ছোটগল্প আছে, নেই
হা সা ন আ জি জু ল হ ক
আমার কথা আলাদা। ধরবার যোগ্য নয়। জীবনে কিছুই প্রণালীবদ্ধভাবে শেখা হয়নি, জানা হয়নি, করাও হয়নি। সবই এলোমেলো, ডালে-চালে মেশানো। ওভাবে একমাত্র খিচুড়িই তৈরি হতে পারে। ছোটগল্প লিখতে শুরু করার আগে ছোটগল্প পড়লাম কখন যে, তা নিয়ে দুটো দরকারি কথা বলব? পঞ্চাশ বছর ধরে লিখছি। আমার লেখার শ্রেণিভাগ করার দায়িত্ব নিয়েছেন কিছুটা পাঠক, কিছুটা বা সমালোচক। তকমা জুটেছে – সাহস করে তকমা বলছি এজন্যে যে, চৌকিদারও তকমা পরে – আজকাল ছোটগল্পকারের। ছোটগল্প-লেখক, কথাকার, কখনো বা কথাশিল্পী। কথাসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার এসবও চলছে। কেমন করে বোঝাব, আমাকে গিলোটিনের তলায় ফেললেও ছোটগল্প কাকে বলে নিশ্চিত-অনিশ্চিত কোনোভাবেই বলতে পারব না। ছোটগল্প মরছে, না মরবে, না ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকবে – এ আমার পক্ষে বলা একেবারেই অসম্ভব। মনে পড়ে, একসময়ে এই তর্কটা তুলে দিয়েই লোকজন কেটে পড়েছিল। আমাদের মহান লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস খানিকটা ঝুঁকে পড়েছিলেন তর্কটায়, অনেক কথা বলে তিনি শেষ পর্যন্ত কিছুটা ছোটগল্পের মৃত্যুর পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস’া, উপন্যাসের সূত্রপাত, ব্যক্তির উৎকট গাত্রোত্থানের কথাগুলোও উঠে পড়েছিল। সংকোচের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাকেও তখন একটা কিছু লিখতে হয়েছিল। লেখাটা মুখ লুকোতে পারেনি, ছাপা হয়েছিল, আমার রচনাসংগ্রহের কোথাও এখনো নির্লজ্জভাবে রয়ে গেছে। যতোদূর মনে পড়ে, ওই লেখাটায় আমি ছোটগল্পের কোনো অসংশয় মৃত্যুঘোষণা করতে পারিনি। যার মৃত্যু বা আয়ু ঘোষণা করতে হবে সেটা যে ঠিক কী তাই নিয়ে যখন মনসি’র করতে পারি না, তখন ঘোষকের কাজটা করি কী করে? তাই আজকাল একরকম পড়িমড়ি করে মরিয়া হয়ে বলি, ছোটগল্প একধরনের টানা খানিকটা গদ্য লেখা (গদ্যই যে, তাতেও নিশ্চিত নই) যাকে পাঠক ছোটগল্প বলতে রাজি থাকেন।
এরকম একটা উদ্ভট বাজে কথা যে আজকাল বলতে বাধ্য হই, সেটা নেহাৎ বিনা কারণে নয়। ছোটগল্পের শেখানো-পড়ানো, লিখিত-অলিখিত, বলা-না-বলা যতোরকম সংজ্ঞা এ পর্যন্ত জানতে পেরেছি তাতে বোধ-বুদ্ধির ধার একটুও বাড়েনি, বরং সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ারই উপক্রম হয়েছে। আজ পর্যন- সায়েবদের উদাহরণ লোকে খায় বেশি। সেজন্যে তাঁদের উদাহরণই আগে দু-চারটে দেওয়া যাক। এ-কালের উদাহরণই আগে দিই। হেমিংওয়ের ‘দি ওল্ডম্যান ম্যান অ্যাট দি ব্রিজ’ ছোটগল্প তো দেড় পাতা? না দুপাতা? ওই একই লেখকের ‘দি স্নোজ অব কিলিমানজারো’ও কি ছোটগল্প? বেশ বড়ো লেখা, প্রায় উপন্যাসের স্বাদ পাওয়া যায়। অন্তত পঞ্চাশ-ষাট পৃষ্ঠা। ফকনারের একটা বেশ দীর্ঘ গল্প আছে ‘দি বিয়ার’; ছোটগল্প বলেই স্বীকৃত। এই গল্পটি তিনবার লেখা। একবার ‘লায়ন’, আর দুবার ‘দি বিয়ার’ নামে। শেষবার গো ডাউন মোজেস অ্যান্ড আদার স্টোরিজে ‘দি বিয়ারে’র পূর্ণাবয়ব একটা বয়ান আছে। তার পৃষ্ঠাসংখ্যা ছোট ছোট অক্ষরে ছাপা ১৩৬ পৃষ্ঠা। এটাও কি ছোটগল্প? ‘নষ্টনীড়’ কী? ছোটগল্প, না উপন্যাস? টেনে বড়ো করা ছোটগল্প, না টিপে-চেপে ছোট করা উপন্যাস? মার্কেসের ‘সরলা এরেন্দিরা…’ কি ছোটগল্প? এইসব ঝামেলায় পড়তে হয় বলেই কি বড়োগল্প, উপন্যাসিকা, নভেলা, প্রায়-উপন্যাস, ছোট-উপন্যাস – এসব নানা কথা চালু হয়েছে? ওপরের উদাহরণগুলো একধরনের। তুর্গেনিভ, তলস-য়, দস-য়েভ্স্কি, কতো কতো উত্তুঙ্গ স-ম্ভের মতো লেখকদের নিয়ে এসব কথাই তোলা যায়। কতো যে দ্বিধা করতে হবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য নিয়ে! তারাশঙ্করের ‘রসকলি’, ‘চৈতালি ঘূর্ণি’, ‘পাষাণপুরী’কে নিয়েও ধন্ধে পড়ে যেতে হয়। ‘বনফুল’ ছোট্ট ছোট্ট গল্প লিখে আমাদের কম বিপদে ফেলেননি। আমি এ পর্যন- যতোরকম সংজ্ঞা পেয়েছি ছোটগল্পের, উখো দিয়ে, কষ্টিপাথর দিয়ে ঘষে ঘষে দেখার চেষ্টা করেছি। কিছুতেই একটা মোদ্দাকথা ছেঁকে তুলতে পারিনি। এই লেখাটার সময়েই সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে যেমন-খুশি আলাপ চলছিল। দেখলাম, ছোটগল্পের মরা-বাঁচা নিয়ে তিনি মোটেই উদ্বিগ্ন নন। প্রশ্নটাই অবান্তর। যেন প্রশ্নটা নেই, ছোটগল্প, মহাকাব্য, উপন্যাস, কবিতা, লিরিক কবিতা ইত্যাদি সবই আছে দিনের আকাশে রাতের তারার মতো। তারা যায় আর আসে। এক রূপে যায় আর এক রূপে আসে, পুরোপুরি বদলেও আসে। মহাকাব্য কি উপন্যাস হিসেবে ফিরেছে? ছোট লিরিক কবিতা কি এখন আর আগের মতো জনপ্রিয় আছে? আবার কি দীর্ঘ কবিতা ফিরছে না! ছোটগল্প কি এখন আর ক্যামেরায় সেকেন্ড-স্থায়ী ‘ছাপ’টির মতো হবে না?
এসব প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না। যে পারবে তার নাম জানি না। সব শিল্পই ভোল পালটাচ্ছে। একবার করে গা-ঝাড়া দিচ্ছে আর একটা করে নতুন চেহারা নিচ্ছে। ছবি গান নাচ কবিতা কথা একেবারে নিমেষে নিমেষে আকার বদলাচ্ছে। তারপরও কথা : শুধুই কি ভোল? শুধুই খোলস আর আকার? অতি ক্ষুরধার কঠিন বজ্রমুখ খোলস ভেঙে, আকার ভেঙে আত্মা পর্যন্ত (সেটা আবার কী? আছে নাকি? থাকুক, না থাকুক, আছে ধরে না নিলে ‘আছি’ই বা কেন?) বদলটা পৌঁছে যাচ্ছে না? ইতিহাসের মৃত্যুর সদম্ভ ঘোষণা দিলেই কি ইতিহাস চলে যায়?
আমি জানি, একটা গোলমেলে জায়গায় নিজে এসে পড়েছি, যে পাঠক সঙ্গে আছেন তাঁকেও সেখানে এনে ফেলেছি। এমন যে হয়ে গেল তার একটা বড়ো কারণ আমার প্রণালীহীন জানা শেখা শোনা! কী অসম্ভব এক পাড়াগাঁয়ে জন্ম আমার! মানুষ সেখানে দূরত্ব পেরোত হেঁটে, গরুর গাড়িতে কিংবা পালকিতে। একটা মার্টিন কোম্পানির ‘ন্যারো-গেজ’ রেললাইন আছে জেলাশহর থেকে মহকুমাশহর পর্যন্ত। কোমর ভেঙে কেউ শয্যাশায়ী হতে চাইলে গাঁয়ের অনেক দূর দিয়ে যে বাস দিনে একবার বা দুবার জেলাশহর থেকে মহকুমাশহর যায়, তাতে চড়তে পারে। গাঁয়ে আছে শুধু জাঁকালো নামের একটি স্কুল – এক মহারাজার রানীর নামে। বর্ণ পরিচয়, নীতিমালা এক, দুই, তিন, চার ভাগ পড়া শেষ করে প্রথম বই পড়েছি ধ্রুব। ওঃ, সে কী অভিজ্ঞতা! তারপরে কাজললতা, খগেন্দ্রনাথ মিত্রের ঝিলে জঙ্গলে, কোনো এক গোপাল ভৌমিক মশাইয়ের লেখা পৃথিবীর বড়ো মানুষ যার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, সক্রেটিস ইত্যাদির সঙ্গে অ্যাডল্ফ হিটলারও আছেন। তারপর পড়া শুরু হলো ছোটদের রামায়ণ, মহাভারত, সেইসঙ্গে বাঁধানো প্রবাসী, ভারতবর্ষ, বসুমতী। এক একটার ওজন চার থেকে পাঁচ কেজি। অবশ্য হ্যাঁ, এইবার কিছু কিছু চলমাফিক ছোটগল্প – প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের। তাতে ছোটগল্পের কিছুমাত্র ধারণা হলো না। নারীদস্যু সোনিয়া সার্লিং, কুম্ভমেলা, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস – এইসব পড়ব, নাকি আদত ছোটগল্প পড়ব? দুর্ভিক্ষপীড়িত, প্রায় জনশূন্য লোকালয়ের নির্জন স্টেশনে বদলি হওয়া স্টেশনমাস্টারের ঘরে রাতদুপুরে এক ভাগ্যলাঞ্ছিত নারীর আগমন। আলো জ্বালতেই সামনে দাঁড়িয়ে সেই নারী। প্রায় উলঙ্গ, ডাকিনির মতো রুখুচুল, শীর্ণ কংকাল একটি : দেশলাই খুঁজতে এসেছিনু! ছোটগল্প নাকি জানি না। অবশ্য স্বীকার করবো রবীন্দ্রনাথ খুব কাছেই ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ ছায়া; দেশজুড়ে, পৃথিবীজুড়ে। এই ‘চিরসখা’ কখনো ছেড়ে যাননি। তারপর কিছু বঙ্কিমচন্দ্র, কিছু শরৎচন্দ্র-ও সঙ্গী : কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকানে-র উইল। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান-, বৈকুণ্ঠের উইল ইত্যাদি। এসব লেখা সংক্ষেপিত সংস্করণে মিলত। দুধের বদলে ঘোলেই সন’ষ্ট। আর ওই বড় ভাইবোনদের পাঠ্য বইগুলো! পথের পাঁচালী থেকে অপুর পাঠশালা; পাঠ্য মহাপ্রস্থানের পথে থেকে খানিকটা তুলে দেওয়া অংশ। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান- থেকে আঁধারের রূপ বা নতুনদা, বহুরূপী, ভাগলপুরে ফুটবল খেলা আর সেই অপূর্ব স্বাদু, সৌকর্যে অতুলনীয় রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের একটা ছোট সংস্করণ। তাতে ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘স্বর্ণমৃগ’, ‘সম্পত্তি-সমর্পণ’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘গুপ্তধন’ – এসব গল্প! অল্প কদিন মেঘনাদ বধ কাব্য নিয়ে হুলুস্থুল। তবে আমার গর্ব তখন : দেব সাহিত্য কুটিরের এক টাকা দামের হেমেন্দ্রলাল রায়, বুদ্ধদেব বসু, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী ইত্যাদির লেখা গোয়েন্দা, অভিযান, শিকার-কাহিনির মোট কুড়িটা বইয়ের সংগ্রহ। একটা ভাঙা কাঠের আলমারিতে রাখা ছিল।
তাহলে আমার কালের ছোটগল্প কি পড়া হলো? কিছুমাত্র না। তরল আবেগ তখন নাচিয়ে বেড়োচ্ছে, মাথার ভিতরে ধূসর পদার্থটা একেবারে নরম তলতলে। যা-ই পড়ি আর যা-ই করি, সবই এলোমেলো, উলটো-পালটা। দু-মুখী, তিন-মুখী, বহুমুখী ছাপ পড়েছে সেখানে। ছাপের উপর ছাপ। কোনোটায় ঘন করে কালির পোচ, কোনোটা প্রায় শুকনো। এমনি করে পড়া এগোচ্ছে। এখন হিসেব করে দেখি, সমস- স্কুলজীবনটায় পড়ার বৈচিত্র্য আর পরিমাণটা তেমন কম নয়। সে-সব পড়ার টাটকা তাজা রস প্রাণভরে গ্রহণ করেছি। ফলে রুচি, বোধ, কল্পনা, আবেগ একটা নির্দিষ্ট পথ পেয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়। শুধু মানা হয়নি কোনো বিধি-প্রণালী। একেবারে বাদ পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথ-পেরুনো নতুন সময়ের ছোটগল্প আর কবিতা। সারা স্কুলজীবনে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে ইত্যাদি আধুনিকদের একজনেরও নাম শুনিনি। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় ভূদেব চৌধুরী না কার একটা রচনা বইয়ে উদ্ধৃত : ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস-ীর কারুকার্য’ পড়ে আনন্দে, নেশায়, মাধুর্যে, সময় আর সভ্যতার ধূসরতায় আচ্ছন্ন হয়ে কীভাবে যে সকাল-দুপুর-অপরাহ্ণ কাটিয়েছিলাম, তার কোনো বর্ণনা হবে না। কবির নাম দেখি, জীবনানন্দ দাশ। একেবারে সেকেলে নাম। শুনলেই মনে হয় গাঁয়ের কোনো বুড়ো মানুষের নাম বোধহয়। আধুনিক কবিতার কথা তো এই! তুলনায় নানারকম গদ্য বরং অনেক পড়া হয়ে গেছে। গল্প বলতে বুঝে গেলাম দক্ষিণারঞ্জন মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি। ওই বইটারই অনুকরণে আরও কিছু গল্পগাছা – জাপানি ফানুস, আয়নার কাণ্ড, আরাকান বিভীষিকা (বইটার শেষ অর্ধেকটা ছিল না, এখনও জানতে ইচ্ছে হয় পাহাড়টা দুভাগ হয়ে যাবার পরে মমতার ভাগ্যে কী ঘটলো)। পাঁচকড়ি দে-র ঢাউস-ঢাউস গোয়েন্দা-কাহিনি, নীহাররঞ্জন রায়ের কালোভ্রমরসহ কিরীটি রায়ের নানা কীর্র্তি-কাহিনির লোমহর্ষক বিবরণ, শশধর দত্তের মোহন-সিরিজ। মাঝখানে দুম করে আনোয়ারা, মনোয়ারা, জোহরা ইত্যাদি। এসব কথা মোটেই বলবার নয়। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে আমাদের মতো পাড়াগেঁয়ে স্কুলপড়-য়ার পড়াশোনাটা এইরকমই হয়। বিশ্বাস হতে চাইবে না যে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক পড়েছি এম.এ. পাশ করবার পরে, আর ওই মানিকেরই পুতুলনাচের ইতিকথা পড়া হচ্ছে এম.এ. পড়ার সময়। প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন-্য সেনগুপ্ত, প্রবোধ সান্যাল, বুদ্ধদেব বসু – এঁদের গল্প একেবারেই পড়া হয়নি তখন। শৈলজারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের বেশ বড়ো একটা গল্পসংগ্রহ থেকে একদিন বিকেলে বাম-রাজনীতির কর্মী ক্লাস নাইনে-পড়া আমাদের বন্ধু শচীন প্রেমতপ্ত কণ্ঠে কী যেন একটা আধঘণ্টা ধরে পড়ে শুনিয়েছিল। গল্প হলেও হতে পারে। শচীন বাউরিপাড়ায় বাগদিদের সঙ্গে থাকতো, খেতো। সেজন্যে হিন্দু-মুসলমানের কাছে অচ্ছুত। শুধুু আমরা, তার বন্ধুরা, বাউরিদের সেই ছোট্ট মাটির ঘরটায় বেলা এগারোটা থেকে দুপুর তিনটে পর্যন- কাটিয়ে দিতাম।
তবে আশ্চর্য ছিল আমাদের স্কুল-লাইব্রেরিটা। পৃথিবীটা যে খুব বড় আর সাহিত্য যে মনের মধ্যে আকাশ ঢুকিয়ে দেয় চন্দ্র-সূর্য-তারাসহ, এই কথাটা তখন লুকিয়ে গিয়েছিল মনের তলায়; আজ চেতনায় তা প্রকাশ পেয়েছে বুঝতে পারি। মোটে তিন আলমারি বই। অনিচ্ছুক লাইব্রেরিয়ানের কাছে কাকুুত-মিনতি করে সপ্তাহে একদিন শুধু স্কুলের শেষ পিরিয়ডে বই পাওয়া যেত দু-একটা। একদিন পেলাম এরিক মারিয়া রেমার্কের অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। অনুবাদক : অবনঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। একটা বইয়ের এত অপরিমেয় শক্তি? কতটুকু বই? পড়ার পর বলতে পারি না কী হয়েছিল আমার? মানুষের কষ্ট, যন্ত্রণা যেমন, ঠিক তেমনি মানুষের সাহস, ভালোবাসা, আনন্দ, লড়াই – ধরিত্রী যার নাম – সেই ধরিত্রীও ধরে রাখতে পারে না। পাত্র হিসেবে পৃথিবীটা ছোট। মানুষের ভিতরের পৃথিবী আরও অনেক বড়। তিন আলমারির মাঝখানটার নিচের তাকে বই খুঁজছি, ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন লাইব্রেরিয়ান মণীন্দ্র স্যার। অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে। একটা বই খুঁজতে কতক্ষণ লাগায় দেখো! খুঁজতে-খুঁজতে পেয়ে গেলাম আলেকজান্ডার দুমার দি ব্ল্যাক টিউলিপ। বেশি বড় নয়, বাংলায় অনুবাদের বইগুলো যেমন হতো তখন। বেশ সংক্ষেপ করা। সারাদিন এই বই পড়েছিলাম। সন্ধের দিকে শেষে হলো। ফুটলো দুর্লভ কালো টিউিলিপ শেষ পর্যন-! এখন আর সেই কাহিনির কিছুই মনে নেই, শুধু এইটুকু মনে পড়ছে, দুঃসহ আনন্দ কাকে বলে সেই আমি প্রথম বুঝেছিলাম। এইরকমই একবার বসনে-র টীকা নেবার পরে জ্বর এসেছিল, শীতকালের রোদটা ভালো লাগছিল, হাতে ছিল সত্যজিতের প্রচ্ছদ আঁকা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজকাহিনী। রোদ-ঝিমঝিম দুপুরে, জ্বরের নেশার মধ্যে কোথায় গিয়েছিলাম আমি? শিলাদিত্যের রাণী পুষ্পবতী সোনার সূঁচে সোনার সুতোয় একটা রূপোর চাদরে নকশা আঁকছিলেন রাজার মাথার পাগড়ির জন্য। চাঁপার কলির মতো আঙুলে সূঁচ ফুটে বেরিয়ে এলো এক ফোঁটা প্রবাল-লাল রক্ত। তাড়াতাড়ি ধুতে গিয়ে সেই এক ফোঁটা রক্ত পুরো চাদরে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর কাহিনির পর কাহিনি। আরাবল্লীর পাহাড়, ঘন অরণ্যে অন্ধকার রাত, বাপ্পাদিত্য, ভীলরাজা, হাম্বীর, সংগ্রামসিংহ, এঁদের সব কাহিনি। কতবার পড়েছি এই বই। তবু সেই প্রথম পড়ার স্মৃতি স্মৃতির ছাই-ভস্মের তলা থেকে আজও ঝিকিয়ে ওঠে। আগেই বলেছি, মাথার ভিতরে ধূসর বস’ তখনো ছিল নরম তলতলে। এই মুহূর্তে তখনকার সেই অবস’াটাই বর্ণনা করছি। এখন দেখছি কোনো কোনো ছাপ তাহলে পড়েছে জীবন-স’ায়ী অমোচনীয় কালিতে।
লিখতে বসেছি ছোটগল্পের কথা, এখন পর্যন- প্রায় কোনো কথাই বলা হলো না। নিজেই নিজেকে জিগ্গেস করছি : এমনভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে কেন? আবার জড়িয়ে যাওয়াটাকে একেবারে বেঠিক বলতেও মন চাইছে না। গদ্যই তো পড়ে গেলাম, কথাসাহিত্যই। তবু বাংলা-সাহিত্যের সেই সময়টার খবর পেলাম না। ইংরেজি ভাষাটা তখন প্রায় কিছুই জানি না। তবু আশ্চর্য, এরকম অসম্ভব পাড়াগাঁয়ে সবকিছু টপকে অক্ষম-সক্ষম বাংলা অনুবাদ হাতে এলো ওই স্কুলের লাইব্রেরি থেকেই : এ টেল অব টু সিটিজ, ট্রেজার আইল্যান্ড, উঁচু-নিচু অদ্ভুত অসমতল সব বই। পুষ্পময়ী বসুর অনুবাদ গর্কির মা। দস-য়েভ্স্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট, অশোক গুহের অনুবাদ রেমার্কের তিন বন্ধু, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের চার না পাঁচখণ্ডে অনুবাদ তলস-য়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস। রমা রলাঁর জাঁ ক্রিস-ভের ছোট ছোট কয়েকটি খণ্ড, নানাজনের অনুবাদ। আবার সম্ভবত অশোক গুহেরই অনুবাদ রঁলার বিমুগ্ধ-আত্মা (কী রকম মাঝখানের একটা খণ্ড! কিছুই বুঝতে পারিনি), দস-য়েভ্স্কির ব্রাদার্স কারামাজভ, আর শেষ পর্যন- বালজাকের ওল্ড গোরিও। এই শেষ দুটো বই পড়েছি বলে উল্লেখ করা নিদারুণ ধৃষ্টতা হয়ে গেল সে-কথা তখনও জানি, এখনও জানি।
এত কথা এত বিশদ করে বলতে-বলতে পাঠকদের সঙ্গে-সঙ্গে আমি নিজেও আমার নিজের পড়া সাহিত্যের প্রথম অধ্যায়টিকে একটু আঁচড়ে-আঁচড়ে দেখে নিলাম। এটা ঠিক যে, জীবনের অনেকটা দূর পর্যন- এসেও আমি বিশ শতকের আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের তেমন দেখা পাইনি। রবীন্দ্রনাথকে হিসেবের বাইরে রাখছি। কারণ তাঁকে তো আজও সম্পূর্ণ পড়া হয়নি। পড়তেই থাকব সারাজীবন।
আমার লেখালিখির শুরু মোটামুটি পনের বছর বয়স থেকে। অসি’র, অ-মনস’ সূত্রপাত। প্রথমে গুটি-গুটি খুদে খুদে কালো অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস শুরু। ধুলোভরা, রোদ-জ্বলা দুপুরগুলিতে একটা বড় টেবিলে বুক পেতে শুয়ে-শুয়ে লেখা। ভীষণ গরমের মধ্যে লিখতে আমার আজও ভালো লাগে। নেশায়-নেশায়, লেখায়-লেখায় যেন তালের রস মেশানো। উপন্যাসটা একশ পৃষ্ঠা লিখে ইস-ফা দিলাম। তারপর কলেজে ঢুকে মোটে তিন-চারটে গল্প না কী জানি! কিছুই মনে নেই। তখন ননী ভৌমিকের ‘জল’ নামে একটা গল্প আমার সঙ্গে-সঙ্গে ছিল। এইরকম দু-একটি গল্প মফস্বল পত্রিকায় পাঠানো হয়েছিল, ছাপাও হয়েছিল। ঢাকার স্পন্দন পত্রিকায় গল্প পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে বাপরে কী ভয়ানক বলে পত্রিকাটাই বন্ধ হয়ে গেল!
তারপর দীর্ঘ একটা কবিতা – সোজনবাদিয়ার ঘাট তখন সদ্য পড়া – পাঠানো হলো কলকাতার নতুন সাহিত্য পত্রিকায়, কাঠ পেনসিলে ‘অমনোনীত’ লেখা, পত্রপাঠ ফেরত এলো। আবার একটা উপন্যাস লেখা শুরু। শেষও হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। এরপর দু-তিন বছর ধরে শুধুই কবিতা, একটা বাঁধানো খাতা প্রায় ভর্তি হয়ে গেল। এইভাবে ছয় বছর ধরে অব্যবসি’ত চিন-ায়, সংকল্পহীনতায় এলোমেলো, দীক্ষাহীন নিরর্থক জাত-বেজাত অক্ষরের ডাঁই সাজানো চললো। মাথার ভিতর গ্রে ম্যাটার তখন টগবগ করে ফুটছে। কী লিখব ঠিক নেই। শুধু একটি কথা ঠিক আছে, লিখতেই হবে। তারপর একদিন পনেরো থেকে একুশ বছর পর্যন- সমস- লেখায় মোটা কালো কালির দাগ দিয়ে একটা ঢ্যাঁড়া টেনে দিলাম।
এইবার আমি খুব নির্দিষ্ট করে জানি, কবিতা লিখতে চাই না। গদ্য লিখতে চাই। সেই লেখাকে কী বলা হবে কিংবা কী বলা হোক বলে আমি ইচ্ছা করি, তার একটু ধারণাও নেই। লিখবই, কিন’ আঁকড়ে ধরার যে কিছু নেই। আমার শাস্ত্র নেই, গ্রন’ নেই, নমুনা নেই, একটা কোনো তৈরি বিধি সামনে হাজির নেই, কোনো সূত্র জানা নেই। কোথাও কোনো পরম্পরার চিহ্ন মাত্র নেই। অথচ চেতনা সি’র-নিবদ্ধ করে দেখতে পাই ভিতরে আকাশ-মাটি মোটেই শূন্য ফাঁকা নয়। মাটিতে আছে সবুজ ঘাসের আস-রণ, নদীতে আছে প্রবল স্রোত, সতেজে বেড়ে উঠছে বিশাল বনস্পতি, সাগরে সাগরে আছে উত্তাল ঢেউ, আকাশেও আছে গ্রহ-তারা-নক্ষত্র : রয়েছে জটলাবদ্ধ অস্ফুট নক্ষত্রময় ছায়াপথ। আর শেষ কথা, সমস-টাই মানুষে পরিপূর্ণ। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম কি না জানি না, কিন’ ঘটে গেল তেমনটাই; লিখতে গেলে লিখতে হবে এই অস্পষ্ট, আবছা, অসংগঠিত, রীতি-প্রণালীমুক্ত, আলোকিত কিংবা অন্ধকার-ঢাকা মানুষ পরিপূর্ণ আকাশ-মাটির ভিতরে থেকেই। খুব বড়ো আলগা একটা কথায় একেই বোধহয় বলি পৃথিবীজুড়ে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা। এই পুঁজিটুকুই সম্বল করেছিলাম। খুব সামান্য পুঁজি। একুশ বছর বয়সে কতোটুকুই বা হতে পারে এর পরিমাণ? আমি সাধ্যমতো বিচার করে দেখেছি, কল্পনা, উদ্ভাবনা-শক্তি, আমার প্রায় নেই-ই, গল্প লিখতে বা বলাতে কোনো কুশলতাও নেই। আধুনিক গল্প তখনও যেহেতু পড়া হয়নি, সেজন্যে বাংলা গদ্য, গল্পের ভাষা কেমন বদলিয়েছে, বদলাচ্ছে, আধুনিক মনোভাবই বা কী, সাহিত্যের একটা শাখা হিসেবে ছোটগল্প কোথায় পৌঁছেছে, শুরু করার সময় এইসবের প্রায় কিছুই জানা ছিল না। আমি নির্ভর করেছি জীবনযাপনের হাড়-কাঠামোর ওপর। একেবারে নেহাত সাধারণ বোধের ওপর। সোজা কথায় ‘স্বাভাবিকের’ মুখোমুখি হয়ে। যদি কিছু গাঁথি, ইট যেন সরাসরি দেখতে পাওয়া যায়, পলেস-রা করবার দরকার নেই। মানুষের যা কিছু আচরণ, অন-রিন্দ্রিয় বহিরিন্দ্রিয় আমাদের জানাতে পারে সেটাকে অতিক্রম করা হলেও তা যেন পুরোপুরি বিযুক্ত নিরবলম্ব হয়ে না যায়।
ষাট সালের গরম কালের দিনে দরজা-জানালা বন্ধ। আধো আঁধার একটা ঘরে বুকের তলায় বালিশ দিয়ে কবিতা লেখার খাতাটার মাঝখানের পাতাগুলিতে দুদিন না তিনদিন মনে নেই, একটা ত্রিমাত্রিক নিরেট ঘটনাকে ভাষায় অনুবাদের চেষ্টা করলাম। লেখাটার নাম দেওয়া হলো ‘শকুন’। যাঁরা পড়লেন তাঁরা একে বললেন ছোটগল্প। তারপর মোটামুটি যাই-ই লিখি পুরো দুটি দশক জুড়ে, তাই ছোটগল্প হিসেবে পাঠক-সমালোচক পড়েছেন। কিছু ব্যক্তিগত গদ্য বলে চলেছে। মোটামুটি আশির দশকের আগে বিচার আলোচনামূলক গদ্য আমি তেমন লিখিনি। প্রায় সবই ছোটগল্প। পাঠকেরা সেইরকমই বলেছেন। শেষ পর্যন- পরিচয় জুটেছে ছোটগল্পকারের। আমার আপত্তি করারও কিছু নেই।
তবে এইবার স্পষ্ট করে স্বীকার করতে হবে ছোটগল্পের রূপ, অবয়ব, লিখন-ভঙ্গিমা, ভাষা, বিশেষ কোনো একরকম দক্ষতা এসবের সঙ্গে প্রায় পরিচয়হীন থেকে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যখন লিখতে শুরু করি সেই অবস’াটার কিন’ এখন পুরোপুরি বদল ঘটেছে। আমি গভীর অনুরাগ আর আগ্রহের সঙ্গে যেমন সাহিত্য পড়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি অনুরাগ, আগ্রহ আর প্রত্যাশা নিয়ে ছোটগল্প নামে সাহিত্যের এই বিশেষ শাখাটিতে চলাচল করেছি। পড়াশোনার ব্যাপ্তি বোঝানোর জন্যে মোটেও এই কথা বলছি না আমি। কারণ শাদামাটা সংকীর্ণ অর্থে জানার জন্যে, জানানোর জন্যে, শেখার জন্যে, শেখানোর জন্যে, প্রদর্শনের জন্যে বা পাঠকের চোখ টানার জন্যে আমি সাহিত্য প্রায় পড়িইনি বলা চলে। শুধু নিজের বৃদ্ধির জন্যে, জীবনের সার সংগ্রহের জন্যে, বাঁচা আর বাঁচানোর রসদ সংগ্রহের জন্যে সাহিত্য পড়েছি। ছোটগল্পের কাছে এইজন্য খুব বেশি গিয়েছি। তবে আনন্দ আর উপভোগের জন্যেই সাহিত্য এইরকম সস্তা কথাটা আমি কিছুতেই বলব না। মানুষকে সবদিক থেকে সবচেয়ে উঁচুতে তুলে ধরতে পারে কিনা সাহিত্য সেটা আমি নির্মোহের সঙ্গে ওজন করে দেখতে চাই। এটা একটা খুব সাধারণ লক্ষ্য বলেই আমার কোনো বাছ-বিচার নেই। সাহিত্য-শিল্পের সব শাখার কাছে নিত্য ধরনা দেওয়া আমার অভ্যেস হয়ে গেছে।
মানব-অস্তিত্বের সঙ্গে যা কিছু কোনো না কোনোভাবে যুক্ত তার প্রতি আগ্রহ আর প্রত্যাশার কোনো সীমানা আমার কাছে নেই। এজন্যেই ভাগাভাগির বিষয়টা আমার কাছে অবান-র বলে মনে হয়। এ-কথা ঠিক আমি দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীর পুরো ছোটগল্পের দিগন্তটা ঘুরে আসতে পারিনি। দুটিমাত্র ভাষা আমার সম্বল; না জানি ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান – এমনকি উপমহাদেশের হিন্দি-উর্দুটাও জানি না। ইংরেজি ভাষার প্রতি আমি অবধিহীন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। এই ভাষার বণিকি-চেহারার বাইরে, সারা পূর্ব-পশ্চিম পৃথিবীর সাহিত্য, শিল্প, চিন-া, দর্শনের প্রায় সব সম্পদ নিজের ভাণ্ডারে মজুদ করে রেখেছে ইংরেজি ভাষা। সেজন্যই মনে হয় না গোটা দিগন- পরিক্রমা আমার পুরোপুরি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। সেজন্যই এখন আর আমি নিশ্চিত চূড়ান- করে বলতে পারি না সাহিত্যের চিরকালের বিভাজনগুলোকে জলবিভাজিকার মতো অটুট, নিশ্ছিদ্র করে রাখা যায় কিনা, রাখা ঠিক কিনা? এলোমেলো বিচ্ছিন্ন হাজার হাজার পাঠ-অভিজ্ঞতার বন্ধ দরজা খুলে দেখছি : হেমিংওয়ের ছোটগল্প ‘দি ওল্ডম্যান অ্যাট দি ব্রিজে’ দেখি (এক সময় আমি নিজেই অনুবাদ করেছিলাম ‘ব্রিজের ধারে বৃদ্ধ’ নামে) যুদ্ধের তাণ্ডবে লোকালয় শূন্য করে সবাই পালাচ্ছে, বৃদ্ধটিও; তার কেউ নেই, পিছুটান কিছু নেই, তার কুকুর-বেড়াল যে যার মতো আশ্রয় খুঁজে নেবে, চিন্তার কিছু নেই, কিন্তু পাখিগুলি যে রয়ে গেল তাদের কে খেতে দেবে? হায় হায়, তাদের কী হবে? ছোট্ট এক টুকরো ছবি আর বর্ণনা। এই সাথেই নিক এডামের ছোট ছোট নকশার কথা মনে পড়ছে। নিকের ডাক্তার বাবা ভোঁতা একটা ছুরি দিয়ে গরিব ইন্ডিয়ান বউটিকে খালাস করাচ্ছে পেট কেটে। অ্যানেসি’শিয়া ব্যবহারের বালাই নেই। বেরুল একটা তামাটে রঙের বাচ্চা। গলা-ফাটিয়ে চিৎকার করে সে পৃথিবীতে তার উপসি’তির জানান দিচ্ছে। স্বামীটা শুয়ে ছিল বউটির বিছানার ঠিক ওপরের বাঙ্কারে। তাকে বাচ্চা দেখাতে গিয়ে ডাক্তার দেখলেন, প্রসূতির আদিম আর্তনাদ সহ্য করতে না পেরে সে লোকটা একটা ব্লেড দিয়ে তার নিজের গলা এ-কান থেকে ও-কান পর্যন্ত কেটে ফেলে শেষ শানি-র ব্যবস্থা করে ফেলেছে। কতটুকু লেখা? কী বলে এইটুকু লেখা? ‘দি স্নোজ অব কিলিমানজারো’ অবশ্য বড়ো গল্প। তাতে দশটা উপন্যাসের ব্যাপ্তি। লেখক হ্যারির পায়ে গ্যাংগ্রিন দাঁড়িয়ে গেছে, মৃত্যু এগিয়ে আসছে একটু একটু করে। জীবনের প্রতি তার ঘৃণা আর শ্লেষের অবধি নেই। আচ্ছন্ন চেতনার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সেই তরল চেতনার মধ্যে দিয়ে সে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পুরো য়ুরোপটা ঘুরে এলো। কখনো ইতালি, কখনো স্পেন, কখনো প্যারিস। এইসব কথা সে লেখার জন্যে জমিয়ে রেখেছিল। লেখা আর কোনোকালেই হবে না। যুদ্ধের পরে বিশের-তিরিশের দশকের বিধ্বস্ত য়ুরোপের পটভূমিতে লেখা। হেমিংওয়ের এইসব লেখার পঁচাত্তর ভাগেরই পটভূমি য়ুরোপ। আমেরিকার ইলিনয়ের এই লেখকের আমেরিকান পটভূমিতে লেখা গল্প-উপন্যাস প্রায় হাতে গোনা যায়। দি সান অলসো রাইজেস : ফ্রান্স-স্পেন; ফর হুম দ্য বেল টোলস : স্পেন; এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস : ইতালি-সুইজারল্যান্ড; দি ওল্ডম্যান অ্যান্ড দি সি : কিউবা। সারাজীবন এই লোকটা গল্প না উপন্যাস লেখার জন্যে চিন্তায়-চিন্তায় জেরবার হয়েছিলেন বলে মনে হয়? অথচ কি মহাপরিক্রমা! যুদ্ধ-ক্লান-, চুরমার, ভাঙা, নষ্ট, পচা, ধসা য়ুরোপের মানব- বাস-বতার পুরো বৃত্ত তিনি ঘুরে আসেন। কে তাঁকে করতে বলে? কেউ বলে না। তাঁর ভেতরের লেখকটি তাঁকে বলে। লেখকের কাছে এই পৃথিবীর বাস-বতার বাইরে আর কিছুই নেই। কেবল খুঁজে চলা। কেবল বলে যাওয়া। বয়ান বুনে যাওয়া। শুরু নেই, শেষও নেই। মাঝখান থেকে বলা মাঝখানেই শেষ করা। অথচ একসময় কত অসহ্য হয়ে ওঠে তাঁর বেঁচে-থাকাটা। জগৎ-জোড়া খ্যাতি, অর্থ, বিত্ত, নারী – সব ফেলে একদিন নিজের মাথায় নিজে গুলি চালিয়ে লোকটা মরে যান। ‘দি স্নোজ অব কিলিমানজারো’ গল্পটা ছোটগল্প, না বড়গল্প, কে জানে? ‘দি ওল্ডম্যান অ্যান্ড দি সি’ উপন্যাস কি? দর্শনের বই নয় তো? আরেকটা বাইবেল নয় তো? সার্ত্রের বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেসের আরেকটা চেহারা নয় তো!
এখন যে এই লেখা আমার ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। ফকনারের ‘দি বিয়ার’ গল্পটার প্রসঙ্গ একবার তুলেছিলাম। ‘লায়ন’ (গল্পের কুকুরটার নাম) নামে ছোট একটা খসড়া বেরিয়ে গেল ১৯৩৮-এর দিকে। কিছুদিন পরেই সেটা ‘বিয়ার’ নামে বেশ বড়সড় একটা গল্প হলো (এটাই বেশিরভাগ ছাপা হয় আজকাল), উপন্যাস বললেই বা আটকাচ্ছে কে? কিন্তু সন্তুষ্ট হওয়া গেল না তাতেও। গো ডাউন মোজেস অ্যান্ড আদার স্টোরিজে ‘দি বিয়ার’ আবার বেরুলো বড় একটা উপন্যাসের আকারে। লেখক কেমন করে কিসে সন্তুষ্ট জানে? ছোট-ছোট গল্প তলস-য় অনেক লিখেছেন ঋষি হয়ে যাবার পর। কিন্তুন রক্ত-মাংসের প্রবৃত্তির টানে চলতেন, তখনকার প্রায় সব গল্পই বড় বড়। ‘দি ডেথ অব ইভান ইলিচ’, ‘ফাদার সের্গেই’, ‘ক্রয়টজার সনাটা’ আকারে ছোটগল্পের চলতি নিয়ম-প্রথা একটুও মানে না। এইবার রবীন্দ্রনাথ। ‘নষ্টনীড়’, ‘হালদারগোষ্ঠী’, ‘মাস্টারমশাই’, ‘দুই বোন’, ‘চতুরঙ্গ’ ইত্যাদি ছোটগল্প, বড়গল্প, উপন্যাস, ছোট উপন্যাস, আখ্যায়িকা? অন-ত রবীন্দ্রনাথ এই নিয়ে বিশেষ চিনি-ত ছিলেন বলে মনে হয় না। ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’ – এই কথাটার কোনো বালাই নেই কোথাও।
আচ্ছা জীবনের কোন্ কাহিনিটা শেষ হয়? রূপকথাতেও তো হয় না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় সব গল্পই পড়েছি, ভেবেছিও অনেক। প্রতিটি গল্প আলাদা-আলাদা দাঁড়িয়ে থাকে বা পড়ে যায়। ছোটগল্পের যত সংজ্ঞা তার দফারফা করে দিয়ে। দিবারাত্রির কাব্য কী রকম উপন্যাস? কিছুই বলার নেই। বাংলা সাহিত্যে একেবারে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
কথা আর বাড়িয়ে লাভ নেই। যে-কথাটা বলতে চাই তা বোধহয় একটু অতিরেক করেই বলা হয়ে গেছে। তারপরও কত কথা বাকি। একজন আদিগুরু এডগার অ্যালান পো যেমন আছেন, তেমনি আছেন চেখভ, মপাসাঁ, ও’ হেনরি, মোরাভিয়া, মম্ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর আমাদের কাছে একেবারেই নতুন অধ্যায় – লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, এমনকি ইন্ডিয়া। মহাবিস্ময়ে নতুন করে মহাদেশ আবিষ্কার করি। হুয়ান রুলফো, আলেহো কার্পেনি-য়ার, ফুয়নে-স, বোর্হেস, ইয়োসা আর সি’র দীপ্যমান নক্ষত্র মার্কেস।
এখন শেষ কথাগুলি এই রকম করে বলি : যিনি লেখক হয়েছেন, কিংবা হননি বা হবেন বা লেখক হবার সংকল্প করেছেন, কিংবা লেখক হয়ে গিয়েছেন তাঁকে কি সত্যি সত্যিই শেষ পর্যন- কোনো একটা ভাগাভাগির মধ্যে যেতে হয় না? অবশ্য সংকল্প করলেও কাজ হয় না। মনস’ করলেই কি কেউ কবি হতে পারেন? সময় যায়। একসময় ঠিক জায়গাটা বাছা হয়ে যায়। ঘষলে কাজ হয় ঠিক কথা, তবে কয়লা ঘষলেই তো হীরে হয় না। কিছু ভাগাভাগি আছে, মনে হয় বেশ কাছাকাছি, পাশাপাশি স্বচ্ছন্দে চলতে পারে। সৃজনশীল গদ্যে ঢুকে গেছে যে তাঁর পক্ষে উপন্যাস-ছোটগল্পে যাতায়াত সম্ভব। আবার এইসব কথা নিয়ে খানিকটা এগোলেই দেখা যায় ভাগাভাগি একরকম নয়। ভেদ-অভেদও একসঙ্গে চলতে পারে। এক হিসেবে ভেদের শেষ নেই। ছোটগল্প বলে নির্দিষ্ট একটা ভাগে পৌঁছানোর পরেই কিন’ ভেদের গল্প শেষ হয়ে যায় না। আমি নিজেও ভেদের পাল্লার মধ্যেই আছি। ছোটগল্পের ভাগটা যদি মেনেই নিই-ই তাহলে বলতে হবে : চেখভ-রবীন্দ্রনাথ একটা ভাগে আছেন, তুর্গেনেভও আছেন কাছাকাছি। মপাসাঁ, ও’ হেনরি অন্যদিকে আছেন। ওঁদের মতো আছেন বোধহয় হাজার-হাজার। চেখভ-রবীন্দ্রনাথের দলের লেখক কম। দস-য়েভ্স্কি-তলস-য় একেবারে নিজেদের মতোন। লাতিন আমেরিকার সাহিত্য খুবই আলাদা। এবং এঁদের মধ্যেও মার্কেস আলাদা। ব্যাপারটা এইরকমই বটে। ভাগ করতে গিয়েও অন- পাওয়া যায় না। আবার অভেদের অনিশ্চয়তা, অস্পষ্টতাকে মেনেও তাকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। দ্বৈত-অদ্বৈত ছাড়া কিছু নেই।
নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি : বাংলা ছোটগল্প (মনে রাখুন, সাধারণভাবে ছোটগল্পের কথা ছেড়ে দিয়েছি, এখন তুলছি বাংলা ছোটগল্প নিয়ে কথা) কি মরে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাব কোন গণৎকার দিতে পারবে? এর জবাব পাবার অপেক্ষায় বাংলাদেশের কোনো লেখক কি লেখা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকবেন? জবাবটা তাহলে এইভাবেই দিই : ছোটগল্প আছে, নেই।
বাংলাদেশের ছোটগল্প একটি আন্ত:জরিপ
বি শ্ব জি ৎ ঘো ষ
রেনেসাঁস-উত্তরকালে, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার পরম বিকাশের যুগে, আধুনিক মানুষের জীবনে দেখা দেয় বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য এবং সীমাহীন জটিলতা। আধুনিক মানবচৈতন্যের সমুদ্রবিস্মৃতি ও বিভঙ্গতা, বহুভুজ বিসংগতি ও বিপর্যয়, অন্তর্গূঢ় বেদনা ও উজ্জ্বল আশাবাদ – এইসব প্রবণতা প্রকাশের অনিবার্য মাধ্যম হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে নতুন শিল্প-আঙ্গিকরূপে ছোটগল্পের আত্মপ্রকাশ। পুঁজিবাদী সভ্যতার অভ্যন-র সীমাবদ্ধতার চাপে, সময়ের শাসনে মানুষ যতোই যান্ত্রিক হয়েছে, ছোটগল্প-সাহিত্যের বিকাশ ততোই হয়েছে ঋদ্ধ। পূর্ণ জীবন নয়, বরং বৈরী পৃথিবীতে জীবনের খণ্ডাংশই মানুষের কাছে প্রাধান্য পেল। এ অবস্তায় উপন্যাসের পরিবর্তে ছোটগল্প উঠে এলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কেননা, একক অনুষঙ্গের আধারেই ছোটগল্পে ফুটে উঠলো পূর্ণ জীবনের ব্যঞ্জনা – পদ্মপাতার শিশিরে যেমন হেসে ওঠে প্রভাতের সম্পূর্ণ সূর্য।
উপন্যাসের মতো ছোটগল্পেও আদি উৎসভূমি ইউরোপ। ইউরোপীয় সমাজে প্রবহমান রূপকথা, লোকগাথা বা রোমান্সকাহিনি – যা ছিল মানুষের মনোরঞ্জনের অন্যতম মাধ্যম – ইতালীয় রেনেসাঁসের পর রূপান-রিত হয় নতুন চেতনায়, নব-প্রতিনব জিজ্ঞাসায়। বোক্কাচ্চিও, চসার, র্যাবলে, সারভান্টেসের সামূহিক সাধনায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠলো ছোটগল্পের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান কাহিনি-চরিত্র-প্লট আর সাবলীল সংলাপরীতি।১ বস’ত, এঁরাই আধুনিক ছোটগল্পের প্রত্ন-উৎসের জনয়িতা; এঁদের সাধনার সরণি ধরেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে ক্রমে আবির্ভূত হয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের প্রধান ছোটগাল্পিকরা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্স-রাশিয়া-ইংল্যান্ড-আমেরিকায় ছোটগল্পের যে শিল্পিত বিকাশ ঘটেছে, তার প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, ভারতবর্ষেও। পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের প্রেরণায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় সংঘটিত হয়েছিল সীমাবদ্ধ নবজাগরণ। নবজাগরণের ফলে শিল্প-সাহিত্য-ধর্মচর্চা – সর্বত্র একটা বিপুল পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। নতুন নতুন শিল্প-আঙ্গিকে পূর্ণ হতে থাকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গন। পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই নাটক, প্রহসন, মহাকাব্য, গীতিকবিতা, উপন্যাস রচিত হলেও ছোটগল্পের আবির্ভাব বিলম্বিত হয়েছিল শতাব্দীর শেষ দশক অবধি। উনিশ শতকের নব্বুইয়ের দশকেই, প্রকৃত অর্থে, বাংলা ছোটগল্পের যাত্রা শুরু, এবং লেখাই বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) হচ্ছেন সে-যাত্রার পথিকৃৎ।
দুই
কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণির বিকাশ ঘটে উনিশ শতকের প্রারম্ভে, শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে নবজাগ্রত এই মধ্যশ্রেণির সাধনাতেই সূচিত হয় বাংলা ছোটগল্পের সমুদ্রসম্ভব বর্ণিল-যাত্রা। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে পূর্ববঙ্গের মুসলিম মধ্যবিত্তশ্রেণির বিকাশ হয়েছে শতবর্ষ-বিলম্বিত। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১) পূর্ববঙ্গের মুসলিম মধ্যবিত্তশ্রেণির বিকাশে রাখে ঐতিহাসিক অবদান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পূর্ববাংলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ নব্য-শিক্ষিতের সমবায়ে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক থেকেই ক্রমবিকশিত হচ্ছিল ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নতুন মধ্যবিত্তশ্রেণি। পূর্ববাংলার নবজাগ্রত এই মধ্যবিত্তশ্রেণীর চেতনা্লাত কয়েকজন শিল্পীর সাধনায় রচিত হয়েছে বাংলাদেশের ছোটগল্প-সাহিত্যের প্রাথমিক ভিত্তি।
ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নতুন মধ্যবিত্তশ্রেণী মর্মমূলে সামন্ত-মূল্যবোধ ধারণ করেও বুর্জোয়া সমাজসংগঠনের চিন্তা-চেতনা, উদার মানবতাবোধ এবং যুক্তিবাদে আকৃষ্ট হয়ে ১৯২৬ সালে গঠন করল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ।’ অপরদিকে মার্কসবাদে বিশ্বাসী অথচ বুর্জোয়া মানবতাবাদে প্রত্যয়ী লেখক ও শিল্পীদের মানসভূমিতে পূর্ববঙ্গ উপ্ত করেছে স্বাতন্ত্র্যের বীজ; এবং এঁরাই স্বাতন্ত্র্যাভিলাষী পূর্ববাংলার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে আধুনিক জীবনচেতনায় অনেকাংশে উদ্বুদ্ধ করেছে।
প্রাক্-সাতচল্লিশ পর্বে পূর্ববঙ্গের ছোটগাল্পিক-চেতনাপুঞ্জ প্রবাহিত হয়েছে দুটি ভিন্ন স্রোতে। একটি স্রোতের উৎস ছিলেন সামন- মূল্যবোধে বিশ্বাসী গল্পকাররা; অন্যটি সৃষ্টি হয়েছে উদার বুর্জোয়া মানবতাবাদে প্রত্যয়ী কথাকোবিদদের সাধনায়। প্রথম স্রোতটি নির্মাণ করেছেন মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন (১৯০৪-৮৬), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৮-৭৯) প্রমুখ; আর দ্বিতীয়টি আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯), আবুল ফজল (১৯০৩-৮৩), আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৯), আবু রুশ্দ (১৯১৯-), সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-৭৫), সোমেন চন্দ (১৯২০-৪২), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-৭১), শওকত ওসমান (১৯১৭-৯৮), আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১১-৮৮), শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-৯৭) প্রমুখ। এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, অসম সমাজবিকাশের কারণে বিশ শতকের সূচনাকাল থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত মুসলিম মধ্যবিত্তশ্রেণির মানসলোকে বুর্জোয়া ভাবধারার ভূমিকা ছিল প্রগতিশীল এবং সত্যস্পর্শী।২
মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন কিংবা বন্দে আলী মিয়ার গল্প শিল্পমূল্যে সমৃদ্ধ নয়, কিন্তু পূর্ববাংলার গল্প-সাহিত্যের বিকাশধারায় তাঁদের প্রয়াস ঐতিহাসিক কারণে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের গল্পে পূর্ববাংলার মুসলিম সমাজের ধর্মাশ্রিত সংস্কার্লিগ্ধ প্রথাচল জীবনপ্রত্যয় রূপায়িত হয়েছে সরল প্লটের আশ্রয়ে, সাবলীল ভাষায়। সামন্ত মূল্যবোধের প্রতি প্রবল আসক্তি এবং উনিশ শতকী জীবনধারণা তাঁদের গল্প-সাহিত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ধানের মঞ্জুরী (১৯৩২), শিরণী (১৯৩৩), পয়লা জুলাই (১৯৩৪), শিরোপা (১৯৩৭); এবং বন্দে আলী মিয়ার মেঘকুমারী (১৯৩৬), মৃগপরী (১৯৩৪), হরিণ (১৯৩৯), অরণ্যের বিভীষিকা (১৯৪৫) প্রভৃতি ছোটগল্প-সংকলনের নাম।
প্রাক্-সাতচল্লিশ পর্বেই বাংলা কথাসাহিত্যের ধারায় আবুল ফজলের দীপ্র আবির্ভাব। যুদ্ধোত্তর বিপর্যয়, কল্লোলীয় ভাবোচ্ছ্বাস ও মনোবিশ্লেষণ এবং মুসলিম সমাজের সংস্কারাচ্ছন্নতা-স্বপ্নচারিতা নিয়ে গড়ে উঠেছে আবুল ফজলের গল্পজগৎ। কল্লোল, কালিকলম, প্রগতির সাহিত্যধারায় যে মননঋদ্ধ নাগরিক চেতনার উদ্বোধন, মুসলিম কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে আবুল ফজলের রচনাতেই তার প্রথম উদ্ভাসন।
ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপাত্মক গল্প-রচনায় আবুল মনসুর আহমদের কৃতিত্ব সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ রচনায় তিনি সিদ্ধহস-। সমাজের নানা দোষ-ত্রুটি ও অসংগতি তিনি ব্যঙ্গের আচরণে উন্মোচন করেন। ভণ্ড ধার্মিক, অসৎ রাজনীতিবিদ এবং কপট সমাজসেবকের বহুমাত্রিক রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্পে।৩ সাবলীল ভাষা, চরিত্রানুগ সংলাপ এবং সরল প্লট আবুল মনসুর আহমদের গল্পের জনপ্রিয়তার মূল কারণ। আয়না (১৯৩৫), ফুড কনফারেন্স (১৯৫০) প্রভৃতি গ্রনে’ আবুল মনসুর আহমদ সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরছেন এবং একই সঙ্গে প্রত্যাশা করেছেন মানবিক অন-ঃসংগতির উদ্বোধন।
মুসলিম মধ্যবিত্তের সংস্কারচেতনা ও চিত্তের প্রবঞ্চনা, সাগরিক মধ্যবিত্তের আত্মগ্লানি ও জীবনবোধের দীনতা, এবং দেশবিভাগের আবেগ-উচ্ছ্বাস-উদ্বেগে সিক্ত আবু রুশ্দের গল্পভুবন। দেশবিভাগের পূর্ববর্তী-পরবর্তী সামাজিক সংকট নিয়ে গল্প-উপন্যাস রচনায় তিনি অতি-উৎসাহী, কিন’ সে-উৎসাহ ইতিহাসচেতনা ও সমপ্রদায়-নিরপেক্ষতার অভাবে প্রায়ই মানবরসে হতে পারেনি জারিত। মধ্যবিত্ত জীবনের নানা অসংগতি ও অন-ঃসারশূন্যতা আবু রুশ্দের প্রিয় বিষয়। শাড়ী বাড়ী গাড়ী (১৯৬৩) এবং মহেন্দ্র মিষ্টান্ন ভাণ্ডার (১৯৭৪) গল্পগ্রনে’ নাগরিক মধ্যবিত্তের চিত্তপ্রবঞ্চনা অসংগতি এবং অনন্বয় শিল্পিত ভাষ্যে রূপলাভ করেছে। বিভাগ-পূর্বকালে রচিত রাজধানীতে ঝড় (১৯৩৮) গল্পগ্রনে’ রোমান্টিক জীবনচেতনার যে প্রকাশ ঘটেছিল, পরবর্তীকালে গল্পে সে-জগৎ ছেড়ে আবু রুশ্দ মুসলিম মধ্যবিত্তের বাস-বজীবনে করেছেন বিচরণ। ছোটগাল্পিক সংহতি এবং নাট্যিক ব্যঞ্জনায় আবু রুশ্দের গল্প বিশিষ্ট।
দক্ষিণ বাংলার গরিব-নিুবিত্ত মানুষের প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে শামসুদ্দীন আবুল কালামের গল্পসাহিত্য। যুদ্ধোত্তর-পটে মানুষের অন-হীন দুর্ভোগ-নির্বেদের গল্পরূপ সৃজনেও তিনি রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। ‘পথ জানা নাই’, ‘দুই হৃদয়ের ঢেউ’, ‘অনেক দিনের আশা’, ‘রক্তের স্বাদ’ প্রভৃতি গল্প তাঁর প্রখর সমাজবোধের পরিচায়ক। ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পটভূমিতে লেখা ‘রক্তের স্বাদ’ গল্প একটি বিশিষ্ট সৃষ্টি। বাংলা কথাসাহিত্যে দাঙ্গার পটে লেখা গল্প-উপন্যাসের মধ্যে ‘রক্তের স্বাদ’ দাবি করতে পারে বিশিষ্টতা। বরিশালের উপভাষা শামসুদ্দীন আবুল কালামের ছোটগল্পে অর্জন করেছে শিল্পিত লাবণ্য। তাঁর অধিকাংশ গল্পে ব্যবহৃত হয়েছে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা।
সোমেন চন্দের গল্প বাংলা ছোটগল্পের ধারায় সংযোজন করেছে নতুন মাত্রা। বাংলা সাহিত্যে সমাজবাদী চিন-ার শিল্পরূপ নির্মাণে তিনি পালন করেছেন পথিকৃতের ভূমিকা। নিরন্ন খেটে-খাওয়া মানুষর প্রাত্যহিক জীবনযন্ত্রণার ছবি ফুটে উঠেছে তাঁর ছোটগল্পে। সোমেন চন্দের গল্পে মানুষের মুক্তিকামনা উচ্চারিত হয়েছে, ধ্বনিত হয়েছে মানবাত্মার বিজয়গাথা। রাজনীতি-সচেতনতায় এবং সমাজকাঠামো পরিবর্তনের বাসনায় সোমেনের গল্প বিশিষ্ট ও ব্যক্তিক্রমধর্ম চিহ্নিত। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘বনস্পতি’, ‘একটি রাত’, ‘ইঁদুর’, ‘সঙ্কেত’ প্রভৃতি গল্প স্মরণ করা যায়।
উপন্যাসের মতো ছোটগল্পেও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র শিল্পনৈপুণ্য একক অনতিক্রান্ত এবং প্রাতিস্বিকতাচিহ্নিত। শিল্পবোধ ও জীবনচেতনার প্রশ্নে পূর্বাপর সতর্ক, সপ্রতিভ এবং বিশ্ববিস্তারী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র গল্পসমূহ বাংলা সাহিত্যের ধারায় সংযোজন করেছে স্বকীয় মাত্রা। যুদ্ধোত্তর বিনাশী প্রতিবেশে বাস করেও মানবীয় অসি-ত্বের ক্লানি-হীন সাধনায় তিনি চিলেন সি’তপ্রাজ্ঞ। নিরস্তিত্বের শূন্যতায় ফুরিয়ে যাওয়া জীবন নয়, অন্ধকার ভেঙে ভেঙে অসি-ত্বের দায়িত্বশীল স্বাধীন সত্তায় উত্তীর্ণ হওয়াই তাঁর ছোটগল্পের মৌল বৈশিষ্ট্য। গল্পের বিষয় নির্বাচনে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ছিলেন বাংলাদেশর জনজীবনসম্পৃক্ত, কিন্তু বক্তব্য ও প্রকরণে সর্বজনীন, বিশ্বপ্রসারিত, স্বনিষ্ঠ এবং পরীক্ষাপ্রিয়। চেতনা ও আঙ্গিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র গল্পসমূহ যেন তাঁর পরিব্যাপ্যমান জীবনবোধের অনুবিশ্ব। মানুষের অস্তিত্ব-অভীপ্সা, নৈঃসঙ্গ্য, ভয়-অনুশোচনা প্রভৃতি তাঁর গল্পের উপজীব্য।৪
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র অধিকাংশ গল্পই মনস-ত্ত্বধর্মী ও মনোময়। সমাজের বহির্বাস্তবতার চেয়ে মানবজীবনের অন্তর্বাস্তবতার জগতে বিচরণ করতে তিনি অধিক উৎসাহী। তাঁর গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের অন-র্জীবনের ইতিকথা, হার্দিক অগ্ন্যুৎপাত। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন ডিটেইলস নিয়ে তাঁর সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হয়েছে কখনো কখনো, যেমন ‘নয়নচারা’। পঞ্চাশের মন্বন-র ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এই গল্পে ময়ূরাক্ষীর স্মৃতিময় জনপদ উন্মোচিত যেন। গ্রামীণ জীবনের নানা কুসংস্কার, ধর্মীয় অন্ধতা এবং ধর্মজীবীদের ভণ্ডামি ওয়ালীউল্লাহ্র গল্পের একটি বহু-ব্যবহৃত বিষয়। ‘নয়নচারা’, ‘মৃত্যুযাত্রী’, ‘খুনী’, ‘দুই তীর’, ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’, ‘পাগড়ি’, ‘সীমাহীন’ এক নিমেষে’ প্রভৃতি গল্পে ওয়ালীউল্লাহ্র ছোটগাল্পিক প্রতিভার উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ সুপরিস্ফুট। তাঁর গল্প প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্যে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র নির্মাণ। ওয়ালীউল্লাহ্র গল্পের ভাষা বিষয়ানুগ, চিত্রাত্মক, গীতোময় এবং অলঙ্কারসমৃদ্ধ। ‘চিন-াশীল চিত্রস্রোত, অবচেতনার ভগ্নক্রমপ্রবাহ’ ওয়ালীউল্লাহ্র গদ্যশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বিভাগ-পূর্বকালে ছোটগাল্পিক হিসেবে আবির্ভূত হলেও শওকত ওসমানের প্রথম গল্পসংকলন প্রকাশিত হয় পঞ্চাশের দশকে। চল্লিশের দশক থেকে নব্বুইয়ের দশক পর্যন- বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-ধর্মীয় আবহ তাঁর গল্পে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় হয়ে আছে বন্দি। প্রথম দিকে মুসলিম মধ্যবিত্ত-নিুবিত্ত জীবনপ্রাঙ্গণ থেকে চয়ন করেছেন তিনি গল্পের উপাদান। এ পর্বে রোমান্টিকতা দ্বারাও প্রভাবিত ছিল তাঁর গল্পের চরিত্রেরা। কিন’ ষাটের দশক থেকে তাঁর গল্পে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মোল্লা- মৌলভি-পাদ্রিদের ভণ্ডামি ও ধর্মব্যবসা আসতে থাকে ব্যাপকভাবে। ব্যঞ্জনাধর্মী রূপক ও প্রতীকের আশ্রয়ে শওকত ওসমান প্রায়ই প্রকাশ করেন তাঁর প্রগতিশীল চিন-াস্রোত, এবং সে-চিন-াস্রোতে সিক্ত হয়ে ওঠে তাঁর পুরুষেরা, তাঁর নারীরা। সদর্থকচেতনায় উত্তীর্ণ হয়ে তাঁর গল্পের নায়কেরা প্রায়ই মানবিক মহিমায় জাগ্রত হয়, নেতি আর নাসি-র জগতে বাস করেও তারা ইতিবাচক জীবনবোধে উজ্জীবিত হয়ে ঘোষণা করে মানবিকতারই জয়গান। মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালে রচিত তাঁর গল্পে এসেছে নতুন মাত্রা। মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষঙ্গ এবং যুদ্ধোত্তর সমাজবাস-বতা এ-সময় অঙ্গীভূত হয় তাঁর ছোটগল্পে। জন্ম যদি তব বঙ্গে (১৯৭৫), মনিব ও তাহার কুকুর (১৯৮৬), ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৯০) প্রভৃতি গল্পগ্রনে’ শওকত ওসমান বাংলাদেশের যুদ্ধোত্তর সমাজবাস-বতা নৈপুণ্যের সঙ্গে করেছেন উন্মোচন। আঙ্গিক-নিরীক্ষা, চরিত্রানুগ ভাষা-প্রয়োগ এবং ব্যঞ্জনাধর্মী রূপক-প্রতীক ব্যবহার শওকত ওসমানের গল্পের অন্যতম সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্য। বিষয়াংশের সঙ্গে প্রকরণের শিল্পিত সম্পর্কে শওকত ওসমানের গল্প বাংলা সাহিত্যের ধারায় বিশিষ্টতার পরিচয়বাহী।
বিভাগপূর্ব কালেই গল্পকার হিসেবে আবু জাফর শামসুদ্দিনের দীপ্র আবির্ভাব। সমাজসচেতনতা, সংস্কারমুক্ত জীবনপ্রত্যয় এবং উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আবু জাফর শামসুদ্দিনের জীবনার্থের মৌল চারিত্র্য। তাঁর ছোটগল্প ওইসব মানসতার শৈল্পিক অঙ্গীকারে অর্জন করেছে বিশিষ্টতা। প্রথম দিকের গল্পে তিনি গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিনতাকে নির্বাচন করেছেন প্রধান শিল্প-উপাদান হিসেবে। জীবন (১৯৪৮), শেষ রাত্রির তারা (১৯৬১) প্রভৃতি সংকলনে পল্লিবাংলার জীবন ও প্রকৃতি হয়ে আছে উদ্ভাসিত। শেষ পর্বের গল্পে নাগরিক মধ্যবিত্ত-নিুবিত্ত মানুষের চিত্র এসেছে, তবে কখনো নির্বাসিত হয়নি পল্লিজীবন। তাঁর গল্পে উচ্চারিত হয়েছে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ। সামাজিক বৈষম্য আর অসংগতিকে কখনো কখনো তীব্র বিদ্রূপবাণেও তিনি বিক্ষত করেছেন, সমাজে-সংসারে কামনা করেছেন প্রার্থিত মুক্তি ও মানবিক অন-র্সংগতি। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষা ‘মৃত্যু ও প্রলাপ’ গল্পের সাবেরের মুখে উচ্চারিত যেন -
আমার মত অন-তঃ গড়ে বিশটা করে শিশু প্রত্যেকে জন্ম দিলে আগামী পনের বৎসরের মধ্যেই সেই যে বলেছি সংঘর্ষটার কথা তা লাগতে পারে এবং তাহলে এই অতি উঁচু নীচু ভেদটা দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন হতে পারে ত?
বিষয়াংশ ও ঘটনাবিন্যাসের প্রতি আবু জাফর শামসুদ্দীন মনোযোগী শিল্পী কিন’ প্রকরণনিরীক্ষায় তাঁর সেই মনোযোগ বা সতর্কতা দুর্লক্ষ্য। প্রথাশাসিত পথেই তিনি গল্পের আঙ্গিক বিন্যাস করেছেন, নতুন নিরীক্ষায় হননি অগ্রসর। আঙ্গিকগত পরীক্ষায় তাঁর সামান্য প্রয়াসটুকুও হতে পারেনি সার্থকতাবিমণ্ডিত।
মুনীর চৌধুরী বেশ কিছু সার্থক গল্প রচনা করলেও তাঁর কোনো গল্পগ্রন’ প্রকাশিত হয়নি। নাটকের মতো ছোটগল্পেও মুনীর চৌধুরীর প্রাতিস্বিকতা সহজেই লক্ষযোগ্য। প্রগতিশীল সমাজচেতনা এবং কৌতুকের আশ্রয়ে সামাজিক অসংগতির চিত্ররূপায়ণই মুনীর চৌধুরীর গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ-প্রসঙ্গে তাঁর ‘খড়ম’, ‘মানুষের জন্য’, ‘নগ্ন পা’, ‘বাবা ফেকু’ প্রভৃতি গল্প স্মরণীয়।
আলোচ্য পর্বেই গল্পকার হিসেবে আবুল কালাম শামসুদ্দীন এবং সিকান্দার আবু জাফরের আবির্ভাব। দেশবিভাগের পূর্বেই প্রকাশিত হয় উভয়ের প্রথম গল্পগ্রন’। আবুল কালাম শামসুদ্দীনের ত্রিস্রোতা (১৯৪৪) এবং সিকান্দার আবু জাফরের মাটি আর অশ্রু (১৯৪৬) মধ্যবিত্ত-নিুবিত্ত মানুষের প্রাত্যহিক জীবনচর্চার গল্পভাষ্য। পরবর্তীকালে এঁরা কেউই আর ছোটগল্প রচনা করেননি, যেমন করেননি মুনীর চৌধুরী।
তিন
সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের ষড়যন্ত্রে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘পাকিস্তান’ নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রের শৃঙ্খলে পূর্ববঙ্গের উঠতি মধ্যবিত্তশ্রেণির অগ্রযাত্রা হলো বাধাপ্রাপ্ত। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ববাংলার উঠতি পুঁজিবাদী গোষ্ঠী এবং নবজাগ্রত মধ্যবিত্তশ্রেণি অনুভব করলো তাদের অস্থিত্বের অন্তর্সংকট। পাকিস্তানি বৃহৎ পুঁজির আর্থিক স্বার্থেই পূর্ববাংলা রূপান্তরিত হলো আধা-ঔপনিবেশিক আধা-সামনবাদী একটা অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে। ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মে সমাজবিকাশের এই প্রতিবন্ধকতা শিল্পীর চৈতন্যকে অনিবার্যভাবে প্রভাবিত করলো। ফলে বুর্জোয়া মানবতাবাদে প্রত্যয়ী শিল্পীর মানসলোকে উপ্ত হলো সংকটের বীজ। আধা-ঔপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ববাংলার প্রগতিশীল নতুন মধ্যবিত্তশ্রেণির প্রথম প্রতিবাদ উচ্চারিত হলো ১৯৪৮ সালে। ১৯৫২ সালে সংঘটিত হলো ইতিহাস-সৃষ্টিকারী ভাষা-আন্দোলন। আমাদের রাজনীতি এবং সমাজ-সংস্কৃতির অন্তর্ভুবনে ভাষা-আন্দোলন সঞ্চার করলো স্বাধিকার-প্রত্যাশী চৈতন্য। বায়ান্নর রক্তিম প্রতিবাদ পূর্ববাংলার জনমনে যেমন তোলে ঊর্মিল আলোড়ন; তেমনি সামন্ত-মূল্যবোধসিক্ত মধ্যবিত্তশ্রেণির সুদৃঢ় পলল ভিতও করে তোলে শিথিল। মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক এবং মার্কসীয় চেতনাপুষ্ট শক্তিসমূহ পূর্ববাংলার সমাজজীবনের প্রায় সকল স্তরে অতিদ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে থাকে – যার ফলে ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনে বেনিয়া-পুঁজি ও সামন্তশক্তির ধারক মুসলিম লীগ, সকল প্রয়াস সত্ত্বেও, পরাজিত হয়; এবং প্রগতিশীল শক্তি যুক্তফ্রন্ট অর্জন করে বিপুল বিজয়। অতঃপর ১৯৫৮-এর আগস্ট পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের ফলস্বরূপ বারবার মন্ত্রিসভার পতন সুগম করে দেয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখলের পথ।
১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন প্রবর্তন-পূর্বকাল-পরিসর এদেশের সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি বিশেষ পর্যায়। তাই আলোচ্য সময়সীমায় রচিত ছোটগল্পসমূহ আমরা বাংলাদেশের ছোটগল্প-সাহিত্যের প্রথম পর্ব হিসেবে বিবেচনা করবো। সময়ের এই পর্ব-বিভাজন মোটেই স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান- নয়; সাতচল্লিশ-উত্তর পূর্ববাংলার আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক বিন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিভাজন অবশ্যই সমাজসত্য-সম্মত।
বিভাগ-উত্তর কালে প্রথম দশকে ছোটগল্প রচনায় যাঁরা ব্রতী হন, তাঁদের মধ্যে সরদার জয়েনউদ্দীন (১৯১৮-৮৬), মিরজা আবদুল হাই (১৯১৯-৮৪), শাহেদ আলী (১৯২৫-), আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০১), আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭-), মিন্নত আলী (১৯২৭-২০০২), আনিস চৌধুরী (১৯২৯-৯০), শহীদ সাবের (১৯৩০-৭১), আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী (১৯৩১-), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-৮৩), জহির রায়হান (১৯৩৩-৭২), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-), বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর (১৯৩৬-), আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ (১৯৩৮-) প্রমুখ শিল্পীর অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৭, সময়ের এ-পর্বে প্রকাশিত ছোটগল্পসমূহ প্রধানত গ্রামকেন্দ্রিক ঘটনাংশ আশ্রয় করে নির্মিত হয়েছে। পূর্ববঙ্গের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হলেও ঢাকা শহরের প্রকৃত নগরায়ণ ঐতিহাসিক কারণেই হয়েছে বিলম্বিত। ফলে আমাদের শিল্পসাহিত্যেও নাগরিক চেতনার প্রতিফলন, আলোচ্য পর্বে, প্রায় অনুপসি’ত। তবু আলোচ্য কালখণ্ডের ছোটগাল্পিকদের মধ্যে আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর প্রমুখের রচনায় নির্মীয়মাণ মহানগর ও তার জীবনবৈচিত্র্য উদ্ভাসিত হতে আরম্ভ করে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায়। পঞ্চাশের গল্পকার হিসেবে যাঁরা সুপরিচিত, তাঁদের প্রধান প্রবণতা সমালোচক নির্দেশ করেছেন এভাবে -
…তাঁরা ছিলেন প্রবলভাবে জীবনবাদী ও সমাজসংলগ্ন। তাঁদের গল্পের বিষয়ে যেমন দেশবিভাগ পূর্বকালের জীবনচিত্র রূপায়িত তেমনি আছে বিভাগ পরবর্তীকালের। উদ্বাস’সমস্যা, মন্বন-র, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দাঙ্গা ইত্যাদি নিয়ে তাঁরা গল্প লিখেছেন, তবে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের গ্রামজীবন। গ্রামের বা শহরের যে ধরনের বিষয় তখনকার গল্পকারেরা অবলম্বন করুন না কেন, গল্পে যাপিত জীবনের সংকট ও সমস্যার আলেখ্যই তাঁরা রচনা করেছেন। কোন কোন শিল্পীর রচনায় শ্রেণীসংগ্রামও প্রমূর্ত হয়েছে।৫
সরদার জয়েনউদ্দীনের গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলার গ্রামজীবন। ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে স্বকালের সামাজিক অসংগতিকে চিত্রিত করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাই তাঁর সৃষ্টিতে ইতিহাসবোধ ও সমকালচিন্তার যুগলস্রোত লক্ষণীয়। তাঁর গল্পের প্রধান উপজীব্য যুদ্ধ, দাঙ্গা, অসংগতি ও অসাম্য – আর এইসব বিরূপতা-বৈনাশিকতা থেকে মানবিক মুক্তিকামনা। সরদার জয়েনউদ্দীনের গদ্যরীতি সরল ও চিত্তাকর্ষক, প্লট জটিলতামুক্ত আর পরিচর্যা মূলত বর্ণনাধর্মী।
সত্তরের দশকে প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও গল্পকার হিসেবে মিরজা আবদুল হাইয়ের আবির্ভাব পঞ্চাশের দশকে। সামাজিক অসংগতিকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরতে তিনি সিদ্ধহস-। সমস্ত প্রতিকূলতা ও অসংগতি অতিক্রম করে তাঁর চরিত্রেরা অন্তিমে উদ্ভাসিত হয় মানবীয় সম্ভাবনায়, উত্তীর্ণ হয় মানবিক পরমার্থবোধে। মিরজা আবদুল হাইয়ের ছোটগাল্পিক-পরিচর্যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য মনোবিশ্লেষণ ও আত্মকথনরীতি। তাঁর গল্পের ভাষা সাবলীল, সংহত এবং কৌতুকবোধসিক্ত।
মানবজীবনের মন্ময়প্রান্ত নিয়ে গল্প রচনায় শাহেদ আলীর উৎসাহ সমধিক।৬ কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-৭৪) কিংবা তালিম হোসেনের (১৯১৮-৯৯) মতো ইসলামি মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনে গভীর বিশ্বাস শাহেদ আলীর শিল্পীমানসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই তাঁর গল্পে ওই মানসপ্রবণতার সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে। সামাজিক বৈষম্য, কৃষকজীবনের দুর্গতি, ধর্মজীবীর ভণ্ডামি এবং ইসলামি মূল্যবোধ – এইসব বিষয় ও প্রবণতা নিয়ে গড়ে উঠেছে শাহেদ আলীর গল্পভুবন। যুদ্ধোত্তর পটে আবির্ভূত হলেও শাহেদ আলীর গল্পে আধুনিক জীবনযন্ত্রণার কোনো চিত্র রূপায়িত হয়নি। আধুনিক নগরসভ্যতার পরিবর্তে গ্রামীণ গণজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-যন্ত্রণাই তাঁকে গভীরভাবে প্রাণিত ও পীড়িত করেছে। শিশু-মনস-ত্ত্বের গল্প হিসেবে শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’ অর্জন করে বহুল প্রশংসা। ‘সিতারা’, ‘মা’, ‘পুতুল’, ‘মহাকালের পাখনায়’, ‘একই সমতলে’, ‘অতীত রাতের কাহিনী’ প্রভৃতি গল্প তাঁর ছোটগাল্পিক-প্রতিভার স্বাক্ষরবাহী। কাব্যময়তা, সংহতি এবং অনি-ম ব্যঞ্জনাসৃষ্টিতে শাহেদ আলীর গল্প বিশিষ্ট।
আবু ইসহাকের গল্পে রূপায়িত হয়েছে গ্রামীণ বাংলার নিুবিত্ত মানুষের সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্না-আনন্দ-বেদনা আর দ্বন্দ্ব-ষড়যন্ত্র-সংগ্রামের কাহিনি। গল্পের শরীরে তিনি এঁকে দিয়েছেন গ্রামবাংলার সামাজিক অনাচার, অর্থনৈতিক শোষণ এবং ব্যক্তিক অসংগতির নানামাত্রিক চিত্র। ইতিবাচক জীবনবোধের আলোয় আবু ইসহাকের নায়কেরা সমস্ত অন্ধতা, কুসংস্কার আর শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে একটি সুন্দর সমাজপ্রতিবেশ নির্মাণে হয়েছে জাগ্রত। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘বিস্ফোরণ’, ‘জোঁক’, ‘খুঁতি’ প্রভৃতি গল্পের কথা উল্লেখ করা যায়। শ্রেণিসংগ্রামের শিল্পভাষ্য হিসেবে ‘জোঁক’ গল্প আবু ইসহাকের প্রগত জীবনবোধের পরিচয়বাহী। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র মতো আবু ইসহাকের গল্প বর্ণনাপ্রধান এবং প্রথাশ্রয়ী, সেখানে নেই আঙ্গিক-সংগঠন বা ভাষা নিয়ে সতর্ক কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছাপ।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর গল্প-সাহিত্যের কেন্দ্রীয় বিষয় নাগরিক মধ্যবিত্তের প্রেম-অপ্রেম, আনন্দ-বেদনা আর স্বপ্ন-সংগ্রাম। তবে, বাংলাদেশের ছোটগল্পের কেন্দ্রীয় প্রবণতা গ্রামীণ জীবন সংলগ্নতা থেকে তাঁর গল্প একেবারে বিযুক্ত নয়। ছোটগাল্পিক সংহতি ও একমুখিতা তাঁর গল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রোমান্টিক মানসপ্রবণতার প্রভাবে গাফ্ফার চৌধুরীর গল্পে আমরা লক্ষ করি কাব্যময়তা ও আবেগী পরিচর্যার আধিক্য। উপমারূপক উৎপ্রেক্ষায় সমৃদ্ধ গাফ্ফার চৌধুরীর গল্পভাষা। ইতিবাচক জীবনবোধের ছোঁয়ায় গাফ্ফার চৌধুরীর গল্প বিশিষ্ট ও উজ্জ্বল।
বাংলাদেশের ছোটগল্প-সাহিত্য যাঁদের সাধনায় সমৃদ্ধ ও উন্নত হয়েছে, হয়েছে প্রগতি ও শিল্পিত, আলাউদ্দিন আল আজাদ তাঁদের অন্যতম। আলাউদ্দিন আল আজাদের শিল্পীমানসের বিকাশরেখা স্পষ্টতই দুটো ভাগে বিভক্ত করা সম্ভব। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির পূর্ব পর্যন্ত আলাউদ্দিন আল আজাদ ছিলেন সমাজমনস্ক শ্রেণিসচেতন প্রগতিশীল কথাশিল্পী। কিন’ ষাটের দশক থেকে শ্রেণিচেতনা ও সমাজবাস-বতার পরিবর্তে মানুষের অবচেতন আকাঙ্ক্ষা, লিবিডোতাড়না এবং কালিক নির্বেদই হয়ে ওঠে তাঁর মানসদৃষ্টির মৌলসূত্র। জীবনদৃষ্টির এই পশ্চাৎগতি আলাউদ্দিন আল আজাদের ছোটগল্প-সাহিত্যের মৌলভূমিতে উপ্ত করেছে একটা বৃহৎ পরাভব ও সীমাহীন অবক্ষয়ের বীজ। ষাটের দশকে আজাদের পথ ধরেই বাংলাদেশের অনেক কথাশিল্পী অগ্রসর হলেন মনোবিশ্লেষণ, যৌনতা আর ভঙ্গিসর্বস্বতার বঙ্কিম পথে। অথচ, মানিক-প্রভাবিত আলাউদ্দিন আল আজাদ গল্প রচনা সূচনা করেন মার্কসীয় শ্রেণিধারণায় সুগভীর বিশ্বাস রেখে।
প্রথম পর্বের গল্পে আলাউদ্দিন আল আজাদের দেশ-কাল- শ্রেণিসচেতন মানসতার সুস্পষ্ট প্রকাশ লক্ষণীয়। জেগে আছি (১৯৫০), ধানকন্যা (১৯৫১), মৃগনাভি (১৯৫৩) প্রভৃতি গ্রন্থে শ্রেণিচেতনায় সজাগ থেকে তিনি নির্মাণ করেছেন মানবতার অপরাজেয় গৌরবগাথা। কিন’ দ্বিতীয় পর্বের গল্পে মার্কসীয় শ্রেণিধারণা থেকে বিচ্যুৎ হয়ে তিনি জীবনের অন-ঃঅসংগতি সন্ধানে ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন ও যৌনধারণায় আকৃষ্ট হলেন। জীবনদৃষ্টির এই পশ্চাৎগতি তাঁর গল্পের শিল্পসিদ্ধিকেও করেছে ক্ষুণ্ন। মনোবিকলন ও মনোগহনের শিল্পরূপ হিসেবে তাঁর অন্ধকার সিঁড়ি (১৯৫৮), উজান তরঙ্গে (১৯৫৯), যখন সৈকত (১৯৬৭), জীবন জমিন (১৯৮৮) প্রভৃতি সংকলনভুক্ত গল্পগুলোর কথা আমরা উল্লেখ করতে পারি। আলাউদ্দিন আল আজাদ গল্পের সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্য এবং ভাষা-ব্যবহারে সচেতন শিল্পদৃষ্টির স্বাক্ষর রেখেছেন। ছোটগাল্পিক সংহতি, নাটকীয়তা এবং কাব্যিক ব্যঞ্জনা তাঁর ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সংগতি এবং ইঙ্গিতময়তায় ঋদ্ধ তাঁর গদ্যের এক উজ্জ্বল এলাকা -
কবিতার মতো গল্প-নির্মাণেও হাসান হাফিজুর রহমান রেখেছেন শৈল্পিক সিদ্ধির স্বাক্ষর। প্রগতিশীল সমাজচিন্তা হাসান হাফিজুর রহমানের শিল্পীমানসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যই তাঁর গল্পে এনেছে প্রাতিস্বিক মাত্রা। সামপ্রদায়িকতার যূপকাষ্ঠে মানুষের অরুন’দ পরিণতি তাঁর একাধিক গল্পে শিল্পরূপ লাভ করেছে। আরো দুটি মৃত্যু (১৯৭০) গল্পসংকলনের গল্পগুলো সামপ্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে মানবাত্মার গৌরবময় জাগরণ – আকাঙ্ক্ষার শৈল্পিক শব্দপ্রতিমা হিসেবে বিশিষ্টতার স্বাক্ষরবাহী। কবির সৃষ্টি হলেও এসব গল্প রোমান্টিক কাব্যময়তা থেকে সর্বাংশে মুক্ত। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবন-পর্যবেক্ষণ এবং প্রাগ্রসর সমাজের জন্য উজ্জ্বল আশাবাদই হাসান হাফিজুর রহমানের গল্পসাহিত্যের কেন্দ্রীয় ভাবপরিমণ্ডল। ‘যে বস’বাদী বিশ্ববীক্ষা তাঁর কবিতার স্বাতন্ত্র্যের প্রাণবিন্দু, ছোটগল্পের শরীরে ও বক্তব্যে তার প্রথম অঙ্কুরোদ্গম।… সামপ্রদায়িক দাঙ্গা, মন্বন্তর, মহামারী, শ্রমজীবী মানুষের জীবনচিত্র, জীবনের দৈনন্দিনতা ও অন-র্লোক এবং সর্বোপরি মানুষের জাগতিক ও মানসিক দ্বন্দ্ববৈচিত্র্যকে গল্পের উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান।’৮ গল্পের প্রকরণ-প্রসাধনে হাসান হাফিজুর রহমান খুব যে সতর্ক ছিলেন এমন কথা বলা যাবে না, তবে তাঁর কোনো কোনো গল্প সাংকেতিকতা ও রূপকব্যঞ্জনায় অর্জন করেছে বিশিষ্টতা।
নাগরিক মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর হৃদয়রহস্য নিয়ে গড়ে উঠেছে জহির রায়হানের গল্পভুবন। জহির রায়হানের সমাজসচেতন মানসতা এবং বস’তান্ত্রিক জীবনার্থের সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে তাঁর ছোটগল্পে। মানবমনের গভীরতার রহস্যলোকে সন্ধানী আলো ফেলতে তিনি নিয়ত উৎসাহী শিল্পী। ভাষা-ব্যবহার এবং প্রকরণ-প্রসাধনে জহির রায়হান পরীক্ষাপ্রিয় কথাকার। তাঁর গল্প-আঙ্গিক চিত্রনাট্যধর্মী, সংহত এবং কবিতা্লিগ্ধ। তবে অতিনাটকীয়তার কারণে এবং উৎকণ্ঠার আধিক্যে কখনো কখনো তাঁর গল্প অর্জন করতে পারেনি শৈল্পিক সিদ্ধি। জীবনবোধের স্বাতন্ত্র্য দিয়ে, প্রকারণিক প্রাতিস্বিকতা দিয়ে বাংলাদেশের গল্পের ধারায় জহির রায়হান সংযোজন করেছেন একটি নূতন মাত্রা।
মনোগহনের জটিলতা ও অসংগতি উন্মোচনে বাংলাদেশের গল্পসাহিত্যে সৈয়দ শামসুল হক অনতিক্রান- শিল্পী। প্রথম পর্বে সৈয়দ শামসুল হক বৃহত্তর জনজীবনের পটে গল্প লিখেছেন, কিন’ দ্বিতীয় পর্বে মানবজীবনে অন-ঃঅসংগতি ও অন-র্বাস-বতার গল্পরূপ অঙ্কনেই হলেন অধিক উৎসাহী। ‘তাঁর গল্পে জীবন ভিন্ন সুর পেয়েছে, গল্পে দেখা দিয়েছে প্রাণ। দেহের কাঠামো ছাড়িয়ে গল্পে প্রাণের সঞ্চার এবং শুধুমাত্র গল্পের জন্য গল্প এই ধারণা থেকে গল্পের মুক্তি,… তাঁর হাতেই প্রথম সার্থকভাবে ঘটেছে।’৯ নাগরিক মধ্যবিত্তের মনস-াত্ত্বিক জটিলতা, অসংগতি আর নির্বেদ অঙ্কনেই সৈয়দ শামসুল হকের মনোযোগ সমধিক। এর বাইরে জীবনের বৃহত্তর প্রাঙ্গণে তিনি ফেলতে চাননি কোনো সন্ধানী আলো। আমাদের সামাজিক অবস’ার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ নাগরিক জীবনচর্যা নিয়ে গল্প লিখতে গিয়ে, বোধ করি প্রায়শই তিনি কৃত্রিমতার দ্বারস’ হয়েছেন। এসব গল্পের ভাবনা ও উপাদান আরোপিত, ফলে শিল্প-সার্থকতায় শীর্ষমুখ-অভিসারী হয়েও তা হঠাৎ-স্খলিত। ‘আনন্দের মৃত্যু’, ‘পরাজয়ের পর’, ‘বন্ধুর সঙ্গে সন্ধ্যে’, ‘শেষ বাস’ প্রভৃতি গল্পে এ-ধরনের কৃত্রিমতা সুস্পষ্ট।
সৈয়দ শামসুল হকের গদ্যরীতির প্রধান লক্ষ্য কাব্যময়তা। প্রতীক-উপমা-উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারে তিনি পাশ্চাত্য রীতিপ্রভাবিত প্রাগ্রসর সাহিত্যবোধের পরিচয় দিয়েছেন। বিষয়াংশ ও উপাদানের মতো, প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যসমূহ, কোনো কোনো গল্পে, মনে হয় আরোপিত; বিষয় ও ভাবের প্রয়োজনে তা অনিবার্য নয়। তবে কোনো কোনো গল্পে, যেমন ‘রক্তগোলাপে’ তাঁর ভাষা বিষয়ানুগ, স্বচ্ছন্দ এবং গীতময়।
নাগরিক মধ্যবিত্ত-নিুবিত্ত জীবনের গল্প-অবয়ব সৃষ্টিতে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের অবদানও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বস্তুবাদী জীবনদৃষ্টির আলোয় মানব-মনস্তত্ত্বের জটিলতা উন্মোচনেই তিনি সমধিক আগ্রহী। ‘সমাজসত্যের উপলব্ধিতে তিনি অনেকাংশে আল আজাদের সমগোত্রীয়; আজাদ যেখানে প্রত্যক্ষ ও উচ্চকণ্ঠ, বোরহানউদ্দিন সেখানে পরোক্ষ ও নির্লিপ্ত।’১০ ভাষা ও প্রকরণে স্বাতন্ত্র্য আনতে গিয়ে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর প্রায়শই আড়ষ্টতা ও কৃত্রিমতার শিকার হয়েছেন, যা ক্ষুণ্ন করেছে তাঁর গল্পের শিল্পমূল্য। বোরহানউদ্দিনের ভাষা স্বাতন্ত্র্য-অভিলাষী, কিন’ তা ছোটগল্পের জন্য একান-ই অনুপযোগী। প্রধানত শিল্পসাহিত্যিক ও গবেষক হলেও ছোটগল্প রচনায়ও আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। নগরজীবনের পটে তিনি উন্মোচন করেন মানব-অস্তিত্বের বহুমাত্রিক জটিলতা, মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণে তিনি কুশলী শিল্পী। ‘সম্রাজ্ঞীর নাম’, ‘চোর’ প্রভৃতি গল্প এ-প্রসঙ্গে স্মরণীয়। প্রহেলিকা ও অন্যান্য গল্প (১৯৫৯) গ্রনে’ আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ মানবিক সম্ভাবনার জয়গাথা নির্মাণ করেছেন। তাঁর গল্পের ভাষা সরল ও বিষয়ানুগ, প্লট জটিলতামুক্ত ও সংহত।
পঞ্চাশের দশকের একজন খ্যাতিমান গল্পকার আনিস চৌধুরী। প্রধানত নাগরিক মধ্যবিত্ত-জীবন নিয়ে গল্প লিখেছেন আনিস চৌধুরী। মধ্যবিত্তের নানামাত্রিক মানস-বিকৃতি, অনন্বয়, অনি-মে মানবিক মূল্যচেতনায় জেগে ওঠে – এসব প্রসঙ্গ শিল্পিত হয়েছে তাঁর গল্পে। দূরসি’ত নিরাসক্ত দৃষ্টিতে পাত্র-পাত্রীদের বলোকন ও তাদের শব্দে চিত্রিত করা আনিস চৌধুরীর গল্পের বিশিষ্ট লক্ষণ। অনিস চৌধুরীর গল্পের আর এক উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য ব্যতিক্রমী সংলাপ নির্মাণ কৌশল। নাট্যরসাশ্রিত সংলাপ আনিস চৌধুরীর গল্পে সঞ্চার করেছে নাটকের ব্যঞ্জনা। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় তাঁর ‘সুদর্শন ডাকছে’, ‘সেই অন্ধকার’, ‘প্রতীক্ষার এক বসন-’, ‘বৃষ্টি, রমনী ও একজন’, ‘আরেক রোববার’, ‘পরিব্রাজক’ প্রভৃতি গল্প স্মরণ করা যায়।
পঞ্চাশের দশকের বাংলাদেশের ছোটগল্প-সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য, বোধ করি এই যে, আমাদের ছোটগল্প এ-পর্বেই প্রথম হয়ে ওঠে মৃত্তিকামূলস্পর্শী ও জাতিসত্তার শিকড়-অন্বেষী। গল্পকাররা বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকরণ-পরিচর্যার প্রতিও ক্রমশ মনোযোগী হয়ে ওঠেন এ-কালখণ্ডে। বিষয়াংশ উপস্থাপনার অভিনবত্ব এবং নিরীক্ষাশীল ভাষারীতি দিয়ে এ-পর্বের শিল্পীরা সূচিত করে দেন ষাটের দশকে বাংলাদেশের ছোটগল্প-সাহিত্যের প্রকরণ-প্রসাধনের ঋদ্ধ পথযাত্রা।
চার
ষাটের দশকে বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যে সূচিত হয় একটি নতুন স্রোত। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কল্লোল আর সংক্ষোভের পটে রচিত এ-কালের গল্প প্রকৃত অর্থেই উদ্ভাসিত করেছে ষাটের উন্মাতাল বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের সংক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীকে। ‘একদিকে সামরিক শাসনের পেষণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিপর্যয়, অবাঙ্গালী পুঁজির বিকাশ; অন্যদিকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এই সময়কে অসি’র করে তোলে। এই সময়ে অগ্রজ গল্পকারেরা যখন গল্পের জগৎ থেকে এক প্রকার প্রস’ান করেছেন, তখন উঠে এসেছেন নতুন প্রজন্মের গল্পকারেরা।’১১
আলোচ্য পর্বে ছোটগাল্পিক-চৈতন্যে আমরা লক্ষ করি দুটি প্রবণতা। একদিকে রয়েছেন সেইসব শিল্পী, যাঁরা সামরিক শাসনের ভয়ে শঙ্কিত হয়ে জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার প্রশ্নে আশ্রয় নিলেন বেতার-টেলিভিশন-বিএনআর-প্রেসট্রাস্টের নিরাপদ সৌধে। এঁদের রচনায় এলো পলায়নি মনোবৃত্তি, ফ্রয়েড-এলিস দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এঁরা নির্মাণ করলেন মৈথুন-সাধনার শব্দমালা। অপরদিকে আছেন সেইসব শিল্পী যাঁরা বিপর্যস্ত যুগ-পরিবেশে বাস করেও সমকালচঞ্চল জীবনাবেগ, যুগসংক্ষোভ এবং প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-দ্রোহ-বিদ্রোহ অঙ্গীকার করে গল্পের শরীরে জ্বেলে দিয়েছেন সমাজ-প্রগতির আলোকবর্তিকা। স্বৈরশাসনের শৃঙ্খলে বাস করেও এঁরা ছিলেন সত্যসন্ধানী, সংরক্ত সমকালস্পর্শী এবং প্রগতিশীল সমাজভাবনায় উচ্চকিত।১২ ষাটের দশকে যেসব গল্পশিল্পী বাংলাদেশের সাহিত্যে আবির্ভূত হন, তাঁদের শিল্পকর্ম বিশ্লেষণ করলেই আমাদের উপর্যুক্ত মন-ব্যের সত্যতা প্রমাণিত হবে। যেসব ছোটগাল্পিক সময়ের এ-পর্বে সাহিত্যসাধনায় ব্রতী হন, তাঁরা হচ্ছেন – নাজমুল আলম (১৯২৭-), সুচরিত চৌধুরী (১৯৩০-৯৪), মুর্তজা বশীর (১৯৩২-), সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্ (১৯৩৩-৯৮), মাফরুহা চৌধুরী (১৯৩৪-), শহীদ আখন্দ (১৯৩৫-), হুমায়ুন কাদির (১৯৩৫-৭৭), শওকত আলী (১৯৩৬-), জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত (১৯৩৯-), হাসনাত আবদুল হাই (১৯৩৯-), রিজিয়া রহমান (১৯৩৬-), রাহাত খান (১৯৪০-), বুলবন ওসমান (১৯৪০-), মাহমুদুল হক (১৯৪০-), দিলারা হাশেম, রশীদ হায়দার (১৯৪১-), আবদুশ শাকুর (১৯৪১-), মাহবুব তালুকদার (১৯৪১-), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-৯৭), আহমদ ছফা (১৯৪৩-৯৯), আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-), সুব্রত বড়-য়া (১৯৪৫-), সেলিনা হোসেন (১৯৪৭-), কায়েস আহমদ (১৯৪৮-৯২) প্রমুখ। শৈল্পিক সিদ্ধি এবং জীবনার্থের প্রশ্নে এঁদের অনেকের মধ্যে রয়েছে মেরুদূর ব্যবধান; তবু আমরা তাঁদের একই পঙ্ক্তিতে বিন্যস- করছি – কেননা, এঁদের সকলেরই রয়েছে অভিন্ন কুললক্ষণ – এঁরা সকলেই দ্রোহ-বিদ্রোহ-সংক্ষোভ-সংগ্রামময় উত্তাল ষাটের গল্পকার।
নাজমুল আলম, সুচরিত চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, মাফরুহা চৌধুরী, হুমায়ুন কাদির, হাসনাত আবদুল হাই, রিজিয়া রহমান, বুলবন ওসমান, মাহবুব তালুকদার প্রমুখ শিল্পীর গল্পরচনাপ্রয়াস ষাটের দশকে শুরু হলেও এ-দশকের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রকরণ-সতর্কতা এবং মনোগহন-বিশ্লেষণ এঁদের রচনায় অনুপস্থিত। নাগরিক মধ্যবিত্তের অতলযাত্রা আর অন-ঃসারশূন্যতা নিয়ে গল্প লিখেছেন নাজমুল আলম এবং সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্। চট্টগ্রামের লোকায়ত জীবন এবং লোকগাথা-কিংবদন্তি নিয়ে সুচরিত চৌধুরী অনেক গল্প লিখেছেন, যা বাংলাদেশের গল্পের ধারায় সংযোজন করেছে একটি নতুন মাত্রা। মুর্তজা বশীর, রিজিয়া রহমান, আহমদ ছফা, বুলবন ওসমান এবং মাহবুব তালুকদারের গল্পে ধরা পড়েছে সমাজসচেতন মানস্তপ্রবণতা এবং সমাজপ্রগতির বাসনা। ইতিহাস-ঐতিহ্যের গল্প-অবয়ব সৃষ্টিতে রিজিয়া রহমান বিশিষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘অগ্নিস্বাক্ষরা’ গল্পের কথা বলা যায়। তবে তাঁর গল্পে পরিলক্ষিত হয় উপকাহিনির আধিক্য, যা ছোটগল্পের শরীরে জড়ো করে উদ্বৃত্ত মেদ। মাফরুহা চৌধুরী নাগরিক মধ্যবিত্তের হার্দ্যজটিলতা উন্মোচনেই সমধিক আগ্রহী। হাস্যকৌতুক আর ব্যঙ্গের ধারায় বাংলাদেশের গল্পে শহীদ আখন্দ রেখেছেন বিশিষ্টতার স্বাক্ষর। ব্যঙ্গের আবরণে সুকৌশলে তিনি উন্মোচন করেন মানবজীবনের গভীরতর কোনো সত্য-উপলব্ধি। সরস-ব্যঙ্গ- কৌতুকের ধারায় আবদুশ শাকুরের সিদ্ধিও এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। সামাজিক অসংগতি ও নাগরিক মধ্যবিত্তের বহুমাত্রিক জটিলতা উন্মোচনে আবদুশ শাকুর সরস-ব্যঙ্গ-কৌতুকের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। গ্রাম ও নগরের পটে নিুবিত্ত মানুষের দৈনন্দিনতা নিয়ে গল্প লিখেছেন হাসনাত আবদুল হাই। তাঁর গল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য প্রকরণ-সতর্কতা। চিত্রলতা, আবেগী ভাষা এবং সংহত সংলাপ হাসনাত আবদুল হাইয়ের ছোটগল্পের জনপ্রিয়তার মৌল কারণ। হুমায়ুন কাদির, মাহমুদুল হক, দিলারা হাশেম প্রমুখ শিল্পীর রচনায় প্রাধান্য পেয়েছে আধুনিক মানুষের একাকিত্ববোধ, হার্দিক রক্তক্ষরণ এবং অতীত স্মৃতিমুগ্ধতা। নাগরিক মধ্যবিত্তের বিকৃতি, অসংগতি আর সদর্থক জীবনচেতনায় উত্তরণের ইতিকথা নিয়ে গড়ে উঠেছে বশীর আর হেলালের গল্পভুবন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালে রচিত তাঁর গল্পের এক বিশাল এলাকাজুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক স্মৃতি-অনুষঙ্গ।
বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যের ধারায় শওকত আলীর অবদান বিশিষ্ট ও ব্যতিক্রমধর্মচিহ্নিত। নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের বহুমাত্রিক অসংগতির চিত্র-অঙ্কনের ষাট-দশকী মৌল প্রবণতার পথ ছেড়ে গল্পে তিনি বিচরণ করেছেন গ্রামীণ জীবনতটে, গ্রামের নিরন্ন-নিঃস্ব খেটে-খাওয়া মানুষের যন্ত্রণা, সংগ্রাম ও দহনের পোড়োজমিতে। শওকত আলী শ্রেণিসচেতন শিল্পী, তাই বস’বাদী সমাজচিন্তার আলোকে তিনি তুলে ধরেন গ্রামীণ মহাজনশ্রেণির শোষণের চিত্র, নির্মাণ করেন সর্বহারা মানুষের সংগ্রাম ও উত্তরণের জয়গাথা। ‘নবজাতক’ গল্পে তাঁর সাহসী মানুষ মন্তাজ আলী মহাজন্তিশোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।
লেলিহান সাধ (১৯৭৩) কিংবা শুন হে লখিন্দর (১৯৮৬) সংকলনের কোনো কোনো গল্পেও উচ্চারিত হয়েছে এই প্রতিবাদ। সমালোচকের ভাষায় – ‘লেলিহান সাধ’ গল্পে মহাজনের ঘরে আগুন দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে সংগ্রামী মানুষের তীব্র প্রতিবাদ, কিংবা বৃদ্ধ সাঁওতাল কপিলদাসের বহুদিনের ভুলে যাওয়া তীর ছোড়ার অভ্যাস আবার রপ্ত করার মধ্যে রয়েছে শত্রু ঘায়েল করার প্রতীকী ব্যঞ্জনা। ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পে বঞ্চিত মানুষের নির্মম প্রতিশোধ-বাসনা মনসামঙ্গলের মিথে অতি চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন শওকত আলী।’১৩ তবে উন্মুল বাসনা (১৯৬৮) থেকেই লক্ষ করা গেছে, নর-নারীর যৌনপ্রবৃত্তি ও আদিমকামনা রূপায়ণে তিনি ক্রমশ হয়ে উঠেছেন উৎসাহী। এ-পথে পা বাড়িয়ে তিনিও আলাউদ্দিন আল আজাদের মতো বৃহত্তর লোকজীবনের প্রাঙ্গণ ছেড়ে আত্মকুণ্ডয়নে হয়েছেন নিমগ্ন। ফলে ‘মন্তাজ আলী ও হাসান আলীর সঙ্কট, রহিম শেখের মৃত্যু, মহাজনদের হাতে জীবনকে নিঃশেষ করে দেওয়া – ইত্যাদি ছবিতে যে শওকত আলী কথা বলে ওঠেন, তার সাথে আজকের শওকত আলীর কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না – যেমন পাওয়া যায় না ‘জেগে আছি’র আলাউদ্দিন আল আজাদকে ‘যখন সৈকত’ অথবা তার পরবর্তী গল্পগুলোতে।’১৪
বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার হাসান আজিজুল হক বাংলা ছোটগল্পের ধারায় সংযোজন করেছেন প্রাতিস্বিক মাত্রা। উত্তর-বাংলার গ্রামীণজীবন তাঁর গল্পের কেন্দ্রীয় শিল্প-উপাদান। বস’বাদী জীবনদৃষ্টির আলোয় তিনি উন্মোচন করেছেন সমাজজীবনের বহুমাত্রিক অবক্ষয়, শোষিত-ক্লিষ্ট মানুষের হাহাকার ও বঞ্চনা, কখনো-বা তাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কাহিনি। শাহরিক আত্মকেন্দ্রিক জীবনের নির্বেদ ও আপাত-আনন্দের উচ্ছ্বাস উপেক্ষা করে তিনি গ্রামীণ মেহনতি মানুষের সমষ্টিগত জীবন-অর্ণবে করেছেন অবগাহন – বাংলা গল্পের ধারায়, এভাবে তিনি নির্মাণ করছেন তাঁর আপন ভুবন, স’াপন করেছেন ‘নিজস্ব এক উপনিবেশ’। বস’ত, হাসান আজিজুল হক হচ্ছেন সেই ব্যতিক্রমী গল্পকার, যাঁর বেশকিছু গল্প নির্দ্বিধায় সমগ্র বাংলা গল্পের আসরে প্রথম পঙ্ক্তিতে স’ান পাওয়ার যোগ্য। কখনো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কখনো জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, কী কমলকুমার মজমুদার, কখনো-বা ম্যাক্সিম গোর্কির প্রভাব পড়েছে হাসানের ওপর – তবু হাসান আজিজুল হক এইসব প্রভাববলয় অতিক্রম করে অবশেষে বাংলা গল্পধারায় স’াপন করেন মৌলিকতার শিল্পলোক। হাসান আজিজুল হকের প্রাতিস্বিকতা-নির্দেশে সমালোচকের মন-ব্য প্রণিধানযোগ্য -
হাসান আজিজুল হক জগদীশচন্দ্র গুপ্ত ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোত্রজ গল্পকার। তিনি কোনো কোনো গল্পে – যেমন ‘সারা দুপুর’ বা ‘সুখের সন্ধানে’ – জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর জগতে প্রবেশ করতে চেয়েছেন, আবার কখনো – যেমন ‘জীবন ঘষে আগুন’ নামক অসামান্য গল্পে তিনি বিস্ময়করভাবে, অথচ স্পষ্টতই কমলকুমার মজুমদারের, ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র কমলকুমারের ভাষারীতি ধার নিয়েছেন। এই সবই নিশ্চয় তন্ন তন্ন অনুসন্ধানের বিষয়, তবু জ্যোতিরিন্দ্র বা কমলকুমারের সঙ্গে এই লেখকের স্বভাবেই মিল নেই। তবু এই গল্পে বিশেষ করে কমলকুমারের অনুভূতি ও চিন-ার নিজস্ব মৌলিকতা ও বর্ণাঢ্যতা হাসান আজিজুল হকের মধ্যে সক্রিয় ছিল বলেই তিনি এই গল্পে কমলকুমারের ভাষার মডেল ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। অন্যত্র এ মডেল ব্যবহার করেননি। তিনি, যেমন আগেই বলেছি, জগদীশচন্দ্র ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোত্রজ। গোত্রজ, কিন’ তিনি যা জেনেছেন, দেখেছেন, তাই দিয়ে এক বহুস্তর অভিজ্ঞতার জগৎ-ই শুধু তিনি রচনা করেননি, প্রেক্ষিতের স্বাতন্ত্র্যে গড়ে তুলেছেন এক নিজস্ব ভুবন; স’াপন করেছেন এক নিজস্ব উপনিবেশ।১৫
উত্তরবাংলার গ্রামীণ জনপদের ভাঙন, সামাজিক শোষণ, কখনো প্রতিবাদ, বাঁচার সংগ্রাম – এইসব কথা নিয়ে হাসানের গল্পজগৎ। তাঁর সব গল্পেরই মূলে আছে, বাঁচা জান-বভাবে বাঁচা, শিশ্নোদর-পরায়ণভাবে বাঁচা, স্থূলতম শারীরিকভাবে বাঁচা এবং সেই বাঁচার ন্যূনতম অসি-ত্বের নানান চেহারা, আর তার থেকে মুক্তির রূপও হরেকরকম। আর তা থেকে পরাজয়ের রূপও হরেকরকম। টিকে থাকার, বাঁচার, হেরে যাওযার বিস্বাদ, কটু, প্রায় নিয়তিবাদী উপলব্ধি, শিবনারায়ণ রায়ের ভাষায় ‘নিরুচ্ছ্বাস আর্তি’ নিয়ে১৬ গড়ে উঠেছে হাসানের ধ্রুপদী বিশাল গল্পভুবন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালে মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে তিনি লিখেছেন বেশকিছু সার্থক ছোটগল্প, যা প্রধানত গ্রথিত হয়েছে জীবন ঘষে আগুন (১৯৭৩) এবং নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫) গল্পসংকলনে। প্রধানত কৃষির সঙ্গে জড়িত গ্রামীণ মানুষের জীবন নিয়ে গল্প লিখেছেন হাসান। কিন্তু স্রষ্টার ব্যতিক্রমী জীবনার্থের স্পর্শে তাঁর গল্পগুলো হয়ে উঠেছে শাশ্বত মানবাত্মার প্রতিভূ। প্রথম পর্বের গল্পে তিনি যৌনতা এবং মানুষের আদিম কামনার শিল্পচিত্র নির্মাণে ছিলেন উৎসাহী। সামাজিক অবক্ষয় এবং মূল্যবোধের বিপর্যয় ধরতে তিনি ব্যক্তিমানুষের যৌনজীবনের পদস্খলনকেই তাঁর গল্পের শিল্প-উপাদান হিসেবে নির্বাচন করেছেন প্রাক্-সত্তর গল্প-পর্বে।১৭ কিন্তু ক্রমে তিনি অবগাহন করেছেন রাঢ়বাংলার বৃহত্তর জনজীবনসাগরে, এবং সেখান থেকে তুলে এনেছেন বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী সুধা, দ্রোহ-বিদ্রোহ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সূর্যদীপ্র বাণী। ভাষা-প্রয়োগ এবং সংলাপ নির্মিতিতে হাসান আজিজুল হক পরীক্ষাপ্রিয় কথাশিল্পী। কখনো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কখনো-বা কমলকুমার মজুমদার তাঁকে প্রভাবিত করেছে প্রতিবেশ-নির্মাণ কিংবা বাক্যগঠন-প্রক্রিয়ায়। যেমন ‘জীবন ঘষে আগুন’ গল্প, যেখানে গদ্যরীতিতে পাই কমলকুমারের উত্তাপ -
রাজার হাতি এসে গেল। তার মেঘের মতো শরীর, তার স’ূলোদর, সেই মহাকায় পদ চতুষ্টয় নিয়ে হেলতে দুলতে মাঠের মাঝখানে দেখা দিল। সেখানে কোন বৃক্ষ ছিল না, কোনো বট বা অশত্থ – শুধু কিছু কাঁটা গাছ, পানসে ছায়া বাবলা, বড় জোর সেয়াকুল ধরনের গুল্ম এইসব মাঝে মাঝে। আর অনেক বড় লাল মাঠ – গরমের তড়াসে পীড়িত অসংখ্য গর্ত ইত্যাদি।
- ডিটেইলকে সংহত উপায়ে স্বল্পকথায় এখানে ধারণ করেছেন হাসান, যেমন করেন কমলকুমার। চিত্রল-পরিচর্যায় গল্প-প্রতিবেশ সৃষ্টিতে হাসান আজিজুল হকের সিদ্ধি শিখরবিন্দুস্পর্শী। তবে কখনো কখনো অতিকথন (‘নামহীন গোত্রহীন’), কখনো-বা বর্ণনার বিস-ৃত আয়োজন (‘জীবন ঘষে আগুন’) ক্ষুণ্ন করেছে তাঁর ছোটগাল্পিক সিদ্ধিকে। প্রকৃতির চিত্র-অঙ্কনে তাঁর নৈপুণ্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। চরিত্রের অন-র্সত্তার অনুগামী হয়ে উঠে আসে হাসানের নিজস্ব প্রকৃতিলোক। তাই দেখি, সংগ্রামমুখর বঞ্চনাপীড়িত জীবনে তাঁর প্রকৃতি আসে রুক্ষতার আবরণে, বিবর্ণসত্তায় -
ষাটের উত্তালতা আর সংক্ষোভ আর নির্বেদের জগৎ থেকে গৃহীত হয়েছে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের গল্পসাহিত্যের মৌল-উপাদান। নাগরিক মধ্যবিত্তের বিচ্ছিন্নতা, রতিবিলাস ও অন-ঃসারশূন্যতার গল্প-অবয়ব নির্মাণেই তিনি অধিক আগ্রহী। মনস-াত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং আত্মকথনরীতির সাহায্যে তিনি উন্মোচন করেন চরিত্রের অন-র্লোক, কখনো-বা চেতনতলউদ্ভাসী টুকরো চিত্রকল্পের সাহায্যে তুলে ধরেন বিশেষ কোনো চরিত্রের অন-র্সত্তা। মগ্নচেতনাপ্রবাহের পথেও তিনি কখনো কখনো বিচরণ করেন মানব-অস্তিত্বের মৌলসংকট উন্মোচনে। সূচনা-পর্বে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত গল্প লিখেছেন গ্রামীণ নিুবিত্ত জীবন নিয়ে এবং এক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধি শীর্ষবিন্দু-অভিসারী। ‘কেষ্টযাত্রা’, ‘রংবাজ ফেরে না’ প্রভৃতি গল্প এ-প্রসঙ্গে স্মরণীয়। ‘কেষ্টযাত্রা’, প্রকৃত অর্থেই, বাংলা ছোটগল্পের ধারায় এক উজ্জ্বল নির্মাণ। কিন্তু অনতিবিলম্বেই তিনি গ্রামীণ জীবন ছেড়ে নাগরিক মধ্যবিত্ত-আলয়ে সন্ধান করলেন তাঁর গল্প উপাদান। এবং এভাবে, আপন ক্ষেত্র থেকে বিচ্যুত হয়ে তিনি ক্রমশ হয়ে উঠলেন – বিষয় ও প্রকরণে – কৃত্রিম ও আড়ষ্ট। বহেনা সুবাতাস (১৯৬৭) এবং সীতাংশু, তোর সমস- কথা (১৯৬৯) গল্পগ্রন্থ থেকে দুটো অংশ উদ্ধৃত করলে উপর্যুক্ত বক্তব্য প্রমাণিত হবে।
ক. ভালো করে চোখ মেললে দেখা যায়, টেলিগ্রাফের তারে বসে দোর খাওয়া ল্যাজ ঝোলা পাখী, গৃহসে’র জীর্ণ কুটিরের প্রাঙ্গণে খড়ের মাড়াই, ঘরের পেছনে দাঁড়ানো কৌতূহলী কৃষক-রমণী অথবা অকস্মাৎ গাড়ী এসে পড়ায় বিব্রত, ডোবায় ্লানরতা পল্লীবালা সকলেই পরপর সকলেই আসছে এবং যাচ্ছে। (‘লৌহবেষ্টনী’)
খ. এই রকম ঘটে চলছে অনেক কাল। তবু শেষ আশ্রয় ছিলো বাসনা। রাত্রির কায়াহীন প্রশান্তিতে, শৈশবের কুয়াশায়, কৈশোরের বকুল তলে, যৌবনের দগ্ধভূমিতে বিচরণ করে কেবল মাত্র তারই কথা স্মরণ করে রক্তের স্পন্দনকে উৎসাহ দিয়েছি। (‘ক্রীতদাসী বাসনা’)
- প্রথম উদ্ধৃতিতে ভাষা ও বর্ণনার স্বতঃস্ফূর্ততায় ফুটে উঠেছে গ্রাম-প্রতিবেশের একটি মুগ্ধ ছবি; পক্ষান্তরে দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতে ভাষা কষ্টকল্পিত, জটিলতা-আক্রান্ত – ফলে ছোটগাল্পিক ব্যঞ্জনাসৃষ্টিতে তা হয়ে পড়ছে অসমর্থ। তবে চতুর্থ গল্পগ্রন’, পুনরুদ্ধারে (১৯৮৯) জ্যোতিপ্রকাশ আবার খুঁজে পেয়েছেন তাঁর স্বক্ষেত্র, বলা যায়, নিজেকেই তিনি পুনরুদ্ধার করেন পুনর্বার। উত্তরবাংলার জীবনপটে এখানে আবার তিনি ফিরে এসেছেন বৃহত্তর লোকালয়ে, তুলে ধরেছেন বাঙালির স্বপ্ন আর সংগ্রাম আর সম্ভাবনার কথা। ‘মন্বন-র’, ‘বিচার চাই’, ‘সম্রাট’, ‘দিন ফুরানোর খেলা’ প্রভৃতি গল্প এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়।
প্রতীকীব্যঞ্জনা এবং চেতনাপ্রবাহরীতির পরিচর্যা জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ছোটগল্পের অন্যতম প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্য। সংহত স্বল্পবাক নির্মেদ সংলাপ-নির্মাণের গোপনমন্ত্র তাঁর করতলগত। আবেগ, কাব্যময়তা আর উদ্ভাসিত নাটকীয়তা থেকে জ্যোতিপ্রকাশের গল্প সর্বাংশে মুক্ত। গল্পের ফর্ম-নির্মাণে তিনি নিয়ত পরীক্ষাপ্রিয়। এইসব বৈশিষ্ট্য জ্যোতিপ্রকাশের গল্পকে এনে দিয়েছে বিশিষ্টতা; কেবল বাংলাদেশের সাহিত্যে নয়, সমগ্র বাংলা ছোটগল্পের পরিপ্রেক্ষিতেই এইকথা, বোধ করি, বলা সম্ভব।
নগরসভ্যতার অসংগতি আর বিকৃতি উন্মোচিত হয়েছে রাহাত খানের ছোটগল্পে। মধ্যবিত্ত জীবনই তাঁর গল্পের মৌল-উপাদান। নাগরিক মধ্যবিত্তের অসংগতি ও নির্বেদ তাঁর গল্পে উপসি’ত হয় যৌনতার প্রেক্ষাপটে, ফলে সেখানে প্রায়শই দেখা যায় আদিমকামনার খোলামেলা স’ূল চিত্র। ঢাকা শহরের অভিজ্ঞতালোক থেকেই রাহাত খান চয়ন করেছেন তাঁর গল্প-উপাদান। ফড়িয়া, দালাল, উঠতি ব্যবসায়ী, ধূর্ত রাজনীতিবিদ, বড়লোকের রক্ষিতা, আদর্শহীন থ্রিলার লেখক – এইসব চরিত্র বারবার ঘুরেফিরে আসে রাহাত খানের ছোটগল্পে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সামাজিক ভাঙন নিয়ে তিনি লিখেছেন কয়েকটি ভালো গল্প। রাহাত খানের ভাষা সাবলীল এবং কৃত্রিমতামুক্ত, ফলে পাঠকনন্দিত। ছোট ছোট বাক্য দিয়ে তিনি নির্মাণ করেন গল্পের ফুলেল শরীর।
নাগরিক মধ্যবিত্তের নির্বেদ-ব্যর্থতা-বিকৃতি-অসংগতির পটে গল্প লিখেছেন রশীদ হায়দার। মধ্যবিত্তের পরাভব নিয়ে গল্প লিখলেও, কাহিনির অনি-মে তিনি উপসি’ত করেন উত্তরণের ব্যঞ্জনাময় ইঙ্গিত। সমাজসচেতনতা রশীদ হায়দারের শিল্পীমানসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রগত সমাজচেতনার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তাঁর মানুষেরা; তাঁর গল্প আমাদের শোনায় মানবিক সম্ভাবনার জয়গাথা, সদর্থক চেতনায় উত্তরণের বিজয়মন্ত্র। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে রচিত তাঁর অনেক গল্পে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি-অনুষঙ্গ। অন-রে ভিন্ন পুরুষ (১৯৭৪), মেঘেদের ঘরবাড়ী (১৯৮২) প্রভৃতি গ্রনে’ স্বাধীনতা-উত্তর ঢাকা শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত জীবনের সামূহিক অবক্ষয় পেয়েছে ভাষারূপ। রশীদ হায়দারের গল্পের ভাষা স্ফটিকসংহত, মেদমুক্ত এবং প্রতীকী-পরিচর্যাঋদ্ধ।
ষাটের দশকে আমাদের ছোটগল্পের অঙ্গনে যেসব প্রতিভাধর শিল্পী আবির্ভূত হয়েছেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁদের অন্যতম। পুরনো ঢাকার ক্ষয়িষ্ণুতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, স্বার্থপরতা আর জীবনসংগ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর গল্পের সমৃদ্ধভুবন। পুরনো ঢাকাকে ইলিয়াসের মতো এমন অনুপুঙ্খভাবে আর কেউ দেখেননি। তাঁর গল্পে কাহিনি অপেক্ষা চরিত্র-মনস-ত্ত্ব মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে, যা আধুনিক ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নেতি দিয়ে শুরু করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর চরিত্রকে সমাপ্তিতে পৌঁছে দেন ইতির রাজ্যে। ডিটেইলস তাঁর গল্পে উঠে আসে অবলীলায়। তবে কখনো কখনো এক গল্পের মধ্যে একাধিক উপগল্প পীড়িত করে মূল গল্পস্রোতকে। প্রায় তিরিশ বছরের সাহিত্যসাধনায় তিনি লিখেছেন মোট তেইশটি গল্প – এমনই স্বল্পপ্রজ এই শিল্পী। তবে হাতেগোনা এই গল্পগুলোর মধ্যেই ফুটে উঠেছে জীবনের বিচিত্র প্রান-, উপলব্ধির বহুবর্ণিল জগৎ। তাঁর অন্য ঘরে অন্য স্বর (১৯৭৬) গল্পগ্রনে’ প্রকাশিত হয়েছে মানবিক সম্পর্কের আত্যনি-ক বিনষ্টি, খোঁয়ারিতে (১৯৮২) যুব-মানসের নির্বেদ; দুধভাতে উৎপাতে (১৯৮৩) নিরন্ন মানুষের জীবনে অমোঘ নিয়তিশাসন আর দোজখের ওম (১৯৮৯) গ্রনে’ নেতি থেকে ইতিতে উত্তরণের কথকতা।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রকরণ-পরিচর্যায় নিরীক্ষাপ্রিয় শিল্পী। অ্যান্টি-রোমান্টিক দৃষ্টিকোণে প্রাত্যহিক ভাষায় তিনি নির্মাণ করেন যাপিত জীবনের চালচিত্র। পুরনো ঢাকার ভাষা, কুট্টিদের খিসি–খেউড়, আর বাখরখানি-সংস্কৃতি ইলিয়াসের গল্পে শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত যেন। তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন দীর্ঘ বাক্যগঠনে; ‘এই দীর্ঘ বাক্যপাঠে অনভ্যস- পাঠকের কাছে তাঁর গদ্য বিরক্তিকর হলেও সজ্ঞান হৃদয়সংবাদী পাঠক গল্পের ভেতরে প্রবেশে বাধাগ্রস- হন না।’১৮ ফ্ল্যাশ-ব্যাক পদ্ধতিতে কাহিনিবয়ন ইলিয়াসের ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ষাটের গল্পকারদের মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ সবচেয়ে বেশি প্রাতিস্বিকতাবিলাসী শিল্পী। আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার গল্পভাষ্য নির্মাণে তিনি সিদ্ধহস-। বিষয়াংশ এবং প্রকরণের অভিনবত্বে তাঁর গল্পসাহিত্য বিশিষ্টতার দাবিদার। তবে, প্রথম পর্বের গল্পে, কনটেন্ট ও ফর্মে, আরোপিত উপাদান গল্পের মূলস্রোতের সঙ্গে জৈবসমগ্রতায় একাত্ম হতে পারেনি। বিচ্ছিন্নতা ও নির্বেদের যন্ত্রণায় তাঁর অধিকাংশ নায়ক পীড়িত ও পর্যুদস-। প্রতীকী এবং পরাবাস-ববাদী পরিচর্যা আবদুল মান্নান সৈয়দের ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রথম পর্বের গল্পের ভাষারীতিতে আরোপিত আধুনিকতা দ্বিতীয় পর্বে পরিত্যক্ত হয়েছে; ফলে, গল্পস্রোত হয়েছে অনেক বেশি সাবলীল ও স্বচ্ছন্দ।
আধুনিক নাগরিক মধ্যবিত্তের অনন্বয় আর অসংগতি আর হার্দ্য-জটিলতা নিয়ে গল্প লিখেছেন সুব্রত বড়-য়া। মগ্নচৈতন্যের জটিল বঙ্কিম পথে তিনি উন্মোচন করেন মানব-অসি-ত্বের স-রীভূত সংকট – অবনীশ বড়-য়া, মনীষা রায় আর শুক্লাদির হৃদয়ের যতো গোপন যন্ত্রণা। বিষয়াংশ এবং প্রকরণ – পরিচর্যার বিচারে একজন আধুনিক ছোটগাল্পিক হিসেবে তাঁকে চিনে নেওয়া যায় সহজেই। বাক্যগঠনে তিনি পরীক্ষাপ্রিয়, শব্দ-ব্যবহারে সতর্ক। কখনো কখনো চূর্ণ চিত্রকল্প কী অসামান্য কোনো উপমা তাঁর গল্পের পরিণামী ব্যঞ্জনাকে করে তোলে সংহত সুগভীর।
নগর আর গ্রাম – উভয় প্রাঙ্গণেই গল্পকার সেলিনা হোসেনের অনায়াস যাতায়াত। নিুবিত্ত খেটে-খাওয়া মানুষের যাপিত জীবনের নানা সমস্যা নিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর গল্পের ধ্রুপদী জগৎ। জীবনের আহ্বানে, বেঁচে থাকার আকুল বাসনায় তাঁর প্রিয় মানুষেরা গ্রাম ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে শহরে। কিন’ গ্রামের মতো শহরেও এরা অপাঙ্ক্তেয়, অবশেষে উন্মূলিত, জীবনবিচ্যুত, আশারিক্ত। উৎস থেকে নিরন- (১৯৬৯), খোল-করতাল (১৯৮২) প্রভৃতি গ্রনে’ এইসব উন্মূলিত-নিরন্ন-আশাহত মানুষের সাক্ষাৎ পাই আমরা। ইতিহাস-ঐতিহ্যের পটে চরিত্রনির্মাণ সেলিনা হোসেনের অন্যতম ছোটগাল্পিক বৈশিষ্ট্য। মানব প্রগতির স্বার্থেই তিনি বিচরণ করেন ঐতিহ্যলোকে, কখনো-বা ইতিহাস, কখনো-বা সংক্ষোভময় সমকালে। সমাজসচেতনতা এবং বস’বাদী জীবনপ্রত্যয় নিয়ে তারা উত্তীর্ণ হয় জ্যোতির্ময় পরমার্থলোকে। এই ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি বাংলাদেশের সাহিত্যে সেলিনা হোসেনের প্রাতিস্বিকতার কেন্দ্রীয় উৎস। তিনি বিশ্বাস করেন -
আজকের দিনে তৃতীয় বিশ্বের লেখকদের শেকড়সন্ধানী অনুপ্রেরণা বৈরী সময়কে অতিক্রম করতে চায়, অতিক্রম করতে চায় মিলিটারি অ্যারিস্টোক্রেসির বদৌলতে বন্দুকের শাসন। কেননা এই শাসন-উদ্ভূত পরিসি’তি সৃষ্টি করে মূল্যবোধের অবক্ষয়। যে অবক্ষয় সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে ঢুকিয়ে রাখে কালো থাবা। যার নিষ্পেষণে পদদলিত হয় সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা। এই আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রমূর্ত রাখার দায়-দায়িত্ব লেখকের।১৯
- এই বিশ্বাসে দৃঢ়মূল থেকেই তিনি নির্মাণ করেন তাঁর উপন্যাস, তাঁর ছোটগল্প। বিষয়াংশের মতো প্রকরণ-পরিচর্যায়ও সেলিনা হোসেন পরীক্ষাপ্রিয় ও স্বাতন্ত্র্য-অন্বেষী। গল্পে অপ্রচলিত এবং আঞ্চলিক ভাষা-ব্যবহারে তাঁর নৈপুণ্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর গল্পের ভাষা গীতল ও চরিত্রানুগ, প্লট সংহত, আর সংলাপ কেন্দ্র-অভিমুখী।
আশির দশকে প্রথম গল্পসংকলন প্রকাশিত হলেও গল্পকার হিসেবে কায়েস আহমেদের আবির্ভাব ষাটের দশকে। ‘কালের দায়, কালোত্তীর্ণের দায়, শিল্পের দায় সব কিছুই বস’তঃ সমাজেরই দায়, মানুষেরই দায়।’২০ – এই বিশ্বাসে সি’ত থেকে তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস’ার বহুমাত্রিক সংকটের পটে মানব-অসি-ত্বের সামগ্রিক রূপ-অঙ্কনই তাঁর ছোটগাল্পিক অভিযাত্রার মৌল-অন্বিষ্ট। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘অপূর্ণ তুমি ব্যর্থ বিশ্ব’, ‘ফেরারী বসন-কে খুঁজে’, ‘লাশ কাটা ঘর’ প্রভৃতি গল্পের নাম স্মরণীয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নকশাল-আন্দোলনের পটভূমিকায় লেখা ‘মহাকালের ঘোড়া’, ‘দুই গায়কের গল্প’, ‘নিয়ামত আলীর জাগরণ’ প্রভৃতি গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের কোনো গল্পকারই পশ্চিমবঙ্গের নকশাল-আন্দোলনের ব্যর্থতা ও অন-ঃসারশূন্যতাকে এমন সূক্ষ্মতর পর্যবেক্ষণে উপস’াপন করতে সমর্থ হননি। রাঢ়বাংলা ও সমতট অঞ্চলের বিস-ীর্ণ জীবনপটে বিন্যস- হয়েছে তার ছোটগাল্পিক ক্যানভাস। তিনি ছোটগল্পে বেছে নেন সেইসব চরিত্র – শ্রমে-ঘামে, আনন্দে-বিষাদে, সাফল্যে-ব্যর্থতায়, স্বপ্নে-সাধে যাদের জীবন স্পন্দিত-সংক্ষুব্ধ-কল্লোলিত। বিষয়াংশ ও শৈলী-সৌকর্যে কায়েস আহমেদের গল্প সমগ্র বাংলা গল্পের ধারাতেই দাবি করতে পারে স্বতন্ত্র মর্যাদা। কায়েস আহমেদের ভাষা গদ্য-পদ্যের যুগলবন্দিতে বিশিষ্ট ও ব্যতিক্রমী। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ভাষাশৈলী ও চৈতন্যগ্রন্থির সঙ্গে কায়েস আহমেদের শিল্পরীতির সার্ধম্য কখনো কখনো আমরা অনুভব করি। তবে জীবন-উপলব্ধিতে মৌলিকভাবেই তিনি শীর্ষেন্দু থেকে দূরবর্তী জগতের বাসিন্দা। পরাবাস্তব আর মগ্নচেতনার প্রভাবে তাঁর গদ্য প্রগত ও প্রাতিস্বিক। যেমন -
বিকেলের মরে যাওয়া হলদে আলোটা এতোক্ষণ খেলা করছিলো নোটন পায়রার মতো, এক সময় জানলা গলে উড়ে গেছে। অন্ধকার এখন বেড়ালের মতো ঘরের ভেতর হেঁটে বেড়াচ্ছে নিঃশব্দ পায়ে। (‘অপূর্ণ তুমি ব্যর্থ বিশ্ব’)
আলোচ্য পর্বে রচিত বাংলাদেশের ছোটগল্পসাহিত্য গ্রামজীবন অতিক্রম করে ক্রমশ শহরমুখী হয়ে উঠেছে। তুলনাসূত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমাদের ছোটগাল্পিকরা গ্রামীণ জীবন চিত্রণে যতোটা স্বচ্ছন্দ, বস’নিষ্ঠ, নগরজীবন চিত্রণে ততোটা নন। তিরিশের পশ্চিমবঙ্গীয় কথাসাহিত্যের প্রভাবে এ-পর্বে নবীন ছোটগাল্পিকদের রচনায় এসেছে আধুনিক নাগরিকচেতনা, লিবিডোতাড়িত মনোবিকলন এবং যুদ্ধোত্তর পশ্চিমি অবক্ষয়ীচেতনা। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনে অবরুদ্ধ সংক্ষুব্ধ পূর্ববাংলার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটও এ সময়ের ছোটগল্পে অভিব্যঞ্জিত হয়েছে। পাকিস্তানোত্তর প্রথম দশকের তুলনায় এ পর্বের ছোটগাল্পিকরা অনেক বেশি আঙ্গিকসচেতন ও প্রকরণনিষ্ঠ; বিষয়াংশ-নির্বাচন, ভাষা-ব্যবহার এবং প্রকরণ-পরিচর্যায় অধিকাংশ ছোটগাল্পিক পরীক্ষাপ্রবণ ও বৈচিত্র্যসন্ধানী। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তীকালের এই উত্তরাধিকারের ওপরও নির্মিত হয়েছে বিদেশি শত্রুমুক্ত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ছোটগল্প-সাহিত্য।
পাঁচ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনে সূচিত হলো মৌল পরিবর্তন, চেতনার ক্ষেত্রেও ঘটলো গুণগত বিকাশ। সমাজ জীবনের অন-র্গঠনের রূপ-পরিবর্তন অভ্যন-র নিয়মেই রূপান-রিত করে সমাজের বহির্গঠন তথা চৈতন্যপ্রবাহ। এজন্যেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি দেশের স্বাধীনতা সমগ্র জাতিকে রূপান্তরিত সত্তায় করে পুনর্জাত। স্বাধীনতার সোনালি প্রভায় আমাদের মন আর মননের যে নতুন চেতনা জাগ্রত হয়েছে, ছোটগল্পে তার প্রতিফলন ছিল একান-ই প্রত্যাশিত। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ ছোটগাল্পিক যুদ্ধোত্তর জাতীয় হতাশা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শব্দচিত্র অঙ্কনেই হলেন অধিক আগ্রহী; দ্রোহ-বিদ্রোহ-প্রতিবাদে উচ্চকিত হওয়ার পরিবর্তে অনেকেই যেতে চাইলেন নির্বেদ-নিরানন্দের অতল গহ্বরে; এবং সবাই মিলে সম্মিলিত-সাধনায় লিখলেন মাত্র একটি ছোটগল্প, যার মৌল বিষয় নাস্তি – নিখিল নাসি-। তবে একই সঙ্গে এ-কথা অনস্বীকার্য যে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ছোটগল্পে জড়িয়ে আছে সংগ্রাম ও বিজয়ের বিমিশ্র অভিব্যক্তি, যা একান্তই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। যুদ্ধোত্তর সময়ে সর্বব্যাপী হতাশা, নির্বেদ ও বিপর্যয় কাটিয়ে মহৎ শিল্পীমানস অনুসন্ধান করে জীবন ও শিল্পের জন্যে সদর্থক এবং আলোকোজ্জ্বল এক মানসভূমি – কোনো কোনো ছোটগাল্পিকের রচনায় এ জাতীয় অভিজ্ঞান মুক্তিযুদ্ধোত্তর ছোটগল্প-সাহিত্যের আশাব্যঞ্জক দিক। স্বাধীনতা-উত্তরকালে যে-সব গল্পকার বাংলাদেশের সাহিত্যে আবির্ভূত হন, তাঁরা হচ্ছেন – মালিহা খাতুন (১৯২৮-), হেলেনা খান (১৯২৯-), কাজী ফজলুর রহমান (১৯৩১-), আবুবকর সিদ্দিক (১৯৩৪-), আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দীন (১৯৩৪-), রাবেয়া খাতুন (১৯৩৫-), রাবেয়া সিরাজ (১৯৩৫-), খালেদা সালাউদ্দিন (১৯৩৫-), মকবুলা মনজুর (১৯৩৮-), আল মাহমুদ (১৯৩৮-), খালেদা এদিব চৌধুরী (১৯৩৯-২০০৮), নাজমা জেসমীন চৌধুরী (১৯৪০-১৯৮৯), নয়ন রহমান (১৯৪০-), জুবাইদা গুলশান আরা (১৯৪২-), আমজাদ হোসেন (১৯৪২-), আবু কায়সার (১৯৪৫-), হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-), আবুল হাসান (১৯৪৭-৭৫), শহিদুর রহমান, জুলফিকার মতিন, আরেফিন বাদল, বুলবুল চৌধুরী, শান-নু কায়সার, আফসান চৌধুরী, তাপস মজুমদার, সৈয়দ ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন, আতা সরকার, আবু সাঈদ জুবেরী, মঞ্জু সরকার, হরিপদ দত্ত, শহীদুল জহির, মামুন হুসাইন, আহমদ বশীর, মুস-াফা পান্না, সিরাজুল ইসলাম, জাফর তালুকদার, সেলিম রেজা, কাজী শামীম, মঈনুল আহসান সাবের, ইসহাক খান, এহসান চৌধুরী, সাইয়িদ মনোয়ার, ইমরান নূর, সারোয়ার কবীর, রেজোয়ান সিদ্দিকী, সুশান- মজুমদার, সুকান- চট্টোপাধ্যায়, হারুন হাবীব, ভাস্কর চৌধুরী, বিপ্লব দাশ, ইসমাইল হোসেন, শাহ্নাজ মুন্নী, মহীবুল আজিজ, পারভেজ হোসেন, নকীব ফিরোজ, রায়হান রাইন, মনি হায়দার, লুৎফর রহমান রিটন প্রমুখ শিল্পী।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে উন্মোচিত হয়েছেন পূরবী বসু। নারী জীবনের অস্তিত্ব এবং নারীত্বের মর্মবেদনা তাঁর গল্পের প্রধান বিষয়। তাঁর বলার ঢং আলাদা। নারীর অন-র্দাহ তাঁর মতো করে আর কোনো গল্পকার উন্মোচিত করেননি।
এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ ও উপাদানপুঞ্জ ব্যবহার করে ছোটগল্প রচনায় বাংলাদেশের নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের মাঝে দেখা দেয় ব্যাপক উৎসাহ। আমাদের গল্পকারদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে ছিলেন জড়িত। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা যুদ্ধোত্তর কালে তাঁদের কাছে বিপুল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দেখা দেয়। দীর্ঘ সিকি শতাব্দী ধরে নিজেকে শনাক্ত করার যে-সাধনায় বাংলাদেশের শিল্পীরা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ, তার সাফল্যে ছোটগল্পের ভাব-ভাষা-প্রকরণশৈলীতে যুদ্ধোত্তর কালে এসেছে নতুন মাত্রা। বিষয় ও ভাবের দিক থেকে বাংলাদেশের ছোটগল্পে যেমন মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে; তেমনি ভাষা-ব্যবহার এবং অলঙ্কার-সৃজনেও মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ উপসি’ত। ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে বিভিন্নভাবে। কখনো সরাসরি যুদ্ধকে অবলম্বন করে ছোটগল্প রচিত হয়েছে, কখনো-বা ছোটগল্পের মৌল-ভাব সৃষ্টি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে। কোনো কোনো ছোটগল্পে স্বাধীনতার স্বপক্ষীয়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং বিপক্ষীয়দের প্রতি ঘৃণাবোধ উচ্চারিত হয়েছে। আবার কোথাও-বা ছোটগল্পের বহিরঙ্গে লেগেছে মুক্তিযুদ্ধের স্পর্শ। মুক্তিযুদ্ধের উপাদানপুঞ্জ ব্যবহার করে বাংলাদেশের প্রায় সব গল্পকারই রচনা করেছেন ছোটগল্প। শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে যাঁদের গ্রন’ প্রকাশিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন – বশীর আল হেলাল প্রথম কৃষ্ণচূড়া (১৯৭২), হাসান আজিজুল হক নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫), সৈয়দ শামসুল হক জলেশ্বরীর গল্পগুলো (১৯৯০), বিপ্রদাস বড়-য়া যুদ্ধজয়ের গল্প (১৯৯১), কাজী ফজলুর রহমান ষোলই ডিসেম্বর ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৮৮), সৈয়দ ইকবাল একদিন বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য গল্প (১৯৮৬), এহসান চৌধুরী একাত্তরের গল্প (১৯৮৬), শওকত ওসমান জন্ম যদি তব বঙ্গে (১৯৭৫), আলাউদ্দিন আল আজাদ আমার রক্ত, স্বপ্ন আমার (১৯৭৫), আবু জাফর শামসুদ্দীন রাজেন ঠাকুরের তীর্থযাত্রা (১৯৭৭), আবুবকর সিদ্দিক মরে বাঁচার স্বাধীনতা (১৯৭৭), সাদেকা শফিউল্লাহ যুদ্ধ অবশেষে (১৯৮০), খালেদা সালাহউদ্দিন যখন রুদ্ধশ্বাস (১৯৮৬) প্রমুখ। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গে যেসব গল্পের কথা বিশেষভাবে স্মরণীয়, লেখকনামসহ তার তালিকাটি এরকম – সত্যেন সেন ‘পরিবানুর কাহিনী’, তাজুল ইসলাম ফিরোজ ‘সপ্তর্ষী অনেক দূরে’, মঞ্জু সরকার ‘শানি- বর্ষিত হোক’, শওকত আলী ‘সোজা রাস-া’, ‘আকাল দর্শন’, আফসান চৌধুরী ‘ফাঁকা শহরের গল্প’, সিরাজুল ইসলাম ‘দূরের খেলা’, রাহাত খান ‘মধ্যিখানের চর’, রশীদ হায়দার ‘কল্যাণপুর, এ কোন ঠিকানা’, মীর নূরুল ইসলাম ‘স্বৈরিণী ফিরে এসো’, কায়েস আহমেদ ‘আসন্ন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অপঘাত’, সেলিম হোসেন ‘আমিনা ও মদিনার গল্প’, মাহমুদুল হক ‘কালো মাফলার’, মঈনুল আহসান সাবের ‘কবেজ লেঠেল, ভুল বিকাশ’, সুচরিত চৌধুরী ‘নিঃসঙ্গ নিরাশ্রিত’, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ‘কেয়া, আমি এবং জারমান মেজর’, জহির রায়হান ‘সময়ের প্রয়োজনে’, শামসুদ্দীন আবুল কালাম ‘পুঁই ডালিমের কাব্য’, আমজাদ হোসেন ‘উজানে ফেরা’, হুমায়ূন আহমেদ ‘শীত’, ‘উনিশ’ শ একাত্তর’, রিজিয়া রহমান ‘ইজ্জত’, হুমায়ুন আজাদ ‘যাদুকরের মৃত্যু’, মামুন হুসাইন ‘মৃত খড় ও বাঙাল একজন’ প্রভৃতি। মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষঙ্গ-উপাদান নিয়ে রচিত হয়েছে এসব গল্প। মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সঙ্কলন-গ্রনে’র কথাও এখানে স্মরণীয় – আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী-সম্পাদিত বাংলাদেশ কথা কয় (১৯৭১), আবুল হাসনাত-সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৮৩), হারুন হাবীব-সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প (১৯৮৫), বিপ্রদাশ বড়-য়া-সম্পাদিত মুক্তিযোদ্ধার গল্প (১৯৯১) প্রভৃতি। এসব গ্রনে’ অন-র্ভুক্ত গল্পসমূহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা ও অনুষঙ্গ শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় হয়েছে উদ্ভাসিত।
মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনেক গল্প রচিত হলেও আমরা এখনো পাইনি এমন একগুচ্ছ কালজয়ী গল্প, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির সম্মিলিত চৈতন্যের জাগরণকে যথাযথভাবে প্রতিমায়িত করতে সমর্থ হয়েছে। এর কারণ বহুবিধ। প্রথমত, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বল্পস’ায়িত্ব এটিকে যথার্থ জনযুদ্ধে পরিণত হতে দেয়নি, ফলে মুক্তিযুুদ্ধের চেতনাও হয়নি সর্বব্যাপ্ত এবং এরই শিকার, অধিকাংশ বাঙালির মতো, বাংলাদেশের ছোটগাল্পিকরাও। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধ এখনো অত্যন- কাছের একটি ঘটনা, এবং এজন্যই অধিকাংশ ছোটগাল্পিকের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা – আবেগ-উচ্ছ্বাসতাড়িত, সেখানে স্বভাবতই ফুটে ওঠে শৈল্পিক নিরাসক্তির অভাব। সময় পেরিয়ে যখন আসবে নতুন প্রজন্মের ছোটগাল্পিক, হয়তো তাঁদের হাতেই লেখা হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে লেখা একগুচ্ছ কালোত্তীর্ণ ছোটগল্প।
স্বাধীনতা-উত্তর ছোটগল্পে আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেকটা কমেছে, তুলনামূলকভাবে বেড়েছে বিষয়ের বৈচিত্র্য। এ পর্বে অধিকাংশ ছোটগাল্পিক যুদ্ধোত্তর হতাশা-অবক্ষয় আর নৈরাজ্যের শব্দরূপ নির্মাণে সচেষ্ট হলেন; উৎসাহী হলেন যন্ত্রণাদগ্ধ তারুণ্যের নষ্ট-জীবনের শিল্পমূর্তি-সৃজনে। সত্তরের দশকের বাংলাদেশের ছোটগল্পের মৌল-প্রবণতা ওই দশকেরই একজন প্রধান গল্পকারের দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে এভাবে -
সত্তরের গল্পকাররা প্রত্যেকে বয়সে নবীন। কিন’ সমাজ, মানুষ, পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে গল্প রচনায় নবীন নন। স্বাধীনতা-পরবর্তী ঘটনার প্রতি রয়েছে তাঁদের তীব্র চাউনি। যুদ্ধোত্তর সংকটে, দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক অভ্যুত্থান এবং শাসক শ্রেণীর প্রতারণার বাস-বতা সত্তরের গল্পকারদের জীবন- বিষয়। লেখকদের মধ্যে যাঁরা সমাজ সজ্ঞান তাঁরা বুর্জোয়া রাজনীতির সীমাবদ্ধতা ও স্খলন ছোটগল্পে চিত্রিত করেন। সত্তরের রোমান্টিক ধারার গল্প লেখকরাও সামাজিক অসাম্য অসি’রতা চিত্রিত করেছেন তাঁদের গল্পে।… এই দশকে গল্পলেখকদের গল্প-পাঠে দেখা যায়, তাঁরা যে যে অবস’ার মুখোমুখি হয়েছেন তার সব কিছু আত্মসাৎ করেছেন ছোটগল্পে। গ্রাম শহর উভয়বিধ পটভূমি উঠে এসেছে ছোটগল্পের জমিতে।২১
স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের ছোটগল্পে যেসব শিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে, তাঁদের মধ্যে বুলবুল চৌধুরী, হুমায়ূন আহমেদ, আল মাহমুদ, আবুবকর সিদ্দিক, আতা সরকার, আহমদ বশীর, মঞ্জু সরকার, পূরবী বসু, সৈয়দ ইকবাল, হরিপদ দত্ত, শহীদুল জহির, মামুন হুসাইন, সুশান- মজুমদার, সুকান- চট্টোপাধ্যায়, মুস-াফা পান্না, মঈনুল আহসান সাবের, জাকির তালুকদার, আহমাদ মোস-ফা কামাল, প্রশান- মৃধা, শাহ্নাজ মুন্নী, মহীবুল আজিজ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, রায়হান রাইন প্রমুখ শিল্পী প্রকৃত অর্থেই রেখেছেন প্রাতিস্বিকতার স্বাক্ষর।
হুমায়ূন আহমেদ মধ্যবিত্তের জীবন-চিত্রণে সিদ্ধহস-। মধ্যবিত্তের তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রেম ও স্বপ্ন তাঁর গল্পের উপজীব্য। ‘চোখ’ তাঁর অসামান্য একটি গল্প। তাঁর কৃতিত্ব শিখরস্পর্শী এবং তাঁর গল্পে মানব জীবনের হৃদয়-যন্ত্রণা ভিন্ন মর্যাদা পায়।
সাবলীল গদ্যে মানুষ ও সমাজের তলদেশ উদ্ভাসনে বুলবুল চৌধুরীর নৈপুণ্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। মানুষের আদিম জৈবকামনার নিরাভরণ চিত্র প্রতীকী ব্যঞ্জনা এবং আবেগী পরিচর্যায় অঙ্কিত হয়েছে আল মাহমুদের ছোটগল্পে। ‘পানকৌড়ির রক্ত’ কিংবা ‘জলবেশ্যা’র মতো দুঃসাহসী গল্পে কাম-বাসনার পটে মানব-মনস্তত্ত্বের জটিলতা উন্মোচনে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন আল মাহমুদ।
সুশান- মজুমদার মুক্তিযুদ্ধোত্তর নৈরাশ্য, সামাজিক অসঙ্গতি, সামপ্রদায়িক শক্তির অত্যাচার এবং নিুবিত্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম ও অসি-ত্ব সংকট নিয়ে গল্প লিখেছেন। মঞ্জু সরকারের গল্পে ফুটে উঠেছে মহাপীড়িত উত্তরবঙ্গের দারিদ্র্যলাঞ্ছিত মানুষের জীবনসংগ্রামের ছবি। হরিপদ দত্তের গল্পে পাওয়া যায় শ্রেণিসংগ্রাম চেতনা ও সাম্যবাদী আদর্শের শিল্পায়ন। সুশান-, মঞ্জু, হরিপদের গল্প রাজনৈতিক চেতনাঋদ্ধ এবং প্রগতিশীল সমাজদৃষ্টি-লালিত। ইমদাদুল হক মিলনের গল্পেও পাওয়া যায় ইতিহাস ও রাজনীতির যুগল অঙ্গীকারের চিত্র। নাসরীন জাহান নারীবাদী দৃষ্টিকোণে গল্প লিখে বাংলাদেশের ছোটগল্পের ধারায় নতুন এক মাত্রা সঞ্চার করেছেন। নারী-মনস-ত্ত্ব নির্মাণে তার নিপুণতা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। বর্ণনাপ্রধান গল্প নিযে সিদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন মঈনুল আহসান সাবের, আহমদ বশীর, মহীবুল আজিজু প্রমুখ ছোটগাল্পিক। আক্রিক-পরীক্ষা এবং মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যায় মামুন হোসাইনের গল্প অর্জন করেছে বিশিষ্টতা।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে যুগসংকট এবং রাজনৈতিক সংক্ষোভ ও সংগ্রাম নিয়ে গল্প লিখছেন আবুবকর সিদ্দিক। বিষয় ও প্রকরণে তাঁর গল্প বিশিষ্ট ও স্বাতন্ত্র্য প্রত্যাশী। রাজনৈতিক অনুষঙ্গ নিয়ে গল্প-রচনায় সৈয়দ ইকবালও সমধিক উৎসাহী। স্বাধীনতা-উত্তরকালের বিপন্নতা ও নির্বেদ নিয়ে বেশ কিছু নিরীক্ষাসফল গল্প লিখেছেন তিনি। সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের গল্পে জীবন ও প্রকৃতির মনোময় একাত্মতা বাংলাদেশের ছোটগল্পে সংযোজন করেছে নতুন মাত্রা। এ-প্রসঙ্গে তাঁর ‘ভগবান’, ‘জটাধারীর বান্নী’, ‘উজানিভাটালি’ প্রভৃতি গল্প বিশেষভাবে স্মরণীয়। রাজনৈতিক কূট-তর্ক, তত্ত্বসংকট এবং সামরিক শাসনের পটে গল্প লিখেছেন আতা সরকার। সত্তুর দশকের রাজনীতি যেন বন্দি হয়ে আছে আতা সরকারের গল্পে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো আহমদ বশীরও ঢাকার জনজীবন নিয়ে গল্প লিখে বিশিষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন। মঞ্জু সরকারের গল্পে রূপান্বিত হয়েছে উত্তরবাংলার রুক্ষ প্রকৃতি, বিধ্বস্ত জনপদ, বিপন্ন সমাজ আর সংগ্রামী জনগোষ্ঠী। রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয়ও ফুটে আছে মঞ্জু সরকারের গল্পে।
শ্রেণিসচেতন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে শোষকের পতন আর শোষিতের উত্থান নিয়ে গল্প লিখেছেন হরিপদ দত্ত। খেটে-খাওয়া নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদী চেতনাই তাঁর গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয়। চড়া সুর বাঁধা হরিপদ দত্তের গল্প। চলিত ও আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগে হরিপদ দত্তের সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুস্তফা পান্নার গল্পেও আছে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের শৈল্পিক সিদ্ধির স্বাক্ষর। দক্ষিণবাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠী আর তাদের সংগ্রামশীল জীবনই মুস্তফা পান্নার গল্পের মৌল বিষয়। হরিপদ দত্তের মতো মুস্তফা পান্নার গল্পে অন্তর্স্রোতেও সর্বদা বহমান শ্রেণিচেতনা। মানবমনের অন্তগূর্ঢ় রহস্য-উন্মোচনই মঈনুল আহসান সাহেবের ছোটগল্পের মৌল অন্বিষ্ট। শহরজীবনের ক্লেদ-স্খলন-নির্বেদ নিয়ে গল্প রচনায় তিনি সিদ্ধহস্ত।
স্বাধীনতা-উত্তরকালের বাংলাদেশের ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, বোধ করি এই যে, এ সময় আমাদের ছোটগাল্পিক – চেতনা হয়ে ওঠে অনেক বেশি রাজনীতিসচেতন ও জনজীবনমূল-অন্বেষী। ‘সত্তর দশকের সমস্ত গল্প লেখকের গল্পের বিষয় মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসংবলিত কথাবস’।’২২ বস’ত, আশির দশকের গল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রেও একথা সমান প্রযোজ্য। স্বাধীনতা-উত্তরকালে পাঠকপ্রিয়তার লোভে এবং বাণিজ্যলক্ষ্মীর আরাধনায় কয়েকজন শক্তিমান গল্পকার সৃষ্টি করেছেন একটা ‘জলো, অসার, বারোয়ারি কেচ্ছা’ লেখার ধারা, যা ক্রমশ স্ফীতোদর হচ্ছে, ধ্বংস করছে গল্পসাহিত্যের শিল্পিত বিকাশের যাত্রাপথ। ষাটের দশকের যে আঙ্গিক-সচেতনতার সূত্রপাত, আশিতে এসে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এখন অনেকেই পাঠকরুচির কাছে বিসর্জন দিচ্ছেন শিল্পমানকে, বক্তব্যভুক পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্যেই তাঁরা যেন সর্বদা সচেষ্ট।
আশির গল্পকার সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল ও শক্তিমান শহীদুল জহিরের গল্পে মানুষের বেঁচে থাকার আর্তি ও সংগ্রাম নবীন মাত্রা নিয়ে উন্মোচিত হয়েছে। তাঁর সময়ের তিনি সবার্ধিক আলোড়িত। প্রেম ও ভালোবাসা এবং মানুষের অস্তিত্বের সংকট তাঁর গল্পের প্রধান বিষয়।
নব্বইয়ের গাল্পিক শাহাদুজ্জামানের গল্পে নিরীক্ষাধর্মী শিল্পজিজ্ঞাসার ছাপ স্পষ্ট। পারভেজ হোসেন, ইমতিয়ার শামীম, আহমাদ মোস-ফা কামালের গল্পেও পাই নানামাত্রিক নিরীক্ষার ছাপ। সাদ কামালী, শাহনাজ মুন্নী, সেলিম মোরশেদ, কাজল শাহনেওয়াজ, ওয়াসি আহমেদ, মশিউল আলম, রায়হান রাইন প্রমুখ গল্পকার বাংলাদেশের ছোটগল্পে শক্তিমান গাল্পিক হিসেবে ইতোমধ্যে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
ছয়
উপর্যুক্ত আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের ছোটগল্পের বিকাশরেখা সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। বিস-ৃতির অবকাশ না-থাকার কারণে, অনেক ক্ষেত্রেই আলোচনাকে করতে হয়েছে সংক্ষিপ্ত, সেদিক থেকে পর্যবেক্ষণ করলে এ কোনো পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বা অন-র্জরিপ নয়। এবং এ কারণেই অনেক অপ্রধান ছোটগাল্পিকের রচনা হতে পারেনি আলোচনার অন্তর্গত। বাংলাদেশের ছোটগল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে সত্য প্রতিষ্ঠা পায় তা এই যে, আমাদের সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় ছোটগল্প দাবি করতে পারে গৌরবের আসন। তবে বর্তমান সময়ে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে চলছে এক ধরনের বন্ধ্যত্ব। বাংলাদেশ কিংবা ভারতীয় বঙ্গ – উভয় ক্ষেত্রেই বিশুদ্ধ ছোটগাল্পিকের আবির্ভাব এখন ক্বচিৎ-কদাচিৎ। ইতিপূর্বে যাঁরা ভালো গল্প লিখেছেন, তাঁরা অনেকেই হাত গুটিয়ে নিয়েছেন, আসছেন না নবীন অনেক ছোটগাল্পিক, বিশেষ করে কয়েকজন নারী গল্প-লেখিকার মধ্যে আমরা সম্ভাবনা দেখছি। প্রবীণরা, অনেকেই, পূর্বে লেখা গল্পগুলো একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নতুন ভাষ্যে করছেন উপস্থাপন। বোঝা যায়, ফুরিয়ে গেছে তাঁদের প্রতিভার দীপ্তি।
পঞ্চাশ-ষাট-সত্তুরের দশকে ছোটগল্পের মূল বাহন পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীর অভাব ছিল প্রকট। তবু ছোটগল্প রচিত হয়েছে। বর্তমানে পত্র-পত্রিকার অভাব নেই, অভাব ভালো ছোটগল্পের। মানুষের সময়ধারণার পটভূমিতে জন্ম হয়েছিল ছোটগল্পের। সময়ের শাসন এখন ঊনবিংশ শতাব্দীর তুলনায় আরো প্রকট। তাহলে বাংলা ছোটগল্পের এই দৈন্যদশা কেন? নাকি পাঠকপ্রিয়তা ও বাণিজ্যবুদ্ধির প্রেরণায় রচিত ষাট থেকে আশি পৃষ্ঠার উপন্যাস নামের বড় গল্পগুলো বাধাগ্রস্থ করছে ছোটগল্পের বিকাশ? পাঠক-রুচির কাছে লেখক বিসর্জন দিচ্ছেন কি আপন প্রতিভা? প্রকাশক যে কাটতি না থাকলে ছোটগল্পের বই প্রকাশ করবেন না – এ কথা তো লেখাই বাহুল্য। তবু তো কথা থেকে যায় কোনো কোনো সৎ প্রকাশকের কাছে। আমরা আশা করবো, সেইসব নবীন-প্রবীণ ছোটগাল্পিক, যাঁদের ক্ষমতা আছে, তাঁরা এগিয়ে আসবেন ভালো ছোটগল্প রচনায়; সম্মিলিত সাধনায় তাঁরা আবার আনবেন বাংলাদেশের ছোটগল্পের পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের সেই স্বর্ণালি আভা, একবার, আরো একবার। তারপরও ছোটগল্পের অমিত সম্ভাবনার কথা না বললেই নয়। ছোটগল্পই হয়ে ওঠে জীবন-দর্পণ। নবীনদের ছোটগল্পে সে-প্রত্যাশারই প্রতিফলন হবে – এ আশাই ব্যক্ত করি।
তথ্যনির্দেশ
১. রথীন্দ্রনাথ রায়, ছোটগল্পের কথা (কলকাতা, ১৯৮৮), পৃ ৪৬।
২. সৈয়দ আকরম হোসেন, বাংলাদেশের সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গে (ঢাকা, ১৯৮৫), পৃ ১৪।
৩. রাজীব হুমায়ুন, আবুল মনসুর আহমদের ব্যঙ্গ রচনা (ঢাকা, ১৯৮৫) পৃ ১২-১৯।
৪. সৈয়দ আকরম হোসেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (ঢাকা, ১৯৮৮), পৃ ৭৫, ৭৭।
৫. আহমদ কবির, ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান-র : বিষয় ও প্রকরণ : প্রসঙ্গ – ছোটগল্প’, একুশের প্রবন্ধ ৮৮ (বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৮), পৃ ৩৮।
৬. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (আধুনিক যুগ), (ঢাকা ১৩৮৫), পৃ ৪৪০।
৭. অসীম সাহা, ‘এ-দেশের গল্প/পূর্ণতা-অপূর্ণতা’, কণ্ঠস্বর (সম্পাদক : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ), ঢাকা, দশম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ১৯৭৫, পৃ ২৭।
৮. রফিকউল্লাহ খান, ‘হাসান হাফিজুর রহমানের ছোটগল্প’, সাহিত্য পত্রিকা, (সম্পাদক : মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান), অষ্টাবিংশ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ফাল্গুন ১৩৯১, পৃ ২৪১।
৯. অসীম সাহা, ‘এ-দেশের গল্প/ পূর্ণতা-অপূর্ণতা’, পূর্বোক্ত, পৃ ২৯।
১০. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (আধুনিক যুগ), পূর্বোক্ত, পৃ ৪৪২।
১১. আহমদ কবির, ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান-র : বিষয় ও প্রকরণ : প্রসঙ্গ – ছোটগল্প’, পূর্বোক্ত, পৃ ৩৯।
১২. বিশ্বজিৎ ঘোষ, বাংলাদেশের সাহিত্য (ঢাকা, ১৯৯২), পৃ ১৪-১৫।
১৩. আহমদ কবির, ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান-র : বিষয় ও প্রকরণ : প্রসঙ্গ – ছোটগল্প’, পূর্বোক্ত, পৃ ৪৭।
১৪. অসীম সাহা, ‘এ-দেশের গল্প/ পূর্ণতা-অপূর্ণতা’, পূর্বোক্ত, পৃ ৩২।
১৫. অশ্রুকুমার সিকদার, নবীন যদুর বংশ (কলকাতা, ১৯৯১), পৃ ৪৭।
১৬. পূর্বোক্ত, পৃ ১৪৭-১৪৮।
১৭. আবু জাফর, গল্পকার হাসান আজিজুল হক (ঢাকা, ১৯৮৮), পৃ ১০।
১৮. সুশান- মজুমদার, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস : দ্বৈরথ সময়’, আজকের কাগজ, ঢাকা, ১৯৯১।
১৯. সালাম সালেহ্উদ্দীন (সম্পাদক), অরুন্ধতী, প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, জুলাই ১৯৯১, ঢাকা, পৃ ৩৫।
২০. কায়েস আহমেদ, ‘নিজের সঙ্গে আলাপ’, অরুন্ধতী, পূর্বোক্ত, পৃ ২১।
২১. সুশান- মজুমদার, ‘ষাটের উত্তরাধিকার : সত্তের গল্প’, অরুন্ধতী, পূর্বোক্ত, পৃ ২৯।
২২. পূর্বোক্ত, পৃ ২৮।
ফেরি জাহাজের অপেক্ষায়
সৈয়দ শামসুল হক
আমি তাকে আগে কখনো দেখিনি। লোকটিকে আমি ঠিক পছন্দ করতে পারছিলাম না। এ রকম হয়। অনেক মানুষের দেখা পাওয়া যায় পথে। এই দেখা হলো, আর কখনো দেখা হবে না। ওইটুকুর ভেতরেই পছন্দ-অপছন্দ গড়ে ওঠে। কখনো এমন হয়, মানুষটির কথা বহুদিন পর্যন্ত মনে থাকে।
দৌলতদিয়ার ফেরি জাহাজের জন্যে পাটুরিয়া ঘাটে অপেক্ষা করছি গাড়ি নিয়ে। নিজেই চালাই। মনটা ভালো নেই। সাবধানে চালিয়ে এসেছি ঢাকা থেকে। বন্ধুরা মানা করেছিলো। একজন তার ড্রাইভারসহ গাড়ি দিতে চেয়েছিলো। ওহে, এ সময়ে নিজে গাড়ি না চালানোই ভালো। আমার জেদাজেদি দেখে একজন তো সঙ্গে আসতেও চেয়েছিলো। কাউকে আনিনি।
জাহাজ আসতে এখনো অনেক দেরি। এক পেয়ালা চা খেয়েছি দোকানে দাঁড়িয়ে। দূরপাল্লার বাস কয়েকটা এসে থেমে আছে পারের অপেক্ষায়। যাত্রীরা সব নেমে পড়েছে। নেমে হাঁটাহাঁটি করছে। বেশ একটা ভিড়ই হয়ে গেছে। পায়ের নিচে নদীপারের বালি। রোদে তপ্ত।
মানুষজন কেউ নাশতার জন্যে হোটেলে হোটেলে ঢুকে পড়েছে। হোটেলের সমুখে পাতা তাওয়ার ওপরে ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে ডিম ভাজা হচ্ছে। ঘন ঘ্রাণ বেরিয়েছে। টিনের থালার ওপরে খবর কাগজের টুকরো পেতে তার ওপরে ডিম-পরোটা পাচার হচ্ছে মুহুর্মুহু। কেউবা ইলিশভাজা লালপোড়া লংকা পেঁয়াজে-ভাতে ডলে গোগ্রাসে গিলছে।
দোকানিরা অভয় দিয়ে বলছে, আস্তে খান সায়েবেরা। টাইম অনেক পাবেন। আরেকখান মাছ দেই? পদ্মার ইলিশ!
ঘাটের সুপারভাইজারের কাছে শোনা গেলো, ফেরি আসতে দেরি হবে। কোথায় একটা জাহাজ নাকি ডুবোচরে ধাক্কা খেয়ে আটকা পড়েছে।
সেই ডিম-পরোটা, ইলিশভাজা, গরম ভাত আর মানুষজনের ভিড়ের মধ্যে লোকটি হঠাৎ আমার চোখে পড়ে যায়। লোকটির চোখ ফড়িংয়ের মতো চঞ্চল। যে ফুলে মধু সেই ফুলেই ফড়িং গিয়ে বসে। লোকটির চোখ বাসযাত্রী-মোটরযাত্রী মহিলাদের ওপর ঘনঘন গিয়ে বসছে। এক মহিলা থেকে আরেক মহিলার ওপরে তার চোখ নাচানাচি করছে। হয়তো এ-জন্যেই লোকটি আমার চোখে পড়ে।
পরনে তার ছাইরঙা ময়লা সাফারি স্যুট, গায়ের রং তার চেয়েও ময়লা ছাইরঙা। টাউট কিসিমের চেহারা। বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। তিরিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ। গালে তিনদিনের না কামানো দাড়ি। দাঁত উঁচু। হাতে সিগারেট। ফসফস করে টানছে।
কাউকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলে দেখালোকটার ঘাড়ে কী একটা ঘটে যায়। ঘাড়ের কাছে শিরশির করে। ফিরে তাকায়। লোকটিও আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। আমাকে তার চোখে পড়ে। চোখে চোখ পড়তেই সে চোখ ফিরিয়ে নেয়। আবার ফিরে আমাকে দেখে।
তারপর এক কাণ্ড ঘটে। এক মহিলা থেকে আরেক মহিলার দিকে তার অনবরত চোখ ফেরাবার মাঝখানে সে আমাকেও এবার একবার করে দেখে নিতে থাকে।
সে আর আমি যেন একটা বাঁধনের মধ্যে পড়ে যাই। অচিরে আমি দেখি আমারও চোখ তারই মতো এক মহিলা থেকে আরেক মহিলার ওপরে গিয়ে বসছে। আর তারই মতো আমিও মাঝখানে একবার করে লোকটিকেও দেখে নিচ্ছি।
লোকটি এক মহিলা থেকে আরেক মহিলার ওপর চোখ ফেরাচ্ছে। আর আমারও চোখ তারই মতো একবার মহিলাদের দিকে পড়ছে, একবার তার দিকে।
অথচ, ঈশ্বর জানেন, এ রকম মেয়ে দেখার স্বভাব আমার নয়।
আমি বরং বরাবরই কোনো মেয়ের ওপর চোখ পড়তেই চোখ ফিরিয়ে নিই। যেন জগতের সব দেখা আমার জায়েজ, শুধু মেয়ে দেখা নয়। যেন ওতে একটা ঘোর অসভ্যতা আছে। বিয়ের রাতেও আমি ভালো করে স্ত্রীর দিকে তাকাতে পারিনি। পাঁচ বছর আগের কথা। এই সেদিন পর্যন্ত আমার স্ত্রী এ নিয়ে বড় মর্মানি-ক রকমে ঠাট্টা করে এসেছে আমাকে।
লোকটি ভিড় ঠেলে ভিড় গুঁতিয়ে হাঁটতে থাকে। আমিও হাঁটতে থাকি। সে আমাকে আকর্ষণ করে কী আমি তাকে আকর্ষণ করি, বুঝে উঠি না। আমরা দুজনে দুজনকে নজর থেকে আড়ালে আর এখন রাখছি না। লোকটিকে পছন্দ করছি না সত্যি, কিন’ চোখও ফিরিয়ে নিতে পারছি না।
লোকটিকে আমি ভিড়ের ভেতরে অনুসরণ করে চলি।
মহিলাদের অধিকাংশই গাড়িতে বা বাসে। তারা নামেনি। তারা জানালায় ঠেসে বসে আছে। এদের ভেতরে অনেকেই ঘরগেরস্ত করা বউ মানুষ। কারো কারো সঙ্গে ছানাপোনা। কয়েকজন তরুণী। তাদের কারো কারো চোখে সানগ্লাস। কারো ঠোঁটে ঘন লাল লিপস্টিক। একজন ওই যে নেমে এলো গাড়ি থেকে। আহ! মেয়েটির পরনে জিনস ট্রাউজার, ওপরে শাদা শার্ট। কাঁধে ক্যামেরা। হাতে চায়ের ফ্লাস্ক। ট্রাউজারের পেছনটা টানটান হয়ে আছে তানপুরার খোলের মতো।
মেয়েটি পারের একটা পিলারে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো। তারপর ক্যামেরা বের করে নদীর বুকে পালতোলা ডিঙি নৌকোর দিকে তাক করলো। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। মেয়েটি নৌকোর ফটো তুললো কী তুললো না, বোঝা গেলো না। চায়ের ফ্লাস্ক বের করে কাপে ঢাললো।
চা কয়েক ফোঁটা বেরিয়েই বন্ধ হয়ে গেলো। তখন সে ফ্লাস্কটার ওপর ভারি রাগ করে ঠোঁট কুঁচকে দাঁড়ালো। ফ্লাস্কটার বরাতে কী আছে কে জানে। ছুড়েই ফেলে দেবে হয়তো। দিলো না। কষে মুখ এঁটে ফ্লাস্কটার বাঁ-কাঁধে ঝোলালো। তারপর তাকিয়ে দেখতে লাগলো ভিড়, মানুষ।
তারপর মেয়েটি একটা পান দোকানে হেঁটে গিয়ে কোকের বোতল কিনলো। বোতলটার ছিপি খুললো সে দাঁত দিয়ে কামড়ে। সেই কামড়টা বড় দুঃসাহসী দেখালো। আর সেটা দেখে হাঁ করে দাঁড়িয়ে গেলো ঘাটের দুটি টোকাই।
মেয়েটি এবার আকাশের দিকে মাথা তুলে ঢকঢক করে কোক গিলতে লাগলো। আকাশের দিকে মুখ তোলার সময় হাতও উঠেছিলো বোতল সমেত। তখন বুকের শার্ট তার উঁচু হয়ে উঠলো। কোমরের গোলাপি রঙের বেল্ট বেরিয়ে পড়লো। স্তন দুটো ঠেলে উঠলো, যেন প্রতিবাদে, যেন তারাও খাবে কোক। সব কিছু ঝকঝক করতে লাগলো বেলা এগারোটার চোখ-ধাঁধানো রোদে।
লক্ষ করি, লোকটিও চোখ ফেলে আছে মেয়েটির বুকের দিকে। মেয়েটি গলা নামালো, বোতল নামালো, তৎক্ষণাৎ তার বুকের ওপর ঢিলে শার্ট ঝুলে পড়লো। স্তনের উচ্চতা মিলিয়ে গেলো শার্টের ভেতরে। ঠিক তক্ষুণি একটা জোর বাতাস উঠলো। বাতাস যেন বললো, আরে আমি তো ভালো করে দেখতেই পাইনি। তাই সেই বাতাসের দাপটে মেয়েটির বুকের বল দুটো আবার উঁচু হয়ে দেখা দিলো। বাতাস এবার বড় অসভ্যতা করলো। শার্টে চেপে ধরে বল দুটোকে ফুটিয়ে রাখলো।
আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। লোকটি তখনো তাকিয়ে আছে মেয়েটির বুকের দিকে। তার চোখে উৎকণ্ঠা? নাকি লালসায় চকচক করছে?
আমি মেয়েটিকে আবার ফিরে দেখি। বাতাস এখনো বদমাশ। মেয়েটি কী সর্বনাশা। এতগুলো মানুষের সমুখে বুকের কোনো খবরই নেই তার! নাকি এতোই সে সরল যে, নিজের শরীরটা নিয়ে কোনো ভাবনাই নেই! একবারও কি তার চোখে পড়ছে না লোকটি তাকে অসভ্য চোখে দেখছে?
কিংবা আমিও দেখছি! আর আমিও যে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছি না! বারবার চেষ্টা করছি। বারবারই ঘুরে ঘুরে মেয়েটির বুকের ওপর আমার চোখ গিয়ে পড়ছে।
লোকটির চঞ্চল চোখ বুঝি হঠাৎ অন্য কোনো দর্শনীয় খুঁজে পায়। সে দূরে চোখ পাঠায়। আর সেই চোখ ধরেই সে এবার দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। তার হাঁটবার সঙ্গে সঙ্গে আমিও একটা টান অনুভব করি। যেন আমাকেও সে সঙ্গে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে।
চট করে আমি মেয়েটির দিকে একবার ফিরে তাকাই। কিন’ হতাশ হই। বাতাসটা তখন মরে গিয়েছিলো, ঢিলে শার্টের গভীরে মেয়েটির স্তন হারিয়ে গিয়েছিলো। তারপরই কী হয়? বাতাস আমাকে বঞ্চিত করে না। বাতাসটা আবার ঝাঁপিয়ে ওঠে। মেয়েটির শার্ট আবার লেপটে যায় বুকে। যেন অদৃশ্য একটা হাত থপথপ করে বল দুটিকে বেশ দৃশ্যমান করে তোলে।
কী বেহায়া? কোথায় শার্ট টেনে ধরে বুক সামলাবে, লোকের চোখ থেকে স্তনের ডোল বাঁচাবে, তা নয়, দ্যাখো দিব্যি আছে। বুক ঠেলে আছে। বুকের ভেতরে বোঁটা পর্যন্ত চোখে পড়ছে এখন! লম্পটের মতো হামলে পড়ে নদীর দমকা বাতাস যেন ও দুটি নিয়ে ছানাছানি করছে।
আর একি! আমার চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটি আবছা মিষ্টি হেসে উঠলো যে!
টের পাই, আমার মুখেও আবছা হাসি ফুটে উঠছে। যেন আমি তার হাসির জবাবে সাড়া দিচ্ছি। আমি সম্মোহিত হয়ে যাই। আমার পা একবার মেয়েটির দিকে চঞ্চল হয়ে ওঠে। বুঝি একটি পা আমার অগ্রসরও হয়ে যায়। কিন’ ব্যাপারটা টের পাওয়া মাত্র আমি নিজেকে গুটিয়ে নিই। সন্ত্রস- হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিই।
পারে বাস আর গাড়ি লাইন দিয়ে দাঁড়ানো। তাকিয়ে দেখি, লোকটি এখন সেই লাইন ধরে পায়ে পায়ে হাঁটছে। মেয়েটি থেকে চোখ ফিরিয়ে আমিও সেই লাইন ধরে হাঁটতে থাকি। লোকটিকে নজর থেকে বাইরে যেতে দিতে রাজি নই। কিন্তু আমার যেন মনে হতে থাকে মেয়েটিও আমাকে দেখছে। দূর থেকে আমি ফিরে তাকাই। অনুমান সত্যি। মেয়েটি আমারই দিতে তাকিয়ে আছে। আমার ভেতরে মৃদু একটা উত্তেজনা টের পাই। আমি এর হাত থেকে নিস-ার চাই। আমি ভিড়ের ভেতরে ঢুকে যাই।
আর কিছু না পেয়ে লোকটিকেই আমি অনুসরণ করতে থাকি। কেন তাকে অনুসরণ করি আমার বোধে আসে না। এ নিয়ে আমি যে ভাবছি, তাও নয়। কেবল অনুভব করি, কী একটা কারণে যেন লোকটি আমাকে টেনে নিয়ে চলেছে।
অথচ লোকটিকে আমি চিনি না। আগে কখনো তাকে দেখিনি।
আমি চিনি-ত হয়ে পড়ি। চিন্তাটিকে ঈষৎ দুশ্চিন্তা বলেই বোধহয় আমার। আমি ঠাহর করতে পারি না দুশ্চিন্তার কারণটি কী হতে পারে?
লক্ষ করি, লোকটি এবার দাঁড়িয়ে পড়েছে। বছর পঁচিশ কি সাতাশের কোঠায় এক ভদ্রমহিলা শাদা একটা গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। সঙ্গে এতটুকু একটি বাচ্চা। মেয়ে বাচ্চা। মায়ের আঙুল ধরে মায়েরই চারপাশে টলমল করে ঘুরছে। মেয়েটির স্বামী গাড়ি থেকে বেরিয়ে সিগারেট ধরিয়ে উপভোগ করছে নদী, মানুষ, ভিড়। বারবার হাতঘড়ি দেখছে।
ভদ্রমহিলা নিচু হয়ে ধরে আছে শিশুটিকে। শিশু বারবার বেসামাল হয়ে পড়ছে। আর ভদ্রমহিলারও বুকের কাপড় পড়ে পড়ে যাচ্ছে। বাচ্চার দুধে পুষ্ট স্তনজোড়া বিশাল ফলের মতো গড়িয়ে পড়ছে নিচু হতেই। কিন্তু আঁচল তোলার তেমন বিশেষ তাড়া নেই ভদ্রমহিলার। আর হাসছে। আর বারবার গড়ানো আঁচলের কোণ ধরে চারদিকে তাকিয়ে হাসছে। খোলা বুক ব্লাউজের দিকে খেয়াল নেই, ঠোঁট মচকাচ্ছে। যেন একটা গরব। গরবটা নতুন মা হবার কী নিজের যৌবন এখনো উপচে পড়া বোধেই কিনা কে জানে!
লোকটিও কম টাউট নয় দেখছি। ভদ্রমহিলার একেবারে কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ফ্যালফেলে চোখ মেলে একবার সে মহিলাকে দেখছে, আরেকবার বাচ্চাটিকে। আমি দেখি আমিও একেবারে তাদেরই কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়েছি।
রোদের তপ্ত বেলায় মহিলার ব্লাউজের বগল ঘামে জবজবে। ঘামে বোধহয় নুন থাকে। বগলের কাছে শাদা চিতুই দাগ পড়েছে। এ আজকের ঘাম নয়। কতদিন কাচেনি? মুখে কড়া প্রসাধন ছিলো। এখন গলে একাকার। কাজল লিপস্টিক পাউডার সব লেপটালেপটি। মহিলার গালের কাছে একটা মাছি ভনভন করছে। বোধহয় গায়ে মাখা কড়া সুগন্ধের টানে। স্বামীটি তার দিকে তাকিয়ে আছে এক ধরনের ঘোরলাগা চোখে।
তখন আমি চোখ ফিরিয়ে নিই। একটু তফাতে সরে যাই। লোকটিও সরে যায়। গলা টান করে দূর থেকে সে নিরিখ করতে থাকে। তারপর একটা দূরপাল্লার বাসের কাছে যায়। আমি আমার জায়গা থেকেই তাকে লক্ষ করতে থাকি।
কিন্তু আমার মনের মধ্যে ভদ্রমহিলার ঘামে ভেজা ব্লাউজের বগল আর লেপটানো প্রসাধনে উষ্ণ মুখখানা জবরদস্তি বসে থাকে। ছবিটা আমি মুছে ফেলতে চাই। পারি না। আমি একবার মহিলার দিকে আরেকবার লোকটির দিকে চঞ্চল চোখ ফেরাতে থাকি।
একবার, মহিলা থেকে লোকটির দিকে চোখ ফেরাতেই দেখি লোকটি নেই। আরে! গেলো কোথায়? এই তো ছিলো! আমি ভিড়ের ভেতরে আঁতিপাঁতি করে খুঁজি তাকে। না, দৌড়ে নয়। চোখ দিয়ে খুঁজি। পাই না। আমি তখন একটু একটু করে সরতে থাকি। সরতে সরতে আবার সেই ভদ্রমহিলার পাশ দিয়ে হেঁটে যাই।
শুনি, ভদ্রমহিলার স্বামী চাপা গলায় শাসন করছে স্ত্রীকে। তপ্ত গলায় বলছে, তোমার বড্ড ইয়ে দেখছি! কোনো হুঁশ নাই! গাড়িতে এসে বসো! স্ত্রীও কম যায় না। সে বলছে, তুমি বসো গিয়ে গাড়িতে। আমি নদীর হাওয়া খাবো।
খাই তোমার মেটে না!
চুপ!
তুমি চুপ! বুক সামলাও!
তুমি চোখ সামলাও! জার্নিতে এ রকম হয়!
জার্নি জার্নি জার্নি। মনের মধ্যে শব্দটা আমি দোহরাতে থাকি। আমার স্ত্রীকে নিয়ে অনেক জার্নি করেছি। ঢাকা থেকে ঝিনেদা। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল। ঢাকা থেকে কুমিল্লা-চট্টগ্রাম। বেড়াতে পেলে ওর আর কথা নেই। চোখ ভরে দুনিয়া দেখবে। সাধ্য নেই ব্যাংকক কী সিঙ্গাপুরে যাই। তাই দেশের মধ্যেই। ময়নামতি, মুজিবনগর, পাহাড়পুর, সমুদ্র, চা বাগান।
কিন’ ওর খুব ভয় জার্নিতে। বাড়ি থেকে বেরুবার সময় দোয়া কালাম পড়বে। হাতব্যাগের ভেতর পুরো টয়লেট রোল নিয়ে বেরুবে। কী জানি বাবা, জার্নিতে কোথায় বাথরুম! সেখানে টয়লেট রোল পাওয়া যায় কী না যায় ঠিক কি! পানির বোতল নেবে চার-পাঁচটা। বাবা, পথের পানি খেয়ে কী ডায়রিয়াই হয়! আর সারাটা পথ আঁচল টেনে শরীর ঢেকে রাখবে। বাবা! পথে অজানা-অচেনা মানুষের নজর বড় নষ্ট হয়!
আরে! অজানা-অচেনা বলেই তো! দেখলেই বা!
সকলে তো আর তোমার মতো না! নিজের বউকেও দেখতে যার লজ্জা!
এতক্ষণে আমি হদিস পাই কেন আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো। কেন ওই লোকটিকে আমার পছন্দ হচ্ছিলো না। ওই লোকটির জন্যেই তো যা কখনো দেখি না তাই-ই আমাকে আজ দেখতে হলো।
আমি কি তবে নজরনষ্ট মানুষ হয়ে যাচ্ছি এতদিন পরে আজ এই নদীর পারে, ফেরি-জাহাজের অপেক্ষায় ভিড়ের ভেতরে? জিনসের ট্রাউজার পরা ওই মেয়েটি, ঘামে বগল জবজবে ওই ভদ্রমহিলাটিকে আমিও যে লোকটির মতো লম্পটের চোখে দেখছি!
দেখছি তো বটেই! দেখে ফেলেছি। চোখ ফেলে দেখেছি। ঘুরে ঘুরে দেখেছি।
আমি আমার স্ত্রীর কথা স্মরণ করে উঠি। ওগো, আমি মরে গেলে তুমি আর কারো দিকে চোখ দেবে না তো?
লোকটিকে হঠাৎ আবার আমি দেখতে পাই। বাস থেকে নেমে আসছে। সম্ভবত এই বাসে করেই সে কোথাও যাচ্ছে। বাসের মাথায় লেখা দেখি – টাকা টু মেহেরপুর। মেহেরপুরে আমিও গেছি স্ত্রীকে নিয়ে। মুজিবনগর দেখে এসেছি। স্বাধীন বাংলার সরকার যেখানে শপথ নিয়েছিলো সেই বৈদ্যনাথতলায়।
আমার বুকের ভেতর হু-হু করে ওঠে। আমি উদ্ভ্রানে-র মতো এলোপাতাড়ি হাঁটতে থাকি। আমি বাসের ভেতরে গাদাগাদি করা নারীদের দেখি। তাদের একজন জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে ওয়াক ওয়াক বমি করছে। হলুদ ভাত উঠে আসছে। আহা, সকালে বুঝি ভাত খেয়ে বেরিয়েছিলো।
আরেক জানালায় দুটি গেঁয়ো কিশোরী রাজ্যের ভয় নিয়ে সন্ত্রস্থ হয়ে বসে আছে। তাদের মাথায় তেল জবজবে বিনুনি। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে জগতের দিকে তাকিয়ে আছে।
আরেক জানালায় দেখি এক বুড়ি মুখ বাড়িয়ে পানের পিক ফেলছে। বাসের গা থেকে পিক গড়িয়ে পড়ছে থসথস করে।
হঠাৎ দেখি কোথা থেকে সেই লোকটি এসে জানালার কাছে দাঁড়ালো। তারপর বুড়িকে সে ধমক দিয়ে উঠলো।
আম্মা, পানের পিক প্যাসেঞ্জারের গায়ে পড়বো! বাসের গাও বা কী করছো! সাবধানে ফালাও।
আর তর সাবধান! বুড়াকালে তুই কী আমারে দেখস? পান ছাড়া দুনিয়ায় আমার আর আছে কী? দ্যাখ তুই জর্দা নি পাওয়া যায়! আমার জর্দা ফুরায়া গেছে।
লোকটি দ্বিগুণ ধমক দিয়ে এবার বলে, মওতের সময় হইলো তও তোমার জর্দার হাউস গেলো না।
মওত! মওতের ডর দেহাস আমারে? খলখল করে হেসে উঠলো বুড়ি।
লোকটি তখন আরো খেপে গিয়ে বললো, কব্বরে তোমার জর্দা দিমু, চিন্তা কইরো না।
বুড়ির তখন চোখ পড়ে আমার দিকে। বলে, হুনছেন, কতা হুনছেন হারামজাদার? এই বুকের দুধ খাওয়াইছি, মানুষ করছি।
লোকটি বিদ্রূপ করে বলে, দুধের খোটা আর কত দিবা? শুকায়া গেছে!
বুড়ি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বাসের জানালা দিয়ে শীর্ণ শরীরের প্রায় সবটা বের করে চেঁচিয়ে ওঠে, আরে আভাগির পুত, এই বুকে অখনো দুধ আছে। জগত খায়া শেষ করতে পারবো না এত দুধ! তুই তো তুই! নাদানের বাচ্চা নাদান! তর মতো হাজারটা পোলারে অখনো আমি দুধ দিবার পারি!
এই বলে বুড়ি জানালা ঠেলে মাথা খাড়া করে দাঁড়ায়। তারপর বুক থেকে চাদর ফেলে দিয়ে জগৎকে দেখায়। আমিও দেখি। মরা স্তন। শীর্ণ স্তন। কবেকার মায়ের স্তন। কোন কতকাল শত বছরের সেই দুধেল স্তন। এখন চুপসে আছে। স্তনের চিহ্নমাত্র এখন আর সে বুকে নেই। শস্তা সবুজ ব্লাউজ ঢলঢল করছে।
লোকটি আমার দিকে হঠাৎ তাকায়। এই প্রথম সে আমার সঙ্গে কথা বলে।
আম্মার মাথাটা বুঝলেন না, ঠিক নাই। অনেক দিনের ব্যারাম।
আমি কাতর হয়ে পড়ি কথাটা শুনে। আমি পায়ে পায়ে পেছন হটে আসি।
শুনতে পাই লোকটি তার মাকে এবার ঠান্ডা গলায় বলছে, আম্মা, বুক ঢাকো। বুক ঢাকো। বুড়া হয়া তোমার শরমভরম সব গেছে। চাদরটা গায়ে দেও। দুনিয়া যে দ্যাখে।
জগৎ প্রকাশিত হয়ে থাকে। জগৎ দেখতে থাকে। শিশু মেয়েটির মা সেই ভদ্রমহিলা গাড়িতে গিয়ে বসে। পিলার থেকে ঠেস তুলে তরুণী মেয়েটি বুকের ওপর তার শার্ট ঢিলে করে টেনে দেয়। নদীর বুক ভেঙে ফেরি-জাহাজের ভোঁ শোনা যায়।
আমার স্মরণ হয়, এই প্রথম আমি একা বেরিয়েছি গাড়ি নিয়ে। একা। শুধু আমি। আজ আমার স্ত্রী সঙ্গে নেই। এই প্রথম সে নেই। ঊনচল্লিশ দিন আগে আমার স্ত্রী মারা যায় স-নের ক্যান্সারে। আগামীকাল তার কুলখানি। আমি শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি। সেখানে তার চল্লিশা হবে।
আমাদের কোনো সন্তান নাই। আমাকে সে স্তন দিয়েছিলো, সন্তানকে স্তন দেবার মতো ভাগ্য হয় নাই রাহেলার।
ওভারভিউ
আবুবকর সিদ্দিক
নিচেয় কালো আঁধারে-অদৃশ্য অতল খাদ। উপরে সুচালো ডগা শানানো রসকষহীন পাথর এবড়ো-খেবড়ো। অজস্র। পথ আগেই খোয়া গেছে। একটা দুর্গম খাঁজে গোড়ালি পিছলিয়ে আঙুল পুঁতে দাঁড়িয়ে আছেন আলী আহমদ। আর এগোনো যাবে না। পথ তাঁকে তাড়া করে এনে জীবনের প্রান্তবেলায় এই বিন্দু অব্দি ছুড়ে রেখে সটকে পড়েছে। আলী আহমদ থম ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। গন্তব্যহীন। তার কোনো অপেক্ষমাণ ভবিষ্যৎ নেই। কেননা পরকাল বা পরলোকে বিশ্বাস তিনি কোনোদিন করেননি। আর করার প্রশ্নও ওঠে না এখন।
আশি বছর। আর কত? এর পরই অতল খাদ।
শরীরের দিকে নজর বুলিয়ে নালিশের কোনো ছুতো মেলে না। সবই ঠিকঠাক আছে। হার্ট-কিডনি ফিট। ডায়াবেটিসের বালাইমুক্ত। চোখে চশমা এঁটে খবরের কাগজ পড়েন। দুইবেলা রুটি খেয়ে দিব্যি হেঁটে চলে বেড়াচ্ছেন। চাকরি থেকে যথাসময়ে অবসর নিয়ে নিজের বাড়িতে পোক্ত হয়ে বাস করছেন। বাড়িটি পৈতৃক পেনশনের টাকা দিয়ে রিপেয়ার করে নিয়েছেন। বাকি টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে ডিম পাড়ছে। পাকা হিসেবির মতো কিছু টাকা হাতে রেখে দিয়েছিলেন ফাউ খরচখরচা মেটানোর জন্যে। ছেলে এবং ছেলের বউ নিজেদের নিয়ে ব্যস-। দুজনই চাকরিজীবী। আলাদা কাজের বুয়া রাখা আছে। আরো আছে বুড়ো সোনামিয়া। কুটির মা পুত্রবধূ সোনিয়ার বাপের বাড়ি থেকে আমদানি করা খাস বাঁদি। তবে অবরে-সবরে রাতমুতে বিছানা ভাসালে সে এসে নিঃশব্দে চাদর পালটে দেয়। সোনামিয়া লুকিয়ে ছানা-সন্দেশ এনে খাওয়ায়। তার মালকিন সোনিয়া গাইনি স্পেশালিস্ট। তার নিষেধ আছে সুগারের ব্যাপারে। বুড়ো বয়েসে কোলেস্টেরলের ভয়। টেলিভিশনে খবর দেখে বাড়ির কাছের রেস-রাঁয় রং চা খেয়ে পার্কে পা মেপে মেপে পায়চারি করে দিন গুজরান করে দেন আলী আহমদ। তার এক এক্স কলিগ শরদিন্দু বসু, বয়েসে সামান্য ছোট তাঁর থেকে, পার্কের বেঞ্চে বসে পা দোলাতে দোলাতে মুচকি হেসে বলে, তোফা আছেন স্যার!
ঊনআশি পুরে এলো। আশি দোরগোড়ায় আসি আসি করছে। ঠিকঠাকই চলছে সব কিছু। কোথাও কোনো চাহিদা বকেয়া রয়ে গেছে বলে মনে হয় না। বিপত্নীক মানুষ। একটিই ছেলে রফি আহমদ। শাঁসালো চাকরি করে। মাইনের চেয়ে উপরি বেশি। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর কোনো কোনোদিন ভাতঘুমও দিয়ে দিতে পারেন আলী আহমদ।
অথচ
অথচ এই ইট-সিমেন্ট আঁটা কংক্রিটের কামরা তাঁকে জাপটেসাপটে পিষে ধরার উপক্রম করে। লোহার রড ভারী তালা দাঁতাল মাঢ়ি লকলকে জিভ আরক্ত চোখ; চার দেয়ালে আটকানো সাদা বাতাসে এসব ভয়াবহ কুহক অহরহ শাসায়। বুড়ো বয়েসের অবচেতন মরীচিকা-টরীচিকা হলে বুঝ দেওয়া যেত মনকে। কিন’ এ যে চাক্ষুষ মূর্তিমান সব কিম্ভূত! দিনেদুপুরে চেপে বসে।
আজগুবি সব হেঁয়ালির ভেতর দিয়ে আলী আহমদের দিন কাটে রাত কাটে। শেষরাতে বাসিঘুম দিয়ে দেরিতে উঠে নাস্তার প্লেট নিয়ে খাটে পা মুড়ে বসেন। নাহ্! গলা দিয়ে সরে না। সেই একই রুটি একই সবজি। দুই টুকরো খেয়ে ঠেলে সরিয়ে রাখেন প্লেট। জিভ পাকলিয়ে ব্যাজার স্বাদটাকে হলকমের নিচে চালান করে দিতে চান। লোল-চামড়াসাঁটা হাত গিঁটজাগা আঙুল বিবর্ণ বিতিকিচ্ছিরি; – দেখতে দেখতে ভাঁজ পড়ে ভুরুতে। একটা কুৎসিত মাছির কাণ্ড দেখেন নজর ধরে। গুঁড়ি মেরে মেরে এগোচ্ছে প্লেটের রুটির দিকে। ওর ঠান্ডা অধ্যবসায় প্ররোচিত করে আলী আহমদকে। আবার নাস্তার প্লেট টেনে নেন কাছে।
বাথরুম থেকে ঘুরে এসে দেখেন সোনামিয়া খালি প্লেট-পেয়ালা নিয়ে গেছে। চেয়ারে বসতে বসতে একটা ইঙ্গিতপূর্ণ কাশি দিলেন আলী আহমদ। পিঠ পিঠ খুক করে পালটা কাশি দিয়ে সোনামিয়া ঢুকল। হাতে পিরিচঢাকা চায়ের কাপ। মানুষটা বয়েসের চেয়ে বুড়িয়ে গেছে। হাঁটাচলা দেখলে মনে হবে সত্তরের কোঠা ছুঁয়েছে। হাত কাঁপে। গলা কাঁপে। মাটিমুখো মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁটে।
টেবিলে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে কথা বলে, লন্ড্রিথ্ন কাপুড় আনতে হইবো আজ। ট্যাকা দেন আব্বা।
কেবলই একটা চুমুক দিয়েছেন আলী আহমদ। অমনি টাকার তাড়া। ঠোঁট কুঁচকে বিরক্ত গলায় বলেন, সাতসকালে টাকার তাড়না! এঃ! এখন কী? যখন যাবি তখন চেয়ে নিবি।
আব্বা! রাতে ঘুম হয়েছিল তো? যা গরম! দরজা ঠেলে রফি আহমদ ঘরে ঢোকে। হাতে আজকের নিউজপেপার। এক নিঃশ্বাসে সব গোছানো কথা বলে যেতে থাকে, নিন কাগজ পড়-ন। সোনাচাচা! আব্বার কী লাগেটাগে দেইখেন। আসি আব্বা। অফিসের গাড়ি এসে গেছে।
বলতে বলতে বেরিয়ে যায় রফি আহমদ। সোনামিয়াও চলে গেছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে কাগজে চোখ বুলোন। শেষ পৃষ্ঠায় একটা খবরের হেডলাইন দেখে নিজের অজান্তেই চমকে ওঠেন তিনি। সামনেই ১২ই জুন। কল্পনা চাকমার অপহরণ দিবস। বেশ কয়েক বছর আগে হিল উইমেনস ফেডারেশনের এই সংগ্রামী ছাত্রীনেত্রীকে তার মারিশার গ্রামের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জওয়ানরা। আজ অব্দি তার কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। কলেজে কিছু পাহাড়ি ছাত্র ছিল তাঁর। ওদের মুখে ঘটনাটি জানতে পান তিনি। শুনে প্রথম দিকে কিছুটা উত্তেজিত হয়েছিলেন বটে। তারপর যথারীতি মিইয়ে আসে তাপ। সমতলের বাঙালি কোনোদিন একাত্ম হয়ে উঠতে পারেনি পাহাড়ি আদিবাসীদের অস্তিত্ব সমস্যার সঙ্গে।
আসলে উত্তেজনার ্লায়ুকেন্দ্রগুলো জুড়িয়ে আসছে তাঁর। জ্যৈষ্ঠের দুপুরে ফ্যানের বাতাসেও দমচাপা তাত। অথচ হাতে-পায়ের রগে রগে অসাড় শৈত্য। আলী আহমদ নিজের ফ্যাকাশে পায়ের পাতায় চোখ ধরে রাখেন। কেমন যেন মরা মরা ছাপচিত্র। কাঁচা-পাকা ধূসর লোম। ফাঙ্গাস-ছত্রাক এইসব গজিয়েছে যেন কবে থেকে! সে আসছে মৃদু পায়ে অমোঘ। এ সবই তার আগমনীবার্তা। টের পান তিনি। ছোট আয়নাটা টেনে নিয়ে মুখ দেখেন। কাঁচা-পাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। খরখরে ছোঁয়া নেন হাত বুলিয়ে। এককালের তুমুল জনপ্রিয় অধ্যাপক। অন্য ক্লাসের ছাত্ররা এসে ভিড় জমাত তাঁর ক্লাসে। ডিপার্টমেন্টের কলিগরা বাঁকা চোখে তাকাত। হুল ফোটাত কথার ফাঁকে। বেপরোয়া তিনি ছাত্রদের নিয়ে জলসা করতেন, নাটক করতেন, কবিতাপাঠের অনুষ্ঠান করতেন। নিজের কবিতার বই বের করেছিলেন। শেলফের তাকে এখনো দু-চারটে কপি উচ্ছিষ্ট রয়ে গেছে তার। পোকায় কাটা। মলাটের রং জ্বলে যাওয়া।
কী যে ছন্দছুট হয়ে গেল জীবনটা। লুৎফা মারা গেল মাত্র ছাব্বিশ ঘণ্টার স্ট্রং ডায়রিয়ায়। স্যালাইনে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে শরীর। তবু বাঁচতে পারেনি। তার মতো বইপোকা একটি মানুষের পক্ষে তাঁর চেয়ে কম করে হলেও দশ বছরের ছোট জড়পুতুলটিকে নিয়ে কালক্ষেপণ করার কথা নয়। কিন্তু কোলে বড়খোকা আসার পর অল্পশিক্ষিত বধূটি তাঁকে একেবারে ননিমাখনের মতো জৈবিক মায়ায় বেঁধে ফেলে। আলী আহমদ তর্জনী তুলে বলেছিলেন, এ-যুগে একাধিক সন্তান মানায় না। সুবোধ বউটি তাতেই ঘাড় নেড়ে সায় দিয়েছিল। অথচ খেলাঘর পুরো বেঁধে তোলার আগেই শিকলি কেটে পাখি উড়ে গেল। কী অসীম নিরাসক্তি এখন এ ভবসংসারে! বড়খোকা রফি তাঁকে মানে, সোনিয়া সহ্য করে। তাদের জগৎ আলাদা। সেখানে সমারোহ সমাগম সবই আছে কানায় কানায়, কেবল তিনি নেই। কুটির মা সোনিয়ার লোক। ভাবলেশহীন মুখে কর্তব্যকর্মটুকু করে যায়। মালকিনের হুকুমবরদার। শুধুমাত্র সোনামিয়া, হ্যাঁ, বুড়ো সোনামিয়া অপত্য আবেগে তাঁকে বুকে আগলায়। প্রভুভৃত্যের ব্যবধান বজায় রেখেই। শেষ বয়েসের যষ্টি পুরাতন ভৃত্য। আলী আহমদ তাকে বকাঝকাও করতে পারেন নিরাপদ দাবিতে।
এই বয়াহীন ভাসমান নৌকোটির সামনে ধূসর আকাশ, পেছনে মুছে যাওয়া ধূসর তীর। তার একটা ছেলেবেলা ছিল। সোনামোড়া গোলাপতোড়া। একটি মধুনাদিনী নদী। সবুজ কান্তার। আদিগন্ত আকাশ। সব ছবি মুছে সাদা হয়ে গেছে। রিটায়ার করার পর একবারটি ফেলে আসা গ্রামে গিয়েছিলেন একলা একা। বাল্যসাথিরা অধিকাংশ মৃত। জীবিতরা কেউ ধুঁকছে বিছানায়। কেউ মসজিদে সেজদা ঠুকতে গিয়ে ঝিমোয়। কেউ খাবি খাচ্ছে এনজিওর ঋণে। সাদা দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল ভেদ করে তাদের মুখের সেই কচি সরল আদল উদ্ধার করা দুঃসাধ্য। সেই সব মেঠোপথ ফাঁকা মাঠ ঘন গাছপালার বাগান ভরাট হয়ে গেছে টুকরো টুকরো ছেঁড়া ছেঁড়া ঘরবাড়ির বেড়াগড়ায়। তাঁর হালবাসিন্দারা কৌতূহলী চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে বৃদ্ধ আলী আহমদকে। প্রশ্ন করে না। সম্ভাষণ জানায় না। সেই যাওয়াই শেষ যাওয়া। পিছন ফিরে তাকাতে আর স্পৃহা বোধ করেন না। যে ক্ষতচিহ্ন দেখলে আগে বুকের মধ্যে সুস্পষ্ট খামচানি টের পেয়ে কষ্ট পেতেন, এখন তা নখদন-হীন হয়ে মিলিয়ে গেছে। যে কন্যাটি তাঁর যুবক বয়সে বিচ্ছেদের নিশ্চিত দশা বুঝতে পেরে শিশিভর্তি ডেটল গিলেছিল তাঁরই সামনে, তাঁকে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করিয়ে বাঁচিয়েছিলেন তিনি। বিনিময়ে তাঁর হাতের চামড়ামাংস কামড়িয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিলেন বঞ্চিত মেয়েটি। সেই স্মৃতিচিহ্ন তিনি আজীবন বহন করে নিয়ে এসেছেন বিশ্বস্থ বাহকের মতো। সব দাগই মিলিয়ে যায় কালের লেপনে। ডান হাতখানি চোখের ওপর মেলে ধরে শনাক্ত করতে চেয়েছেন জখম। মালুম হয় না আর। প্রবৃত্তিহীন মানুষটি বিকারশূন্য ঘাড়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন সময়ের পাকের কাছে।
সকালে নাস্তা খেয়ে চলে গিয়েছিলেন পরিমলের সেলুনে। ফাঁকা ছিল সে সময়। আলী আহমদকে পেলে মুখ খুলে যায় নরসুন্দরটির। ব্রাশ দিয়ে তাঁর দাড়িতে সাবান ঘষে আর মুখে কপচাতে থাকে ভূয়োদর্শনের বুলি : কী রকম চলছে দেখছেন আংকল? সন্ত্রাস, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নদীদখল, ভূমিদখল – বাজার গরম একেবারে! আলী আহমদ চমকে উঠে প্রশ্ন করেন, তাই নাকি? তা তুমি এতো সব কেতাবি বাংলা জানলে কী করে? পরিমল সাধু গলায় বলে, স্যার, আপনি হলেন বিদ্যের জাহাজ। আমি সামান্য পরামানিক মানুষ! আপনাদের মতো শিক্ষিত কাস্টমাররা পদধূলি দেন। আমি তেনাদের বচন শুনি আর – । আলী আহমদ তাকে কথা শেষ করতে দেন না। থামিয়ে দিয়ে বলেন, জিভ সামলে রাখো বুঝলে? রিমান্ডের নাম শুনেছ? পরিমল বাঁ-হাতে নাক-কান মলে দাঁত ঝুলিয়ে বলে, অপরাধ হয়ে গেছে আংকল। মাপ করে দিন।
জুন মাসের গরমে ঘাড়-গলা বেয়ে ঘামের ধারা নামে। দ্রুত পায়ে ঘরে ফিরে আসেন আলী আহমদ। জামা খুলে খালি গায়ে ফ্যানের নিচেয় বসেন। গাল মেলে হাঁপরের মতো শ্বাস টানতে থাকেন। সোনিয়ার গান ভেসে আসছে ও-ঘর থেকে। চাকরিতে যায়নি আজ। রিল্যাক্স করছে ঘরে বসে। হাতের উলটো পিঠে নজর পড়তে ভুরুতে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। নখ বড় হয়ে গেছে। কাটা হয়নি কতোদিন! খেয়াল থাকে না ইদানীং। পরিমলকে বললে যত্ন করে কেটে দিত। সোনামিয়াকে হাঁক পেড়ে ডাক দেন। কাছে এলে বলেন, যা তো বউমার কাছ থেকে একটা পুরনো ব্লেড চেয়ে নিয়ে আয় দিকি। সোনামিয়া ‘জি’ বলে মাথা নেড়ে চলে যায়। একটু পরেই সোনিয়ার চিলচিৎকার এসে ফেটে পড়ে আলী আহমদের কানের পর্দার ওপর : একটা ব্লেড কেনার মুরোদ নেই! পেনশনের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা জমাচ্ছে ব্যাংকে। খাচ্ছে পড়ে পড়ে। একটা পয়সা গলে না হাত থেকে। কবরে নিয়ে যাবে যক্ষের ধন। হায় আল্লা! আলী আহমদ দুহাত দিয়ে কান চাপা দেন। মাথার মধ্যে ঝাঁ-ঝাঁ করছে টের পান। বালিশে মাথা রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েন। প্লাস্টারচটা দেয়ালের ঘা-পাঁচড়া দেখেন শুয়ে শুয়ে। একটু পরে কুটির মা ঘরে ঢোকে। বিছানার ওপর একটা ব্লেড ছুড়ে দিয়ে চলে যায়। রোবটের মতো। ঠোঁটে কুলুপ আঁটা।
আলী আহমদ শূন্য চোখে তাকিয়ে আছেন সামনের দিকে। সেখানে তাঁর অতীতের উজ্জ্বল দিনগুলো ম্লান হেসে সান্তনা দিচ্ছে। শেলফে উপহার পাওয়া বই। দেয়ালে বাঁধানো মানপত্র, গ্রুপছবি। সংসারের প্রাক্তন তৈজসের মতো সব কিছুতে ছাতা পড়ে গেছে। দেখে না কেউ। কলেজের শেষ বিদায়ের দিনটিতে ছাত্র-শিক্ষকরা মিলে জাঁকালো ফেয়ারওয়েল দিয়েছিল। প্রিন্সিপাল তাঁর শিক্ষকতা জীবনের প্রথম যুগের ছাত্র। পদমর্যাদার গুমরে তাঁকে পুছত না তেমন। সেদিন নিজ হাতে গলায় মালা পরিয়ে সালাম করেছিল পায়ে হাত দিয়ে। পুরো ছবিটি মনে আছে এখনো।
বিকেল হয়ে পারেনি বটে। গায়ে জামা গলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাইরে। শাহবাগের মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন ট্রাফিক ক্লিয়ারেন্সের অপেক্ষায়। ফ্লাইওভারে উঠতে পারেন না। ফুসফুসে অক্সিজেনভাণ্ডে ঘাটতি পড়ে। বারডেমের সমুখ থেকে ঢাকা ক্লাব পেরিয়ে পার্কের গেটে পৌঁছতে বিশ-পঁচিশ মিনিট লেগে যায়। ঠুকঠুক করে রয়ে-রয়ে হাঁটতে হয়। ভেবেছিলেন শরদিন্দুর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। না, আসেনি সে। অগত্যা একাই বসে থাকেন ফাঁকা বেঞ্চে। কফিঅলা ছেলেটি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অর্ডার না পেয়ে চলে গেছে। মনের মধ্যে কোথাও যেন তার ছিঁড়ে গেছে। গুছিয়ে ভাবতে পারছেন না কোনো কিছু। অবসর নেওয়ার প্রথম দিককার কথা। পেনশনের একটা মোটা অঙ্কের চেক রফি আহমদের হাতে ধরিয়ে দিতে গিয়েছিলেন। রফি ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিল, এখন রেখে দিন ওটা। লাগলে বলব। বরং নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিন। অসুখ-বিসুখে কাজে লাগবে। পরের মাসে বাজার খরচ বাবদ কিছু দিতে চেয়েছিলেন। রফির সেই এক কথা, এখন তো লাগছে না। আমার ও আপনার বউমার ইনকামই খরচ করে ফুরোতে পারি না। পরে চেয়ে নেব যখন দরকার পড়বে। হঠাৎ পেছনের গাছতলার দিকে নজর চলে যাওয়ায় সাপ দেখার মতো চমকে ওঠেন আলী আহমদ। একটা ডাঁসাবয়েসি মেয়েছেলেকে জাপটে ধরে চুমু খাচ্ছে এক চ্যাংড়া তরুণ। মেয়েটি ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে দেখছে তাঁকে। সঙ্গীটির পিঠে খোঁচা দিয়ে তাঁর দিকে চোখের ইঙ্গিত করল সে। ছেলেটি দেখতে পেয়ে ঠোঁট আলগা করল। তাঁর চোখে চোখ রেখে ঠোঁট ভেটকিয়ে বলল, কী নানু! লাগবে নাকি? ছোবল খেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি। এটাই এখন ঢাকার ফাস্ট লাইফ।
ঠুকঠুক করে হেঁটে আসতে আসতে সন্ধে উতোর করে দেন আলী আহমদ। মনে ভার। দুপায়েও সেই ভার গোদের মতো চেপে বসা। বাড়ির সামনে এসে খাম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে বাড়িটাকে লাগছে একটা অদ্ভুতুড়ে জেলখানা। এখুনি একটা কালো সেলের মধ্যে সেঁধিয়ে পড়তে হবে। বাংলায় কী বলে? বিবর? সমরেশ বসুর বইয়ের নাম। একটা নেউল বটে। তিনি। নেউল মানে কী? নেউল মানে বেজি। মেটেরঙা বেজি। ভাবতে ভাবতে গেট পেরুতে গিয়ে একটা আবছা মানুষের শরীরে গোত্তা খান তিনি। মাজা বেঁকিয়ে কাঁচুমাচু দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে ঠাহর করতে পারেন। কুটির মায়ের স্বামী। হেরোইন খাওয়ার জন্যে বউয়ের কাছে টাকা চাইতে এসেছে ঠিক। বারান্দায় পা দিতে কানে সোনিয়ার গান, নাকে উগ্র প্রসাধনের ঝাঁঝ। ক্লাবে বেরুবে। তার প্রস’তি চলছে।
শুক্রবারের সকাল সাড়ে এগারোটা। পাশের ঘরে গজদ্দম চলছে স্বামী-স্ত্রীতে। মাঝেমধ্যে উত্তরা-বনানী ইত্যাকার শব্দ ছিটকে আসছে। সহসা গাড়ির শব্দ দুয়ারে। পুলিশ। জুতোয় মস্মস্ আওয়াজ তুলে একজন অল্পবয়েসি পুলিশ অফিসার উঠে আসে বারান্দায়। কলিংবেল টিপতে দরোজা খুলে দিয়ে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানায় স্বামী-স্ত্রীতে। যেন অপেক্ষায় ছিল তারা। তাকে ঘরের ভিতর আহ্বান জানিয়ে দরোজা এঁটে দেয়। খানিক পর প্রচুর হাসি-তামাশা-নখরামোর শব্দ। এ-ঘর থেকে আঁচ করতে পারে আলী আহমদ, ও-ঘরে গুলজার জমে উঠেছে। একসময় থেমে যায় গজল্লা। মনে হয় গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর চলছে তিনটিতে মিলে। দরোজা খুলে বেরিয়ে যায় রফি আহমদ। ভিতর থেকে ছিটকিনি আঁটার শব্দ। আবার হাসি-তামাশা-নখরামো। এবারে আরো উদ্দাম তোড়ে। ওই! রবীন্দ্রসংগীত গাইছে সোনিয়া : এ কী আনন্দ রে…। মিষ্টি গলা বউমার। চুপচাপ সুমসাম সব। পিনপতন নীরবতা। টানা আধঘণ্টা ধরে। রফি আহমদ ফিরে এসে কলিংবেল টেপে। হাতে খাবারের প্যাকেট। সুবাস ছড়াচ্ছে। আলী আহমদের বুকে পাথর চেপে বসেছিল। নেমে যায়। ফ্যানের রেগুলেটরে ফুল স্পিড চড়িয়ে দেন। বেলা উজিয়ে দিয়ে বিদায় নেয় সরকারি অফিসার। লাঞ্চে আপ্যায়িত হয়েছে নিশ্চয়। নিজের ঘর থেকে হাসিমুখে সামনে এগিয়ে আসেন আলী আহমদ। হাজার হলেও বাড়ির কর্তা তিনি। তাঁর দিক দিয়ে একটা সৌজন্যের ব্যাপার আছে বইকি! কিন্তু সোনিয়া হাত উঁচিয়ে হাঁ-হাঁ করে ওঠে। রফি আহমদ তাঁর হাত ধরে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। তিনি ভোম হয়ে বসে থাকেন খাটের ওপর।
পরপর দুদিন ফিরিয়ে দিলেন নাস্তার প্লেট। চায়ের পর চা গিলে কাটিয়ে দিলেন বেলা। রুচিই মরে যাচ্ছে দিনকে দিন। সোনামিয়া হা-হুতোশ করে। ভিনপাড়ায় তাঁর এক ছাত্র ডাক্তারের ডিসপেনসারি। সেখানে যাবার জন্যে পীড়াপীড়ি করে। আলী আহমদ শুধু ঢক্ঢক্ করে পানির গ্লাস খালি করেন। লোডশেডিংয়ে চুপচাপ বসে থাকেন। কী যেন ভাবেন। ভেবে কূল-কিনারা করতে পারেন না। কী যেন হারিয়ে গেছে তাঁর। সারাজীবন ধরে হাতড়ে বেড়ান। সুলুকসন্ধান মেলে না। সাদা ছায়া নাচে চোখের ওপর।
কদিন পরে এক সন্ধেবেলা হইহই করতে করতে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ঢুকে পড়ল তাঁর ঘরে। দুজনের হাতে দুটো আনকোরা প্যাকেট। আরো ঝুলছে মিষ্টির প্যাকেট। মিষ্টি নয়, কেক। প্যাকেট খুলে নতুন পাঞ্জাবি বের করতে করতে কলকলিয়ে কথা বলে চলে সোনিয়া। কী আব্বা! আজ ১২ই জুন। আপনার জন্মদিন। কী! মনে নেই তো? নিজের হাতে তাঁর গায়ে নতুন পাঞ্জাবি পরিয়ে দিতে দিতে বলল, আশিতে পড়লেন কিন্তু। নামাজটা ধরুন এবারে। তাঁর মুখে কেকের পিস তুলে দিতে দিতে দুজনে হাততালি দিয়ে কোরাস ধরে : হ্যাপি বার্থডে টু ইউ! কুটির মা সোনামিয়া দুটিতে ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে পিটপিট করে তাকিয়ে দেখে। মিটমিট করে হাসে। রাত দেড় প্রহর অব্দি নতুন পাঞ্জাবি পরে সঙ সেজে বসে থাকেন আলী আহমদ। সোনিয়ার মুখে জন্মের পর মধু দিতে ভুলে গিয়েছিল ওর মা-খালারা। ঠেস দিয়ে ছাড়া কথা বলতে পারে না। হ্যাঁ গো সোহাগী! এই ধন ধন না মণি। একদিন তোমারও দাঁত পড়বে, চুলে পাক ধরবে। টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল চলছে। আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়ার ম্যাচ। ম্যারাডোনা পর্দায় হাত ছুড়ছে বৃথাই। তিনি দেখেও দেখেন না।
সংসারের ঘুরপাকে চাকা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। ভালো ও মন্দ একটার পর আরেকটা তলউপর করে। কখনোবা একইসঙ্গে ঘটে যেতে থাকে ব্যাপারগুলো।
মাসকয়েক পরেকার কথা। সোনিয়াকে তড়িঘড়ি করে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হলো। রাত থেকে প্রচুর ব্লিডিং। সকালে দরোজায় অ্যাম্বুলেন্স। সোনিয়ার মা এসে গেছেন জামাইয়ের জরুরি মোবাইল পেয়ে। অ্যাম্বুলেন্সে উঠে মেয়ের মাথা কোলে নিয়ে বসলেন। কুটির মা পায়ের কাছে। রফি আহমদ ড্রাইভারের পাশে।
রাত দেড়টার দিকে রফির মোবাইল এলো, মিসক্যারেজ হয়ে গেছে। কান্নাকাটি করছে সোনিয়া। সোনামিয়াকে রেঁধে দিতে বলা আছে। ওরিড হওয়ার কিছু নেই।
রাতে টেনশনে ঠিকমতো ঘুমুতে পারেননি। দুটো রুটি ও এক কাপ চা গিলে আলী আহমদ সকাল সকাল চলে এলেন ক্লিনিকে। সেখানে কেবিনে ঢুকে অনেকটা আশ্বস- মনে করতে পারেন নিজেকে। সোনিয়া জেগে আছে। খুব ক্ষীণ গলায় কথা বলছে মায়ের সঙ্গে। রক্তশূন্যতার জন্য সাদা দেখাচ্ছে চোখমুখ। তিনি মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ওর কপালে হাত রেখে কুশল প্রশ্ন করেন, এখন কেমন আছ বউমা? কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে সোনিয়া। তারপর আস্তে করে বলে, ভালো। বসুন আব্বা। আলী আহমদ বেয়ানের পাশের চেয়ার ফাঁকা দেখে সেটিতে বসতে বসতে বলেন, স্লামালেকুম বেয়ান সাহেব! ভালো আছেন? মহিলা হুঁটুকু বলে চুপ করে বসে থাকেন। তারপর হঠাৎ বলে ওঠেন, গায়ের ধার থেকে সরে বসেন। যা গরম! সোনিয়ার হাতের শিরায় স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। আলী আহমদ সেদিকে তাকিয়ে ফোঁটা পড়া দেখছিলেন। আচমকা থতমত খেয়ে চেয়ার নিয়ে দরোজার দিকে উঠে যান। মা-মেয়ে কারো মুখে কোনো কথা নেই। অনেকক্ষণ বোকার মতো বসে থাকেন সেখানে। বড় একা লাগে নিজেকে। শেষে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসেন কেবিন থেকে।
ঋতু পরিবর্তনের আবর্তনচক্রে বর্ষাকাল এসে পড়ে। বর্ষা গিয়ে শরৎ আসে। শরতের পর হেমন্তও এসে পড়ে। নভেম্বরের রাতে হিম ঝরে বাতাসে। আলী আহমদ বরাবর শীতে কাবু। বারান্দায় বসে ছিলেন চেয়ার পেতে। অন্ধকারে। অনেকক্ষণ বসে আছেন। এবারে ঘরে যাবেন উঠে। হঠাৎ ওদের ঘর থেকে সোনিয়ার বাজখাঁই গলার স্বর ধেয়ে আসে। তার পরপর রফির কুনকুন কণ্ঠ।
তোমাকে সাফ সাফ বলে দিচ্ছি আমি। এবারে আর কোনো রিস্কের মধ্যে নেই আমি। আগেই বলেছি, এ-বাড়িটায় কুফা লেগে গেছে। খামোকা আমার প্রথম সন্তানটা নষ্ট হয়ে গেল। দিস টাইম আই মাস্ট বি কশাস। দ্যাটস্ অল।
এখানে নয় তো কোথায় যাবে তুমি বলো? এটা নিজের বাড়ি -
আরে রাখো তোমার নিজের বাড়ি! আম্মা কী বলে গেলেন শুনলে না? উত্তরার ফ্ল্যাটটা আব্বা আমার নামে দিয়ে দিচ্ছেন।
হুঁ! এ-বাড়িটা তাহলে কী হবে?
কেন? ডেভেলপারকে দিয়ে দেবো।
তা আব্বা? আব্বা কোথায় যাবেন তবে?
সারাজীবন ওই পুতুপুতু করেই গ্যালো তোমার! আরে মিয়া! মডার্ন এজে সে-ব্যবস্থাও হয়ে গ্যাছে এ-দেশে। কেন? গাজীপুরে বৃদ্ধাশ্রমে মানে ওল্ড হোমে চলে যাবেন। ওখানে ওঁর বয়েসি সঙ্গীসাথিও মিলে যাবে। আচ্ছা, আশি বছর তো হয়ে গেছে। এরপর আর বাঁচার কোনো মানে হয়? ওভারভিউ হয়ে গেছে।
সোনিয়ার গলার স্বর চড়ছে। আর শুনতে চান না আলী আহমদ। তাড়াতাড়ি উঠে পড়েন চেয়ার ছেড়ে। পিছনে পায়ের শব্দ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন সোনামিয়া।
কী রে? ঘুমোসনি এখনো?
চাচা, ঠান্ডা লাগতাছে আপনের। ঘরে লন।
হ্যাঁ যাই। তুইও আয়। তোর সঙ্গে কথা আছে।
দুজনে ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
খাটে এসে একেবারে এলিয়ে পড়েন আলী আহমদ। একটু বেলুন ফুটো হয়ে যাচ্ছে টের পান। উলটে ধাতব সাঁড়াশি টিপে ধরেছে টুঁটি। ভারটা নামিয়ে দেওয়ার জন্যে সোনামিয়ার কাছ থেকে এক গ্লাস পানি চেয়ে খান। কারেন্ট এসে গেছে। তবু ঘাম নামছে দরদর করে। উঠে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দেন।
সোনামিয়া একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। মায়া হয় এই নাছোড়বান্দাটির জন্যে। আদর করে বলেন, হ্যাঁ রে সোনা! তোর দেশবাড়ি নেই? সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে এখানে পড়ে আছিস!
হাত কচলাতে কচলাতে বলে সোনামিয়া, চাচাজান! পইড়া আছি খালি আপনার মায়ায়।
বউ ছেলেমেয়ে?
কেউ না চাচা। তামাম মরে নিকেশ। ছোটভাইডা আছে। জমিজমা হেই-ই তত্ত্বতালাশি করে।
দেশে যেতে মন টানে না?
আপনেরে কার ঠেঁই ফালায়ে থুয়ে যাই কন? আম্মায় নাইকা। আমি ছাড়া কেডা তোন্দরতালাপি করে কন?
তোদের গ্রামে গাছপালা আছে কেমন? নদী আছে?
সব আছে চাচা। আমার নিজিরই তো সুপারিবাগান বিরাট। আম-জাম-লিচু-কাডাল কী নেই কন। খাল একটা আছে চোখ ভুলানো। মাথার পরে আকাশ একখান এই ছাদের চাইয়ে চটান।
ইহ্! যাবি নিয়ে তোর গাঁয়ের বাড়ি?
যাইবেন আমার লগে? হাচা?
যেতে পারি। কী খাওয়াবি আগে বল?
বলক তোলা দুধ খাওয়াইবো গাইগোরুর। তার সাতে পুরু মোটা সর। চলেন কালই রওনা দিই। সদরঘাটথন লঞ্চ উঠলি গাঙের বাতাসে ঘুম জড়ায়ে আসবে নয়নে। কিন্তুক খোকামিয়া যদি বাদী -
সে আমি বুঝবোখন। তুই ঘুমোতে যা এখন। রাত অনেক হয়ে গেছে।
চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে এসে শুয়ে পড়েন আলী আহমদ। কিন’ ঘুম নেই চোখে। ভোল্টেজ বেড়ে গিয়ে ফ্যান ঘুরছে ঝড়ের বেগে। দুপায়ের ফাঁকে কোলবালিশ। ছেলেবেলার অভ্যেস। ছাড়তে পারেননি। ঘুম নেই। দুচোখ পূর্ণ মেলা। বাঁ-কপালে রগ লাফাচ্ছে।
তবু ঝড়ো বাতাসের মাতনেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েন শেষরাতে। একেবারে তলিয়ে যান ঘোরের মধ্যে। তারপর হঠাৎ কেঁপে উঠে ঘুম ভেঙে জেগে যান। দারুণ এক গা হিমকরা দুঃস্বপ্ন হানা দিয়েছে তাঁকে। অবিশ্বাস্য অথচ টাটকা জ্যান্ত।
মিশকালো বিশাল বিকট এক জাম্বুবান অন্ধকার তাড়া করে এনে খাদের কিনারে পৌঁছে দিয়েছে তাঁকে। উঁচু পাথুরে শিখর। শুধু ধারালো পাথরের ফলা পায়ের তলায়। চামড়া কেটে রক্ত বেরোয় ফিনকি দিয়ে। গোড়ালি পিছলিয়ে স্রেফ আঙুলের ডগা পুঁতে অন্তিম ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন। নিচেয় অতল কালো খাদ। কালিগোলা ভয়াল আঁধার। পড়ে যেতে গিয়েও ধাঁধালো চুম্বকের কামড়ে আটকে আছেন।
মেঘে নেমে গেছেন আলী আহমদ। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। পাথর যেন তাঁর শ্বাসনালিতেই চওড়া হয়ে বেঁধে গেছে। অঙ্গুষ্ঠ-তর্জনী দিয়ে গলার নলি ওপর-নিচে মালিশ করতে থাকেন। বুঝতে পারেন, এ তাঁর আখেরি বিদায়ের আলামত। চাটিবাটি ফেলে রেখে জীবনের পাট সেরে নেমে যেতে হবে এইবেলা। চোরপায়ে। আপ্সে। আশি বছর… ওভারভিউ… বৃদ্ধাশ্রম… হাহ্! নদীর বাতাস… সুপুরিবাগান… নিরিবিলি খাল… ছাদের মতো আকাশ…. গাইদোয়া দুধ – দুধের পুরু সর… হাহ্!
সবকিছু পড়ে রইল। টেবিলের ড্রয়ারে ব্যাংকের চেকবই, শেলফে ফেয়ারওয়েলের উপহারসামগ্রী, দেয়ালে মানপত্র-গ্রুপছবি।
তবু কী যে দারুণ দুর্মর মায়া-পলকা মানুষের! যেতে যেতে সমূহ খাদের মুখে দাঁড়িয়েও একবারটি ফেলে আসা বাঁকের মাথায় বিলীয়মান সবুজ লতাবিতানের দিকে চোখ মেলে চায়। তিনি কি ব্যর্থ? খ্যাতি-প্রীতি-কীর্তি-সম্মান এসব স্তূপীকৃত সম্ভারের সমারোহ সত্ত্বেও কোথাও কি ঊন রয়ে গেছে আশি বছরের প্রাপ্তির ভাণ্ডারে? দীর্ঘ শিক্ষকতাজীবনে কোথাও কোনো দাগ পড়ে পারেনি। সারাটা জীবন সনে-র মতো কাটিয়ে দিয়েছেন। বিড়ি-সিগ্রেট ছোঁননি। অসূয়ার পরবশ হয়ে কারো কোনো ক্ষতি করেননি বা কুচ্ছো গাননি। ছাত্রছাত্রীদের সন্তানের অধিক ভালোবেসেছেন। তারাও প্রাণমন ঢেলে ভক্তি-ভালোবাসা দিয়েছেন। ঘণ্টা পড়ে গেলেও তাঁর ক্লাস ছেড়ে যেতে চায়নি। তাঁর হাঁটা, উচ্চারণ, হাতের লেখা নকল করত। অমল-মোজাফ্ফর-শুভ্রাংশু-বাদশা তোমরা কে কোথায় আছ? যেখানেই থাকো না কেন, শানি- ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকো! সুখে থাকো!
কাপড় পালটে নিয়ে খুব সাবধানে বারান্দায় চলে আসেন। গুটিগুটি পায়ে গেটের দিকে এগিয়ে যান। একটুও শব্দ না করে খুলে ফেলেন সদর ফটক। রাস্তায় নেমে আসেন। জনপ্রাণীশূন্য ফাঁকা রাস্তায়। লোমশ কালো জাম্বুবান অন্ধকার অশীতিপর শরীরটাকে অক্লেশে গিলে নেয়। বাগে পেয়ে নভেম্বরের হালকা হিমেল বাতাসও পিছু নেয়। শূন্য;… উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম-ঊর্ধ্ব-অধঃ সারা চরাচরজুড়ে অন্ধকার মহাশূন্য।
আমরা হারিয়ে যাইনি
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
কবিতাটি শেষ করার পর আমার মন খুশিখুশি লাগে। একটা ভার সারা শরীর থেকে নেমে গেছে। টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। শাওন মাসে বৃষ্টি নাই। রোদ যেন আখার আগুন, পুড়ে যাচ্ছে পুকুরের পানি, গাছপালা; গাছপালার ডালে বসা তিনটি চিল উড়তে গিয়ে উড়তে চায় না। বসার ভঙ্গিতে অবসাদ। কবিতাটি নিজের মনে পড়ি। একবার দুবার তিনবার।
দুই
লক্ষ্ণৌ ছাড়ার হুকুম এসেছে
কবিরা তো দেশ শাসন করতে পারে না
তাকে পেনশন দিয়ে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দাও
একটা মাটির দুর্গ বানিয়ে দিও
পাথরের দুর্গ দিয়ে ও কী করবে
ও তো যুদ্ধ করতে জানে না।
লক্ষ্ণৌ ছাড়ার হুকুম এসেছে
কবিতা দিয়ে কিছু হয় না
ও সরাব খেতে থাক আর কবিতা লিখতে থাক।
আমি শাহ ওয়াজেদ আলী
সব আমি উড়িয়ে দিয়েছি
ফতুর হয়েছি আমি নিজে
আমার মতো লোকের বাঁচার কোনো অর্থ নেই
কবিরা তো দেশ শাসন করতে জানে না।
আল্লাতাল্লা কবিদের তুমি জন্মাতে দিয়েছ কেন
কবিদের রোদনে আকাশ হয়তো খানখান হয়
তার বেশি কিছু হয় না।
মাটির বুরুজ বানিয়ে
আমি নিজেকে রক্ষা করি দুনিয়াদারি থেকে।
মাটি আমার শেষ আশ্রয়
আমার কবিতার।
আমি কান্নার কথা ভাবি
আর ভাবি
আমার কবিতার।
আমি মাটির বুরুজে দাঁড়িয়ে
দিগন্তের কান্না শুনি, আর শুনি পাখির রোদন।
তিন
আমি মধ্যে মধ্যে লিখি। একলা থাকি তো। যা কিছু লিখি ছাপাই না। মধ্যে মধ্যে শহরে যাই। বই কিনে ফিরে আসি। সব বই পড়ি তা না। যখন ইচ্ছা হয় একটা-দুটা বই এলোমেলো উলটাই। আমার পড়া শেষ। তখন লিখি। গাছপালা নিয়ে লিখি। পাখ-পাখালি নিয়ে লিখি। নিজের গ্রামটা নিয়ে লিখি। পুরানো বসত পুরানো কবর। নতুন বসত নতুন কবর। আমি পিছন দিকে তাকাই। সামনের দিকে তাকাই। সব একরকম মনে হয়। কিংবা সব ভিন্নরকম মনে হয়। আমি বুঝবার চেষ্টা করি। কেন সব একরকম মনে হয়। কেন সব ভিন্নরকম মনে হয়।
আমার দাদার কথা মনে পড়ে। একশ পাঁচ বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি এই এলাকার বাসিন্দা নন। মেঘনা তখন আমাদের গ্রামের কূল দিয়ে বয়ে যেত। দাদা মেঘনার কথা বলতে বলতে দিশাহারা হয়ে যেতেন। বিরাট নদী বিরাট নদী। নদীর এই কূল থেকে ওই কূল দেখা যায় না। ঢেউ ওঠে বিশাল। আমরা নদীকে ডরাই না। আমরা তো হার্মাদের বংশধর। কথাটা এক হিসেবে সত্য। দাদা ছিলেন লম্বা-চওড়া মানুষ। টাটকা লাল রং চোখেমুখে। চলাফেরা করতেন দপদপিয়ে। নাও চলত তার হাতে বাজিকরের মতো।
আমি অবাক চোখে দাদাকে দেখতাম।
দাদাভাই।
কী রে।
দাদিমার কথা কিছু কন।
তোর দাদিমা তো হার্মাদ ঘরের মেয়ে। ফকফকা চেহারা। তখনকার দিনে হার্মাদ ঘরের ছেলেমেয়ের সঙ্গে অন্য ঘরওয়ালার বিয়েশাদির চল ছিল না। এই তল্লাট তখন নদী নদী। কূল- কিনারাহীন নদী। নদী পাড়ি দিতে পারত হার্মাদদের জাহাজের মতো নৌকাগুলি। দুইখান ঝড়ের কথা কই। প্রথম ঝড়খান আমার জন্মের আগে। হার্মাদদের সব নৌকা উড়ে গেল দক্ষিণে। যে কটা নাও বাঁচল সেগুলো নিয়ে হার্মাদরা চলে গেল আরাকান মুল্লুকে। বিয়াশাদিতে ক্বচিৎ কখনো দেখা হয়। গলা ধরে কান্নাকাটি হয়। এই পর্যন্ত। পরের ঝড়খান আমার ষাইট বছর বয়সে দেখা। তিনদিন তুফান, তিনদিন বিষ্টি, ভিটিবাড়ি পানির মধ্যে ভেসে গেল। গরুগুলা রাখার জায়গা নাই। তোর দাদিমার পরামর্শে গরুগুলা ছেড়ে দিলাম। যদি পারে বাঁচুক, যেভাবে পারে বাঁচুক। ঘরের ছনের চালা ভিজে ভেসে গেল বানে। গরুগুলা আমার কাছে আসতে চায়। লাঠির গুঁতা দিয়ে ঠেকিয়ে রাখি। পাশের বাড়ির তমিজউদ্দীনের চালাঘর ভেসে গেল। তমিজউদ্দীনের গলা শুধু শুনলাম, মে ভাই আর বাঁচন নাই। শূন্যে ভেসে যাচ্ছি। মাপ কইরা দিয়েন। ভাবিকে বলবেন, যদি বাঁইচা থাকি দেখা হবে। বারিস কমে না, তুফান কমে না, বান কমে না। তোর দাদির হলো শরীল কাঁপানো জ্বর। এই জ্বর শেষ জ্বর। আমাকে শুধু বলল, যদি পারো আমারে মাটিতে কবর দিও। চারদিন লাশ নিয়ে বসে থাকলাম চালার ওপর। চারদিন পর, আমি ভেলা বাঁধলাম, তার ওপর শোয়ালাম লাশ। আস্তে আস্তে ঢেউয়ের লহর তুলে পুবদিকে পাড়ি দিতে থাকলাম। শুনেছি ওই পাড়ে মাটি আছে। কবরের মাটি আছে। দুদিন বাদে পৌঁছলাম ওখানে, ওই গ্রামের পাড়ে। গ্রামের মানুষজন হাত লাগিয়ে কবর খুঁড়ে দিলো। তোর দাদিমারে ওখানে শোয়ালাম। আমার গলার স্বর মিষ্ট। গ্রামের লোকজন দুকানি জমি আমাকে দিয়েছে। আমি আসে- আসে- জমির দাম শোধ করে দিব। মসজিদে আজান দেওয়া আমার কাজ। আমি মসজিদে আজান দিই। অন্য সময় তোমার দাদিমার কবরের পাশে, অন্য মুর্দাদের কবরের পাশে বসে থাকি। মুর্দাদের সঙ্গে কথা বলি। কারো কোনো দরকার আছে কি-না, কোনো অভাব আছে কি-না, জানি। সেই মোতাবেক কাজ করি। ধরো, কোনো মুর্দা জানাল, শবেবরাতের রাতে ফকির-মিসকিন খাওয়াতে, কোনো মুর্দা জানাল কোরবানি করতে, কোনো মুর্দা জানাল তার কবরের মাথায় সাদা ফুলগাছ লাগাতে : আমি মুর্দাদের আত্মীয়-স্বজনদের বলি। খালি তোর দাদিমা একটা কথা শুধু বলে, আমি খুব খুশি মাটিতে আমাকে শুইয়ে রেখেছ বলে। ভেবে দেখ, কোথাকার হার্মাদ পাড়ার মেয়ে কোথায় শেষ জায়গা পেয়েছে। আমি মারা গেলে তোর দাদিমার পাশে আমাকে শুইয়ে রাখিস। মাঝে মধ্যে সময় পেলে আমার পাশে এসে বসিস। মুর্দারা জ্যান-দের কাছে থাকতে চায়। এ-কথাটা কখনো ভুলবি না। আমার হাত ধরে বল, কখনো ভুলবি না।
চার
আমি কাপড় বদল করি। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে রেডি হই। শাওন মাস। বৃষ্টি নাই, ঠাঠা রোদ। ছাতাটা সঙ্গে নিয়ে বার হই। যদি বৃষ্টি নামে, যদি রোদ অসহ্য লাগে, তখন ছাতাটা কাজে দেবে। রাস্তার দুপাশে সারসার শিশুগাছ। যুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনী গাছগুলো কেটে দিয়েছিল। যে-কয়টা গাছ ইবলিশদের হাত থেকে বেঁচেছে সেগুলো বিক্রি করেছে রাজাকারের দল। বাচ্চাদের মেরে ফেলা, দুধের গাইদের জবাই করা, লকলকা গাছ কেটে ফেলা আমার অসহ্য লাগে। আমি মানতে পারি না। মুঠো করে হাত ছুড়ি আকাশের দিকে। হে পরওয়ারদিগার, হে রহমানুর রহিম, হে ত্রিভুবনের বাদশা, তুমি এসব জালেমি কাজের হিসাব নিও, শাসি- দিও।
উঠানে নামি। সামনে এসে দাঁড়ায় রহিমার মা। রহিমার মা আমার দেখভাল করে। ঘরসংসার দেখে। রান্নাবান্না করে। রহিমা তার একমাত্র মেয়ে। বছর পাঁচেক বয়স। ছটফটে, চঞ্চল। এই তাকে জামগাছের নিচে দেখা যায়, পরক্ষণই পুকুরের ঘাটলায়, তারপর দেখা যায় সমবয়সীদের সঙ্গে, ছেলে হোক কিংবা মেয়ে হোক, তাদের সঙ্গে ইট ছুড়ে ছুড়ে পুকুরে পাল্লা দিচ্ছে। রাত্রিবেলা আমার সঙ্গে খায়। তার মা এই রেওয়াজ বন্ধ করতে পারেনি।
খালুজান।
কী রে?
কই যাইতেছেন?
একটু হাঁটাহাঁটি কইরা আসি।
তা না হয় কইরলেন। খাইয়া যান।
পায়ে খিল ধইরা গেছে। বইসা বইসা।
মাদান চলতাছে।
এই যামু। পলকে যামু। পলকে ফিরা আসুম।
কখন ফিরবেন তার কী ঠিক আছে।
তুই রহিমারে খাওয়াইয়া দিস।
তা দিমুনে। কই যাইতেছেন হেইডা তো কন না।
হাটে যামু। সেইখান থিকা আলুখেত দেইখা ফিরা আসুম।
মাদানে আপনের খাওয়া হইব না।
হইব। হইব। খিদা লাগলে আইসা পড়ুম।
আপনের লাইগা আজ পাবদা মাছ রানধলাম।
আইসা পাবদা মাছ খামু।
রহিমার মা চোখে আঁচল দিয়ে কান্না শুরু করে। নিশ্চুপ দুপুরে রোদ ঝলকাচ্ছে। দুধের গাইটা রহিমার মায়ের কাঁদন শুনে চোখ তুলে তাকায়। গাইটার সঙ্গে রহিমার মার ভাবসাব আছে। রহিমার মা তো গাইটাকে ফেনভাত, খইল খাওয়ায়। পিঠে পোকা হলে পোকা মেরে দেয়। রহিমার চেয়ে গাইটাকে বেশি ভালোবাসে রহিমার মা।
আমি আভাগির বেটি। যুদ্ধে স্বামীটা মইরা গেল। আপনের এইখানে থাকনের জায়গা পাইলাম। আপনের যদি কিছু হয়, শরীলের যা অবস’া, আমি কই যামু। তয় একখান কথা কই। হাঁইটা যাইয়েন না। রিকশা লইয়া যান।
বার হতেই রিকশা পেলাম। বাড়ি পার হলেই সদরে রাস্তা। রিকশায়ালা সিটে বসে আছে।
খালুজান, কই যাইবেন?
হাটে।
উঠেন। উঠেন।
রিকশায় উঠে ছাতা মেলে ধরি। ভালো লাগছে বাতাস আর রোদের মাখামাখি। কমাস পর পাতাঝরার দিন আসবে। রাস-ার পাশের গাছগুলো থেকে, বসতবাড়ির আব্রু দেওয়া গাছগুলো থেকে দমকা হাওয়ার তোড়ে পাতা ঝরে যাবে। পাতাঝরার দিন এলে চারপাশে তন্দ্রা জাগে। হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে দিশাহারা মাঠে। আকাশের শিয়রে যত নীল আছে সব যেন ঘিরে থাকে। গ্রামে তো এখন অজানা মাঠ নেই। বনজঙ্গল নেই। নদী নেই, যেখানে আকাশ ঢেউ তুলে তুলে হয়রান হয়ে যাবে। আমি এসব ভাবছি আর আশেপাশে ওপরে তাকাচ্ছি।
হাট এসে যায়। ধুলো উড়ছে চতুর্দিকে। মাছি ঘুরছে ভনভন করে। সওদার গায়ে কোনো হীরামন পাখি নাই। গরিব মানুষের হাট, গরিব মানুষই ক্রেতা। চোখ তুললে চেনা যায় পায়রার ঝাঁক।
খালুজান।
কী রে।
যামু গা। না থাকুম।
থাক।
এইখান থিকা কই যাইবেন?
আলুক্ষেতির দিকে।
এই হাট বহু বছরের পুরান না। ব্যাপারীদের নাও নাই। খাল এক সময় ছিল। এখন শুকনা, খটখটে। কিছু দোকানপাট খালের মধ্যে আছে। কয়েকটা আধমরা নারকেল আর খেজুর গাছ ধুলায় ধূসর। খালের ধারে বাঁশের মাচান তুলে একটা চায়ের দোকান, পাশে দিলীপ ময়রার জিলিপির দোকান। আমার চায়ের খিদে জাগে। সাবধানে পা ফেলে বাঁশের মাচানে বসি। তিনটা কাক একটা মিষ্টির ঠোঙা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। এই হাটে ঠাটবাট নাই। চা খেয়ে হাটে ঘুরি। একটা বইয়ের দোকান হয়েছে। আগে ছিল না। আমি আনমনে একটা বইয়ের পাতা ওলটাই। পৃথিবীর সাথে ভেসে চলবার দুরাশায় বুঝি বইয়ের দোকান খোলা। কারা বই কেনে, এই জিজ্ঞাসা ও বিস্ময় আমার চোখেমুখে। আমি শেষ পর্যন- দোকানটা খুঁজে পাই, ওষুধের দোকান। ডাক্তার বিষ্ণু চক্রবর্তীর ওষুধের দোকান। সামনের দিকে বিষ্ণুদা বসতেন, পিছনে তার কম্পাউন্ডার, মোজাম্মেল হোসেন। বিষ্ণুদা ডাক্তারি করতেন, তার চেয়ে বেশি করতেন পরোপকার। গরিবের কাছ থেকে ভিজিট নিতেন না, ওষুধের দাম নিতেন না। আমি তাঁকে বলতাম, চলবে কী করে আপনার। হাসতেন, শুধু হাসতেন। ওরা যখন ভালো হবে, ওদের যখন টাকা-পয়সা হবে, তখন ওরা দেবে। তুমি তো কবিতা লেখো। এই কবিতাটা পড়োনি কখনো :
মানে খোঁজা নিয়ে যোঝা
একদিন থেমে যায়
তেপান্তরে ঝড়ের মতন।
শুধু থাকে চেয়ে থাকা, শুধু কান পেতে রাখা
শুধু নীল ছড়ানো গগন।
তখনো নদীরা থাকে,
থাকে স্রোত, থাকে ঢেউ, তীর;
শুধু হৃদয়ের আর থাকে নাতো কোনো ভার
কোন দায় কোনো বেসাতির।
বিষ্ণুদা হাসতে হাসতে বলতেন, আমার পূর্বপুরুষ এই তল্লাটে খুব অত্যাচার করেছে। আমার তো টাকার অভাব নাই। আমার তো কোনো বেসাতির দায় নাই। কিছু ঋণ শোধ করছি মাত্র।
আমি চুপচাপ তাঁর কথা শুনতাম। তারপর আসে- উঠে বাড়ির দিকে হাঁটা দিতাম।
একদিন এলো সেই ঋণ শোধ করার পালা। ভয়ংকর সেই দিন, নির্মম সেই দিন। যুদ্ধের ভয়ংকর নির্মম দিন। বাড়িতেই থাকি অধিকাংশ সময়। শুধু শুনি হাটবাজার পোড়ানোর কথা, ঘরবাড়ি পোড়ানোর কথা, মেয়েদের ওপর অত্যাচারের কথা, মেয়েদের গুলি করে হত্যার কথা। আমার স্ত্রীর মধ্যে মধ্যে পেটে ব্যথা হতো। দারুণ ব্যথা। একদিন লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে বিষ্ণুদাকে খবর পাঠালাম। তিনি এলেন রাতে, ক্ষেতের আল বেয়ে, লুকিয়ে। তিনি বললেন, তুমি শক্ত মানুষ। রোগীর অসুখের কথা নিকটজনকে জানাতে হয়। বউদির স্টমাকে ক্যান্সার। ঘাবড়াবে না। এই যুদ্ধ বেশিদিন এগোবে না। এটা তো নবাব সিরাজের জমানা না। বিদেশি সৈন্য দখল করবে সারাদেশ। যুদ্ধ শেষ হলে আমি নিজেই বউদিকে নিয়ে যাব ঢাকায়। আমি বিষ্ণুদাকে বলি, আপনার আর বউদির চলে যাওয়া দরকার। মানুষ গোক্ষুর সাপ। কখন ছোবল দেয়। বিষ্ণুদা বলেন, আমিও তাই ভাবছি। তোমার বউদির আত্মীয়-স্বজন ত্রিপুরা আছেন। ওখানে ওকে মেয়েসুদ্ধ পাঠিয়ে দেব দু-একদিনের ভেতর। আমি যাব না। ডাক্তার মানুষ, আমাকে কে মারবে। ডাক্তারের দরকার সৈন্যের, কৃষকের, হিন্দুর, মুসলমানের। বিষ্ণুদা এসব বলে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। অন্ধকারের মধ্যে আরো অন্ধকারে।
এক সপ্তাহ পর স্ত্রীর ব্যথা ফের শুরু হয়। এই ব্যথার শুরু আছে, শেষ নাই। কাঁদছে কাঁদছে কাঁদছে। আমি বলি, আমি যাই, ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসি। স্ত্রী বলেন, তুমি যেও না, তোমাকে মেরে ফেলবে। বাড়ির কাজের ছেলেটিকে একটি চিঠি দিয়ে ডাক্তারদার কাছে পাঠাই। বলি পাটক্ষেতের ভিতর দিয়ে চলে যাবি। পরের ঘটনা কাজের ছেলেটার কাছে শুনি। আকামত বলে, চিঠি পেয়েই ডাক্তারদা রওয়ানা হলো। মোজাম্মেল ব্যাগ নিয়ে পিছনে দৌড়াতে থাকে। আকামত বলে, ডাক্তারবাবুর পায়ে এতো জোর, কখনো ভাবিনি। হাটের রাস্তা যেখানে মোড় নিয়ে আমাদের গ্রামের রাস্তায় উঠেছে, সেখানেই তিন গাড়ি পাঞ্জাবি সৈন্য, সঙ্গে রাজাকারের দল। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামটায় আগুন ধরিয়ে এসেছে। মানুষজনের চিৎকার, মানুষজনের আহাজারি। সেই দিন সৈন্যরা তিন গ্রাম : নিশ্চিন্দিপুর, মোহনপুর, মনপুরায় আগুন দিয়েছে। মনপুরার পরেই আমাদের গ্রাম। সৈন্যরা ডাক্তারবাবুকে জিগ্গেস করে, কোথায় যাচ্ছিস?
রোগী দেখতে।
পিছনে কে।
আমার কম্পাউন্ডার।
তুই হিন্দু না মুসলমান।
হিন্দু।
তোর জন্য এক গুলি। তোর কম্পাউন্ডারের জন্য আর এক গুলি।
গুলি চালাল সৈন্যরা। ডাক্তারবাবু রাস্তার ধারে পড়ে গেলেন। মোজাম্মেল ভাই তার পাশে। আমি পাটক্ষেতে লুকিয়ে এসব দেখি। এসব বলে আকামত ফোঁপাতে থাকে। দুদিন লাশ রাস্তার ধারে পড়ে থাকে। তৃতীয় দিন লোকজন জড়ো করে, ডাক্তারদাকে, মোজাম্মেলকে রাস-ার পাশে কবর দিই। হাট পেরিয়ে শ্মশান, সেখানে সৈন্যদের ক্যাম্প। সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। দাফন আর দাহর মধ্যে তফাৎ কী। কতো মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর কাছেই মানুষ তার কর্ম সম্পাদন করে ফিরে যায়। ডাক্তারদা, তুমি আমাকে মাপ করো। মোজাম্মেল ভাই, তুমি আমাকে মাপ করো। যুদ্ধের পর তাদের কবর আমি বাঁধিয়ে দিই। ফলকে লিখি : বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. বিষ্ণু চক্রবর্তী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক। যখনই তাদের পাশ দিয়ে যাই, আমি তাঁদের প্রণাম করি, আমি তাঁদের সালাম করি।
হাটে যখন আসি, যেদিনই আসি, ডাক্তারদার ডিসপেনসারি আমি দেখে যাই। ডিসপেনসারির নাম এখনো : ড. বিষ্ণু চক্রবর্তী। ডিসপেনসারির মালিক হয়ে বসেছে তরুণ এক যুবক। সেখানে রাজনীতি করে।
যুদ্ধের পর, ত্রিপুরা থেকে একবারই বউদি এসেছিলেন। জায়গা-সম্পত্তি বিলিবণ্টন করার জন্য। যারা জমিজমা দখল করেছে, বাড়িঘর দখল করেছে, হাটের ডিসপেনসারির মালিক হয়েছে, তারা কেউই ডাক্তারদার সহায়-সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়নি। বউদি আমার সঙ্গে দেখা করে যান। তিনি কোনো অভিযোগ তোলেননি। তিনি আমার কাছ থেকে আমার স্ত্রীর একখানা ফটো চেয়ে নিয়েছেন। বলেছেন : ভাই আমার মেয়ে তো একটাই। মেডিক্যালের ছাত্রী। ওকে ইংল্যান্ড পাঠিয়ে দিচ্ছি। ওখানেই পড়াশোনা করবে। আপনার তো দুই ছেলে, ডাক্তারি পড়ছে। এদেরকেও ইংল্যান্ড পাঠিয়ে দিন। তিন ভাইবোনের এক জায়গায় শিকড়। এক জায়গায় থাকবে। আপনি ওর খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। বউদির চোখ ছলছল করে ওঠে। রিকশা দাঁড়িয়ে। তিনি রিকশায় উঠে চলে গেলেন। আমি স্ত্রী বিহনে, শূন্য বাড়িতে, শত-সহস্র স্মৃতির মধ্যে, জীবনযাপন করে চলেছি। কতো কথা মনে পড়ে। অন্ধ রাত্রির সমস্ত বিভীষিকাময় ভ্রূকুটির বিরুদ্ধে স্মৃতি দাঁড়িয়ে থাকে একা। স্মৃতি হিন্দু না মুসলমান না, নারী না পুরুষ না, স্মৃতি মধুময় পৃথিবীর ধূলি।
যুদ্ধ শুরুর দিনগুলোতে আমার খাবার চালে টান পড়ে। প্রতিবেশীদের কারো অবস্থা সচ্ছল নয়। হাটবাজার বসে না। আমি এই বাড়ি ওই বাড়ি করে হয়রান। কেউ খাবার চাল হাতছাড়া করতে রাজি নয়। জমি বিক্রি করতে চেয়েছি। খদ্দের নাই। ডাক্তারদা কী করে খবর পেয়েছেন। তিনি তাঁর বাড়ির কাজের লোককে দিয়ে একমণ চাল পাঠিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে ছোট্ট একটি চিরকুট : বেশি পাঠালাম না। লুট হয়ে যাবে। আমি এবং আমরা মুখোমুখি চেয়ে আছি। যুদ্ধ একদিন শেষ হবে। আমরা ফের পরস্পর পথ খুঁজে পাব।
পাঁচ
খালুজান
কী রে।
লন যাই।
চল।
খালুজান।
কী বলবি।
একটু চা খাইয়া লই। কখন পান্তা খাইয়া বাইর অইছি।
ত, চা খা।
রিকশায়ালা চায়ের দোকানে থামে। আমি সামনের লম্বা টুলে বসি। গরম চা আর লেড়ি বিস্কুট খেয়ে নিয়েছে রিকশায়ালা।
খালুজান।
ক’।
একখান কথা কই।
ক’।
চা’র দাম বাড়ছে। লেড়ি বিস্কুটের দাম বাড়ছে। আমরা রিকশায়ালারা তো এইটাই খাই। কোন বেহানে পান্তা খাইয়া বাইর অইছি। এখন মাদান চলতাছে।
জোর চালা।
কই যামু। আলুক্ষেতে?
হ।
রিকশায়ালারা মোটামুটি জানে আমি কখন কই যাই। আমার যাওয়ার জায়গা কম, রোজই কমে যাচ্ছে। আমার বয়সীরা মরে যাচ্ছে। কেউ চলে যাচ্ছে শহরে, ছেলেপুলেদের টানাটানিতে। কেউ জায়গা-জিরাত বিক্রি করে ঢাকা শহরে বাড়ি করছে। আমি, একমাত্র আমি থেকে যাচ্ছি, নাছোড়বান্দা হয়ে। আমি মধ্যে মধ্যে ভাবি, কেন আমার এই জেদ, গ্রামে পড়ে থাকার জেদ।
জেদ করি। একলা মানুষ। চাহিদা কম। ঋণ করি না। যতটুকু জায়গা আছে তাতে আলুর চাষ করি। যুদ্ধের সময় দুদিন না খেয়ে ছিলাম আমি ও আমার স্ত্রী। বেতফল আর বাটিভর্তি জাম। কাছারিঘরের সিঁড়িতে বসে থাকতাম এক বুড়া এক বুড়ি। সৈন্যদের আনাগোনা টের পেতাম দূরগ্রামের লোকদের চিৎকার আর হাহাকার শুনে, কিংবা আগুনের কালো ধোঁয়া দেখে। কাছারিঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে ভিতর বাড়িতে চলে যেতাম।
আল্লাহ, হে আল্লাহ, না খেয়ে থাকতে চাই না। ডাক্তারদার চাল না পেলে আমরা মরেই যেতাম। পরওয়ারদিগার, আমরা মরতে চাই না, বাঁচতে চাই।
আলু খেয়ে তো কিছুদিন বাঁচতে পারব। কোথায় একটা বই পড়েছিলাম, খুবসম্ভব গন উইথ দ্য উইন্ড। আর কখনো না খেয়ে থাকতে চাই না। ঈশ্বর-আল্লাহ-ভগবান, না খেয়ে থাকতে চাই না।
আমরা হারিয়ে যাইনি। আমি, ডাক্তারদা, বউদি, আমার দুই পুত্র, ডাক্তারদা ও বউদির কন্যা কঙ্কা, আমরা সবাই অনেক পথ খুঁজে শুধু চুপ করে আছি।

