনাথের আশিতম জন্মদিনে আমরা পেয়েছি ‘সভ্যতার সংকট’ ভাষণ, লিখিত যে-ভাষ্যপাঠের সামর্থ্য কবির ছিল না, শান্তিনিকেতনে আয়োজিত জন্মোৎসবে ‘সভ্যতার সংকট’ তাঁর হয়ে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন। গভীর পরিতাপ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আজ আমার বয়স আশি বৎসর পূর্ণ হল। আমার জীবনক্ষেত্রের   বিস্তীর্ণতা আজ আমার সম্মুখে প্রসারিত। পূর্বতম দিগন্তে যে-জীবন আরম্ভ হয়েছিল তার দৃশ্য অপর প্রান্ত থেকে নিঃসক্ত দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি এবং অনুভব করতে পারছি যে, আমার জীবনের এবং সমস্ত দেশের মনোবৃত্তির পরিণতি দ্বিখন্ডিত হয়ে গেছে - সেই বিচ্ছিন্নতার মধ্যে গভীর দুঃখের কারণ আছে।’ জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে এক অন্ধ-সময়ের মুখোমুখি প্রায় যেন বিপর্যস্ত রবীন্দ্রনাথ, তিনি লিখেছেন, ‘আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি, - পিছনের ঘাটে কি দেখে এলুম কি রেখে এলুম, ইতিহাসের কি অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট, সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ!’
কাইয়ুম চৌধুরী যখন আশি বছরে পদার্পণ করে আমাদের জন্য উপহার দেন চিত্রসম্ভার তখন, সভ্যতার আরেক যে সংকট আমরা প্রত্যক্ষ করি, মনে হতে পারে তার সঙ্গে শিল্পীর চিত্রমালার কোনো যোগসূত্র নেই। বাজার-অর্থনীতির প্রচন্ড দাপটে যখন অর্থনৈতিকভাবে কেবল নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও তৈরি হতে চলেছে এক পণ্যভোগী আদর্শবিবর্জিত সমরূপ বিশ্ব, প্রতিবাদের অথবা বিকল্পের ক্ষেত্রগুলো খানখান হয়ে পড়েছে, বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলছে সংঘাত ও হানাহানি, বৃহৎ শক্তির দাপট সংঘাতের জবরদস্তি সমাধান ঘটাতে গিয়ে পরিস্থিতি করে তুলেছে আরো জটিল, সেই উদ্ধার-সম্ভাবনাহীন পটভূমিকায় কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্পরূপ কোন কথা আমাদের বলছে? যে-সুন্দরের আবাহন ও জীবনের বন্দনা কাইয়ুম চৌধুরীর চিত্রমালায় মনে হতে পারে তার সঙ্গে সংকটের কোনো সম্পর্ক নেই।
একান্ত প্রাচ্যদেশীর রীতিতে ‘সভ্যতার সংকট’ বক্তৃতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি গান পরিবেশন করেছিলেন, তাঁরই রচিত ও সুরারোপিত সংগীত। কাঁপা কাঁপা হাতে গানের কথাগুলো তিনি লিখেছিলেন, গাইবার উপায় তাঁর ছিল না, শিখিয়ে দিয়েছিলেন সংগীতভবনের শিক্ষাগুরুকে, জন্মোৎসবে শিক্ষার্থীরা দলগতভাবে পরিবেশন করেছিল সেই গান, ‘ঐ মহামানব আসে’। প্রচলিত ভাবনাধারায় আমরা এই গানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধ থেকে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো তাঁর ভাষণের অঙ্গাঙ্গি অংশ হিসেবেই বেঁধেছিলেন এই গান, বাঙালি যেমন আপন মনের গহিন উপলব্ধি প্রকাশে সুরে ও বাণীতে অনুভব করে স্বাচ্ছন্দ্য। যখন পুস্তকাকারে প্রবন্ধ হিসেবে ছাপা হয় ‘সভ্যতার সংকট’ কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকৃত তাঁর ইংরেজি ভাষ্য, ‘দি ক্রাইসিস ইন সিভিলাইজেশন’, তখন এই গান সেখানে আমরা পাই না, অথচ দুইয়ে মিলেই তো জন্মদিনের আবাহন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। আশ্চর্যজনকভাবে এই গানে ‘সভ্যতার সংকটে’র বেদনা ও হতাশার কোনো ছায়াপাত নেই, আছে জীবনের প্রতি প্রবল আশাবাদ, যে-আশাবাদ তিনি ব্যক্ত করেছিলেন ভাষণের শেষে, বলেছিলেন - ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’ এবং তাকিয়েছিলেন পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্তের দিকে, যখন একদিন অপরাজিত মানুষেরা সকল বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাওয়ার পথে। তাই ভাষণ-শেষে গীত হয়েছিল গান, ‘উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈঃ রব/ নবজীবনের আশ্বাসে।/ ‘জয় জয় জয় রে মানব-অভ্যুদয়’/ মন্দ্রি উঠিল মহাকাশে’।
‘আত্মানুসন্ধান’ চিত্রমালা দেখে মনে হবে আশি বছরে উপনীত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হতাশা নয়, আশাবাদ ব্যক্ত করতে চেয়েছেন কাইয়ুম চৌধুরী, প্রবন্ধের ভাষ্য নয়, গানের বার্তা হয়েছে তাঁর অবলম্বন, সভ্যতার সংকটের মুখোমুখি হয়ে যেমন গান বেঁধেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তেমনি সভ্যতার নবতর সংকটের কালে জীবনের প্রতি প্রবল আস্থার শিল্পরূপ সৃজনে নিমগ্ন হয়েছেন কাইয়ুম চৌধুরী।

Anushandan-65, Qayyum Chowdhury

Anushandan-65, Qayyum Chowdhury



দুই

‘আত্মানুসন্ধান’ প্রদর্শনীর আশিটি ছবির মধ্যে দিয়ে যে পরিক্রমণ, তা দর্শক-দৃষ্টি আকর্ষণ করবে দুভাবে, রঙের ঔজ্জ্বল্যে এবং ফর্মের সারল্যে। দুভাবে বলা হলো বটে তবে ছবিতে এই দুই ধারা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। বরাবরই কাইয়ুম চৌধুরীর কাজে থাকে একধরনের চিত্রধর্মিতা, যা নিছক চিত্ররূপ হয়ে থাকে না, রং এবং ফর্মের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে তিনি চিত্রের আপাতসারল্য অতিক্রম করে পৌঁছতে চান অন্যতর গভীরতায়। মানুষ যখন জীবনাভিজ্ঞতার নির্যাস আহরণ করে, দীর্ঘ জীবনপথ পাড়ি দিয়ে তাকাতে পারে অতিক্রান্ত সময়ের দিকে তখন আমরা স্বাভাবিকভাবে ধরে নিই জীবনের রং তার কাছে ফিকে হয়ে আসে, ধূসরতা আচ্ছন্ন করে বোধ। কিন্তু কাইয়ুম চৌধুরী জন্মোৎসবকে পরিণত করেছেন চিত্রোৎসবে এবং তিনি যেন রঙের এক হাট আমাদের সামনে উপস্থাপন করলেন।
কাইয়ুম চৌধুরীর প্রিয় শিল্পী পল ক্লি একবার বলেছিলেন, ‘রং আমাকে আচ্ছন্ন করে।’ কাইয়ুম চৌধুরীও তেমনি রং দ্বারা আচ্ছন্ন হয়েছেন এবং রঙের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করতে চেয়েছেন শিল্পানুভূতি। লাল, হলুদ, নীল এইসব প্রাথমিক রং তাদের সকল ঔজ্জ্বল্য নিয়ে ফুটে উঠেছে ক্যানভাসে। এমনকি কালো রঙের ব্যবহারেও কার্পণ্য করেননি শিল্পী। মোটা কালো রেখা অথবা কালোর ছোপ মিলবে অনেক ছবিতে। তবে সেই কালোও যেন চারপাশের ঔজ্জ্বল্য আরো বাড়িয়ে দেয়, স্বয়ং হয়ে ওঠে উজ্জ্বলতা। বৃষ্টিধোয়া প্রকৃতিতে যেমন সজীবতা, সদ্য-স্নাত নারীর যেমন স্নিগ্ধতা, সেই সতেজতা ও মাধুর্য যেন রঙের মধ্যে পুরে দিতে চান কাইয়ুম চৌধুরী। প্রদর্শনীতে রয়েছে শিল্পীর যে-আত্মপ্রতিকৃতি, ৬১-সংখ্যক চিত্র, সেখানে সাদা অংশ হিসেবে আছে ঘাড় ছাপিয়ে নেমে আসা প্রবীণ শিল্পীর চুল, আর প্রতিকৃতি ঘিরে রয়েছে ফুল, পাখি, নদী, নৌকো, মাছ, ঘুড়ি, লতাপাতার ফর্ম, আছে পাকা ফসলের হলুদ, গরুর গাড়ির চাকা, উজ্জ্বল আলোয় ভরা শিল্পীর ভুবন, আর রয়েছে এক অচিন পাখি, হাতে এসে বসা এই পাখির সঙ্গে শিল্পীর কথোপকথনই বুঝি প্রতিফলিত হয়েছে চিত্রমালায়।
ফর্ম নিয়ে জীবনভর কাজ করে চলেছেন কাইয়ুম চৌধুরী, নিজের জন্য বিশেষ সুবিধা তিনি গড়ে তুলতে পেরেছিলেন তাঁর কৃত ব্যবহারিক শিল্পে ফর্মের প্রয়োগ দ্বারা। জীবনভর তিনি ব্যবহারিক শিল্পের কত বিচিত্র ধরনের কাজই না করেছেন। প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে তাঁকে চেনে কয়েক প্রজন্মের মানুষ, তিনি প্রচ্ছদ চিত্রায়নে শিল্পের যোগসাধন এমন এক মাত্রায় নিয়ে গেছেন যার উদাহরণ বিশেষ মিলবে না। সংবাদপত্র সাময়িকীর রচনা-চিত্রায়ন, প্রকাশনার লে-আউট, টাইপোগ্রাফি ইত্যাদি সকল দিকে তাঁর নজর এবং এইসব কাজ এমন এক নিবিষ্টতা ও মমতা দিয়ে তিনি করেন যা ব্যাখ্যা করা কঠিন। একেবারে অাঁটসাঁট আড়ষ্ট যেসব কাজ, প্রতিষ্ঠানের লোগো তৈরি, লেটারহেড ডিজাইন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তিনি গ্রাফিক শিল্পীর কুশলতার সঙ্গে ফর্ম নিয়ে নানা খেলা যোগ করতে পারেন। পোস্টার, আমন্ত্রণপত্র, ব্রোশিওর, প্রচারপত্র, বিজ্ঞাপনের ডিজাইন সব কাজই তিনি করেন আনন্দচিত্তে। তিনি ফর্মের যে-সারাৎসার খুঁজে ফেরেন সেই অনুসন্ধানের সামাজিক অবলম্বন হয়ে উঠেছে ব্যবহারিক শিল্পে তাঁর অবাধ বিচরণ। এই অনুসন্ধিৎসা এবং প্রয়োগজাত উপলব্ধি ফিরে ফিরে তাঁর ক্যানভাসে যে মূর্ত হয়ে উঠবে সেটা বলা বাহুল্য। তবে আমাদের দেশে শিল্পবোধ ও শিল্পবিচারে যে আড়ষ্টতা ও গন্ডিবদ্ধতা তার ফলে কাইয়ুম চৌধুরীর কাজের এ-মতো মাত্রা বুঝে নিতে শিল্প-সমালোচকদের অস্বস্তি দুর্নিরীক্ষ্য নয়।
সম্প্রতি কাইয়ুম চৌধুরীর আশিতম জন্মদিনে অর্ঘ্য নিবেদনকালে এক শিল্প-সমালোচক লিখলেন যে, তিনি আমাদের বাণিজ্যিক ধারার প্রধান শিল্পী এবং শিল্পধারায়ও তাঁর বিশেষ স্থান রয়েছে। এমন কড়ে আঙুলে স্বীকৃতিদানকালে সমালোচক বিস্মৃত হলেন যে, বাণিজ্যিক ধারা প্রত্যয়টি বহু আগেই বাতিল হয়ে গেছে, বাণিজ্যিক বলে কোনো কথা নেই, ব্যবহারিক শিল্প হিসেবে তা এখন নন্দিত এবং ব্যবহারিক শিল্প ও শিল্পকলার মধ্যে ভেদরেখাও মুছে গেছে অনেক আগে। এই বিভাজন যাঁরা অতিক্রম করতে পারেন তাঁরা পারেন, যেমন পেরেছিলেন অ্যান্ডি ওয়ারহল, পেরেছেন আমাদের কাইয়ুম চৌধুরী, তাঁর মতো করেই বাংলার শিল্পধারা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। তবে আমাদের চিত্রভাবনায় সাবেকি কেতা এখনও বিশেষ প্রবল। চিত্রকলা বলতে আমরা এখনও বুঝি বর্গাকার কিংবা আয়তাকার ক্যানভাসে রঙের প্রলেপ, প্রদর্শনী বলতে বুঝি গ্যালারির পরিচ্ছন্ন পরিসরে সারবেঁধে ছবির প্রদর্শনী, যেখানে ধোপ-দুরস্ত দর্শক নির্দিষ্ট সময় মেনে এসে ছবি দেখবেন, কিনবেন, কিন্তু জীবনে শিল্পকলার উপস্থিতি তো এর বাইরে অনেক বিস্তৃত।
কাইয়ুম চৌধুরীর ছবির চিত্রধর্মিতা ছাপিয়ে ওঠে তাঁর শিল্পকর্মে ফর্ম ও রঙের উদ্ভাসন। তিনি যে স্বদেশ ও স্ব-সমাজের গভীরে শেকড় জারিত করে রস আহরণ করতে চান এবং সেই রসে সিঞ্চিত করেন তাঁর ক্যানভাস, সেটা নানাভাবে নন্দিত হয়েছে। সেইসঙ্গে এটাও লক্ষণীয়, ফর্ম কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্পস্পর্শে যেন-বা হয়ে উঠেছে কনটেন্ট। তাঁর ফর্ম বিমূর্ততা উৎসারিত অথবা বিমূর্ততা-অভিমুখী নয়, এই উৎস একান্ত লোকজ, যে-লোকায়ত শিল্প সবসময়ে ব্যবহারিক, সাবেকি কায়দায় বলা যেতে পারে বাণিজ্যিক। নিত্যকার কেনাবেচা ও ব্যবহারের সামগ্রীতে লোকশিল্পী যেভাবে শিল্পের মাত্রা যোগ করেন তা শনাক্ত করতে পেরেছিলেন জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান এবং সেই উপলব্ধির পথ ধরে জীবনভর পরিক্রমণে কাইয়ুম চৌধুরী ফর্মের বিশুদ্ধতায় যেন পৌঁছতে চাইছেন। ফলে তাঁর ছবিতে, বিশেষভাবে সাম্প্রতিক কাজে, কাঁথার ফোঁড়, পাখার নকশা, পিঠার ছাঁচ অথবা শখের হাঁড়িতে তুলির টান এসবের নবতর প্রয়োগ এমন এক রূপ অর্জন করে বহুকালের সাধনা ছাড়া সেই রূপে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। যেমন ধরা যাক জ্বলন্ত সূর্যের উপস্থিতি, কাইয়ুম চৌধুরীর ছবিতে বারবার তা ফিরে আসে মামুলি রূপক হিসেবে নয়, ফর্মের বহুবিচিত্র প্রকাশ হিসেবে। ক্যানভাসে সূর্য তো নিছক গোলাকার বৃত্ত, কিন্তু সেই বৃত্তে জীবনের বিপুল শক্তিময়তা পুরে দিতে শিল্পীকে  ভিন্নতর সাধনায় নিবিষ্ট হতে হয়। সেই ষাটের দশকে কাইয়ুম চৌধুরীর ক্যানভাসে সূর্য শীতল পাটির নকশা থেকে শুরু করে কতরকম প্যাটার্নেই না ফুটে উঠেছিল। সাম্প্রতিক কাজে সূর্যকে আমরা পাই পূর্বের আড়ম্বর ঝেড়ে ফেলে নকশার বিশুদ্ধতায় প্রকাশের আকুতি হিসেবে। এসব কাজের সারল্য অর্জনের পেছনে শিল্পের যে-দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়া এবং হাজারোভাবে উলটেপালটে সূর্য প্রতীক বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়াস, সেসব বিস্মৃত হলে চলবে না।
কাইয়ুম চৌধুরীর রঙের পক্ষপাতিত্ব ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই রং উঠে এসেছে লোকজ শিল্পধারা থেকে, শখের হাঁড়ি, কাঠের ঘোড়া, পাখার রঙিন সুতোর নকশা, কাগজের চড়কি ইত্যাদি উৎস থেকে রং আহরণ করেছেন তিনি। রঙের বিন্যাসে লোকজ ফর্ম ভেঙে প্রকৃতি ও মানুষের যে-চিত্র তিনি অাঁকতে চেয়েছেন, সেক্ষেত্রেও রঙের এক বিশুদ্ধতার প্রতি ক্রমান্বয়ে আকৃষ্ট হয়েছেন তিনি। সাম্প্রতিক কাজে, ‘আত্মানুসন্ধানে’, তাই দেখা যায় রঙের ঔজ্জ্বল্যে তিনি ভরিয়ে দিতে চেয়েছেন ক্যানভাস এবং সেই ঔজ্জ্বল্য বশে আনার জন্যে কখনো ছেড়ে দিয়েছেন সাদা জমিন, কখনো-বা ব্যবহার করেছেন কালো। রং তাঁর এসব ক্যানভাসে স্বয়ম্ভূ হয়ে উঠেছে, এও তাঁর সাম্প্রতিক কাজের বৈশিষ্ট্য, যখন রং স্বয়ং হয়ে ওঠে ছবির কনটেন্ট, যেমন ঘটে থাকে বিমূর্ত চিত্রকলার ক্ষেত্রে। বস্ত্তত, কাইয়ুম চৌধুরীর ছবির এমন অনেক খন্ডাংশ আমরা খুঁজে পেতে পারি যা বিমূর্ত চিত্র হিসেবে দাখিল করা যায়। শিল্পের ও জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অভিজ্ঞতার জারণের মধ্যে দিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী যে রঙের ঔজ্জ্বল্য ও তীব্রতার প্রতি ক্রমান্বয়ে আকৃষ্ট হতে থাকলেন, সেই অভিযাত্রা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় অাঁরি মাতিসের শিল্পযাত্রা। আশি বছরের উপান্তে এসে তিনি প্রায় পুরোপুরি নিজেকে সমর্পণ করলেন রঙের উজ্জ্বলতায় এবং ফর্মের বিশুদ্ধতায়। কাগজ কেটে তিনি বানিয়েছেন ফুল, পাখি, লতার নানা ফর্ম, প্রায়শ সেই রঙিন উজ্জ্বল কাগজ সেঁটে দিয়েছেন ক্যানভাসে, আর কোনো রং লাগানোর প্রয়োজন মনে করেননি। আর রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাস রাঙিয়েছেন লাল, নীল ও হলুদের উজ্জ্বলতায়, এমন এক তীব্রতায় যা আচ্ছন্ন করে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ানো দর্শক-হৃদয়। এইসব কাজ সম্পর্কে এক শিল্প-সমালোচক বলেছিলেন, ‘The canvas radiates it. The redness overflows and people standing in front of the picture to look are seen to have it reflected on them. They are included in it; they share in a natural condition of things and of painting.’ (Matisse - Lawrence Gowing, Oxford University Press, 1979).
কাইয়ুম চৌধুরী আশি বছরে উপনীত হয়ে যে ‘আত্মানুসন্ধান’ চিত্রমালা আমাদের উপহার দিলেন তা সর্বার্থে একজন আধুনিক মননশীল শিল্পীর জীবনভর সাধনার নির্যাস। এর আপাতসারল্য যেন অাঁরি মাতিসের আশি-উপান্তের কাজের সঙ্গে তুলনীয়, যে-সরলতায় পৌঁছতে প্রয়োজন পড়ে দীর্ঘ জীবনসাধনা, সতত অনুসন্ধিৎসা ও নিরন্তর সৃজনকর্মে মগ্ন থাকা।
কাইয়ুম চৌধুরী লোকশিল্পীদের মতোই ব্যবহারিক শিল্পকর্মে পান অপার আনন্দ এবং মানুষের নিত্যকার সামগ্রী শিল্পিত করে তোলা, তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনকে শিল্পমন্ডিত করা, এইসব কাজে সদা নিমগ্ন রয়েছেন। সেইসঙ্গে চলে তাঁর যে নিরন্তর শিল্পানুসন্ধান এবং দুইয়ের সম্মিলনে তাঁর শিল্প-দর্শনের ও রূপচেতনার পরিচয় পাওয়া যায় সাম্প্রতিক এইসব কাজে। এই জীবনবন্দনার মধ্যে নিহিত আছে গভীর জীবনোপলব্ধি, যে-উপলব্ধির ঘরানা আলাদা। ‘সভ্যতার সংকট’ এ-নয়, এ-হচ্ছে একই উপলব্ধির অন্যতর রূপ, ভাষণ এ-নয়, এ-হচ্ছে সংগীত, কিন্তু জীবন ও সভ্যতার নিবিড় অধ্যয়ন ও সম্পৃক্তির মধ্য দিয়েই বিকশিত হয় এমন নিবিড়তর উপলব্ধি যার অনন্যসাধারণ শিল্পরূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি ‘আত্মানুসন্ধান’ চিত্রমালায়।

বিজন চৌধুরী

ধীরাজ চৌধুরী

Calcutta Painters-এর সূত্র ধরে বিজনদার সঙ্গে পরিচয় - দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফট্স  (AIFAC) - রফি মার্গে প্রথম প্রদর্শনী হয় -  যেখানে মহিম রুদ্র, প্রকাশ কর্মকার, নিখিল বিশ্বাস, রবিন মন্ডলের ছবি প্রদর্শিত হয়েছিল - Calcutta Painters-এর যাত্রা শুরু। বিজন চৌধুরী তার মধ্যমণি। তাঁর drawing যেমন শক্তিমান, paintingও সাবলীলতার পরিচয় বহন করে... সবচেয়ে বড় যা - সেটা হলো, সুবক্তা ছিলেন। অনেক গুছিয়ে কথা বলতেন। শিল্পকলার জটিল বিষয় ছিল তাঁর নখদর্পণে। মানুষ হিসেবে সহজ-সরল, সদাহাস্য, সবাইকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল।
Calcutta Painters-এর সদস্যপদ নেওয়ার পর বিজনদার সঙ্গে আরো কাছাকাছি আসার সুযোগ পেলাম। বিশেষ করে শিল্পী থাপার জন্য ওই group-এর রাজধানীতে। প্রদর্শনী করার কথা হয়েছিল। এই প্রদর্শনী আয়োজনে আমার একটা ভূমিকা  ছিল। তাছাড়া দিল্লিতে আমি তখন স্থায়ীভাবে বাস করছিলাম বলে আমার বাড়িতে সবার অবাধ আসা-যাওয়ার জন্য... সব সদস্যকে অনেক কাছ থেকে দেখার-বোঝার ব্যাপার থেকে যেত। ঠিক ওই কারণে পরের দিকে কামরুল হাসান, আমিনুল ইসলাম, রশিদ চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল দিল্লিতে। মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতায় আমাদের সঙ্গেই আর্ট কলেজে ছিলেন। যেহেতু বিজনদা ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে পাশ করেছেন, জয়নুল আবেদিনের স্নেহধন্য ছাত্র - এবং কলকাতার সঙ্গে সবারই একটা common bonding ... সবার সঙ্গে আমাদের আরো অন্তরঙ্গ হওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছিল।
বিজনদার সঙ্গে অনেক art camp-এ কাজ করার, তাঁকে অন্তরঙ্গভাবে দেখার, কথা বলার জন্য পরস্পরকে বোঝার সুযোগ হয়েছিল। শিলচর চা-বাগানের art camp-এর স্মৃতি তো অম্লান হয়ে আছে।... বিশেষ করে ঢাকার বেশকিছু art camp-এ একসঙ্গে কাজ করেছি। ‘শেকড়ে থেকে ফেরা’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী হয়েছিল ঢাকায়। আমরা যেসব বাঙালি শিল্পী দেশত্যাগ করে চলে এসেছিলাম তাদের সবাই প্রদর্শনীতে ছিলাম। প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল ঢাকা ক্লাবে। এসব স্মৃতি এখনো সমুজ্জ্বল। আমিনুলদা, বিজনদার নানা প্রসঙ্গের আলোচনা... বিশেষ করে দুই বাংলার সমসাময়িক শিল্প-সমস্যা - ভাবিয়ে তুলত।

Bijan Choudhury

Bijan Choudhury



এই কয়েক মাস আগেই Calcutta Rowing Club-এ রবিন মন্ডল, তপন ঘোষ, অনিন্দ্য রায়চৌধুরী এবং পঞ্চাশ জন শিল্পীর সঙ্গে বিজনদাও ছিলেন। দারুণ উৎসাহের সঙ্গে একটা ক্যানভাসে ছবি এঁকে ফেললেন। এটাই সম্ভবত তাঁর শেষ চিত্র-কর্মশালা।
দিল্লিতে calcutta Painters-এর প্রদর্শনী শ্রীধরণী গ্যালারিতে চলেছে সগৌরবে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১-এ আমাদের বাংলাদেশের প্রদর্শনীর catalogue-এ introduction লিখে  দিয়েছিলেন। তাঁকে এক শিল্পরসিক প্রশ্ন করেছিলেন -  Calcutta Painters Groupটা Calcutta-র - যেখানে Delhi-র অনেক সদস্য ছিলেন - বিমল দাশগুপ্ত, ফাল্গুনী দাশগুপ্ত, জগদীশ দে, নীরেন সেনগুপ্ত এবং আমি - সবাই দিল্লি আর্ট কলেজের অধ্যাপক - এবং ‘painters’... যেখানে অনেকে sculpture-এ আছেন, বিপিন গোস্বামী প্রমুখ। সহাস্যে শ্রীমতী গান্ধী বলেন - ‘What’s in a name?’
 Page 1 of 39  1  2  3  4  5 » ...  Last »